| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

কপোত কপোতী ও একটি কালবৈশাখ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

(১)

কুউউউউ… কুউউউউউ…

বসন্ত শেষ হয়েছে অনেকদিন তবুও কোকিলটা এখনও মাঝে মাঝেই অশান্তভাবে ডেকে ওঠে। কাকে ডাকছে ও? ওর সঙ্গীকে? কি বলতে চাইছে ডেকে ডেকে? এই অসময়েও আমার ভালোবাসা চাই, তোমাকে কাছে চাই। না কি জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্বের কথা? বলতে চাইছে আমি এখনও বেঁচে আছি?

কোকিলের ডাকটা শুনেই আজ সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল তন্ময়ের। আর ঘুম ভেঙে যেতেই মনের মধ্যে ভিড় করল একরাশ বিরক্তি। আজ ওর কাজের দিন; বাসন মাজা, রান্না করা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, আর হ্যাঁ তার সাথেই আছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ মানে রোজকার মতো ঘরে বসে অফিসের কাজ করা। অফিসের এইসব রুটিন কাজকর্ম নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তন্ময়ের তবে ওর ঘরে অফিসের মতো ইনফ্রা-স্ট্রাকচার নেই তাই ঘাড়ে, পিঠে, কোমরে একটু-আধটু ব্যথা হয় এই যা। তা হোক, মাস দেড়েকের টানা লকডাউনের পরেও যে ওর চাকরিটা আছে, সেটাই শান্তি।

না আর দেরী করলে চলবে না, আগে বাসন মাজবে তারপর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এক কাপ চা খাবে। বিছানা ছেড়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেল তন্ময়। সিঙ্কের ভেতর জমে থাকা বাসনগুলোকে দেখে চোখে জল এসে গেল ওর। কি কুক্ষনেই যে বাড়ি ছেড়ে এতো দূরে চাকরি করতে এসেছিল…

অথচ প্রথম প্রথম কি সুন্দরই না ছিল সবকিছু। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার আগেই পুনার একটি নামী আই,টি কোম্পানিতে প্লেসমেন্ট হয়ে গেল তন্ময় হালদারের। মা অবশ্য প্রথমদিকে একটু আপত্তি করেছিল একমাত্র ছেলেকে বাড়ি থেকে প্রায় ২২০০ কিলোমিটার দূরে চাকরি করতে পাঠাতে কিন্তু মাইনে শুনে আর কথা বাড়ায়নি; সেটা যে কোলকাতার চাকরিগুলোর থেকে প্রায় দেড়গুণ। যথা সময়ে লটবহর নিয়ে পুনায় চলে এসেছিল তন্ময়। ওরই মতো আর তিনজন কম বয়সী কলিগের সাথে অফিসের কাছাকাছি দু’কামরার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে পেতে ফেলেছিল ব্যাচেলারদের সংসার। একজন মাঝবয়সী কাজের মাসি সকাল বেলায় ঘরের কাজ আর রান্নাবান্না করে যেতো; ওরা সারা সপ্তাহ নাকমুখ গুঁজে কাজ করতো আর ছুটির দিনে করতো দেদার মদ্যপান। হায় ভগবান! কোথায় গেল সে সব দিন? করোনা ভাইরাস এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিল। এখন ওদের হাউসিং সোসাইটিতে ডোমেস্টিক হেল্প-দের আসা বারণ, ডেলিভারি বয়দের আসা বারণ এমনকি রেসিডেণ্টদের অকারনে কমন-প্লেসে ঘোরাঘুরি করাও বারণ। তাই ঘোর অনিচ্ছাসত্বেও চার রুমমেট মিলে ঘরকন্নার কাজ সামলাচ্ছে এখন। আজ পালা পড়েছে তন্ময়ের।

সবুজ রঙের স্ক্রাবারে করে লিকুইড সাবান নিয়ে কুকারের গায়ে বোলাতে বোলাতে কিচেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো তন্ময়। ঝকঝকে পরিষ্কার সকাল। জানালার পাশে লম্বা ঝাউ গাছটার ডাল-পালায় নাম না জানা পাখিদের কিচিমিচি। মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল তন্ময়ের।

সেই যে গত নভেম্বরে চাকরিতে জয়েন করেছিল, তারপর থেকে আর একদিনও ছুটি নেয়নি তন্ময়। ভেবেছিল একেবারে দিন পনেরোর ছুটি নিয়ে বাড়ি যাবে। কিন্তু তার আগেই গোটা মহারাষ্ট্র জুড়ে তান্ডব করতে শুরু করলো করোনা ভাইরাস; তার জেরে শুরু হল দফায় দফায় লকডাউন, ইতি পড়ল স্বাভাবিক জীবনাভ্যাসে। ভাগ্যিস, পরিযায়ী শ্রমিকগুলো একজোট হয়ে বিদ্রোহ করলো, না হলে সরকার কবে যে আবার ট্রেন চালানোর কথা ভাবতো কে জানে?

এ বছর পয়লা বৈশাখে বাড়ি যাওয়ার প্ল্যান করে রেখেছিল তন্ময়। ভেবেছিল মাকে একটা লাল পাড় গরদের শাড়ি আর বাবাকে একটা তসরের পাঞ্জাবি কিনে দেবে। বাবার অনেকদিনের শখ তসরের পাঞ্জাবি পরার কিন্তু ওর পড়াশোনার খরচা যোগাতে যোগাতে সে আর হয়ে ওঠেনি। মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল তন্ময়ের। ট্রেন চললেই বাড়ি ফিরতে পারবে মহারাষ্ট্রে কাজ করতে আসা পরিযায়ী শ্রমিকেরা। কিন্তু ওর মতো মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবিরা? যারা ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের মতোই একটু বেশি রোজগারের আশায় পরিবার, প্রিয়জন ছেড়ে এত দূরে এসেছে, তারা কবে ফিরবে কাছের মানুষের কাছে?

“একটুকু ছোঁয়া লাগে…

চিন্তায় ছেদ পড়ল তন্ময়ের। চার্জে লাগানো মোবাইল ফোনটায় রবীন্দ্রসংগীতের সুর বেজে উঠেছে। বাবা-মা নয়, ফোন করেছে সেই বিশেষ একজন, যাকে কাছে পাওয়ার জন্যেও এতো দূরে চাকরি  করতে এসেছে। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে নিতে লাগলো তন্ময় কিন্তু তার আগেই থেমে গেল ফোনের সুর। মন খারাপ নিয়ে ও আবার বাসন মাজায় মন দিল।

মুখে করে খড়কুটো এনে এনে সামনের ফ্ল্যাটের বন্ধ জানালার কার্নিশে জমা করছে দুটো গোলা পায়রা, বাসা বাঁধার আশায়। সেদিকে দেখতে দেখতে মেজে রাখা বাসনগুলো একে একে ধুয়ে রাখতে লাগলো তন্ময়। লকডাউন শেষ হলে ওকে ও তো তোড়জোড় করতে হবে প্রিয়জনের সাথে ঘর বাঁধার…  

(২)

নীপার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে স্বশব্দে একটা চুমুক দিলেন মহাদেব ভট্টাচার্য। নীপা মানে ছোটমেয়ে নীপবীথি-কে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই মহাদেব বাবুর। এই মেয়েটা বড়মেয়ে লোপামুদ্রার মতো শান্তশিষ্ট নয়; এ যেন কেমন উড়ুক্কু মেজাজের, গেছো টাইপ। আগে সারাদিন টইটই করে বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরে বেড়াতো, এখন লকডাউনের জন্য গৃহবন্দী; সারাদিন হয় মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছে নয়তো মায়ের মুখে মুখে তর্ক। লোপাকে বছর ছয়েক আগেই পার করেছেন মহাদেব বাবু; সরকারি চাকুরে জামাই আর চার বছরের নাতনিকে নিয়ে বড় মেয়ের সুখের সংসার, আর যেভাবে ক্রমাগত লকডাউন বাড়ছে তাতে হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই দৌহিত্রের আগমনবার্তাও পেয়ে যাবেন কিন্তু এই মুখরা ছোট মেয়েটার যে কি হবে ও যে কিভাবে শ্বশুরঘর করবে, তা ভগবানই জানেন।

ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটগুলোর ওপর মহাদেব বাবুর কোনো বিশ্বাস নেই, তাছাড়া বড় মেয়ের বিয়েও তো খবরের কাগজ দেখেই হয়েছিল তাই মার্চ মাসের মাঝামাঝি নীপার জন্য সরকারি চাকুরে, ব্রাহ্মণ পাত্র চেয়ে একটি নামী খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকটা ভালো ভালো সম্বন্ধও এসেছিল, বৈশাখ মাস পড়লেই পাত্রী দেখতে আসার কথাও ঠিক হয়ে গিয়েছিল কিন্তু মারণ রোগের ঠেলায় সব ভেস্তে গেল।

সামনের বছরেই প্রাইমারি স্কুলের হেডমাষ্টারের গুরুদায়িত্ব পালন করার হাত থেকে অব্যহতি পাবেন মহাদেব বাবু। তাই ভেবেছিলেন রিটায়ারমেন্টের আগেই আসছে অঘ্রাণে নীপার বিয়ে দিয়ে, প্রভিডেন্ট ফান্ড আর পেনশন নিয়ে নিশ্চিন্তে অবসর যাপন করবেন, কিন্তু সে গুড়ে বালি। এখন যা অবস্থা তাতে কবে যে লকডাউন উঠবে, কবে পাত্র পক্ষ নীপাকে দেখতে আসবে, কবে পাকা কথা হবে সে সবকিছুই অনিশ্চিত। তাছাড়া পাকা কথা নয় হোলো কিন্তু বিয়েবাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে তো ? আর সোনার দাম যেভাবে চড়চড় করে বাড়ছে তাতে মেয়েকে গা-সাজানো গয়না দিতেই তো মহাদেব বাবু ফতুর হয়ে যাবেন। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে উনি আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। জুড়িয়ে যাওয়া চা টা এবার বড়ই বিস্বাদ ঠেকল মহাদেব বাবুর।

(৩)

বাবার হাতে কোনোমতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিয়েই সেখান থেকে সরে পড়ল নীপা। বাবার সামনে এখন আর বেশিক্ষন থাকতে ইচ্ছা করে না ওর। মিড-ডে মিলের লোভে কাজি পাড়া নিম্ন বুনিয়াদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসা অবাধ্য কচি-কাঁচাদের শাষন করতে করতে বাবা যেন কেমন বদরাগী হয়ে গিয়েছে আর তার সাথেই জেদী ও একরোখা। সেই সঙ্গেই বিসর্জন দিয়েছে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি। নাহলে এতো তাড়াতাড়ি দিদির বিয়ে দিয়ে দেয়? দিদি তো পড়াশোনায় ভালো ছিল, এম,এ পড়তে চেয়েছিল, চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই একটা আধবুড়ো লোকের সাথে বিয়ে হয়ে গেল।

নীপা কিন্তু ওর সাথে এইসব অবিচার হতে দেবে না। বাবা যতই প্ল্যান করুক সরকারি চাকুরে ছেলের সাথে এ বছরেই ওর বিয়ে দেবে, ও কিন্তু সে সব একেবারেই মানবে না। ওর প্রেমিক তন্ময় এখন পুনাতে আছে। তন্ময় একে ব্রাহ্মণ নয় তার ওপর ওর চাকরিটাও বেসরকারি, বাবা কোনো মতেই ওকে মেনে নেবে না কিন্তু নীপা বাবাকে সাফ জানিয়ে দেবে ও বিয়ে করলে তন্ময়কেই করবে। তন্ময় নীপাকে কথা দিয়েছে চাকরিতে পার্মানেন্ট হলেই ওকে বিয়ে করবে।

আর এ বার ভগবান ও তো সাথে রয়েছে নীপার। বাবা খবরের কাগজে ‘পাত্র চাই’ বলে বিজ্ঞাপন দিলেও করোনা ভাইরাসের ভয়ে একটাও পাত্রপক্ষ দেখতে আসেনি নীপাকে। তাই করোনা ভাইরাস অন্যদের কাছে অভিশাপ হলেও নীপার জীবনে আর্শীবাদ হয়ে এসেছে…                  

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত