| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

হরিদাসীর গুপ্তকথা

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comছেলেদের কথায় শেষ অব্দি রাজিই হয়ে গেল হরিদাসী। ব্যাপার তো তেমন কিছু নয়। জমির দলিলটা নিয়ে পাড়ার ক্লাবে যেতে হবে। যে টাকা ধার দেবে সে সেখানে আসবে। ক্লাবের লোকজনও থাকবে। যা কথা হওয়ার সেখানেই হয়ে যাবে।

বাষট্টি পেরিয়ে হরিদাসী মণ্ডলের ভরাট সংসার। তিন ছেলে, তিন বউমা। বড়ছেলে বিষ্ণু রাজমিস্ত্রির কাজ করে। তার এক ছেলে। মেজ নারায়ণ আলু বিক্রি করে জয়শ্রী বাজারে। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। ছোট কৃষ্ণ ইলেকট্রিকের মিস্ত্রি। তার একটিই মেয়ে তবে সংসার বড় হলেও যেটা যে তেমন চোখে দেখতে পায় হরিদাসী তা নয়। বড় আর মেজর হাঁড়ি আলাদা। ঘর-গেরস্থালিও। অ্যাসবেস্টস চাপানো একখানা করে পাকা ঘর দুই পরিবারের। হরিদাসীর ঘরও পাকা। তফাত বলতে ঘরের ছাদে টালি। ছোটছেলে তাদের সঙ্গে থাকে না। বিয়ের বছর দুয়েক পরেই দক্ষিণ দীনেশপল্লিতে শ্বশুরের ঘরের পাশে ভাড়া নিয়ে চলে গেছে। সবদিক বিচার করে দেখলে হরিদাসী বেশ ঝাড়া হাত-পা। সকাল সাতটায় পীরপুকুর থেকে বেরিয়ে পড়ে। তিন বাড়িতে কাজ তার। সবই দূরে দূরে। অটো আছে কিন্তু দু’পিঠের ভাড়া আঠেরো টাকা। হরিদাসী হেঁটে হেঁটেই পথ কাবার করে দেয়। কাজ সেরে শেষবেলার বাজারে কিছু গস্ত করে ফিরে আসে একটা নাগাদ। বেঁটেখাটো রোগা-পলকা শরীর। যেতে-আসতে দেড়ঘণ্টা হাঁটতে পারবে না! ঘরে ফিরে তার কাজ কী আর। কলের হাতল হ্যাচাং হ্যাচাং করে জলে ভরে বালতিতে। গায়ে ঢালে। ছাড়া শাড়ি-ব্লাউজ কাচে। তারপর পাম্প স্টোভে রান্না বসায়। বেশি তো কিছু নয়। কোনওদিন পাঁচমিশেলি তরকারি, কোনওদিন গাঠিকচু কী পুঁইচচ্চড়ি। সঙ্গে ভাত আছেই। নাইতে-খেতে বেলা যায়। তারপর সে চৌকিতে গিয়ে ওঠে। ঝিমুনি থেকে ঘুমে চলে যায়। বিকেলে শুকোতে দেওয়া কাপড়জামা তোলে ছোট উঠোনে টাঙানো দড়ি থেকে। নাতিদের খেয়াল করতে পারে না তবে নাতনিকে পড়তে যেতে দেখে। ঘরের সামনে জলছড়া দিয়ে শাঁখ বাজায়। উঠোনের একপাশে যে তুলসীগাছে জল দিয়ে সে সকালে কাজে বেরোয়, সেখানে গলায় আঁচলের বেড় দিয়ে জড়ো করা হাত কপালে ঠেকায়। ঘরে গোপাল ঠাকুর আছে হরিদাসীর। লক্ষীর বাঁধানো ছবি, শিবের ক্যালেন্ডার। তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে গড় করে। সকালের চা তার কাজের বাড়িতেই হয়ে যায়। বিকেলেরটা নিজে করে খায়। তারপর কোনওদিন আশেপাশের কারও বাড়ি যায়। কেউ তার ঘরেও আসে। গল্পগাছা চলে। রাতে তো রান্নার ঝামেলা নেই। সকালের তরকারি বাটিতে চেপে গামলার জলে নৌকা হয়ে ভেসে থাকে। ভাত নষ্ট হয় না। বড়জোর প্যাচপ্যাচে হয়ে যায় খানিকটা। একা মানুষের এই না কত।

আজ সন্ধেবেলায় তার একটা বাড়তি কাজ হয়েছে। ক্লাবে যেতে হবে। বড়ছেলে অনেকদিন ধরেই বলছে জমির দলিলটা দেওয়ার কথা। দু’কাঠা জমি। হরিদাসীর নামেই কিনেছিল তার বর গোবর্ধন। এখন তার বড়ছেলের পঁয়তাল্লিশ হবে। তখন তার বরের অমনই ছিল। ঘরামির কাজ করত। কিন্তু জমি কিনে নিজের ঘর তোলার আগেই মরে গেল। পেটের অসুখ। টের পায়নি তা তো নয়। চেপে গেছিল হবে। রক্তবমি হল দু’দিন। তিনদিনের মাথায় গেল।
তখন জমি পেয়েছিল সাড়ে চার হাজার টাকা কাঠা। কলকাতা বললে কী হয়। এ একেবারে দক্ষিণেরও দক্ষিণে। আর এখন? খোঁজ নিয়ে দেখেছে হরিদাসী। লাখ চারেক তো হবেই। বেশিও হতে পারে। জমি অনেক ভেতরে কিন্তু অটো মেট্রো স্টেশন ছুঁয়ে ফেলার পরেই দাম চড়ে গেছে।
জমির দলিল নিয়ে যেতে হবে মানে জমি কেনাবেচা হবে তা নয়। বিষ্ণু কাকে জোগাড় করেছে। দলিলটা গচ্ছিত রেখে সে টাকা ধার দেবে। টাকা শুধলে আবার তোমার জমি তোমার। দু’লাখ নাকি দেবে বলেছে লোকটা।
টাকার দরকার কীসে? হরিদাসীর তো লাগছে না। তার ছেলেদের লাগবে। বড়, মেজ— দুজনেরই। অ্যাসবেস্টসে খুব গরম করছে। ছাদ ঢালাই করে নেবে তাই। ছোটছেলেরও লাগবে। সে একটা দোকান দেখেছে। এখান থেকে কিছুটা পেলে বাকিটা জোগাড় করে এইবেলা হলে হয়ে যেতে পারে। খুব সোজা ব্যাপার। তবে মুশকিলটা হল, যে টাকা দেবে সে হরিদাসীর সঙ্গে কথা না বলে কিছু করবে না। জমি যখন হরিদাসীর তখন টাকাও সে তাকেই দেবে। শুধু তা-ই নয়। সে লোক বলেছে এসব আবার পাড়ার ক্লাবে সকলের সামনে হতে হবে। দলিল এনে তার হাতে তুলে দিলেই হবে না। লেখাপড়া হওয়ার আছে।
হরিদাসী দলিল দিতে রাজি ছিল না। দুই ছেলে তার পিছনে পড়ে রয়েছে গেল বছর থেকে। চাপ আরও বাড়ছে। তার ঘরে এসে বলেছে। নিজেদের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বুঝিয়েছে। ব্যাপারটা যাতে পাঁচকান না হয়। ঘরের ব্যাপার তো ঘরে থাকাই ভালো। এখন যে আর থাকছে না তাতে তারা গুমরে রয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। যার কাছ থেকে কর্জ করবে তার শর্ত তো মানতেই হবে।
ছোটছেলের এমনিতে তেমন আসা-যাওয়া নেই। তবে মাঝে মাঝে সেও এসে হরিদাসীকে বলে গেছে, ‘দলিলটা দিয়ে দাও মা। ও তো পড়েই আছে। কাজের কাজ হলে ভালো নয়?’

একদিন বিকেলবেলা বড়ছেলে শিঙাড়া নিয়ে এসে হাজির। ‘ঘুমোচ্ছ না কি? ও মা। বাইরে এসো দেখি একবারটি।’ হরিদাসী ধড়মড় করে উঠে বসেছিল চৌকিতে। কাঁচাপাকা চুল খুলে এলিয়ে গেল। এক প্যাঁচ দিয়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বেরিয়ে এসে অবাক। ছেলে বলল, ‘ধরো ধরো, গরম নি এসছি একেবারে। চা খাও আর এই খাও।’
ঠোঙা হাতে নিয়ে হরিদাসী যদিও টের পেয়েছিল শিঙাড়া ঠান্ডা মেরে গেছে। তবু সে নিয়েছিল। বিষ্ণু তখন বলল, ‘এবার আমাদের কথাটা এট্টু ভাবো। এ বছরের জলটা শেষ হলেই কাজটা ধরে ফেলি তালে। সে লোককে খবর করি। কেলাবেই আসুক। যাবে তো পষ্ট বলো।
হরিদাসী বলেছিল, ‘যাব।’ তারপর ছেলেকে অবাক করে দাঁড় করিয়ে রেখে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল।
যে বড় কাপড়ের থলেয় ছাতা আর টাকাপয়সা রাখার ছোট ব্যাগ নিয়ে হরিদাসী রোজ কাজে যায় সেটা নিয়েই সে বেরোল সন্ধেবেলায়। চশমাটা মুছে নিয়েছে ভালো করে তবু কষ্ট হয় এই সময়টায়। বাঁ চোখে ছানি। ডান চোখ যাও বা আছে, তা চলাফেরায় তেমন সুবিধের নয়। তবু দুই ছেলের সঙ্গে রওনা দিল হরিদাসী। ছোটছেলেও চলে আসবে ঠিক।
মিলন সংঘের ঘরে বেশ লোকজনের জমায়েত হয়েছে। ক্লাবের মুরুবিবরা হাজির। ক্লাব থাকলে সালিশিও থাকবে। টাকা দেওয়ার লোক সোমনাথ কুণ্ডুও আগে থেকেই এসে বসে আছেন চেয়ারে। হরিদাসীকেও একখানা চেয়ারে বসতে হল। সোমনাথ কুণ্ডুকে হরিদাসী না চিনলেও অনেকেই চেনে। ফুটবল টুর্নামেন্ট, রক্তদান শিবির, কালীপুজোয় চাঁদা দেন। নানারকম ব্যবসা আছে। তার একটা হল টাকা ধার দেওয়া। সুদ তো নেন নিশ্চয়ই। না হলে আর ব্যবসা কীসের! সবাই তো আর ব্যাঙ্ক থেকে ধার পায় না। সুদ বেশি হলেও সোমনাথ কুণ্ডুই তাদের ব্যাঙ্ক। এরকম লোক অনেকেই আছে। যারা খোঁজ রাখার তারা জানে।
কথা শুরু করার আগে ক্লাবের সেক্রেটারি বিমল চক্রবর্তীকে একটু কেশে নিতে হল। হরিদাসী মণ্ডল তো রোজ এই ক্লাবের সামনে দিয়েই লোকের বাড়ি কাজ করতে যায়। আজ আবার এসেছে আর এক চেহারায়। আপনি, না তুমি? কী বলা যায়? তারচেয়ে বরং সোমনাথ কুণ্ডুকে দিয়ে শুরু করাই ভালো।
‘বলুন কুণ্ডুবাবু, আপনি বলুন আগে।’
‘আমার যা বলার বলে দিয়েছি। জমি তো ওর নামে। ওর সাথেই হোক যা হওয়ার। ছেলেরা তো বলে দিয়েছে কিন্তু মায়ের মত আছে কিনা জানতে হবে না?’
‘কী মাসি?’— মাসিই বলে ফেললেন সেক্রেটারি। ‘দলিল এনেছ? ও জমি তো তোমারই?’
হরিদাসী মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, ছেলেদের বাপ তো আমার নামেই কাগজ করে দে গেছল। আমরা থাকতুম গোচরণে। বাপের ঘর, শ্বশুরঘর— দুই-ই সেখেনে। টেরেনে চাপলে সোই তোমার লক্ষীকান্তপুর লাইনে পড়ে, ঝানো তো। তা সেখেনে বে হওয়ার পর থে-ই দেখি তাদের ভায়ে ভায়ে ঝগড়া। সে বললে, চলো কালী, কলকেতায় যাব। খাটব, খাব।’
বিমল চক্রবর্তী নড়ে উঠে বললেন, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও। কালী কেন? তোমার নাম তো—। দলিলে কী আছে?’
হরিদাসী যেন লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁটে অল্প হাসি। ‘ওই তার কথার ছিরি ছেল। আমি খুব কালো তো তাই কালী বলে ডাকত।’
‘ও। বুঝলাম।’
হরিদাসী আবার কথায় ফিরে গিয়ে বলল, ‘ত্যাখন এখেনেও ঘরামির কাজ ছেল। এখন তো নেই আর। দ্যাখ না দ্যাখ সব পাকা বাড়ি হয়েছে। তা সে খুব খাটত। সোই খেটে খেটে ট্যাকা জমিয়ে বলে জাগা কিনব। কিনলে। তাপ্পর বলে, বেড়া তো দিতি পারবুনি, টিউকলটা বসাই, চিহ্ন থাকপে একটা। সে ধরো পঁচিশ-ছাবিবশ বচ্ছর আগে কথা বলতিছি। ত্যাখন ইদিকে খালি হোগলার বন, মাঠ, বাঁশের জঙ্গল আর খাল-বিল। একটাও ঘরদোর নি। লোকে আসতে চায় নে মোটে। হাঁটচলার আস্তা নেইকো। খালি শ্যাল খটাস ভাম ঘোরে। আর খুব সাপ ছেল।’
কে একজন বলল, ‘শেয়ালটেয়াল আর নেই কিন্তু সাপ তো মাঝে মাঝে এখনও বেরিয়ে পড়ে।’
হরিদাসী চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ও বাবা, এই তো সেদিন দেখলুম, সাড়ে তিন হাত। চন্দবোড়া হবে। আমার ঘরের পেছুনে বাদাড় হয়ে আছে, সেখেনে সরসর—।’

সেই একজন বলল, ‘ধুর, কী দেখতে কী দেখেছে।’
বিমল চক্রবর্তী বললেন, ‘ওসব বাদ দাও। জমির কথা বলো।’
‘জমির কথা কী আর বলব। কিনলি কী হয়, কপালে নেই তার কী করবে। মরেই তো গেল সে। আমার ছেলে তিনটের মধ্যি বড়টা ত্যাখন এট্টু স্যায়না হয়েছে। আজমিস্তিরির কাজ শিখছে। আমি লোকের বাড়ি কাজ নিলুম। ছেলেগুলোকে মানুষ করতি হবে নে! তাপ্পর তোমার একটা ওই ছ্যাঁচাবেড়ার ঘর তুললুম জাগার ওপ্‌রে। গোচরণে বাপের জাগাজমি যা ছেল সব ভায়েরা ভাগাভাগি করে নে নেছে। এই এত্‌টুক খালি আমার হল।’
‘তা তুমি এখন কী করবে? তোমার ছেলেদের তো টাকার দরকার।’
মাথা নাড়ল হরিদাসী। ‘সে তো দরকার জানি। বড় আর মেজ বলতেছে ছাদ ঢালাই করবে। করতিই হয়। ওই অ্যাসবেস না কী বলে, ওতে খুব তাপ টানে। আমার তো টালির চাল, তবু যা হোক ঠান্ডা। এক জল পড়লিই যা মুশকিল।’
‘জল পড়ে না কি?’
‘পড়ে তো। কত টালি বলে ভেঙে গেছে। সরে ফাঁক বেইরে পড়েছে কত জাগায়। সেখেন দিয়ে জল আসে নে? এই তো বিষ্টির কাল শুরু হয়েছে, একবার এসো না আমার ঘরে, নিজিই দেখতে পাবেখন।’
এবার একজন তাকাল হরিদাসীর বড়ছেলের দিকে। ‘কী রে বিষ্ণু, মায়ের ঘরের টালিগুলো সারিয়ে দিতে পারিসনি!’
বিষ্ণু আমতা আমতা করে বলল, ‘দেব দেব করে হয়নি। সোমসারের খরচ কী কম! সেই জন্যেই তো বলছি। হাতে টাকা এলেই এইবার-।’
হরিদাসী বলল, ‘ও কিছু না। সে আমি পেলাস্টিক এনে জায়গামতো গুঁজে গুঁজে রাখি। কিন্তুক জোরে হাওয়া চললে থাকে নে মোটে। জানলায় পেলাস্টিক ঝুইলে রাখি, সেখেনেও সেই এক দশা।’
‘কেন? জানলার পাল্লা ভেঙে গেছে না কি?’ সেক্রেটারি তাকালেন হরিদাসীর দিকে।
হেসে উঠল হরিদাসী। ‘শোনো কথা। জানলার কবাট ছিল কোনকালে? সে তো সেই গোড়া থে-ই ফাঁকা। কবাট নেই, শিক নেই, কিচ্ছুটি নেই। ছেলেরা যে যার নিজির ঘর তুললে, আমি বললুম, আমার ঘরটাও তালে পাকা করে দে বাবা। তা বড়টা বললে, তুমি এখন ওইতেই থাকো, পরে দেখবখন। ঢের খরচ। আমি করিছি, নারায়ণ করেছে, হাতে আর কিছু নেই আমাদের। আমি বললুম, আমারটা আমি দিচ্ছি। তুই করে দে। কাজ তো তোর হাতে। মিস্তিরির পয়সাটা যা হোক বাঁচে। ত্যাখন ঘর হল। তাপ্পর জানলা বইসে দে বললে, চোর-ডাকাত ঢুকে নেবে কী! খোলাই থাক, বাতাস খেলবে। কথাটা ভুল বলে নে। হাওয়া ঢোকে, জল ঢোকে, ফের ইঁদুর-ছুঁচোও ঢোকে, সাপও ঢুইকে ছেল। ওদের দোষ নি। আমার অব্যেস এসে গেছে।’
ছোটছেলে কৃষ্ণ এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, ‘ঘরটা যে তোমার পাকা হয়েছিল, সেটা বলো।’
হরিদাসী তার দিকে তাকাল। ‘বললুম তো। কেমন সোন্দর ইট দে গেঁথে দিলে বিষ্ণু! শুধু ভেত্‌রে আর বাইরে ঝদি সিমেন্ট বুইলে দিত, আরও বেশ হত। ইটের মধ্যি মধ্যি জল জমতি পারত নে। তা সে ভালোই হয়েছে। জল জমে বলে বছরভর সোঁদা থাকে, ঠান্ডাও হয়। শীতকালে ঝা এট্টু।’
ক্লাবের প্রে‌সিডেন্ট রতন দাশ এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। তিনি কম কথার লোক। তা ছাড়া ক্লাব তো শুধু মাঝখানে রয়েছে। অন্য কিছু ব্যাপার নেই। তবু এবার তিনিও বললেন, ‘কী নারায়ণ, মায়ের দিকে খেয়াল রাখ না কেন তোমরা?’
সঙ্গে সঙ্গে হরিদাসী বলে উঠল, ‘না না। সে খেয়াল রাখে। এই যে আষাঢ় মাসে এত বিষ্টি হল, চাদ্দিকে একেবারে কোমরডোবা জল, ত্যাখন কি তারা দ্যাখেনি? কাজের বাড়ি যাচ্ছিলুম, ছাতা ধরিছি, তাও জল বাগে মানে নে। যেতি যেতি শাড়ি চুপচুপে। ফেলাটবাড়ির সিঁড়িতে দাঁইড়ে সে কাপড় ছেড়ি শুকনো একখানা পড়লুম। এই থলেয় ভরে নে গেছলুম। ফিরতি পথে সেখানাও ভিইছে গেল। এসে দেখি ঘরে জল ঢুইকে অস্থির। ঠাকুরদের দ্যালের ওপ্‌রে তুলে দিলুম। ইস্টোভ চৌকির ওপ্‌রে তুলে ভাত বসালুম। আমাদের ইদিকটা ডোঙার মতো, ঝানো তো। একবার জল ঢুকলি সহজে নামতি চায় নে। আত ঝ্যাত বাড়ে, জল ত্যাত বাড়ে। আমি সেই চৌকি ছাড়া যাই কোথা! তা ত্যাখন ন’টা হবে, বড়ছেলে এসে বললে, মা, এখেনে আর থাকা যাচ্ছে নে। আমরা দীনেশপল্লি চললুম, ছোটর ওখানে। আরও আত্তিরবেলায় মেজটা বললে, মা, আমরা শান্তিনগর চললুম, শ্বশুরবাড়ি। সাবধানে থেকো। কাল সোকালে এসে দেখব কী হয়।’
জমির ব্যাপারটা কোথা থেকে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে এর কথায় কথায়। কিন্তু এড়ানোও যেন যাচ্ছে না। তাই বিমল চক্রবর্তী বলে ফেললেন, ‘তুমিও গেলে না কেন ওদের সঙ্গে?’
‘ও মা, শোনো কথা। আমি কোথায় যাব? মেজছেলের শ্বশুরঘরে গে উঠব? ছোট নিজিই থাকে ভাড়ার বাড়ি, বড় সেখেনে গেল, তার মধ্যি আমি ভিড়ে পড়ব? আমি একা মানুষ। একটা আত কাইটে দিতে পারবুনি? যাওয়ার কালে খেয়াল করি তারা বলে তো গেছল!’
আবার কোনও একজন বিষ্ণুকে বলল, ‘মাকে তোরা তোদের সঙ্গে রাখিস না কেন? বুড়ি মানুষ, এরকম আলাদা থাকে!’
যেন ছেলের হয়ে জবাব দিচ্ছে এভাবে হরিদাসী বলল, ‘বেড়ার ঘর থাকার সময় তো ওদের নে-ই থাকতুম। ছেলেদের বে-থা হল, বউমারা এল, নাতি-নাতনি হল, তাদের ঘর লাগবে নে? দু’কাঠা জাগায় একখানা করে ঘর তো মোটে। সেখেনে আমার জাগা হয়! আমি হাত-পা ছইড়ে নিজির ঘরে থাকি। নিজি বাজার করি, নিজি রাঁধিবাড়ি, খাই। এই ভালো।’
রতন দাশ বললেন, ‘তুমি নিজে এতসব করো কেন? বউমারা তো আছে।’
কোলের ওপর রাখা থলেটা একটু নাড়াচড়ার মতো করে হরিদাসী বলল, ‘সে আছে। তবে তাদের নিজিদের সোমসারও তো দেখতি হয়। ছেলেমেয়েগুলোর দেখাশোনা করতি হয়। সোয়ামিদের যত্নআত্তি করতি হয়। তারা চৌপর দিন ব্যস্ত বলে আমার খপর নিতি পারে নে। আমি আচারটা কী নাড়ুটা দিলি, নেয় কিন্তু। ভালোবেসে খায়। ছোটছেলের ঘরেও পাইঠে দি। আমার নাতনিগুলো তো আমচুর খুব খায়।’
এতক্ষণ ধরে এসব চলছে বলে বিষ্ণু তেতে উঠছিল। সে বলল, ‘দলিলের কথার কী হল? কুণ্ডুদা, আপনি বলেন যা বলার।’
নারায়ণও বলে উঠল, ‘ঘরের কথা বাইরে টানছ কেন মা?’ তার ভাই কৃষ্ণ বলল, ‘হ্যাঁ, কাজের কথা সারো।’
প্র‌ায় সঙ্গে সঙ্গে হরিদাসীও বলল, ‘সেই ভালো। এই সেদিনকারে বিষ্ণু শিঙাড়া নে এসছেল। বললে, আমাদের কথা এট্টু ভাবো। তা সেই শিঙাড়া খেয়ে সারাআত্তির কী পেটের যন্তন্না, পেটখারাপ। পাঁচ-ছ’বার বাইরে ঘুরে এসে বিছানাশয্যা হয়ে গেলুম। কাজের বাড়ি কামাই হল। মাঝে উঠে দোকান থে ওষুধ কিনে, ঘরে ফিরে, খেয়ে, তবে সারলে। তার মধ্যিও দেখি ছেলেদের কথা ভাবছি। ভাবতে ভাবতে তো এখেনে এসে পড়লুম।’
‘ছেলেদের কাউকে বললে না কেন ওষুধ কিনে দিতে?’
‘কী করে দেয় তারা বলো দেখি। একজন সোকালে কাজে বেইরে যায়। আর একজন যায় বাজারে। তাদের সময় থাকে?’ বলতে বলতে চশমার বাঁ দিকের কাচে হাত ছোঁয়ায় হরিদাসী। ‘এই চোখটায় ছানি ধরেছে। কিছুতেই কাটাতি পারছি নে। সেই লায়ন কেলাব না কী বলে গো— তোমাদের চে বড় কেলাব— সেখেনে গেছলুম। কাড বানিয়ে দেখাতি হয়। হতচ্ছাড়া ডাক্তার বলে, দু’রকমে কাটানো যায়। একরকমে দশ হাজার ট্যাকা লাগবে— সেদিনই বাড়ি ফিরতি পারবে আর একরকমে পাঁচ হাজার লাগবে, দু-তিন দিন থাকতি হবে। ভাবলুম ও থাক পড়ে। ডান চোখটা তো আছে এত পয্যন্ত।’
নারায়ণ আর কৃষ্ণ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। বিমল চক্রবর্তী বললেন, ‘আজকে টাকার জন্যে আসতে পারলে, মায়ের ছানি অপারেশনের কথাটা তো আমাদের বলতে পারতে, চেষ্টা করতাম।’
কথাটা ভুল বলা হচ্ছে তাই যেন তা থামাতে গিয়ে হরিদাসী সামনে হাত নেড়ে বলল, ‘না গো। আমার ছেলেরাও চেষ্টা করেছে। কিন্তুক হয় নে। সে বচ্ছর বড়নাতিটা বাইক কিনলে, বিষ্ণুকে টাকা ধার করতি হল। সে বললে, এখন কোথ থে দেব? তা নাতিটা গাড়ি চেপে ভুড়ুম ভুড়ুম করি ঘুরি বেড়ায়— কী সোন্দর লাগে! তার পরের বচ্ছর মেজছেলে নারায়ণ বললে, এই তো ফিরিজ কিনলুম, এখনই কী করে দি? সত্যি কথা। ঘরে টিভি আছে, ফিরিজ না হলি চলে! তাপ্পর ছোটটা বললে, আমি তো ভাড়া দে পরের বাড়ি থাকি, আমার কি অত ট্যাকা থাকে? এট্টু সবুর করো। তারাপীঠে মানত আছে, মায়ের পুজোটা দি এসে দেখছি। তা আমিও মনে করলুম, ছানি কাটানোয় বড্ড হাঙ্গাম। লোকের বাড়ি কাজ করি। তারা না হয় মানলে কিন্তুক আমার ঘরের কাজ তো আমাকেই করতি হবে। বউমাদের তো বলতি পারবুনি। চ্যান করা যাবে নে, জল লাগানো চলবে নি। অত পেহার কে সামলাবে!’
প্রে‌সিডেন্ট রতন দাশ বললেন, ‘ না না। আমরা যা শুনলাম সেসব তো ভালো কথা নয়।’
হরিদাসী একটু হাসল যেন। বলল, ‘ভালো-মন্দ কে বিচার করে বলো দেখি। যে কারুর ঘরেই এমন হতি পারে। আমাদের হয়, তোমাদেরও হতি পারে। পারে না? হলপ করি বলতি পারবে কেউ?’
হরিদাসীর এ কথায় ঘরের সবাই যেন থমকে গেল। এমনকি গুজগুজ ফিসফাসও বন্ধ। যেন কথাটার একটা জবাব দিতে পারলে ভালো হত কিন্তু দেওয়া যাচ্ছে না।
তখন হরিদাসী আবার নড়ে উঠে পিঠ সোজা করে বলল, ‘এককালে লোকে বলত আমি বড্ড কথা কই। সোমসারে থাকতি থাকতি সব কথা ফুইরে এসছে। অ্যাদ্দিন বাদে তাও কত কী বলে ফেললুম। যাগগে যাক, ওসব ফেল থোও। এত্‌খন চেয়ারে বোস থে কোমরের ব্যথাটা ফের চাগাড় দে উঠতেছে। আর পারি না বাপু। নেও, কী করবে তোমরা করো। কিন্তু আমার একটা কথা জানার ছেল।’
সোমনাথ কুণ্ডু এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন সব। কথা অনেক ঘুরে গেছে এরমধ্যে। তবে এরা যখন টাকা তার কাছ থেকে নিতে চায় তখন তাকেও তো কিছু বলতে হবে। বললেন, ‘হ্যাঁ, কী বলার আছে বলো।’
‘ট্যাকা নেওয়ার কাগজে আমাকেই সই করতি হবে তো? তার যে সুদ হবে, সে দেবে কে? আসল শুধতি না পারলি আমার জমি থাকপে, না যাবে?’
‘টাকা তো আমি তোমায় দেব। তোমার ছেলেরা তোমার কাছ থেকে নেবে। আসল আর সুদ মিলিয়ে মাসে মাসে শোধ করতে হবে। সেও আমি তোমার কাছ থেকেই নেব। যদি তোমার ছেলেরা তোমায় টাকা দেয়। শোধ করার জন্য সময় দেওয়া থাকবে। তার মধ্যে ছাড়াতে না পারলে সময় বাড়তে পারে। তারপরেও না পারলে ও জমির এখন যা দাম, সে টাকা নিয়ে তখন জমি লিখে দিতে হবে। তবে এসব কথা বলে লাভ নেই আর। দলিল তোমায় দিতে হবে না। জমি আমি নিচ্ছি না। টাকাও দিচ্ছি না।’
বিষ্ণু, নারায়ণ আর কৃষ্ণ একসঙ্গে চমকে উঠে তার দিকে তাকাল। ক্লাবঘরের বাকিরাও অবাক হয়ে গেছে। সোমনাথ কুণ্ডু এবার দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘এত ঝামেলা আমার পোষাবে না। তোমাদের ঘরের ব্যাপার, তোমরা বোঝো। বিমলদা— হরির দোকানে চা-বিস্কুট বলে দিয়ে যাচ্ছি সবার জন্যে। ক্লাবের এতখানি সময় গেল।’
হরিদাসীর তিন ছেলের কেউই চা খাওয়ার জন্য থাকেনি। সে নিজেও বেরিয়ে এসে তাদের কাউকে দেখতে পেল না। এই রে, আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। থলে থেকে ছাতা বের করে মাথায় ধরল হরিদাসী। তারপর গুটগুট করে হাঁটতে শুরু করল। বাড়ি যেতে যেতে ছেলেগুলো ভিজে যাবে। দেখেছে হরিদাসী, খালি হাতেই এসেছিল সবাই।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত