| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

জুয়েল মাজহারের কবিতা

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
মম প্রিয় বন্ধুগণ
১.
মম প্রিয় বন্ধুগণ তপ্ত লাল শলাকা শানায়। আর,
রক্তজবা কানে গুঁজে শব্দ করে ভয়ানক হাসে;
.
মাঝে মাঝে বক্ষো’পরে বসে তারা
মোর পানে উঁচায় খঞ্জর।
.
তাদের চেহারাগুলি ঘোর লাগা
লাল আর বিভীষিকাময়
.
আমাকে তারাই ফের পিঠে নিয়ে চলে বহুদূর।
আমারে তারাই ফের তৃপ্ত করে
লেহ্য-পেয়ে, সুরায় আরকে!
.
দিন ক্রমে নত হয়!
সূর্যের গ্রীবা ঢলে পড়ে
.
যখন সবাই ঘুমে
বদ্দিরাজ গাছে এক চোর
মগডালে রুপালি, বর্তুল।
সাদা-নীল পরচুলা, উঁচু টুপি
লাল মোজা, কালো মোকাসিন
বিনোদক বাঁশি নিয়ে
রাতেই নীরবে তারা আসে;
.
সময় হলেই তারা অবলীলাভরে
বুকে উঠে দ্রুত হাতে চালায় খঞ্জর!
(সূর্মাটানা চোখজোড়া প্রপীড়িত অন্ধ খোড়লে!)
.
রুপালি নদীর জলে ভিস্তি ভরে
দল বেঁধে কারা আসে,
কারা যায় হেঁটে
মোগলটুলিতে আর আরমানিটোলায়?
—বৈকালিক পথে-পথে বাজখাঁই হাঁক দিয়ে যায়!
.
আর আমি, হয়তো চোখের ভ্রম, দেখি:
খাম্বিরা তামাকে তৃপ্ত পুরান ঢাকার সব
রাংতা-মোড়া জানালার কাচ ভেঙে পড়ে।
.
২.
এ সময় তুষারঝড়ের গ্রীবা নড়ে যদি সমূহ বিপদ। যেন
সুবিস্তীর্ণ স্তেপজুড়ে ঠাণ্ডা হিম করাতের দাঁত
তারপর শান্ত সবই। গর্জনেরা নীরব হঠাৎ!
.
চতুর্দিকে অসীম বরফ আর ধ্বংসরেখা!
পাহাড়ের উচ্চাবচ চূড়া
যেন এক বিমর্দিত স্তনের কাফেলা
.
ঝড় শেষ হওয়া মানে
আকাশে রুপালি তাঁবু ফুলে উঠবে এখন আবার।
ধারালো নখের নিচে ঈগলেরা লুকায় শিকার।
আর তারা বিপুল ডানার তলে, ছানাদের আগলে রাখে
সুকোমল লোমের আদরে।
.
অপর্যাপ্ত খাদ্যকণা, যবদানা, ঠাণ্ডা মাংস পথে-পথে এখন সম্বল;
মিতব্যয়ী, সচেতন তারা জানে রসদ সামান্য, কিন্তু
সামনে আরো লড়াই লড়াই শুধু! লড়াই! লড়াই!
ঠাণ্ডা রুটি ধেনো মদ যবদানা তারা তাই ভাগ করে খায়।
নিজে খায়, পশুকে খাওয়ায় আর
পালান নামিয়ে রেখে ঘোড়াগুলো ছেড়ে দেয় ঘাসে।
.
ত্রস্তে তারা জড়ো হয়
চমরি গাইয়ের ত্বকে গড়া এক দড়াটানা তাঁবুর ভেতরে;
.
মধ্যরাত। বাইরে হু-হু হাওয়ার ঝাপট
তাদের ক্লান্ত হাতে অভ্যাসের তাস জমে ওঠে!
তাঁবুর ভেতরে তারা
খুমিশ ঢালছে পেয়ালায়!
.
৩.
ক্রূর, বক্র, ভীতিপ্রদ অতিকায় তাদের নাসিকা।
গুম্ফ নেড়ে নেড়ে তারা
ত্রাহিরবে দুনিয়া কাঁপায়!
.
তাদের করাল ঠোঁটে রক্ত-চর্বি, ছিন্নমাংস চুনিগাঢ় লাল!
বক্র-শ্যেন-ঘোরলাগা রক্তজবা তাদের নয়ান!
.
তাদের চক্ষু থেকে ক্ষণে ক্ষণে ঝরে শুধু
শত শত মৃত্যু, আসব
.
তারাই আমার সখা
সদাহাস্য তাহাদের কপালে তিলক;
.
যুদ্ধ আর জিঘাংসার তরবারি দিয়ে তারা ক্রমাগত আমাকে শাসায়!
আস্তিনের ভাঁজ খুলে বের করে খড়্গ-চাকু,
জংধরা বাঁকা তলোয়ার;
.
কল্লাবালু দিয়ে তারা, সঙ্গোপনে, ছুরি-কাঁচি ধার দিয়ে চলে।
.
আর, আমি ঈশ্বরের প্রিয়তম ভেড়া যেন
প্রতিদিন দিবালোকে বলি হয়ে যাই
.
কপালের ফেরে হায়, এ-যেনবা শেষ নিশিভোজ
সকলের মধ্যে আমি নীলমণি-যিশু!
নিজের কলবে শুধু কান পেতে পেতে আমি শুনি:
পাপাল বুল-কে ঘিরে টানা দীর্ঘ চারশো বছর
কোটি কোটি মার্জারের অবিরাম মরণ-চিৎকার!
.
অভ্রভেদী লাফ দিয়ে ভয়ে আমি অবিরাম দ্রুত উড়ে উড়ে
শত-শত ক্রুশ আর সূচ্যগ্র শলাকা থেকে নিজেকে বাঁচাই।
.
ক্রমাগত ভিক্ষা করি লক্ষ নিমেষ আর একটি নিমেষ!
.
আর আমি দুই চোখ মুদে
প্রেমপূর্ণ রিরংসায় মম প্রিয় বন্ধুদের দেখে যেতে চাই:
.
মধ্যরাত। তাঁবুর ভেতরে তারা
খুমিশ ঢালছে পেয়ালায়!
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
মধুব্রজনের জ্যামিতি 
মধুবসন্তে আমরা রওয়ানা হলাম উৎপ্রেক্ষার বাড়ির দিকে
.
পথে উপমার গিরিখাতে তুষারে আটকে গেল আমাদের গো-শকট;
তখনও বাতাসে ত্রসরেণুর মতো ভেসে রইল
আমাদের চলমান পায়ের মর্মর
.
আহা! এখানে অনুপ্রাসের মতো বয়ে গেছে পর্বতচূড়া
এখানেও উপমার আক্রমণ;
.
ব্যাজস্তুতির বাঘ নেচে বেড়াচ্ছে
গজদন্ত-ছড়ানো নৃশংস অরণ্যপথে
.
আর এই আপাত সরোবর সে তো
স্বপ্নহননের শীতল চাকুতে ভরা
.
বরফ গলার প্রতীক্ষায় আমাদের মদ শেষ
অপচয়িত সকল যবদানা;
.
শুধু হাওয়া এসে বলে যায়:
‘অপেক্ষা ভালো
রানি আসবে তার উচ্ছ্রিত ঘোড়ার বাহনে চড়ে!’
.
জানি না কী করে পেরোতে হয় কেওক্রাডংয়ের পথ!
–ডানায়, জেব্রার পায়ে নাকি উড়ে?
.
শুধু আধোঘুমের ভেতর গতায়াত করছে
চিত্রকল্পের পাখি আর টুসুগানের সুর;
.
—কেবলি ঢুলছি আর হাই তুলছি
.
রক্ত-সরোবরের জলে কেউ শানাচ্ছে শীতল চাকু
কেউ আঁকছে জ্যামিতি!
.
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
.
 আলকিমি 
এ-হাসি আমার। তবু সে আমাকে ছেড়ে
অপরের গণ্ডদেশ আলো করে থাকে;
.
যেন আমি নিষেধ না-মানা কোনো মাছ
সবার অলক্ষ্যে ভেসে এসেছি এখানে;
.
আমাকে ঝুলিয়ে রাখে অন্য কোনো ধীবরের জাল
অপর দেহের রক্তে কেউ এসে মেশায় আমাকে
.
ব্যাখ্যাহীন আলকিমি! রাশি রাশি সন্দেহ-তুষার
মেঘ-রৌদ্র-নিশাদলে ধূমায়িত গূঢ় অম্লজান
লক্ষবীজ ফলের আকারে
আমাকে ফলায় গাছে গাছে ;
.
সমুদ্রযোনির গর্ভে যেন আমি মন্ত্রপূত শুশুকের ভ্রূণ!
.
দুর্লঙ্ঘ্য প্রাকার আর উচ্চাবচ পাহাড় পেরিয়ে যায় পাখি;
সুমেরু-কুমেরু তাকে টেনে নেয় চুম্বকের মতো।
.
তাকে ডাকে উত্তমাশা অন্তরীপ
আর ঘন নীল আসমান;
———ডাকে আমাকেও;
.
তার গর্ভে থাকি আমি
সে আমার ভেতরে বাঙ্ময়;
.
–বিমূঢ় বিব্রত; তবু
বিহসিত নীলে আত্মহারা
.
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
.
নোঙ্গরের পাশে 
নোঙ্গরের পাশে তুমি
মনে হলো, ফেলেছো নোঙ্গর
.
সূর্য থেকে দূরতম
পশ্চিমের এলানো বিকেলে;
.
বিষণ্ন ও একা ছিলে;
.
ডুবন্ত জাহাজ থেকে
জেগে ওঠা বুদ্বুদের মতো।
.
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
.
পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর 
পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর ক্রমশ তরঙ্গবহুল হয়ে উঠল তোমার গ্রীবা। রজস্বলাদের গুরু নিতম্বের ক্রম শিহরণ গাছেদের গায়ে এসে লাগে। আর আমি ঝুলন্ত ডেউয়াফলের মতো তোমার গরিমাময় কুচযুগের দিকে তাকাই নতুন করে।
.
আমার লোভের চাহনি, গ্রীষ্মদিনে তপ্ত স্বেদবিন্দুর মতো ক্ষীণ ধারায় গড়িয়ে শুধু নামে।
.
উপত্যকায় হাজার রাত্রিশেষের রাত্রি; আর, হাজার দিনশেষের দিনে লোহু-রঙিন জবাফুলের মতো উপহার তুমি। কালচে-সবুজ পাতার আড়ালে বসে তোমাকে জারিত করি চোখের লবণে। তুমি শাদা-শাদা অপার্থিব কাচের মিনার থেকে উঁকি দাও। লহমায় লহমায় তোমার মুখ জ্বলে উঠতে দেখি এই অরণ্য-প্রদোষে।
.
যখন পাহাড়ে যায় লোক, ভালুকদের কাছ থেকে তাদের ভারী চলনগতি আর যূথবদ্ধতার মন্ত্র শিখে নেওয়া ভালো। এসবের কিছু নমুনা নিয়ে এসেছি। বরফে, বক্ষবন্ধনীর ভেতরে সেসব তুমি বহুদিন যত্নে রেখে দিও।
.
আর চলো চিরখল, চিরলোভাতুর, চিরকুটিল আর চিরবদমায়েশ শহরে ফিরে না যাই আবার। চলো শীতরাতে গোপনে ডিঙি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সরল অসভ্যতার দিকে। চলো ঘুমের ভেতরে! চলো পরস্পরকে কাঁধে নিয়ে ছুটি আবছা ভোরের কুয়াশায়।
.
শাদা ফসিলের মতো বৃষ্টিতে ট্যাক্সিরা গর্জন করে ওঠে;——-শুনি। আর দেখি, হাতের তালুর মতো ঢালু উপত্যকায় ভোর-সন্ধ্যার আভারূপে ক্ষণে হেসে ওঠো তুমি; আর, ক্ষণে কেঁদে ওঠো ভালুকশিশুর মতো। কেঁদে ওঠো যেন দূর সাইবেরিয়ায়।
.
সেসব কান্নাকে এখন জড়ো করছি; আর ভাবছি, এঞ্জিন-রব আর খুরধ্বনি থেকে আজ কতো না দূরে রয়েছে তোমার অভিজ্ঞান।
.
তুমি এক লম্বা দৌড়; তুমি পত্রালির ভেতরে সাঁতার—বায়ুবাহিত বেলুনে বেলুনে।
.
পাহাড় গোপন জলধারা নামায় আর ডাকে তোমায়। তাতে শব্দ করে ওঠে রাত্রি;—যেন একাকী তক্ষক। যেন ছল। এটুকু ছলই একদিন আমাদের জোড়া ঠোঁটের কাছে প্রেম হয়ে আসবে কামের পেয়ালায়। সেখানে রঙিন পাথর থেকে পাথরে, চূড়া থেকে চূড়ায় লালাভ সূর্য আর মেদুর রাত্রির চুপ-সিরাপ ছল্‌কে পড়বে তোমার গুরু নিতম্বে; আর তোমার তরঙ্গবহুল গ্রীবায়, ডেউয়া ফলের মতো ঈষৎ-ঝুলেপড়া তোমার স্তনে আর গ্রানিট পাথরে গড়া নাভিনিম্নদেশে।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত