| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

রাখালদিনের গাঁথা

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

তারপর একদিন এইসব কথা শশীর কাছে গিয়ে বললাম। শশী ছলছল চোখে একটি ডুমুরগাছের দিকে তাকিয়ে দুইটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেললো। শশী মনে মনে আমার মাথায় হাত রাখলো। আমি বললাম, শশী! আমি মনে হয় তখন আনমনা হয়ে বিলের পাশে বসেছিলাম। দেখছিলাম দুইটা বক মিলে একটা ডাহুকপাখিকে ঠোকর দিচ্ছে। আর বিলের জলে থই থই নেমে আসছিলো সন্ধ্যা।

তখন আমার খুব ছোটোবেলা। নয়দশ এমন বয়স হবে হয়তো। আমি ছিলাম মেষের রাখাল। মেষ মানে গড্ডল। গড্ডল থেকে গড্ডালিকা প্রবাহ। বলে না গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো! গড্ডল মানে ভেড়া। মানে একটা ভেড়া যেদিকে যায় দল বেঁধে সব ভেড়া সেদিকেই যায়। যাই হোক, বিষুদবার ছিলো হাফছুটি ইশকুল। বাড়ি ফিরেই সেদিন আমি বনের ধারে একটা বিলের পাশে মাঠে আমাদের ভেড়াগুলিকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের ছিলো মোট সাতখানা ভেড়া। প্রায় শাদা গায়ের রং, ঢেউ খেলানো গায়ে তাদের লোম। আহা সুন্দর!

শীত শীত হাওয়া। মাঠের শেষে একফালি রাইক্ষেত, হলুদ ফুলে প্রলম্বিত হয়ে দিগন্তের দিকে চলে গেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা সন্ধ্যা রং চারপাশে। আমি মনে হয় তখন আনমনা হয়ে বিলের পাশে বসেছিলাম। দেখছিলাম দুইটা বক মিলে একটা ডাহুকপাখিকে ঠোকর দিচ্ছে। আমার চোখ ভরে ঘিরে আসছিলো ঘোর।

ভেড়াদের ডাকে ঘোর কেটে গেলো। দেখলাম সব কটা ভেড়া রাইক্ষেতে। আর বিশালবপু কালো মতো এক লোক আমার ভেড়াগুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তার পিছু পিছু গেলাম। ভেড়াগুলিকে লোকটা খোয়াইলে দিয়ে দিলো। তারপর আমাকে বকা-ঝকা করে চলে গেলো। খোয়াইল মানে খোঁয়াড়।

এইখানে থেকে পশুগুলিকে ছাড়াতে হলে আমার লাগবে মোট ২১ টাকা। কিন্তু আমার কাছে মাত্র আট-আনার দুইটা কয়েন ছাড়া আর কিছু নাই। কী করবো বুঝে কূলকিনারা করতে পারছিলাম না। একা একা বাড়ি ফিরে গেলে আব্বার হাতে মাইর খেতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে একসময় দেখি খোয়াইলের লোকটা নাই। তখনই ভাবলাম ভেড়াগুলিকে নিয়ে চলে যাবো। যেই বাঁশের দরজাটা খুলে খোয়াইলে ঢুকেছি তখনই লোকটা এসে গেলো। আর আমাকে একটা চটকানা দিয়ে ওখানেই ভেড়াগুলির সঙ্গে আটকে রাখলো। আমি ভেড়াগুলির মাঝখানে বসে আছি। রাত্রি বাড়ছে। আমার গায়ে পাতলা কালো একটা গেঞ্জি। আমি বসে আছি যেনো শাদা ভেড়াগুলির মাঝখানে একটা কালো ভেড়া। শীত আর মশা সমানে কামড়াচ্ছে।

রাত গভীরে খুঁজে-টুজে আব্বা এসে আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে গেলো। কিন্তু মারলো না, বকাও দিলো না কেনো জানি না সেদিন।

পরদিন শুক্রবার ছিলো, ইশকুল ছিলো না বলে সকাল সকাল ভেড়াগুলিকে নিয়ে বের হয়েছি। রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা ভেড়া ট্রাকের তলায় পড়ে গেলো। আর লাইন ধরে একে একে বাকি ছয়টা ভেড়াও ছুটন্ত বাস-ট্রাকের তলায় গিয়ে পড়লো। ভেড়াদের এইসব আত্মহত্যা দেখে আমি স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর আমার চোখ দিয়ে শুধু পানি পড়ছিলো। দুহাতের পিঠে চোখ মুছতে গিয়ে আমার হাত ভিজে ভিজে হয়ে গেলো দুইটা মৃগেল মীন। মীন মানে মাছ, চিরদিন জলে ভেজা জলজকুসুম।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত