| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

লাল গোলাপের কাঁটা

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

মুর্শিদাবাদ জেলা বইমেলাতে গল্প পাঠ করতে এসেছে আমিল। প্রতিবারের মত এবারেও সে গল্প পাঠে ডাক পেয়েছে। বইমেলাতে এলে অনেকের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ হয়। বেশ ভালোই লাগে। বছরে একবার সবার সঙ্গে দেখা হয়। কথা হয়। চা পান থেকে শুরু করে লেখার খবর পর্যন্ত নেওয়া যায়। আমিল বেশ অনেক দিন থেকেই সে লিখছে। বাজারে দু’একটি গল্পের বইও আছে তার। অনেকেই তাকে চেনে। ওর লেখা পছন্দ করে পাঠকরা। তবে ও একটু মুখচোরা। কথা বলতে পারেনা। লাজুক ভাবটা এখনো কেটে যায়নি। গল্প পাঠ করতে গিয়ে ওর হাত পা কাঁপে। মুখে রক্তের ছোপ। যেন ছলকে রক্ত বেরিয়ে আসবে।

আজ ওর বাড়ি থেকে বের হতে দেরিই হয়েছে। বেলা দুটো থেকে গল্প পাঠ শুরু হবে।বড়ুয়া মেড়ে এসে বাস ধরে। বাসে উঠতেই সে একটি জায়গা পেয়ে গেল।বাসে বেশ ভিড়। বাসটা ঠিক ঠাক পৌছে দিয়েছিল বহরমপুরে। গল্প পাঠ শুরু হতে এখনো সময় আছে। দু-একটা বইয়ের স্টল ঘুরবে বলে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। লিটিল ম্যাগের ষ্টলটা পার হতেই হঠাৎ সামনা সামনি দেখা হয়ে গেল আবিরার সঙ্গে। দুজন দুজনকে দেখে থেমে যায়। মুখে কোন কথা নেই। আগের থেকে আবিরা আরও সুন্দরী হয়েছে। চোখের টানা টানা ভ্রু-রেখাতে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে তার ব্যক্তিত্ব। আমিল কথা বলতে পারেনা। ওর মুখের দিকে সে চেয়ে আছে। সেই আগের মত হলে ওকে কাছে টেনে নিয়ে কথা বলতো। আবিরাকে হঠাৎ এখানে সে আবিষ্কার করবে। ও ভাবেনি। ওর সঙ্গে বহুদিন দেখা নেই। আমিলকে ছেড়ে সে চলে এসেছিল শহরে। ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি আবিরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে ভুলতে বসেছে। আর ঠিক সেই সময় হঠাৎ আলো ফুটে উঠল নতুন কদম ফুল।

হ্যাঁ -সে তার কাছে ফুলেরই মতো।তার সুবাসে কত কত দিন সে মুগ্ধ হয়েছে। যে মুগ্ধতা সে এখনো ভুলতে পারেনি। জীবনের বারান্দায় সব ফুল একদিন ঝরে যায়। কেউই হয়তো টিকে থাকেনা। কিন্তু আমিলের মনে সে এতকাল ফুল হয়েই ছিল।যাকে নিয়ে কত লেখা লিখেছে ও।সে লেখা হয়তো ও পড়ে কখনো দেখেনি।বা সে হয়তো আদৌ জানেও না। হঠাৎ করে কেন যে ও শহরে চলে এসেছিল কে জানে। ওদের গোটা পরিবারটাই চলে এসেছিল শহরে। ওদের গ্রামের সেই জমিদার বাড়িতে এখন ধুলোর আস্তরণ পড়তে শুরু করেছে। সবাই বলে, ওটা নাকি ভুত বাড়ি।
কখনো কখনো চলে যায় ওদের গড়ের দিকে আমিল। যে ঘরে আবিরা থাকতো সে ঘরের বন্ধ জানলার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে আমিল গড়ের পাড়ে। মনে হয় যেন এখনই আবিরা জানলা খুলবে। ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। ওর সেই চাঁদ মুখটার জন্য সারাদিন বসে থাকে। আমিল তাকে পছন্দ করত। পছন্দ থেকে এক সময় মনের অজান্তে ওদের মধ্যে এক নিবিড় ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমিল ওদের বাড়ির লাইব্রেরীতে যেত। ওর মা খুব ভালবাসতেন আমিলকে। ওর লেখা পড়ে মতামত দিতেন।আমিল যেন ও বাড়ির একজন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ মধ্যে থেকে যে কি হলো তা ও জানতে পারেনি। আবিরাও ওকে কিছু বলেনি। একদিন জমিদার বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। শূন্য পড়ে থাকল বড় বড় দালান। পালকি। বড় বারান্দা। সব ভূতুড়ে পরিবেশে পরিণত হল। আমিলের বুকের কষ্টটা বাড়তে লাগল। আবিরা কে সে কত খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও থাকে সে খুঁজে পায়নি। আজ তাকে দেখতে পেয়ে ওর মনের ভেতর ঝড় উঠেছে। কত প্রশ্ন এসে ভিড় করছে মনে। কিন্তু কি বলবে ওকে?
ও ভেবে পায়না।
আবিরা ওর কাছে এগিয়ে আসে। ও কাছে আসতেই সেই পুরনো গন্ধটা পেল ও। ওর বুক জুড়িয়ে গেল। ওর মনে জমে থাকা ব্যথাটা যেন এক লহমায় উবে গেল। ইচ্ছে হল ওকে জড়িয়ে ধরতে। ধরে জিজ্ঞেস করতে, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আমি যে আতরের মতো একটু একটু করে ফুরিয়ে যাচ্ছিলাম।
ভালো আছো আমিল? কতদিন পর তোমাকে দেখছি।
এ কথা শুনে ওর চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে।
একটু সময় নিয়ে বলে, তুমি ওভাবে কেন চলে গেলে? একবারোও কি আমার কথা তোমার মনে পড়েনি? তুমি পাথর গো! তুমি পাথর!
আমিলের গলা ধরে আসে। সে কথা বলতে পারে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আমিলের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায় আবিরা।তারপর বলে, তোমাকে সব কথা খুলে বলবো আমিল। তোমার কথা আমি ভুলে যাইনি। শুধু সময় দুজনকে আলাদা করে দিয়েছে।
এমন সময় গল্প পাঠের জন্য ডাক পড়ে আমিলের।আমিল ওকে বলে, আবিরা, চলো গল্প শুনবে। কতদিন আমার গল্প শোনো না। গল্প পাঠ শেষ করে তোমার সঙ্গে বসে কথা বলব।
দুজনে এক সঙ্গে এগিয়ে যায়। আবিরা চেয়ারে গিয়ে বসে। আমিল গল্প পাঠ করে। পশ্চিমে সূর্য হেলে পড়েছে। বইমেলাতে মানুষ জনের ভিড়। এক সময় আবিরা কে এগিয়ে দেয়।আবিরা বিদায় নিয়ে চলে যায়। আমিল বইমেলার গেটের কাছে একা দাঁড়িয়ে থাকে। তার গোটা গায়ে আবিরার সেই পুরোনো সুগন্ধীটা ছড়িয়ে।
দুই —
আবিরার দেওয়া ঠিকানায় এসে ও দাঁড়িয়ে ছিল। গোরাবাজারের ঘাটে এখন স্নানের লোকের ভিড়। এখন বেলা দশটা বাজে। ও মোবাইল বের করে সময় দেখে।আবিরা ঠিক দশটায় আসব বলেছে। সেদিন ওর ফোন নাম্বারটা নেওয়া হয়নি। শুধু বলেছিল এখানে আসতে।
দুজনে গঙ্গা পেরিয়ে মাঝিপাড়া যাবে। সেখানে জরিশা বাবার মাজারের কাছে গিয়ে বসবে। সেখানে নাকি বসবার ভালো জায়গা আছে। নির্জনে বসে কথা বলা যাবে। এ শহরে অনেক জায়গা ছিল। কিন্তু কেন যে ওখানে যেতে চায়ল কে জানে। আমিলের যেন সময় কাটছিল না। বার বার ঘড়ি দেখছে। প্রতিটি মিনিট যেন বছর। কত দিন পর দুজনের কথা হবে। বইমেলাতে ওর সঙ্গে তেমন কথা হয়নি। আবিরার ফেরার তাড়া ছিল। আমিল ওকে আর ধরে রাখেনি ।
আবিরা আজকের দিনটির কথায় সে বলেছিল, দেখা করবে। ও ভুল করছে না তো?
ওর বেশ চিন্তা হচ্ছে। যতক্ষণ আবিরা না আসছে ততক্ষণ ওর চিন্তা যাবে না মনে থেকে। হঠাৎ করে যে আবার দেখা হবে। কথা হবে। ও ভাবতেই পারেনি ও তো এক সময় ভুলতে বসেছিল। বইমেলা আবার দেখা করিয়ে দিল।
আমিল গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে। দু’একটি নৌকা ভাসেছে জলে। মাছ ধরছে জেলেরা। এখন তো তেমন মাছ ওঠেনা নদী থেকে। মাছ কমে আসছে দিনকে দিন। নদীর দূষণ বেড়েছে। জেলেরা পড়েছে মহাসংকটে। ওদের জীবন ধারণ এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এদের প্রতি সরকারের কোনো নজর নেই। এদের জন্য কেউ বলার নেই। কোনো কাগজে এদের কোনো খবর হয় না। আসলে গরিবের কেউ নেই।

আমিলের মনটা হঠাৎই খারাপ হয়ে গেল। এক পা এক পা করে নদীর কাছে ও এগিয়ে যায়। নদীকে ছুঁয়ে দেখে। যুগ যুগ ধরে বয়ে চলেছে। নদীরও মনের ব্যথা আছে। সেও তো কিছু বলতে চায়। কিন্তু তা শুনবার মতো ক’জনের কান আছে? আমিল চুপ দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে আছে। এমন সময় হঠাৎ ওর পিছনে এসে কে যেন দাঁড়ালো।ও বেশ চমকে যায়। ঘুরে দেখছে আবিরা দাঁড়িয়ে।ও হাসছে। এখনো নদী দেখা নেশাটা তোমার আছে? তুমি একটুও বদলাও নি। আমি অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি। কিন্তু তুমি শুনতে পাচ্ছ না। নদীর সঙ্গে মিশে গেছো বুঝি?
আমিল এ কথা শুনে হাসতে থাকে।
নদী যে মানুষের জীবনের কত আপন তা কেমন করে ওকে বোঝাবে।
এই–চলো।নৌকো করে ওপারে যাবো। আবিরা ওকে তাড়া দেয়। সেই আগের মতোই ও ছটফটে। একটুও বদলায়নি। আবিরা আজ নীল রঙের শাড়ি পড়ে এসেছে। কপালে নীল টিপ। রেশমি ঘন চুল বাতাসে উড়ছে। আমিলের খুউব ইচ্ছে হলো ওর চুলে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিতে। কিন্তু কেমন এক সংকোচ হল ওর। আবিরা কি সেই আগের মতই আছে? কতদিন আবিরাকে ও ছুঁয়ে দেখেছে। ওর পাশে বসে গল্প করেছে। কিন্তু আজ কেমন এক দূরত্ব যেন কাজ করছে। ওকে ছুঁতে চায়লে যদি অন্য কিছু ভাবে।
ওরা নৌকা করে নদী পেরিয়ে সোজা বাঁধের রাস্তা ধরে মাঝিপাড়া চলে আসে।জরিশা বাবার মাজারের পাশে সুন্দর একটা পার্ক। ওখানে নিজ”নে গিয়ে দুজনে বসে।
জায়গাটা সুন্দর না আমিল?
আবিরা জিজ্ঞেস করে।
হুম।সত্যিই সুন্দর। ঠিক তোমার মতো।
আবিরা এ কথা শুনে ওর দিকে তাকায়। আমিলের খুব ইচ্ছে হল ওর চোখের পাতা দুটি ছুঁতে। ওরঝিলচোখের গভীরে হাত ছানিতে ও যেন হারিয়ে যাবে।
ওর বুক পকেটে রাখা গোলাপটা ওকে কি ভাবে দেবে আমিল ভেবে পায় না।
জানো, আমিল, তোমাকে এখানে কেন ডেকে এনেছি?
না…।

তোমার সঙ্গে মনে হয় এটাই আমার শেষ দেখা। আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি সামনের মাসে। আমার বিয়ে। আমার হবু বর বিদেশে থাকে। আমার বাড়ির সকলে সেটাই চায়।
আমিল এ কথা শুনে কেমন চুপ মেরে যায়। ও কোনো কথা বলতে পারছে না। বুক পকেটে রাখা গোলাপটাতে সে হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকে। আবিরা ওর হবু বরের কথা বলে চলে। সে কথা ও শুনতে পায় না । পকেটে রাখা গোলাপটাতে সে আরো বেশি চাপ দেয়।গোলাপটা আরও বেশি লাল হয়ে ওঠে। ওর হৃদয়ের রক্তে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে বোঁটার কাঁটা গুলো।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত