| 16 এপ্রিল 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

অর্ধনারীশ্বর: ধারণার দূরান্বয়

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

অর্ধনারীশ্বর ধারণাটির উৎস ভারতীয় ভাবা হলেও এর সঙ্গে মিল আছে আরও বহুজাতির প্রাচীন ধারণারও—এটা নতুন কথা নয়। বিডিআর্ট সেই বিপাশা চক্রবর্তী এ নিয়ে লিখেছিলেন একটি সুখ পাঠ্য দীর্ঘ প্রবন্ধ। কিন্তু এখন কৌতূহল আরও দূরে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় নজরে এলো শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটকে এ-সম্পর্কিত এক ইশারা:

“হ্যামলেট: আমি দেখছি এক দেবদূত কে যে সে সব নজর করছে। কিন্তু, থাক; ই্ংল্যান্ডের পথে যাত্রা করা যাক। বিদায় প্রিয় জননী আমার।

রাজা: আমি তো মার স্নেহশীল পিতা, হ্যামলেট।

হ্যামলেট: আমার মাতা। পিতা আর মাতা হলো স্বামী আর স্ত্রী; স্বামী আর স্ত্রী হচ্ছে একই দেহ। তাই, আপনি আমার মাতা।ইংল্যান্ড যাওয়া যাক।”

HAMLET: I see a cherub that sees them. But, come; for

England! Farewell, dear mother.

KING CLAUDIUS: Thy loving father, Hamlet.

HAMLET: My mother: father and mother is man and wife; man

and wife is one flesh; and so, my mother. Come, for England!

(হ্যামলেট, শেক্সপিয়র, অনুবাদ: শামসুর রহমান, তৃতীয়দৃশ্য, চতুর্থ অঙ্ক, বাংলাএকাডেমী, প্রথমপ্রকাশ: ১৯৯৫, পৃ-১২৭,)

জানিনা, হেমলেট এমন কথা কেন বলতে গেলেন, কিন্তু ওই বলার মধ্য দিয়ে যে যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন তা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাকেই সমৃদ্ধ করে সৃজনী সংরাগে।  তবে এই ধারণাটি কেবল একক সত্তার উদ্ভাবনই ছিলনা, এটি এক যৌথ আয়তনে বহুকাল আগে থেকেই মানুষের মনের কাল্পনিক বৃত্তি রূপে ছিল। তা যে ছিল সেরকম দৃষ্টান্ত অন্য কিছু জাতির যৌথ চেতনার প্রত্নরূপেও লক্ষ্য করা যায়।

দেখা যাচ্ছে মেক্সিকোর আজটেকরাও পিছিয়ে ছিলনা এই অর্ধনারীশ্বরের ধারণায় :

আজটেকদের নাউয়াতল (Nahuatl)  ভাষায় Ometeotl বলে এক ইশ্বর আছেন যার নামের অর্থ এরকম:  “Ome” মানে ‘দুই’ আর “teotl” মানে হচ্ছে মহাজাগতিক শক্তি।  এই দুইয়ের সম্মিলনে এর অর্থ দাড়ায় “দ্বৈততার প্রভু” বা “Lord of Duality,” যেখানে নারী(Ometecuhtli) এবং পুরুষ (Omecihuatl), অর্থাৎ আলো ও অন্ধকার, বিন্যাস ও বিশৃঙ্খলার সমন্বয় রয়েছে। এই আদিম দেবতা যে-বিশ্বাস কে তুলে ধরছে তা হলো মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে পরস্পর বিরোধী দুই মেরুর দ্বারা।  একের মধ্যে দুই সত্তার অধিকারী এই বিমূর্ত ঈশ্বর থাকেন ও এমন এক জায়গায় যা ১৩তম স্বর্গ হিসেবে চিহ্নিত Omeyocan-এ, যার অর্থ দ্বিস্থান( “Two Place”)।

সাহিত্যে এর একটি সমান্তরাল দেখা যাবে লেখকদের সৃজন-সম্পর্কিত ধারণার ক্ষেত্রে। ফ্লবেয়ার কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মাদাম বোভারী উপন্যাসের মূল চরিত্রটি কার আদলে তৈরি করা হয়েছে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন : আমিই মাদাম বোভারী। এর মানে হচ্ছে একজন মহৎ শিল্পীর সত্ত্বার একটা বড় অংশই হচ্ছে নারীত্বময়। এরকম না হলে তিনি অসাধারণ সব নারী চরিত্র আঁকতে পারতেন না। শরৎচন্দ্র যে বাংলা ভাষার পুরুষ পাঠকদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নারী পাঠকদের কাছেও এতজন প্রিয় হতে পেরেছিলেন তা ওই নারীত্বময় গুণের কারণে। অর্থাৎ যে-গুণ থাকার কারণে নারীদের মনস্তত্ত্ব তিনি ভালো জানতেন। ভারতীয় সভ্যতায় নারী পুরুষের লৈঙ্গিক বিভাজন থাকলেও অবচেতনে আছে এক পারস্পরিক বিনিময় কিংবা পারস্পরিক সহাবস্থান। এই সহাবস্থান দর্শন, শিল্প আর সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে ইশারায়, সাংকেতিক ভাষায়।

ভারতীয় শিল্পকলায় এবং তন্ত্রবাদে অর্ধনারীশ্বরের ধারণাটি কিভাবে রূপায়িত হয়েছে তার এক চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে অক্তাবিও পাসের এক প্রবন্ধে। “প্রতিটি পুরুষের মধ্যে মেয়েলি আর প্রতিটি নারীর মধ্যে পুরুষালি কিছুর উপস্থিতির ধারণাটিকেই তন্ত্রবাদ এক যাত্রা বিন্দু হিসেবে নিয়েছে। পুরুষের মধ্যে নারীত্ব আর নারীর মধ্যে পুরুষত্বকে অবদমন ও বিভাজনের বিপরীতে তন্ত্রবাদ এই দুই উপাদানের সহাবস্থান খুঁজে বেড়ায়।  সর্বদা পৌরুষব্যঞ্জক (virile) হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় দেবতাদের প্রতিমাগুলো থেকে প্রায় মেয়েলি প্রশান্তি ও কমনীয়তা (languor and softness) বিচ্ছুরিত হয়। আর ভারতীয় দেবীদের পরিপূর্ণ স্তন, প্রশস্ত নিতম্ব আর সরু কটিদেশ সত্ত্বেও তাদের মধ্য থেকে যে অভিকর্ষ, ঋজুতা ও অবিচলতা বিচ্ছুরিত হয় তা পৌরুষ ব্যঞ্জক। ”

Tantrism takes as its point of departure the idea that in each man there is something feminine and in each woman something masculine. Instead of repressing and separating the feminine in man and masculine in in woman, Tantrism seeks to reconcile the two elements. The images of Indian gods, even though they are always virile, radiate an almost feminine languor and softness. And though Indian goddesses have full breasts, wide hips and thin waists, they radiate a gravity, an aplomb, a determination that is masculine. (Five works of Octavio Paz. P 233)

অর্ধনারীশ্বরের ধারণা কে দার্শনিক গুরুত্বে বিচার করতে গিয়ে অক্তাবিও পাস আজকের দিনে এই চেতনার সংকট এবং এই সংকট থেকে সৃষ্ট আমাদের চিন্তা, অভ্যাস ও দৈনন্দিন অন্যান্য ক্ষেত্রে যে-ভারসাম্য হীনতা দেখা দিয়েছে তার কিছু উদাহরণ তিনি দিয়ে ছিলেন এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে। বলেছেন এর প্রয়োজনীয়তার কথাও: 

“মেয়েলি ও পৌরুষের বৈপরীত্য হচ্ছে সম্পূরক বিন্যাস। প্রতিটি পুরুষ ও নারীর গভীরে এর পুনর্জন্ম ঘটে, আর এই কারণে প্রতিটি পুরুষ হচ্ছে অংশত নারীময় আর প্রতিটি নারী অংশত পৌরুষ দীপ্ত।”

The opposite of feminine and masculine is of a complementary order. And it is reborn within the bosom of every man and every woman,  so that every man is partly feminine and every woman party masculine.

কিন্তু আমরা যখনই কেবল একটি দিক কে প্রধান করে তুলি তখনই সমস্যার সূচনা হয়।

“একটা সমাজ যখন পৌরুষ কে(masculine)তার একমাত্র আদি ছাঁচ (archetype) হিসেবে উপস্থাপন করে তখন সহিংসতা আর বিকৃতির জন্ম হয়। ঠিক এই ব্যাপারটাই আমেরিকার প্রটেস্টান্ট পুঁজিবাদী সমাজে ঘটেছে; তাদের মডেল হচ্ছে প্রথমত এক পুরুষালি আদি ছাঁচের, আর নারীদেরকে এই মডেলের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে, নিজেদের কে পুরুষালি করার মাধ্যমে তারা হয়েছে বিকৃত। অন্যদিকে পুরুষও একই ভাবে নিজের বিলোপ ঘটিয়েছে। পুরুষ শুধু পুরুষই নয়, সে নারীও।”

When a society presents the masculine as its sole archetype, violence and distortion result. This is what has happened in the Protestant capitalist society of the United States: their model has been primarily a masculine archetype, and women have had to adapt themselves to this model; by masculinizing herself,  woman has become deformed. But man has mutilated himself as well. Man is not only a man, he is also a woman.

মার্কিনি সমাজে একক সত্তা হিসেবে পুরুষালির উপস্থিতির নমুনা দিতে গিয়ে পাস এও বলেছিলেন “যখন মার্কিন কেউ ভাবে যে কাজ, সমৃদ্ধি আর আধিপত্য হচ্ছে মূল ব্যাপার… যখন সে আনন্দ কে কাজের ধরন হিসেবে দেখে আর সুখানুভূতির(orgasms) সংখ্যাকে বক্সিং প্রতিযোগিতায় রাউন্ডের সংখ্যা অথবা ব্যাংক একাউন্টে ডলারের সংখ্যার সমার্থক(equivalent)হিসেবে দেখে… যখন এমনটা ঘটে, মানুষ তখন পুরুষালি প্রত্ন ছাঁচের দ্বারা বিকালাঙ্গ হয়ে পরে। পশ্চিমা সভ্যতার উচিত মেয়েলি(feminized )হওয়া।”

When North American man thinks that work, thrift, and domination are the fundamentals … when he also sees pleasure as a form of work and number of orgasms as equivalent to the number of rounds in a boxing match or the number of  dollars in his bank account … when this happens, man is being mutilated by the masculine archetype. Western civilization should be feminized. ( Seven Voices, Rita Guibert, Alfred A Knopf, 1972, p 187)

অর্ধনারীশ্বরের ধারণা সম্পর্কে পাসের এই বিশ্লেষণটা আমাদের জন্য জরুরী এইজন্য যে এটা নিছকই লোকোৎসারিত ধারণা মাত্র নয়, এটি আমাদের জীবনের সামগ্রিকতার এক প্রতীকি রূপ।

একই সঙ্গে নারী-পুরুষের সমন্বিত সত্তার ধারণা ও তার প্রয়োগ থেকে সরে আসার কারণে জীবন ও সভ্যতা কতটা ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে তা জানাটা ও জরুরী।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত