| 3 মার্চ 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

বিমর্ষ সন্ধ্যা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মার্চের শেষ সপ্তাহ। সেদিন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরে শান্ত। কোলাহল নেই।  করোনা ভাইরাসের কারণে থমকে গেছে সবকিছু। চোখের পলকে সবকিছু বদলে গেছে। লকডাউন। সবাই ঘরে বন্দি। মসজিদ,মন্দির, গির্জা, ক্লাব,রেস্তোরাঁর দরজায় তালা ঝুলছে।  একেবারেই বিমর্ষ সন্ধ্যাটা। ঠোঁটে চায়ের কাপে চুমুক দিতেই হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন। সাউন্ড বাজতেই নোটিফিকেশনাট একবার চোখ বুলাল সালমান। রুমে এসে বিছানায় গা-টা এলিয়ে দিলো।  করোনার দিনরাত্রিতে কিছুই ভালো লাগছে না।বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।  বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা তখন বাজছে। মেরিনার ফোন।

-আচ্ছা তুমি তো কোভিড-১৯ নিয়ে অনেক লেখালেখি করেছে তাই না?

-জানলে কীভাবে?

-তোমার টাইমলাইনে কয়েকটি লেখার লিংক দেখতে পেলাম।

-আচ্ছা, লিখেছি।  করোনার দিনরাত্রিতে বলা যায় অবরুদ্ধ আছি।  বাসা, বাসা, একদম বিরক্ত।

-আমাকে একটু বলো তো কোভিড-১৯ আসলে কী ধরনের?

-করোনাভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি।  এর আরেক নাম ২০১৯ -এনসিওভি বা নভেল করোনা ভাইরাস। এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে।সাধারণত শুষ্ক কাশি ও জ্বরের মাধ্যমেই শুরু হয় উপসর্গ, পরে শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়।সাধারণত রোগের উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে গড়ে পাঁচ দিন সময় নেয়।

-কতটা ভয়ঙ্কর এটি?

-শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অসুস্থতার মতো এই ভাইরাসের ক্ষেত্রেও সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা এবং জ্বরসহ হালকা লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিছু মানুষের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক হয়। এই ভাইরাস সংক্রমণের ফলে বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

-ওহ মাই গড।

-বিদেশ থেকে কেউ আসলে নাকি হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়?

-হা হা হা।  কেন? তোমার জামাই আসছে নাকি?

-আসবে রে।

-ভালো তো! তাইলে তো এবার মজাই হবে। বেশি না মাত্র চৌদ্দ দিন একসঙ্গে ঘরে কাটাবে। 

-মানে কী?

-কেন খবর দেখনা? পেপার পড়ো না?

-ধুর! ফাজলেমি বাদ দে। ফোনটা কেটে গেল।

করোনার এই দুঃসময়ে চারদিকে শুধু খারাপ খবর। গত কয়েকদিনে বরেণ্য কয়েকজন প্রিয় মানুষ মারা গেছে।  জামিলুর রেজা চৌধুরী, আনিসুজ্জামান স্যার, দেবেশ রায় কত প্রিয় ছিলেন মেরিনার, তাদের মৃত্যুর খবরে একদম বিমর্ষ হয়ে গেছে সবকিছু।এত এত খারাপ খবরের মাঝেও মেরিনার বাসায় আজ এক অন্যরকম সন্ধ্যা কাটবে। অনেক দিন পর বিদেশ থেকে পলক আসছে।  ঠিক কতদিন আগে এমনই এক সন্ধ্যায় পলকের সঙ্গে আনন্দ কেটেছিল।

বিয়ে হওয়ার চার বছর পর পলক ইতালি চলে যায়।  বাবা-মার অবাধ্য হয়ে ভালোবেসে পলককে বিয়ে করে মেরিনা।  বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে ওর সঙ্গে প্রেম।  ক্যাম্পাসের আট বছর জীবনে পলকের হাত ধরেই তো সব সময় ঘোরাঘুরি ছিল।  অবশেষে চাকরি জীবনের দ্বিতীয় দিনেই মেরিনাকে বিয়ে করে পলক।  এরপর সংসার শুরুর দ্বিতীয় বছরেই ঘরে আসে আলাইনা (মেয়ে)। আলাইনার দুই বছর বয়সের সময় স্কলারশিপ নিয়ে ইতালি চলে যায়।

পলক ইতালি থেকে ঢাকায় আসবে আজ। এ ভাবনা আসতেই নিমিষেই মেরিনা ফিরে যায় ফেলে আসা স্মৃতির ডায়েরিতে।  পলক ছাড়া একাকী জীবন অনেক জটিলতায় কেটেছে সময়গুলো। এরই মধ্যে বাবাকে হারিয়েছে।  মাকে হারিয়েছে।  একমাত্র ভাই মঈনও কোনও খোঁজ-খবর নেয়না।  বিয়ের পর মঈন যেন ভুলেই গেছে বোনকে।  সারাক্ষণ বউ, বউ বউ।  বউকে নিয়েই সময় কাটছে।  আলাইনাও বড় হচ্ছে।  ওকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, সংসার সামলানো, বাজার করা—সবই তো একাই সামলেছে। এরই মধ্যে পলকের ফোন..।

-হাই জান কী করো?-

-ঘর গোছাচ্ছি।

-তোমার প্লেন কখন ছাড়বে?

-এই তো আর কয়েক ঘণ্টা পরই।

-সাবধানে এসো।  মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পড়তে ভুলো না যেন, কেমন।

-ওকে জান। লাগেছ রেডি করতে হবে। বাই।

আজকের সন্ধ্যাটা অন্যরকম। পলক আসছে।  ঘরে অন্যরকম আলো দেখতে পাচ্ছে মেরিনা।  তবুও একটা শঙ্কা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। পলক আসার পর ওকে আবার বিমানবন্দরে কোয়ারেন্টাইনে রেখে দেয় কিনা, কে জানে।  এই করোনার দিন কবে শেষ হবে কেউ জানে না। প্রতিদিন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। ইতালির অবস্থা খুবই খারাপ।  যে কারণে ভয়টা আরো বেশি পাচ্ছে মেরিনা। তারপরও চোখের সামনে ওকে দেখবে, নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে, আলাইনাকে নিয়ে আনন্দ করবে—নানা ভাবনায় হৃদয়ে একচিলতে আলো দেখতে পাচ্ছে। ফোন বাজছে। সালমানের ফোন..

-কেমন আছো?

-ভালো।  কী খবর তোর?

-পলক আসছে?

-আজ আসবে।

– দাওয়াত দিও।  একদিন সবাই একসাথে ঘুরব।

-ওকে, চলে আসিস। ভালো থাক। একটু ব্যস্ত আছি।

-আচ্ছা, বাই।

মসজিদ থেকে মাইকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে।  হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক শব্দ। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে পলক! চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর জল পড়ছে মেরিনার।  পলক সোজা চলে গেল বেডরুমে।  বিমানবন্দর থেকে বলে দেওয়া হয়েছে হোম কোয়ারেন্টাইনে তাকে থাকতে হবে।  বাইরে যাওয়া যাবে না। চৌদ্দদিন ঘরেই থাকতে হবে। ইতালি থেকে ৩৫ ঘণ্টার প্লেন জার্নি, শরীরটা ক্লান্ত। মেরিনা খাবার রেডি করছে।  ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিল পলক।  হঠাৎ মেরিনার ফোন বাজছে।  রিসিভ করতেই শুনতে পেলো, করোনায় মঈনের বউ মারা গেছে।হঠাৎ চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। মেরিনার বিশ্বাস হচ্ছে মৃত্যুর খবর। গতকাল থেকেই নয় নম্বর বিপদ সংকেত ছিলো।  ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে বাইরে তখন শুরু হয়েছে বৃষ্টি।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত