এনিমি প্রপার্টি

নিমের ছোট্ট চারাটি দেখে আমার ছোটবেলায় খেলার ঝগড়ায় ভেঙ্গে ফেলা মাটির টেঁপা পুতুল নূপুরের কথা মনে পড়ে। আমার খুব মায়া লাগে। কাঠের পিঁড়ি দাঁড় করিয়ে বানানো চার দেয়ালের ছাদ ছাড়া ঘরে পুতুলগুলো যখন সারাদিনের বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা শেষে কেবল একটু চোখ বুঁজেছিল তখন নূপুর আর ঝুমুরের মা আমার পিঠাপিঠি বড়বোনের সাথে নিয়মিত ঝগড়ার কোন একটি পর্ব শুরু হয়ে গেলে আমি সম্ভবত অপেক্ষাকৃত ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পিঁড়ির বেড়ার ঘরটি ফেলে দেই এবং সাথে সাথেই ভেঙ্গে যায় ঘুমন্ত নূপুরের হাত-পা। একা হয়ে যাওয়া ঝুমুর প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কতটা ক্লিষ্ট হয়েছে সেটা নিয়ে ভাবার সুযোগ পাওয়ার আগেই প্রায় শত্রুতুল্য প্রিয় বড়বোনের করুণ কান্নার চোটে আমার পাতালে পালানোর দশা। খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাওয়া নূপুরের প্রতি ভালোবাসার বেদনা নাকি মায়ের বকা খাওয়ার ভয়- সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলেও আমি গলার কাছে ঠেলে ওঠা একটা ব্যথার দলা ঠিকই টের পাই। ব্যথায় বোধ হয় মানুষ নরম হয়। নূপুরের প্রতি একটা করুণ মায়া আমাকে ক্রমাগত আচ্ছন্ন করতে থাকে। অনেকদিন পরে এই নিমের চারার প্রতি তেমনি একটি মায়া ফিরে এলে আমি পায়ে চলা রাস্তার পার থেকে তাকে অনেক যত্নে তুলে আনি। ততদিনে রবীন্দ্রনাথের ভাইপো বলাই সম্ভবত আমার বুকের কোথাও খানিকটা জায়গা করে নিয়েছে।

নিমের চারাটিকে উঠানের এক কোনে নরম মাটিতে লাগিয়ে দেই। কী গাঢ় সবুজ! কী উচ্ছ্বল ওর পাতার দুলুনী! যেন সদ্য দাঁত ওঠা আমার ছোটবোনটিই হাসছে!

আমি চারাটির চারপাশে মাটির ঘের তৈরি করে দেই, যাতে পানি দিলে তা জমে থাকে। যাতে ওর খাবারের কোন কষ্ট না হয়।

সে সময় শ্যামল রং নিমের চারাটির মতোই আমার দেড় বছরের বোনটি বেড়ে উঠছে শ্যামলী নাম নিয়ে। বাবার আদরের দেওয়া নাম শ্যামলী। ওকে প্রতিদিন কাঁসার বাটিতে করে দুধ খাওয়ানো হয়। কিছু দুধ বাটিতে বেঁচে যায়, কিছু থেকে যায় পাতিলে। আমি সেই অবশিষ্ট দুধ থেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিতে শুরু করি। সবার অলক্ষে নিমচারার গোড়ায় ঢেলে দেই সেই দুধ। দুধ খেতে পেলে চারাটি নিশ্চয়ই আরও স্বাস্থ্যবান হবে, দ্রুত বেড়ে উঠবে! ওর জন্য এত কষ্ট করে যে দুধ নিয়ে আসছি, ও নিশ্চয়ই বুঝবে সেটা! বড় হয়ে অনেক ভালোবাসবে আমাকে! আমি ওর গোড়ায় দুধ ঢেলে দিয়ে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকি। সাদা দুধের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট শ্যামল একটি চারা। এক পৃথিবী মুগ্ধতা এসে আমার দু’চোখ ছাপিয়ে যায়। আমার দিকে তাকিয়ে তিরতির করে নিজের পাতাগুলো নাচায় সে! কীসব বিহ্বল বিকেল!

তারপরের এক বিবশ বিকেলে কাউকে কিছু না বলে বাবা চিরদিনের জন্য চুপ হয়ে গেলে আমার ছোট বোনটির শ্যামলী নামটিও আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। তখন আমরা অন্য গ্রামে, অন্য ধানক্ষেতের বাতাসে আশা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হতে থাকি দিনরাত।

তারও অনেকদিন পরে সেই কৈশোরের নিমচারার কাছে ফিরে গেলে আমি তাকে খণ্ড খণ্ড হয়ে মাটিতে গড়াতে দেখি। কোন প্রতিবেশির কুড়াল তাকে টুকরো টুকরো করেছে বলে কারণসহ আমাকে জানানো হয়-যে মাটিতে নিমগাছটি দাঁড়িয়ে ছিল, সে মাটি আমার না, নিমগাছেরও না, সে মাটি এনিমি প্রোপার্টি।

বহুদিন পরে আমার আবার টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া মাটির টেঁপা পুতুল নূপুরের কথা মনে পড়ে। আমার গলার কাছটাতে কেমন যেন লাগতে থাকে। ব্যস্ত রাস্তার গাড়ির হর্ণের মতো আমার সারা শরীর জুড়ে বাজতে থাকে একটি চিৎকার-এনিমি প্রোপার্টি!

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত