| 23 এপ্রিল 2024
Categories
ঈদ সংখ্যা ২০২০

পর্যটন

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট


দুপুরের রাস্তায় গড়াতে গড়াতে যখন সন্ধের ঘর এল, চায়ের দোকান একহাসি নিয়ে লিকার চা। খেতে খেতে সন্ধে বললো,
– ওঠ্‌- সারাদিন টৈ টৈ।
বাবা ছোটবেলায় ছটার আলো নিভলে যেমন। শীতের দিনে অবশ্য পাঁচটা। উঠলাম।
ছোটখাট পলাশেরই মতই তার ফ্ল্যাট। আমার ঘরটা বারান্দার দিকে। ঠাকুরপুকুরে পুকুর বিস্তর। পাশেও একটা। তিনদিক এখনো খোলা। কিছুদূরে কেউ কেউ চাষাবাদও করে। শহরের প্রান্তে। ক’দিন এখানে, ফির কঁহি অউর রয়েন বসেরা। জিপসী জীবন। এমনই তো আমার। মাঝের কয়েকটা বছর যেন…! ফিরেছি নিজের মূলে। বিছানার পাশে দেড়ফুট অসংরক্ষিত বনাঞ্চল। রান্নার হাঁড়ি থেকে মিগুয়েল আস্ত্রা পাশাপাশি ছুটে বেড়ায়। শিকারের সম্ভাবনাও ষোল আনা। এই সেদিন যেমন বিভূতিভূষণ একপিস। অবশ্য পাড়া বেড়াতে কদ্দূর তা বোঝা গিয়েছে, ফিরে আসবেন। কাল পলাশের বাবা মেদিনীপুর থেকে, অতএব বালতিতে গরম জল, নিমপাতা দিয়ে। পা ধুয়েছি। সাতটার দিকে মনে হল খুব ঠান্ডা। অন্তরার গলা ভেঙে যেত শীতের সন্ধের দিকে। হাত বাড়িয়ে মনে মনে একটু ছুঁয়ে এলাম। মাফলারের উষ্ণতা দিয়ে গলা ঢাকলাম, কান মোড়ালাম। সব কাজ সারতে সারতে, যাঃ! ঠিক অন্তরার চোখে চোখ পরে গেল। কালো গভীর মণিদুটোতে অনেকক্ষণ…।
গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলো হাতের লেখাটা।
– বলি আজ-ও কি শেষ হবে না সম্পাদককে বলবে প্রবন্ধ জীবনানন্দের কেউ ছিল না?
সম্বিতে।
জীবনানন্দকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখতে Flâneur (ফ্লানর)- এর কথা এল। এককালে ফরাসী ভাষায় এর মানে বলতে বোঝাত, লোফার জাতীয় লোকদের ঘুরে বেড়ানোর কথা। উনিশ শতকের ফ্রান্সে ব্যাপারটা এক থাকল না। ব্যদলেয়ারের নৈশভ্রমণ যেমন। নিজেকে সঙ্গে নিয়ে রাত্রির পাহি (প্যারিস) দেখে বেড়াচ্ছেন। হেঁটে বেড়াচ্ছেন। এ এক পর্যটনব্রত। পর্যটনের অলঙ্কারশাস্ত্র। পাহি নগরীর উত্তল, অবতল নানা বিভাজিকা, আলো অন্ধকারে যাতায়াত করছেন। লিপিবদ্ধ করছেন।
‘Little poems in prose’ নামে সংকলন আছে ওনার। তার একটা ‘At One O’Clock In The Morning’।
“Alone, at last! Not a sound to be heard but the rumbling of some belated and decrepit cabs. For a few hours
we shall have silence, if not repose. At last the tyranny of the human face has disappeared, and I myself shall be the
only cause of my sufferings.
At last, then, I am allowed to refresh myself in a bath of darkness! First of all, a double turn of the lock. It
seems to me that this twist of the key will increase my solitude and fortify the barricades which at this instant
separate me from the world.”
(Title: The Poems and Prose Poems of Charles Baudelaire
with an Introductory Preface by James Huneker
Author: Charles Baudelaire
Editor: James Huneker
Release Date: May 31, 2011 [EBook #36287]
Language: English)
জঘন্য শহর, জঘন্য লোকজন। এই বলে পরের পংক্তিগুলো শুরু করছেন। সারাদিন কি কি করলেন, দেখলেন- তার বৃত্তান্ত, মতামত, বিরক্তি, বিবৃতি। এখানেই শেষ না। তুমি ‘Le Crépuscule du matin’ (Twilight morning) পড়। সেই বিখ্যাত বা কুখ্যাত ‘Les Fleurs du mal’ (The Flowers of Evil), সেখানেও এই রাতচারণা, ভোরে এসে সমে ঠেকছে। অথবা উল্টোটা।
“…The dawn, shivering in her green and rose garment,
Was moving slowly along the deserted Seine,
And somber Paris, the industrious old man,
Was rubbing his eyes and gathering up his tools.”
— (Translation: William Aggeler)

এই পর্যটন জীবনানন্দের ছিল। বরিশালের কবি, চল্লিশের কলকাতায় ভাড়াবাড়িতে, দাম্পত্যের প্রীতি থেকে শৈত্যে, পর্যটনপটু। কিম্বা নিতান্ত অপটু, হৃদয়ের আমিশাসী ক্ষতে জেরবার। সে একটা গল্প শুনেছিলাম কার কাছে যেন! অথবা পড়েছিলাম, মনে পড়ে না। যাই হোক, গল্পটা এরকম যে সন্ধেবেলা জীবনানন্দ পাড়ার একটি পানের দোকান থেকে পান মুখে দিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে প্রতিদিন এক সময় কোথায় যেন চলে যান। পানওয়ালার খুব কৌতুহল! সে সঙ্গ নিতে চায়। জীবনানন্দ একদিন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে চলেন। হাঁটতে হাঁটতে একটি মাঠের ধারে ঝোপের মধ্যে বসে পরেন কবি। পানওয়ালাকে বলেন কোন শব্দ না করে বসে থাকতে। বেশ কিছুক্ষণ উসখুস করা পানওয়ালার খরিদ্দারী অভ্যাস বঞ্চিত সময় চলে যায়। ধৈর্য্য প্রায় হারিয়েছে এমন সময় একটি ট্রেন আসে। সামনে একটি রেলপথ এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। আচমকা ট্রেনের চাকার তীব্র ঘর্ষণে, ভারী লোহার উপর দিয়ে ছুটে চলায়, সগর্জন এঞ্জিনের ছুটে আসায় স্থবির অন্ধকার চৌচির। ঝোপের আড়াল থেকে এক ঝাঁক জোনাকি আকাশে তারাবাজির মত রল্লা দিয়ে ওঠে। রাত চিরে ছুটে চলা এঞ্জিনের গায়ে মাখা মাখা অন্ধকার ছিঁড়ে ছিঁড়ে একদিকে রক্তাক্ত, অন্যদিকে জোনাকির ছোট ছোট আলোকবৃত্ত নৃত্যশীল। এই দেখতে জীবনানন্দ।

“হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কূষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল;
অথবা সে-হাইড্র্যান্ট হয়তো বা গিয়েছিলো ফেঁসে।
এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে।
একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে
অস্থির পেট্রল ঝেড়ে; সতত সতর্ক থেকে তবু
কেউ যেন ভয়াবহভাবে প’ড়ে গেছে জলে।
তিনটি রিক্‌শ ছুটে মিশে গেল শেষ গ্যাসল্যাম্পে
মায়াবীর মতো জাদুবলে।
আমিও ফিয়ার লেন ছেড়ে দিয়ে- হঠকারিতায়
মাইল-মাইল পথ হেঁটে- দেয়ালের পাশে
দাঁড়ালাম বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে গিয়ে- টেরিটি বাজারে;
চীনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে। …”

কুষ্ঠরোগী, পেট্রল, হঠকারিতা, ফিয়ার লেন – কবি হাঁটছেন। ফ্ল্যানোর। ডায়ানামোর গুঞ্জনের সঙ্গে মিশে টান রাখে মৃত ও জাগ্রত পৃথিবীকে। টান রাখে জীবনের ধনুকের ছিলা।

“শ্লোক আওড়ায়ে গেছে মৈত্রেয়ী কবে;
রাজ্য জয় ক’রে গেছে অমর আত্তিলা।…”

মৈত্রেয়ী এক বিশুদ্ধ জীবনের অভিপ্সায়, আত্তিলা সাম্রাজ্যের অতি-উত্তেজনায়। আর লোল নিগ্রো, ব্রায়ার পাইপ বুড়ো গরিলার মত পরিস্কার করতে করতে চল্লিশী কলকাতার মধ্যরাতের মজলিশকে ভেবে বসে লিবিয়ার জঙ্গল।

“তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব অতিবৈতনিক,
বস্তুর কাপড় পরে লজ্জাবশত।”

কি হিংস্র না জীবনানন্দ? নখে-দাঁতে ছিঁড়ছেন না আমাদের? ব্যোদলেয়ারের পাহি ভ্রমণের স্থানিকতা ছেড়ে ক্রমাগত ইতিহাসগামী সেই ‘বনলতা সেন’ রচয়িতা সমকালকে তীক্ষ্ণ টুকে রাখছেন মন্তব্য সমেত। সমাজতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক।

এমন সব খানিক লেখার কথা। নিজে তো পারি না, তাই কবি ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। এবং ফ্ল্যানোর। পর্যটন, যা অননুমোদিত, কষ্টগন্ধবাহী।

পলাশের বাবা মাস্টারমশাই। অবসরপ্রাপ্ত। ভালবাসেন রবীন্দ্রচর্চা। পলাশের ল্যাপটপটা নিয়ে প্রবন্ধটা লিখছিলাম। পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধকন্ঠ ধরলেন, ‘চিরসখা হে’! না ঠিক ওইখান থেকে, ‘নির্জন স্বজনের সঙ্গে রহ’। এখনো দাপটিয়া। স্বজনের বলে টানছেন, মনে হচ্ছে পালে বাতাস লেগে ফুলে ফুলে উঠছে। মেসোমশাই এখন একলা। মাসিমা গত বছর চলে গিয়েছেন। মাসিমার কথা উঠলেই বলেন,

– আমাকে রেখে গিয়েছে পলাশের ব্যবস্থা দেখে যেতে। হয়ে গেলেই যেতে হবে। ওর তো আবার খুব বাতের ব্যথা। আমি তেল মালিশ না করে দিলে নিজে কিছুতেই করে না।

পলাশের ব্যবস্থা বলতে বিয়ে-টিয়ে না, স্বল্প কিছু জমি-জায়গা এবং একটা দোকান আছে তার ব্যবস্থা। এখানে কলকাতার প্রান্তিক ফ্ল্যাটে গোছানোগাছানো সব দেখে সাজিয়েছেন। ওদিকে দোকানটা এবারে ভাড়া দেবার ব্যবস্থা করে এসেছেন। জমিজমা যা ছিল সব ধীরে ধীরে ভেড়ি হয়ে যাচ্ছে আসেপাশে। উনি জমির কাজ শেখাবার জন্য সপ্তাহান্তে পলাশকে নিয়ে যাচ্ছেন। পলাশ এখানে সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে। সেও নিয়ম করে যাচ্ছে। দেখে আসছে। বাবা ও ছেলের ভারী অদ্ভূত সম্পর্ক। বন্ধু দুজনে। পলাশ সামনের বছর চলে যাবে বাইরে। কিছুকাল সেখানেই থাকবে। বিয়ে করা নিয়ে সে ব্যস্ত না।

পলাশকে আমি আবিষ্কার করেছিলাম আমার এক বন্ধুর কাছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। ট্রেন থেকে পড়ে গিয়েছিল সে দেশের বাড়ি যাবার পথে। কাজ করত একটি খবরের টেলিভশন চ্যানেলে। টেক সাপোর্টের কাজ। একদিন রাতের ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল। পরের দিন সকালে তাকে পাওয়া যায় উলুবেড়িয়ার থেকে পরের স্টেশন যাবার পথের মাঝখানে। বেঁচেছিল যে সেই আশ্চর্য্যের ব্যপার। স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল। ট্রেন থেকে কী ভাবে পরে গেছিল তাও তার মনে ছিল না। তার চিকিৎসার জন্য আমার বন্ধু তপোজিৎ-এর কাছে তাকে নিয়ে আসেন পলাশের বাবা। বন্ধুটি মনোচিকিৎসক। বয়সে তরুণ। এমন একটা কেস তাকে বেশ টেনেছিল। সে পলাশের সম্পর্কে খোঁজখবর শুরু করে। ধীরে ধীরে তথ্য যোগাড় করে তার সম্পর্কে। আমিও তখন সাংবাদিক। তাই পলাশের কাজের জায়গায় পৌঁছতে আমার সাহায্য চেয়েছিল।

সে এক আবিষ্কার সত্যিই। পলাশের সহকর্মীরা নানাজনে নানা তথ্য দিয়েছিল। পলাশের নিজস্ব ঘরে টুকরো-টাকরা নাম, বইপত্র এ সব দেখে দেখে কিছু তথ্য গড়া হচ্ছিল। কঠিন কাজ। কলেজ জীবন অবধি আমরা পৌঁছেছিলাম। সেই সব স্মৃতিগুলোকে পলাশ আত্মস্থ করছিল। সাধারণ ভাল-মন্দের স্মৃতি দিয়ে দিয়ে একটা মানুষের অতীত গড়া হচ্ছিল। আমার সঙ্গে পলাশের অন্তরঙ্গতা বেড়ে চলেছিল। তপোজিৎ এবং আমি পালা করে পলাশকে সঙ্গ দিয়েছি। কিন্তু আমরা আটকে গেছিলাম এক অদ্ভূত সমস্যায়। পলাশের কর্মজীবনে এসে আমরা আটকেছিলাম। পলাশ যে সময় চাকরী করতে শুরু করেছে সে সময় অর্কুট এসে গিয়েছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। পলাশের সহকর্মীদের সূত্রে জানা গিয়েছিল পলাশের অর্কুট অ্যাকাউন্ট ছিল। আমাদের সমস্যা হচ্ছিল অফিসের বাইরে পলাশের সামাজিক জীবন সম্পর্কে আমরা কোন ধারণাই পাচ্ছিলাম না। পলাশের বাবা এ প্রসঙ্গে খুব বেশী কিছু জানেন না। ভাসা ভাসা কিছু নাম মাত্র। সে দিয়ে খুব কিছু এগোচ্ছিল না।

অ্যাকাউন্টের কথা শুনে হাতে চাঁদ পেলাম। পলাশ সহকর্মীদের মধ্যে যাদের বন্ধুতালিকায় ছিল তাদের অনুরোধ করা হল। তাঁদের প্রোফাইল থেকে থেকে পলাশের প্রোফাইলে বেশ কিছু ছবি পাওয়া গেছিল। সেই সব ছবির বেশীরভাগেই একটি মেয়ের উপস্থিতি আছে। মেয়েটি কে? জানা নেই। পলাশের বেশীরভাগ সহকর্মী এ বিষয় নীরব। এমন কী যাঁদের প্রোফাইল থেকে এই সব ছবি দেখা গেল, পলাশের স্ক্র্যাপবুক দেখা গেল – তারাও খুব সামান্য তথ্য দিলেন। মেয়েটির সম্পর্কে শুধু এটুকু জানা গেল যে মেয়েটি পলাশের পরিচিতা। সহকর্মীরা তেমন চেনেন না। পলাশও বিশেষ কিছু বলেনি মেয়েটি সম্পর্কে। কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। পলাশের সঙ্গেই তাকে বার কয়েক সহকর্মীরা দেখেছে তাদের অফিসের নীচে বা রাস্তায়। শেষ তাদের ছবি আছে পলাশের দুর্ঘটনার মাস খানেক আগের।

আমাদের সমস্যা ছিল যে আমরা কোন অপরাধের তদন্ত করছিলাম না। অতএব কেউ যদি আমাদের তথ্য দিতে না চান আমরা অন্য কোন পদ্ধতির সহায়তা নিতে পারব না। আইনী কোন অধিকার আমাদের নেই। তপোজিৎ-এর কথা ছিল যে মেয়েটির কাছ থেকে এমন কিছু সূত্র পাওয়া সম্ভব যা পলাশের দুর্ঘটনা অবধি আমাদের নিয়ে যাবে। এবং সেই যাওয়াটা অত্যন্ত জরুরী। পলাশের মস্তিষ্ক এখন ফাঁকা। সেখানে আমরা নতুন করে স্মৃতি ভর্তি করছি। সেই স্মৃতির মধ্যে দিয়ে পলাশ তার অতীত পূনর্নির্মাণ করবে। পলাশের স্বাভাবিক জীবনে তার স্মৃতিভান্ডারে জমা করার বিষয় বাছাবাছির উপায় ছিল না। কিন্তু এখন হয়েছে। সুতরাং, আমাদের স্মৃতিগুলোকে সচেতনভাবে বাছতে হচ্ছে। এমন স্মৃতি কোন পলাশকে আমরা দিতে চাই না যে স্মৃতি তাকে উদ্বিগ্ন বা বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পলাশ কী ভাবে ট্রেন থেকে পরেছিল তা যেহেতু জানা যায়নি তাই এই বাছাবাছি খুব জরুরী। এমন যদি হয় যে পলাশ আসলে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, তাহলে তার পেছনে কোন কারণ থাকবে। স্মৃতির ভীড় থেকে সেই কারণবীজ বহনকারী স্মৃতি যদি আমরা তাকে ফিরিয়ে দিই তাহলে সর্বনাশ। এমন যদি হয় যে পলাশকে কেউ হত্যা করতে চেষ্টা করেছিল, তাহলে পলাশকে সে স্মৃতি দেবার বদলে আমরা চেষ্টা করব আইনের সাহায্য নিতে তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য।

পলাশকে কেউ মারতে চাইবে এমন কারণ এখনো অবধি আমরা খুঁজে পাইনি। শত্রু তার সেই অর্থে কেউ নেই। অন্তত আমরা খুঁজে পাইনি। সুতরাং পলাশের অর্কুট অ্যাকাউন্ট আমাদের কাছেই গুপ্ত ছিল। তপোজিৎ-এর আরেক বন্ধু ছিল সাইবার ক্রাইমে। তার সাহায্য নেওয়া হল। পলাশের অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলা হল। মেয়েটি এবং পলাশ সম্পর্কে তথ্য এসে পরল আমাদের হাতে। আমরা, মানে আমি আর তপোজিৎ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে শুরু করলাম। সিদ্ধান্ত নিতে হবে তপোজিৎকেই। তার চিকিৎসাধীন রোগী। অতএব আমার অপেক্ষা করার পালা। খানিকক্ষণ ভাবল তপোজিৎ। তারপরে বলল সে জানাতে চায় না এখন পলাশকে। বুঝলাম যে খটকা আমার লেগেছে একই খটকা তারও লেগেছে।

মেয়েটির সঙ্গে পলাশের প্রেম ছিল। ছিল বলাই সঙ্গত। মেয়েটির সঙ্গে পলাশের যাবতীয় কথা চ্যাটবক্স থেকে বেরোল যখন তখন দেখা গেল পলাশের দুর্ঘটনার পাঁচদিন আগে তাদের যাবতীয় কথা শেষ। অথচ শেষ চ্যাটে এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল না, যার থেকে বোঝা যায় এমন ভাবে কেন শেষ হল! বরং শেষ চ্যাটটা ছিল বেশ উষ্ণতায় ভরা। পলাশকে আমরা কিছু জানালাম না। খুঁজতে শুরু করলাম মেয়েটিকে। সেই একমাত্র চাবিকাঠি। অবশ্য যদি সে চাবি দিয়ে তালা খোলে তাহলেই। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে কোথাও নেই। আমরা যখন চূড়ান্ত হতাশ তখন পলাশের এক সহকর্মিণী নিজে থেকেই এগিয়ে এলেন। একদিন আচমকা তিনি ফোন করলেন আমাকে। দেখা করতে বললেন। জানা গেল মেয়েটি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত সেখানেই তাঁর বোনও পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি অনুষ্ঠানে মেয়েটিকে তিনি দেখেছেন সম্প্রতি। তাঁর বোন মেয়েটিকে চেনে এবং তারা সহপাঠিনী।

তপোজিৎ যথারীতি দায়িত্বটা আমার কাঁধে চাপিয়ে দিল। মেয়েটিকে একদিন বিশ্ববিদ্যালয় ফিরতি রাস্তায় ধরলাম। অবশ্যই আমার সাংবাদিক পরিচয়টা তখন কাজে লেগেছিল। সরাসরি তাকে বললাম যে আমি পলাশের বন্ধু। পলাশ সম্পর্কে কিছু কথা আমার বলার আছে। মেয়েটি প্রথমে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করল। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এমন কিছু একটা হবে। কিছুটা অনুমান এবং কিছুটা সাংবাদিক সুলভ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাকে বললাম,

– আপনি আমাকে এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে বিষয়টা আপনারই অসুবিধের কারণ হবে। আইনী পন্থায় আপনার সঙ্গে কথা বলতে হলে যা যা করতে হবে তাতে আপনারও কিছু অসম্মান হবে।
– আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?
– না। আমি শুধু সমস্যাটা ব্যাখ্যা করছি। পলাশের কেসটা পুলিশ অনুসন্ধান করছে। আপনি অব্দি যদি আমি পৌঁছতে পারি তাহলে তাদের পৌঁছতে কত সময় লাগবে? এবং বুঝতেই পারছেন যে আমি সেক্ষেত্রে তাদের সাহায্যই করব।
– পলাশের কেস? পলাশ কি ক্রাইম করেছে কোন?
– জানেন না?
– জানলে আপনাকে জিজ্ঞেস করব কেন?
– যা করেছে তা ক্রাইম হতেও পারে, আবার অন্য কারোর ক্রাইমও হতে পারে যদি প্রমাণিত হয়!
কিছুক্ষণ থমকাল মেয়েটি। তারপরে বলল,
– আমাকে কি করতে হবে?
– সামান্য কিছু প্রশ্নের উত্তর চাই! পেলেই …

কাছাকাছি একটি জায়গায় বসলাম।

বসা ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। বসে পড়লেই হল না। কোথায় বসছি, কিসে বসছি এ সব খুব গুরুত্বপূর্ণ! ইংরেজী ভাষায় যেমন চেয়ার, সিট এবং বেঞ্চ আলাদা আলাদা বসার জায়গা। বসার সঙ্গে বসার কারণ যে কাজ, সেটাও জড়িয়ে আছে। কারণের গুরুত্ব যত ততই বসার স্থাননাম নিয়ে পার্থক্য। এই যেমন খালাসিটোলায় বসা। একটা বাংলা মদের ঠেক বই কিছু নয়। সেখানে বসা নিয়ে এত উতলা হওয়া কেন? কারণ বলতে বিখ্যাত সব নামের জড়িয়ে থাকা। খালাসিটোলায় গিয়ে মদ খেলেই যে চড়চড় করে লেখা বেরোবে তা তো না! খালাসিটোলায় যাঁরা যেতেন, তাঁদের চর্চার থেকে যা কিছু আলোর টুকরো ছিটকোতো সেই সব মগজের কোষে কোষে সেঁধিয়ে যেত। সেই নিয়ে বেড়ে ওঠা বা বেড়ে চলা। আমার এক পরিচিত ছিলেন, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর কোনো আমলে আলাপ পরিচয় ছিল। কবিতার কথা উঠলেই তিনি অনিবার্যভাবে শক্তির প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। তারপরে চলে যেতেন মদ খাওয়ার কথায়। তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মদ খেয়েছেন। রাস্তায় রাস্তায় নানা কান্ড করেছেন ইত্যাদি। তারপরে নিজের কবিতা শোনাতেন। ক্লান্তিকর। মদ খেয়েছেন একসঙ্গে ঠিকই, কিন্তু শক্তির ‘পদ্য’ শক্তিরই।

হ্যাঁ, এও এক যাপনের ফসল। যাপন খুব গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিরা যখন লিখছেন তখন তাঁরা উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের ভাষা খুঁজছেন। স্বাতন্ত্র্য খুঁজছেন। পড়াশোনা করেছেন তার জন্য। পাশাপাশি বেঁচেছেন অন্যরকম। জীবনের যে স্রোত তাঁদের চারপাশে চলছিল সেই স্রোত থেকে নিজেদের সরাতে চেয়েছেন। ক্লান্ত, জীর্ণ এক সময়। বিক্ষুব্ধ এক সময়। একদিন স্বাধীনতা এলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এই সোনালী স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। মৃত্যু সর্বদা নতুন জন্ম দেয়। ক্ষোভ বা বিদ্রোহ অথবা প্রেম সে জন্মের ফসল। অথবা সব মিলে মিশে থাকে। আন্তরিক এক বিশ্বাসঘাতকতা থাকে। সে সব মিলিয়েই যাপন। কিন্তু ভাষা হয়ে উঠবে কি করে? ওই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গল্পটা, লুঙ্গি পরে ভুটান চলে যাবার সে তো আসলে অস্থিরতার এক দ্যোতক। এই দ্যোতনা তো রয়েছে বিশ্বসাহিত্যে।

“Nothing behind me, everything ahead of me, as is ever so on the road.”
― Jack Kerouac, On the Road

পেছনে তবু কত কিছু পরে থাকে। শক্তির থাকে। কেরুয়াকের থাকে। পলাশের থাকে।

– আমি এত সব কিচ্ছু জানতাম না!

মেয়েটি না শব্দটা উচ্চারণ করার পর বাতাসে কিছুক্ষণ তার রেশ থেকে যাওয়া উচিত ছিল। আন্তরিক উচ্চারণ রেশ রেখে যায়। যায়নি। অতএব আমি জানলাম যে মেয়েটি জানত।

– চারদিনে একজনকে এতটাই ভুলে গেলেন যে তার কি হল না হল তাও জানার ইচ্ছে রইল না?
– চারদিনে মানে?
– মানে পাঁচদিন আগে পলাশের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছে, আপনারা অনেকক্ষণ গল্প করেছেন, একসঙ্গে দুপুরে খেয়েছেন, পলাশের ফ্ল্যাটেই। তার ঠিক চারদিন পরে পলাশ …

মেয়েটি বিষ্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। ভাবছিল নিশ্চই যে এত কথা আমি জানলাম কী করে! মেয়েটির তাকানোর মধ্যে একটা বুনো বেড়ালের গন্ধ রয়েছে। পলাশের বোঝা উচিত ছিল। অবশ্য আমিই কি ছাই সব বুঝেছি জীবনে? অন্তরার সঙ্গে দেখা না হলে বুঝতাম যে জীবনটা একটা স্থাপত্যের মত স্থায়ী হয়ে গিয়েছে। গতির শক্তি হারিয়ে ক্রমে একটা প্রতিষ্ঠান। দিব্যি বিয়ে-থা করে নিয়ে ভরপেট খেয়ে সংসারী হংসটি ভাসছিলাম। সংসারে কি আছে না আছে, ভেতরের জামা-কাপড় বাদ দিলে বাইরে থেকে লোক জানবে শুধু সংসারী লোক। লেখার যা অভ্যাস ছিল তাই দিয়েই কুড়িয়ে বাড়িয়ে দিন চলছিল। চাকরীটা নিতান্ত না করলে না, সেও চলছিল। অন্তরার সঙ্গে দেখা হতে যৌবনের দিনকাল ফিরে এল। মনে হল পা এত কাদায় গেঁথেছে কবে? তুলতে গেলাম, ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল।

না, আমার কোন অভিযোগ নেই কারো প্রতি। যা আছে সব নিজের দিকে আঙুল তুলেছে। সংসারে ছিলাম, কিন্তু সংসার করছিলাম না। মহুয়ার সঙ্গে থাকাটা একটা অভ্যেস ছিল। মহুয়ারও তাই। সেটা মহুয়ার জন্য ততটা ক্ষতিকর না, যতটা আমার নিজের জন্য। আমি স্থবির হয়ে যাচ্ছিলাম। মহুয়া স্থবিরতার বাইরে যেতে ইচ্ছুক ছিল না। আমাকে বাধা দিতেও চায়নি। জীবনের কয়েকটা বছর বাকী আছে। একবার ঠিক মত বেঁচে না উঠলে যাবার দিনে না বাঁচার শোক থেকে যাবে। দুজনের জন্যই সে ভুল। দুজনেই ভাবলাম, কথা বললাম। সভ্য, শান্ত মানুষের মত সরে গেলাম। অন্তরা ততদিনে বহুদূরে। টানাপোড়েনের মধ্যে থাকার চেয়ে একদিকে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে যাওয়াও শ্রেয় মনে করেছে সে। অথবা ভেসে উঠলে ভেসে ওঠা। বিয়ে করে নিয়েছে।

পলাশও করে নিত হয়তো বা! তারপরে? এই মেয়েকে বিয়ে করার খেসারত দিয়ে যেতে হত বাকী জীবন। খুব দ্রুত মিথ্যে বলতে পারে। অত্যন্ত হালকা উচ্চারণে মিথ্যে বলে চলে। পাঁচদিন আগে সে ছিল তার দেশের বাড়িতে। মিথ্যেটা বলছিল যখন তখন অন্যদিকে তাকিয়ে। হালকা গলাতে বলে চলেছিল।

– শুনুন,আমি সব জানি। মিথ্যে বলে নিজের বিপদ বাড়াচ্ছেন। আপনি যে ওখানেই ছিলেন তার প্রমাণও আছে।
– কি প্রমাণ?

সামান্য হেসে বললাম,

– বলব না। তবে এটা সিওর যে আপনি সহায়তা না করলে যথা সময় সে প্রমাণ পুলিশের কাছে চলে যাবে।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেয়েটার মুখ কাঁচুমাঁচু হয়ে এল। ছায়া পরল। কষ্ট একটা ছাপ ফেলল।

সব মানুষের মনেই কোথাও কষ্ট ছাপ ফেলে। মুখে ফুটে ওঠে। অন্তরা যেদিন বলল যে বিয়ে করে নিচ্ছে, সেদিন আমার মুখেও বোধহয় এমন কোন ছাপ পরেছিল। আমি দেখতে পাইনি। মহুয়া আর আমার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। ভেতরে ভেতরে অনেকদিন অনেকটাই দূরে সরে গেছিলাম। নতুন করে আর দূরে যাবার ছিল না। ঠাঁই বদলের ভাবনাটা কষ্টের এই ছাপ ফেলতে পারে না, অস্বস্তি আনে একরকম। তারপরে সেটা কেটেও যায়। আমাদেরও কেটে গেছিল। আমি এখানে চলে এলাম। তারপরেও দেখা হয়েছে। সংসারে যে সব জিনিস জোড় বেঁধে থাকে তা ছাড়াতে সময় লাগে। সেই সময়ে আমরা আড্ডা দিয়েছি। বন্ধুর মত পরস্পরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছি। অন্তরার চলে যাওয়া শুনেছে মহুয়া। আলাদা করে সান্তনা দেয়নি। দিলে যে আমি বেশ অস্বস্তিতে পরব তা বিলক্ষণ বুঝেছে। এটাও ভাবেনি যে অন্তরা চলে গেছে বলেই আমি ফিরে যাব। ফেরা আর হবে না আমার। সেদিন কি আমার মুখে কষ্টের ছাপ দেখেছে মহুয়া? কে জানে!

– আমি চাইনি এমন হোক!
– কিন্তু হয়েছে! একটা ছেলে আচমকা আত্মহত্যা করতে চলে গেল, অথচ তার প্রেমিকা কিচ্ছু জানে না, এ হতে পারে?

প্রেমিকা শব্দটাতে মেয়েটি হোঁচট খেল। অনেকক্ষণ ধরে হোঁচট খেল। প্রেম এমনিতে একটি বেশ মনোরম শব্দ। প্রেমিকা-প্রেমিকাও তাই। কিন্তু সময়ান্তরে এই শব্দগুলোই বিষের মত হয়ে ওঠে। মেয়েটির ক্ষেত্রে এখন নিশ্চই তাই হচ্ছে।

– ভালবাসতাম। এমন করবে ভাবতে পারিনি।
– ২১ তারিখ যা করেছিলেন সেটা কেন করেছিলেন?

প্রশ্নটা চাপা গরগরে গলায় করতে করতে আমার মনে হচ্ছিল যে আমি অনায়াসে কিন্তু পুলিশের চাকরী করতে পারতাম। বেশ একটা তদন্তকারী ভাব আমার আছে। নিজের মনেই হাসলাম নিজেকে নিয়ে। ২১ তারিখ ছিল মেয়েটির পলাশের ফ্ল্যাটে পলাশের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার পরের দিন। সেদিন আরো কিছু ঘটেছিল যার কিছু আঁচ আমরা ওদের চ্যাটবক্সে পেয়েছিলাম। সে সব উষ্ণ আঁচ পেরিয়ে আমাকে শীতের দিকে যেতে হচ্ছিল। ২১ তারিখটা আমি ইচ্ছে করেই বলেছিলাম যাতে ঘাবড়ে দেওয়া যায় মেয়েটিকে। আমার এবং অবশ্যই তপোজিৎ-এর বিশ্লেষণ ছিল যে পরের দিন এমন কিছু মারাত্মক ঘটেছিল যার জন্য পলাশের সঙ্গে মেয়েটির যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর পলাশ দেশের বাড়ি ফেরার ট্রেন যেদিন ধরে সেদিন ইচ্ছে করেই হোক, আনমনে হোক, অনিচ্ছেতেই হোক – ওই গুরুতর দুর্ঘটনাটি ঘটে।

প্রশ্নটা আমি এভাবেও করতে পারতাম,

– ২১ তারিখ কি হয়েছিল?

কিন্তু সেক্ষেত্রে মেয়েটি পাশ কাটাবার রাস্তা পাবে। ২১ তারিখ কিছু ঘটেছিল, আমাদের অত্যন্ত শক্তপোক্ত অনুমান। যা ঘটেছিল তাতে মেয়েটির ভূমিকা অবশ্যই বড় ছিল। না হলে পলাশের ক্ষেত্রে ঘটনাটি না ঘটে মেয়েটির ক্ষেত্রে ঘটতে পারত। তাই মেয়েটিকে একটুও জায়গা না দেওয়ার জন্যই প্রশ্নটাকে ওভাবে রেখেছিলাম। বলার ভঙ্গীমার মধ্যে এমন একটা দৃঢ়তা রেখেছিলাম যাতে মনে হয় পলাশের জীবনে ঘটা সব কিছুই আমার জানা। মেয়েটি ভাঙল।

রেস্তোরাঁর আলোছায়াতে যে সামান্য আড়াল তাতেই সে নিজেকে লুকোতে চাইল। কান্না লুকোতে চাইল।

– আই আম সরি! আই ওয়াজ ড্রাঙ্ক, কমপ্লিটলি ড্রাঙ্ক!

অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আমার কাজ নেই আর। বেরিয়ে এল। পলাশের ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি মেয়েটির কাছেও থাকত। পলাশ অফিস গিয়েছিল। মেয়েটির যাবার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার আগের রাতে তারা কথা বলেছিল যে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করবে। সকালে উঠে পলাশ ব্রেকফাস্ট বানিয়ে অপেক্ষা করেছিল। মেয়েটির দেরী হয়েছে আসতে। পলাশ নিজে খেয়ে তার জন্য রেখে গেছিল। মেয়েটি এসে খেতে খেতে বুঝছিল শরীরটা ততটা জুতের লাগছে না। সে বিশ্ববিদ্যালয় যাবে না ভাবছিল। এমন সময় তার বন্ধু ফোন করে। সহপাঠী ছেলেটি। মনোজ নাম। কলকাতা শহরে এসে পলাশের সঙ্গে পরিচিত হবার আগে থেকেই এর সঙ্গে বন্ধুত্ব মেয়েটির। দিনাজপুর থেকে কলকাতা এসে পড়াশোনা করছিল মেয়েটি। ফার্স্ট ইয়ারে একটি ছেলের সঙ্গে প্রেম, ভেঙে যাওয়া- সে সব সময় মনোজ ছিল তার সঙ্গী। আর পলাশের সঙ্গে আলাপ কফিহাউসে। তাদের এক বান্ধবীর সূত্রে আলাপ। ঘনিষ্ঠতা, প্রেম ইত্যাদি তারপরে। মনোজ থেকে গিয়েছিল। সেই মনোজ যখন শোনে যে তার শরীর ভাল লাগছে না তখন সে চলে আসতে চায়। মেয়েটি ডেকে নেয়। আসার পরে মনোজ দেখে মেয়েটি অনেকটা সুস্থ। তারা দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে। মনোজ প্রস্তাব দেয় তাহলে কিছুটা পান-ও হয়ে যাক। ঘরেই ছিল। অতএব পান শুরু হয়। সেই জলযাত্রা কখন যে শরীরে গিয়েছে তা বোঝার আগেই আগুন জ্বলে যায়।

মনোজের একটি প্রেম ছিল, যা ভেঙেছিল একসময়। পরস্পরকে সান্তনা দিতে দিতে মেয়েটি ও তার মধ্যে শরীর চলে আসে। কমবেশী এসেছে বেশ ক’বার। পলাশ আসার পরে তার বিরতি পরেছিল এমন না। তবে বেশ কমে গিয়েছিল। এই ঘটনার আগের বেশ কিছুকাল তাদের মধ্যে আর এ সম্পর্ক ছিল না। মেয়েটি পলাশকে বিয়ে করবে। নিজেকে কিছুটা বোধহয় গোটাচ্ছিল। কিন্তু অভ্যাস ভারী শক্ত বিষয়। তাকে ছাড়াতে হয়, নইলে জড়িয়ে মরতে হয়। সেদিন পলাশ অফিসে গিয়ে বোঝে যে তারও শরীর ঠিক নেই। অত্যন্ত কো-ইনসিডেন্টাল। কিন্তু এমনই তো জীবন! অফিস থেকে হাফ ছুটি নিয়ে ফিরে আসে। মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা। তাই ফোন করেনি তাকে আর। বাড়ি ফিরে আসে। নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢোকে। দুজনকেই বিছানায় পেয়ে যায়।

এরপরের কথাগুলো সহজেই অনুমানযোগ্য। মেয়েটি ক’দিনের জন্য চলে যায় তার নিজের বাড়ি। পলাশ অফিসে মন বসাতে পারে না। ছুটি নিয়ে দেশের বাড়ি যেতে চায়। যাওয়ার পথে…!

কি হয়েছিল? আত্মহত্যা করতে চাইলে গলা দিলেও তো হত? ট্রেন থেকে ঝাঁপাতে হবে কেন? মুহুর্তের বিকৃতিতে এমন? নাকি অন্যমনস্ক ভাবে গেটে দাঁড়িয়ে ছিল বলে পড়ে গেল? ধাক্কা দেবার জন্য মনোজ ছিল নাকি ট্রেনে? বেশ অসম্ভব ব্যাপারটা! কাজেই মনোজের না থাকাটাই স্বাভাবিক। কি হয়েছিল এখন বোঝার সত্যি কোন উপায় নেই। কিন্তু কেন হয়েছিল তার একটা চেহারা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল! এই স্মৃতি, যা আমি ও তপোজিৎ বা তপোজিৎ ও আমি পলাশ ও মেয়েটির গল্প পর্যটন করে পেলাম তা পলাশকে ফেরত দেব কি? যদি লুকিয়ে রাখি আজ, কাল পলাশ জানবে না তার ঠিক কি আছে? স্মৃতির অন্য সব সূত্রগুলোকে আমরা দিয়েছি। যা দিয়েছি তা ধরেই তো কোনএকদিন পলাশ এই স্মৃতিক্ষেত্রপর্যটনে ফিরতে পারে। ফিরে গেলে? আবার পলাশ…?

রেস্তোরাঁর বাইরে রাত নেমেছিল। অন্তরা এখন সুখ বুনছে বোধহয়। মহুয়া ইদানীং রাত্রের দিকে সম্বিতের সঙ্গে আড্ডা দেয় ফোনে। পলাশের বাবা দেশের বাড়িতে খেয়ে ঘুমোতে যাচ্ছেন, ভোরে উঠবেন। পলাশ খেয়ে-দেয়ে টেলিভিশন চালিয়ে বসে আছে। আমি ফিরলে শুতে যাবে। আমার এবং মেয়েটির মধ্যে অপার নৈঃশব্দ।

“For a few hours
we shall have silence, if not repose.”

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত