Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com, Eisamay rituparno Ghosh Sunil gangopadhya interview

ঋতুপর্ণ ঘোষ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আলাপচারিতা (পর্ব-১)

Reading Time: 7 minutes

চিত্রপরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতেন। সে-ই অনুষ্ঠানে শিল্প-সাহিত্য-সিনেমাঙ্গনের গুণী শিল্পীদের অতিথি ক’রে আনতেন তিনি। একবার ঋতুর অনুষ্ঠানে অতিথি হয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের সে-ই আলাপচারিতা ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে প্রথম পর্ব।


 

ঋতুপর্ণ ঘোষ: আজকে ঘোষ এন্ড কোম্পানিতে আমাদের সাথে আছেন সুনীল দা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। যার ব্রান্ডনেমই হয়ে গেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই নামেই সবাই এখন চেনেন। আমি মনে করি সুনীল দা কোলকাতা শহরের একজন ক্রনিকলার। কোলকাতা শহরকে অনেকটা চিনিয়েছেন সুনীল দা। আমরা আড্ডার বিষয়টা সেটা রাখতে পারি, দেখা যাক সেখান থেকে কোথায় যাওয়া যায়।

ঋতুপর্ণ ঘোষ: আমাদের ইতিহাস বিস্মৃত বাঙালি এবং আমাদের গল্পকথায় প্রায় পুরো জিনিসটা চিনিয়ে দেয়া ওই সময়টার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সময়টাতে আমরা একটা রুদ্ধশ্বাস উপন্যাসের মধ্যে পড়েছি। হয়তো যখন তুমি লিখেতে শুরু করেছো এবং আমাদের খুব ফরমেটিভ বয়সও তখন তাই রেসপন্ডও করেছি। তখন মনে হতো, আমরা যখন ইতিহাস পড়েছি তখন সেগুলোকে যদি কেউ এভাবে লিখে দিত!

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: রণজিৎ গুহ নামে একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আছেন, বিদেশে থাকেন বহু বছর ধরে। তিনি আমায় বললেন, ‘কী হলো আমরা এত ইতিহাস নিয়ে লিখলুম টিখলুম, লোকে বেশি পড়ে না। আর তুমি যেই গল্পের ছলে বললে আর সবাই পড়তে লাগলো!’ তারপর উনি বললেন, ‘এখনকার ইতিহাস বোধ হয় এভাবেই লেখা উচিৎ!’

তারপর আমি বললাম, ‘দেখুন আমি তো ইতিহাসে নবিশ, আমি তো আর সেরমভাবে গবেষণা করিনি। বইপত্র অনেক পড়েছে যা হাতের কাছে এসছে পড়েছি, লাইব্রেরি থেকে কার্ড করে পড়েছি কিন্তু সেরকম একটি সাংঘাতিক ইতিহাস যাতে একটি নতুন তথ্য দিলাম এমন তো কিছু নেই।’ তারপর তিনি বললেন, ‘না, ওই গল্পটাই আসল। লোকে ওটাই শুনতে চায়।’

ঋতুপর্ণ: কিন্তু তুমি বলছো, তুমি ইতিহাস পড়োনি কিংবা দেশপত্রিকায় তোমার ফুল টাইম কাজ তার সাথে তুমি যে কেবল ওই দুটো উপন্যাস লিখেছো তা তো নয় কবিতা লিখেছো, তোমার নানান কাজ। তাহলে ওরকম লেখার ধারাবাহিকতাটা তুমি কি করে পেলে?

সুনীল: আসলে কী জানো তো আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম ঐসব ইতিহাস আমি পড়িনি। কিন্তু আমার একটা নেশা ছিলো ঊনবিংশ শতাব্দির এ সমস্ত বাংলার ইতিহাস, রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এদের জীবনী বা এদের সম্পর্কে পড়তাম, তখন আমার মনের মধ্যে একটা ধর্ম জিজ্ঞাসা তৈরী হয়। আমি ব্রাহ্মণ বাড়ির ছেলে। পুজোর রাতে এসবই দেখেছি, কিন্তু মন থেকে কখনো এগুলো মানতে পারিনি। তখন আমি খুঁজছিলাম, ধর্মটা কী? আমি কী করব? আমি যখন ছাত্র এটা সে সময়ের। এদের জীবনী পড়ে দেখলাম, বাহ্, ব্রাহ্মধর্মটা তো খুব ভালো। তো আমি ব্রাহ্ম হই না কেন?

কিন্তু ব্রাহ্ম ধর্মটা যে অনেক পিছিয়ে গেছে, ওটা যে আগে হয়ে গেছে সেটা তো আমার খেয়াল নেই। আমি তখন আবার করলুম কী, কর্নওয়াল স্ট্রিটে ব্রাহ্মসমাজ লাইব্রেরি আছে একটা। সেখানে আমি পড়তে যেতাম, বিনা পয়সার লাইব্রেরি। তো সেখানে এক বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। তাকে আমি বললাম, ‘দেখুন, আমি ব্রাহ্ম হতে চাই। ব্রাহ্ম হতে হলে আমাকে কী করতে হবে?’

সে ভদ্রলোক কী ভালো! কী বলবো তোমায়! তিনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন প্রায়। তিনি বললেন, ‘ব্রাহ্ম হতে চাও ঠিক আছে কিন্তু এত ব্যস্ততার কী আছে? আরও পড়াশোনা করো, আরও দু’চার বছর যাক। বরঞ্চ তখন তুমি আবার আমার কাছে এসো।’ দু’তিন বছর পরে, আমার ধর্মের প্রতিই বিশ্বাস চলে গেল! ভদ্রলোক আমাকে বাঁচিয়েই দিয়েছেন।

ঋতুপর্ণ: বুঝতে পারছি। তার মানে কোলকাতা নিয়ে তোমার খোঁড়ার কাজটা তখনই শুরু হয়ে গেছে?

সুনীল: ওইটে তখন মাথার মধ্যে ছিলো, বুঝলে। তারপরে যদি আমার লেখালেখির কথা বলতে হয়, তাহলে একটা কথা বলবো যে গদ্যতে আমি তো পরে এসেছিলাম। কবিতা দিয়েই লেখা শুরু করেছিলাম, ভেবেছিলাম আজীবন কবিতাই লিখে যাবো।

এমনকি আমার ছাত্র জীবনের স্বপ্ন কী যদি তা জিজ্ঞেস করো? তবে স্বপ্ন ছিলো যে কোন এক মফস্বলের কলেজে যদি চাকরি পাই যথেষ্ট। আর সাথে যদি দু’ তিনখানা কবিতার বই বেরোয় তাই যথেষ্ট।

একটা সময়ে এখানে যা চাকরি-বাকরি করতাম, টিউশনি করাতাম সব ছেঁড়ে ছুঁড়ে আমেরিকাতে চলে যাই। একটা স্কলারশীপ পেয়েছিলাম। তারপর আমি অবিবাহিত, সেরকম পিছুটান ছিলো না তখন। আমেরিকা গিয়ে ষাটের দশকে থেকে যাবার অজস্র্র সুবিধে, ইমিগ্রেশনের সমস্যা ছিলো না।

কিন্তু আমার মন টিকলো না। দেখলুম সব আছে এখানে কিন্তু বাংলা ভাষায় লিখেতে ইচ্ছে করে রাত্রিবেলা। ওই ছোট্টো একটা কবিতা লিখলে মনে যে শান্তি পাই, এখানে এত মদ খেয়ে বান্ধবীদের সাথে ঘুরেও তা পাই না।

ঋতুপর্ণ: তোমার কি গিন্সবার্গের সঙ্গে আলাপ সেই সময়টাতে?

সুনীল: তার আগে থেকেই ওর সাথে আলাপ। গিন্সবার্গের সাথে আলাপ কোলকাতা থাকার সময়ে। তো যাহোক, তো আমি দেখলাম যে, নাহ! আমি ফিরে যাবো। অনেকেই আপত্তি করেছিলো, বারণ করেছিলো। ‘কোলকাতা গিয়ে কী করবে বেকার হবে, অমুক হবে, তমুক হবে।’

তো ফিরে এসে একদম কাঠবেকার, উর্পাজন নেই। বাড়িতে মা, ছোট ছোট ভাইবোন রয়েছে। আমেরিকা থেকে টাকা পাঠানো সহজ ছিলো। এখানে এসে কী করি? তখন আমি শুরু করলুম নানা রকম নামে গদ্যটদ্য লেখা।

আমার তো অনেক ছদ্মনাম। তো তখনই শুরু হলো আর কি। একই নামে বারবার লিখলে লোকে যদি বিরক্ত হয়! তাই নানারকম ছদ্মনাম। তারপরে সাগর দা হঠাৎ বললেন, ‘তুমি উপন্যাস লিখবে?’ আমি আকাশ থেকে পড়লুম। উপন্যাস! সে আবার কী করে লিখতে হয় রে বাবা!

রণদা বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা রণদা বাবু, উপন্যাস লিখতে হলে চ্যাপ্টার কী করে ভাগ করতে হয়? কোথায় কী, কোথায় থামতে হয় এসব আর কি।’ তারপর সাগরদা বললেন, ‘না, তোমাকে লিখতেই হবে।’ সাগরদা সেবার থেকে প্লান করেছিলেন আগে দেশ পত্রিকায় একটা উপন্যাস বেরোতো, ওই প্রেমেন্দ্রমিত্র, বনফুল, তারাশঙ্কর এদের। সেইবছর থেকে সাগরদা ভেবেছিলেন তিনটে উপন্যাস বের করবেন। একটা প্রেমেন্দ্রমিত্রের, একটা সমরেশ বসুর আর আমি তরুণতম।

আমার লেখা তখন ‘আত্মপ্রকাশ’। খুব মাথার চুল ছিঁড়ছিলাম, ওরে বাপরে! উপন্যাস লিখবো কী করে? আর সাগরদা সেটা বলছেন জুন মাসে আর সেপ্টেম্বরে পুজো সংখ্যা তো বেরোয়।

তো যাই হোক, আমি করে কী লিখবো? এতো মহাবিপদে পড়লাম এসব ভাবছিলাম। আবার মনে মনে একটা লোভও ছিলো, উপন্যাস লিখলে বোধ হয় একটু বেশি টাকা পাওয়া যায়। টাকার তো খুব দরকার তখন। সাবজেক্ট কি লিখবো, প্লট কোথায় পাবো?

তখন আমার মনে পড়লো, আমেরিকাতে যখন ঐ অ্যালেন্স গিন্সবার্গের-টিন্সবার্গের আড্ডায় ঘুরতাম তখন জ্যাক কেরুয়াকের সাথে দেখা হয়েছিল। তো জ্যাক একদিন কথায় কথায় বলেছিলো, ‘উপন্যাস লেখা খুব সোজা।’ আমি বললাম, ‘তাই নাকি?’

উনি বললেন, ‘উপন্যাস তুমি কী করে লিখবে? তুমি একটা তারিখ ভাববে। ধরো, ২ মে মার্চ ১৯৬৪। সেদিন তুমি কী করছিলে? তুমি একটা বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে ছিলে। তো সেখান থেকে লেখা আরম্ভ করবে। সে বাসে উঠলো, বাসটা কোথায় যাবে? এভাবে লিখতে শুরু করো গল্প হয়ে যাবে।’

আমি যখন উপন্যাস লিখবো তখন আমার মনে হয়েছিলো, আরে তাইতো! ট্রাই করলে তো হয়। তারপর অমুক রাতে আমি কোথায় ছিলুম মনে পড়লো। আরম্ভ করলুম আমি সেখান থেকে।

ঋতুপর্ণ: এবং আস্তে আস্তে একটা ফর্ম পেয়ে গেলে?

সুনীল: আমি একটা এক্সপেরিমেন্টও করলুম বলা যেতে পারে। সাধারণত বাংলা ভাষায় যেটা হয় না, নায়কের নাম দিলাম ‘সুনীল’। সুনীলই সব করছে। মদ খাচ্ছে, জুয়া খেলছে এমনকি ওসব পাড়াতে যাচ্ছে। বাংলা গল্পে আগে তো এমনটা হতো না। যাতে ব্যাপারটা আরও বেশী বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

পরবর্তীতে আমার যখন বিয়ে টিয়ের ব্যাপার হয়। একটা মেয়ের সাথে প্রণয়-ট্রনয় হলো, সবই হলো। তো ওর দাদা সেই ‘আত্মপ্রকাশ’টা পড়ে বললো, ওরে বাবা এরম ছেলে নাকি অ্যা! হুবহু সবই সত্যি বলেছি ওর ভেতর। এইযে আত্মপ্রকাশ লিখলাম, অরণ্যের দিনরাত্রি লিখলাম, প্রতিদন্দ্বী লিখলাম এগুলো সবই নিজের জীবনের ঘটনা। তো নিজের জীবনের ঘটনা লিখতে লিখতে মনে হলো, আর কত লিখব! নিজের জীবনের ঘটনার তো শেষ আছে বা লোকের কাছে একঘেয়ে লাগতে পারে। তখন আমি ভাবলাম যে, এবার একটা অন্যদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিৎ।

তখন আমার ছাত্র বয়সে যে উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা ছিলো সেগুলো মনে এস গেল। আমি ছাত্র অবস্থায় বিভিন্ন বন্ধুদের প্রশ্ন করতাম। ‘বলতে পারো প্রথম বিধবা বিবাহটা কে করেছিলো? কোন ব্যক্তি?’ কেউ বলতে পারে না।

আমি বললাম যে, ‘বলতে পারো কালীপ্রসন্ন যখন মহাভারত অনুবাদ করছেন তখন তার বয়স কত ছিলো?’ কেউ বলতে পারে না। তখন আমি দেখলাম যে এ তো বিরাট ফিল্ড পড়ে আছে। আমাদের একটা সাংঘাতিক ইতিহাস অথবা একটা সময় এখনকার যে ভালো ছাত্র-ছাত্রী তারাই জানেনা! তখন আমি ও বিষয়ে লিখতে লাগলাম।

আরেকটা কারণও আছে। আমি একদিন দুপুরবেলা ঘুমোচ্ছি তখন একটা উদ্ভট স্বপ্ন দেখলাম। আমি দেখলুম, মাইকেলের সাথে বিদ্যাসাগরের ঝগড়া হচ্ছে! কারণটা আমি জানি না। হয়তো ওসব পড়ছিলাম বলে। বিদ্যাসাগর মাইকেলকে বলছেন, ‘তুমি আমার টাকা ফেরত দাও!’

তখন হঠাৎ আমি ভাবলাম আরে এদের নিয়েও তো লেখা যেতে পারে! এদের নিয়ে তো শুধু জীবনীই লেখা হয়। থার্ড পার্সনে লিখে। এরা যদি ফার্স্ট পার্সনে আসে! কথা বলে, তাহলে কেমন হয়?

তো সেজন্য আমি সেসময়ের উপন্যাসটাতে এদের জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থিত করেছি এবং যেহেতু ইতিহাস তো আমি লিখছি না, আমি লিখছি একটা উপন্যাস। সেজন্য এসব জীবন্ত ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর ফাঁকে ফাঁকে একটা করে কাল্পনিক চরিত্র ঢুকিয়ে দিয়েছে নাহলে গল্প তো আর আগানো যায় না।

ঋতুপর্ণ: ওহ আচ্ছা, কিন্তু এই যে নবীনকুমার যে কালীপ্রসন্ন সেটা ইন্ডিকেট করার ব্যাপারটা কী করে মাথায় এলো?

সুনীল: যখন আমি লিখবো ভাবলাম তখন ভাবলাম কেমন লিখব? ইতিহাস নিয়ে লিখলেই তো আর গৎবাঁধা ইতিহাস নিয়ে লিখলেই হবে না। ইতিহাসের একটা ইন্টারপ্রিটেশন দরকার, আমার নিজস্ব। সেই ইন্টারপ্রিটেশনটা হলো বহুকাল ধরে বাংলাতে লিখালিখি হয়েছে যে ৯০ দশকের একটা সময় রেনেসাঁ হয়ে ছিলো, বেঞ্জল রেনেসাঁ।

কিন্তু আমার প্রশ্ন তোলার ইচ্ছে ছিলো সত্যি কি বাংলা রেনেসাঁ হয়েছে? নাকি বাঙালিরা এমনি এমনিই গর্ব করে? সত্যিকারার্থে রেনেসাঁ হয়নি। রেনেসাঁ হতে গেলে একসঙ্গে সবকিছুর উত্থান লাগে। ছবি, নাটক তখন সিনেমা ছিলো না, সঙ্গীত সমস্ত কিছু এবং তাতে সমাজের সকল স্তরের মানুষের গিয়ে ছোঁয়াটা লাগে। কিন্তু আমাদের কি হয়েছিলো?

হয়েছিল নানান দিক থেকে টুকটাক হয়েছিলো বটে কিন্তু ছবি ধরো কিছুই হয়নি। তখনকার দিনে ছবির ব্যাপারই ছিলো না। নাটকগুলো বস্তাপঁচা। বড়বড় নাট্যকারদের কথা বলি, তবে বিষয়বস্তু অতিবাজে। কিন্তু ধর্মের একটা রির্ফমেশন হয়েছিলো, সাহিত্যের একটা নতুন জোয়ার এসেছিলো।

ঋতুপর্ণ: সেটা ঠিক কখন, কার হাত ধরে?

সুনীল: ওই তো ধরো আস্তে আস্তে। প্রথমে ক্রিশ্চিয়ানিটির ব্যাপারটি এসেছিলো। সেটা কাটাবার জন্য দুটি ক্যাম্প হলো। একটা হলো দক্ষিণেশ^রের রামকৃষ্ণ। ওদের ব্যাপার ভক্তিবাদ নিয়ে এলো। আরেকটা হলো ব্রাহ্ম যেটা কেশব সেন করলেন। তো সেটা ফুটিয়ে তোলার ইচ্ছে হয়েছিলো।

ঋতুপর্ণ: সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেটা হয়েছিলো?

সুনীল: সাহিত্য তো হলো। দেখো গদ্য, উপন্যাসের ফর্ম এলো বঙ্কিমের হাত ধরে। তারপর কবিতাও ঈশ্বরগুপ্তের থেকে কি রকম পালটে গেল। মাইকেল এসে সাংঘাতিক নতুন কিছু একটা করে ফেললো। এই যে নতুন কিছু করাই তো রেনেসাঁর ব্যাপার। কিছু কিছু হয়েছিলো।

তবে আমার যেটা সবচেয়ে খারাপ লেগেছিলো যেটা আমি ভেবেছিলাম ফোঁটাতেই হবে। সেটা হচ্ছে এই যে ভদ্দরলোক শ্রেণির উদ্ভব হয়ে গেল; ‘আমি ব্রাহ্ম আমাকে ছুঁয়ো না।’ ব্রাহ্ম কত সুন্দর একটা আদর্শ ছিলো! কিন্তু ধর্মটা সবার কাছে পৌঁছলো না। সব বড়লোকরাই ব্রাহ্ম হয়, বাসার কাজের লোকরা তো আর ব্রাহ্ম হতে পারবে না।

ভেবে দেখো, ক্রিশ্চিয়ানরা যে দেশে যায় ওদের দাসদাসীদের পর্যন্ত ক্রিশ্চিয়ান করে ফেলে। ইসলাম কী করেছে? একটা রাজ্য জয় করেছে তখন তলা থেকে গোড়া অবধি ইসলামের দীক্ষা দিয়েছে। আর আমাদের হিন্দুদের প্রথম কথা, ‘এই ছোঁবে না, এমন করবে না, যাও যাও!’ ব্রাহ্মরা তো তাই করলো।

এমন একটি গল্পও ছিলো। এক বার্বারিজ হিন্দু স্কুলে গিয়ে বলছে আমার বাচ্চাটাকে ভর্তি করাও। এখন কী করবে? তাকে তো সরাসরি ফিরিয়ে দিতে পারে না। তখন শেষ-মেষ তাকে একা একা স্কুলে পড়ালেও পরে তাকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। আমি আমার উপন্যাসের মধ্যে দেখিয়েছি ছেলেটা পরে লেখাপড়া শিখলো। কিন্তু সমাজ থেকে তাকে বিতাড়িত হতে হলো শুধুমাত্র বার্বারিজ ছেলে বলে? এগুলো এক ধরনের অশিক্ষা।

কমরেড চারু মজুমদার: এক স্বপ্নদর্শী বিপ্লবীর জন্মশতবর্ষ

ঋতুপর্ণ: কিন্তু এই ধরনের গল্পগুলোর রেফারেন্স তুমি কীভাবে পেলে?

সুনীল: তখনকার দিনের পত্র-পত্রিকা। হুবহু সব পাইনি। একটু একটু করে গল্প পেয়েছি বাকিটা তৈরী করেছি। এছাড়া নানা সংবাদপত্রের ফাইল দেখে। এমন সব খবর বেরোতো এখনকার দিনেও যা হয় আরকি। বাড়িতে চুরি হয়েছে। যা হয় আরকি, পরিচারিকাকে প্রহার করতে করতে পরিচারিকার মৃত্যু হলো অথচ পরে দেখা গেল চুরি সে করেই নি।

এমনকি এও বেরোতো যে, ঠাকুরদের পরিবারের লোকেরা দার্জেলিং বেড়াতে যাচ্ছে, হাওড়া স্টেশনে তাদের একটা স্যুটকেস চুরি গেছে এটাও খবরের কাগজে বেরোতো।

কিন্তু একটা খুব বড় খবর সব খবরের কাগজগুলো চেপে গেল। তা হলো কাদম্বরীর মৃত্যু। আবার প্রমাণ আছে যে, দেবেন ঠাকুর সব সম্পাদকদের ডেকে খাওয়ালেন আর কি। এখন হাতে করে একটা করে খাম দিয়েছিলেন নাকি সেটা তো আর কোথাও লেখা নেই। ধমক বা কিছু একটা করেছিলেন, সেজন্য কোনো খবরের কাগজে বেরোল না।

ঋতুপর্ণ: আত্মহত্যা বা স্বাভাবিক মৃত্যু না সেটা জনসাধারণ জানতে পেরেছিলো কবে?

সুনীল: প্রথমে জানা যায়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে আস্তে আস্তে হিসেবের খাতায় দেখা যাচ্ছে যে, যিনি করোনার, সাধারনত কোর্টে গিয়ে এসব হয়। কিন্তু করোনারকে বাড়িতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। তারপর তাকে মদের বোতল টোতল এই সমস্ত দেয়া হচ্ছে। তো এরকম সব অনেক ব্যাপার আছে ওর মধ্যে।

ঋতুপর্ণ: সেদিক থেকে বোধ হয় একটি সুবিধেই হয়েছে। এসব পত্রিকাগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শিখিয়েছে!

সুনীল: আসলেই তো তাই ই উদ্দেশ্য ছিলো। তবে রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ একজন ব্যক্তি কোনো সন্দেহ নেই। সত্যি কথা, আমি মনে করি ব্যক্তি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ একজন অসাধারণ কিন্তু তার দু’একটা ফল্ট তো থাকতেই পারে।

ঋতুপর্ণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তুমি কেন আসাধারণ মনে করো?

সুনীল: কারণ, এই যে ধরো, সারাজীবনে কত কষ্ট পেয়েছেন তার প্রকাশ হয়েছে তার শিল্পের মধ্য দিয়ে। কোথাও তিনি সেটা আলাদাভাবে প্রকাশ করেননি। সাধারণ মানুষের মতো কান্নাকাটি এসব তিনি কখনও করেননি। আর কত কাজ করেছেন বলো তো!

অত লিখেছেন প্লাস কো-অপারেটিভ মুভমেন্ট নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। কোন দরকার ছিলো না তারপরেও শান্তিনিকেতনের মতো একটা জায়গাতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে দিয়ে মাস্টাদের মাইনে দিচ্ছেন।

কে বলেছিলো এসব করতে? তার কারণ হলো অদম্য একটা শক্তি ছিলো লেখা ছাড়াও। মানে লেখা ছাড়াও নানান দিকে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাইতেন, যা বাঙালিদের মধ্যে দেখা যায় না।

ঋতুপর্ণ: আচ্ছা উনি জমিদার হয়ে কেমন জমিদারী করতেন?

সুনীল: প্রথমদিকে ভালোই জমিদারী করেছেন। কিন্তু তারপর তিনি জমিদারীটাকে লাটে তুলে দেন। তার কারণ তিনি মুভমেন্ট নিয়ে ব্যাপক এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন। তিনি আরেকটা বিষয় বুঝতে পেরেছিলেন যে, জমিদারী প্রথাটায় যাবার ব্যাপার। তাই এসব নিয়ে এত মাথা ঘামাতে চাননি।

ঋতুপর্ণ: একটা বিতর্ক চলে না যে রবীন্দ্রনাথ লালনেরটা কিংবা লালন রবীন্দ্রনাথেটা ধার করেছিলো। এমন কোনো প্রমাণ কি তুমি কাজ করতে গিয়ে পেয়েছ?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>