একা

একটা ছোট ট্রলি ব্যাগে নিজের তিনটে কুর্তি, লেগ ইনস্ , একটা শাড়ি, দুটো শায়া, দুটো ব্লাউজ, তিন চারটে আন্ডার গার্মেনটস নিয়ে ষষ্ঠ বারের মত বেরিয়ে পড়ল মনীষা। এর আগেও পাঁচ বার গেছে। ফিরেও এসেছে। গত পাঁচ বারেই ও খুব উত্তেজিত ছিল। এবারে খুব শান্ত। তবে গত পাঁচ বারও যে ভুলটা করেনি, এবারেও ও সে ভুল টা করেনি। সমস্ত মার্কশিট, আধার কার্ড , প্যান কার্ড, পাসপোর্ট যে ফাইলে থাকে সেটা নিয়ে বেরিয়েছে। ওর শাশুড়ির সমস্ত এডুকেশনাল ডকুমেন্ট পুড়িয়ে দিয়েছিল ওর শ্বশুর, উচিত শিক্ষা দিতে। বিয়ের পরপর এ গল্প শুনেছিল মনীষা। শাশুড়ির তিতিক্ষা ওকে মুগ্ধ না করলেও গত পনের বছর ধরে সাবধানী করে রেখেছে। সংসারটা করতে গিয়ে প্রথম বুঝেছিল শ্বশুর বাড়ির আস্ফালন কাকে বলে। প্রথম প্রথম খুব অসহায় লাগতো। মনে হত ও একা একটা পক্ষ আর প্রতিপক্ষে আছে তিনজন। আর দুপক্ষের কোন দিন সহাবস্থান হতে পারে না। তার পরেও পনের বছর কাটলো একসাথে। আজকাল এই সংসারটা আর টানেনা। মানে যে সংসারটা বাঁচানোর জন্য ও এতদিন এত কষ্ট সহ্য করল, আজকাল এক্কেবারে কোন তাগিদ অনুভব করেনা। জামাকাপড় পড়ে থাকে ছড়ানো ছিটানো। দেওয়ালে ঝুল জমে। কোথাও কিছু সাজানোর তাগিদ আসেনা। শুধু মনে হয় ‘চলে যাই’, মনীষা জানে না সেই মনে হওয়াটাকেই আজ নিজের অজান্তে উজ্জাপন করছে কি না।
হাঁটতে শুরু করে মনীষা। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে এসেছে, ‘ দুটো দিন কষ্ট কর। আমি দেখছি’। ছেলে পরিণত। ছেলে ছ মাস বয়স থেকে এই তেরো বছর বয়সের মধ্যে মাকে পাঁচবার আত্মহত্যা র চেষ্টা করতে দেখেছে। হাসপাতালে থাকত মা।আবার বাবা গিয়ে ফেরত আনতো। দেখেছে মায়ের ছ’বার বাড়ি ছেড়ে যাওয়া। তার মধ্যে পাঁচবার ও নিজে সঙ্গে ছিল। আগে একবার আর এ বার মা আমাকে ছেড়ে একা গেল। আমিই হয় তো বড় হয়ে গেছি, ভাবে তের বছরের শুভম।

হাঁটছে মনীষা। বেশ আস্তেই। কোথাও কোনো উত্তেজনা নেই। এখনো ঠিক করেনি কোথায় যাবে? যেন কোথাও পৌঁছানোর কোন তাড়া নেই। মনে পড়ল ব্যাগে মাত্র দশ টাকা। হেসে ফেলল মনীষা। ও একটা বিশাল বড় কর্পোরেট চাকুরে। একটা ছোটখাটো ব্যবসাও চালায়। আর ব্যাগে দশ টাকা, ব্যাঙ্কে জিরো ব্যালান্স। কেউ বিশ্বাস করবে না বললে। আসলে কেউ ই ওর জীবন টা তো যাপন করেনা। তাই সবার ধারণা র বাইরে। অবশ্য মনীষা বলতেও চায় না কাউকে। কেননা বুকের ভিতরের কাঙালপনা কারো সামনে আনতে নেই। আর কর্পোরেটের লোকেদের তো নৈব নৈব চ। ও চেনে ওদের ই এক বসকে যিনি ধার করে গাড়ি চড়েন। গাড়ি চড়াটা তার পজিশনগত কম্পালশন। রোজ সকালে মর্নিং মিটিং এ দাঁড়িয়ে তাকে অ্যাসপিরেশন নিয়ে বক্তব্য রাখতে হয়। উনি বলেন , এই ইন্ডাস্ট্রি আমায় সব দিয়েছে, গাড়ি, বাড়ি সব। তোরা যদি গতবছর ফ্যামিলি কে যে লাইফ স্টাইল দিয়েছিস এ বছর তার চেয়ে বেশি না দিতে পারিস তবে কাজ করার কোন মানে নেই। ইউ মাস্ট নট ওয়ার্ক ফর স্যালারি। এন্টায়ার স্যালারি শুড বি সেভড্। ইউ মাস্ট ওয়ার্ক ফর ইনসেনটিভস্। মাই ফার্স্ট কার ওয়াজ মারুতি এইট হানড্রেড, এখন নিশান চালাই। লোকটার জন্য করুণা হয় মনীষার । এই কথা গুলো বলার সময় লোকটার ভিতর থেকে কী প্রচন্ড ক্লান্ত লাগে জানে ও। ওকেও তো এমন সেজেগুজে থাকতে হয়। ঘরে চাল না থাকলেও হাতে গুচির ঘড়ি হল কর্পোরেট এর সবচেয়ে দামি পরিহাস। ফোন করে একটা। শুভমের ম্যাম কে। ওনার সঙ্গে ওর খুব ভালো সম্পর্ক। “ম্যাম, গুড ইভনিং। ক্যান আই স্টে উইথ ইউ ফর টুনাইট? ‘
‘হোয়াট হ্যাপেন্ড?’
‘জাস্ট নট ফিলিং লাইক স্টেয়িং ব্যাক অ্যাট হোম।’
‘আই অ্যাম কনফার্মিং ইউ আফটার টেন মিনিটস্। ‘
মনীষা বুঝল ঠিক করেনি ও।ওয়ান শটে যেখানে হ্যাঁ আসে না সেখানে কিছু অসুবিধে থাকে।এখান থেকে অটোয় বালিগঞ্জ স্টেশন দশটাকা। ট্রেনে চেপে বসলে উইদাউট টিকিটে চলে যেতে পারবে বাটানগর, ওর বাপের বাড়ি। আর কোথাও এত কম খরচে আর কোথাও পৌঁছাতে পারবে না। সুতরাং অটোয় উঠে বসল। বালিগঞ্জ স্টেশনে বসে মনীষা পুরোনো জীবনটাকে ঘাঁটতে শুরু করে।

দু নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। রাত দশটা বাজে। শীতের রাত বলে খুব কম লোক। পরপর দুটো লক্ষ্মী আর ডায়মন্ড বেরিয়ে গেল বলে এখন বেশ ফাঁকা। আজকাল খুব কম ভয় লাগে মনীষা র। কোথা থেকে এক রাক্ষুসে শক্তি ওকে পেয়ে বসেছে। আর সেই শক্তিতে ভর করে গত সাত বছর ও অসাধ্য সাধন করেছে। এই শক্তিটাকেও ও ঘৃণা করে। ও একটু কম পারলে ভালো হত। ও একটু খারাপ রাঁধুনি হতে পারত, তাহলে সৌগতর সব বন্ধুরা এসে বাড়িতে মদের পার্টিটা বসিয়ে বলত না, ” মনীষা তুই যা রাঁধিসনা, রেস্টুরেন্ট এ অর্ডার করার কোন মানে হয় না। ” ও সারাদিন অফিস করে এসে কি অনায়াসে বানিয়ে ফেলে চমৎকার সব মেনু এক ঘন্টার মধ্যে। আসুরিক এই শক্তিটা না থাকলে কাজের লোক দিনের পর দিন না এলেও সব বাসন মেজে অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনির পর কি গিয়ে স্টেজে কবিতা বলে আসতে পারতো? আবার বাড়ি ফিরে আসার সময় জানতো যে বাসন , রান্না ও না ভাঁজ করা সকালে কাচা কাপড় গুলো ওর অপেক্ষায়। আজ শাশুড়ির চেক আপ, কাল অফিস যাওয়ার আগে শ্বশুর মশাই সারা ঘরে পায়খানা করে ফেললে সব পরিষ্কার করে অফিসে ছোটা, ফিরে এসে ছেলের অসুস্থতা শুনে লোকাল ডাক্তারের কাছে ছোটা …এই সবকিছু ও না পারলেই হত। এই রাক্ষুসে শক্তিটা ওকে ভেতর থেকে মেরেছে। পারতে হবে…আরো পারতে হবে …এ যেন স্প্রিন্টারের কোচের ঘড়ি ধরে বাড়ানো স্পিড, একটা টার্গেট যা জীবন ওকে চাপিয়ে দিচ্ছে আর ও স্পিড বাড়িয়ে চলেছে… ফাইট কণি ফাইট। ওর এই সব পারাকে মনে মনে প্রচুর খিস্তি করে মনীষা। তারপর হাসতে থাকে নিজেই। ‘শালা , আমি এত বড় পাগল! নিজেই নিজের এবিলিটিকে খিস্তাচ্ছি।’
মেসেজ করে ভালোবাসার মানুষটিকে।
“আরেকবার ঘর ছাড়লাম। হয়তো ফিরেও যাব। দেখি কি হয়? একটা সীমারেখা টানতে চাইছি কোথাও। আপাতত মায়ের কাছে যাচ্ছি। ‘
এই মানুষটাকে খুব ভালোবাসে মনীষা, যদিও একটুও বোঝে না সেও বাসে কিনা। কেন যে ওর জন্য এত আকুলিবিকুলি করে তা ও নিজেই জানেনা। দূরত্বে ই থাকে, কিন্তু এক মিনিট দেখা হলে বুকের মধ্যে জলোচ্ছ্বাস, চোখের পাতা স্থির, আঙুলে চিনচিনে রোমাঞ্চ আর এক হাজার ফ্যান্টাসি ভর করে ওকে। অথচ একথা জানে না সুতীর্থ ও ওকে ভালোবাসে কি না। না জানুক। সুতীর্থ ওকে কিছু দুর্মূল্য সন্ধে আর কিছু অলীক বিকেল দিয়েছে। এত যৌনসুখ আর ওকে কেউ দিতে পারেনি। সুতীর্থ র ঠান্ডা স্বভাব ও শিল্পবোধ ওকে মনীষার সারাক্ষণের অসুখে পরিণত করেছে। ওকে ছাড়া কাউকে ছোঁয়ার কথা আর ভাবতেই পারে না মনীষা। এত যত্ন করে আদরটাও তো ওকে আর কেউ করেনি পনের বছরের বিবাহিত জীবনে। হ্যাঁ, শরীর ম্যাটার করে। করে।
এই বোকা কথাটা মনীষা অনেকবার শুনেছে, ‘শরীর কি সব? মনের কি কোনো গুরুত্ব নেই?” অথবা ওকে প্রোপোজ করা অন্তত আটশো নশো ছেলের মধ্যে শতকরা নব্বই জন বলেছে শরীরে চাই তোমায়, তা বলে ভেবো না ওটুকু ই আমার চাওয়া। ‘ এই ন্যাকা বোকা কথাগুলো সহ্য করতে পারে না মনীষা। মন দেখেছে কেউ? কেমন দেখতে হয় তা? কোথায় থাকে? আসলে মস্তিষ্ক বা নার্ভাস সিস্টেম আর অ্যাড্রিনালিন প্রবাহ আমাদের বিহেভিয়ারাল অ্যাসপেক্টগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। তা মস্তিষ্ক কোথায় থাকে ভাই? শরীরের বাইরে? নাকি শরীর বললে শুধু রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেমকে বোঝায়? শরীর চাই বলতে হেব্বি প্রবলেম, তাহলেই প্রমাণিত হয় তোমার চিন্তা ভাবনা নোংরা। মনীষা ভালোবাসে সুতীর্থ কে শরীরের জন্য না মনের জন্য জানেনা। ওর অ্যাবসেন্স যে ওকে পাগল করে , অস্থিরতা দেয়, তা যদি ভালোবাসা না হয়, তবে ওর আর কোন সংজ্ঞা জানা নেই। আর এই ভালোবাসার অনেকটা জুড়ে যে শারীরিক সুখ সে কথা স্বীকার করতে লজ্জা কোথায়? সুতীর্থ র কাছে ও যে ‘যে কোন নারী ‘ নয়, তা জানে। এইটুকু বোধ, মাসে একবার যত্ন করে আদর, কিছু হোয়াটস্অ্যাপ, কিছু কথা ওকে ভালো রাখে। সুতীর্থ কোন দায়িত্ব নেবে ওর এ আশা ভুলেও করেনা মনীষা। ওর বাবা ওকে দেখেননি, সংসারে সবাই থাকলেও ছোট থেকে মনীষা বুঝে গিয়েছিল ওর জন্য শুধু একজন ই আছে, সেটা মনীষা নিজেই। আর একজন ছিল সবসময়, সব ভুল ও ঠিক সিদ্ধান্তে, কোন মতামত না চাপিয়ে দিয়ে , সারাজীবন …। তার কাছেই যাচ্ছে ও , মা। মার কাছ থেকেই এই আসুরিক শক্তিটা কিছুটা পাওয়া মনীষা র । যে কোন অবস্থায় দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার শিক্ষা র নাম মনীষা র কাছে মা।
ঘুমের মধ্যে ও দেখতে পায় ওদের ছোটবেলার বাড়ি, তখন বাড়িটা অন্য রকম ছিল। সামনে একটা বড় উঠোন, তাতে পেয়ারা গাছ, পেঁপে গাছ, কাগজি লেবু, বাতাবিলেবু আর নারকেল গাছ ছিল। ওরা চার ভাইবোন খেলত। জ্যাঠার দুই ছেলে, ও আর ওর ভাই। খেলার মধ্যে ই দেখছে বাবা এসে দাদাকে মারছে, মা বাধা দিচ্ছে, বাবা শুনছে না, ও খুব কাঁদছে, দাদা ও খুব কাঁদছে। দাদা বলছে “বড়কাকা, আমায় মেরো না, “জেম্মাও এসে কাঁদছে। ঘুম ভেঙে গেল ওর । দাদা এখন একা থাকে । তিনসুকিয়া। জ্যাঠতুতো ছোট ভাই মুম্বই, নিজের ভাই সুরাট, খুড়তুতো বোন দিল্লি, খুড়তুতো ভাই ভুবনেশ্বর। বড় হওয়া মানেই একটা ভাতের হাঁড়ি ফেটে চাল ছড়িয়ে পড়া। বড় হওয়া মানে সময় না পাওয়া। বড় হওয়া মানে ক্লান্ত হতে থাকা রোজ। কান্না গুলো ও কি একলা হয়ে যায়। ওর ভাইবোনদের জন্য খুব কান্না পেতে থাকে মনীষার। বাবা নেই। জেম্মা নেই। আছে লোকগুলো র নেই হওয়া শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছু বছর হল। বাবা মারা গেল ছ’বছর আগে। বাবার মারা যাওয়া টা মনীষা র জন্য খুব দুঃখ জনক হলেও ও জানে ঘটনাটা আসলে শাপে বর ওর মায়ের জন্য। সরকারি চাকুরে এই মানুষ টা কোন দিন কোন দায়িত্ব পালন করেনি। শুধু নিজের ফুটানি করতে গিয়ে, আর একটার পর একটা ব্যবসা করতে গিয়ে ঋণ বাড়িয়েছে। চশমার একটা লোন দেয় সরকার, সেটাও ওনার নেওয়া ছিল । যারা ধার করে তাদের ধার করাটা একটা নেশার মতো। তাদের বাজারে, মুদি দোকানে, বন্ধুর কাছে সর্বত্র ধার থাকে। হাত পাতায় অনন্ত সুখ। এমন একটি মানুষ যে একদিনের জন্য ও ওর মাকে শান্তি দেননি এবং ওদের শৈশবটাকে নষ্ট করে দিয়েছেন পড়ে পাওয়া অপমানে সে কথা বলার দরকার পড়ে না। মায়ের ব্যক্তিত্বের কারণে ওরা ভেসে যায় নি। পড়াশোনা করে আজ রোজগার করে খাচ্ছে। ওর ক্ষেত্রে তো খাওয়াচ্ছে বলা ঠিক।
সামনে একটা বাচ্চা মেয়ে। বাচ্চা মেয়েটির পাশে ওর মা দাঁড়িয়ে। কোলে একটা বছর দুয়েকের মেয়ে ঘুমে অচেতন। হাতে আর কাঁধে দুটো ভারি ব্যাগ। বড় মেয়ের হাতে কিছুই দেননি মহিলা। মেয়েটি মায়ের একদম কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। মনীষা র মনে পড়ল মাও কোন দিন ওকে কিছু নিতে দেয়নি। সবাই মিলে বেড়িয়ে ফিরে ওরা বাড়ি ঢুকেই বলত ‘ মা , খেতে দাও। বানাতে যে সময় লাগবে, এই মানুষ টা ও যে আমাদের সাথে ই ফিরেছে কিচ্ছু ভাবতনা। ওরা নাহয় বুঝতনা। ওদের বাবা, কাকা, দাদু ও কোন দিন বোঝেনি। সেদিন রান্নাঘরে ক্লান্ত বিধ্বস্ত মায়ের কতটা একা লাগত এখন রান্নাঘরে অবসাদের ধোঁয়ায় ঝাপসা হতে হতে বোঝে মনীষা । মার লড়াইটা একার ছিল। ও অনেক বড় হয়ে মাকে সংসারের বাইরে নিজেকে মেলে ধরতে সাহায্য করেছে শুধু। বাবা রিটায়ারমেন্টের আগে মারা যাওয়ায় মা টাকাগুলো পায় । দাঁতে দাঁত চেপে সব দেনা শোধ করে। আজ পেনশনের খুব কম টাকায় আর কিছুটা এম আই এস করতে পেরেছিল, তাই নিয়ে লড়ে যাচ্ছিল। বাবা একবছর পরে মারা গেলে তিনি নিজেই সব টাকা খরচ করে ফেলতেন, সেই ধার, সেই অপমান চলত আজীবন মায়ের ক্ষেত্রে। মা তাই বেঁচে গেছে।

মাঝের হাট এসেছে । মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো বড় মেয়েটা ঢুলছে, কোলের বাচ্চা টা তো ঘুমিয়ে কাদা। আচ্ছা, এই মেয়েটিই বা কেন এত রাতে দুটো ছোট মেয়ে নিয়ে একা যাচ্ছে। ওর ও পাশে কোন বাড়ির লোক নেই? চেহারায় বেশ দৈন্য ওদের। আর ঝকঝকে পোশাকের , মুখশ্রীর মনীষা ও তো ওর মতোই বেরিয়ে পড়েছে….একা। কিছুদিন আগে এমন ই একা বেরিয়ে পড়ার শাস্তি পেতে হয়েছে দুটি মেয়েকে একজন বরের সঙ্গে ঝগড়া করে ছোট কোলের শিশুটিকে নিয়ে এসে রাস্তায় বসেছিল। তাকে একা দেখে ধর্ষণ করে তিনজন ও বাচ্চাটি কাঁদছিল বলে তাদের মুড নষ্ট হচ্ছিল, তাই বাচ্চাটিকে আছড়ে মারে ফুটপাতে। মা ধর্ষণের পর নিজের রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাচ্চাটাকে বাঁচাতে ছোটে হাসপাতালে। সে জানত না কোলে সে মৃত শিশুকে বহন করছিল। আমাদের রাজধানী দিল্লি সেদিন মেয়েটিকে সাহায্য করতে আসেনি। আরেকজন ওর মতই বরের সঙ্গে ঝগড়া করে এসে রাস্তায় বসেছিল। দিনে দুপুরে তাকে ধর্ষণ করে মদ্যপ ট্রাক ড্রাইভার, রাস্তার লোক ভিডিও করে , কেউ এগিয়ে আসেনি। এরা সবাই একা। মনীষা র মতো। কে জানে সন্তান খোয়ানো ধর্ষিতা মেয়েটি কি লড়াই লড়ছে এখন? মানুষ এবং খবরের কাগজের স্মৃতি তো সাতদিনের। মনীষা র হঠাৎ এই সামনের বৌটির জন্য খুব মায়া হতে থাকে, দুহাতে ভারি ব্যাগ, কোলে আর হাতে বাচ্চা। নেমে যায় ওরা পরের স্টেশনে। আবার কিছুটা শূন্যতা খেলা করে মস্তিষ্কে। শুভম বলেছিল , খুব খিদে পেয়েছে। ইমপালসিভ হয়ে না খেতে দিয়ে ই হঠাৎ বেরিয়ে এসেছে। শুভমের জন্য ই ফিরে যেতে হবে ওকে। যে কারণে আজ অবধি বঞ্চনা গুলোকে পাশবালিশ করে শুয়েছে মনীষা, কিছুতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় নি। ছেলেকে নিয়ে একা থাকতে গেলে বাপের বাড়িতে থাকতে হয়। নাহলে তেরোয় পড়া টিন এজার ছেলে হঠাৎ পরিবার হারানোর ক্রাইসিসে কি করবে, কোন ভুল পথে যাবে কেউ জানে না। আর এ কথাটা সবাই জানে যে মনীষা কোন দিন শুভম কে ঘাড় থেকে নামিয়ে দিতে পারবেনা। তাই ওর ঘাড়ে চেপে আছে ও ছাড়া আরো চারজন। মনীষা ভাগ্যবান (বতী? ) নয়, তাই তার বোঝা ভগবান নেন না। নিজেকেই নিতে হয়। আসলে লড়াইটা সকলের ই একার। একাই লড়তে হবে, রক্তাক্ত হতে হবে। এই যে মা এত বছর লড়ল, ও নিজেই বা কতটা দাঁড়াতে পেরেছে মায়ের পাশে? সবাই আমরা মিথ্যে সমাজ, সামাজিক জীবনের কথা বলি, সমাজ শুধু বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য, সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য নয়, ভাগ করার জন্য নয়। এই যে শুভম এখন সারারাত শুনবে ঠাকুমা র কাছে ওর মা কত খারাপ, বেপরোয়া, দায়িত্বহীন; এই যে ওর রাতে ঘুম আসবে না, দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকে রাখবে, গেম খেলে এক্সপ্রেশন লুকোবে; এই লড়াইয়ে কে আছে ওর পাশে? মনীষা নিজেও তো নেই। এসে গেছে নুঙ্গি স্টেশন। মনীষা নামে। ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে এগোয়। রাত বেড়েছে। অন্ধকার গভীর।
রাস্তা বেশ শুনশান। মনীষার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। সাত থেকে দশ মিনিটের পথ , কোন রিক্সা নেই। এটুকু পথ ওকে একাই যেতে হবে। এইটুকু পথ?

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত