একটি কথোপকথন

দুটো নামের পাশেই সবুজ  আলোটা জ্বলজ্বল করছে।
—খুব ব্যস্ত কী এখন?
—- না না বলো।
—আপনাকে একটা কথা বলার ছিলো।
—আরে বলোই  না।
—কেমন আছেন?
—ভালো তো। এ আবার কথা নাকি! রোজ তো তুমি এটাই জিজ্ঞাস করো।
—ও মা এও তো কথাই তো।
—কেমন আছি জিজ্ঞাসা করা মানে আপনার সাথে কথা বলার বাহানা এটা। বোঝেন না কেন?
—ওওও  আমার সাথে কথা বলতে তোমার বাহানা লাগে বুঝি!?
—লাগবেই তো। নাহলে আপনি যদি মনে মনে ভাবেন বাবা মেয়েটা কী গায়েপড়া রে বাবা!
—-হা হা হা হা আজকাল আমার ভাবনাটাও তুমি ভাবছ! বাঃ বেশ বেশ।
—তা বলো কী বলবে?
—না কিছু না তো।
——আমার বলতে নয় ভাবতে বেশি ভালোলাগে যে।
——তাহলে ভাবো আর আমায় মেসেজে পাঠিয়ে রেখো আমি সময় করে দেখে নেবো।
——উঁহু সে হবে না।
——আমার যে খুব ইচ্ছে করে আপনার সাথে এমনি এমনিই কথা বলতে‌।
——সে আবার কী!?
——কেন আপনি বুঝি কখনো প্রয়োজন ছাড়া অমন করে কারুর সাথে কথা বলেন নি!?
—কই না তো!
——আমায় একটু প্লিজ বুঝিয়ে বলো তো ব্যাপারটা।
—আচ্ছা দাঁড়ান বলছি।
——এই দেখো দাঁড়াবো কেন!? আমি তো অফিস ডেস্কে এখন বসে আছি।
——উফফফফ ওটা তো কথার কথা! এই নাকি আপনি মজা বোঝেন না!? কেমন হাঁড়িচাচার মতো গম্ভীর মুখ করে মোটা কাঁচের চশমার ফ্রেমের মধ্যে দিয়ে দেখেন! কেমন যেন সব দুটো দুটো দেখায় আপনার চোখের দিকে তাকালে। বড়ো ভয় লাগে বাবা আপনার প্রোপিকটা দেখলে‌। তবে ওই মোটা চশমার কাঁচের মধ্যে দিয়েও আমি কিন্তু আপনার দৃষ্টিটা দিব্যি অনুভব করতে পারি। আপনিও অনুভব করেন নাকি? কারুর মন পড়তে শিখেছেন?
—হা হা হা হা আমি হাঁড়িচাচা! তা বটে! তবে ওই মনপড়া না কী বললে সেটা কী জিনিষ!? জলপড়া, নুনপড়া,তেলপড়া এসব শুনেছি কিন্তু মনপড়া তো শুনিনি।
—উফফফ আপনি না কী যে আমি বুঝি না একদম। একেকসময় মনে হয় আপনি মজা করেন একেকসময় মনেহয় ওই চশমা দিয়ে অন্তরস্থল দেখছেন।
— আচ্ছা তাহলে কী দাঁড়ালো আমি হাঁড়িচাচা!
——একদম তাই। ঠিক তাই। একশোবার তাই।
——আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও। অমন এক থেকে একশো গুনো না। থামো।
——বলো এবার কী একটা বলছিলে যেন!
——হ্যাঁ দেখেছেন তো আপনার সাথে বকবক করতে গিয়ে সব গুলিয়ে গেলো। আপনার ভাবনা গুলো আমায় কীভাবে বলবেন সেটা শিখিয়ে দেবো ভাবছিলাম আজ …নিজেই ভুলে যাচ্ছি বার বার!
এই যে  জানেন তো আপনার কথা ভাবতে গিয়ে না আমার সব চিন্তাগুলো কেমন তালগোল পাকিয়ে যায় আজকাল।
——সেকি! তোমার সংসার ফেলে তুমি আমার কথা ভাবো আজকাল!?
——কেন ভাবতে পারি না বুঝি আপনার কথা!
আমি না চাইলেও তো আপনি আজকাল আমার ভাবনায় হানা দিচ্ছেন যখন তখন সময় অসময়ে।
——ভাবনায় আসার আবার সময় হয় নাকি!? আগে তো কখনো শুনি নি এমন কথা! এই প্রথম শুনলাম তোমার কাছে।
——উফফফ আপনি যে কী না!?
আপনি কী জানেন না যে ভাবনার গায়ে দুটো পাখনা থাকে ওরা চাইলেই যেখানে খুশি যেতে পারে।
——আচ্ছা বেশ বেশ এমন হয় না কি!?
—উফফফফ আপনি না কী যে! কিচ্ছুটি বোঝেন না!?
—কী বুঝবো!?
——থাক আপনার শুনে আর কাজ নেই।
—আহা রাগ করো কেন?
—রাগ করবো না তো কী?
——বলো কী বলছিলে যেন। আমার কাজগুলো এখন ডেস্কের একপাশে সরিয়ে রাখলাম। তোমার কথা শুনে তারপর আবার কাজ করবো বলো।
——আচ্ছা শুনুন তবে। আমার ভাবনা গুলো আমি আপনার কাছে পাঠাবো এই ঝিরিঝিরি ফাগুন বাতাসকে দিয়ে। আবার আপনি তার উত্তর পাঠাবেন আমায় ভোরের পূবালী হাওয়ার কাছে। বুঝেছেন কিছু? মানে মাথায় ঢুকলো ওই মোটা কাঁচের ফ্রেম ভেদ করে।
—সে আবার কী!? এমন কথা তো কখনো শুনিনি!!
—-বড়ো বেরসিক আপনি।
——কিছুই বোঝেন না। সব কিছু এত বুঝিয়ে বলতে হয় না আপনাকে বড়ো রাগ হয়।
——আমার বয়স হয়েছে নয়না। তোমায় এটা বুঝতে হবে তো! তোমার মতো ছেলেমানুষী ভাবনা আমি ভাবতে পারি না যে এই বয়সে।
——আহা সবসময় অমন বয়স বয়স করবেন না তো। বন্ধুত্বের আবার বয়স কী!?
——তা ঠিক।
—— এদিকে তা ঠিক বলছেন আবার বয়স বয়স করছেন! খুব বাজে আপনি জানেন তো! আমি আপনাকে বুঝিয়ে দেবো। তবে আপনাকেও বোঝার চেষ্টা করতে হবে তো!
—–আচ্ছা ঠিক আছে এবার থেকে আমি তোমার সব ভাবনাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করবো মনপ্রাণ দিয়ে।এবার রাখি নয়না। অনেকক্ষন কথা হলো। অনেক কাজ পড়ে আছে যে ডেস্কে।
আচ্ছা ঠিক আছে । আবার কাল দুপুরে। আমি অপেক্ষা করবো আপনার জন্য।
আচ্ছা নয়না অবশ্যই। আমিও।
আপনি ভালো থাকবেন।
তুমিও ভালো থেকো নয়না।
নয়না তোমায় যেটা বলতে পারলাম না , আমিও অপেক্ষা করি তোমার মেসেজের। মাঝেমাঝে দেখি ইনবক্সের সবুজ আলোটা জ্বলে আছে কি না? এই সুদূর প্রবাসে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনে তোমার মেসেজ গুলো আমায় সবুজ করে। আমি যে বলতে পারি না তোমায় এসব কথা। আমি বুঝি তোমার আমায় বোঝাতে চাওয়া কথা গুলো। ইচ্ছে করেই বুঝতে চাই না। ভয় হয় বড়ো। নিজেকেই ভয় পাই। তোমার সাজানো সংসার থেকে তোমায় বার করে আনতে চাই না যে। ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়‌। জানি কোনদিন বলতে পারবো না একথা। সারাজীবন তুমি যতই চেষ্টা করো  আমি কিছুতেই তোমায় বুঝতে দেবো না যে তোমার সব ভাবনাগুলো আমিও বুঝি। ইচ্ছে করে তোমার সব  আকাশকুসুম ভাবনার সাথে তাল মেলাতে। ইচ্ছে করে  তোমার সাথে ভাবনা সমুদ্রে ভাসতে। ইচ্ছে করে তোমার সাথে পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে বলতে  আমিও ভালোবাসি তোমায়। পাহাড়ী ঝরনার মতো খিলখিল করে হাসো যখন তুমি আমার ও  ইচ্ছে করে নয়না ওই ঝরনায় ভেসে যেতে… আমি শুধু তোমার মতো করে বলতে পারি না যে। তোমার মতো করে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারি না যে আমিও তোমায় ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি।
ভালোথেকো  নয়ন।
আমিও জানি  আপনি সব বোঝেন। আমায় বুঝতে দেন না। না দিন আমার কিছুই যায় আসে না তাতে। পরিপূর্ণ আর সবার কাছে একটি ঈর্ষনীয় সংসার থাকা সত্বেও আমি ভালোবেসে ফেলেছি আপনাকে। কেন? কী জন্য? আমি জানি না। শুধু জানি ভালোবেসে ফেলেছি।
দুজনেই এতদিনে বুঝে ফেলেছি আমরা একে অপরের মনে জায়গা করে নিয়েছি সবুজ দূর্বা ঘাসের মতো। তাও যদি এমন লুকোচুরি থাকে থাক। এতেই আমার ভালোলাগা।
আর হ্যাঁ একটা কথা বলতে ভুলেই গেলাম। বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়ার গাছটা আগুন লাল হয়ে উঠেছে জানেন অর্জুন।
ভালো থাকবেন আপনিও।
দুটো সবুজ আলোর একটা নিভে গেলেও প্রবাসী সবুজ আলোটা জ্বলে রইলো অনেকক্ষন। অনেকটা সময় নিয়ে সবুজ আলোর পেছনে একটা মালাগাঁথা হলো বিনিসুতোয়। কেমন করে জানি অর্জুনের কাছেও খবর গেছিলো নয়নার কৃষ্ণচূড়ার গাছটা আগুন লাল হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত