যুগাবসান

জয়ন্ত ঘোষাল

 

জীবনের সমস্ত নি:শ্বাস খরচ করে ফেললেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। চলে গেলেন। সেনা হাসপাতালে কোমায় ছিলেন। তারপর আজ বিদায়৷ চির বিদায়। এক অজাতশত্রু রাজনৈতিক নেতা যিনি চিরকাল ভারতীয় বহুত্ববাদে বিশ্বাস রেখেছেন। সংঘাত নয়, ঐক্যের রাস্তায় হাঁটতে চেয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা রেখেছেন। নিজের অ্যাটাচিতে সবসময় রাখতেন নীল রঙের একটা ছোট্ট ভারতীয় সংবিধান। একবার আমাকে বলেছিলেন, দেশ চলছে। কেউ শাসক দল, কেউ বিরোধী৷ কিন্তু প্রশাসনের হয়ে প্রতিমুহুর্তে এই সংবিধানটাই কাজ করে। নীরবে। নি:শব্দে।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ছোট্ট গ্ৰাম মিরাটির সেই ছোট্ট বালকটি কী ভাবে একদিন রাজধানী শাহি দিল্লি এসে পৌছলেন, কীভাবে তিনি প্রবেশ করলেন রাইসিনা হিলসের প্রাসাদে?

প্রণব মুখোপাধ্যায় আজ দিল্লির সেনা হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তাঁর অসুস্থতার খবরে গোটা দেশের মানুষ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহৎ বাঙালি সমাজও উদ্বেগে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছিল। ছোটবেলায় নাম ছিল পল্টু। বর্ষার সময় বাড়ি থেকে বহু দুরের স্কুলে পৌঁছনোর জন্য চাষের মাঠের আল ধরে হেঁটে হেঁটে যেতে হত তাঁকে। বৃষ্টি হলে জামা আর হাফপ্যান্ট দু’টোই স্কুলে সেটা আলাদা করে ব‍্যাগের মধ্যে রেখে যেত, পাছে সারাদিন ভেজা জামাকাপড় পরে থাকতে হয়। সেই বালক দেশের অন‍্যতম অর্থমন্ত্রী হলেন, একবার নয়, দু’বার। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর অর্থমন্ত্রী, পরণে গলা বন্ধ কোর্ট, মুখে পাইপ। আবার মনমোহন সিংহের অর্থমন্ত্রী ও হয়েছেন তিনি।

তবু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি স্থায়ী সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তিনি ইন্দিরার নম্বর টু। তিনি নরসিংহ রাওয়ের নম্বর টু। আবার মনমোহন সিংয়ের ও নম্বর টু। তাই বারবার এই নম্বর টু হওয়াটা বোধহয় প্রণববাবুর কাছে সন্তোষের কারণ ছিল না। বিশেষত মনমোহন যেদিন প্রধানমন্ত্রী হলেন। সনিয়া যেদিন মনমোহনকে মনোনীত করলেন, সেদিন তাঁর মুড ভালো ছিল না। তিনি আশা করেছিলেন সেবার বাজপেয়ীরাজের অবসানের পর কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় এল তখন তিনি নিশ্চই বেস্টচয়েস। এরকম একটা দিনে আমি দিল্লির ১৩ তালকোটরা রোডে তাঁর বাড়িতে পৌঁছলাম। বললাম, দাদা, কনগ্ৰাচুলেশনস! আপনি আবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। আবার নম্বর টু অফ দ‍্য ক‍্যাবিনেট। মনে আছে, নম্বর টু এ শব্দটা শুনেই তিনি হুট করে রেগে গেলেন। বললেন, ‘হোয়াট নম্বর টু? প্লিস ডোন্ট ফরগেট আই ওয়াস দ‍্য নম্বর টু অফ মিসেস ইন্দিরা গান্ধী।’ আমি বসলাম। বুঝলাম, যে মনমোহন সিংহ ছিল তাঁর নম্বর টু, তিনি অর্থমন্ত্রী আর মনমোহন রিজার্ভ ব‍্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর। চিরকাল এই টেকনোক‍্যাট-প্রশাসক। ওকে স‍্যার বলেছেন যিনি, তিনিই আজ প্রধানমন্ত্রী। আর প্রণববাবু তার অধিনস্ত। এটা এত সহজে মেনে নেওয়া ওরপক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

হুট করে রেগে গেলেও পারদ আবার দ্রুত পড়ে যেত। তারপরই বললেন, মুড়ি খাবি? বললাম, খাবো। মনমোহন অবশ্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাকে স‍্যার বলতেন। মনে আছে নরসিংহ রাও যখন প্রধানমন্ত্রী আর মনমোহন অর্থমন্ত্রী হলেন, তখন প্রণববাবু যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান, তখন প্রণববাবু কোনও দিন নর্থব্লকে অর্থমন্ত্রীর ঘরে যাননি, মনমোহন নিজেই আসতেন যোজনা ভবনে প্রণববাবুর সঙ্গে দেখা করতে।

ইন্দিরা প্রণববাবুকে বলেছিলেন দ‍্যাখো প্রণব, একটা ছফুট লম্বা লোককে চারদিন না খাইয়ে রাখলে সে লোকটা রোগা হয়ে যেতে পারে, তার ওজন কমে যেতে পারে কিন্তু তার উচ্চতা কিন্তু তুমি কমাতে পারো না। রাজনৈতিক স্টেচার বা মর্যাদা হল মানুষের এই উচ্চতার মত। কখনই এই উচ্চতা কমাবে না। খর্বকায় প্রণববাবু তাই এই আত্মমর্যাদা সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। ইন্দিরা যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তাঁকে আদালত হাজির হতে হচ্ছে, কেননা কমিশন লাগানো হয়েছিল ইন্দিরার বিরুদ্ধে। সেদিন প্রণব ইন্দিরাকে ছেড়ে যাননি। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আদালতেও যেতেন শুনানির সময়। ইন্দিরাও ক্ষমতাচ্যুত হয়েও এই মর্যাদাকে কখনও বিসর্জন দেননি। প্রণববাবু ছিলেন ইন্দিরার ভাবশিষ‍্য।

প্রণববাবুর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের দিনটা খুব মনে পড়ে। ১৯৮৫ সাল। প্রণববাবুকে দল থেকে বহিষ্কার করেছেন রাজীব গান্ধী। রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে এক পৃথক দল তিনি গঠন করেন‍। আমি তখন বর্তমান খবরের কাগজের এক নবীন সাংবাদিক। আমি থাকতাম কলকাতার যমজ শহর হাওড়ায়। পৃথক জেলা হাওড়ায় প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অমিয় দত্ত ওরফে পাল্টুদা ছিল প্রণববাবুর বিশেষ ঘনিষ্ঠ। তিনিও কংগ্রেস দল ছেড়ে প্রণববাবুর নতুন দলের জেলা সভাপতি হন। অমিয়দা প্রণববাবুর সঙ্গে আমার অ্যাপয়নমেন্ট করে দেন। আমি স‍্যাদার্ন অ্যাভিনিউতে ওর ফ্ল্যাটে গেলাম। দোতলায় বৈঠকখানায়, একটা ছোট্ট ডিভানের ওপর বসেছিলাম।

সকাল আটটায় অ্যাপয়নমেন্ট। আধঘণ্টা আগেই পৌঁছে গেছিলাম। তারপর বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। নার্ভাস ছিলাম। হাওড়া থেকে বাসে করে দক্ষিণ কলকাতায় গেছি। আমার তো সেদিন গাড়ি ছিল না। যদি পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। কদিন আগেও তো লোকটা দেশের অর্থমন্ত্রী ছিল। সম্পাদক মশাই ওর খুব ঘনিষ্ঠ। কত গল্পো শুনেছি ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে।

প্রণব তখন রাজীব গান্ধীর তীব্র সমালোচক। কিন্তু কোনও দিনই তিনি সংঘাতের রাজনীতি করার লোক ছিলেন না। তাই আবেগ তাড়িত হয়ে নতুন দল করলেন শুরু করলেন জেলাওয়ারি সফর। আমি ওর সঙ্গে জেলায় জেলা যাওয়া শুরু করলাম। সত্যি কথা বলতে কি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হয়েও তার আগে অন্য কোন জেলা কেন, হাওড়া জেলার মহকুমা উলুবেড়িয়া পর্যন্ত যাইনি, প্রণববাবুর নতুন দলের জমানাত বাজেয়াপ্ত হল। সেবার বিধানসভা নির্বাচনে তিনি পর্যদুস্ত হলেন। কিন্তু আমার প্রতিটি জেলাকে চেনা হল, জানা হল। প্রণববাবু জেলায় গিয়ে যখন বক্তৃতা দিতেন তখন এত অভিমান এত ক্ষোভ তবু রাজীব গান্ধীর বিরোধিতা করতেন না। তিনি বলতেন, কয়েকজন রাজনৈতিক ম‍্যানেজার অনভিজ্ঞ রাজীবকে বিপথে পরিচালিত করছেন। রাজীব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অরুণ সিং আর অরুণ নেহেরু এই দুই চরিত্র ভারতের রাজনীতিতে এলেন। পরে দু’জনেই রাজীবের বৃত্ত থেকে সরে গেলেন। অরুণ নেহেরু তো শক্রুপক্ষে যোগ দিলেন। প্রণব ফিরে এলেন কংগ্রেসে।

সেদিন কোনও এক সংবাদ চ‍্যানেল জিজ্ঞাসা করছিলেন ভারতের রাজনীতিতেপ্রণববাবুর প্রধান অবদান কী? আমি বললাম, কোন কোন নীতি তিনি মন্ত্রী হিসেবে প্রণয়ন করলেন? পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সাফল্য থেকে WTO চুক্তিতে ভারতের স্বার্থরক্ষা বা বিদেশনীতির সাফল্য- একটা বিরাট তালিকা তৈরি করা যায়। কিন্তু এসবই মাইক্রোডিটেলস। কিন্তু প্রণববাবু নামক রাজনৈতিক ব‍্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় অবদান হল তাঁর ঐক‍্যমত রচনার চেষ্টা। ১৩৫ কোটি মানুষের দেশ ভারত। নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান। এ দেশে চাই রাজনৈতিক পরমত সহিষ্ণুতা। ভারতীয় বহুত্ত্ববাদ ভারতের বৈচিত্র্য কে রক্ষা করে।

প্রণববাবু একজন হিন্দুধর্মী। শুধু দার্শনিক স্তরে নয়, ব‍্যক্তিগত ভাবে তিনি হিন্দুধর্মের বহু আচারও
মেনে চলেন। সকালবেলা তিনি নূন্যতম এক ঘন্টা চন্ডীপাঠ করতেন। বাড়িতে পুজোপাঠ লেগেই থাকত। পৈতে ধারণ করতেন। গরদের চাদরধুতি পরে তিনি পুজোয় বসতেন। দূর্গাপুজোর সময় নিয়মিত নিজের গ্ৰামে গিয়ে পুজো করতেন। কিন্তু তিনি হিন্দু হয়েও কোনও দিন সংখ্যালঘু জনসমাজের বিরুদ্ধে রাজনীতিকে পশ্রয় দেননি। জঙ্গীপুর নামক যে লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনি দু’দুবার জেতেন, সেই জঙ্গীপুর ছিল মুসলিম প্রধান এলাকা। সারাজীবন প্রণববাবুর একটা দুঃখছিল সেটা, তিনি লোকসভা ভোটে জিততে পারেন না। হেরে যাওয়ার পরও ইন্দিরা তাকে গুজরাত থেকে রাজ‍্যসভার সদস্য করেছেন। প্রবীণ বয়েসে তাই লোকসভা ভোটে জেতা ছিল ওঁর জীবনের এক মস্তবড় স্বপ্নপূরণ।

জঙ্গীপুর কেন্দ্রটি সম্পর্কে তার আবেগ সম্পর্কে ওঁর ঘনিষ্ঠ এক নেতা একদা আমাকে বলেছিল, জানো এ হল কত্তার সন্তান। এই সন্তানের প্রতি স্নেহ তাই সবচেয়ে বেশি। দুরকমের রাজনৈতিক নেতা দেখেছি। একধরনের নেতা যারা জনপ্রিয়। মেঠো। গ্ৰামীন বামাটির বা জনসংযোগ খুব বেশি। কিন্তু এই নীতি প্রণয়নের জন্য যে দার্শনিক সভার প্রয়োজন তা এদের থাকে না। এরা প্রাজ্ঞ। এরা দূরদর্শী হন। আদর্শ হচ্ছে যদি কোনও নেতার মধ্যে এই দুই বৈশিষ্ট্যের সুষ্ঠ মিলন হয়। অনেক জনপ্রিয় নেতা নবীন বয়সে না হলেও ধীরে ধীরে ক্ষমতাসীন হয়ে অভিজ্ঞতার মধ‍্যে দিয়ে প্রজ্ঞার পথে হাঁটেন। আবার কিছু প্রজ্ঞবান নেতা হন যারা ক্ষমতাসীন হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে চান। জীবনের পাঠশালায় তিনি ঋদ্ধ হতে চান। আমি তোমাদেরই লোক‌। প্রণববাবু প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক ব‍্যক্তিত্ব কি জঙ্গীপুর থেকে জয়লাভের পর তিনি মানুষের জননেতা হতে আগ্ৰহী হন।

মনে আছে প্রণববাবু যোজনা কমিশনের দায়িত্ব পাওয়ার পর যোজনা বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব অর্থমন্ত্রক দিলেও রাজি হননি। আর তিনি পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন‍্যও সচেষ্ট হন। তিস্তা নদীর জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের খুব উপকার হবে। তিনি এ খবরটা প্রচার চেয়েছিলেন। সেসময় তিনি বলেছিলেন, অশোক মিত্র রাজ‍্যের অর্থমন্ত্রী হয়ে রাজ‍্যে এমন প্রচার করেছিলেন যে, আমি বাংলাকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য টাকা দেয়নি। সিপিএম তো রাজ‍্যে এই বঞ্চনাকে এক মস্ত বড় ইস‍্যু করল। প্রণববাবু এই ভাবমূর্তি বদলাতে চাইছিলেন। ক্রমশ সচেতন ভাবে তিনি শিক্ষিত জনভিত্তিহীন নেতা থেকে মানুষের নেতা
হয়ে ওঠেন।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত