Epilepsy or repetition of history 2022

মহামারী সংখ্যা: অতিমারী অথবা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি । আশিস দাস

Reading Time: 4 minutes

মহামারীর ইতিহাস অনেক পুরনো। পৃথিবীতে বারবার মহামারী এসেছে আর শেষ হয়েছে অগনিত প্রাণl আজ পৃথিবী এক ভাইরাসের মারণখেলায় বিপর্যস্ত, ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে অসংখ্য প্রাণ। ভাইরাসের মারণখেলা এই পৃথিবী আগেও দেখেছে এবং যদিও আজ বিশ্ব অনেক উন্নত কিন্তু মহামারী আক্রান্ত পৃথিবীর দৃশ্য বোধহয় সব কালেই এক। অমিতাভ ঘোষ তাঁর সদ্য প্রকাশিত ” Gun Island” উপন্যাসে লিখেছেন যে,১৬২৯ সালে জার্মান সেনারা ইতালীর মিলান শহরে ভয়ঙ্কর প্লেগ রোগের ভাইরাস বয়ে আনলেন,সমগ্র মিলান শহরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়লো,কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়লো শহর থেকে শহরে। মৃত্যু হলো হাজার হাজার মানুষের, তারপর মৃত্যু হানা দিলো ভেনিস শহরে। ১৬৩০ সালে ভেনিস শহরে এই রোগ ভয়াবহ রূপ ধারন করলোl সাধারন মানুষ,অভিজাত শ্রেনী, পুরোহিত শ্রেনী, কেউই এই রোগের আক্রমন থেকে রেহাই পেলোনাl যে নৌকা বা ডিঙ্গি একসময় মানুষের যাতায়াতের বাহন ছিল, সেই ডিঙ্গি বা নৌকা হয়ে উঠলো শব বহনের মাধ্যম। নদী নালা, খাল বিল, মৃতদেহে ভরে গেলো। শহরের যে স্থানে একসময়ে চিত্র প্রদর্শনী হতো সেই সব স্থানে দেখা গেল মৃতদেহের স্তুপ। শহরে কারফিউ জারি হলো, সংক্রমন ঠেকানোর জন্যে আক্রান্ত ব্যক্তি কে পাঠানো হলো Quarentine centre এ। রাস্তাঘাট জনশূন্য হলো, লোক চলাচল বন্ধ,শুধু সেনাবাহিনীর লোকজন দেখা যেতো মাঝে মাঝে। কিছু রাস্তা দীর্ঘদিন জনশূন্য থাকার ফলে রাস্তার মাঝখানেই গাছপালা গজিয়ে উঠলো। প্লেগ আক্রান্ত মানুষজন কে পাঠিয়ে দেওয়া হলো অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে,যাকে বলা হতো Lazaretto Vecchio কিন্তু কিছুদিন পর সেইসব জায়গায় দেখা যেতো হাজার হাজার কঙ্কাল! এরপরেই লেখক লিখেছেন,” It has not changed in centuries”,অর্থাৎ শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে কিন্তু দৃশ্যপটের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

ঠিক একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ফ্রান্স অধিকৃত আলজিরিয়ার ওরান শহরেl প্লেগ কবলিত ওরান শহরে সেদিন ও মৃত্যু অতি পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। ডাক্তার,নার্স সহ বহু স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছিল, মৃত্যু হয়েছিল কবরখানার কর্মচারী দেরl নদীর জলে মৃতদেহ ভেসে যাবার দৃশ্য দেখে আজ আমরা চমকে উঠি কিন্তু সেদিন ও এই দৃশ্য খুবই পরিচিত দৃশ্য ছিল।

Albert Camusতাঁর “The Plague” উপন্যাসে বলেছেন যে কিছুদিন অতিক্রান্ত হবার পর মৃত্যুর এই ভয়ঙ্কর রূপ মানুষের কাছে এক অতি পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠলো এবং এইসব ক্ষেত্রে মানুষ তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতেও ভুলে গেল। মানুষ যেন অদ্ভুত রকমের উদাসীন হয়ে গেলl Camus এই অভিব্যক্তি কে ‘Sang Froid’ বলে অভিহিত করেছেন।’ Sang Froid’ হলো সেই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার নাম যখন মানুষ দুঃখ কষ্ট, শোক সন্তাপের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে ভুলে যায়। Albert Camus এই ধরনের উদাসীনতাকে “Stolid indifference” ও বলেছেনl আজ আমরাও আমাদের মধ্যেও এই ধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করছি। চারদিকে এত মৃত্যু, চেনা জানা,আত্মীয় পরিজন চলে যাচ্ছে কিন্তু আমরা যেন সবই মেনে নিচ্ছি। একথা ঠিক যে মেনে না নিয়ে আমাদের উপায় নেই,তবু আমাদের কাছে সব ই যেন কি রকম গা-সওয়া হয়ে গেছে, অগনিত মৃত্যু বোধহয় আমাদের অনূভুতি কে ভোঁতা করে দিয়েছে, যেমন সেদিন ফ্রান্স বা ইতালীর মানুষের মধ্যে ও দেখা গিয়েছিল। এই অবস্থা দেখে W. B .Yeats এর একটা কবিতার লাইন খুব মনে পড়েl তিনি লিখেছেন, “Too long a sacrifice can make a stone of the heart “,অর্থাৎ অতিরিক্ত কষ্টে মানুষের হৃদয় পাথর হয়ে যায়l আজ আমাদের হৃদয় ও হয়তো সব অনূভুতি হারিয়ে পাথর হয়ে গেছে।

যুদ্ধ,মহামারী বা মন্বন্তর, এই সব ক্ষেত্রেই অনেক কিছুর সঙ্গে আরো যা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তা হলো মানবিকতাl মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো মানবিকতা,কিন্তু আমরা দেখেছি যে অনেক ক্ষেত্রেই,প্রাণের দায় এই হোক বা অন্য কোনো কারনেই হোক, আপৎকালে মানুষ অনেকসময়েই তার মনুষ্যত্বের প্রমান রাখতে পারেনিl এই ধরনের অমানবিকতার ইতিহাস অনেক পুরনো এবং তার দৃষ্টান্ত আজো বর্তমান।

সদ্য সমাপ্ত সাধারন নির্বাচনে ভোট কর্মী হয়ে যে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলাম, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক অফিসার একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন,উনি নিজে সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। একটা দোতলা বাড়ির ব্যলকনি থেকে প্লাস্টিকে মোড়া এক বৃদ্ধের মৃতদেহ অতি সন্তর্পনে দড়ি বেঁধে নীচে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছেl বাড়ির সব দরজা জানলা বন্ধ,শত ডাকাডাকি সত্বেও কারো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে নাl বৃদ্ধ ছেলে বৌমার কাছেই ছিলেন শেষবয়সেl আমার অতি পরিচিত এক বৃদ্ধা করোনা আক্রান্ত হবার পর ওনার ছোটছেলে মা কে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এলো,কিন্তু তারপর বাড়ির আর কেউ হাসপাতাল মুখো হলো না। কয়েকদিন পর বৃদ্ধার মৃত্যু হলো এবং সরকারী ব্যবস্থাপনায় সৎকার ও হলো হয়তো,কিন্তু বৃদ্ধার পুত্রকন্যা রা ওদের মা কে শেষ দেখা দেখতেও গেল না। এই ধরনের ঘটনার উদাহরন অন্তহীনl আমরা সভ্যতার শিখরে পৌছেছি কিন্তু জীবনের কোনো এক পর্যায়ে বোধহয় আমরা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। মহামারী একদিন শেষ হবে কিন্তু অমানবিকতার এই সব কাহিনী মুছে যাবে না, নিরেট পাথরের মতো জেগে থাকবে হাজার পরিবর্তনের মাঝেওl এ যেন কবি W .B Yeats এর ভাষায়,”The stone’s in the midst of all”

সেদিনের মহামারীর সাথে আজকের মহামারীর অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় মৃতদেহ সৎকার বা শেষকৃত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে। সেদিন ও মৃতদেহ সৎকারের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল এই অদ্ভুত ধরনের ব্যাস্ততা বা দ্রুততা। রোগাক্রান্ত হবার পর যেকোনো মানুষ ই একা, আত্মীয় পরিজন বিচ্ছিন্ন, রোগ ছড়াবার ভয়ে সে তখন isolated বা একা এবং বিচ্ছিন্ন, পরিবারের লোকেরাও quarentine এ, সুতরাং মৃত্যুর সময়ে কেউ কাছে নেই। Camus লিখেছেন যে,” The plague victims died away from his family and the customary vigil beside the dead body was forbidden “এই দৃশ্য আমরা এবারেও দেখলাম,আত্মীয় পরিজন দের হাতে মৃতদেহ দেওয়ার কোনো নিয়ম ই নেই, শেষ দেখা দেখতে চাওয়াও নিয়ম বিরুদ্ধ! সৎকার যা হবে সেটা সরকারী ব্যবস্থাপনায় হবে। এরপর যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় মৃতদেহ সৎকার হয় সেটাও খুবই অস্বাভাবিক। Camus লিখেছেন, ” the whole process was put through with the maximum of speed and minimum of risk “এই ধরনের শেষকৃত্য কে Camus বলেছেন,”lightning funeral”। এই দৃশ্য কি আজ আমাদের কাছেও পরিচিত দৃশ্য নয়? কিন্তু এই দৃশ্য ও মানুষের মনে কোনো দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করেনা কেন? তার কারন যেহেতু মহামারী কালে অন্নাভাব দেখা দেয় এবং মানুষ অন্ন সংস্থানের চিন্তায় এতই বিব্রত হয়ে পড়ে যে, মৃতের কিভাবে সৎকার হলো সেই দিকে নজর দেবার মতো অবস্থা থাকেনা। Camus বলেছেন, “The people had no time to think of the manner in which others were dying, এবং সৎকার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ” actually the most striking feature of our funeral was their speed.” এই দৃশ্য কি আজ ও সত্যি নয়? আজ থেকে কয়েক শো বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে আজকের ঘটনার কত মিল! যেন এ সব ই সেদিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি l এ সব ই যেন re- enactment of historical events বা বলা যায় re-creation of history! শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে কিন্তু ইতিহাস যেন একই ভাবে,তার নিজস্ব নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে আজ ও।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>