অ্যাভিয়ন থেকে প্যারিস

Reading Time: 8 minutes

৪৮তম ডান্স কংগ্রেস হবে অ্যাভিয়নে। ফ্রান্সের এক ছোট শহর। আন্তর্জাতিক ডান্স কংগ্রেসের অ্যাভিয়ন শাখা আয়োজন করেছে ডান্স কংগ্রেসের। আগে জার্মানি ও গ্রিস গিয়েছি। খুব টানে ফ্রান্স। শিল্প-সংস্কৃতির হুল্লোড় সেখানে। ৪৮তম ডান্স কংগ্রেসের আমন্ত্রণ তো পেলাম কিন্তু রসদ জোগাবে কে! আগের বারে আইসিসিআর বিমানের টিকিট দিয়েছিলেন। এবারেও দেবেন কী! মাসখানেকের মধ্যে আবেদন মঞ্জুর হল। আমার আর সন্দীপনের টিকিট তাঁরা দেবেন। এবার বাসস্থানের প্রশ্ন। প্যারিসের ভারতীয় দূতাবাসের কাছে পাঠালাম মেল। তাঁরা শ্রীরঙ্গনাথনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। দক্ষিণ ভারতের এই মানুষটি অ্যাভিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা। ‘আত্মা’ নামে যোগ ব্যায়ামের বিরাট স্কুল তাঁর। বিয়ে করেছেন এক ফরাসি নারীকে। রঙ্গনাথন জানালেন তিনি তাঁর যোগাসন কেন্দ্রের একটা ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করবেন। ‘আত্মা’ হবে আমাদের পরমাত্মীয়। বেহালার কোন দোকান থেকে প্যারিসের সিমকার্ড কিনে আনল। প্যারিসের বিমান বন্দরে নামার পরে এই সিমকার্ড থেকে আমরা কলকাতায় ফোন করতে পারব।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Avian to Paris


সন্ধ্যেবেলা বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে আমরা সোদপুরের বাড়ি থেকে চলে এলাম পর্ণশ্রীর বাড়িতে। এখান থেকে ভোরবেলা বেরোতে সুবিধে হবে । আমার মা-বাবাও ছাড়তে গেলেন বিমান বন্দরে। কিন্তু গেট থেকেই ফিরে যেতে হল তাঁদের। নতুন নিয়মে যাত্রী ছাড়া আর কেউ ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। এ্য়ার ইন্ডিয়ায় পৌনে দশটায় এলাম দিল্লি। ঘন্টা তিনেক বাদে প্যারিসের বিমান। বিমানটি আকারে বিশাল। সেদিন কোন কারণে যাত্রী কম। একবার এধার থেকে ওধার করে, সিনেমা দেখে কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে দিলাম। না, তাও কাটত না। একা একা দীর্ঘ বিমানভ্রমণ যে কী রকম বিচ্ছিরি, সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। এবার আমি একা নই। সন্দীপন আছে। সে মাঝে মাঝে ফোড়ন কাটছে। আমি খুনসুটি করছি।

বিকেল ৬টা ২০ তে পৌঁছালাম প্যারিস বিমান বন্দরে। এ বিমান বন্দরের অন্ত্য নাই গো নাই। এখান থেকে যেতে হবে টিজিভি ট্রেনের স্টেশনে। কীভাবে, কোথা দিয়ে যাব জানি না কিছু। হাতে মাত্র ১ঘন্টা ২৫ মিনিট। যে টিজিভি ট্রেনের টিকিট দেওয়া হয়েছে, সেটা ধরতে না পারলে সর্বনাশ। স্টেশনের সব লেখা ফরাসিতে। লোকজনকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। সেই ফরাসি। গোলোকধাঁধা ভেদ করার চেষ্টা করছি। এই সময়ে ফরাসি বন্ধু কিকি বা ক্রিস্টেলের ফোন এল। বাংলা-ইংরেজি মেশানো বিচিত্রভাষায় সে ফোনে বলল : নো ভয়, নো চিন্তা। স্টেশনের ম্যাপ দেখছি আর প্রবলবেগে হাত-পা নেড়ে মানুষজনের কাছে স্টেশনের হদিশ চাইছি। ভারি ভারি দুটো ব্যাগ বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে। এসকেলেটরে উঠতে গিয়ে নাভিশ্বাস । ভাগ্যিস এক সহযাত্রী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

কোনক্রমে স্টেশনের হদিশ পাওয়া গেল। গেটের মুখে ব্যাগ রেখে দোতলায় উঠে বসলাম। একটু পরেই ছেড়ে দিল ট্রেন। আর একটু দেরি হলেই বারোটা বাজত। প্যারিস থেকে অ্যাভিয়ন ৬৯০ কিলোমিটার। মাত্র তিন ঘন্টায় আমরা চলে যাব সেখানে। ভাবা যায়! এই ট্রেনে নাকি ডেলি প্যাসেঞ্জাররা যাতায়াত করেন। তাঁরা আরাম করে বসে খাওয়া-দাওয়া শুরু করেছেন। আমাদেরও বড্ড খিদে পেয়েছে। কিন্তু খাদ্য যে বাক্সবন্দি! গন্ধ শুঁকে খিদে মেটানোর চেষ্টা করতে লাগলাম।

সন্দীপন বলল, ‘কী রে, ট্রেন চলছে তো !’ চলছে তো নিশ্চয়ই। একেবারে ঝড়ের বেগে চলছে। কিন্তু ভেতরে বসে সেই চলাটা বোঝা যাচ্ছে না একটুও। অ্যাভিয়নে নামার সমস্যাও আছে। শুনে বা পড়ে যে স্টেশনটা বুঝতে পারব তার উপায় নেই। ভাযার সমস্যা, তাই অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও সাহায্য পাওয়া যাবে না। তাহলে! স্টেশন যদি পেরিয়ে যায়! ভরসা একটাই। এসব দেশে ‘নটার ট্রেন কটায় যাবে’ চলে না। এরা সময়নিষ্ঠ। অ্যাভিয়নে রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে পৌঁছানোর কথা। ১০টা ৪০এ আমরা গেটের কাছে যাব। কিন্তু স্টেশনে কেউ যদি নিতে না   আসে! এই শীতের রাতে যাব কোথায়! কলকাতা থেকে বাবার ফোন এল। এর মধ্যে তিনি মেল চালাচালি করে ড্যান্স কাউন্সিলের শ্রীমতী কারমন্ট আর রঙ্গনাথনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছেন। বাবা জানালেন রঙ্গনাথন আর তাঁর স্ত্রী আমাদের নিতে আসবেন স্টেশনে। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। ১০টা ৪০এ আমরা গেটের কাছে। একজন টিটির কাছে জানা গেল অ্যাভিয়ন স্টেশন আসছে।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Avian to Paris


জান্বুবানমার্কা স্যুটকেসদুটো কোনক্রমে সিঁড়ি দেয়ে নামালাম। নিঝুম শীতের রাতে পা দিলাম এক অপরিচিত স্টেশনে। নামতেই ঠান্ডা বাতাস প্রবলবেগে আলিঙ্গন করল আমাদের। কাঁপতে লাগলাম হি হি করে। হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার নাম ধরে ডাকছেন কেউ। চিনতে অসুবিধে হল না রঙ্গনাথনকে। নেটে তাঁর ছবি দেখেছি। বাবা একটা প্রিন্ট আউটও ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমার হাতে। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী আমাদের নিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে তাঁদের গাড়িতে ওঠালেন। মিনিট দশেকের মধ্যে এলাম ‘সেন্টার আত্মায়’। একতলার একটা ঘরে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেলেন তাঁরা। জানিয়ে গেলেন রান্না-বান্নার সরঞ্জাম ও হিটার আছে। জামা-কাপড় বদলে, স্যুটকেস থেকে চিকেন স্যুপের প্যাকেট খুলে স্যুপ বানিয়ে ক্ষুণ্ণিবৃত্তি নিবারণ করে, হিটার জ্বালিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। আমার মাথায় বেশ যন্ত্রণা। হয়তো ঠান্ডার জন্য। এর মধ্যে এক পাক ঘুরে এসেছে সন্দীপন। টিফিন করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। অ্যাভিয়ন দঃপূঃ ফ্রান্সের ছোট এক শহর। রোনে নদীর বাঁদিকে। ১৩০৯-১৩৭৭ পর্যন্ত অ্যাভিয়ন ছিল ক্যাথলিক পোপের কর্মস্থল। ১৭৯১ সালে শহরটি ফ্রান্সের অর্ন্তভুক্ত হয়। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো অ্যাভিয়নকে হেরিটেজ শহরের মর্যাদা দিয়েছে।

বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় মাথার যন্ত্রণা বেড়ে গেল। কিন্তু উপায় নেই। ডান্স কংগ্রেসের অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। যেতে হবে মিউজিক কনভেটরি। সেখানে আমার লেকচার ডেমোনেস্ট্রেশন। রবীন্দ্রনাথের নৃত্য-গীতে ডান্স থেরাপির উপাদান নিয়ে বললাম। শ্রোতা হাতে গোনা। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে গিয়ে বেশির ভাগ মানুষ যেমন ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে, এখানেও তেমনি।

সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি রোদ উঠেছে। হাওয়াও নেই। মাথার যন্ত্রণাও ভ্যানিশ। বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরিয়ে পলাম। অন্য একটা রাস্তা দিয়ে আমরা এলাম পোপের প্রাসাদের পেছন দিকে। প্রাসাদের চারদিকে মধ্যযুগের প্রাচীর। এখানে প্রায় প্রতিটি রাস্তায় দেখি থিয়েটার হল। হলগুলো ছোট, কিন্তু ছিমছাম। ছোট জাদুঘরও অনেক। টিকিট কেটে একটা জাদুঘরে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম মৃত পশু-পাখির সংগ্রহ। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অন্যরকম।

রাস্তায় একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হল। একটা মোড়ের মাথায় ফুলবাগিচার পাশে বসে আছি। দেখি এক ভদ্রমহিলা তাঁর কুকুর নিয়ে বেরিয়েছেন। কুকুরটি পটি করল। ভদ্রমহিলা বসে পড়ে হাতে গ্লাভস পরে একটা প্লাস্টিকে পটি ভরে ময়লা ফেলার ড্রামে ফেলে দিলেন। রাস্তা পরিচ্ছন্ন রাখার এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যেস আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি।

পরের দিন ওয়ার্কশপ ছিল। সেখানে না গিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ঘুরতে ঘুরতে এলাম পোপের প্রাসাদের   কাছে। পাহাড় কেটে তৈরি প্রাসাদ। পাশে সুন্দর বাগান। পায়ের তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে রোনে নদী। সামনে আর একটা পাহাড়। তার মাথাটা বরফে ঢাকা। এই পাহাড়ের মাথা থেকে না কি দেখা যায় সাতটা শহর। পাহাড়ি পথ দিয়ে আমরা এলাম অ্যাভিয়নের নতুন শহরে। রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া ছুটছে। সন্দীপন বলল,’রাস্তা পেরিয়ে ওদিকে যাব আমরা।’ কিন্তু চলন্ত গাড়ি-ঘোড়ার ভিতর দিয়ে যাব কী করে! সন্দীপন বলল, ‘ আমরা রাস্তা পেরোতে গেলে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে।’ হলও তাই । যেন ম্যাজিক। রাস্তা পেরোতেই দেখা হল রোনে নদীর সঙ্গে। পারাপারের জন্য লঞ্চ আছে। নদীর অপর পারে ঘন সবুজ বন। সবুজ আর সবুজ। জুড়িয়ে গেল চোখ। সবুজ সেই পটভূমিতে অনেক নারী-পুরুষ-শিশু। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ সাইকেলে ঘুরছে। আজ শুক্রবার। আজ দুপুর থেকে কর্মবিরতি। সপ্তাহের শেষ দুটি দিন কাজ থেকে মুক্তি। পরিবারকে সময় দেয় মানুষ। বেরিয়ে পড়ে কাছে-পিঠে। ঘন্টা দুই সবুজ পটভূমিতে কাটিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। সন্দীপন আবার ম্যাজিক দেখিয়ে গাড়ি থামাল। রাস্তার দোকান থেকে তার্তিয়া রুটিতে লেবানিজ স্টাইলে মাংস দেওয়া খাবার খেলাম। ঠিক করলাম বাসায় ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোব। রাতের অ্যাভিয়ন দেখব। রাতের অ্যাথেন্স দেখার সুযোগ হয়েছিল সেবার। হেলায় হারিয়েছিলাম সে   সুযোগ। কিন্তু বিছানায় শরীর এলিয়ে দেবার পর ঘুম টেনে নিল আমাদের।

পরের দিন আমার কথ্থক নাচের অনুষ্ঠান ছিল। সারাদিন কেটে গেল ব্যস্ততার মধ্যে। রাত নটা নাগাদ শেষ হল অনুষ্ঠান। শীতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ফিরলাম। পরের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখি ঝকঝকে আকাশ, রোদ্দুর, আর হিমেল বাতাস। বেরিয়ে পড়লাম টিফিন করে। আজ শনিবার। নির্ভেজাল ছুটির দিন। আজ কোন কাজ নয়। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, দোকান-পাট সব বন্ধ। সকালবেলা চার্চের দিকে চলেছেন মানুষ। আমরাও হাঁটছি। চলতে চলতে সন্দীপন গান ধরল হেঁড়ে গলায়। তাকে থামাবার চেষ্টা করতে আমাকে বকে দিলেন এক ফরাসি বৃদ্ধা। এই ছুটির দিনে, এই ব্যাকরণ না- মানার দিনে কোন বাধা নয়। এরা কাজ করে, আবার এরা ছুটি উপভোগ করতেও জানে।

আমরা ডান্স কাউন্সিলের অফিসের দিকে যাচ্ছি। সামনে একটা চাতাল। পায়রার বকম-বকমে মুখরিত। আমার কাছে মায়ের দেওয়া মুড়ির প্যাকেট ছিল। ফরাসি পায়রাদের সেই বিদেশি মুড়ি খাওয়াতে লাগলাম। কয়েকটা বাচ্চাছেলে দেখছিল আমাদের কাণ্ডকারখানা। মজা পাচ্ছিল খুব। তারা এগিয়ে এসে আমাদের কাছ থেকে মুড়ি নিয়ে ছুঁড়তে লাগল পায়রাদের দিকে। বিদেশি খাদ্যের স্বাদে পায়রাগুলো আনন্দে মশগুল।

আজ আমাদের ডান্স কংগ্রেসের শেষ দিন। সার্টিফিকেট নিলাম। ফটো সেশন হল। কার্ড বিনিময় হল। সন্দীপন ফটাফট আমার ছবি তুলছিল। একজন বিদেশি বয়স্ক প্রতিনিধি সন্দীপনের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমার পতিদেবতা হিসেবে পরিচয় দিতে তিনি হেসে বললেন, ‘নো নো, উনি তোমার পার্সোনাল ফটোগ্রাফার।’

সবাইকে বিদায় জানিয়ে বাইরে এলাম। রঙ্গনাথনের ফোন। আজ রাতে তাঁর বাড়িতে খাওয়ার নেমতন্ন। অ্যাভিয়নে আমাদের আরও দুদিন থাকার কথা ছিল। আইসিসিআরের যে টিকিট ছিল সেটা দুদিন পরের। কিন্তু আমাদের প্যারিসের বন্ধু ক্রিস্টেল নাছোড়বান্দা । ফ্রান্সে এসেছি অথচ তার কাছে যাব না, এটা সে মানতে পারে নি। তাই সে ট্রেনের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে। কাল ভোরবেলা ট্রেন। তাই আমরা অ্যাভিয়নের সেন্ট্রাল রেল স্টেশন দেখতে গেলাম। স্টেশনে একটা পিয়ানো দেখে সন্দীপন বোদ্ধার মতো বাজাতে বসে গেল।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Avian to Paris


স্টেশন থেকে বেরিয়ে আমরা একটা ক্যাফেটোরিয়ায় কিছু খেয়ে নিয়ে দেখতে গেলাম পন্ট সেন্ট বেনাজিট ব্রিজ। রোনে নদীর উপর এই ব্রিজ তৈরি হয়েছিল ১১৭৭-৮৫ সালে। ৪০ বছর পরে একটা সংঘর্ষের ফলে সেই ব্রিজ নষ্ট হয়। তারপর ২২টি পাথরের খিলান দিয়ে আবার তৈরি হয় সেই ব্রিজ। কিন্ত রোনে নদীতে বন্যা হলে কয়েকটি খিলান ভেঙে যায়। তাই একে ‘ভাঙা ব্রিজ’ বলে। ব্রিজের কাছাকাছি আসতে সন্দীপনের দুষ্টুবুদ্ধি উথলে উঠল। সে এক ফরাসি বৃদ্ধাকে বিশুদ্ধ বাংলায় বলল, ‘মাসিমা, ভাঙা ব্রিজে ওঠার রাস্তা কোনদিকে?’ বিন্দু-বিসর্গ বুঝলেন না তিনি। মজার কথা ভেবে হাসতে লাগলেন। ভারি মিষ্টি হাসি। চিনিহীন কফি খেতে খেতে আমি ভাবতে লাগলাম, এরা মিষ্টি না খেয়েও মিষ্টি হাসি হাসে কী করে! ফেরার পথে দেখা হল চাঁদের সঙ্গে। ঝকঝকে আকাশে থালার মতো চাঁদ। আমাদের দেশের মতোই মায়াময় । এখানেও কী জ্যোৎস্নারাতে বনে যাবার সাধ হয় মানুষের!

বাসায় ফিরে দেখি আমাদের নিয়ে যাবার জন্য রঙ্গনাথন গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বাড়ি নেমতন্ন রক্ষা করতে গিয়ে নাকাল হতে হল। আমাদের জন্য ভারতীয় খাবার তৈরি করেছেন তাঁর ফরাসি বউ। কী, না ঢেঁড়শ আর বেগুনের তরকারি। এ দুটোর কোনটাই আমরা খাই না। অনুরোধে ছুঁচোও গিলতে হয়। তাই অর্ধভুক্ত হয়ে রঙ্গনাথনের বাড়ি থেকে বেরোলাম। তারপরে অ্যাভিয়নের রাস্তায় এলোমেলো ঘুরে বেড়ালাম। কিছুটা হলেও রাতের ফ্রান্স দেখা হল।

শীতে কাঁপতে কাঁপতে ভোরবেলায় সেন্ট্রাল স্টেশনে এলাম। ট্রেন ছেড়ে দিল। সাড়ে দশটায় পৌঁছবে ট্রেন। কিকি ফোন করে জানাল সে সকাল সাতটা থেকে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ট্রেন থেকে নামতেই জড়িয়ে ধরল। তারপরে কান্না। সবাই তাকিয়ে দেখছে আমাদের। এ কান্না যে পরম আনন্দের, তারা বুঝবে কী করে ! ট্রেন থেকে বাস। মিনিট চল্লিশ পরে আমরা এলাম মিউডন ভ্যালে ফ্লেয়ারিতে। ঝরাপাতায় ঢাকা রাস্তা দিয়ে, সরু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে কিকির বাসায়। একটু ফ্রেস হয়ে বাইরে গিয়ে জাপানি জলখাবার খেলাম। তারপরে এলাম ক্যাথলিনের বাড়ি। কিকির মাসতুতো বোন ক্যাথলিন। তবে সে কিকির মতো বাউন্ডুলে নয়। রাশভারি। কিকির চেয়ে বয়সে ছোট হলেও কিকি তার কাছে জব্দ। কিকির জামাইবাবু সুদর্শন, অমায়িক। তাঁর আচরণে দেখলাম খাঁটি ফরাসি এটিকেট। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। বেশ মিষ্টি। তাদের সঙ্গে খেলায় কেটে গেল অনেকটা সময়। এর আগে দুবার ইউরোপে এলেও কোন পরিবারের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয় নি। এবার হল। পরের দিন কিকির বন্ধু স্যান্ড্রিনের বাসায় গিয়েছিলাম। স্যান্ড্রিন ডিভোর্সি। সে তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে থাকে। থাকার জন্য সরকার তাকে ফ্ল্যাট দিয়েছে। দ্বিতীয়বার বিয়ে না করা পর্যন্ত ফ্ল্যাটের অধিকার তার থাকবে।

কিকির সঙ্গে পরের দিন আমরা ঘুরতে বেরোলাম প্যারিসে। এই একটাই মাত্র দিন হাতে। ভারতীয় দূতাবাস প্যারিসে আমার কোন নৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে পারলে কয়েকটা দিন থাকতে পারতাম। কিন্তু ভারত উৎসব চলছে বলে তাঁরা অপারগ। কিকি প্যারিসের মেয়ে, কিন্তু দেখলাম সে প্যারিস ভালো চেনে না। আফ্রিকান খাবার খাওয়াবে বলে সে আমাদের নিয়ে গেন আফ্রিকান কলোনিতে। সেখানে কোন আফ্রিকান রেস্টুর‍্যান্ট পাওয়া গেল না। তারপরে চুল নিয়ে চুলোচুলি। দুজন দৈত্যাকার আফ্রিকান আমার পিছু নিয়েছে। নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করছে। কিকি আফ্রিকান বোঝে। সে বলল যে ভয়ের কিছু নেই, আমার কালো চুলের কিছু অংশ তার ভালো দাম দিয়ে কিনতে   চায়। তাদের হাত এড়িয়ে আমরা আবার চলতে লাগলাম।

আরে এই তো বাতাক্লাঁ কনসার্ট হল। কিছুদিন আগে সন্ত্রাসবাদীদের কালাশনিকভের গুলিতে প্রাণ হারায় বহু মানুষ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। এরপর কোথায় যাব? কিকি বলল,’চলো আইফেল টাওয়ার।’। কিন্তু জানা গেল কিকি কোনদিন আইফেল টাওয়ারের উপরে ওঠে নি। তাতে কী! কলকাতার কতজন মানুষ শহিদ মিনারের উপরে উঠেছে? টাওয়ারের তলায় দাঁড়ালাম। উপরের দিকে তাকাতে মাথা ঘুরে গেল। এই ফোবিয়াটা আমার আছে। বহু কষ্ট করে তীর্থের কাছে এসে তীর্থদর্শন না করলে মন খারাপ হয়। তবে কিকি সান্ত্বনা দিয়ে বলল,’ না উঠে ভালোই করেছি। দেখো এর মধ্যে টাওয়ারের উপরের দিকটা মেঘে ঢেকে গেছে। মাঝে মাঝে এরকম হয়।’

আইফেল টাওয়ারে না উঠতে পারার দুঃখ পুষিয়ে দিল সেন নদীতে লঞ্চভ্রমণ। বাথোমসে যাবার পথে দেখি এক সুন্দরী রিক্সা চালাচ্ছেন। অ্যাভিয়নেও না কি এরকম রিক্সা দেখেছিল সন্দীপন। বিশ্বাস করি নি। কিকির অনুরোধে সুন্দরী রিক্সার চালকের আসন থেকে নেমে এলেন। সন্দীপন কিছুক্ষণ চালাল সেই রিক্সা। লঞ্চভ্রমণের প্রধান গেট বাথোমসে গিয়ে আমরা উঠে পড়লাম একটি সুদৃশ্য লঞ্চে। সেন নদীর উপর দিয়ে তরতর করে চলেছে লঞ্চ। দুপাশে ছবির মতো গাছপালা, ঘরবাড়ি। ফরাসি ও ইংরেজিতে ধারাভাষ্য হচ্ছে। নদী থেকে ডাঙায় উঠলাম। দেখলাম স্টাচু অফ   লিবার্টি। সেখানে অসংখ্য তালা-চাবি। কিকি জানাল প্রেমিকরা এভাবে তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করে। এরপর কিকি নিয়ে এল প্যারিসের বিখ্যাত এক রাস্তায়। স্যঁ জে লি জ্যেঁ। রাস্তার ধারে এক কাফেতে বসলাম কিছুক্ষণ।

দেখতে দেখতে কেটে গেল আড়াইটা দিন।

ফেরার পালা এবার। যেদিন ফিরব, সেদিন সকাল বেলা কিকি জানাল তার জরুরি কাজ আছে। আমাদের সে এয়ারপোর্টে ছাড়তে যেতে পারবে না। দেখলাম তার চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। বুঝলাম। বন্ধুদের বিদায়দৃশ্য সে সহ্য করতে পারবে না। তাহলে ইউরোপের মানুষ আমাদের মতোই আবেগপ্রবণ!

ছবি: লেখক

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>