ফাগুন হাওয়ায় : মিছিল ডাকছে ফের!

আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছ বারংবার;
তবু কেন বোঝ না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,

আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে , গ্রামেদিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব
সবাইশেষবারের মতো!

– দেশলাই কাঠি, সুকান্ত ভট্টাচার্য

শিল্পের বহুমাত্রিকতা কখন কিরূপে উদ্ভাসিত হবে নব নব ব্যখ্যানে তা নিবিড় দৃষ্টি না দিলে ঠাহর করা মুশকিল। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এমন বহুমাত্রিক উদ্ভাসনের অনন্য ক্যানভাস হয়ে এল। বড় পর্দায় এ চলচ্চিত্র দেখার যৎকিঞ্চিত প্রতিক্রিয়া জানানো সমুচিত জেনে দুকথা লিখছি এখানে। ঠিক চলচ্চিত্র সমালোচনার মেজাজ নিয়ে লিখতে বসিনি, এই লেখায় তা খুঁজতে গেলে হতাশ হবেন, আর চলচ্চিত্র নির্মাণের খুটিনাটি অনুপুঙ্খ পাঠের তত্ত্বজ্ঞানের সমূহ সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থণা করছি। মূলত এই চলচ্চিত্রকে টেক্সট হিসেবে দেখতে চাই দূরবর্তী পাঠক হিসেবে।   

টিটো রহমান এর ছোট গল্প ‘বউ কথা কও’ অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা এবং নির্মাণের মূল কারিগর তৌকির আহমেদ। একথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবেনা যে, বাংলা সিনেমার নতুন দিনের কান্ডারীদের মাঝে তৌকীর আহমেদ স্বতন্ত্র একটি স্বর নির্মাণে অগ্রগামী অবস্থান অর্জন করেছেন সাম্প্রতিক দুই দশকে। জয়যাত্রা, রুপকথার গল্প, দারুচিনি দ্বীপ, অজ্ঞাতনামা এবং হালদা’য় ক্রমোন্নতি, বৈচিত্র এবং বহুমাত্রিক নিরীক্ষায় নিজস্ব পথরেখা সুস্পষ্টকরণের নমুনা আর চমক নয় বরং আকাঙ্ক্ষিত। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ তাঁর পূর্ববর্তী কাজের ধারাবাহিকতার আরো উজ্জ্বল, পরিচ্ছন্ন এবং শিল্পিত উচ্চালিভাষের স্মারক। এই উচ্চাভিলাষ জরুরি, বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশের পক্ষেই ভীষণ জরুরি। এই সাহসে ভর করেই বাংলা চলচ্চিত্রে অনেক সীমবদ্ধতাকেই অতিক্রম করেছে ফাগুন হাওয়ায়।  

মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন সহ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহ নানা কারনেই খণ্ডিত পাঠরূপে হাজির আছে আমাদের সামনে। ইতিহাস পাঠ এর কেন্দ্র রাজধানী, ১৯৭১ এবং সাম্প্রতিক কালে দলীয়করণের বৃত্তে বন্দী। একেকটি আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই ইতিহাসের পূর্বপথরেখা যথাযথ পাঠের চেষ্টা করেছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা তাই ৫২ পর্যন্ত পৌছুতে পারেনা। বঙ্গভঙ্গ এবং এর পূর্বাপর পরিস্থিতি, দেশ ভাগ নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন কাজ নেই বলা চলে। বায়ান্ন নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু তা খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছোয়নি। ২০১২ সালে রোকেয়া প্রাচী নির্মাণ করেছিলেন শহীদ আবুল বরকত এর জীবন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘বায়ান্নর মিছিলে’। পরবর্তীতে, ২০১৮ তে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে শবনম ফেরদৌসী নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাষা জয়িতা’ ব্যতীত নতুন কাজের খবর আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, অথচ এই বৃহৎ আন্দোলনকে সেলুলয়েডে ধারণ করবার, পুনঃপাঠের নিবিড় এবং স্বার্থক প্রয়াস নিতান্তই হাতেগোনা। খুব কম চলচ্চিত্রেই ইতিহাসের পূর্ব পথরেখা পাঠের চেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাস পাঠের এই ভ্রান্তিমূলক, একপাক্ষিক এবং খণ্ডিত পাঠ প্রকারান্তরে আগামী প্রজন্মের নিকট একটা প্রবল শুন্যতা তৈরি করছে, যা এই মূহূর্তে ঠিক বুঝতে চাইছেন না যেন কেউ! ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এই গণ্ডী ভাঙার সাহস দেখিয়েছে। গল্পের কেন্দ্র ঢাকা নয় এখানে, রাজধানীর বহু দূরের জেলা খুলনা। গল্পের পাত্রমিত্ররা জাতীয় পর্যায়ের কেউকেটা কেউ নন, বরং মৃত্তিকালগ্ন জনসাধারণ যেখানে মেথর, বাউল, বনেদী ডাক্তার, মিষ্টিবিক্রেতা, নাট্যকর্মী, গ্রামের তরুণ, এমনকি বনের পাখী নিজের স্বরে কথা বলবার অপ্রতিম বাসনায় মুখ খোলে সমূহ প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাটলে আঞ্চলিক পর্যায়ে এরূপ প্রতিরোধ সংগ্রামের খবর পাওয়া যাবে, এমনকি চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলা শহরে একই সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণের খবরও পাওয়া যাবে যা এই নাগরিক ঢাকার বুদ্ধিজীবী সমাজ স্বীয় ঔদাসীন্যে আড়াল করেছেন। মাতৃভাষার আন্দোলন যে আপামর জনসাধারণের আন্দোলন- এই বোধটুকুর জয়গান ‘ফাগুন হাওয়ায়’। গল্পের শুরুতে তাই ময়না পাখিকে মানুষের ভাষা শেখানোর প্রতি গল্পের নায়ক নাসিরের বক্রোক্তি নিছক মেয়েপটানো সংলাপ নয়, বরং একটি প্রস্তাবনা। শক্তিমান কেন্দ্র (রাজধানী) থেকে সরে গিয়ে প্রান্তে দাঁড়িয়ে সমগ্রের (জাতির) গল্পকথক হওয়াটা এতটা সরল সমীকরণ নয় আমার পাঠে। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ তাই সমান্তরাল গল্পের জমিন মেলে ধরে। ঢাকায় ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার সমান্তরালে দূর মফস্বলে আরেকদল মানুষ সমান তেজে সামরিক জান্তার পাতি প্রতিনিধি, জামসেদ দারোগার মুখোমুখি দাঁড়ায়। নির্দেশক নিছক স্থূলবুদ্ধির অনুকরণ (মিমিক্রী) করেন না, বরং উৎপ্রেক্ষার জমিন রচনা করে ইতিহাসের আরো একটি অধ্যায়ের পূর্বপাঠে আমাদেরকে বাধ্য করেন। স্থানীয় নাটকের দলটি মঞ্চে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ‘নীলদর্পণ’ নাটকের। বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর দমন, পীড়ন, নির্যাতন যেন ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের উত্তরাধিকার, তারও সমান্তরাল পাঠ হয়ে গেল। ক্ষমতাকাঠামোর মুখপাত্রগণ বুঝি যুগে যুগে এমনি করে কণ্ঠরোধী, জনতার অধিকার আয়োজনে তৎপর! সমকালীন বাস্তবতায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার চরম ক্রান্তিলগ্নও বুঝি এক ঝলকে পাঠ করা হয়ে গেল বিগত শতকের স্বৈরাচারী শাসনের বৃত্তান্ত পাঠের সমান্তরালে। এই সমান্তরাল দৃশ্য ও বাস্তবতা নির্মাণ এই চলচ্চিত্রের অনন্যতাকে সূচিত করে। নাটকের মহড়ার দৃশ্যে ব্রিটিশ সাহেবের হাতে সম্ভ্রম হারানো নারীর আকুতি আর মূক ঝুমুরের সম্ভ্রম হারানোর অনুক্ত আর্তনাদ সমান বেদনায় উচ্চকিত হয়ে ওঠে। তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভষা করা চরম ঔদ্ধ্বত্যপূর্ণ বক্তব্য যেন সমান ঔদ্ধত্য নিয়ে ঘোষিত হয় জামসেদ ওসির কণ্ঠে। ‘নীল দর্পণ’ নাটকে ব্যক্ত, নিপীড়িত জনতার প্রতিরোধের আখ্যান যেন ১৯৫২তে এসে পুনঃনির্মিত হল। কোন রাজনৈতিক আন্দোলন চুড়ান্ত বিচারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানসহ পূর্বতন সংগ্রামের ইতিহাস ১৯৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত ঘরে দিয়েছে। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসকে শুধুমাত্র ১৯৭১ এ কেন্দ্রীভুত করে ফেলার মধ্যে চরম বিপদ লুকিয়ে আছে। এইসব খন্ডিত পাঠ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ‘মূল বয়ান বা গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভ নির্মানে’। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এই শুন্যতা নিরসনে একটি নান্দনিক প্রস্তাবনা হয়ে এসেছে। এই সিনেমা একটি ছোট গল্পের প্রাণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, সুকান্ত ভট্টাচার্যের অসাধারণ একটি কবিতা ‘দেশ্লাই কাঠি’র নতুন পাঠ হাজির করেছে, প্রান্তের মানুষজনকে ইতিহাস পাঠের কেন্দ্রে হাজির করেছে এবং দূর্দান্তভাবে বাংলাদেশের সিনেমাকে সবুজ শ্যামল বাংলার জমিনে নিয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী জনপদকে এতটা স্নিগ্ধভাবে দেখার সুযোগ আধুনিক (!) ঢাকাই সিনেমায় ক্রমশ কমে আসছে। আশার কথা সাম্প্রতিক বেশ কিছু নতুন ছবি বাংলাদেশকে নতুন চোখে দেখাচ্ছে। ফাগুন হাওয়ায় ফের দেখা দিল ঐতিহ্যবাহী ‘রকেট’, বিস্তীর্ণ চর, সবুজ মাঠ, মেঠোপথ, গরুর গাড়ির ছন্দে দেখা দেশ!

‘ফাগুন হাওয়ায়’ নাম শুনেই মগজে বেজে উঠেছিল কবিগুরুর ফাগুন বন্দনার গানটি, কিন্তু কি আশ্চর্য সিনেমার কোথাও তাঁর রেশ নেই। বরং নতুন গানে নতুন ব্যখ্যানে ‘ফাগুন হাওয়া’ বয়ে গেল পর্দায়! নির্মাতা এই অপরিমেয় পরিমিতি বজায় রেখেছে প্রায় পুরো সিনেমাজুড়ে! কবিগুরুর ফাগুন বন্দনা অতিক্রম করে জহির রায়হান এর ‘আরেক ফাল্গুন’ এর ‘আসছে ফাগুন আমরা দ্বিগুন হব’ এই শ্লোগানই বুঝি মূর্ত হল অলক্ষ্যে। আর ৮ই ফাল্গুন’র আবহটাই যেন পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেল। সময়ের এই উল্টোস্রোতে পরিভ্রমণের নিরন্তর প্রয়াস দারুন সফল। ষাট এর দশকের মেজাজ নির্মাণে আবহ সঙ্গীত ছিল অনন্যসাধারণ। সঙ্গীতায়োজনে পিন্টু ঘোষ এবং রোকন ইমন এই গীতল আবহ নির্মাণের মূল কারিগর। ফাগুন হাওয়ায় গানটিতেই এসে বরং কিছুটা টোল খেয়েছে তা। এই গানটির সঙ্গীতায়োজন পুরাতনী আবহ ধারণ করলেও কথা ও সুরে তা কখনো সাম্প্রতিক দশকের গানের নিকটবর্তী ঠেকেছে। বলিউড এর অভিনেতা যশপাল শর্মা নামের ভারে অভিনয়গুণেই মুগ্ধতা অর্জন করেছেন সবার! সিয়াম ক্রমশ তাঁর জায়গা পোক্ত করে নিচ্ছেন সিনেমার জগতে। ফজলুর রহমান বাবু আরো একবার তাঁর অনন্যতা প্রমাণ করলেন। শহীদুল আলম সাচ্চু, নরেশ বিশ্বাস, পংকজ মজুমদার, ফারুক হোসেন নিজেদের চরিত্রে কি দূর্দান্ত! পার্শ্ব অভিনেতারা প্রায় সকলেই স্ব স্ব চরিত্রে বিশ্বস্ততার প্রতিচ্ছবি। ঝুমুর চরিত্রটির বেদনাতুর ভাষাহীন মুখও কি মুখর! তবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে থেকেও তিশা তাঁর প্রতি প্রত্যাশার সুবিচার করতে পারলেন না, যেন পার্শ্বচরিত্র হয়ে রইলেন। আর দশটা নাটক সিনেমায় নিয়মিত উপস্থিতিই হয়তো তাঁর স্বকীয় উপস্থিতি নির্মাণে ব্যঘাত ঘটিয়েছে।

দুই ঘণ্টা ষোল মিনিটের সিনেমায় কিছু অতৃপ্তিরেখাও আছে বটে। বনেদী হিন্দু ডাক্তারের বাড়ি ঠিক হিন্দু পরিবারের পরিচয়সূচক বাস্তবানুগ চিহ্ন ধারণ করে না যেন। যেহতু ধর্ম পরিচয় এখানে বড় একটা বিষয়, সেক্ষত্রে ঠাকুরদা, তাঁর বাড়ি, পোশাক এর ক্ষেত্রে আরেকটু বাস্তবানুগ হওয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে করি। বাউল এর উপস্থিতি যেন শুধু দৃশ্যের প্রয়োজনে, অথচ তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত গায়নই স্বাভাবিক মনে হত। লঞ্চের প্রথম শ্রেণির ডেকে অকারণ দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক যুক্তিযুক্ত ঠেকে না। বাউলের দোতারার ‘স্টীল কী’ ষাট এর দশকে অকল্পনীয়, এটা সাম্প্রতিক সময়ে গীটার থেকে ধার করেছে নাগরিক শহর। দারোগার মুরগী চুরি করে ভোজোৎসব স্বাভাবিক দৃশ্য কিন্তু ‘বার বি কিউ’ করাটাও ঐ সময়ের কোন এক গ্রামের আবহ বিচারে বেমানান লেগেছে। পুরো সিনেমায় অনেক বিষয়েই চরম পরিমিতি দেখালেও রাতে দেয়াল টপকে দীপ্তির সাথে দেখা করতে যাওয়াটা ‘শেষের কবিতা’ দিয়ে প্রেম শুরু যুগলের মানসের যৌক্তিক পরিণতি মনে হয়নি। এ যেন হঠাৎ লাফিয়ে নব্বই এ চলে এলাম! সিনেমার শেষ দিকে এসে কিছুটা গতি হারিয়েছে যেন। আর সাবটাইটেলে কিছু বানান ভুল (যেমন- পাকিস্থান, দাড়িয়ে, কথাবর্তা, গর্ধভ …) মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। এইসব ছন্দপতন অবশ্য দর্শককে মূল গল্প হতে বিচ্যুত করে না খুব একটা।

আক্ষরিক অর্থেই ক’পৃষ্ঠার ছোটগল্প ‘বউ কথা কও’ কে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রুপান্তরের এমন দারুণ সফল নমুনা এই ভাবনাটিও জাগিয়েছে যে, আমাদের ছোটগল্পের ঋদ্ধ ভাণ্ডর কী অবহেলায় ফেলে রেখেছি আমরা। আমাদের শিল্পসাহিত্যের প্রভূত রসদ বুঝি পাঠহীনতার জোয়ারে ক্রমশ আড়ালের ধন! নির্মাতার ঋদ্ধ এবং জহুরি পাঠকমানস আমাদেরকে আলো দেখিয়েছে এই সিনেমায়। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ দেখে নিজের ভেতরে যে হাহাকার বেজেছে তা বোঝানো কঠিন। রীতিমত অশ্রুসজল চোখে হল ছেড়েছি। এটাকে বলা যেতে পারে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সুলুক সন্ধানী প্রস্তাবনা, যদিও সিনেমাটি কোন ঐতিহাসিক ঘটনার প্রামাণ্যচিত্র নয়, কিন্তু এর অন্তর্গত বক্তব্য ভাষা আন্দোলনের নেপথ্য কারণ এবং এর পরম্পরাকে দারুণভাবে চিত্রায়িত করতে পেরেছে। বিনোদনের চেয়েও বড় বেশি ছুঁয়ে গেছে ইতিহাসের এই চিহ্নপাঠের নিবিড় প্রচেষ্টাকে। রোমান্টিক সিনেমা হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করতে গিয়ে তরুণ তরুণীর প্রেম এর চেয়েও মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে রোমান্টিক বিপ্লবীদের আখ্যানটিকেই গুরুত্ব দিতে চাই সর্বাগ্রে। এমন চলচ্চিত্র আরো আরো চাই। এই সকল চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাবাহিকতায় আমরা হয়তো একসময় কাছাকাছি পৌঁছে যাব ভাষা আন্দোলনসহ বাঙালি জাতিসত্তার উত্থানপর্বের ইতিহাসের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মূল বয়ান নির্মাণে।


তৌকির আহমেদ এবং এই চলচ্চিত্র নির্মাণে সম্পৃক্ত সকলের প্রতি অকুণ্ঠ অভিবাদন। ফাগুন হাওয়ায় দেখুন, বিনোদনের দাবি নিয়েও দেখুন, মাতৃভাষায় কথা বলবার অধিকারের জন্য কিছু মানুষের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখুন, এই জাতির ইতিহাসের অলিগলি নিবিড়পাঠের বাসনা থেকেও দেখুন! এই সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্যের সাথে আদর্শিক বিজয়টুকুও কামনা করি অপরিসীম ভালোবাসায়। প্রভাতফেরির মিছিলে অবচেতনে আমাদের উপস্থিতি জারি থাকুক। এই দাহকালে এতটুকু ভালোবাসার বারুদ মগজে পুরে দেশলাই কাঠির মত জড়ো হওয়ার ডাক বারে বারে আসেনা। ফাগুন হাওয়ায় তেমনি মিছিলে জড়ো হওয়ার ডাক। শেষ দৃশ্যে দীপ্তি যখন কাতর অনুনয় করে বলে, ‘আমার বন্ধুরা মিছিলে’ তখন ঐ মিছিল দৃশ্যমান প্রভাতফেরির চেয়ে ঢের বহুগুণ জ্যান্ত হয়ে ধরা দেয়। সুকান্তের কবিতা পাঠ করে আসুন এই মিছিলে সামিল হই! এটা জরুরি।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত