farasi premik by taslima nasrin

তসলিমা নাসরিনের সম্পূর্ণ উপন্যাস ফরাসি প্রেমিক

Reading Time: 322 minutes

প্রতিটি মানুষের দুটো মাতৃভূমি, একটি তার নিজের, অন্যটি ফ্রান্স –শ্রীবোকাচন্দ্র ঠাকুর

.

দমদম থেকে শার্ল দ্য গোল

মেয়েটি, পরনে লাল বেনারসি, নাকে কানে গলায় হাতে সোনার অলংকার, শুকিয়ে চড়চড় ঠোঁট, উড়োজাহাজ থেকে নেমে ডানে বামে সামনে পেছনে তাকাতে তাকাতে, চলন্ত সিঁড়িতে হোঁচট খেতে খেতে, রাশি রাশি সাদা মানুষ দেখতে দেখতে হাঁটছে যেদিকে লোক হাঁটছে বেশি, যেদিকে ঢল, কলকল, সেদিকে। ঢল থেমে যায় এক কোণে, একের পেছনে আরেক করে হয়ে যায় দীর্ঘ অজগর। অনেকটা রেশন দোকানে সস্তায় ডাল দিচ্ছে গো, দাঁড়িয়ে যাও-এর মতো। লেজ ডিঙিয়ে, মেয়েটি নিজেকে গলাতে চায় পেটে। পেটের লোকেরা বলে, ও মেয়ে, ও লাল শাড়ি, লেজে যাও, লেজে যাও। মেয়েটি জিভের জলে ঠোঁট ভেজাতে ভেজাতে লেজে ফেরে, সবার পিছে সবার নীচে সবহারাদের মাঝে।

অজগর সড় সড় করে ডিঙিয়ে যাচ্ছে ঝোপঝাড়।

 কেবল লেজটিই ঝোপের কাঁটায় আটকে পড়ে।

মেয়েটি, কপালে থেবড়ে যাওয়া সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, ভেজা ঠোঁট মুখোমুখি হয় দুজনের, কালোর আর সাদার। মেয়েটি কালো পেরিয়ে সাদার দিকে এগোয়, অমাবস্যা পায়ে দলে ধবল জ্যোৎস্নার দিকে। কালো ডাকে, ও মেয়ে, ও লাল শাড়ি, এদিকে। লাল শাড়ি কানে খাটো, হাঁক শুনেছে, ডাক বোঝেনি। সাদার সামনে ত্রিভঙ্গ দাঁড়ায় সুবিনীত সুস্মিতা। দেবী দুর্গার মতো লাগছে না কি, একবার চোখ তোলে। দেবীতে সাদার কিছু যায় আসে না, সাদা চোখ তোলে না, আঙুল তুলে কালোর দিকে ইঙ্গিত করে। লাল শাড়ি কানে খাটো হলেও চোখে খাটো নয়। দু পা বামে গেলেই কালো। বামে যেতে তার পা সরে না, মন সরে না।

কালো তো কালোই, আবার গজদন্ত। মেয়ে ফোঁসে।

 পাসপোর্ট। গজদন্তের গভীর গুহা থেকে গমগম শব্দ বেরোয়।

 গাঢ় নীল পাসপোর্টটি কালোর চোখের সামনে ধরে মেয়েটি, অজগরের মাথা বুক পেটের লোকেরা যেভাবে ধরে পার পেয়ে গেছে। গজদন্ত খপ করে ধরে গপ করে টোপটি গেলে। শেয়ালের কালো থাবায় ভারতীয় কুমিরের ছানা। যক্ষের ধন পেয়েছে গজদন্ত। টোপটির আগপাশতলা দেখতে দেখতে কালোর লাল টকটক জিভে, মেয়েটি দেখে, জল গড়াচ্ছে।

টিকিট। আবার গুহার গমগম।

এবার আর টোপ নয়। মেয়েটি কালো থাবায় পুরে দেয় দুপাতার টিকিট–দমদম শার্ল দ্য গোল দমদম—বাইশে ফেব্রুয়ারি, একুশে মার্চ নিরানব্বই।

কুমিরছানা চলে গেল মেশিনের তলায়, একবার দুবার তিনবার।

কী করতে এখানে এসেছ হে? গমগম।

সংসার করতে। শুকোতে থাকা ঠোঁট নড়ে।

কোন হোটেলে উঠবে, নাম কী? গমগম।

 বাপের হোটেল থেকে স্বামীর হোটেলে উঠবে লাল শাড়ি। এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে জীবন পার।

ঠিকানা কী? গমগম।

টুকরো একটি কাগজ কালো থাবার ভেতর চালান করে, একশো বারো রু দু ফুবো সানদানি, প্যারিস সাত পাঁচ শূন্য এক শূন্য।

টাকা কত আছে? গমগম। দুশো ডলার থাবায় চলে যায়।

আর কত আছে? গমগম।

ঝোলার ভেতরে হাত আনাচ কানাচ খোঁজে, বাসি ফুল, ছেঁড়া চিঠি, দুটো বোতাম আর একটি চিনেবাদামের খোসা, আর আধখাওয়া কমলালেবুর সঙ্গে উঠে আসে বারোশো পঁচিশ টাকা।

গজদন্ত দু আঙুলে শুঁয়োপোকা ভুরু চুলকে চিকন গলায় জিজ্ঞেস করল, এগুলো কী?

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এগুলো টাকা।

 টাকা?

 হ্যাঁ টাকা। ভারতের টাকা। মেয়েটির মাস্টারি গলা।

গজদন্ত টাকার এমন চেহারা আগে দেখেনি। সাদা লোকটির চোখ পড়ে টাকায়, নাক কুঁচকে ওঠে, যেন আবর্জনার স্তূপ থেকে এক মুঠো দুর্গন্ধ বিষ্ঠা এনে সামনে রেখেছে কেউ। মেয়েটির পেছনে নতুন অজগর, অজগর লম্বা হচ্ছে, হাঁসফাঁস করছে, বুকের পেটের লোকদের গা জ্বলছে। লাল আপদটি সামনে না থাকলে অনেককাল বেড়া ডিঙিয়ে যেত ওরা। ওদের মত নিজেকেও মেয়েটির বড় এক আপদ বলে মনে হয়।

সাদা তার সাদা চিবুক নেড়ে সাদা আঙুল তুলে বলে, এই লাল শাড়ি, তুমি ওই কোণে গিয়ে দাঁড়াও।

আপদ বিদেয় হয়। কোণে।

নতুন অজগর দ্রুত গড়িয়ে যায়। এই মাথা তো এই লেজ। কারও পাসপোর্ট মেশিনে ঢোকানো হয়নি। কারও ঝোলার ভেতর হাত ঢোকাতে হয়নি, টাকা খুঁজতে হয়নি। কাউকে কোনও কোণে পাঠানো হয়নি। মেয়েটিই একা। মেয়েটিই এক কোণে। কোণটি, মেয়েটির মনে হয়, চিড়িয়াখানার খাঁচা, যারাই পার হচ্ছে, অদৃশ্য খাঁচার ভেতর মেয়েটিকে দেখছে, কালো চোখের কালো চুলের কালচে রঙের আজব জীব দেখছে। মেয়েটি চোখ নামিয়ে রাখে মেঝেয়। অপরাধী চোখ।

অজগরের লেজের শেষ বিন্দুকে ছুটি দিয়ে গজদন্ত যখন সাদার দিকে ঝুঁকে হাসছে, মেয়েটি এক পা দু পা করে কোণের সীমানা ডিঙিয়ে সাদাকে মিনমিনে গলায়, সবাই যে চলে গেল, আমি যাব না? বলতেই সাদা ডানে বামে মাথা দোলায়। মাথা দুলতেই থাকে, এর অর্থ কি না তুমি যাবে না, না কি সাদার মনে কোনও গানের সুর জেগেছে হঠাৎ আর সে সুরে তাল না দিয়ে সে পারছে না।

সাদার মাথা দোলানো দেখে গজদন্ত বেরিয়ে আসে কাচের ঘর থেকে।

 হাঁটো। গমগম।

গজদন্ত থামে। কাচের নয়, ইস্পাতের একটি ঘরে, পেছনে লাল শাড়ি। ঘরের ভেতরে দুটো চেয়ারে দুটো নীল পোশাকের সাদা লোক। একটির বেশি বয়স, আরেকটির কম। বেশি বয়সের হাতে যক্ষের ধনগুলো সঁপে দিয়ে গজদন্ত বেরিয়ে যায়। কমবয়সি হাসছিল, মেয়েটিকে দেখে হাসি গিলে ফেলে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখে প্রসবযন্ত্রণা।

বেশিবয়সি আস্ত নপুংসক, প্রসবযন্ত্রণা নেই নাকে চোখে গালে। বদলে ইস্পাতের মুখ, টোকা দিলে হাড় তো ভাঙবেই, আঙুল খসে যাবে, এমন। বেশিবয়সি ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ফরাসি জানো?

না।

 কী জানো?

ইংরেজি।

ইংরেজি চলবে না।

মেয়েটি ইস্পাতের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। বিস্ময় তাকে একবার ডানে কাত করে, একবার বামে।

পৃথিবীর কোথাও ইংরেজি ভাষাটি যে অচল হতে পারে, এ তার ধারণায় ছিল না। কলকাতায় জাতে উঠতে হলে বা সভ্য হতে হলে ইংরেজি জানতে হয়। তার বিশ্বাস ছিল, সভ্য লোকেরা, সে যে দেশেরই হোক না কেন, অনর্গল চোস্ত ইংরেজি বলে।

তোমার নিজের ভাষা কী? বেশিবয়সি ধমকে ওঠে।

 বাংলা। ক্ষীণ স্বর মেয়েটির।

 বাংলা চলবে না, বাক্যটি শোনার জন্য মেয়েটি প্রস্তুত ছিল, মেয়েটিকে হতাশ করে বেশিবয়সি বলে,

দোভাষীর ব্যবস্থা করা হবে।

 দোভাষী এলে মেয়েটিকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হবে। উত্তর সন্তোষজনক হইলে বিচারকমণ্ডলি রায় ঘোষণা করিবে মুক্তির, আর না হলে অর্ধচন্দ্র, যেখানের মাল সেখানে ফেরত পাঠানো।

ইস্পাত আর প্রসবযন্ত্রণার দু জোড়া চোখ মেয়েটির চুল থেকে পায়ের নখ অব্দি ঘুরে বেড়ায়। কপালের চোখটি সামান্য বুজে ইস্পাতি ইঙ্গিত করে কোণের চেয়ারে। বেনারসি শাড়ি, থেবড়ানো সিঁদুরের টিপ, শুকনো চড়চড়ে ঠোঁট কোণের চেয়ারে গিয়ে বসে। কোণে তিনটে চেয়ার পাতা। তিনটের একটিতে, দেয়ালের লাগোয়াটিতে, কচি কলাপাতা রঙের লম্বা আলখাল্লা পরা ঘোর কালো রঙের এক লোক বসা, লোকটির মাথা ভর্তি চুল নয়, চুলের জট। এক চেয়ারের ব্যবধান রেখে মেয়েটি বসে।

লোকটি জিরাফি গলা বাড়িয়ে খড়খড়ে গলায় বলে, আমি সেনেগালের, তুমি?

মেয়েটি কানে খাটো, কানে খাটো বলে চোখ ইস্পাতের দেয়ালে। দাঁড়কাকের কর্কশ কা কা রব থামার লক্ষণ নেই। তুমি কোন দেশের?

দেয়ালে চোখ স্থির, ঠাণ্ডা গলায় উত্তর ছুঁড়ে দেয় বাতাসে, আমি সেনেগালের নই।

সেনেগালের নয় বলে একটি অহংকারের চড়ুই চকিতে উড়ে এসে তার বাঁ কাঁধে বসে। বাঁ কাঁধটি মেয়েটি মোটে নড়াতে চায় না। কাঁধ না নড়িয়ে আড়চোখে দেখে দাঁড়কাকের কদাকার পায়ের কাছে ততোধিক কদাকার বেগুনি রঙের বস্তা। বস্তাটির গলা খুলে বুনো হস্তিথাবায় একটি নোংরা বোতল বের করে পিঠের দিকে মাথা ঝুলিয়ে হিপোপটেমাসের হাঁয়ের ওপর বোতল উপুড় করে। অর্ধেক বোতল জল ঢুকে যায় হাঁয়ে। জিরাফি গলা মেয়েটির দিকে এল আবার, জল খাবে?

না।

জিরাফি গলা আবার, তোমার পাসপোর্টও কি নকল?

না। এ স্বরটি ঝাঁঝালো।

 তুমি কি চিন দেশের?

 না।

বুঝেছি, পাকিস্তানি।

মেয়েটি উঠে যায়, কাঁধের চড়ুই কাঁধেই থাকে। দেয়ালে হেলান দিয়ে দেয়ালের দিকেই নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। ঘরে আরও এক সাদা লোক ঢুকতেই মেয়েটির চোখ উতলা হয়। সাদা লোকটি সেনেগালির পাশের চেয়ারটিতে বসে। মেয়েটি কাঁধের চড়ুইকে উড়িয়ে দিয়ে সাদার পাশে, জিরাফি নাগালের বাইরে নিশ্চিন্তে এসে বসে। সাদার তেল চিটচিটে কাপড় থেকে পেচ্ছাপের ঝাঁঝালো গন্ধ বেরোচ্ছে।

সেই গন্ধে স্বচ্ছন্দে নাক ডুবিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন দেশের?

রাশা।

আবার নাক, তোমাকে কী কারণে আটকেছে গো?

লোকটি ফ্যাক করে হলুদ দাঁতে হেসে উত্তর দেয়, মস্কো।

ও তুমি বুঝি মস্কোতে থাকো?

লোকটি মাথা নাড়ে।

জানো আমার এক কাকা মস্কোতে গিয়েছিলেন। খুব নাকি সুন্দর শহর। আমার দাদা তো সামনের বছরই সম্ভবত বেড়াতে যাবে মস্কো।

লোকটি হলুদ দাঁতে হাসে।

পেচ্ছাপের গন্ধে আবার নাক ডোবে মেয়েটির।

আমি ভারত থেকে এসেছি। তুমি গেছ কোনওদিন ভারতে?

লোকটি মাথা নাড়ে।

পেচ্ছাপের গন্ধের দিকে সরে এসে মেয়েটি বলে, বাহ! কোন শহরে গেছ বলো তো! কলকাতা গেছ?

লোকটি উত্তর দেয়, প্যারিস।

ও তুমি প্যারিসে এসেছ আগে? আমার কিন্তু এই প্রথম।

 মেয়েটি কোনও উত্তর আশা করেনি, কিন্তু উত্তর উচ্চারিত হয়, মস্কো।

 মেয়েটি এবার মুখ বোজে, নাক বোজে। তার তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর কী হবে সে অনেকটা অনুমান করে।

প্রশ্ন কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কিছু জানো?

 উত্তর ভ্লাদিমির আলেকজান্দ্রোভিচ স্তানিস্লাভস্কি।

এদিকে প্রসবযন্ত্রণা আর ইস্পাত মিলে খড়বড় ভড়বড় নড়বড় করে অনর্গল ফরাসি বলে যাচ্ছে। একটি শব্দ বোঝা মেয়েটির পক্ষে সম্ভব হয় না। এক ঘণ্টা পঁয়ত্রিশ মিনিট পার হলে কমবয়সি নীল পোশাকের লোকটি তিন আসামির দিকে চেয়ার ঘোরায়। আঙুল তুলে লাল শাড়ির দিকে, স্পষ্ট ইংরেজিতে বলে, তোমাকে ফিরে যেতে হবে, তোমার দেশে, বুঝলে? কমবয়সির মুখে প্রসবযন্ত্রণা নেই আর, কপালে একটি বাড়তি চোখ ছিল, সেটিও নিশ্চিহ্ন।

মেয়েটি ত্রস্ত উঠে দাঁড়ায়, দোভাষীর কথা বলছিলে, ওর কী হল?

 দোভাষী পাওয়া যায়নি।

মেয়েটি যখন অপেক্ষা করছে তার পাসপোর্ট টিকিট ইত্যাদি যক্ষের ধন ফেরত পাবার, নীল পোশাকের বেশিবয়সি ইস্পাতমুখী আরেকটি বেশিবয়সি সাদা নিয়ে ঘরে ঢোকে, এটি চুইংগাম চিবোচ্ছে। এটি নীলার মাথা থেকে পা অব্দি নিরীক্ষণ করে, দুচোখে কুলোয় না, কপালে একটি বাড়তি চোখ ছিল, সেটি খোলা।

চুইংগাম চিবোত চিবোতে, মেয়েটিকে, কী নাম?

কার?

তোমার।

 নীলাঞ্জনা মণ্ডল।

 প্যারিসে কী কারণে এসেছ?

সংসার করতে।

কার সঙ্গে?

 স্বামীর সঙ্গে।

স্বামীর নাম কী?

 কিষানলাল?

 বয়স কত?

 ঠিক জানি না। আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় হবে।

 তোমার বয়স কত?

 সাতাশ।

কতদিন আছে সে এখানে?

কে?

তোমার স্বামী।

নীলাঞ্জনা ঘাড় চুলকে বলে, সম্ভবত পনেরো বছর।

তুমি সঠিক জানো না?

না।

সে কি এদেশের নাগরিক?

তাই তো শুনেছি।

 কী করে সে?

শুনেছি ব্যবসা করে।

শুনেছ? নিশ্চিত নও?

কে বলেছে সে তোমার স্বামী? চুইংগামের ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দেয় অবিশ্বাস।

নীলা ডানে বামে তাকিয়ে, বিব্রত বিনীত স্বরে বলে, আমি বলছি। আমাদের বিয়ে হয়েছে এক মাস হল।

পদবিই তো এক নয়। চুইংগামের ঠোঁট থেকে উড়ে অবিশ্বাস এসে বসে ডান চোখে।

তা এক নয়, কারণ…শুকনো ঢোক গেলে নীলা।

কী কারণ?

 আমি ইচ্ছে করেই স্বামীর পদবি নিইনি।

নীলার বুক কাঁপে। তার স্বামীদেবতাটি কখনও বলেনি যে পদবি এক না হলে সর্বনাশ। বলেছে নাম ঠিকানা রেখো, বিয়ের কাগজ হাতে রেখো, দরকার নেই যদিও, সাবধানের মার নেই। বৈধ পাসপোর্ট, বৈধ ভিসা, আর কী!

কেউ না চাইতেই নীলা ঝোলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে লম্বা কাগজ বের করে বলে, এই দেখো, আমাদের বিয়ের দলিল।

কার বিয়ের দলিল? ইস্পাতমুখী জিজ্ঞেস করে।

কাগজটি ইস্পাতমুখীর দিকে বাড়িয়ে নীলা বলে, আমার আর কিষানলালের।

কাগজটির দিকে এক নজর তাকায়, হাতে নেয় না, বরং কমবয়সি নেয় ছোঁ মেরে। চুইংগাম লোকটি কমবয়সির সঙ্গে কিছুক্ষণ হড়বড় করে, নিতম্ব দুলোতে দুলোতে, বেরিয়ে যায়, নিতম্বের পেছন পেছন বেশিবয়সি ইস্পাতমুখী। আর কতক্ষণ এই কোনায় বসতে হবে, উত্তরের জন্য সে কমবয়সির দিকে তাকায়। কমবয়সির নিরিন্দ্রিয় ভঙ্গি নীলাকে কোনও আশা বা হতাশার কথা শোনায় না। অতঃপর আবার সেই কোণ, সেই অপেক্ষা, এবার ভ্লাদিমির আলেক্সান্দ্রোভিচের ঝুলে থাকা মাথার তলে। নীলার মনে হয়, এই ইস্পাতের ঘরে ঠায় বসে থেকেই বাকি জীবন কাটবে তার। নিজের অস্তিত্বটি ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, না পারছে ঘর থেকে বেরোতে, না পারছে ঠায় থাকতে। উঠে দাঁড়ায় সে, ঘরময় হাঁটে, দরজায় চোখ, নিস্তার দিতে কেউ আসছে আশায় কমবয়সি ইঙ্গিত করে স্থির হতে। স্থির হয় বটে সে, স্থিরের মধ্যে অস্থিরতা দ্বিগুণ লাফায়। আপাতত এই কোণ থেকে নীলা দূরে সরতে পারলে বাঁচে। সে কলকাতা হলে, কলকাতা।

পা পা করে এগিয়ে এসে, কমবয়সিকে জিজ্ঞেস করে, আমার সুটকেসগুলো কোত্থেকে নেব? কোন বিমানে ফিরতে হবে, এ সবের কি কিছু ঠিক করছেন?

কমবয়সি, কোনও উত্তর দেয় না। যেন এ কোনও প্রশ্ন নয়। অথবা কোনও প্রশ্ন করার অধিকার আর যে কেউ রাখুক, নীলা রাখে না।

আমার স্বামীর আমাকে নিতে আসার কথা। বাইরে অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই। তাকে কি ডাকা যাবে এখানে?

নীলা যার উদ্দেশ্যে বলে, সে একটি কৌটোর মুখ খুব যত্ন করে খুলে, চিমটি দিয়ে কালো তামাকগুঁড়ো তুলে, বাঁ হাতে ওপরের ঠোঁটটি টেনে চিমটির গুঁড়ো গুঁজে দেয় ভেতরে, তার নাকের নীচ থাকে ফুলে, নাকের পাটাও। কোনও শব্দ নেই, কেবল স্তানিস্লাভস্কির নাক ডাকার গড়গড়, আর সেনেগালি কালোর কোমরের মড়মড়। সেনেগালি কালো পিঠ টান করে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ, ক্ষণে ক্ষণে পিঠটিকে ডানে বামে মোচড় দিয়ে মড়মড় করে হাড় ফোঁটাচ্ছে। পিঠের সবগুলো হাড় ফুটিয়ে তবে সে পিঠকে নিস্তার দেয়, সেই সঙ্গে নীলাকেও। সেনেগালি উবু হয়ে আবার সেই নোংরা জলের বোতলে হাত দেয়, আবার হিপোপটেমাসের হাঁ, নিমেষে বোতল খালি।

জলতেষ্টা আর খিদে নীলাকে হাভাতের মতো গিলে খাচ্ছে। বন বন শন শন করে বাতাস নয়, ঘোরে মাথা।

কার কাঁধে মাথাটি রাখবে সে, স্তানিস্লাভস্কির কাঁধই তার কাঁধে এসে পিং পং বলের মতো পড়ছে বারবার, পেচ্ছাপের গন্ধ আরও তীব্র হয়ে নাক বেয়ে মাথায় উঠছে, মাথাটি ঘাড় থেকে আলতো করে তুলে নিয়ে ইচ্ছে করে কোথাও ছুড়ে দিতে। ছুড়লে কোথায় আর, ইস্পাতের দেয়ালেই। কী দরকার ছিল, নীলা ভাবে, কোথাকার কোন কিষানলাল, জানা নেই শোনা নেই, হুট করে তাকে বিয়ে করার! কলকাতা খাঁ খাঁ করছিল, কলকাতা না ছাড়লে নীলা মারা পড়ত। কিন্তু বিয়ে না করেও সে ছাড়তে পারত শহর, দিল্লি বা বোম্বে কোথাও সে চলে যেতে পারত, কোথাও খুব দূরে, সুশান্তর গন্ধ বর্ণ থেকে যোজন যোজন দূরে।

আচ্ছা কেউ কি আমাকে অন্তত এক গেলাস জল দিতে পারো? নীলা নিজেকেই প্রশ্ন করে। নিজেকেই সে উত্তর দেয়, না কেউ আমরা তোমাকে এক গেলাস জল দিতে পারি না।

এমন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকার অভ্যেস নেই নীলার, বিশেষ করে এ যদি অপেক্ষা হয়। সুশান্তর জন্যও সে এতটা সময় কখনও অপেক্ষা করেনি, আসলে প্রয়োজনও হয়নি, যেখানেই দেখা করার, সুশান্তই গিয়েছে আগে। সুশান্তই। মাথা ঘোরাটা আরও বাড়ে, যেন কেবল মাথা নয়, ভারী একটা বোঝা মাথায় তার, গোটা সুশান্ত তার মাথার ওপর জেঁকে বসছে আবার।

ভারী বোঝার মাথা বেমক্কা চক্কর খেয়ে প্রায় ছিঁড়ে পড়ে, যখন চোখের সামনে সেনেগালিটিকে মুক্তি দেওয়া হয় আর বেগুনি বস্তা কাঁধে নিয়ে পেছনে একটি ঝলক দিয়ে হাসির এবং কাশির, সেনেগালি অদৃশ্য হয়। নীলার হাত নিশপিশ করে আলখাল্লার ঝুল ধরে লোকটিকে হিড়হিড় করে টেনে এনে এই ইস্পাতের ঘরে বসিয়ে দিতে, তারপর নিজে সে অদৃশ্য হতে, কাঁধের চড়ুইটিকে কাঁধে নিয়ে।

কালো লোকটি তো দিব্যি চলে গেল। আমার দোষটা কোথায় শুনি। নীলা জিজ্ঞেস করে।

আচ্ছা, কোণ থেকেই নীলা প্রশ্ন করল, গোলটা কোথায় হচ্ছে। আমার পাসপোর্টটা কি নকল?

কমবয়সি উত্তর দিল না।

 আমার ভিসাটা কি নকল?

 কোনও উত্তর নেই।

 টাকাগুলো নকল?

 কমবয়সি চেঁচিয়ে উঠল, এই লাল শাড়ি, বেশি বকবক কোরো না।

লাল শাড়ি মুখে কুলুপ আঁটে।

যক্ষের ধন যার হাতে, সেই বেশিবয়সি, ফিরে এল। সঙ্গে চুইংগাম চিবোনো আগের লোকাট, লোকটি এখন আর চুইংগাম চিবোচ্ছে না। লোকটির কপালের চোখটিও নিশ্চিহ্ন। নীলার হাতে ছুঁড়ে দেওয়া হল একটি একটি করে ধন, একটি বাড়তি কাগজও পড়ল। কাগজ মানে প্রশ্নপত্র, ইস্কুল কলেজে এমন প্রশ্নপত্র যথেষ্টই হাতে নিয়েছে সে, এ কিছু নতুন ঘটনা নয়। এবার তাকে পাচার হতে হয় কমবয়সি লোকের কাছে।

ভুরু নাচিয়ে কমবয়সি বলে, বেশ তো ছাড়া পেয়ে গেলে। ভাগ্য বলতে হবে। মসিয়ে বেস-এর করুণা না হলে বুঝতে।

কমবয়সির নাকের পাটা আর নাকের তলের মতো ঠোঁটজোড়াও ফোলে। ফোলা ঠোঁট তাকে ওই হোথা যাবার ইঙ্গিত করে। ওই হোথার হদিস পেতে পেতে হাওয়ায় উড়ে যায় আরও সময়। আবার সেই কাচের ঘর, আবার সেই গজদন্ত। গজদন্তের হাতে পূরণ করা বাড়তি কাগজটি বাড়িয়ে দেয় যেখানে অনেকটা মুচলেকা দেওয়া যাহা বলিতেছি সত্য বলিতেছি, মাস পার হইবার আগেই ভালয় ভালয় এই দেশ ত্যাগ করিব। এই দেশে বসত করিবার লোভে কোনও চাতুর্যের আশ্রয় লইব না, লইলে যে শাস্তিই দেওয়া হোক, গা পাতিয়া মন পাতিয়া বরণ করিয়া লইব ইত্যাদি।

গায়ের বাদামি রং, লাল বেনারসি, কপালের আর সিঁথির সিঁদুর, সোনার অলংকার, নীল পাসপোর্ট, খুচরো টাকা প্রাণপণ আড়াল করতে করতে বেড়া ডিঙোয় নীলা। ছাড়পত্র ভিক্ষে পেয়েছে সে, এ ভিক্ষে নাও জুটতে পারত তার। করুণা নাও হতে পারত মসিয়ে বেস-এর। সেই পুরনো কলকাতার পথে আবার একই আকাশ একই মেঘ দেখতে দেখতে ফিরতে হত তাকে একই বাড়িতে, যে বাড়ি থেকে একধরনের চিরবিদায় তাকে দেওয়া হয়েছে। ভিখিরি নীলা একলা পড়ে থাকা দুটো সুটকেস জোগাড় করে যখন বাইরে আসে, সকাল গড়িয়ে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল গড়িয়ে, শেষ বিকেল।

কিষানলাল তখনও দাঁড়িয়ে, সুনীল আর চৈতালিও। নীলাকে দেখে তিনটি প্রায়-মৃত শরীর প্রায়-দৌড়ে প্রায় নীলার ওপর পড়ে। সুটকেসের ঠেলাগাড়িটি বেঁটে মোটা বুট পরা টাই পরা সুট পরা সুটের ওপরেও কোট পরা কিষানলাল প্রায় কেড়ে ঠেলতে ঠেলতে বলে, কী ব্যাপার, এত দেরি হল কেন? সেই ভোর থেকে বসে আছি!

সুনীল, লম্বা, ফর্সা পাতাকাঠি ঘটকমশাই একগাল হেসে বলে, আমরা প্রায় আশাই ছেড়ে দিচ্ছিলাম।

কপালের থেবড়ে থাকা সিঁদুরের টিপ দুহাতে ঘসে দিতে গিয়ে চৈতালি বলে, আহা কী ধকলটাই না গেছে।

কনকনে ঠাণ্ডার সূচ নীলার হাড়ে কেন মজ্জায় বেঁধে, বন্দর ছাড়তেই। চৈতালি তার গা থেকে বাড়তি গরম কোটটি দিয়ে নীলার গা ঢেকে দেয়। গা পোড়া গরম থেকে আসা নীলা, তীব্র এই সুচগুলোই নীলার প্রতি রোম ছুঁয়ে ছুঁয়ে অমল আনন্দের চাদর বুনে দেয়।

কলকাতায় এই তো আর দু মিনিট দেখেই ফোন করতে নিচ্ছিলাম, পরের ফ্লাইটে ফেরত পাঠাল কিনা জানতে। সুনীলের শুকনো ঠোঁটে ভেজা হাসির টুকরো।

স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর নামের পদবি মেলে না তাই ঝামেলা করেছে। মিললে আর সবার মতো সময়ে বেরোতে পারতাম। নীলা বলে।

পারতে না। পদবি মিললেও ওরা যা করেছে, তাই করত। সুনীল গাড়ির ভেতর গা গলিয়ে দিয়ে বলে।

নীলা গা ছেড়ে দিয়ে সামনের আসনে, বলে, ডলার আরও বেশি থাকলে পারতাম।

সুনীল গলা ছেড়ে প্রথম কেশে নিয়ে তারপর হেসে নিয়ে বলে, পারতে না। এই একই হাঙ্গামা করত ওরা।

হাজার প্রশ্নের চোখ নীলার, পাসপোর্ট ভিসা কিছু তো নকল নয়। কী কারণে করত?

সুনীল হাসে, কিষানও। প্রশ্নটির যেন একটিই মাত্র উত্তর, খ্যাক খ্যাক।

খ্যাক খ্যাকে মন ভরে না নীলার। তা হলে কারণ কী অমন হেনস্থা করার?

কারণ হল তোমার গায়ের রং। যথেষ্ট সাদা নয়। সুনীলের কথা শেষ হওয়ার আগে চৈতালি বলে, আর হল পাসপোর্ট, যথেষ্ট ধনী দেশের নয়।

নিজের গায়ের রং নীলার খুব মন্দ বলে মনে হয় না। সেনেগালির বিচ্ছিরি রঙের সঙ্গে মেলালে সে রীতিমতো সোনার বরণ কন্যা। সোনার বরণ চক্ষু কর্ণ নাসিকা কুঞ্চিত করে সেনেগালির কোমরের হাড় ফোটানো আর জল খাওয়ার নিখুঁত বর্ণনা করে বলে, ও ব্যাটা সে দিব্যি পার পেয়ে গেল।

নীলার কণ্ঠে ক্ষোভের ফুলকি। ক্ষোভ সেনেগালির পার পাওয়ায়।

প্যারিসে নেমে কালো লোক দেখব আশা করিনি। নীলা গাড়ির কাছে নিজের মুখটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলে।

কালো দেখলে গা জ্বলে কিযানেরও, সুনীল চৈতালিরও।

 যত নষ্টের গোড়া ওই কালোগুলো। বসে বসে সরকারি সাহায্য খায়, সন্ত্রাস করে বেড়ায় আর এদের দোষের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় আমাদের মতো প্রায়-সাদাদের।

সুনীলই প্রথম উত্তর দেয়, কালো লোকের জ্বালায় বাঁচার উপায় নেই।

 কালোদের পিণ্ডি চটকানো চলে অনেকক্ষণ। শুদ্ধ বাংলায়।

.

বাঙালির ভিড়ে অবাঙালি কিষানলাল মাংসের বাটির ভেতর এক টুকরো আলুর মতো পড়ে থাকে।

আলু আড়চোখে মাংস দেখে, লাল টুকটুকে মাংস। নিরামিষাশীর মাংসে লোভ নেই, কে বলে! কিষানের আড়চোখ লক্ষ করে নীলার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চকিতে সজাগ হয়, রাস্তার সিটি বাজানো যে কোনও কামুক পরপুরুষের সামনে যেমন হয়। খোলা বাহুটি মুহূর্তে আঁচলে ঢাকার পর তার চেতন ফেরে, লোকটি তার স্বামী, স্বামীর সামনে গুটোনোর কিছু নেই। যদিও বিয়ে হওয়ার পর সে দু সপ্তাহ মাত্র শুয়েছে স্বামীর সঙ্গে কলকাতার বাড়িতে, ও কেবল শোয়াই, রাতে সঙ্গম শেষে দুজনই দু দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়েছে। কিষানের সঙ্গে নীলার সম্পর্ক বলতে ওই শারীরিক সম্পর্কটুকুই। ভাঙা হিন্দি আর ভাঙা ইংরেজিতে দু-একটি কাজের কথা ছাড়া নীলার তেমন কোনও কথা হয়নি স্বামীর সঙ্গে। বিয়েতে নীলার মত দেওয়ার আগে মলিনা বলেছিলেন, অবাঙালি ছেলে, জানা নেই শোনা নেই, হুট করে বিয়ে করে ফেলবি, একটু দেখে শুনে কোনও বাঙালির ঘরে..।

বাদ দাও মা, বাঙালি তো যথেষ্ট দেখা হল। দেখা হল না? নীলা গলায় কান্না চেপে বলেছিল।

ওই দু সপ্তাহই। ওর মধ্যে পাসপোর্ট ভিসা টিকিট এ সবের ব্যবস্থা করে, দিল্লি হয়ে প্যারিস চলে এল কিষান।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষের পরীক্ষা শেষ হতে কিছু বাকি ছিল নীলার, শেষ করে, সেও আকাশে উড়বে, এমনই কথা। স্বামীকে তুষ্ট করার জন্য নীলার বাবা অনির্বাণ তাগাদা দিয়েছেন বিয়ের শাড়ি অলংকার পরে উড়োজাহাজে উঠতে, সম্ভবত পুরুষই ভাল জানে, পুরুষেরা কীসে তুষ্ট হয়। কিষানই এই জগৎ সংসারে তার সবচেয়ে আপন, যেহেতু সে স্বামী, স্বামীর সঙ্গে বাকি জীবন যাপন করতে হবে তার, স্বামীকে তুষ্ট করতে হবে জীবনভর, তবু কী ব্যাপার রাস্তার ডান দিক দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছ ছাড়া আর কিছু প্রশ্নের হ্যাঁ না উত্তর ছাড়া স্বামীর সঙ্গে মধুর কোনও বাক্যালাপ তো নয়ই, কোনও মিষ্টি হাসি বা দৃষ্টি বিনিময়, তাও হয় না। কথার ফুলঝুরি যা কিছু সব বাংলায়, যা বলে পেছন ফিরে।

আচ্ছা, বিমানবন্দরের ফরাসি লোকগুলো ইংরেজি জানে না নাকি! ভাল ইংরেজি বলল না তো!

জানে জানে। ইচ্ছে করে বলে না। এই তো সবে এলে, থাকো, দেখবে এদের বর্ণবাদী চরিত্র। চৈতালির চিকন গলা ভারী শোনায়।

কী ব্যাপার, এত চুপচাপ যে। কিষানের মাথায় চাঁটি মেরে বলে সুনীল।

কিষান, মোটা কালো মোচ, আঙুলে পাকাতে পাকাতে মুখ খোলে, বাঙালি বেচারাকে একটু সুযোগ দিচ্ছি কিচিরমিচির করার।

হা হা।

.

নীলার ক্লান্তি জলতেষ্টা খিদে মাথাধরা উবে যায় যখন প্যারিস শহরের ভেতর ঢোকে গাড়ি। নীল পোশাকের কমবয়সি, বেশিবয়সি, চুইংগাম, গজদন্তের ওপর যে অভিমান ছিল, মুহূর্তে জল হয়ে গেল। গাড়ি হোটেল দ্য ভিল ছাড়িয়ে প্যালে রয়াল ছাড়িয়ে লুভর জাদুঘরের ভেতর দিয়ে পঁ নফের ওপর দিয়ে, সেইনের পাড় ধরে বুলোভার্ড শাঁ মিশেলের। দিকে যাচ্ছে যখন নীলা নিজেকে জিজ্ঞেস করে, এর নাম কি স্বর্গ? নিজেকেই উত্তর দেয়, এর নামই।

.

অতিথি বধূ

কিষানলালের বাড়িতে পা দিয়ে নিজেকে অতিথি-মতো লাগে নীলার। বিশাল বাড়ি, দেয়ালের মাথা থেকে মেঝে অব্দি জানালা, জানালায় ভারী পর্দা, ওপারে ফুলে ছাওয়া ঝুল বারান্দা। আকাশ রঙের নীল গালিচায় ছাওয়া মেঝে, সোফায় বসতেই নরম গদিতে পা ডুবে যায় নীলার, সামনে মদের বোতলের তাক, পাথরের নারীমূর্তি, ছাদ থেকে পাখার বদলে ঝুলছে কাচের ঝালরবাতি, দেয়ালে সাঁটা ইস্পাতের পাত উত্তাপ ছড়াচ্ছে ঘরময়। চৈতালির তাড়ায় নীলাকে বাড়ি দেখতে উঠতে হয়, এই হল বসার, এই শোবার, আর ওপাশের ঘরটি ঠিক কোনও কাজের নয়, বাড়তি মানুষ বা অকেজো জিনিসপত্র গোঁজার, আর এদিকে রান্নাঘর, ওদিকে স্নানঘর, কলঘর, মলঘর। সংসার নতুন করে সাজাবার কিছু নেই, চৈতালি বলে। এই দেখো ধুলো ঝাড়ার, কাপড় ধোবার, শুকোবার, বাসন ধোবার, এমনকী ডিম ফাটাবার, ফাটিয়ে একে নাড়বার, সেদ্ধ করবার, ফালি ফালি করে কাটবার যন্ত্র। সুশান্তর সঙ্গে টোনাটুনির সংসার করার স্বপ্ন দেখত নীলা, প্রথম গাছের তল, তারপর কুঁড়েঘর, সেই নুন আনতে পান্তা ফুরনো ঘরে কুপির আলোয় দুজনে দুজনকে ভালবাসবে, বাইরে বস্তুবাদী জগতের দিকে হো হো হাসি ছুড়ে দেবে আর যেদিন চেষ্টা চরিত্তির করে শহরতলির ইস্কুলে মাস্টারির কাজ জোটাতে পারবে সুশান্ত, যেদিন হ্যাজাকবাতি আসবে ঘরে, সারারাত ধরে উৎসব হবে গানের।

ধুত হ্যাজাকবাতি টাতি না, গানের উৎসব হবে পূর্ণিমায়। খোলা মাঠে।

ভালবাসিয়া গাছের তলে বাস করিব আবেগ নীলার কিছু কম ছিল না। বাঙালি জন্মই নেয় ওই আবেগ নিয়ে। আর সাতাশে পড়তেই কালবোশেখি ঝড়ে জীবন বদলে গেছে নীলার, গুঁড়িসুদ্ধ উড়ে গেছে শখের বটবৃক্ষ, হ্যাজাকবাতি নিবে গেছে, উৎসবে নেমে এসেছে ভুতুড়ে স্তব্ধতা, পূর্ণিমা ঢেকে গেছে এক আকাশ কালো মেঘে, আর নীলাকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে অদ্ভুত বিনাশী হাওয়া সুদূরপারে এক ঝকঝকে ঘরে, সব আছের সংসারে।

কাজের লোক নেই? নীলা জিজ্ঞেস করে।

 কিষান আর সুনীল বসে গেছে মদের বোতল খুলে। সে আসরে নিজেকে গলিয়ে দিয়ে চৈতালি বলে, কিষানের বউ কাজের লোকের কথা জিজ্ঞেস করছে গো!

সুনীল সশব্দে হাসে, কিষানের মোচের তলেও হাসি ঝিলিক দেয়।

যে উত্তরটি পায় নীলা, তা হল এই বিদেশে কারও ঘরে কাজের লোক থাকে না, এ দেশে কোনও গরিব নেই যে লোকের বাড়িতে কাজ করবে। আরও একটি ধারণা দেওয়া হয়, আজ যদি কাউকে ঘরদোর পরিষ্কার করার চাকরি দেওয়া হয়, ঘড়ি দেখে এক ঘণ্টায় কম পক্ষে পঞ্চাশ ফ্রাঁ দিতে হবে।

নীলা আঙুলের কড়ায় হিসেব করে চোখ কপালে তোলে, তিনশো টাকা? পুরো মাস চবিবশ ঘণ্টা কাজ করেও তো কলকাতায় বাড়ির কাজের লোকদের তিনশো টাকা দেওয়া হয় না।

সুনীল এবং কিষান দুজনই নীলাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এ প্যারিস, কলকাতা নয়।

লাখ টাকা বেতন দিয়ে কাজের লোক কে রাখে এখানে? মদে বরফ ঢালতে ঢালতে বলে সুনীল।

সব কি নিজের হাতে করতে হবে?

সোফার হাতলে বসে নীলা।

চৈতালির গেলাসে মদ ঢালতে ঢালতে কিষান বলে, ভয় পেলে না কি?

ভয়ের কী আছে। ঘরদোর তো সব গোছানোই দেখছি। ঘরে দৃষ্টি ছড়িয়ে বলে নীলা।

গোছানোর কিছু নেই, তোমার কাজ হল, কোনও কিছু অগোছালো না করা। কিষান জোরে হাসে।

.

খিদে সামাল দিতে দু চাক রুটি খেয়ে, জল খেয়ে দু গেলাস, চৈতালির তাড়ায় গরম জলে স্নান করে নেয় নীলা। স্নানের জলে ধুয়ে যায় সিঁথির সিঁদুর। ধুয়ে যায় চোখের কালো কালি। নিজেকে শুদ্ধ স্নিগ্ধ করে ভেজা চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে, যেই না জানালায় দাঁড়িয়েছে, আকাশ বা আকাশের নীচে যে স্বর্গ, দেখতে, হই হই করে ওঠে কিষান, বউ হয়ে এ কী পোশাক পরেছ? শাড়ি পরো, গয়না পরো, সন্ধেয় লোক আসবে বউ দেখতে।

কিষানের আবদার বা আদেশ মতো নীলা জিনস ছেড়ে লাল একখানা কাতান পরে সোনার অলংকারে গা মুড়োলো, হাত ভরে সোনার চুড়ি, কানে ভারী ঝুমকা, গলায় সোনার মালা। মুখে পাউডার মেখে কাজল পরে, সিঁদুরের টিপ পরে কপালে, সিঁথিতে সিঁদুরে আঙুল টেনে এয়োতির চিহ্ন এঁকে, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক লাগিয়ে তাকাল নিজের দিকে। এ সিঁদুর তো সুশান্তর পরিয়ে দেবার কথা ছিল। নীলার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো তেতো হাসি, কোথায় এখন সুশান্ত! দিব্যি আছে নিশ্চয়। বছর ধরে প্রেম করল নীলার সঙ্গে, আজ বিয়ে হয়, কাল বিয়ে হয় এমন, শেষ অব্দি জাতে মেলে না বলে কেটে পড়ল, কুলীন ব্রাহ্মণের ছেলে সুশান্ত চক্রবর্তী, নমশুদ্রের মেয়ে নীলাঞ্জনা মণ্ডলের সঙ্গে প্রেম করতে পারে, কিন্তু বিয়ে নৈব নৈব চ। লেখাপড়া জানা ছেলেও যে এত জাতফাতের তোয়াক্কা করে! তোয়াক্কা সম্ভবত সুশান্ত করেনি, করেছে ওর বাবা মা, আর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেই বা কী করে বাপ মায়ের পছন্দ করা মেয়ের সঙ্গে সাত পাকে ঘোরে, নিজের পছন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে! নীলার কাছে ও সব কেবল অবাক করা ব্যাপার নয়। নিজের জীবনটিও তাকে অবাক করে, বিশেষ করে জেদ করে বিয়ে করার ব্যাপারটি। জীবনে আর যে দুর্ঘটনা ঘটুক এটি যে ঘটবে না, এ ব্যাপারে অনেকটাই সে নিশ্চিত ছিল। সুশান্তর বিয়ের পর, স্মৃতির ধার, দাঁতের কামড় নীলাকে রক্তাক্ত করছিল প্রতিদিন, এ ছাড়া, সে ভাবে, তার উপায়ই বা কী ছিল! নীলার হঠাৎ মনে হয়, বাঁচার জন্য কি তার কলকাতা ছাড়া, না কি এ অন্য রকম এক মৃত্যুকে বেছে নেওয়া, অথবা বিয়ে করতে হয় বলে করা, না করলে লোকে মন্দ বলে, ভুরু কুঁচকে তাকায়, তাই! নাকি কী ব্যাপার, বয়স এত হয়ে গেল, এখনও পাত্র জুটল না। এসব কূটকথা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সে যে কালা নয়, খোঁড়া নয়, তারও যে পাত্র জুটতে পারে, তা কিষানকে বিয়ে করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব আর পাড়াপড়শিকে দেখিয়ে এল। তাই কি?

.

সন্ধেয় বাড়িতে সাতজন অতিথি এল। সাতজনের মধ্যে দুজন অবাঙালি ভারতীয়, একজন ফরাসি। অডিল। গুজরাটি তারিক ইসমাইলের বউ। বউ নিয়ে এসেছে দুজন, বাবু গোগিনি আর রাজেশ শর্মা। বউ ছাড়া সানাল এডামারুকু। ওর বউ নেই। নীলা গ্রহণ করল যে যা দিল, মীনাক্ষীর সাতরঙের ফুলের তোড়া, সাহানা গোগিনির শাড়ি, আর সানালের একটি, একটিই টকটকে লাল গোলাপ আর দুগালে অডিলের চু চু করে দুটো চুমু। যে যার মতো চেয়ার টেনে বসে গেল। সবাই এ বাড়িতে আগে এসেছে। নীলাই নবাগত। অতিথিরও অতিথি।

মোয়েট অ্যান্ড শানডন শ্যাম্পেনের বোতলের গলা ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে কিষান বলল, আমার একটি নয়, দুটি নয়, একটি মাত্র বউ। আজ না হয় ভাসলামই শ্যাম্পেনের জলে। বলে যেই না বুড়োআঙুলে ছিপির গোড়ায় চাপ দিয়েছে, ছিপি বিষম শব্দে ছাদে লাফ দিল, আর শ্যাম্পেন ফুঁসে উঠে ফোয়ারার মতো ছড়িয়ে পড়ল নীলার গায়ে। যেটুকু বোতলে ছিল। তাই ঢেলে গেলাসে গেলাসে ঢেলে দিল কিষান।

গেলাস উঠিয়ে ফ্রান্সে স্বাগতম বলল বাবু গোগিনি। বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে যার যার গেলাস উঠিয়ে পাশের গেলাসে টুং টাং শব্দ তুলে একই কথা বলল, স্বাগতম। মাতামাতি কিছুক্ষণ নীলাকে নিয়ে চলল, আহা সে কী ডাগর চোখ। চোখ তো দেখে না, যেন কথা বলে। সাহানা বাঁ কাতে নীলাকে দেখে বাবুকে খোঁচায়, দেখো দেখো ওকে একটু রেখা রেখা লাগে না? গোগিনি দম্পতির ধারালো চোখের সামনে তখন নীলা, জবুথবু নীলা, বাবু ঘাড় ডানে কাত করে ফিসফিস করে, আরে না, খানিকটা মীনাক্ষী শেষাদ্রির মতো বলতে পারো।

উঁহু, সানাল লাফিয়ে তিন চারটে হাঁটু ডিঙিয়ে নীলার সামনে লাল গালিচায় আসন করে বসে নাহ, কে বলে রেখার মতো, মীনাক্ষীর মতো, আমাদের বউদি দেখতে, যতটা গম্ভীর হওয়া সম্ভব, হয়ে, বলে একেবারে নীলাঞ্জনা মণ্ডলের মতো।

সারা ঘর হেসে ওঠে।

সানাল পদার্থবিদ। দশ বছর এ দেশে, বিয়ে থা করেনি। নোয়াজি-তে বাড়ি কিনেছে। একা থাকে। ছ ফুট মতো লম্বা। মেদহীন শরীর। ঘাড় অব্দি লম্বা চুল। মাথা নেড়ে যখন কথা বলে সানাল, সামনে পেছনে দোল খায় তার চুল। একবার সানালকে দেখে, আরেকবার কিষানকে, নীলা মেলায়। সানালকে দেয় একশোয় পঁচাশি, আর কিষানকে পনেরো। সানালের সঙ্গে, নীলা ভাবে, যে তার তো বিয়ে হতে পারত। কিন্তু হয়নি। জীবন যে কোথায় কার সঙ্গে বাঁধা থাকে! আসলেই কি বাঁধা থাকে? সুনীল যদি সানাল এডামারুকুকে কলকাতায় পাঠাত বিয়ে করতে, তবেই তো জীবন অন্যরকম হতে পারত তার। হতে পারত কিন্তু হয়নি।

ওই লোকটি, ওই ফরাসি মেয়েটির স্বামী? উনি কী করেন? নীলা চৈতালির কানে কানে জিজ্ঞেস করে।

লেখেন। থাকতেন লন্ডনে। ফরাসি মেয়ে বিয়ে করে এ দেশে চলে এসেছেন। বেশ ভাল একটা বই লিখেছেন জানো তো। কী নাম যেন বইটির…চৈতালি তার হাতের বুড়ো আর মধ্যমা ঘষে মনে করার চেষ্টা কার কী নাম, কী নাম…এই সুনীল তারিকের বইটির নাম যেন কী?

কেন আমি মুসলিম নই! সুনীলের ঝটপট জবাব।

হ্যাঁ, কেন আমি মুসলিম নই।

নীলা বলে, বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো! কেন আমি ক্রিশ্চান নই। আচ্ছা, কেউ কোনও বই লিখেছে, কেন আমি হিন্দু নই?

চৈতালি ঠোঁট উলটে মাথা নাড়ে ধীরে। না তার জানা মতে নেই।

সুনীল মগ্ন ছিল হুইস্কির গুণাগুণ বর্ণনায়, মগ্নতা থেকে মুহূর্ত ব্যয় করে বলল, হ্যাঁ লিখেছে, শ্রীসুনীল চক্রবর্তী।

হা হা।

কিষান, কী খাওয়াচ্ছ এ সব! মল্ট বের করো। মল্ট।

কিষান সুনীলের আবদার পালন করে মদের তাক থেকে এক হাতে গ্ল্যানফিডিশ, আরেক হাতে লাফ্রোওইগ নিয়ে দুলতে দুলতে আসে।

আসরে তুমুল আনন্দধ্বনি।

শেষটা হবে স্প্রিংব্যাঙ্ক দিয়ে।

ওয়াও হো। সানাল সিটি বাজায়।

ইংরেজি ফরাসি হিন্দি মিশিয়ে আড্ডা জমে ওঠে। প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ করে গলার স্বর সপ্তমে ওঠে সবার। সোফার এক কোণে চৈতালির গা ঘেঁষে বসে থাকে নীলা, বউ নীলা, মুখে রং মাখা নীলা, পুতুল নীলা, অতিথি নীলা। আড্ডার লোকেরা উঠে উঠে রান্নাঘর থেকে নিজেরাই জল বা বরফ বা কমলার রস নিয়ে আসে। কমলার রস নীলার আর সাহানার গেলাসে। বাকিরা হুইস্কির সঙ্গে কেউ নেয় জল, কেউ নেয় বরফ। তারিক জল বা বরফ না মিশিয়ে খায়। খেতে খেতে অন্তত দুবার বলে ফেলেছে, হুইস্কিতে জল মেশালে এর স্বাদই নষ্ট হয়ে যায়। এই মুশকিল ভারতীয়দের, মদ খেতে জানে না, তবু খাবে।

রাজেশ বলে, আমরা কি ভাই মদ খাওয়ার জন্য মদ খাই! খাই মাতাল হবার জন্য। তা যেভাবে মাতাল হওয়া যায়।

তা বলেছ বটে ভাই! বাবু গোগিনি গলা ফাটিয়ে হাসে।

সাহানা বাবুকে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে বলে, অমন দৈত্যের মতো হাসছ কেন? এর মধ্যে মাতাল হয়ে গেলে নাকি।

সানাল খপ করে ধরে সাহানাকে, আচ্ছা, এই যে বললেন দৈত্যের মতে, দৈত্যকে কখনও হাসতে দেখেছেন?

দেখেছি দেখেছি, অডিল মুখ খোলে, লা জকোন্দাকে হাসতে দেখেছি।

 হাসির রোল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যে হাসিটি এঁকে লা জকোন্দাকে জগৎবিখ্যাত করেছেন, সেটিকে এক বাক্যে দানবীয় বলে রায় দেওয়ার পর, নীলার জানতে ইচ্ছে হয়, এ কি লোক হাসাতে, নাকি অডিল আসলেই মনে করছে হাসিটি অমন? জানার ইচ্ছেটি নীলা প্রকাশ করার সুযোগ পায় না কারণ সানাল আবার লাফিয়ে এসেছে নীলার দিকে। তিন চারটে হাঁটু ডিঙিয়ে।

গেলাসে, যেখানে কমলার রস ছিল, খানিকটা ভদকা ঢেলে দুটো ঝাঁকানি দিয়ে সানাল গম্ভীর মুখে বলল, এই স্ক্রু ড্রাইভারটা লক্ষ্মী মেয়ের মতো গিলে ফেলো তো নতুন বউ, তোমার মাথার যে সব স্ক্রু ঢিলে আছে, কাল সকালের মধ্যে সব টাইট হয়ে যাবে।

আরও এক দফা হাসি। হাসলে কিষানের কোদালি দাঁতগুলো বেরিয়ে আসে। আর বাবু গোগিনির সোনা হাসি, ওপরের পাটির দুটো দাঁত সোনায় বাঁধানো, দুটো ঝলকায়। তারিক ইসমাইল ঠোঁট টিপে হাসে, হাসলে মাথা থেকে পা অব্দি কাঁপে। চৈতালি হাসি চাপলেই বাঁ হাতে মুখ ঢাকে। সানাল হাসে হা হা হো হো করে। আর অডিলের হাসিতে কেবল ওপরের গোলাপি মাড়ি বেরোয়, না দাঁত না শব্দ। রাজেশের মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফ নেমে এসেছে ঠোঁটের ওপর, হাসলে গাল প্রসারিত হয়, এ পর্যন্তই, দাঁত ঢাকা পড়ে যায় গোঁফের আড়ালে। সুনীল হাসে দম টেনে, বাতাস বেরোয় না, ঢোকে।

ওই দমকের মধ্যে বাবু গোগিনির শখ হয় একটি প্রশ্ন করতে সবাইকে।

প্রশ্নটি হল, কেন ফরাসি পুরুষদের মুখ এত বড়, আর হাত এত ছোট?

কেউ জানে না এর উত্তর।

 বাবু গোগিনি গম্ভীর মুখে উত্তর বলল, কারণ ফরাসি মেয়েদের স্তন খুব ছোট, আর স্তনবৃন্ত খুব বড়।

অডিল আর সানাল ছাড়া আর কেউ হাসল না।

 মীনাক্ষী মুখ ঘোরাল।

সাহানা উঠে গেল।

প্রশ্নে প্রশ্ন বাড়ায়, সানাল বলে, আইন কী লিঙ্গ বলুন তো?

 উত্তর নেই কারও মুখে।

 উত্তর বলে দেয় সানাল, স্ত্রীলিঙ্গ।

উত্তর বলে দিব্যি মুখ বুজে বসে থাকে যতক্ষণ না এর কারণ জানার কৌতূহল কারও হয়। অডিলের হয়।

আইন স্ত্রীলিঙ্গ, কারণ আইনের ফাঁক আছে।

চৈতালি জিজ্ঞেস করে, কারও কি কমলার রস টস লাগবে?

 প্রসঙ্গ দ্রুত ঘোরানো হচ্ছে।

আজ তোমার ছুটি, কাল থেকে সংসারধর্মে নেমে পড়তে হবে, বুঝলে। নীলার দিকে হাসিমাখা একখানা বাণী ছুঁড়ে দেয় কিষান।

সেই বাণীতে নীলা খুব বিদ্ধ বা রক্তিম হয় না।

চৈতালি নাক গলায়, সংসার কি আর একজনের, সংসারধর্মে নামতে হলে দুজনকেই নামতে হবে।

কিষান এক চুমুকে গেলাসের তলানিটুকু গিলে বলল, আমি অবিশ্বাসী লোক। আমার দ্বারা ধর্ম টর্ম পোষাবে না।

আর আমার বুঝি পোষাবে? নীলা প্রশ্ন করে।

তোমার পোষাতেই হবে। তুমি মেয়ে।

আসরের সবাই হেসে ওঠে, বড় জব্দ করা গেছে লেখাপড়া জানা মেয়েকে।

আরে কাছে এসে বসো না, বউ হয়ে এত দূরে দূরে থাকলে চলে! ঢুলু চোখে নীলার দিকে তাকিয়ে কিষান বলে।

আসরের সবাই প্রায় ঠেলে পাঠায় নীলাকে কিষানের পাশে।

 কিষান গেলাসে চামচের টোকা দিয়ে সবার চোখ ওর দিকে ফিরিয়ে বলে, ভদ্রমহাশয় ভদ্রমহিলাগণ, আমার বউখানা বেশ সুন্দরী! ঠিক কি না?

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। সমস্বরে রব ওঠে।

নীলার পিঠে বাহ বাহ বা জাতীয় চাপড় মেরে বলে কিষান, আরে দেখতে হবে তো কার বউ!

কিষানের এমন একটা বউয়ের দরকার ছিল বড়। তারিকের মত।

এমন কেমন?

এমন লক্ষ্মী, এমন সুন্দরী। আগাগোড়া ভারতীয়। ফিরিঙ্গিদের দিয়ে কি আর পোষায়! এদের সঙ্গে প্রেম করা যায়, বিয়ে করা যায় না। বিয়ে করলে ভাই ভারতীয়। তারিক বিশুদ্ধ হিন্দিতে বলে।

চৈতালি চেঁচায়, তারিক যা বলেছে, তা কি কেউ অনুগ্রহ করে অনুবাদ করে দেবেন, অডিলের জন্য?

অডিল সাহানা আর বাবুর সঙ্গে ফিসফিসে ব্যস্ত ছিল। চকিতে মুখ তোলে, কেউ কি বদনাম করছ নাকি আমার!

আরে বলছেন কী, সানাল বলে, বদনাম হবে কেন! যা বলছে সত্য বলছে, তবে সত্যটা বানিয়ে বলছে।

তারিক হেসে বলে, জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছি, কিন্তু আমার বউয়ের মতো সুন্দরী আর কাউকে দেখিনি।

অডিলের গোলাপি মাড়ি অনেকক্ষণ বেরিয়ে থাকে।

.

আড্ডা, হঠাৎ কেউ লক্ষ করে না, টুকরো হয়ে যায়, এক দলে রাজেশ বাবু আর তারিক।

বুঝলে হে ভারতের অর্থনীতি আগামী দশ বছরে বিষম পালটে যাচ্ছে….

ধুর, ও গরিব, গরিবই থাকবে, দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে…

পুরো সিলিকন ভিলি চলে গেছে ভারতীয়দের হাতে। ইয়োরোপও এখন কমপিউটারদক্ষ লোক আনতে ভারতে ধর্না দিচ্ছে।

আরে টাকা ওই হাতে গোনা কিছু লোকের হাতে, বেশির ভাগ লোকই তো না খেয়ে মরছে।

না খেয়ে মরতে আমি পুরো ভারতে একটি লোককেও দেখিনি। সব পশ্চিমি প্রচার।

 জনসংখ্যাই দেশটিকে মারছে।

তা কেন, জনতা হল শক্তি, একে কাজে লাগাও। ইয়োরোপের কলকারখানা বন্ধ হবার জোগাড় হয়েছিল, অন্য দেশ থেকে শ্রমিক না এনে এদের উপায় ছিল না।

আরেক দলে কিষান আর বাবু গোগিনি মুখে ফেনা তুলছে বলে যে

কংগ্রেস গেছে। একশো বছরেও আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না।

 বিজেপির ওপরও আর ভরসা করা যাচ্ছে না। বাজপেয়ী আছে বলে বাঁচোয়া।

ডানপন্থী বামপন্থী সব দলের গোমর ফাঁস। জ্যাক শিাখ মস্ত টাকা ঘুষ নিয়েছে দলের জন্য, সে জানো?

জসপার দলে যে চোর নেই তা না।

হোসে বোভে যে হারে জনপ্রিয় হচ্ছে, নির্বাচনে দাঁড়ালে ঠিকই পাশ করে যাবে।

আরে ধুর, এ সব হুজুগ। নিজের ব্যবসার সুবিধে হলে ম্যাগডোনাল্ডস অসুবিধে নয়। দিক না ওরকম সস্তায় খাবার, প্রতিযোগিতার নাম শুনলে বাবুদের মাথায় আকাশে ভেঙে পড়ে।

এক কোণে সানাল আর সুনীল। অনর্গল ফরাসি ভাষায় বকে যাচ্ছে। প্রসঙ্গ ক্রিকেট।

অডিল আর মীনাক্ষী একদিকে। মুলত ওদের বাচ্চাদের গল্প।

নীলা আর চৈতালির সঙ্গে যোগ হল সাহানা।

প্রসঙ্গ সংসার। নতুন সংসার। বাজার সদাই। কোথায় কোন দোকানে পাঁচফোড়নের মশলা পাওয়া যায়, দেশি মাছ কোন দোকানে ভাল। তারপর কী রাঁধতে গিয়ে কী দিলে স্বাদ হয় ভাল।

কিষানের দলে রাজনীতি সরিয়ে ঢুকল ব্যবসাপাতি।

 মুরগিতে সালমোনেলা, পাগল গোরু রোগ!

যত্তসব প্রচার।

 মাছ মাংসের ঢালাও আমদানি হচ্ছে, দেশি মাংসের চড়া দাম।

ধুত, এদেশে ভারতীয় রেস্তোরাঁ করে লাভ নেই, রেস্তোরাঁর ব্যবসা চলে ইংলন্ডে। অবাধ অনুপ্রবেশকারীগুলো দল বেঁধে ইতালি চলে যাচ্ছে, কাজ করাব কাকে দিয়ে। কিষান বলে। তারপর নীলার দিকে তাকিয়ে, এক চোখ ছোট করে, বউকেই নামিয়ে দেব ব্যবসায়, ও রাঁধবে, আমি বাড়ব।

কী কেমন রাঁধো তুমি? কিষান কনুই ঠেলে নীলার পেটে।

 আমি রাঁধতে জানি না। নীলা নিজের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বলল।

কিষান জোরে হেসে উঠে। বলে কী মেয়ে, মেয়ে হয়েছ, রাঁধতে জানো না?

আমার রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখো, জীবনে যে ছেলেগুলো দেশের রান্নাঘরে উঁকি অব্দি দেয়নি, তারা কী দিব্যি রাঁধছে। তোমারও হয়ে যাবে।

সুনীল ক্রিকেট প্রসঙ্গ স্থগিত রেখে বলে, এই এই এই নতুন বউকে এক্ষুনি রান্নাবান্নার কথা বলছেন, আরে যাক না কটা দিন।

.

অনেক তো প্যাঁচাল হল, চৈতালি আপনি একটা গান করুন। চৈতালির হাতে চাপ দিয়ে বলে নীলা।

গান? ওরে বাপ। গান হল বাঙালির আড্ডায়। অবাঙালিরা গানের বোঝে কী! যত্তসব বেরসিক।

চৈতালি বাংলায় বলে। অবাঙালির দল থেকে কারও তেড়ে আসার তাই লক্ষণ নেই।

রাত আটটায় এক কালো সুট নেকটাই ঢুকল। হাতে খাবারের প্যাকেট। কিষানের রেস্তোরাঁর খাবার। রুটি সবজি। কিষানলাল নিরামিষাশী। এ বাড়িতে মাছ মাংস চলে না।

টেবিলে খাবার রেখে কালোসুট নেকটাই মোজাম্মেল বউ দেখতে এল কিষানের। মুখে এক গাল হাসি। চোখ এমন যে মনে হয় কাজল পরে আছে।

দিদি, আমি কিষানবাবুর দোকানে কাজ করি। বাংলাদেশের ছেলে।

বাঙালি!

 নীলার দু চোখে দু ফোঁটা আনন্দ।

চৈতালি টেবিল সাজিয়ে দেয়, কেউ বসে টেবিলে, কেউ সোফায়।

সুনীল খেতে খেতে বলে, মাছ ভাত খেতে ইচ্ছে হলে আমাদের বাড়ি চলে এসো নীলা। চৈতালি চমৎকার রান্না করে।

নীলা বলে, আমার তো এক্ষুনি লোভ হচ্ছে খেতে। রুটি সবজি একদিন খাওয়া যায়, দুদিন না।

মোজাম্মেল তার হাসি মুখে নিয়ে বলে ওঠে, কোনও চিন্তা নেই দিদি, তাজমহলে চলে আসবেন। মাছ মাংস বেশ ভাল রাঁধে আমাদের বাবুর্চি।

খাবার পরও আড্ডা গড়ায় অনেকক্ষণ। কিষান নতুন বোতল খুলেছে। বাড়িতে সিজোফ্রেনিক ছেলে রেখে এসেছে বলে তারিকদম্পতি আগে ভাগে চলে যায়। রাজেশ দম্পতিও। সুনীলদম্পতি তাদের টুম্পামণিকে সানদানিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছে, ও বাড়িতে ঘুমোবে সে। ওদের তাই তাড়া নেই ওঠার। বোতল খালি হলে সানাল ওঠে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হুকে ঝুলিয়ে রাখা গরম জ্যাকেট পরতে পরতে সানাল সবাইকে শুনিয়ে বলে, নীলাবউদি, যাবার সময় দু গালে চুমু দিতে হয় এদেশে। আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে দিচ্ছি না। আজ যত ইচ্ছে চুমু খাবার দায়িত্ব কিষানকে দিয়ে গেলাম। ওর প্রাপ্য। কী বলো কিষান।

কিষান তখনও সোফায় বসা, শার্টের বোতাম ফেটে পেট বেরিয়ে আছে। পেট না তো পেটের তেল।

ফ্যাক ফ্যাক করে হাসে সে। মোচের তলে কোদালি দাঁত বেরিয়ে এসেছে, পেটের তেলও সে হাসিতে আরও বেরিয়ে আসে।

সানালের প্রস্থানের পর সুনীল আর চৈতালি যাবার উদ্যোগ করে।

কী ব্যাপার সবাই চলে যাচ্ছেন! বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। থেকেই যান না আজ রাতে। চৈতালির হাতখানা নীলা ধরে রাখে নিজের শক্ত হাতের মুঠোয়।

পাগল মেয়ে। সুনীল দম টেনে হাসে।

নীলার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে হুক থেকে নামিয়ে ওর গরম কোট পরে নেয় চৈতালি।

ওরা অদৃশ্য হতেই হঠাৎ এক স্তব্ধতা বন্ধ জানালা দরজা ভেঙে হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে। উৎসব শুরু হয় স্তব্ধতার মাতাল নৃত্যের।

নীলা একা বোধ করে, যদিও ঘরে সে একা নয়।

নীলা একা বোধ করে, যদিও জানে ঘরে যে মানুষটি বসে আছে, সে তার পরম আত্মীয়, তার স্বামী।

.

বিছানায় ওভাবেই ওরকম গা ভর্তি অলংকার আর কাতান পরেই (দ) হয়ে শুয়ে থাকে নীলা। আর কিষান সেই দ ভেঙে(1) করে বুকের আঁচল সরিয়ে ব্লাউজের বোতাম পটাপট খুলে নেয়, কাঁচুলি ঠেলে সরাতেই নীলার স্তনজোড়া লাফিয়ে ওঠে। শক্ত আঙুলে সেদ্ধ আলু ডলার মতো দুরন্ত স্তনদুটোকে ডলে নিস্তেজ করে কিষান। ফোঁস ফোঁস শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই ঘরে। কিষানের লোমশ শরীরের তলে সে নিসাড় পড়ে থাকে। নিজেকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি সুখ পাও এ সবে?

নিজেকেই উত্তর দেয়, না।

সংসারধর্ম

১.

ওঠো ওঠো।

ওঠো ওঠো বেলা অনেক।

সারারাত ঘুম হয়নি তার, ভোরের দিকে ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছিল। ডাক শুনে সে ধড়ফড়িয়ে ওঠে, এ কোথায় নীলা, এ তার কলকাতার ঘর নয়, এ তার বিছানা বালিশ নয়। কিষানের দিকে চোখ পড়তে, কিষানের মোটা কালো মোচে, হোঁদল কুতকুতে চোখে, বসন্তের দাগ বসা গালে, তার চেতন ফেরে, এ তার স্বামীর ঘর, স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে সে এখানে, এই রু দ্য ফুবো সানদানিতে, এই ছ’তলায়, এই প্যারিসে, ধবধবে সাদা বিছানা বালিশে। কিষান কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে স্নানঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, দেখো তো কাল রাতের বাসনপত্র ওভাবেই পড়ে আছে।

ওসব যে পড়ে আছে, নীলা রাতেই দেখেছে। বাসনপত্র কলকাতার বাড়িতে এরকম পড়ে থাকলে কোনওদিন সে ফিরে তাকায়নি। বাসন সরিয়ে নেবার, ধোবার, গুছিয়ে তুলবার লোক আছে। কিষান স্মরণ করিয়ে দেয়, কলকাতায় রাজার হালে বাস করা গেলেও প্যারিসে যায় না। এখানে মেথরের কাজও নিজের হাতে করতে হয়। কলকাতায় হলে নীলা অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়েই কাটাত। চিত্রা চা আর খবরের কাগজ দিয়ে গেলে চা খেয়ে কাগজ পড়ে তবে বিছানা ছাড়ত। বিছানা ছেড়ে আরেক দফা চা। এ বাড়িতে চিত্রার বংশও নেই। নীলাকেই উঠতে হবে। উঠে কাল রাতের এঁটো বাসনপত্রের ঝামেলাও নীলাকেই ঘোচাতে হবে। ওঠে সে।

সুতি একটি শাড়ি গায়ে জড়িয়ে, চা চড়াতে রান্নাঘরে ঢুকে আঁতিপাতি করে খুঁজেও চা পাতা না পেয়ে, স্নানঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, চা পাতা কোথায় রেখেছ?

কিষান স্নান সেরে দাড়ি কামাচ্ছিল, অর্ধেক গাল ফেনায় সাদা, অর্ধেক কামানো। আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে, চোখে বিস্ময়ের ফেনা তুলে বলে, চা কে খাবে, চা তো আমি খাই না!

বলো কী! চা খাও না তুমি?

নীলার নেত্ৰমলে সংশয়। কৈশোর পার হয়েছে, অথচ চা পান করে না, ভারতবর্ষে এমন লোক নীলা কখনও দেখেনি।

নাহ।

আবার আয়না। ফেনার গাল টান করে ধরা। ফেনার গালে ধারালো ব্লেড।

আমার চা না হলে চলে না, সকালে অন্তত দু কাপ আমার লাগেই। নীলা দরজায় দাঁড়িয়ে আঙুলে চোখের পিঁচুটি মুছতে মুছতে বলে। পিঁচুটি যায়, সংশয় লেগে থাকে। ও আঙুলে ওঠে না।

চায়ের নেশা করো নাকি?

নেশা ঠিক না। অভ্যেস। নীলা বলে।

এই তো মুশকিলে ফেললে।

মুশকিলে?

এক বাড়িতে দুরকম অভ্যেস থাকলে মুশকিলই তো।

.

নীলা স্নানঘরের দরজা থেকে সরে আসতে আসতে শোনে কিষান বলছে, আমার দেরি হয়ে গেল।

পাঁউরুটি, মাখন, জেলি, কমলার রস, টেবিলে সাজিয়ে দেয় সে। স্বামী যখন সকালে আপিসে যায়, ঘরের বউদের ব্যস্তসমস্ত হয়ে এভাবেই প্রাতরাশের আয়োজন করতে হয়। বুদ্ধি হবার পর থেকে সে দেখছে, অনির্বাণের কখনও আওয়াজ দিতে হয় না যে তাঁর দেরি হচ্ছে বা কিছু, ভোরবেলা নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে মলিনা উঠে যান রান্নাঘরে, স্বামীর জন্য নিজে হাতে রুটি বেলে ভেজে গরম গরম আলুপুরি ডালপুরি, অনির্বাণের মুখে যা যা রোচে, ঠিক তাই তাই তৈরি করেন। সংসারধর্মে মলিনার কোনওদিন কোনও ত্রুটি হয়নি। নীলা মলিনার কন্যা, লোকে বলে মায়ের মতোই নাকি নম্র, শ্লীল, সুবোধ, শান্ত সে, মায়ের মতোই প্রিয়ংবদা, তার কেন ত্রুটি হবে স্বামীসেবায়।

গতরাতের বাসনপত্রও তড়িঘড়ি সরিয়ে নেয় নীলা।

কিষান সুটেড বুটেড সাহেব, টেবিলের সরঞ্জাম দেখে বলে, বাহ বেশ লক্ষ্মী বউ তো তুমি!

কেন লক্ষ্মী বলছ, টেবিলে খাবার এনে রেখেছি বলে?

কেবল কি তাই! কিষান চোখ ছোট করে হাসে।

অনির্বাণ এরকমও কখনও হাসেননি মলিনার দিকে চেয়ে। বরং প্রায় দিনই অনুযোগ করেছেন, সবজিটা একটু কম সেদ্ধ হয়েছে, ডিমের কুসুমটা ভেঙে গেছে, রুটির কোনাটা পুড়ে গেছে বলে। নীলা নিজের ভাগ্যকে বাহবা দেয় কিষানকে অসন্তুষ্ট তো নয়ই, বরং অল্পতে তৃপ্ত হতে দেখে।

তুমি ফিরছ কখন? নীলা জিজ্ঞেস করে।

ঠিক নেই। ঠিক নেই কারণ কিষান নটা পাঁচটা চাকরি করে না যে বলবে পাঁচটায় আপিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেব, রাস্তায় ট্রাফিকে নেবে পঁয়ত্রিশ মিনিট, আর ছ মিনিট যাবে নীচে রাস্তায় গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজতে, আর দু মিনিট ওপরে উঠতে, ফিরব পাঁচটা তেতাল্লিশে। দুটো রেস্তোরাঁ চালায় কিষানলাল। মঁপারনাসে তাজমহল নামে একটি, দ্বিতীয়টি লাল কিল্লা, পনেরো এরনদিসমোয়। লাল কিল্লাটি ভাল চলছে না, নাম পালটালে ভাল চলবে, কিষানের বিশ্বাস।

একটা নাম ভাবো তো! কিষান বলে।

সারাদিন আমি কী করব? নীলা কিষানের মুখোমুখি বসে গালে হাত, মাথা ঝুঁকে থাকে ডানে, চোখ কিষানে, জিজ্ঞেস করে।

বসে বসে আমার কথা ভাববে।

আর?

 আর কী? এ ভেবেই কি সময় ফুরোবে না?

যদি না ফুরোয়? নীলার উদাসীন প্রশ্ন।

এও কথা বটে।

খুব শিগরি নীলাকে নিয়ে তার বাইরে যেতে হবে, গরম জামা জুতো কিনতে, শিগরিটি ঠিক কবে, তা অবশ্য সঠিক করে কিষান বলে না।

নীলার চোখ কিষান থেকে সরে গিয়ে জানালায় আটকে থাকে। বাইরের স্বর্গে।

আচ্ছা ওটা, ওটা কি রাজার বাড়ি? আঙুল তুলে জানালার ওপারে গায়ে গায়ে মূর্তি বসানো একটি বাড়ি দেখায় সে।

রেল ইশটিশন। গার দ্য নর্দ।

 বলো কী? ইশটিশন এত সুন্দর হয়?

নীলা দৌড়ে যায় জানালার দিকে।

শহরটা কখন ঘুরে দেখাবে? গলায় তার শিশুর আহ্লাদ। পতিব্রতার সাধ আহ্লাদ অত থাকতে নেই, তবুও।

কাল তো শহর খানিকটা ঘুরে দেখালাম, এত অস্থির হচ্ছ কেন, সবে তো এলে, দেখার জন্য তো সারা জীবন পড়ে আছে তোমার। বলে বেরিয়ে যায় কিষান।

দেখার জন্য সারাজীবন পড়ে আছে, নীলা তা জানে। তবু প্রতি লোমকূপে অস্থিরতার উদ্বাহু নৃত্য দেখে সে। ইস্পাতের ঘরটিতে বসে ঠিক যেরকম দেখেছিল। ওই ঘরে বসেও সে অপেক্ষা করছিল ছুটি পেতে, এ ঘরেও একই রকম অপেক্ষার অনুভব নীলার। ছুটি পাবার অপেক্ষা, কোত্থেকে ছুটি, কোথায় যেতে, স্পষ্ট করে কিছু সে জানে না যদিও। এ ঘরেও একই রকম ডানা ঝাপটায় প্রাণপাখি। ইস্পাতের দেয়ালের চেয়ে কিছু কম নির্জীব নয় এ বাড়ির দেয়াল।

জানালায় উদাসীন বসে থেকে নীলা দেখে নীচের রাস্তায় মানুষ হাঁটছে, গাড়ি ছুটছে, সুনসান নিস্তব্ধতার মধ্যে সভ্য সুন্দর সুচারু ব্যস্ত জীবন মানুষের। কলকাতা বিষম চিৎকারে ফেটে পড়ে এই মাঝ দুপুরে–ভোঁ বাজার, ট্রাকের চাকা ফাটার, ঠেলাগাড়ির, ফিরিঅলার, ভিখিরির, কুকুরের ঝগড়ার, জলকলে মেয়েমানুষের চুলোচুলির তীব্র শব্দ, হল্লা হুল্লোড়ে কলকাতা এত তেতে ওঠে যে, তিষ্ঠোনো দায়। নীলার মনে হতে থাকে পৃথিবীর বাইরে কোথাও চলে এসেছে সে, যেখানে জঞ্জাল নেই, ঝঞ্জাট নেই, বিসদৃশ কিছু নেই, অসংবৃত, অশোভন, অকুলীন কিছু নেই।

এ শহর তেতে ওঠে না, চেঁচায় না, তা ঠিক, কিন্তু এ শহরে সবারই ব্যস্ততা আছে কেবল তারই নেই, তারই নটা পাঁচটা নেই, এক তারই অপেক্ষা কেউ করছে না কোথাও। নীলা আনমনে তার অলস অবসর জুড়ে গাইতে থাকে ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে। গাইতে গাইতে নিজের স্বরে নিজেই চমকায় সে। গার দ্য নর্দ-কে মনে হতে থাকে ফরাসি রাজার বাড়ি, আর রাজার ছেলে সে বাড়ির জানালা খুলে দেখছে দূরে এক দৈত্যের ঘরে বন্দি এক রাজকন্যা, খোঁপা ভেঙে ঘন কালো দীঘল চুল গড়িয়ে পড়েছে তার। বুকে পিঠে। রাজপুত্র ঘোড়ায় চড়ে বন্দিনীকে উদ্ধার করতে ছুটে আসছে, হাতে তার জাদুর কাঠি, সে কাঠি ছোঁয়ালেই দৈত্যের ঘরের দরজা আপনাতে সিসিম ফাঁকের মতো খুলে যাবে, রাজকন্যাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে রাজপুত্র সেই প্রাসাদের সিংহদরজায় নামবে, তারপর দুজন হাত ধরে হেঁটে যাবে অন্তঃপুরের দিকে। নিজের হাতটির দিকে তাকায় নীলা, কিষান কখনও এই হাতটি হাতে নিয়েছে বলে তার মনে পড়ে না। হাতে হাত ছুঁয়ে গেছে নিশ্চয়ই, শখ করে এই সরু সরু আঙুলের দিকে, রাঙানো নখগুলোর দিকে বাহ বেশ তো ধরনের দৃষ্টিও, নীলার মনে পড়ে না, কিষান ছুড়েছে। নীলার শরীর নিয়ে অন্ধকারে প্রমোদবিহারে যখন সে নামে, তখন তার প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ কিষানের এ তার একেবারেই মনে হয় না, বড়জোর নীলার একটি অঙ্গ লাগি ফোঁসে কিষানের একটি অঙ্গই। নীলার লাবণ্যলতা আঙুল, সুবিন্যস্ত রক্তিম নখ, ভ্রমর কালো চোখ, দীঘল ঘন চুল অন্ধকারে নমশুদ্র অস্পৃশ্যের মতো পড়ে থাকে।

.

জানালা থেকে সরে সারা বাড়িতে বই খোঁজে নীলা। থানইটের মতো গোটা পাঁচেক টেলিফোনের বই, একটি ইংরেজি ফরাসি অভিধান, তিনটে রান্নার বই হিন্দি ভাষায়, দু বছর আগের সাতটি ল মন্দ পত্রিকা, চারটে হেরাল্ড ট্রিবিউন, আত তিনটে পর্নো ম্যাগাজিন, এ ছাড়া পাতি পাতি করে খুঁজেও নীলা আর ছাপার অক্ষরের কিছু পায় না। হাল ছেড়ে গানের জগতে হামলে পড়ে, হিন্দি সিনেমার গান, চারটে ইংরেজি, কিছু ভাংড়া, আর একখানা এডিথ পিয়াফ, এই। রবীন্দ্রসংগীতের রও নেই, এমনকী ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ছিটেফোঁটাও ভাণ্ডারে নেই। এডিথ পিয়াফ চাপিয়ে নীলা দেখে একই সুরে কিচিরমিচির করে যাচ্ছে এ দেশের ছোট্ট চড়ুই। অচেনা জায়গায় অচেনা কিচিরমিচির শুনলে আরও একা লাগে। এডিথ পিয়া বন্ধ করে ঘর থেকে ঘরে হাঁটে নীলা। সঙ্গে হাঁটে তার পায়ের শব্দ শুধু। অতঃপর এক বর্ণ ফরাসি না বোঝা নীলা টেলিভিশন খুলে সাদা মানুষের হাসি ঠাট্টা দৌড় ঝাঁপ দেখতে থাকে মন দিয়ে। মগ্নতা ভাঙে ফোনের শব্দে, তখন বিকেল, ওপাশে কিষানের স্বর, কী রেঁধেছ গো গিন্নি?

গিন্নি তো কিছু রাঁধেনি।

কিষান বলে, তা হলে খাব কী গো? স্বামীকে না খাইয়ে মারবে?

নীলা ঠিক কী উত্তর দেবে বুঝে পায় না। আপাতত বিধবা হওয়ার ইচ্ছে তার নেই।

কিষানের গম্ভীর গলা, একেবারে ভুলে গেছি, বুঝলে। তোমাকে দরজার চাবি দিয়ে আসা উচিত ছিল। বাড়িতে আগুন ধরলে…

আগুন ধরবে কেন? নীলা জিজ্ঞেস করে।

আরে, দুর্ঘটনা ঘটে না? চুলো টুলো থেকে। সাবধানের মার নেই।

তা ঠিক, সাবধানের মার নেই। আগুন ধরলে সে আগুন কী করে নেভাবে সে নিয়ে ভাবছিল, এবং বুঝে পাচ্ছিল না আগুনের সঙ্গে চাবির সম্পর্ক কী হতে পারে। জিজ্ঞেস করল, কী হবে আগুন ধরলে?

তখন চাবি থাকলে বেরোতে পারবে। তেষ্টা পেলে জল পান করার মতো সোজা উত্তরটি দেয় কিষান।

ও। নীলা বোঝে উত্তরটি, ঘরে আগুন লাগলে প্রাণ বাঁচাতে ঘরের বাইরে যাবার স্বাধীনতা তার সম্পূর্ণই আছে। আগুন না লাগলে প্রাণ বাঁচানোর প্রশ্ন নেই, প্রশ্ন ওঠে না।

কিন্তু যদি ওঠে!

 রান্নাঘরে এঁটো বাসন ধুতে ধুতে, ভাত ডাল আর সবজি রাঁধতে গিয়ে, বারবারই ভাবল সে, যদি ওঠে!

নীলার ভাত গেল পুড়ে, সবজি রইল অসেদ্ধ, ডাল হয়ে গেল নুনে তেতো।

.

সন্ধের পর বাড়ি ফিরে ভারী শরীরটিকে কিষান ছুড়ে দিল সোফায়।

কাপড় জামা খোলো! হাত মুখ ধোও, বাইরে থেকে এসেছ। নীলা বলে, বলে টের পায়, বোনের স্নেহ উপচে পড়ছে কণ্ঠে তার।

এ কি তোমার নোংরা কলকাতা পেয়েছ যে বাইরে থেকে এলে ধুলোবালি দূর করতে হাত মুখ ধুতে হবে! হা হা! কিষান বলে।

সারাদিন এমন ভারী জুতো পরে আছ, জুতোটা খোলো অন্তত! বলে নীলার মনে হয়, ঠিক এভাবে মলিনা তাঁর পুত্রধন নিখিলকে জুতো খুলতে বলেন।

খুলে দাও না। কিষান দু পা এগিয়ে দেয় নীলার দিকে।

 কিষানের পায়ের কাছে বসে সরু আঙুলে জুতোর সরু ফিতে ঢিলে করে জুতো খোলে নীলা, মোজা খোলে।

নিজেকে এবার ঘরের দাসীর মতো মনে হয়, যেন চিত্রা সে, চিত্রা এরকম জুতো খুলে দেয় বাড়িসুদ্ধ লোকের।

স্নানঘরে ময়লা কাপড়ের ঝুড়ি আছে। ওতে রেখে দাও। কাল ধুয়ে দিও সব। কিষানের কণ্ঠ স্বামীর অথবা প্রভুর। বাড়ির বউকে অথবা দাসীকে যে কণ্ঠে কিছুর আদেশ করা হয়, এ ঠিক সে কণ্ঠ।

ময়লা মোজা দুটো স্নানঘরে নিতে নিতে নীলা ভাবে, রাতে বিছানায় তাকে দিব্যি পতিতা সাজতে হবে, পতিতারা যেমন করে দুটো পয়সার জন্য শরীর বিকিয়ে দেয় তেমন করে বিকোতে হবে তার নিজেকে। পতিতার খদ্দেরে এবং স্বামীতে কোনও পার্থক্য আছে কি না। নীলা ভাবে। যে পার্থক্যটি সে দেখে, তা হল পতিতাকে তার পাওনা বুঝিয়ে তবে খদ্দেরকে পার পেতে হবে, কিন্তু স্ত্রীর পাওনা না মিটিয়েও স্বামী পার পেয়ে যায় বা যেতে পারে। পতিতার স্বাধীনতা স্ত্রীর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি বলে তার মনে হয়।

নীলা ভাবে, মা বোন আর পতিতা এই তিন চরিত্রে দক্ষ অভিনয় করতে হয় স্ত্রীকে না কি এ অভিনয় নয়, এই তিন চরিত্র নিয়েই জন্ম হয় যে কোনও মেয়ের।

.

কী কেমন লাগছে প্যারিসে? কিষান বলে।

 নীলা জানালায় উদাস তাকিয়ে উত্তর দেয়, এই প্রথম ভারতের বাইরে আসা। মাঝে কোনও সমুদ্দুর নেই, তবু মনে হয় যেন সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে এসেছি। অন্য এক জগতে, বড় অচেনা।

কিষান ধীরে মাথা নাড়ে, ধীরে বলে, যাক না কটা বছর, দেখবে ভারতকেই অচেনা লাগছে। জীবন এরকম নীলা, অভ্যেস, আর কিছু নয়। এখানকার জীবনে অভ্যস্ত হলে ভারতের জীবনে তুমি খাপ খাওয়াতে পারবে না, যদিও ভারতেই তোমার জন্ম, বড় হওয়া।

তা কী কী করলে সারাদিন? কিষান প্রশ্ন করে।

 সারাদিন একা লেগেছে। ওদের ফোন নম্বর থাকলে কথা বলতে পারতাম..

ওদের কাদের?

 ওই কাল রাতে যারা এসেছিল..

ওদের সঙ্গে খামোকা কথা বলতে যাবে কেন? কাল রাতের ব্যাপার কাল রাতেই শেষ। কাজের কাজ হল দেশে ফোন করা।

কিষান কলকাতায় ফোন করে। মধ্যরাত ওখানে, ঘুমোবার আয়োজন চলছে। নীলা পৌঁছেছে, ভাল আছে, কাল অনেকটা বিয়ের অনুষ্ঠান মতো হল এ বাড়িতে, কিষান জানাল। অনির্বাণের সঙ্গে কথা হওয়ার পর নিখিলের সঙ্গে হয়, শেষে মলিনার মলিন কণ্ঠের সঙ্গে।

কী যে ফাঁকা লাগছে বাড়ি। তুই তো কখনও দূরে যাসনি আগে। মলিনার কণ্ঠ ওপাশে কাঁদে।

ধমকে ওঠে নীলা, থামো তো! বোকার মতো কাঁদছ। ওই বাড়িতে, ওই বালিগঞ্জে আমি পচে মরলে তোমার বুঝি ভাল লাগত!

কেমন আছিস, বল আমাকে। মলিনা জিজ্ঞেস করেন।

নীলা উচ্ছ্বসিত, ভাল আছি, খুব ভাল আছি। এখানে সব কিছু খুব সুন্দর। কাল রাতে খুব মজা হল। অনেক লোক এসেছিল। চমৎকার লোক সব।

ওপাশে তবু বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদেন মলিনা।

নীলার রাগ হয় কান্না শুনলে। মা ব্যাপারটি বড় বিচ্ছিরি, মেয়ের বিয়ে না হলে কেঁদে বালিশ ভেজান, আর হলেও বুক ভাসান।

.

কিষান মদ নিয়ে আয়েশ করে বসে। খেতে খেতে তার রেস্তোরাঁ লাল কিল্লায় লাল বাতি জ্বলছে জানায়। শিগরি নাম পালটাতে হবে। নীলা ঠিক বুঝে পায় না, নাম পালটালে লাল থেকে বাতি সবুজে যাবার কী কারণ। প্রশ্ন করলে কিষান হাসে, বলে এ সব বুঝবে না। বুঝিয়ে দাও, বুঝব। নীলা আবদার করে। বোঝালেও নীলা বুঝবে বলে কিষানের মনে হয় না। মেয়েদের ব্যবসাবুদ্ধি সাধারণত থাকে না বলেই সে জানে।

সুরুচি, খাবার দাবার, তৃপ্তি এই নামগুলো নীলা প্রস্তাব করে রেস্তোরাঁর নামের জন্য। কিষান উড়িয়ে দেয় নামগুলো মদগন্ধ হাওয়ায়। চলবে না। কী চলবে তা হলে? চলবে গান্ধী। গান্ধীর সঙ্গে ভারতীয় খাবারের সম্পর্ক কী? সম্পর্ক না থাকলেও গান্ধীর সঙ্গে ফরাসিদের সম্পর্ক আছে, ফরাসিরা গান্ধী নামটি যত জানে, লাল কিল্লা তত জানে না। রেস্তোরাঁয় খাবারের মান কতটুকু পালটাবে? সে একই থাকবে, আগের বাবুর্চিই রাঁধবে, আগের লোকরাই পরিবেশন করবে।

বোতল অর্ধেক খালি হলে কিষান খেতে বসে। স্বামীকে থালায় ভাত তরকারি বেড়ে দিয়ে চুক চুক করে দুঃখ করে নীলা, রান্না ভাল হয়নি বলে। অপরাধী মুখ করে সে বসে থাকে সামনে। খেতে খেতে কিষান বলে, শত হলেও বউয়ের হাতের রান্না।

নীলা জানে স্ত্রীর হাতের রান্না খেতে সব স্বামীই পছন্দ করে। অনির্বাণ যদিও মলিনার রান্নার ক্রটি সকাল বিকাল আবিষ্কার করতেন, কিন্তু চিত্রার হাতে রান্না কিছুতে মুখে তুলতেন না। একবার মলিনা জ্বরে পড়ে শুয়ে রইলেন, চিত্রা রান্নাবান্না করল, নিখিল খেল, নীলা খেল, কিন্তু অনির্বাণ খাবেন না। মলিনাকে জ্বর গায়ে নিয়ে রাঁধতে হল, তবে অনির্বাণ খেলেন। এতে অনির্বাণই যে কেবল তৃপ্তি পেয়েছিলেন তা নয়, মলিনাও পেয়েছিলেন।

কিষান খাওয়া শেষে বলে আমি বাচ্চুকে, রেস্তোরাঁয় যে ছেলেটি রাঁধে, একদিন বাড়িতে পাঠিয়ে দেব রান্না শেখাতে।

নীলা হেসে বলে, রান্নাও অভ্যেসের ব্যাপার।

.

রান্না যেমন অভ্যেসের ব্যাপার, স্বামীর সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোনোও। বিয়ের পর প্রথম যখন কিষান শুয়েছিল নীলার সঙ্গে, সারারাত হাঁসফাঁস করেছে নীলা, হাত পা ছুড়ে শোয়া, এপাশ থেকে ওপাশে গড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না বলে। ধীরে ধীরে বেশি অর্ধেক জায়গা ছেড়ে দেবার, হাত পাকে শেকলবন্দি করার এবং নাক ডাকার শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতে অভ্যস্ত হয়েছে সে, এটিকে ধাতস্থ করেছে ধীরে, এটিই মজ্জাগত হবে তার।

কিষান যখন শাড়ি সরিয়ে হাঁ মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে বুকে, আহ্লাদি গলায় বলে নীলা, আমি কিন্তু কাল একটু রাস্তায় হাঁটতে চাই।

কেন?

 এমনি?

এমনি এমনি কেউ বেরোয় নাকি?

 দূরে যাব না। কাছেই।

এই নোংরা এলাকায় কী হাঁটবে?

 নোংরা বলছ? এমন ঝকঝকে। 

একা হাঁটবে? হারিয়ে যাও যদি। সামনের শনিবার আমি সময় পাব, তখন তোমাকে ইফেল টাওয়ার দেখাতে নেব।

এদিকে ইফেল টাওয়ারের স্বপ্নে নীলা বিভোর, ওদিকে কিষান পরমানন্দে নীলার টাওয়ার এর চুড়োয়..

.

০২.

ছদিন অপেক্ষা করার পর সামনের সেই শনিবার এল। নীলাকে গরম জামা জুতো কিনে দিয়ে ইফেল টাওয়ার দেখিয়ে মঁপারনাসে তাজমহল রেস্তোরাঁয় থামে কিষান। মালিকের বউ এসেছে, ছড়িয়ে পড়ে খবর।

কালো সুট নেকটাই মোজাম্মেল এক গাল হেসে এগিয়ে আসে দিদি কী খাবেন বলুন, চা কফি, নাকি ঠাণ্ডা কিছু?

নীলা চা খাবে, কারণ তার মনে হচ্ছে বছর চলে যাচ্ছে তার চা খাওয়া হচ্ছে না। চায়ের তৃষ্ণা চা ছাড়া আর কিছুতে মেটে না।

কী চা, ভারতীয় চা, না কি কালো চা?

 নীলা অবাক হয়, ভারতীয় চা কী রকম শুনি?

দুধ দিয়ে, এলাচ লবঙ্গ দিয়ে। নীলা ওয়াক থু করে, সে চায়ে দুধই নেয় না, আবার এলাচ লবঙ্গ।

চা এল। এক দঙ্গল বাঙালি ছেলেও এল। রান্না ফেলে বাচ্চুও। এদের কারও বাড়ি যশোর, কারও রংপুর, কারও বরিশাল। হৃদয়ে নীলার খুশির জোয়ার ওঠে, বলে, আমার বাবার বাড়ি ছিল ফরিদপুর। দেশভাগের সময় বাবা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে এলেন, আর ফিরে যাননি।

ছেলেগুলোও নীলাকে, যেন ওদের পাড়াতুতো বোন, মেঘনা যমুনা পদ্মার গল্প শোনাল। দেখে কিষান ক্যাশবাক্সের সামনে থেকে চেঁচায় বাঙালির আড্ডা হচ্ছে তাই তো! এই বাঙালির মতো অলস জাতি এ জগতে নেই। কেবল খাও, ঘুমোও আর আড্ডা দাও। চলো চলো।

আরে চাটা খেতে দাও তো। নীলাও গলা তোলে। বাঙালি পেলে এই হয়, গলায় জোর বাড়ে। কেবল কি গলায়, নীলা অনুমান করে, খানিকটা মনেও।

চা খেতে খেতে নীলা জানল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে লেখাপড়া করেছে, সর্বোচ্চ ডিগ্রিও নিয়েছে, ঢাকায় চাকরি জোটেনি বলে উপার্জনের আশায় মোজাম্মেল ফ্রান্সে এসেছে আজ তিন বছর। গলা কাটা পাসপোর্ট নিয়ে এ দেশে এসেছে।

এ আবার কী জিনিস?

এ হচ্ছে অন্যের পাসপোর্টে ছবি থেকে গলা কেটে নিয়ে নিজের গলা বসিয়ে দেওয়া।

নীলা শিউরে ওঠে।

মোজাম্মেল বলে, কী আর করা, বিদেশের ভিসা তো পাব না..ভিসাঅলা পার্সপোর্ট কিনতে পাওয়া যায়, জমিজমা বাবার যা ছিল বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকায় সে পাসপোর্ট কিনে, তারপর…

নীলা উৎসুক।

তারপর ফ্রান্সে এসে কাজ শুরু করলাম।

কী কাজ?

রাস্তায় গোলাপ বিক্রি।

পদার্থবিজ্ঞান পড়ে ফুল বিক্রি?…কেন এখানে ভাল কোনও চাকরি পেলেন না? উৎকণ্ঠায় কাঁপে নীলার স্বর।

মোজাম্মেল হেসে বলল, আমাদের লেখাপড়ার কোনও মূল্য নেই এখানে। ঝাড়ুদারের চাকরিও করেছি কিছুদিন।

এই রেস্তোরাঁয় কাজ পাওয়ার আগে মোজাম্মেল কমপিউটার বাক্সবন্দি করার কাজ করত। পয়সা কম জোটে এ সব কাজে, কারণ বৈধ কাজ নয় এ সব। কাগজ না হওয়া তক চাকরি বাকরি করার অনুমতি দেয় না এ দেশের সরকার। যা করতে হয়, লুকিয়ে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে। তাই অবৈধ। কাগজ সম্পর্কে কৌতূহল বাড়ে নীলার। কেবল মোজাম্মেলই নয়, জুয়েল নামের একটি বাচ্চা বাচ্চা মুখের ছেলেও এই শব্দটি উচ্চারণ করেছে। নীলা অনুমান করে সবাই যে দুর্লভ জিনিসটির অপেক্ষা করছে রাতদিন, যেটির জন্য প্রার্থনা, যেটির জন্য প্রাণ পেতে বসে থাকা, যেটি পেলে জীবনের অন্ধকার, অসুন্দর, অবিন্যাস দূর হবে, সে হল কাগজ।

কী এই কাগজ।

 এ দেশে থাকার অনুমতি।

নীলার কৌতূহল দানোর মতো বাড়ে। মোজাম্মেল অসংকোচে বলে যায়, এদেশ থেকে দুবার তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, শেষে মামলা করলাম থাকার কারণ দেখিয়ে, ঝুলে আছে মামলা, যদ্দিন ঝুলবে, তদ্দিন থাকতে পারব…

কারণটা কী?

দিদি কী বলব…এ সব বলতেও খারাপ লাগে..নতুন পাসপোর্ট করলাম হিন্দু নাম নিয়ে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে..আমার দেশে ফেরা নিরাপদ নয়, এই বলে…

ডাহা মিথ্যে কথা। মোজাম্মেল নিজেই স্বীকার করছে। মিথ্যে শুনলে নীলার বড় রাগ হয়, কিন্তু মোজাম্মেলের মিথ্যে শুনতে শুনতে নীলা লক্ষ করে, তার রাগ হচ্ছে না।

কী বলব দিদি, মোজাম্মেল মাথা চুলকে বলে, এ সব লুকোনোর জিনিসও নয়। সবাই জানে গরিব দেশের ছেলেরা কীভাবে আসে এ সব দেশে, কী করে থাকে…

মিথ্যে না বললে হয় না?

হয় না। মোজাম্মেল বলে সে যদি বলে যে লেখাপড়া শেষ করে বেকার বসে থাকতে হচ্ছে ঢাকায়, এ দেশে সে তার বিদ্যে খাটাতে চায়, তার শ্রম খাটাতে চায়, একটি স্বাস্থ্যকর সুন্দর জীবন যাপন করতে চায়, যে জীবনের স্বপ্ন সবাই দেখে, তবে এ দেশ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে দিতে পারে, অর্থনৈতিক আশ্রয় দেবে না।

ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের কী কোরে করে, নীলার সামান্য অভিজ্ঞতা হয়েছে বিমানবন্দরে। এ নিয়ে প্রশ্ন করার রুচি হয় না তার।

মোজাম্মেলের পাশে বসে জুয়েল বলে যায় যে সে মেট্রো ইশটিশনে ফল বিক্রি করত, পুলিশের জ্বালায় ও কাজও তার ছেড়ে দিতে হয়েছে।

পুলিশ জ্বালায় কেন?

 মেট্রোতে ফল বিক্রি নিষিদ্ধ, তাই। থানায় ধরে নিয়ে যায় প্রায়ই, কাগজ দেখতে চায় কাগজ…

কাগজ কি কারও নেই?

আছে কারও কারও, কেউ কেউ আবার মোটা টাকার চুক্তিতে ফরাসি মেয়েদের বিয়ে করে, বিয়ে করলে থাকার অনুমতি জোটে, নাগরিকও হওয়া যায়। আর বহু বছর মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে একসময় হয়তো বৈধ করে নেয়, একধরনের ক্ষমাঘেন্না করে থাকতে দেওয়া আর কী!

মোজাম্মেল আর জুয়েল বেলভিলের এক বাড়িতে থাকে, সঙ্গে আরও পাঁচজন বাঙালি ছেলে, গাদাগাদি করে ওই এক ঘরেই।

সাতজন? নীলা ঠাণ্ডা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল।

কী করব দিদি, খরচ বাঁচাই।

কিষান রেস্তোরাঁর হিসেবপত্তর গুছিয়ে রব দেয়, চলো চলো।

নীলা বলে, কিন্তু আমি যে আরেক কাপ চা খাব!

চা তো খেলেই।

এক কাপে কী হয়! তোমাকে তো বলেছিই আমি খুব চা খোর। নীলা মাথা তুলে স্পষ্ট স্বরে বলে, অনুনাসিক অনুনয় নয়।

কিষানের চলো চলো রবে নীলাকে ঘিরে যারা বসেছিল, এক এক করে সরে যায়, মোজাম্মেল ছাড়া।

দেশে ফিরে যান না কেন? নীলা গলা চেপে প্রশ্ন করে।

দেশে? এত বছর এখানে কাটিয়ে দিলাম এখানে ভাল রোজগারের আশায়, এখন দেশে ফিরে করবটা কী, খাবটা কী, চাকরিও এই বয়সে কী করব, বয়সও চলে গেছে চাকরির। আর মুখ দেখাবই বা কী করে। খালি হাতে ফিরতে হবে সংসারে। এখান থেকে ছোট কাজ করেও অন্তত কিছু টাকা দেশে পাঠাতে পারি। ছোট ভাইটার লেখাপড়ার খরচ পাঠাচ্ছি।

জুয়েল আরেক কাপ কালো চা দিয়ে যায় নীলাকে, ওতে দ্রুত চুমুক দিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, এতকাল লেখাপড়া শিখে তা হলে আপনার লাভ হল কী?

লাভ কিছু নেই দিদি। মোজাম্মেল চেয়ার ছেড়ে ওঠে।

ওরাও এখানে আর যারা আছে, সবাই কি আপনার মতোই, মানে এভাবেই এসেছে এদেশে?

সবাই।

সবাই শিক্ষিত? নীলা উদগ্রীব জানতে।

সবাই শিক্ষিত, সবাই। বাচ্চু তো ডাক্তার।

এখানে ডাক্তারি করে না?

নাহ, চাকরি কে দেবে? দেশ থেকে ডাক্তারি পাশ করলেও এ দেশে আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। অবৈধভাবে এ দেশে এলে সে পরীক্ষায়ও বসা যায় না। ভাষাটা বড় সমস্যা। বলতে পারলেও লিখতে পারা যায় না।

আপনার আত্মীয়রা জানে যে রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন? নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে।

জানাই না। লজ্জা লাগে…

 মোজাম্মেল হেসে ওঠে, হাসতে হাসতে বলে, আমার আত্মীয়রা কী জানে জানেন তো? আমি ডিসি-র পদে আছি…লোকে জানে ডেপুটি কমিশনার, আমি জানি ডিস ক্লিনার।

নীলাও হেসে ওঠে। কিষান অনাহুতের মতো সে হাসিতে ঢোকে, এত হাসির হচ্ছে কী এখানে! চলো চলো।

মোজাম্মেল সরে যায়।

বাহ রান্নাঘরটা দেখে যাব না।

নীলা রান্নাঘরে ঢুকে দেখে বরিশালি সোহেল পেঁয়াজ কাটছে। বাচ্চু কড়াইয়ে তেল ঢালছে। জুয়েল থাল মাজছে।

কী ডাক্তারবাবু, কী রান্না করছেন?

 ঝোল। বাচ্চু হেসে বলে।

কীসের ঝোল?

 সবকিছুর।

 সবকিছুর মানে? মাছ না মাংসের? কোনটার?

 মুরগি গোরু ভেড়া মাছ ডাল সবজি সবকিছুরই এক ঝোল।

 নীলা বলে, হায় এ কী কাণ্ড। সব রান্নার এক ঝোল হবে কেন?

হবে দিদি। এটাই নিয়ম।

 এ তো সত্যিকার ভারতীয় খাবার হল না তবে।

 ঠিক ভারতীয় খাবার নয়। ফরাসি স্বাদে ভারতীয় খাবার।

 বাচ্চু জানাল সে জার্মানিতেও এ কাজ করেছে, ওখানে রাঁধত জার্মান স্বাদে ভারতীয় খাবার।

নীলা বলে, আমার বেশ অবাক লাগছে দেখে যে ছেলেরা পেঁয়াজ কাটছে রান্না করছে, থাল ধুচ্ছে দেখতে। এ দৃশ্য আমার জীবনে এই প্রথম দেখছি।

বাচ্চু এক বাটি পেঁয়াজ ঢেলে দিয়ে কড়াইয়ে, বলে, জীবনে কোনওদিন পানিটা গ্লাসে ঢেলে খাই নাই। জগ থেকে কেউ পানি ঢেলে দিত গ্লাসে, তারপর খেতাম। আর রান্নাঘর কাহাকে বলে এবং ইহা কী, এই বিষয়ে ধারণা আমার ছিল না। হয়েছে ইয়োরোপে এসে।

তেলে পেঁয়াজে চি চি শুরু হয়, আর গলা উঁচিয়ে নীলা বলে একরকম ভালই হয়েছে, কী বলেন। এখন বুঝতে পারছেন, মেয়েরা কী কাজটা করে রান্নাঘরে!

বাচ্চু পেঁয়াজ নাড়তে নাড়তে ধোঁয়া থেকে চোখ সরিয়ে মিষ্টি হেসে বলে দিদি, একদিন আসুন, কিছু রান্না শিখিয়ে যান।

বলে কী, আমিই কি রান্না জানি। আমিই কি গেছি রান্নাঘরে কোনওদিন। এ তো মায়েদের কাজ।

এ সব মায়েদের কাজ। মলিনার কাজ। নীলা এমনই জানে। এমনই সে দেখেছে সারা জীবন যে মলিনা রান্না করে খাবার নিয়ে আসেন টেবিলে, স্বামী সন্তানদের থালে খাবার বেড়ে দেন। স্বামী সন্তান গল্প করতে করতে খায়। মলিনা দাঁড়িয়ে থাকেন টেবিলের পাশে, কারও কিছু যদি লাগে হঠাৎ। নুন বা কিছু। ঝোল বা কিছু। জল বা কিছু। নীলা মনে করতে চেষ্টা করে মলিনাকে কখনও সে খেতে দেখেছে কি না কারও সঙ্গে বসে। না দেখেনি।

.

বাইরে ঝকঝকে রোদ দেখে গরম কাপড়ে গা না মুড়েই রাস্তায় বের হতে চায় নীলা। কিষান টেনে তাকে গরম ঘরে ঢুকিয়ে নবিশ বউটিকে বলে, ও রোদে তাপ নেই। তা যে নেই, তা আপাদমস্তক মোড়া লেপের পুঁটলি হয়ে রোদের তলে দাঁড়াতেই হুল ফোঁটানো ঠাণ্ডা গায়ে কামড় মেরে বোঝায়। মলিনাকে লেখা চিঠিটি ফেলতে নীলা একটি পোস্টাপিস খোঁজে। থিরথির করে থুতনি কাঁপছে তার, খোঁজে। এ শহরে খুঁজতে হয় না কিছু, হাতের কাছেই যেন দাঁড়িয়ে থাকে সব। চোখ মেললেই বস্তু মেলে। পোস্টাপিসে গিয়ে লম্বা লাইন দেখে লাইন না দাঁড়িয়ে সামনে এগোতে গেলেই কিষান অস্থির নীলার গরম জামার ঝুল ধরে টেনে পেছনে এনে কানে মন্ত্র দেয়, এ দেশে যেখানেই যে লাইন দেখবে, শ্রদ্ধা করবে। এ দেশ সমতার দেশ। যে আগে, সে আগে।

নীলা এক পাক নেচে ছোটবেলার খেলার মতো বলে, আগে গেলে বাঘে খায়, মাঝে গেলে নাচে গায়, শেষে গেলে দেশে যায়…

লাইনে দাঁড়াতে হয় না। পোস্টাপিসের ভেতরেই মেশিন বোঝাই। হলুদ একটি মেশিনে চিঠিটি রাখতেই মেশিন বলে দিল, কত টাকার টিকিট লাগবে এতে, টাকা দিলে টিকিট বেরিয়ে এল। সে টিকিট চিঠির গায়ে লাগিয়ে বাক্সে ফেলে দিল, ব্যাস। এক মিনিটের কাজ। কাজ নয় তো জাদু। শহরের মোড়ে মোড়ে ম্যাজিক বাক্স। কার্ড ঢোকালে সুড়সুড় করে টাকা বেরিয়ে আসে, পয়সা ঢাকালে মেশিনের পেট থেকে চা কফি বেরোয়, ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল বের হয়, খেলনা গাড়ি বেরোয়, চকলেট বিস্কুট বেরোয়। আরও ম্যাজিক দেখতে নীলার এবার অনুনাসিক অনুনয়, চলো শহরটা আরও ঘুরে দেখি।

কিষান নীলার জন্য একটি উপহার কিনবে, শহর দেখার জন্য সারা জীবন পড়ে আছে।

কী সে উপহার?

বলা যাবে না।

 ফুরফুরে মন নিয়ে গাড়িতে ওঠে কিষান। মোঁপারনাস থেকে রু দ্য রেনের ভেতর দিয়ে, শাঁ জার্মা দি প্রে বাঁয়ে রেখে, বুলোভার্ড শাঁ জার্মায় যেতে থাকে গাড়ি আর নীলা হাঁ হয়ে দেখতে থাকে ঝকঝকে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, সিনেমা। ইচ্ছে করে গাড়ি থেকে নেমে আর সব মানুষের মতো সেও হাঁটে, কোনও ক্যাফেতে থেমে আর সব মানুষের মতো বসে চা খায়, চা খায় আর মানুষ দেখে, ঝকঝকে মানুষ, ফুটফুটে মানুষ।

শাঁ মিশেলে গাড়ি রেখে জিবারে ঢোকে কিষান। বইয়ের সমুদ্র। এই সমুদ্রে নীলা ডোবে ভাসে, তল পায় না। এই সমুদ্রের জল তার চেনা নয়। চেনা জলের অন্তত একটি ছোট্ট সরোবর তার আছে, রেখে এসেছে কলকাতার বাড়িতে। বালজাক, ভিক্টর হুগো, গুস্তব ফ্লবের, মোপাসাঁ, আলবেয়ার কাম্যু, জঁ পল সার্ত্রের বইগুলো সে নেড়ে চেড়ে দেখে, বোদেলেয়র দেখে, র‍্যাঁবো দেখে, পল ভারলেইন, পল এলুয়ার দেখে, এঁদের বাংলা অনুবাদ সে কবেই পড়েছে, মূল ভাষায় বইগুলো হাতে নিয়ে নীলার অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। মোহগ্রস্তের মতো নীলা একটির পর একটি বই হাতে নেয়, ঘোর আবেশে শোঁকে বইগুলো, বুকে চেপে ধরে। পেছনে ক্রমাগত ডেকে যায় কিষান, নীলার কানে পৌঁছে না কারও ডাক।

জিবার থেকে নীলাকে প্রায় টেনে বার করতে হয়। তখনও বিহ্বল চোখ নীলার, তখনও মোহাবিষ্ট, তখনও বিবশ অস্তিত্ব তার, ফরাসি ভাষাটা শেখা দরকার আমার।

কিষান দ্রুত গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে, সে তো শিখতেই হবে। যে দেশে থাকবে, সে দেশের ভাষা না জানলে চলবে কেন!

শিখতে চাই ফরাসি সাহিত্য পড়তে। নীলা বলে।

ও তুমি তো আবার বইপোকা বলে শুনেছি। কিষান খ্যাক করে হাসে। ঠোঁট বেঁকে থাকে সে হাসিতে।

কলকাতায় বইপোকা বলে নীলার দুর্নাম আছে। বই পেলে সে নাওয়া খাওয়া তো ভোলেই, নিজের নামও নাকি ভুলে যায়, বাড়ির লোকেরা তো বলেই, বাড়ির বাইরেও বলে।

কী ব্যাপার জোরে হাঁটো। কিষান তাড়া দেয়।

 চলো না এই ফোয়ারাটার সামনে বসি।

না আজ নয়।

ওটা তো সেইন নদী। চলো নদীর ধারে হাঁটি।

আরেকদিন। কিষান কাটিয়ে যায়।

গাড়িতে উঠে কাগজে মোড়া একটি প্যাকেট নীলার হাতে দিয়ে কিষান বলল, বাড়িতে নিয়ে খুলবে।

প্যাকেটটি কোলের ওপর রেখে, নীলা আবার অস্থির হয়, আচ্ছা, এখানে বেশ তো সিনেমা, চলো সিনেমায় যাই।

ধুর, ও তুমি বুঝবে না, সবই ফরাসি…কিষানের ঠোঁট উলটে থাকে।

 কেন ইংরেজি ছবি নেই বুঝি…

ফরাসিরা ইংরেজি জানে না, জানতে চায় না।

আচ্ছা নাটক ফাটক হয় না, যাও না তুমি নাটক দেখতে?

সময় কোথায়!

 প্যারিসে তো কত জাদুঘর। চলো ল্যুভরে যাই।

আজ সময় নেই আর, বাজার করে বাড়ি ফিরতে হবে।

চলো তা হলে অন্তত কোনও ক্যাফেতে বসে চা খাই।

চা তো খেয়েই এলে তাজমহল থেকে।

 নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তা ঠিক চা তো সে খেয়েই এসেছে, এক কাপ নয়, দু কাপ।

নীলার ব্যাকুল বায়না স্বচ্ছন্দে নাকচ করে দেয় কিষান। স্ত্রীলোকের এ ধরনের বিনতি মিনতিকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়, এ শিক্ষা কিষান তার ছ বছর বয়সেই নাকি পেয়েছে। কিষান বলেও, অবশ্য হেসে গড়িয়ে, তার মায়ের একবার শখ হয়েছিল পাকা আম খাবে, সে আম পাড়তে গিয়ে গাছের মগডাল থেকে পড়ে পা ভেঙেছিলেন কিষানের বাবা, সেই থেকে কিষানের বাবা ছেলেদের ডেকে সাবধান করে দিয়েছেন, স্ত্রীলোকের আবদারে কান দিবি তো মরবি।

গাড়ি চোখের নিমেষে সেইন পার হয়ে যায়। শাতলের মিনিপ্রিতে ঢুকে নীলার বিস্ময় কাটে না। থরে থরে সাজানো খাবার দাবার। রান্না করা ভাত, এমনকী রান্না করা মাছ মাংস সবজি রঙিন রঙিন প্যাকেটে পোরা। বাড়ি নিয়ে গিয়ে গরম করে খেয়ে নিলেই রান্নার ঝামেলা যায়। বোতলে সিমের বিচি আর ভেড়ার মাংস রান্না করে রাখা, খাবারের নাম কাসুলে।

নীলা বলে, এরা কি রান্নাবান্না করে না? প্যাকেটের বোতলের খাবার কিনে খায়!

 রান্না করে সময় নষ্ট করতে কেউ চায় না। কিষান বলে।

কৌটোর জলে মটরশুঁটি, ঢেঁড়শ, গাজর, টম্যাটো ভেজানো। ন বছর পার হলেও এগুলো তাজাই থাকবে জলে। মাছ মাংসের ঝোলের পাউডার করে রাখা প্যাকেটে, বছর কয় গেলেও ক্ষতি নেই, জলে গুলে ঝোল বানিয়ে নিতে পারে। এমনকী আল সেদ্ধরও পাউডার। নীলা হতবুদ্ধি দাঁড়িয়ে থাকে।

ওটা কি সবুজ সবুজ, বোতলে?

জলপাই।

 জলপাই? না জলপাইয়ের বাচ্চা!

সবজির এলাকায় এসে সে জিজ্ঞেস করে, পুঁইশাক নেই? ওটি আমার খুব পছন্দ।

 দেশি শাক পাবে না।

লাউ কুমড়ো?

 পাগল!

আচ্ছা এদের সবজি আনাজ সব এত বড় বড় কেন!

 সব কৃত্রিম উপায়ে বানানো।

পাঁচটা ধনেপাতার ডাল একটি ঝলমলে প্যাকেটে পোরা দেখে নীলা লাফিয়ে ওঠে, বাহ কী চমৎকার দেখো দিকিনি। ধনেপাতা আমার খুব পছন্দ…

আরে তোমাকে কিলো কিলো ধনেপাতা এনে দেব চিনাদের দোকান থেকে। বারো ফ্রাঁ রাখছে, পাঁচটা ধনেপাতার জন্য…এগারো ফ্রাঁই প্যাকেটটির জন্য রেখেছে।

নীলা রেখে দেয় প্যাকেট, যেখানে ছিল।

 চাপাতা?

 ঠিক আছে চাপাতা নাও। তবে কি জানো, চায়ের নেশা বড় খারাপ নেশা।

পাঁচশো রকম পনির। সবচেয়ে দামি পনিরটি নাকের কাছে ধরে সুগন্ধ নিতে গেলেই নীলার বমি উঠে আসে, পেট থেকে গলায়। গলায় বমি আটকে নাক চোখ বন্ধ করে সে পনিরের এলাকা থেকে নিজেকে ত্বরিতে সরিয়ে নিয়ে, মাছ মাংসের এলাকায় গিয়ে শ্বাস নেয়, চোখ খোলে। টুকরো টুকরো মাংস প্যাকেটে সাজানো। ভেড়া, মুরগি, বড় মুরগি, হাঁস, খরগোশ, গোরু, শুকর। সবচেয়ে দামি মাংস গোরুর, সবচেয়ে কম দাম মুরগির। কলকাতায় সবচেয়ে সস্তা গোরু, আর চড়া দাম মুরগির। হাড় নেই কেন মাংসে? হাড়ের মাংসেই তো স্বাদ বেশি। এরা হাড় ছাড়িয়ে, তেল ছাড়িয়ে মাংস খায়। ঘটে বুদ্ধি থাকলে লোকে নাকি তাই করে। মাংসেরও ছোট জাত বড় জাত আছে, বুকের মাংস বড় জাত, দামি, পায়ের মাংস ছোট জাত, তাই দামেও কম।

কাঁটা ছাড়িয়ে আঁশ ছাড়িয়ে নানারকম মাছ রাখা প্যাকেটে।

 গোলাপি সালমনের দিকে আঙুল তুলে নীলা বলে, এটি কী করে রাঁধে?

কাঁচা খায়।

আর চিংড়ি?

এও কাঁচা খায়।

 নীলা ওয়াক করে। ওয়াক করেও ঘুরে ঘুরে বাজার তো নয়, জমকালো দোকানটিতে হাঁটে সে। হাজার রকম চকলেটে ছেয়ে আছে তাক, হাজার রকম ওয়াইনে। চোখ জুড়িয়ে যায়, মনও।

প্যাকেটের খাবারের ওপর কৌতূহল বাড়ে নীলার। একটি ঝলমলে প্যাকেট হাতে তুলে নিতেই কিষান বলে, করো কী করো কী এ তো কুকুরের খাবার!

আরেকটি কৌটো হাতে নিয়েও ঝামেলায় পড়ে। কিষান হাত থেকে কৌটোটি নিয়ে তাকে রেখে দিয়ে গলা চেপে বলে, বেড়ালের খাবারে হাত দিচ্ছ কেন? ঘরে কি বেড়াল পোষো?

নীলা বোকা বনে যায়। কুকুর বেড়ালের জন্য দোকানে খাবার কিনতে পাওয়া যায়, তাও আবার মানুষের খাবারের পাশেই সে খাবার রাখা, মানুষের খাবারের প্যাকেটের মতোই প্যাকেটে, কৌটোর মতোই কৌটোয়। কলকাতার বাজারে নীলা অনেক গেছে, ধুলো কাদায়, চিৎকারে গ্যাঞ্জামে পচা মাছের বাসি খাবারের নোংরা নর্দমার গন্ধে নীল ডুমো মাছি ভনভনে দাঁড়িয়ে নেড়িকুকুরের ঘাঅলা গায়ে লাথি কষিয়ে দূরে সরিয়ে, মানুষের বগলের ঘাড়ের দুর্গন্ধ থেকে নাক বাঁচিয়ে গা বাঁচিয়ে, চেঁচিয়ে দরদাম করে খোলা মাছের মাংসের গা থেকে মাছির উৎসব সরিয়ে, চোর ছ্যাঁচড় সরিয়ে, তবে কিছু কিনতে হয়েছে তাকে।

শাক, সবজি, ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, দুধ ডিম ইত্যাদি আর দুটো জনি ওয়াকার দোকানের ঠেলাগাড়িতে ভরে, কিষান তাড়া দেয়, চলো চলো। দাম মেটাতে গিয়ে দেখে কিষান কোনও দরাদরিতে গেল না, প্রতিটি দ্রব্যের গা থেকে পড়ে নিয়ে মেশিনই হিসেব করে দিল কত, আর কিষান একখানা নীল কার্ড বাড়িয়ে দিল, মেশিনই সে কার্ডের নম্বর টুকে নিল, মেশিনই কিষানের ব্যাঙ্ক থেকে টাকা জোগাড় করে নেবে। বাহ।

নীলার ইচ্ছে করছিল বাজারটিতেই অন্তত আরও সময় কাটাতে। এ তো আর কলকাতার বাজার নয়। কিন্তু কিষান বাড়ি যাবে। নীলা, যেহেতু সে কিষানের বউ, তাকেও বাড়ি যেতে হয়। বাড়ি ফিরে সে প্যাকেটের বইটি খুলে দেখে, রান্নার বই, মিনা জাফরির লেখা ভারতীয় রান্নায় একটি ইংরেজি বই।

কিষান যথারীতি মদের বোতল আর টেলিভিশন খুলে বসে যায়, নীলা ঠিক বোঝে, বাজার করা হয়েছে, রান্নার বইও কেনা হয়েছে, এখন তার কাজ রান্নাঘরে ঢুকে রাতের খাবারের আয়োজন করা। নীলা তাই শুরু করে, আঁচলখানা কোমরে গুঁজে। কিষান গলা উঁচু করে বলে, অনেকদিন মালাইকোফতা খাই না, আজ করো তো দেখি কেমন হয়।

আর কী?

নান করো। আর একটা সবজির কিছু থাকলে ভাল হয়, পালক পনির করো।

ও তো বাঙালির খাবার নয়। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে, চোখে পেঁয়াজের ঝাঁজ, হাতে রসুনের গন্ধ, নীলা বলে।

আমি তো বাঙালি নই। কিষান হেসে বলে।

 ও তাই তো। চোখ ঢেকে দেওয়া উড়ো চুল হাতের পিঠে সরিয়ে নীলাও হাসে।

.

 সারা সন্ধে রান্না করে নীলা। টেবিল সাজিয়ে দিয়ে খেতে ডাকে কিষানকে। খেতে খেতে কিষান জিজ্ঞেস করে, রেস্তোরাঁয় ছেলেগুলো অমন ছেঁকে ধরেছিল কেন তোমাকে?

নীলা হেসে বলে, বাঙালি তো, তাই!

মোজাম্মেলের সঙ্গে কী এত গল্প করলে?

কিষানের থালায় মালাইকোফতা তুলে দিয়ে নীলা বলে, কী করে এল এ দেশে, কেমন আছে এসব।

আর কী বলল?

এসবই, বলল কাগজ না হলে ভাল চাকরি জুটবে না।

আর?

আর বলল বেলভিলে থাকে।

আর?

আর বলল সাতজন ছেলে একটি ছোট্ট ঘরে থাকে।

আর?

 আর বলল দেশের লোকেরা তাকে ডিসি বলে জানে।

 আর?

আর বলল দেশে গেলে চাকরি পাবে না ভাল, বয়স হয়ে গেছে।

আর?

আর বলল বাচ্চু ছেলেটা ডাক্তার।

আর?

আর বলল চায়ে আরেক চামচ চিনি লাগবে কি না। না বলেছি, হ্যাঁ বললে আরেক চামচ চিনি ও এনে দিত। আরও বলল যে চায়ে চিনির বদলে নুন হলে অন্যরকম স্বাদ হয়। আমি বললাম হ্যাঁ তা হয়। ও বলল, দেব এক চিমটি নুন? আমি বললাম, না, তেতো জিনিস আমি একদম পছন্দ করি না। ও বলল, দিই একটা লেবুর টুকরো। আমি বললাম, না টক চা আমি খাই না। আরও বললাম, লেবু বেশি টিপলে কী হয় জানেন তো? ও জিজ্ঞেস করল, কী হয়? আমি বললাম, তেতো হয়।

আচ্ছা তুমি ডাল মাখানি বানাতে জানো? কিষান জিজ্ঞেস করে।

 নীলা উত্তর দেয়, না।

তবে যাই বলল, আজকের রান্নাটা সেদিনের চেয়ে ভাল হয়েছে। বইটা তোমার কাজে দেবে।

নীলা খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়ে, তুমি তো মাছ মাংস একেবারেও খাও না। খাবে না?

সে তো তুমি জানোই যে আমি খাই না। এবং কী জানো, কখনও খাব না।

মাছ মাংস খাওয়া অভ্যেস আমার। সবসময় নিরামিষ খেতে পারি না।

আমি যে নিরামিষাশী তা জেনেই তো তুমি বিয়েতে মত দিয়েছ, দাওনি?

হ্যাঁ দিয়েছি। কিন্তু আমি তো বলিনি, আমি আমিষ খাওয়া বন্ধ করব।

 এক বাড়িতে দুরকম রান্না হবে, এ তুমি ভেবেছিলে?

অত ভাবার সময় পাইনি।

নীলা এঁটো বাসন রান্নাঘরে ধুতে নিয়ে যায়। কিষান বড় একটি ঢেকুর ছেড়ে ফোলা পেটখানায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে, এত ভাল খেলে ভুঁড়ি বাড়বে না তো কি!

নীলা রান্নাঘর থেকে জল পড়ার শব্দকে আড়াল করে উঁচু স্বরে বলে, তুমি তো ডিম খাও দুধ খাও, এ সব তো আমিষ। তবে মাছ মাংস না খাবার কারণটা কী? অভ্যেস নেই, নাকি ভাবো যে জীব হত্যা মহা পাপ!

কিষান কোনও উত্তর দেয় না।

নীলা বলে, আমি না হয় তোমার রেস্তোরাঁয় গিয়ে মাঝে মাঝে খেয়ে আসব। মোজাম্মেলও বলছিল।

কিষান এরও কোনও উত্তর দেয় না।

.

রাতে ঘুমোবার আগে আর দিনের মতো মহা উদ্দীপনায় কিষান যখন শাড়ি খুলতে নেয়, নীলা অপ্রসন্ন স্বরে বলে আমার ঘুম পাচ্ছে।

ঠিক আছে ঘুমিয়ে যাও। আমি আমার কাজ করছি। একটুও টের পাবে না কী করছি আমি।

নীলা জানে এ কাজটি কিষানেরই। এ কাজে তার নিজের কোনও ভূমিকা নেই।

কিষান যখন হাতের তেলোয় স্তন দলছে, নীলা পাশ ফিরে বলে, ঘুমোতে দাও।

নীলাকে ঘুমোতে দিতে কিষানের কোনও আপত্তি নেই, তবে হাত পা মুখ মাথা যেন নীলা না নাড়ে, তা হলেই কিষান তার কাজ ভালয় ভালয় সারতে পারবে। নীলার সংশয় জাগে ভোগের জন্য জীবিত নারীদেহের আদৌ কোনও প্রয়োজন আছে কি না কিষানের। নিস্পন্দ পড়ে থাকে সে, কিষানের ভারী শরীরটি তার শরীরের ওপর কী কাজ করে যায়, কিষান ঠিকই বলেছে একটুও টের পাবে না নীলা, টের নীলা পায় না।

এর পরের ঘটনা নীলা বেশ ভাল জানে, তার শরীর থেকে নেমেই কিষান নাক ডেকে ঘুমোতে থাকবে আর সে অনেকক্ষণ একা একা জেগে থাকবে, ঘুম আসবে না সহজে। সকালবেলা ঘুমের নীলাকে ঠেলে জাগাবে কিষান ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো বেলা অনেক। তার অত সকালে জাগতে ভাল লাগবে না, তবুও সে উঠবে, কিষানের খাবার তৈরি করবে, রুটি মাখন সাজিয়ে রাখবে টেবিলে, গেলাসে কমলার রস ঢেলে দেবে। আর নিজের জন্য চা করবে, যখন চা পান করতে থাকবে, কিষান বলবে, চা খেলে গায়ের রং কালো হয়ে যায়।

নীলা জিজ্ঞেস করবে, কখন ফিরবে?

 কিষান বলবে ঠিক নেই।

এরপর নীলা জানালায় দাঁড়াবে। জানালা থেকে মানুষ দেখবে রাস্তায়।

.

০৩.

এক শুক্রবার সুনীলের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গেল কিষানলাল, নীলাকে নিয়ে। সুনীলের বাড়ি রু দ্য রিভলিতে, ইতালির রিভলিগ্রামের নামে নাম, যেখানে ১৭৯৭ সালে অস্ট্রিয়ানদের পরাজিত করেছিলেন নেপোলিয়ন। চেকস্লোভাকিয়ার অস্তারলিৎস শহরের নামে এ শহরে একটি ইশটিশন আছে, রাস্তা আছে, সেতু আছে, কারণ অস্তারলিৎসে ১৮০৫ সালে নেপোলিয়ন রাশান ও অস্ট্রিয়ান সৈন্যদের হারিয়েছিলেন। ফ্রিডল্যান্ড বলেও রাস্তার নাম আছে, যেহেতু রাশার ফ্রিডল্যান্ডে ১৮০৭ সালে রাশানদের হারিয়েছিলেন নেপোলিয়ন। যে যুদ্ধক্ষেত্রগুলোয় নেপোলিয়ন জয়ের পতাকা গেড়েছিলেন, সেগুলোই কেবল প্যারিসে সসম্মানে অবস্থিত। প্যারিসের মানচিত্র আঁতিপাতি করে খুঁজেও ওয়াটারলু বলে কোনও জায়গা নীলা পায়নি। বাঁয়ে হোটেল দ্য ভিল, ডানে ল্যুভর জাদুঘর, বাড়ির জানালা থেকে ল্যুভরের কালো ছাদ স্পষ্ট চোখে পড়ে, জানালায় দাঁড়িয়ে সামনে অবাধ সুন্দরের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে নীলা বলে, কিষান তুমি এমন জায়গায় বাড়ি নিতে পারো না?

কিষানের মোটা ঠোঁটে মোটা হাসি, তোমার বাবার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের পণের টাকা পেলে ঠিকই পারি। আজই পারি।

নীলা ঘাড় বাঁকায়, কেন? সুনীল কি পণের টাকায় বাড়ি নিয়েছে এ অঞ্চলে?

সুনীলের সঙ্গে আমার তুলনা! ও ডাক্তার, কোটি টাকা কামায়। আমি ভাই খেটে খাওয়া মানুষ। আমার ব্যবসায় প্রায় লালবাতি জ্বলছে।

সুনীলের বাড়িটিতে নীলার বোধ হচ্ছে না যে সে অতিথি, যেন এ তার নিজের বাড়ি অথবা আপন কারও বাড়ি। কিষানের বাড়ির চেয়ে এ বাড়িতেই, সে লক্ষ করে, সহজবোধ তার বেশি, স্বস্তিবোধ অসামান্য। দেয়ালে সোনালি ফ্রেমে ঝুলে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষ বসু, স্বামী বিবেকানন্দ। তিন খ্যাতিমান বাঙালি। বিবেকানন্দ নিয়ে নীলার মনে খুঁতখুঁতি আছে, লোকটি মেয়েদের বাল্যবিবাহের পক্ষে ছিলেন, বিধবাবিবাহের বিপক্ষে ছিলেন। ছিলেন না কি? নীলা জিজ্ঞেস করে, সুনীল বলে যে সে জানে না, জানে চৈতালি, চৈতালি ব্যস্ত রান্নায়, বিবেকানন্দের বিবেক বলতে কিছু ছিল না, এ ধরণের মন্তব্য তার শোনার ইচ্ছে নেই। বইয়ের আলমারিতে একগাদা বাংলা উপন্যাস, গান বাজছে আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ…ঝুঁকে বই দেখতে দেখতে গানটি গানের সঙ্গে গাইতে গাইতে রান্নাঘর থেকে আসা সর্ষে ইলিশের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়া ঘরে, নীলার ইচ্ছে করে, থেকে যায়। বইয়ের তাক থেকে তিনটে বাংলা উপন্যাস আর উনিশ শতকে ফরাসি শিল্পচেতনা হাতে নিয়ে ধার নেবার অনুমতি চাওয়ার আগেই নীলা দেখে সুনীল মাথা নাড়ছে, অর্থাৎ অনুমতির অপেক্ষা কোরো না।

আর দুটো রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট? কণিকার? এতেও কোনও বাধা নেই।

নীলা প্রফুল্লচিত্তে পায়ের ওপর পা তুলে পা নাচাতে থাকে, হাতে জর্জ পেরেকের একটি বই, নাচের পা জোড়া মেঝে থেকে সোফায় ওঠে, কুণ্ডলী থেকে ধীরে ধীরে সিধে হয়, মাথা কাত হতে হতে সোফার এক কোণে, পা ছড়াতে ছড়াতে সোফার আরেক কোণে। কলকাতার বাড়িতে সোফায় বিছানায় মাঠে উঠোনে মেঝেয় শুয়ে নীলা এরকম জগৎ ভুলে মেতে থাকত বইয়ে। সুনীল এবং কিষান দুজনই মন্তব্য করে সাহিত্যের ছাত্রী তো, বইয়ের নেশা থাকবেই।

কী ব্যাপার, বই পড়তে এখানে এসেছ নাকি?

কিষানের মন্তব্যে নীলা সোজা হয়ে বসে। বৈঠকঘরে দুটো পুরুষমানুষ বসে গল্প করছে। সেখানে নীলার এরকম সোফায় শুয়ে বই পড়া মোটেই শোভন নয়, তার বরং রান্নাঘরে গিয়ে চৈতালিকে সাহায্য করা দরকার।

রান্নাঘরে না গিয়ে সে সুনীলকে একটি বাক্য তৈরি করতে বলে যেখানে কোনও আকার নেই, ইকার নেই।

সুনীল কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে, বাক্য তৈরি সম্ভব হয় না।

জর্জ পেরেক ইকার ছাড়া এই আজদাহা বইটি লিখেছে। ভাবা যায়! নীলা তখনও বুঁদ হয়ে আছে, পেরেকে।

কী অসামান্য প্রতিভা! বিভোর নীলা।

তাই নাকি তাই নাকি বলে সুনীল কিছুক্ষণ আগ্রহ দেখিয়ে কিষানের রেস্তোরাঁ ব্যবসার গল্পে পরক্ষণেই মেতে ওঠে।

এই বইটিকে নীলা ধারের বইয়ের কাতারে রেখে কাঠের মেঝেয় হামাগুড়ি দিয়ে টুম্পার দিকে এগোয়। এই টুম্পামণি আমাকে খেলায় নেবে? টুম্পা আপন মনে খেলতে থাকে, ফিরে চায় না।

টুম্পামণি, ওই যে কথা বলা পুতুলটা দেবে আমাকে?

 টুম্পা কথা বলে না।

সুনীল বলল, ও বাংলা জানে না।

নীলা অবাক হয়। বাঙালি মেয়ে বাংলা বলতে জানে না, জানে কেবল ফরাসি। ইস্কুলে ফরাসি বলে, ঘরেও ফরাসি। সুনীল চৈতালি নিজেদের মধ্যে বাংলায় বললেও টুম্পার সঙ্গে বলে ফরাসি।

ওকে বাংলা শেখান না কেন?

দুটো ভাষা শেখার চাপে ওর মাথাটা যাবে। এ সুনীলেরও মত, চৈতালিরও। বাংলা শিখে লাভ কী, কী কাজে লাগবে এ ভাষা!

নীলা কলকাতাতেও দেখেছে, বাঙালি বাচ্চাদের ইংরেজি ইস্কুলে পাঠানো হয়, ঘরেও তাদের সঙ্গে ইংরেজি বলা হয়, যেন বাংলা কোনও অস্পৃশ্যদের ভাষা, আর এরকম যুক্তিই দেওয়া হয় বাংলা জেনে কী লাভ! ভারতবর্ষের বাংলা মুল্লুকে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বড় বড় বিদ্বান বসে আছে, চাকরি জোটে না, জীবিকার তাগিদে অন্য রাজ্যে পাড়ি দিতে হয় বাঙালিদের, উত্তরপ্রদেশে, মহারাষ্ট্রে, ও সব রাজ্যে বাংলা চলে না, ইংরেজি ভাল জানলে যে কোনও রাজ্যে চাকরি পাওয়া সহজ হয়, সে কারণে বাংলার প্রতি অনীহা। নীলা সব জেনেও বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করেছে, অনির্বাণ বলেছিলেন, এ পড়ার কোনও মূল্য নেই, কিন্তু প্রতিবাদ করেছে সে, পৃথিবীতে একুশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, এর মূল্য থাকবে না কেন? পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা এটি, এর লিখিত সাহিত্যই হাজার বছরেরও অধিক পুরনো, বাংলার যত গভীরে গেছে, ততই অমূল্য সম্পদের খোঁজ পেয়েছে সে, কোনও গোপন হিরের খনির সন্ধান পাওয়ার মতো। এ ভাষাটি নিয়ে অন্যভাষীরা গৌরব করলেও, নীলা দেখেছে, বাঙালিরাই এই ভাষায় কথা বলতে, লিখতে, বাংলাভাষী বলে নিজেদের পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত বোধ করে।

টেবিলে হরেক রকম খাবার এনে রাখে চৈতালি, খাবারের গন্ধেই জিভে জল চলে আসে নীলার। ডালের বড়া, শুক্তো, পোস্ত, বেগুনভাজা, ফুলকপিভাজা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, রুইমাছের পাতুরি, সরষেইলিশ, চিংড়িমাছের মালাইকারি, মুরগির ঝোল, ভেড়ার মাংসের কালিয়া খেতে খেতে নীলার মনে হয়, দীর্ঘদিন সে উপোস ছিল। ভরপেট খেয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেয়, সে জানে, জিজ্ঞেস করলে চৈতালি পই পই করে বলবে কোন দোকান থেকে কোন মাছ কিনেছে, কোন দোকান থেকে মাংস। এ সব জেনে নীলা এও জানে, তার কোনও লাভ নেই। কিষানের বাড়িতে মাছ মাংস কেন, এর গন্ধও ঢুকলে চলবে না।

খাওয়া শেষে বাটায় পান নিয়ে দিদিমা ঠাকুরমাদের মতো চৈতালি বসে সুনীলের সামনে, এই পুজোয় পবন দাস বাউলকে ডাকছ তো?

নীলা পান মুখে দিয়ে বলে, এই প্যারিসে পুজোও হয়?

কেন হবে না? রীতিমতো ঘটা করে হয়।

সুনীল মাথা চুলকোয়। পুজোকমিটির সভাপতির পদ পেয়েছে সে এ বছর, এত দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাঁধ ঝুলে পড়ার জোগাড়। আমার এত পোষায় না। জয়ন্তকে দেব দায়িত্ব।

জয়ন্তকে দেবে, ও তো বাংলাদেশি!

তা হোক হিন্দু তো।

 তার চেয়ে অসীম রায়কে দাও। গতবার বাংলাদেশিগুলো মণ্ডপ করবে বলল টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেল, ভুলে গেছ? চৈতালি অদৃশ্য এক অনুযোগের বাটাও পানের বাটার সঙ্গে নিয়ে বসেছে।

সুনীল ভোলেনি।

বাঙালির মাঝখানে শক্ত এক দেয়াল, নীলা অনুমান করে। বাংলাদেশের বাঙালিরা বেশির ভাগই এ দেশে অবৈধভাবে এসেছে, থাকেও অবৈধভাবে, কাজও করে অবৈধভাবে। যতসব অবৈধ ছোটলোক। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বাঙালি যত না, তার চেয়ে বেশি ভারতীয়। পাঞ্জাবি, মরাঠি বা গুজরাটি যাকে পাক দেশি ভাই বলে জড়িয়ে ধরে ফরাসি, হিন্দি, ইংরেজি ধুমসে বলে যাচ্ছে, কেবল পেচ্ছাপ পায়খানা চেপে রাখার মতো বাংলাটা পেটে চেপে রাখে, ব্যাস। বাংলা হচ্ছে আড়ালে আবডালে, না পারতে।

তিন বাঙালির মাঝখানে কিষানলালকে একটি রামছাগলের মতো দেখতে লাগে। রামছাগলটি, নীলা কায়মনোবাক্যে কামনা করে, একা বাড়ি ফিরে যাক, বাড়ি ফিরে একা ঘরে মদ খাক, মদ খেয়ে একা বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ক, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখুক সে একা, তার নাস্তা তৈরি করার কেউ নেই ঘরে, কেউ নেই তার জুতোর ফিতে বেঁধে দেবার, সন্ধে বা রাতে ফিরেও দেখুক সে একা, তার জুতো মোজা খুলে দেবার কেউ নেই, রান্না করার, টেবিলে খাবার সাজিয়ে দেবার, পরিবেশন করার কেউ নেই, একা সে কথা বলুক নিজের সঙ্গে, একা সে কাঁদুক। কিষান একা বাড়ি ফিরবে না, একা তার না ফেরায় সায় দেয় সুনীল। সুনীলের চশমাচোখের লম্বাটে মুখের দিকে তাকিয়ে নীলা ভাবে, এই লোকটি প্রেসিডেন্সি কলেজে নিখিলের সঙ্গে পড়ত, লোকটি নীলাদের বালিগঞ্জের বাড়িতে অনেকদিন গিয়েছে, মলিনা যত্ন করে ছেলে আর ছেলের বন্ধুকে খাইয়েছেন। মাসিমার হাতের রান্নার তুলনা হয় না! খেয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে এই লোকটি অনেকদিন বলেছে। নীলা বেণী দুলিয়ে ইস্কুল থেকে ফিরলে লোকটি প্রায়ই বলত, কীরে পাগলি, এত লেখাপড়া করে কী হবে, বরের ঘরে গিয়ে তো ওই হাঁড়িই ঠেলবি! নীলা জিভ দেখিয়ে চলে যেত অন্য ঘরে। সেই জিভ দেখানো মেয়ে, পরোয়া না করা মেয়ে, দিব্যি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙিয়ে গেল তরতর করে, অশিক্ষিত গৃহবধূ না হতেই তো! হাঁড়ি ঠেলার কাজ না নিতেই তো! লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে নয়তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রী পড়াবে, এই স্বপ্ন নিয়েই তো! আর শেষ অব্দি, এই লোকটি, এই সুনীল, নিখিলের বন্ধু সুনীল, এক কদাকার ব্যবসায়ীকে পাঠিয়ে দিল নীলার স্বপ্নের বাগানে মোষ চরিয়ে দিতে, নীলাকে তুলে এনে হাঁড়ি ঠেলার কাজে লাগাতে! ভেবে তার অবাক লাগে, নিখিলের এই বন্ধুটির হাতেই ছিল তার ভবিষ্যৎ। নিখিলের এই বন্ধুটি বিশ্বাস করত, নীলাকে হাঁড়ি ঠেলতে হবে যত বিদুষীই সে হোক না কেন! ঠিকই নীলা হাঁড়ি ঠেলছে। আগের মতো আর সে জিভ দেখাতে পারে না। জিভ এত ভারী আর শক্ত হয়ে আছে যে ইচ্ছে করলেও সম্ভব নয়। নীলার নিজের কোনও মাটি নেই, যেখানে সে স্বপ্ন রোপণ করবে। নীলার রাগ হতে থাকে সুনীলের ওপর।

.

বাড়িতে ফিরতে গিয়ে রাতের উজ্জ্বল প্যারিস দেখতে দেখতে মনে মনে ঘ্রাণ নেয় নীলা ছোটবেলার সেই সুগন্ধীর, সেই ইভনিং ইন প্যারিস নামের সুগন্ধীর। রাস্তায় ছেলে মেয়ের কোলাহল, মেয়েরা নিশ্চিন্তে হাঁটছে, শিরদাঁড়া টান করে, শক্ত করে। আতঙ্কের লেশ নেই কোথাও, পদক্ষেপে দ্বিধা নেই কোনও।

রাস্তায় এত রাতেও মেয়েরা একা একা হাঁটে? ভয় পায় না? নীলা জিজ্ঞেস করে।

 কীসের ভয়? কিষান পালটা জিজ্ঞেস করে।

তাও তো কথা! নীলা ভাবে, কীসের ভয়। এ তো আর কলকাতা নয় যে ঝোপের আড়াল থেকে পাঁচটা কামুক বা ডাকাত অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে মেয়েদের ওপর। টাকা পয়সা গয়নাগাটি মান সম্মান এমনকী জীবন, যদি ইচ্ছে হয়, ছিনিয়ে নেবে।

নীলা জিজ্ঞেস করে, আঙুল তুলে একটি মেয়েকে দেখিয়ে, এই মেয়েটি, এই ধরো ষোলো সতেরো বছরের মেয়ে, সামনের ওই বাড়ি থেকে এই বেরোল, কোথায় যাচ্ছে বলো তো এত রাতে!

কিষান উত্তর দেয়, হয়তো কোনও বারে, নয়তো ডিসকোতে, সারারাত আড্ডা দেবে, নাচবে, আনন্দ করবে।

ওর মা বাবা কিছু বলবে না? বড় বড় চোখে নীলা তাকায় কিষানের দিকে।

যদি শুক্রবার রাতে এ বয়সি মেয়েরা ঘরে বসে থাকে, যদি কোনও ছেলে বন্ধু না থাকে, যদি না শোয় কোনও ছেলের সঙ্গে, তা হলে মা বাবাই বরং বিষম ভেঙে পড়ে। ভাবে যে এ মেয়ের যৌনাঙ্গে অথবা মস্তিষ্কে দুরারোগ্য কোনও ব্যাধি আছে। মেয়েরা বেরিয়ে গেলে মা বাবা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়, আর ঘরে থাকলে বরং দুশ্চিন্তায় সারারাত না ঘুমিয়ে কাটায়। আর বেশির ভাগই তো এ বয়সে বেরিয়ে যায় বাবা মায়ের বাড়ি থেকে। নিজেরা একা থাকে নয়তো প্রেমিকের সঙ্গে থাকে।

বিয়ে ছাড়া? নীলা আবার প্রশ্ন করে।

 নিশ্চয়ই। বিয়ে আজকাল কেউ করে না। আর করলেও অনেক পরে। পাঁচ ছ বছর এমনকী দশ বছর একসঙ্গে থাকার পর। বাচ্চা কাচ্চা হলে পর।

লেখাপড়া? নীলার কৌতূহল ক্রমাগত বাড়ে।

লেখাপড়া করতে এ দেশে পয়সা লাগে না। সরকারই দেয়। আর মেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি ছোটখাটো কাজ করে, চলে যায়।

খুব মুক্ত জীবন। নীলা বলে।

হ্যাঁ, এদের মূল উদ্দেশ্য জীবনকে উপভোগ করা, সে যে ভাবেই হোক। কিষান বলে, ঠোঁট তার উলটে থাকে, নাক কুঁচকে থাকে।

যত্তসব। কিষান বলে, এই মেয়েরা সতীত্ব হারায় কখন জানো তো! পাঁচ ছ বছর বয়সে, ডাক্তার ডাক্তার খেলতে গিয়ে। কুড়ি বছরের আগেই একশো একটা ছেলের সঙ্গে ঘুমোনো সারা। কোনও আদর্শ নেই, মাইরি। আজ একে ভালবাসল তো কাল ছেড়ে গেল, পরশু আরেক জনের সঙ্গে, এরা কোনও স্থায়ী বন্ধনে নেই। এরা জানে না কী করে স্থির হতে হয়, কোথায় এবং কখন। এরা জানে না, পারে না।

নীলা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে নিজের ভেতরে কোথাও, চলো ওই সেতুতে থামি কিষান, ওই পঁনফে, একটু হাঁটি। চলো সেইন নদীটি দেখি ঝুঁকে, ঢেউ কী করে ফুলে ফুলে আসছে দেখি, দূর থেকে নতরদামের চুড়োর আলো ঢেউগুলোর মাথায় কেমন সোনার মুকুট পরাচ্ছে দেখি।

কিষান গাড়ি থামায় না। হাতে স্টিয়ারিং তার, হাতে যার স্টিয়ারিং, তার ক্ষমতা অনেক, নীলা জানে। তবে কিষানকে থামতে হয় রিপাবলিকের মোড় থেকে যখন শাঁ শাঁ শব্দ তুলে ধেয়ে আসে হাজার হাজার রোলার স্কেটার, হাজার প্রজাপতির মতো উড়ে, তখন। নীলা দুচোখে রাজ্যির বিস্ময় নিয়ে দেখে তরুণ তরুণীর জুতোয় চাকা লাগানো, চাকা চলছে, জুতো চলছে, ওরাও চলছে। তারুণ্যের এমন বিচ্ছুরণ, নবীন প্রাণের জাগরী নিনাদ এর আগে এত কাছ থেকে নীলা দেখেনি, শোনেনি।

এ সব করছে কেন এরা?

কিষান বলে, আনন্দ করতে।

কী করতে?

 আনন্দ। আনন্দ। কিষানকে চেঁচাতে হয়।

কেবলই আনন্দ?

 কেবলই।

নীলা বেরিয়ে আসে বাইরে, দু চোখ মেলে দেখে গতিময় মানুষ, নীলাকে পেছনে রেখে চলে যাচ্ছে, চোখের পলকে যাচ্ছে, হাওয়ার গতিতে যাচ্ছে, জীবনের গতিতে যাচ্ছে আর গতিহীন নীলা, স্থবির নীলা দাঁড়িয়ে থাকে একা, দুচোখে বিস্ময় তার, দুচোখ জুড়ে মুগ্ধতা।

কিষান তাড়া দিলে গাড়ির ভেতরের অন্ধকারে ঢুকতে হয় নীলাকে, যদিও তার ইচ্ছে করছিল রাস্তায় হাঁটতে, দৌড়োতে, চাইছিল শরীরে মনে নির্ঝরের গতি, চাইছিল সারারাত তারুণ্যের উল্লাসে মেতে উঠতে, কিন্তু কিষান, যেহেতু কিষান তার স্বামী, আর যেহেতু স্বামীর আদেশ অমান্য করা অন্যায়, যেহেতু স্বামী ছাড়া সে চলৎশক্তিহীন, ডাকলে তার ইচ্ছের পায়ে শেকল পরাতে হয়।

কী অপূর্ব! অন্ধকার বলে কিছু নেই এখানে। সবই উজ্জ্বল, আলোকিত, সবই জীবন্ত। বার বার বলে নীলা।

.

বাড়ির কাছে পৌঁছে গাড়ি রাখার জায়গা খুঁজতে বড় রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা, এক গলি থেকে আরেক গলিতে কলুর বলদের মতো ঘোরে কিষান। জায়গা ঘণ্টাখানেক পর মেলে।

গাড়ি গ্যারেজে না রেখে রাস্তায় রাখছ যে? নীলা বেরিয়ে বলে।

 কারও গ্যারেজ আছে নাকি, সব্বাই তো রাস্তাতেই রাখে।

কলকাতায় রাস্তায় এরকম গাড়ি পড়ে থাকতে নীলা দেখেনি। অনির্বাণের অ্যামবেসেডার গাড়িটির লেজের দিকটা ডেবে গেছে, দরজায় জং ধরেছে, তারপরও ওটি রাখা হয় গ্যারেজে, রেখে আবার শক্ত তালাও লাগানো হয় গ্যারেজের দরজায়।

এই যে রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাড়ি দাঁড়ানো, সারারাত এখানেই থাকবে গাড়ি?

 কিষান মাথা নাড়ে। থাকবে। থাকে। থেকে আসছে।

 চুরি হয় না?

চুরি হবে কেন?

নীলা ভাবে, তাই তো চুরি হবে কেন? এ তো চোর ডাকাতের দেশ নয়।

বাড়ি থেকে গাড়ি দূরে রাখাতে নীলার একরকম ভালই লাগে, অনেকটা পথ এখন সে হেঁটে যাবে, অনেকটা পথ সে দেখে দেখে যাবে পথের চরিত্র। আলোর প্লাবন বইছে বন্ধ দোকানগুলোয়, ইটের নয় কাঠের নয় পাথরের নয়, কাচের দেয়াল দোকানগুলোর। নীলা কাচের ওপারে দেখে সারি সারি অলংকার সাজানো, দামি পাথরের, সোনার রুপোর মুক্তোর হিরের। যে কেউ ইচ্ছে করলে কাচ ভেঙে ভেতরে ঢুকে অনায়াসে হাতিয়ে নিতে পারে অমূল্য সব মণিমুক্তো।

চুরি হয় না?

 কিষানের কণ্ঠস্বরে এক রাশ বিস্ময়, চুরি হবে কেন?

 নীলার চেতন ফেরে, তাই তো, চুরি হবে কেন? এ তো কলকাতা নয়।

.

০৪.

কোনও ঘটনা না ঘটলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও থাকে কম, কিন্তু নীলার সাদামাটা ঘটনাবিহীন জীবনে হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। স্নানঘরে পা পিছলে কপাল ফাটে তার। ফাটা কপালের কপাল ফাটা বড় ভয়ানক, নীলার ধারণা। মাথা গিয়ে পড়েছিল বাথটাবের কোণে, স্রোতের মতো রক্ত বয়ে গেছে। কিষানকে ফোনে খবর দেওয়ার শক্তিটুকু শেষ অব্দি ছিল, ভাগ্য। তড়িঘড়ি বাড়ি পৌঁছে নীলাকে নিয়ে কিষান দৌড়োল লারিবুয়াসিয়ের হাসপাতালে, গার দ্য নর্দের কাছেই সে হাসপাতাল। কলকাতার হাসপাতালে শত রোগীর উপচে পড়া ভিড় দেখে নীলা অভ্যস্ত, আর এ হাসপাতালের অপেক্ষাঘরে পাঁচ কি ছ জন রোগী বসে আছে, ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা, দেখে রোগী বলে বিশ্বাস হয় না, যেন বাড়িটির ভোজসভার নিমন্ত্রিত অতিথি এরা। নীলার গায়ে রক্তমাখা শাড়ি, পাতলা তোয়ালেয় পেঁচানো মাথা, নীলরতন-বর্হিবিভাগের জলজ্যান্ত রূপ। একজন একজন করে ডাক পড়ছে ভেতরে। ডাক পড়লে নীলাকে ভেতরে যেতে হয়, নার্স বলে, গায়ের সব কাপড় চোপড় খুলে পাতলা একটি বুক খোলা জামা পরে পরীক্ষা করার বিছানাটিতে শুয়ে পড়তে। মাথা পরীক্ষা হলে পরনের সব কাপড় খুলতে হবে কেন, নীলা বুঝে পায় না, দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকে। নার্সকে ডেকে স্মরণ করিয়ে দেয়, মাথা ছাড়া আর কোথাও তার কোনও অসুবিধে নেই। নার্স বলে, মাথা হোক, পায়ের আঙুল হোক, কাপড় খুলতেই হবে। এরকমই নিয়ম? এরকমই নিয়ম। শাড়ি ব্লাউজ পেটিকোট খুলে হাসপাতালের সাদা জামাটি পরে নেয় নীলা। নার্স দেখে বলে, জামার তলে কোনও সুতো থাকলেও চলবে না। ব্রাও খুলতে হবে? ব্রাও। প্যান্টিও? প্যান্টিও। নীলা খোলে, শোয়, ডাক্তার এসে নাড়ি দেখে, মাথা টেপে, পাঠিয়ে দেয় এক্সরে করতে। এক্সরে করতে গিয়ে মহা বিপদ, পুরো উলঙ্গ হয়ে এক্সরে টেবিলে শুতে হবে। নীলা জিজ্ঞেস করল মাথার এক্সরে হলে উলঙ্গ হতে হবে কেন? ওরা বলে হতে হবে। বুকের এক্সরেও হবে, বুকের এক্সরে হলেই বা উলঙ্গ হওয়ার দরকার কী? ওরা বলে দরকার আছে। মাথা হোক, বুক হোক, পেট হোক, পা হোক, পায়ের আঙুল হোক, এক্সরে করতে হলে পুরো উলঙ্গ হতেই হবে। এরকমই নিয়ম? এরকমই নিয়ম। নীলার বাবা অনির্বাণ নিজে ডাক্তার, নীলা নিজে বহুবার হাসপাতালে গেছে, ঘুরে ঘুরে হাসপাতালের নানা বিভাগ দেখেছে সে, নিজের বুকের এক্সরে একবার করতে হয়েছিল, পরনের কোনও কাপড় খুলতে হয়নি। এখানে উলঙ্গ হওয়ার প্রস্তাব শুনে নীলা লজ্জায় মাটির সঙ্গে কেবল মিশে যায় না, মাটির তলেও ঢুকে যায় মনে মনে। তার পক্ষে পুরো ন্যাংটো হয়ে ড্যাং ড্যাং করে স্তন দেখিয়ে নিতম্ব দেখিয়ে নার্স ডাক্তারের সামনে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হয় না। সম্ভব না হলে চিকিৎসাও হবে না জানিয়ে দেওয়া হয়। নার্স এবং ডাক্তার ঠিক বুঝে পায় না নীলা চিকিৎসা নাকচ করে দিচ্ছে কী কারণে। লজ্জায় শেষ পর্যন্ত তাকে উচ্চারণ করতে হয়েছে লজ্জা শব্দটি। সে যে লজ্জা করছে এ সহজ ব্যাপারটি তবুও কারও বোঝার ক্ষমতা নেই। দুবার বলার পর নার্স আর ডাক্তার দুজনের চোখ কপালে ওঠে।

লজ্জা, কাকে?

তোমাকে। তাকে।

 কেন?

কেনর উত্তর না দিয়ে নীলা তার শাড়িকাপড় পরে নিয়ে সোজা বেরিয়ে গিয়ে, কিষানকে জানায় তার পক্ষে হাসপাতালের অসভ্য প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

কিষান কোদালি হাসি হেসে নীলাকে ঠেলে দেয় এক্সরে করার ঘরে, উলঙ্গ হতে বললে উলঙ্গ যেন হয় নীলা, পরামর্শ দেয়।

তুমি রাগ করবে না? নীলা জিজ্ঞেস করল।

মহানুভবতার চুড়ান্ত উদাহরণ দেখিয়ে কিষান বলে ডাক্তারের সামনে উলঙ্গ হওয়া কোনও অন্যায় নয়।

.

নীলা লজ্জার মাথা খেয়ে মাথার এক্সরে করে।

দুটো সেলাই নেয় ফাটা বা কাটা কপালে, সেলাই নেওয়ার পর ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রও নেয়, সে নিতে গিয়ে অবশ্য তাকে উলঙ্গ হতে হয়নি।

.

০৫.

কিষানের থুতনির কাছে কাটা দাগের একটি চিহ্ন আছে, এ কারণে, নীলা কখনও বলেনি যে কিষানের রূপের বারোটা বেজেছে কিন্তু তার কপালের ছোট্ট দাগটির জন্য যেটি চুলের তলে ঢাকা পড়ে থাকে, কিষান প্রায়ই মুখ মলিন করে বলে যে নীলার আগের সেই আগুন রূপটি আর নেই।

কাটা ঘা সারার পর ওষুধ খেয়ে চাঙা হতে কদিন পেরোয়, রান্না করার আর ঘর গোছানোর পর যে অবসর জোটে, বই পড়ে কাটায় নীলা। এরপর মুখ থুবড়ে পড়া দিনগুলোকে টেনে হিঁচড়ে যেমন তেমন পার করছিল, তেমনই এক দিনে গান্ধী নামকরণের পর রেস্তোরাঁর ব্যবসা ভাল জমে ওঠায় কিষানের শখ হয় নীলাকে নিয়ে গ্যালারি লাফায়েতে যেতে।

বুলোভার্ড হুসমানের চোখকাড়া বাড়ি দেখতে দেখতে গ্যালারি লাফায়েতে এক বিকেলে থামা হয়। ভেতরে ঢোকাও হয়। চমকানোও হয়।

ও মা, আমি তো ভেবেছিলাম এ একটা গ্যালারি, ছবি টবি থাকে।

এ দোকান, এক দোকানের ভেতরে একশো দোকান। আকাশছোঁয়া রঙিন ছাদে চোখ যায় তার, চোখ সরতে চায় না সেই অসম্ভব সুন্দর থেকে। কিষানের গুঁতো খেয়ে ঘাড় সোজা করতে হয়।

এ দোকান, না কি সোনায় মুড়োনো প্রাসাদ!

 নীলা এর আগে এত সুন্দর কোনও দোকান কেন, প্রাসাদও দেখেনি।

এটা কেনো, ওটা কেনো, জুতো কেনো, জামা কেনো, কিষান বলেই যাচ্ছে। কপালের দাগটি সত্ত্বেও নীলা রূপসি রয়ে গেছে, তার হাতের রান্নাও দিন দিন সুস্বাদু হচ্ছে, আর নীলা যেহেতু তারই বউ, তারই সম্পদ, তারই সম্পত্তি, তারই হাতের মুঠোয় নীলার জীবন, নীলাকে আরও সুন্দরী দেখালে লোকে তারই প্রশংসা করে বলবে যে কিষান বড় সুন্দরী বউ পেয়েছে, নীলা ভাল জামা জুতো পরলে এ প্রশংসাও কিষানের, নীলা অসুখ থেকে সেরে উঠলে লোকে বলেছে কিষান তার বউকে সারিয়ে তুলেছে, নীলার কিছুতে যেহেতু নীলার কিছু নয়, সবই কিষানের, নীলার প্রতি উদারতা তাই উথলে উঠেছে তার, এ আসলে কিষানের নিজেকেই নিজের ভালবাসা, নীলা অনুমান করে।

জুতোর দোকানে ঢুকলে দোকানি নীলার পায়ের মাপ জিজ্ঞেস করে। মাপ তো দাদা জানি না! নীলা মাপ জানবে কেন, কলকাতার জুতার দোকানে ঢুকে যে জুতো বা স্যান্ডেল পায়ে আঁটে, তা কিনে অভ্যেস তার। এ মাসে আট নম্বর জুতো আঁটসাঁট হল, পরের মাসে দেখা যায় সাত নম্বরই বড় হচ্ছে। তবে কি পা কুঁকড়ে যাচ্ছে, না পা কুঁকড়োচ্ছে না, জুতোর মাপের ঠিক নেই। জুতোঅলারা যার যা পছন্দ নম্বর বসিয়ে দেয়, যার পায়ে জুতো দরকার দোকানে এসে একটি পর একটি জুতো পরে পরখ করে তবে কেনে। এরকমই নিয়ম।

কিষান জুতোর তাক থেকে একজোড়া বুটজুতো নিয়ে বলে, পরে দেখো তো।

ও মা এ তো ছেলেদের জুতো। নীলা জিভে কামড় দেয়।

 এ মেয়েদের।

 কিষান বলে, দোকানিও বলে এ মেয়েদের।

জুতো কিনে জামা কাপড়ের দোকানে এসে নীলা ঝামেলায় জড়ায় আবার। পান্তলুনে হাত রাখতেই কিষান সরিয়ে নেয় নীলাকে, ও সব ছেলেদের।

তা হলে এই শার্ট!

এও ছেলেদের!

কী তফাত গো ছেলেদের মেয়েদের পোশাকে? নীলা উৎসুক জানতে। কলকাতায় মেয়েদের ছেলেদের জামা কাপড় জুতোয় আকাশ পাতাল তফাত। শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, ফিতেঅলা চটি মেয়েদের আর ছেলেদের ধুতি, ফতুয়া, স্যান্ডো গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, টাই, জুতো, মোজা। তফাত স্পষ্ট। এ দেশে একই রকম পোশাক ছেলে মেয়েরা পরছে, দু পোশাকে তফাত বোঝা কঠিন। বোতামের ঘর এদিক না হয়ে ওদিক, কোমরের কাছটা সামান্য চাপা, বুকের কাছে একটি বাড়তি সেলাই, খুব মন দিয়ে না দেখলে কোনটি কার তা বোঝা যায় না। কিষানের মতে প্রচুর তফাত, কোমরে তফাত, নিতম্বে তফাত, দৈর্ঘে তফাত, প্রস্থে তফাত।

তোমার মাপ কী?

 মাপ তো জানি না! নীলা তার মাপ জানবে কেন, মাপ জানে পাড়ার দরজি।

আর ওই লাল সোয়েটার, ওটি বেশ সুন্দর তো।

হাত দিয়ো না। ও ছেলেদের।

 মেয়েদের সোয়েটারের সঙ্গে এটির তফাত কোথায়?

আছে। ঘাড়ে, গলায়, কোমরে, বুকে।

বুকে শব্দটি বলে কিষান কনুইয়ে আলতো চাপ দেয় নীলার বুকে।

কমলা রঙের একটি মেয়েদের সোয়েটার কিনে কিষান যখন দাম দিতে যায়, নীলা বলে পাঁচশো ফ্রাঁ এর দাম, তার মানে সাড়ে তিন হাজার টাকা?

এরকমই দাম এ সবের। কিষান হাসে।

কিছু কম করে দিতে বলো। দুশো ফ্রাঁ-এ দেবে কি না জিজ্ঞেস করো।

এ দেশে দরাদরি নেই। দাম যা লেখা আছে, তাই।

.

যে দোকানে কোনও ভিড় নেই সে সোনার দোকান। আর এ দোকানেই নীলা আটকে যায়। সোনায় বানানো নানান অলংকার।

সোনার এমন লালচে রং কেন?

আঠারো ক্যারেটের সোনা এরকমই দেখতে হয়।

 আঠারো ক্যারেট মাত্র! কেন গো! আমরা তো বাইশ ক্যারেট পরি।

এরা সোনা তেমন পরে না। পছন্দও করে না। কেনে পাথরের অলংকার।

এরা ধনী হয়েও সোনার অলংকার কেনে না আর গরিব দেশ ভারতে সোনা না হলে চলে। সোনা না পরলে মান যায় জাত যায়। সোনা না হলে বিয়ে হয় না, বিয়ে হলেও সুখ হয় না। নীলার বিয়েতেই অনির্বাণ আট ভরি সোনা দিয়েছেন, চকচকে সোনা। অনির্বাণের ধারণা সোনা থেকে সুখের প্রপাত বইয়ে কন্যার সংসার ভাসিয়ে দিচ্ছে। সোনার প্রতি লোভ ভারতীয় মেয়ে মাত্রই থাকে, নীলারও আছে। কিন্তু আঠারো ক্যারেটের লালচে সোনা কিনতে মোটে তার আগ্রহ জন্মায় না।

আগ্রহ তার সুগন্ধী কেনায়। সুগন্ধীর রাজ্যে ঢুকে নীলা বিবশ হয়ে থাকে। এত সুগন্ধীও জগতে আছে! এ তো সুগন্ধীরই দেশ। এটি পছন্দ হয় তো ওটিও পছন্দ হয়। নীলা পছন্দ করে জিভাঁসির অরগানজা, কিষানের পছন্দ ক্রিশ্চান ডিওরের পয়জন। তা হলে কোনটা কেনা হবে। একেবারে সোজা। কেনা হবে পয়জন।

পয়জনের এত দাম এখানে? কলকাতায় তো অনেক কম।

হ্যাঁ অনেক কম, কারণ ওখানে যা পাওয়া যায়, সব নকল। এখানে আসল, বুঝলে হে, সব আসল।

নীলা সব আসলের ভিড়ে খাবি খায়। সবই আসল, সবই ভাল, সবই সুন্দর।

সুগন্ধী নো হলেও সুগন্ধীর এলাকা থেকে মোটে সরতে চায় না সে। একটি সুগন্ধী সে খুঁজছে, খুঁজছে ইভনিং ইন প্যারিস। পাতি পাতি করে খুঁজেও সেই নীল রঙের ছোট্ট শিশি, সেই ইভনিং ইন প্যারিস কোথাও পেল না। চোখ গেল শ্যানেল নং ফাইভে। শ্যানেলই কিনবে সে, নিজের টাকায় কিনবে।

কিষান চমকায়, কার জন্য?

দাদার জন্য।

সুনীলের এক বন্ধু কলকাতা যাচ্ছে, তার হাতে কিছু জিনিস পাঠানো যেতে পারে, সুনীল নিজে বলেছে।

নিখিলের জন্য তো। অনেক অল্প দামের সুগন্ধী আছে, ওগুলো কেনো। কিষান বলে।

না এটিই কিনব। শ্যানেল নং ফাইভ দাদার খুব পছন্দ। নীলা গোঁ ধরে।

কিষান নীলার হাত থেকে শ্যানেলটি দোকানিকে ফেরত দিয়ে নীলাকে টেনে সরাল দোকান থেকে, গলা চেপে বলল, তোমার কাণ্ডজ্ঞান একেবারে নেই।

নীলা শান্ত গলায় বলে, আসলে কী জানো দাদা আমাকে দুশো ডলার দিয়েছে যেন ঠিক এই সুগন্ধীটিই কিনে তাকে পাঠাই।

ঠিক এটিই?

হ্যাঁ ঠিক এটিই।

নীলা ডলার ভাঙিয়ে শ্যানেল নং ফাইভ কিনল। কিনে, দেখল, তার একরকম আনন্দ হচ্ছে নিজের টাকায় কিছু কিনে। কিষানের কাছ থেকে ব্যাগ ভরে জিনিসপত্র উপহার পাওয়ার চেয়ে বেশি আনন্দ।

.

বাড়ি ফিরে, কিষান মদ নিয়ে বসল, আর নীলা আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান, প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ গাইতে গাইতে পয়জন মাখল গায়ে। কিষান জিজ্ঞেস করল, কী গান এটি?

রবীন্দ্রসংগীত।

 ওই বাঙালিব্যাটা তো যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল, তার গান?

হ্যাঁ ওই বাঙালিব্যাটার গান। ওই বাঙালিব্যাটা এই পয়জন সুগন্ধী নিয়ে চমৎকার একটা গান লিখেছে, সেটিই গাইছি।

এই পয়জন?

 হ্যাঁ এই পয়জন।

 ঠিক এটিই।

হ্যাঁ ঠিক এটিই।

অনুবাদ করে শোনাও তো।

 নীলা হেসে বলল, কিছু কিছু গান আছে, যার অনুবাদ হয় না।

 কিছু কিছু মানুষ আছে, যার অনুবাদ হয় না। কিষান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে।

আর কিছু কিছু মানুষের অনুবাদ খুব সহজ। নীলা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরময় সুগন্ধ ছড়িয়ে বলে।

কিষান খেয়ে শুয়ে পড়ার পর নীলা চিঠি লিখতে বসে মলিনাকে।

তুমি যে বলেছিলে, এখানে একা একা কী করে সংসার করব আমি! তুমি একবার এসে দেখে যাও। কাজের লোক নেই, তা ঠিক। কোনও প্রয়োজনও নেই। মেশিনে বাড়ি ভর্তি, এখানে কাজ বলতে সুইচ টেপা। জানো মা, আমি আজকাল রান্না করছি। রান্নায়, আবার ভেবো না, কষ্ট হচ্ছে কিছু। একেবারেই না। কিষান আজ আমাকে অনেক জিনিস কিনে দিল। বারবার বুঝিয়ে দিল সে কিনে দিয়েছে। জীবন তো এরকমই মা, তাই না! স্বামী স্ত্রীকে জিনিসপত্র কিনে দেবে, আর স্বামীর আদেশ মতো স্ত্রী চলবে। জিনিসপত্রের কাছে আমরা একরকম বন্দি। আমাদের হাত পা বাঁধা। তোমাকেও দেখেছি, বাবা দুটো শাড়ি কিনে আনলে কী বিষম খুশি হতে তুমি। বাবাকে খাওয়াতে মাছের মুড়ো দিয়ে, পাশে বসে হাতপাখায় বাতাস করতে। ভালবেসে করতে হয়তো। জিনিসপত্র দিয়ে কি ভালবাসা কেনা যায়? কী জানি! যায় হয়তো। আজ রাতে কিষানের জন্য ডাল মাখানি রান্না করলাম, ও খুব পছন্দ করে খায়।

প্যারিস আশ্চর্য সুন্দর একটি শহর। আজ অপেরার পাশ দিয়ে আসার সময় আমার মনে হয়েছে, কিষানের সঙ্গে বিয়ে হয়ে একরকম ভালই হয়েছে আমার, না হলে এ শহর দেখা হত না। আর এ শহর না দেখে মৃত্যু হলে, জীবন পূর্ণ হত না।

সারাজীবন কেবল অন্যকে আনন্দ দেবার জন্য নিজের জীবন খরচ করলে মা। এবার নিজের কথা ভাবো। নিজে আনন্দ করো। দাদু মারা যাবার পর সম্পত্তি তো ভাগ হয়েছে, তোমার নিজের ভাগ বিক্রি করে টাকা তো পেয়েছ অনেক, কার জন্য জমিয়ে রাখছ সে সব? খরচ করো। নিজের জন্য করো। জীবন আর কদিনের বলো! দেখো, এখানকার লোকেদের ভাত কাপড়ের ভাবনা নেই। এরা জীবনকে ভীষণ রকম উপভোগ করে। এরা প্রাণ খুলে হাসে। আর আমরা হাসি না, ভয়ে হাসি না, কারণ রামশর্মা নামে এক বদমাশ লোক বলে গেছে, যত হাসি তত কান্না।

এটুকু লিখে থেমে পুনশ্চ দিয়ে লেখে দাদার জন্য শ্যানেল নং ফাইভ পাঠালাম, খুব দামি সুগন্ধী। এটি কিষানের টাকায় কেনা না, আমার টাকায়, যে টাকা জমিয়েছিলাম টিউশনি করে।

.

০৬.

আমাকে কিছু টাকা দেবে, তোমার তো সময় হয় না, আমি একা না হয় বেরোই।

একা?

হ্যাঁ একা।

পাগল হয়েছ?

 কেন একা বুঝি আমি বেরোতে পারি না? আমি কি ছোট্ট বাচ্চা?

আমার কাছে অবশ্য তুমি ছোট্ট বাচ্চাই। কিষান নীলার গালে আঙুল বুলিয়ে বলে।

 নীলা হাসে। বলে, কিন্তু আমার কাছে তো আমি ছোট্ট বাচ্চা নই।

 তবে কি বড় বাচ্চা? কিষানও হাসে, কোদালি হাসি।

আমার সাতাশ বছর বয়স। আমি প্রাপ্তবয়স্ক।

 প্রাপ্তবয়স্ক হলে বুঝি বেরোতে হয় রাস্তায়?

রাস্তায় যে হতে হবে তা নয়। ধরো সুনীলের বাড়ি গেলাম কি কোনও ক্যাফেতে বসে চা খেলাম, ধরো কোনও জাদুঘরে গেলাম, অথবা বইয়ের দোকানে। ধরো অপেরার ভেতরটা দেখতে গেলাম। প্যারিসে আসব বলে প্যারিসের ওপর কিছু বই পড়েছি, দেখতে ইচ্ছে করে জায়গাগুলো। নীলা জানালায় উদাস তাকিয়ে বলে।

একা একা এ সব করতে চাও তুমি? কিষানের ছোট ছোট চোখ দুটো গোল আলুর মতো বড় হয়ে ওঠে।

তুমি তো সময় পাও না তাই। ভাবছিলাম, একটু না হয় হাঁটিই রাস্তায়, কোথাও যদি নাও যাই। নীলার উদাস স্বর।

হাঁটবে? কেন?

কোনও কারণ নেই। এমনি।

এমনি এমনি হাঁটে কেউ রাস্তায়! দেখো তো এই দেখো, কিষান হেঁচকা টেনে নীলাকে জানালার কাছে নিয়ে বলে, ওই যে লোকগুলো হাঁটছে, কেউ কি অকারণে হাঁটছে বলে মনে হয় তোমার! সকলেই কিছু না কিছু কারণে হাঁটে। সকলেই ব্যস্ত। আমিও ব্যস্ত। কাজে ব্যস্ত না হলে উনুন জ্বলবে না। মাথার ওপর ছাদ থাকবে না নীলা, তোমাকে একদিন দেখাতে নেব কী করে উদ্বাস্তুগুলো রাস্তায় কাটায়, শীতের রাতেও। তখন বুঝবে, খামোখা সময় নষ্ট করার মানে হয় না।

নীলা শাড়িতে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে বলে, আসলে কী জানো, আমার মোটে সময় কাটে না। লেখাপড়া করেছি কি ঘরে বসে থাকার জন্য? কোনও চাকরি বাকরি করলেও না হয়…

চাকরি? চাকরি বা করতে হবে কেন? আমি কি টাকা রোজগার করছি না? কিষান তাজ্জব হয়ে প্রশ্ন করে।

তা করছ।

আর এই যে আমি ব্যস্ত থাকি, সে তো এ সংসারের জন্যই। আমি কাজ না করলে তুমি থাকবে কোথায়, খাবে কী! পরবে কী? গলার স্বর ক্রমে উঁচুতে উঠছে কিষানের।

সে কি কেবল আমার জন্যই করছ! বিয়ের আগেও তুমি এ কাজই করতে। আমাকে ভরণ পোষণ করতে হবে বলে কি কাজ নিয়েছ? তা তো না। নীলার অদ্ভুত শান্ত গলা।

ওহ নীলা, কিষান সোফায় ধপাস করে বসে বলে, তুমি তো বেশ কথা বলতে জানো! এত কথা শিখলে কোথায়।

কোথাও তো শিখিনি। এ তো সবাই বলতে পারে।

কিষান সজোরে মাথা নেড়ে বলে, না না না, ভারতীয় বউরা এমন বলে না।

নীলা আবারও আগের সেই শান্ত গলায় বলে, ভারতীয় বউ কারা এমন বলে না। তোমার দিদিমা বলে না, তোমার ঠাকুরমা বলে না। এই তো!

কেউ বলে না। কিষান চেঁচাল।

আসলে কী জানো, তোমার এক বোবা মেয়ে বিয়ে করা উচিত ছিল। মুখ বুজে সংসারের কাজ করবে, এমন এক মেয়ে। সাত চড়ে রা করবে না এমন এক মেয়ে। তিন কুলে যার কেউ নেই, এমন মেয়ে। লেখাপড়া না জানা মেয়ে। মাথায় গোবর ছাড়া কিছু নেই, এমন মেয়ে। সাধ নেই স্বপ্ন নেই এমন মেয়ে। নীলা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে।

কিষানের গলার স্বর সপ্তম থেকে নবমে, লেখাপড়ার বড়াই করছ কেন? এমন তো নয় যে ডাক্তার হয়েছ বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছ। তোমার ওই বাংলাসাহিত্যের লেখাপড়া দিয়ে কী করতে পারো তুমি। এক ফ্রাঁ উপার্জন করতে পারবে? পারবে না। তোমার সারাজীবনই আমার ওপর নির্ভর করতে হবে, এ ছাড়া তোমার উপায় নেই। সুতরাং দেমাক কমাও, এত দেমাক দেখিয়ে তোমার যে কোনও লাভ হবে না মাথায় সামান্য ঘিলু থাকলে বুঝতে পারতে।

কিষান উঠে দাঁড়ায়। হাঁটে, কোনও কারণ ছাড়াই ঘরময় হাঁটে। ভারী শরীরের ধপ ধপ শব্দ তুলে মেঝেয়, হাঁটে। জল খায়। এক গেলাস। দু গেলাস। হাঁটে। এরপর ভারী কণ্ঠে বলে, শোনো, সুনীল চৈতালি দুজনই চাকরি করে, ওরা দিনের বেলা বাড়ি থাকে না। আর ক্যাফেতে যাবে কেন, ঘরে চা আছে, সে বানিয়ে খাও। বাইরে খামোখা পয়সা খরচার দরকার কী! জাদুঘর, সিনেমা থিয়েটার, এ সবে আমি যাই না, কিন্তু তোমার যদি এতই যাবার ইচ্ছে, তা হলে ঠিক আছে, আমার সময় হলে আমি নিয়ে যাব।

কিষান বেরিয়ে যায়। সিঁড়িতে শব্দ হয় ধপ ধপ, নামার।

.

টেবিলে চাবির গোছা। নীলা সারাদিনই ঘুরে ফিরে চাবিটি হাতে নেয়, ঘরে আগুন না লাগলে এ চাবি ব্যবহারের কোনও পরামর্শ কিষান দেয়নি।

.

০৭.

কবে তোমার সময় হবে গো?

শনিবার সকালে কিষানের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে নীলা।

 নীলার দিকে আরও সরে এসে কিষান তার ডান বাহুটি নীলার শরীরে ছড়িয়ে দিয়ে বলে তোমাকে সময় দেবার সময় তো এই শনি রোববার। সপ্তাহগুলো ব্যস্ততায় কাটে, ঘরে শুয়ে বসে থাকার দুটো কেবল দিন। বউয়ের নরম হাতের স্পর্শ সারাদিন ধরে নেব।

কোদালি দাঁত যতটা সম্ভব আড়াল করে হাসে কিষান। এ হাসিটি তার যে কোনও হাসির চেয়ে ভাল। কিষান সম্ভবত ভাবে এ হাসিটি প্রেমিকের হাসি। প্রথম প্রেমে পড়লে প্রেমিকার সঙ্গে এমনই কায়দায় হাসে প্রেমিককুল।

সারাদিন শুয়ে বসে থাকবে? আর কিছু না? নীলা জিজ্ঞেস করে। মন তার উড়ছে খোলা হাওয়ায়।

কিষান মাথা নাড়ে। আর কিছু না।

আগে একদিন বলেছিলে শনি রোববার হল ঘর পরিষ্কার করার, কাপড় ধোবার।

তাও ঠিক। কিষান ঘুম ঘুম স্বরে বলে।

 নীলা সারাদিন নিপুণ হাতে ঘর ঝাড়ু দিল, কাপড় কাচল, ফুলগাছের গোড়ায় জল ঢালল, রান্না করল। এ সব করে নীলার অভ্যেস নেই যদিও, করল। করতে করতে নীলা ভাবে, সে কি এ সব কিষানকে ভালবেসে করছে না কি ওকে খুশি করার জন্য করছে যেন অন্তত এ কারণে নীলাকে সে ভালবাসে, ভালবাসার তো কোনও একটি কারণ থাকতে হবে, কিছু গুণ না থাকলে তো জোর করে ভালবাসা যায় না। গুণ বলতে তো রান্নাবান্না করা, ঘর গোছানো, এ সব। বউ হয়েছে বলেই যে আকাশ থেকে বউয়ের জন্য ভালবাসা জলের ফোঁটার মতো বুকের ওপর পড়বে তা তো নয়! নীলা ভাল গান গায়, সাহিত্যের ভাল খবর রাখে, এ সব কিষানের মনে ভালবাসা জাগাবার কোনও কারণ নয়, কারণ কিষান বাংলা ভাষা বোঝে না। এ ভাষায় শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দিলেও কিষান বুঝবে না যে এ গাল, না বুঝে মিষ্টি মিষ্টি হাসবে। এ ভাষায় কবিতা আবৃত্তি করলেও কিষান ভাবলেশহীন মুখে বসে থাকবে সামনে। এ ভাষা, এ বাড়িতে ভাঙা কাচের মতো মূল্যহীন। ভাঙা কাচ গা কাটা ছাড়া আর কোনও কাজে আসে না। এ অচল ভাষাও তেমন। শরীর না কাটলেও মন কাটে। এ ভাষার অসম্ভব সুন্দর শব্দাবলী নীলার ভেতরে গুমরে মরে আর যখন একা একা নীলা নিজের সঙ্গে এ ভাষায় কথা বলে বা গেয়ে ওঠে আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে, কোন গোপন বাঁশির কান্না হাসির গোপন কথা শুনিবারে, ভ্রমর সেথা হয় বিবাগি নিভৃত নীল পদ্ম লাগি রে, কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে..নীলা লক্ষ করে চোখে জল তার, আসলে জল নয়, নীলা ভাবে, এ হৃদয় কাটা রক্ত।

সারা সকাল বিছানায় গড়িয়ে কিষান টেলিভিশনের সামনে সোফায় আসে দ্বিতীয় দফা গড়াতে, ভিডিওতে কেয়ামত সে কেয়ামত চালিয়ে। নীলা তখন কার্পেট ঝাড়ু দিয়ে জানালার কাছে কাচ মুছছে। কাচ মুছে, রান্না সেরে, স্নান সেরে, কেবল গুণ নয়, রূপও যেহেতু চাই কিষানের, মুখে তাই ক্রিম মেখে, পাউডার মেখে, চোখে কাজল পরে, ঢাকাই শাড়ি পরে সামনে এসে বসে নীলা। বউ নীলা। লক্ষ্মী নীলা। ঘরণী নীলা।

কেমন লাগছে দেখো দিকিনি! কিষানের পাশে ঘন হয়ে বসে জিজ্ঞেস করে।

 বেশ।

 এই ওদের একবার নেমন্তন্ন করবে না?

 কাদের?

 সুনীলদের।

সময় কোথায়।

আজ সন্ধেয় না হয় ডাকো।

এভাবে ডাকা যায় নাকি! অন্তত দু সপ্তা আগে থেকে জানাতে হবে তো!

ও।

কেন, হঠাৎ ওদের কথা কেন!

অনেকদিন বাংলায় কথা বলি না তো!

 হুম তাও কথা। তোমার সঙ্গে কোনও এক বাঙালির বিয়ে হলে ভাল হত।

বাঙালির সঙ্গে বিয়ে না হয়ে ঢের ভাল হয়েছে। বাঙালিকে বিশ্বাস নেই।

কিষান তার না কোদালে হাসিটি হাসে।

আচ্ছা, তুমি ঘরে বসে পাঞ্জাবি ভাষাটা শিখলেও তো পারো!

কী করে?

পাঞ্জাবি গান শোনো। ছবি দেখো। আমার সঙ্গে একটু একটু বলো। হয়ে যাবে।

তার চেয়ে ফরাসি ভাষাটা শেখা ভাল না?

মাথায় যদি কুলোয়, তা হলে শেখো।

ফরাসি ভাষা যে ঘরে বসে থেকে আর কিষানের সঙ্গে গাড়িতে হঠাৎ হঠাৎ এদিক ওদিক ঘুরে এলে শেখা হবে না, তা নীলা যেমন জানে, কিষানও জানে। এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সে বলে আচ্ছা সানালের বাড়ির নেমন্তন্নে তো গেলে না, কাটিয়ে দিলে, ওকেই না হয় আজ খেতে ডাকো!

নাহ। ও ছেলের মুখের লাগাম নেই! দেখলে না তোমার সঙ্গে কী রকম রং তামাশা করল সেদিন।

রং তামাশা?

তাই তো। এ নিয়ে পরে রাজেশ বলেছেও যে সালের এ সব করা মোটেও ঠিক হয়নি। অন্যের বউয়ের দিকে নজর দেওয়া ওর চিরকালের স্বভাব। ভারতীয় বউগুলো এলেই সানাল ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেন রে বাবা নিজে একটা জোগাড় করে নিলেই তো পারিস, অন্যের সম্পদে চোখ দিস কেন!

কিষানের সারা মুখে ঈর্ষা চমকাচ্ছে, নীলা স্পষ্ট দেখে। সানাল গত রবিবার নীলা আর কিষানকে নেমন্তন্ন করার পর, কিষান প্রথম বলেছে নিশ্চয়ই যাব, তারপর বলেছে দেখি, তারপর বলেছে, মনে হচ্ছে না হয়ে উঠবে, একেবারে শেষে বলেছে, ভাই খুবই দুঃখিত, বিষম এক কাজ পড়ে গেছে, জরুরি কাজে আমাকে লিওঁ যেতে হচ্ছে। কিষান লিওঁ যায়নি সেদিন, প্যারিসেই ছিল।

সে রাতে ওর তো তোমাকে স্ক্রু ড্রাইভার বানিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। কিছু বানাতে হলে সে আমি বানাব। আমার বউ আমি দেখব তার কী লাগবে না লাগবে। কিষানের ঘাড়ের রোয়া ফুলে ওঠে বলতে গিয়ে।

ধুর কী যে বলল। তোমারই তো বন্ধু। বউদির সঙ্গে মজা করেছে এই যা। নীলা বলে।

তুমি বুঝবে না, এ সব মজা না। এই পনেরো বছরে প্যারিসের ভারতীয় ছেলেদের কাণ্ড কম শুনিনি, অন্যের বউ ভাগিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে, নয়তো অবৈধ সম্পর্ক করে।

কিষান নাক কুঁচকোলো। কপাল কুঁচকোলো। ঠোঁট কুঁচকোলো।

 নীলা কুঁচকোনো কিষানের সামনে থেকে সরে জানালায় গিয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা, আজ চলো না তোমার রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার সারি।

কী যে বলো, পুরো সপ্তাহটা কাটে ওই রেস্তোরাঁয়। আজ যাব না! অবশ্য…সামনের সপ্তাহে তোমায় নিয়ে যাব, রেস্তোরাঁয় মাছ মাংস খাওয়াতে…

নীলা ঘুরে দাঁড়ায়। কিষানের দিকে পায়ে পায়ে যেতে যেতে বলে, ঠিক বলছ তো!

 ঠিক বলছি, ঠিক।

কিষান নীলার ডান হাত টেনে নিয়ে নিজের চুলে বসিয়ে দিয়ে বলে, দেশি মেয়ের হাতের স্পর্শই অন্যরকম, দেশি মেয়ের স্বাদই আলাদা!

কিষানের চুলে এবং টাকে দুটোতেই হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চাপা হাসি ঠোঁটে, নীলা বলে, বিদেশি মেয়ের স্বাদ কেমন?

 ধুর। কিষান ঠোঁট ওলটায়।

কেউ কি হাত বুলিয়ে দিয়েছে চুলে? কিষানের মুখের ওপর ঝুঁকে বলে নীলা।

 কিষান চোখ বোজে। হুলো বেড়াল চোখ বোজে। গড়গড়।

বলছ না যে, কেউ হাত বুলোয়নি?

 ওরা এ সবের বোঝেই না, কী বুলোবে!

 কী করে জানো যে বোঝেই না?

বোজা চোখ বুজেই থাকে। জানি জানি। কে না জানে!

.

০৮.

সোমবার সকালে নীলাকে নিয়ে ইল দ্য লা সিতের পুলিশঅফিসে গিয়ে নীলার নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করল কিষান। ঘণ্টা দুয়েক কাটানোর পর যখন বেরিয়ে এল, নীলার ইচ্ছে করে নতরদামে যেতে, কিষানের ইচ্ছে করে না। নীলার ইচ্ছে করে সেইনের পাড় ধরে হাঁটতে, কিষানের ইচ্ছে করে না। এই দ্বীপটিতে, এই ইল দ্য লা সিতের ছিল সবচেয়ে পুরনো বসতি, এখানেই এক উপজাতি জেলেদলের নাম ছিল পারিসি। রোমানরা এসে পরে এ জায়গা দখল করে নিয়ে সেইনের ধারে বাড়ি ঘর তুলেছিল, রোমান শহরের চিহ্ন কিছু আছে ওপারে। জানো, ওই পারিসি উপজাতির নামেই এ শহরের নাম প্যারিস হল। আগে নাম ছিল লুতেসিয়া। কিষান জানে না, জানার কোনও ইচ্ছে তার নেই। তার তাড়া রেস্তোরাঁয় যাবার। নীলাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে সে চলে গেল। ওই তাড়ায় কিষান ভুলে গেছে তার ঠিকানা আর টেলিফোন নম্বর লেখা নোটবইটি সঙ্গে নিতে। কিষানের ছোট্ট নীল নোটবইটি হাতে নিয়ে এ থেকে জেড পর্যন্ত লেখা নামগুলো দেখে নীলা। বেশির ভাগ নামই সে চেনে না। নীলার নাম নেই, বদলে নিখিলের নাম, পাশে বালিগঞ্জের বাড়ির নম্বর। সুনীলের নামের পাশে পাঁচটা ফোন নম্বর, একটি প্যারিসের বাড়ির, দুটো ক্লিনিকের, একটি মোবাইলের, আর একটি কলকাতার বাড়ির।

নীলা শুয়ে নোটবইটি কোলের ওপর নিয়ে সুনীলের আপিসের একটিতে ফোন করল।

ফরাসি ভাষায় একটি মেয়েকণ্ঠ তড়বড় করে কিছু বলল, নীলা কেবল জিজ্ঞেস করল, তুমি কি ইংরেজি জানো?

মেয়েটি সাফ বলে দিল, না। বলে ফোন রেখে দিল। খটাস।

সুনীলের আপিসে আরেকটি নম্বরে ফোন করে এবারও একই কণ্ঠ পেল। খটাস।

 সুনীলের নাম থেকে ওপরে চোখ পড়তেই দেখে সানাল।

নম্বরটি নীলা টুকে রাখে। সানালেরও দুটো নম্বর, আপিসের নম্বরে খটাসের ভয়ে নীলা ফোন করে না।

শেষে তাজমহলে, কিষানকে বলতে যে টেলিফোনের নোটবইটি বাড়িতে পড়ে আছে। কিষান নেই, এখনও রেস্তোরাঁয় পৌঁছোয়নি, সবে রেস্তোরাঁ খোলা হল, থাল বাটি সাজানো হচ্ছে, গেলাসে ন্যাপকিন পোরা হচ্ছে। লোবানের গন্ধ ছড়ানো হচ্ছে রেস্তোরাঁয়।

গন্ধটা বিচ্ছিরি লাগে না? নীলা বলে।

এ দেশি লোকেরা আবার এ গন্ধ পছন্দ করে। আমার সহ্য হয় না, মনে হয় কেউ যেন মারা গেছে। মোজাম্মেল বলে।

দুপুরে কী রান্না হচ্ছে ওখানে?

রান্না নতুন করে কিছু হয় না। সেদ্ধ খাবার থাকেই ফ্রিজে, বের করে তেলে ভেজে দাও, বারোয়ারি মশলায় ছেড়ে দাও। তবে তন্দুরি চিকেন আর নানরুটিতে মন ঢালতে হয়। এ দেশিরা এটিই খায় বেশি।

ও।

এদিকে যে অনেকদিন আসেন না!

 যাব একদিন, খেতে যাব। মাছ মাংসের স্বাদই ভুলে যেতে বসেছি। ছাগলের মতো ঘাসপাতা চিবোতে হয় শুধু।

মোজাম্মেল হাসে। বলে, যাই বলুন দিদি, শাক সবজিতে ভিটামিন আছে।

তা আছে। এ থেকে জেড পর্যন্ত ভিটামিন টলটল করছে। বলে নীলা নিজেই হাসে।

 দিদি আপনি কি লেখাপড়া করছেন না কি চাকরি করছেন?

লেখাপড়া করছি না। তবে চাকরি করছি। ঘর সংসারের চাকরি। বেতন ছাড়া চাকরি।

মোজাম্মেল হাসে, নীলাও।

আচ্ছা মোজাম্মেল, আপনি তো অনেক জায়গায় কাজ টাজ করেছেন, আমার জন্য একটা কাজ খুঁজে দেখবেন।

নীলার কণ্ঠস্বরে মোটেও মনে হয় না, সে কথার কথা বলছে।

আপনি চাকরি করবেন? তো কিষানবাবুকে বলুন না, ওঁর তো অনেক চেনা আছে। আমি তো ছোট চাকরি করি…আমি কী করে বড় চাকরির খোঁজ দেব বলুন।

মোজাম্মেলের কথা শেষ না হতেই নীলা বলে, ছোট চাকরিই করব। আপনি পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করে থাল মাজেন, আমি বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করে না হয় ঘরই ঝাড়ু দিলাম। নীলা বলে। নীলার কণ্ঠস্বর শুনে আবারও কেউ বলবে না যে সে মজা করছে।

ছি ছি কী বলছেন দিদি। আমি তো করি আর কোনও উপায় নেই বলে।

আর আমার বুঝি খুব উপায় আছে?

নীলা হাসে, মোজাম্মেলও।

কিষানবাবু তো ভাল টাকা রোজগার করেন।

তো?

কেন, ওতে তো চলছে ভাল।

মোজাম্মেল, কিষান রোজগার করে, ও তো ওর টাকা, আমার তো নয়।

মোজাম্মেল অপ্রস্তুত। থেমে থেমে বলে, আপনি কিষানবাবুকে বললে নিশ্চয়ই… 

ও বউদের চাকরি করা পছন্দ করে না…

কেন কিষানবাবুর আগের স্ত্রী তো চাকরি করতেন!

আগের স্ত্রী?

মোজাম্মেল অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলে, কেন দিদি, আপনি জানেন না?

না তো…

মোজাম্মেল খদ্দেরের দোহাই দিয়ে ফোন রেখে দেয়।

সেদিন বিকেলেই নীলা সুনীলের বাড়িতে ফোন করে কিষানের আগের বিয়ের ঘটনাটি সত্য কি না জানতে চায়।

কেন তুমি জানো না?

 নাহ।

 হ্যাঁ, ওর তো ফরাসি বউ ছিল। ইমানুয়েল। কিষান বলেনি?

 নাহ।

 বলো কী, আমি তো জানি, তুমি জেনেই বিয়েতে রাজি হয়েছ।

.

নীলা অনুভব করতে চেষ্টা করে, কিষানের আগে একটি বউ ছিল বলে তার কষ্ট হচ্ছে কিনা। কোনও যন্ত্রণা তার শরীর থেকে মনে ছড়াচ্ছে কি না, আশ্চর্য, না। ছড়াচ্ছে না।

.

০৯.

কী ব্যাপার এই সন্ধেবেলা ঘুমোচ্ছ? কিষান ঘুমের নীলাকে ডেকে প্রশ্ন করল।

আড়মোড়া ভেঙে নীলা বলল, সময় খুব বড় শত্রু আমার, তাই সময়কে হত্যা করছি একরকম, ঘুমিয়ে।

রাতে দুজন লোক আসবে, বেশ কিছু পদ রান্না করতে হবে। শুরু করে দাও এক্ষুনি।

নীলা হেসে বলল, এই তো ব্যস্ত বানিয়ে দিলে। কারা আসবে শুনি?

 এক পাঞ্জাবি দম্পতি। তুমি চেনো না।

কেবলই দেশি বন্ধু, তোমার বিদেশি বন্ধু নেই?

আছে, তবে বাইরে, ঘরের বন্ধু দেশিই হয়।

ইমানুয়েলও কি বাইরের বন্ধু ছিল?

 ইমানুয়েল কে?

 তোমার স্ত্রী।

ও তা খবর দিল কে?

যেই দিক না।

মনে হয় তুমি খুব ভেঙে পড়লে?

মোটেই না! এত সহজে ভাঙলে চলবে!

 ইমানুয়েলকে বিয়ে না করলে আমার ফরাসি নাগরিক হওয়া হত না, আর সে সুবাদে যে তোমারও হচ্ছে, সেটিও হত না।

তুমি তো আগে বলনি ইমানুয়েলের কথা।

 কেন, আগে জানালে বুঝি এ বিয়েতে রাজি হতে না?

 হয়তো না।

হতে হতে।

কী করে জানো হতাম?

হতে কারণ প্রেমিকপ্রবর সুশান্ত তোমাকে ছেড়ে যেভাবে পালিয়েছে, আমি না বিয়ে করলে তোমাকে কেউ বিয়ে করত না, খবর তো আর কম রটেনি। শুয়েছও তো ও ছেলের সঙ্গে, শোওনি?

নীলার বুকের ভেতর এক কলস ঠাণ্ডা জল উপুড় হয়ে পড়ল।

কী শুয়েই থাকবে নাকি? রান্না করতে হবে তো! কিষান টাই ঢিলে করতে করতে গলা চড়ায়।

.

১০.

সকালে কিষান বেরিয়ে যাবার পর নীলা অলস শুয়ে রইল। শুয়ে শুয়ে ভাবছিল গত রাতে পাঞ্জাবি বন্ধুদম্পতি নিয়ে মধ্যরাত অব্দি কিষানের হইচই এর কথা। নীলা শোবার ঘর থেকে শুনেছে, তিন মাতালের উচ্ছ্বাস। যা রান্না করেছিল, কিষান বারবারই বলেছে, মোটে ভাল হয়নি। নান পুড়ে গেছে, ডালমাখানিতে কিছু একটা কম হয়েছে, কী কম হয়েছে তা অবশ্য বলেনি আর ফুলকপির তরকারি, পাঞ্জাবি বউটি যদিও বলেছে ভাল, জিভে চুক চুক শব্দ করে কিষান বলেছে আরও ভাল হতে পারত। নিজেকে নীলার মনে হয়েছে, সে তার মা, সে মলিনা। অনির্বাণ এমন আচমকা বলে বসতেন, রাঁধো তো, বন্ধুরা খেতে আসছে। মলিনা রান্নাঘরে ঘেমে নেয়ে রাঁধতেন। খেতে গিয়ে অনির্বাণ সব সময়ই এটা ওরকম হলে ভাল হত আর এটা না হয়ে ওটা হলে স্বাদ হত এ সব বলতেনই। মলিনা স্বামীকে যত তুষ্ট করতে চাইতেন, তত ব্যর্থ হতেন।

নীলা সানালকে ফোন করে।

ওপাশে সানাল গলা শুনে চিনতে পারেনি, চিনতে পারার কোনও কারণও নেই।

নীলা। নীলাঞ্জনা মণ্ডল।

ও মিসেস কিষানলাল!

 হ্যাঁ মিসেস কিষানলাল।

তা কী খবর মিসেস লাল। হঠাৎ?

 নীলা টের পায় সানাল আশা করছে কোনও জরুরি খবরের।

না এমনি। এমনি ফোন করলাম। নম্বরটা পেলাম। ভাবলাম জিজ্ঞেস করি কেমন আছেন।

আমি ভাল আছি। বেশ ভাল। হা হা। তা আপনি কেমন আছেন! সানালের সেই উৎফুল্ল কণ্ঠস্বর।

আমার আর থাকা! তা আসুন না একদিন আমাদের বাড়িতে। অনেকদিন আপনাকে দেখি না। নীলার গলায় ব্যাকুলতা।

তা স্বামী দেবতাটি কোথায়? ঘরে আছে?

নেই। ওর তো দিনরাত ব্যস্ততা।

 হুম। বিদেশে ব্যস্ত না থাকলে চলেও না..তা ভাবীজি আমারও ব্যস্ততা ভীষণ। এই তো ছুটতে হবে কাজে।

সানালের ব্যস্ত কণ্ঠ।

ও। ঠিক আছে। আমি বোধহয় অসময় ফোন করলাম।

 নীলা ফোন রাখে। নিজের ওপর রাগ হয় তার। কেন এই ফোনটি সে করেছে, কেন সে শুনতে গেছে যে সানাল খুব ব্যস্ত, এত ব্যস্ত যে নীলা যেচে ফোন করার পরও তার যেহেতু এখন সময় নেই, কখন সময় হবে কথা বলার, সকালে না হলে দুপুরে, দুপুরে না হলে রাতে, আজ না হলে কাল তা বলেনি। এত ব্যস্ত যে নীলা যে ভাল নেই তার ইঙ্গিত দেবার পরও সানালের এতটুকু উৎসাহ হয়নি জানতে কেন নীলা ভাল নেই, কী ঘটেছে বা কী ঘটছে।

সানালের সঙ্গে সে কেন কথা বলছে চেয়েছে! এ কি কেবল কারও সঙ্গে কথা বলার জন্যই! কারও সঙ্গে কথা বলার জন্য এমনই যদি আকুতি, তবে সে মলিনার সঙ্গে বলতে পারত অথবা কলকাতার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে। কলকাতা যেহেতু দূরে, যেহেতু কিষান বলেছে, ঘন ঘন বিদেশে ফোন করলে ফ্রান্স টেলেকমের ধারালো ছুরিতে গলাটা কাটা পড়বে, সে প্যারিসেই সুনীল বা চৈতালির সঙ্গে বলতে পারত যত কথা আছে মনে। বলেনি কারণ নীলা সানালের সঙ্গেই চেয়েছে বলতে, যে সানালের দুর্নাম আছে অন্যের বউয়ের সঙ্গে রং তামাশা করার, যে সানালের দুর্নাম আছে অন্যের বউয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার, অন্যের বউকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবার, সেই সানালকেই নীলা চেয়েছিল তাকেও যেন ভাগিয়ে নেয় এ বাড়ি থেকে, যে করে হোক। নীলা নিজেকে প্রশ্ন করে, এই কি কারণ? নীলা কারণ জানে না। আজকাল নীলার মনে হয় অনেক কিছু সে জানে না। কেন সে সারাদিন শুয়ে থাকছে সে জানে না। কেন সে উঠে চা পর্যন্ত খায়নি, সে জানে না। কেন সে স্নান করতে ওঠেনি, দুপুরের খাবার খেতে না, এমনকী জানালায় দাঁড়িয়ে রাস্তার কোলাহল দেখতেও না, সে জানে না। কেন সে সুনীলের বাড়ি থেকে আনা বইগুলো পড়তে নিয়েও রেখে দিয়েছে, সে জানে না।

.

বিকেলে ফোন বাজে, নীলা ফোনের দিকে পিঠ ফিরে শোয়, কেউ হবে হয়তো, কিষান কিংবা রেস্তোরাঁর কোনও লোক তাকে খুঁজছে, অথবা কোনও পাঞ্জাবি কারবারি।

শ্রুতিযন্ত্রে সুনীলের কণ্ঠ শুনে নীলা রিসিভার তোলে, কী ব্যাপার নীলা, ফোন ধরছ না।

শুয়েছিলাম। ক্লান্ত স্বর নীলার।

 এই অসময়ে? তা আছ কেমন?

এই তো।

 কিষান বাড়িতে?

না।

কী ব্যাপার ও রেস্তোরাঁয় নেই। মোবাইলও ধরছে না, ভাবলাম বাড়ি আছে বুঝি।

 নেই।

 তা কী করে সময় কাটাচ্ছ? কী কী দেখলে প্যারিসে?

 ইফেল টাওয়ার দেখেছি।

আর?

 আর কিছু দোকান।

 ল্যুভরে যাওনি?

না।

মিউজি দর্সে?

না।

পিকাসো, রোদ্যাঁ কিচ্ছু না?

না।

কিষানকে একদিন বলেছিলাম আমাদের সঙ্গে তোমাকে যেন বেরোতে দেয়, তা হলে প্রদর্শনীগুলোয় নিয়ে যেতে পারতাম, আর দেখার এত কিছু আছে এ শহরে, ও বলল ও নিজেই নাকি তোমাকে নেবে, আর বিয়ের পর পর কেউ কি বউ ছাড়তে চায়, স্ক্রৈন হয়ে থাকে তো অন্তত ক’মাস।

বলে সুনীল হাসে দম টানা হাসি। হেসে আবার বলে, আমি নিজেকে দিয়ে বুঝি, চৈতালিকে বিয়ে করার পর তো কাজেই যাইনি পুরো দু মাস। চব্বিশঘণ্টা আঠার মতো লেগে ছিলাম দুজনে।

আচ্ছা, সুনীলদা, আপনার হাতে কোনও চাকরি টাকরি আছে? নীলা আচমকা প্রশ্ন করে।

চাকরি? কেন? কার জন্য?

আমার জন্য।

 তুমি চাকরি করবে?

করব।

 কিষানকে বলেছ? ও কী বলে?

ওকে বলিনি।

 ওকে বলনি? তা হলে হবে কী করে?

 কিষান কিষান কিষান, কিষান ছাড়া যেন আমার জীবনে কিছু হবার নয়।

না সে কথা বলছি না। কাজ করার আগে ভাষাটা তো শিখতে হবে…

ভাষা শিখব কোথায়?

আলিয়ঁস ফ্রসেজে যাও না কেন! কিষানকে বলো…

আমাকে ঠিকানা দিন, কী করে যেতে হয় বলুন, আমি একাই যেতে পারব।

 কিষান তো রাগ করবে…

নীলা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে।

 ওপাশ থেকে সুনীল বলে, কিষান বাড়ি এলে বোলো বাড়িতে আমাকে একবার ফোন করতে।

কোনও জরুরি ব্যাপার?

 আরে ওই পুজোকমিটির ব্যাপার। ও কিছু চাঁদা দেবার লোক জোগাড় করে দেবে বলেছিল।

ও৷

.

১১.

যে চাবি ঘরে আগুন না লাগলে ব্যবহারের পরামর্শ কিষান দেয়নি, সে চাবি ঘরে আগুন লাগেনি, অথচ নীলা ব্যবহার করে। বাইরে বেরোয় সে। বেরিয়ে রাস্তায় এলোপাতাড়ি হাঁটে। পকেটে শহরের একটি মানচিত্র আর কিছু ফ্রাঁ। গার দ্য নর্দ নামের সেই প্রাসাদের ভেতর ঢুকে দেখে, মানুষ ঢুকছে, বেরোচ্ছে, রেলগাড়ি থামছে, ছাড়ছে। নীলা একটি থামে হেলান দিয়ে রেলগাড়ি দেখে, ইচ্ছে করে দূরে কোথাও যেতে। রাজপুত্রের মতো দেখতে নীল চোখের সোনালি চোখের যুবকেরা রেলগাড়িতে চড়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে, নীলাকে কেউ নিচ্ছে না, নীলার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। তার হঠাৎ মনে হয় সে দৃশ্যমান তো! নিজের দিকে তাকায়, পাট ভাঙা কালো জিনস, তার ওপর সাদা একটি সিলকের শার্ট, শার্টের ওপর গোলাপি একটি কার্ডিগান, পায়ে পালিশ করা কালো জুতো, নীলাকে নীলা নিজেই বোঝে মোটেও কুৎসিত লাগছে না। তবু কেন তার দিকে কারও তাকাবার রুচি হয় না। কলকাতার রাস্তায় হাঁটলে সে নিশ্চিত যে কোনও পুরুষই তাকে ফিরে ফিরে দেখত। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আবারও নীলা উদ্দেশ্যহীন হাঁটে, হেঁটে হেঁটে একটি বাসস্টপে দাঁড়াতেই মুহুর্মুহু বাস আসছে, একটিতে চড়ে বসে। কোন বাস, কী বাস, কোথায় যাচ্ছে কিছু না জেনেই সে চড়ে। কিষান একবার বলেছিল, নীলা হারিয়ে যেতে পারে একা বেরোলে। তার মনে হয়, সে যদি হারিয়ে যায়, যাক, ক্ষতি কী। নীলা নিজেকে হারাতে চায়। এমন কোথাও চলে যেতে চায় যেখান থেকে বাড়ির পথ আর সে চিনবে না। বাস যতদূর তাকে নেয়, সে যায়। এক বাস থেকে নেমে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক হেঁটে আবার সে নতুন বাসে চড়ে। কখনও উদাস, কখনও ঔৎসুক্য চোখে। কলকাতার বাসে গাদাগাদি ভিড়, ভ্যাপসা গরম, জানালায় বসলে ধুলোয় চোখ মুখ চুল ভেসে যায়। আর এখানকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের চারদিকটা প্রশস্ত জানালায় মোড়া, ধুলোর বংশও নেই। সামনের দরজা দিয়ে ওঠো, কমলা রঙের টিকিট, মাসের টিকিট, ওঠার সময় ড্রাইভারের সামনে কেবল উঁচিয়ে ধরো, ঢুকে যাও, আর কমলা টিকিট না থাকলে ড্রাইভারের কাছ থেকে সবুজ টিকিট কিনে নাও আট ফ্রাঁ দিয়ে, ছোট মেশিনে সে টিকিট ঢোকালে কড় কড় শব্দ করে সময় তারিখ বসিয়ে দেবে। নিয়ে গদিঅলা চেয়ারে বসে যাও। কোনও চিৎকার নেই, চেঁচামেচি নেই, রাজনীতির গল্প নেই, মাছের বাজারের আলাপ নেই, ঘর সংসারের বর্ণনা নেই। সকলেই শান্ত, সকলেরই সুখী মুখ, কারও ব্যাপারে কেউ নাক গলাচ্ছে না। সাদা সব মানুষের মধ্যে বাদামি রঙের এক মেয়ে বসে আছে, কেউ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে না তুমি কোত্থেকে এসেছ, কোথায় দেশ, কোথায় বাড়ি। নীলা বাসের ভেতরের বাইরের সুখী মুখগুলো দেখে, দেখে এক যুবক যুবতী উঠল বাসে, প্যারামবুলেটরে বাচ্চা ঠেলে। বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে আর যুবক যুবতী এক বাস লোকের সামনে দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছে। গভীর চুমু। ফরাসি চুমু। নীলার কান লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। নীলা দেখে বাসের আর কেউ তাকাচ্ছে না চুমুখাওয়া জোড়ার দিকে। কলকাতায় এ ঘটনাটি ঘটতে পারত না, বাসে কেউ যদি চুমু খায়, অশালীন কর্ম করার দায়ে বাসের লোকেরা ধাক্কা দিয়ে জোড়া ফেলে দেবে বাইরে। রাস্তায় অশালীন কর্মটি করলে রীতিমতো ঢিল ছুড়বে লোকে। নীলা ভাবে, এই যে চুমু খাচ্ছে এরা, খেতে ইচ্ছে হচ্ছে বলে খাচ্ছে, চুমুটাকে বাড়ির শোবার ঘরের জন্য রেখে দিচ্ছে না, আড়াল খুঁজছে না, অন্ধকার খুঁজছে না, এর মতো শালীন এবং সুন্দর ব্যাপার আর হয় না। কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কোনওদিন সুশান্তর হাতে হাত রেখে হাঁটতে পারেনি সে, লোকে কী বলবে বলে। লোকে কী বলবে বলে সন্ধের পর চারদিক কালো হলে শহর থেকে চার মাইল দূরে গিয়ে অন্ধকার ঝুপড়ির আড়ালে কোথাও কেউ নেই, এমন জনমনুষ্যহীন জায়গায় এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ভয়ে ভয়ে একটি কি দুটি চুমু খেয়েছে। নীলার আর সুশান্তর সবচেয়ে বেশি ভয় ছিল মানুষের। শেয়াল ডাকছে ঝুপড়ির পেছনের জঙ্গলে, সে ক্ষতি নেই, মানুষ ডাকলেই সর্বনাশ।

নীলা দেখছে যুবকটি একটির পর একটি চুমু খাচ্ছে আর যুবতীটির পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করছে। এক শরীরের সঙ্গে আরেক শরীর মিশে একাকার। নীলার ইচ্ছে করে মেয়েটির মতো আদর পেতে, ইচ্ছে করে এমন এক সুদর্শন যুবক তাকে এমন করে ভালবাসুক, এমন করে জড়িয়ে থাকুক, এমন গভীর করে চুমু খাক। সেইন নদীর কাছাকাছি এলে নীলা নামে বাস থেকে, সেইনের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাতের সারি বাঁধা সবুজ বাক্স বইয়ের দোকানগুলো দেখে। পর্যটকের ভিড় দোকানের সামনে, বই কেনার নয়, ভিড় ছবি তোলার। হাঁটতে হাঁটতে চোখের সামনে দেখে ল্যুভর জাদুঘর। অপ্রকৃতিস্থের মতো সে দৌড়ে যায় জাদুঘরে। জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র পিঁপড়েসম যদিও মনে হয় তার, বিশালতার কাছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নিজেকে নির্দ্বিধায় সমর্পণ করে। ল্যুভরের বিশাল জগতে নীলা হারিয়ে যায়, সত্যিকার হারানো যাকে বলে। তার আর মনে থাকে না সে কলকাতার কোনও এক অনির্বাণ মণ্ডলের কন্যা নীলাঞ্জনা মণ্ডল, নিজের কোনও অস্তিত্ব সে অনুভব করে না, ভিড়ের মধ্যে কারও কাঁধ কারও হাত নীলার গায়ে ধাক্কা খায়, নীলা অনুভব করে না। রসোলিও থেকে সুলি, সুলি থেকে দেনোতে সে গ্রস্তের মতো হেঁটে যায়, অনুভব করে না সে হাঁটছে, মনে হয় কেউ তাকে নিয়ে যাচ্ছে, কোনও দেবদূত পাখায় করে তাকে এক কোঠা থেকে আরেক কোঠায় নিচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে যায় নীলার খিদে পায় না, খিদে পাবে কেন, তেষ্টাই বা পাবে কেন, নীলা এই জগৎ সংসার থেকে অনেক দূরে। এক অসাধারণ আচ্ছন্নতার মধ্যে নীলার বিকেল পার হয়ে যায়। ল্যুভর থেকে বেরিয়ে আসার পরও তার আচ্ছন্নতা কাটে না, কাচের পিরামিডের পাশে পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে। নীলা ভুলে যায় যে তার বাড়ি ফিরতে হবে, ভুলে যায় যে তার একটিই পরিচয় সে মিসেস লাল, মিসেস কিষানলাল।

.

বাড়ি ফিরে দেখে কিষান তখনও ফেরেনি। বাথটাবের গরমজলে নিজেকে ডুবিয়ে শুয়ে থাকে। তার উঠতে ইচ্ছে করে না, রাঁধতে ইচ্ছে করে না। কিষান যখন ফেরে তখনও নীলা সাদা ফেনায় ঢাকা। স্নানঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কিষান বলে, কী ব্যাপার, এই অসময়ে স্নান করছ?

ওঠো ওঠো। তাড়া দেয় সে।

কেন? নীলার ঠাণ্ডা স্বর।

কেন মানে? আমি এসেছি না?

তো?

তো উঠতে হবে। সেদিন কুমড়োর কথা বলেছিলে, দেখো কুমড়ো এনেছি। এ দিয়ে কিছু একটা করো তো। শুনেছি কুমড়োর নাকি মোরব্বা হয়, জানো করতে?

সাদা ফেনায় নিজেকে আরও ঢাকতে ঢাকতে বলে সে, না।

 তা হলে বুদ্ধি করে কিছু একটা করো এটি দিয়ে।

তুমি করো না। তোমার তো অনেক বুদ্ধি।

আমি রান্না করতে জানি নাকি!

নীলা বেশ ভাল জানে যে কিষান রান্না করতে জানে, সে এ বাড়িতে আসার আগে কিষান নিজের জন্য রান্না করত। নীলা বেশ ভাল জানে যে তার ইচ্ছে না করলেও এই ফেনা সরিয়ে তাকে উঠতে হবে। মোরব্বা বানাতে না জানলেও, তাকে মোরব্বা বানাতে হবে।

নীলা যখন স্নানঘর থেকে এল, কিষান মীনাক্ষীর সঙ্গে কথা বলছে ফোনে। জানতে চাইছে, কুমড়োর মোরব্বা কী করে বানায়। ধুতে হবে, চামড়া ছাড়াতে হবে, টুকরো করতে হবে, ছিদ্র করতে হবে, চিনির সিরা বানাতে হবে, সে সিরায় কুমড়োর টুকরো ছাড়তে হবে…চারটে লবঙ্গ ছাড়তে হবে, পাঁচটা এলাচ ছাড়তে হবে, কম আঁচে অনেকক্ষণ রাখতে হবে ইত্যাদি।

ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

.

সে রাতে কুমড়োর মোরব্বা বানিয়ে কিষানকে তুষ্ট করার পর নীলা চিঠি লেখে মলিনাকে,

আমার যদি টাকা থাকত মা, আমি বেশ ভাল বেঁচে থাকতে পারতাম। নিজের টাকা মা, নিজের টাকা না হলে, যার টাকা আছে তার কথায় কথায় সারাজীবন কেবল উঠবে বসবে, তুমি ডানে যেতে চাইলে টাকাঅলা বলবে বামে, তোমাকে বামে যেতে হবে। ইচ্ছের কোনও মূল্য নেই, তুমি যদি কপর্দকহীন হও। অন্যের পয়সায় খাব, আর স্বাধীনতা চাইব, এটি হয় না। তুমি কী আমাকে, কাউকে জানিয়ো না, কিছু টাকা পাঠাতে পারো? যে টাকা এনেছিলাম দেশ থেকে, প্রায় শেষ। নিজের হাতখরচের জন্য কিছু থাকা ভাল।

.

১২.

সকালে মলিনাকে লেখা চিঠিটি দুবার পড়ে ছিঁড়ে ফেলে নীলা, ছিঁড়ে মোজাম্মেলকে ফোন করে।

যেমন তেমন একটা চাকরি আমাকে খুঁজে দেবেন, যেখানে ভাষাটা খুব দরকার হয় না!

দিদি, সে পারি, পরে না আবার আমার অসুবিধে হয়। মোজাম্মেল অসহজ কণ্ঠে বলে।

 ব্যগ্ৰ নীলা, সে বুঝতে পারছি, আমি কাউকে বলব না।

 দিদি আমার চাকরিটা থাকবে না…

 নীলা কথা দিল কিষানকে সে কিছুতে জানতে দেবে না যে মোজাম্মেলের কোনওরকম ভূমিকা আছে তার চাকরির ব্যাপারে। দোষ সব নিজের ঘাড়ে নীলা নেবে।

.

নীলা সেদিনও বেরোল। সারাদিন ঘুরে ফিরে সন্ধের মুখে বাড়ি ফিরল।

কিষান ঘরে ফিরে, এক থোকা উৎকণ্ঠা তার স্বরে, জিজ্ঞেস করে, কোথায় ছিলে, ফোন ধরোনি কেন?

কখন ফোন করেছিলে?

 দুপুরে করেছি, বিকেলেও।

নীলা একবার ভাবে বলবে সে ঘুমিয়েছিল। আরেকবার ভাবে, না ঘুমিয়ে না, স্নান করছিল। ধুত, স্নান না, টেলিভিশন দেখছিল, ফোনের শব্দ শোনেনি। নীলা যখন যে কোনও একটি বলার, যেটি বললে কিষান স্বস্তি পাবে, খুঁজছিল, আর কিষান দাঁড়িয়েছিল নীলার উত্তরের অপেক্ষায়, তার চোখের সামনে, নাকের সামনে, ঠোঁটের সামনে, নীলা বলল, সে বাড়ি ছিল না। ছিটকে পড়ল কিষান। বাড়ি ছিল না নীলা। বাড়ি ছিল না, তো কোথায় ছিল? বাড়িতে আগুন ধরেছিল? না ধরেনি। ভূমিকম্প হয়েছিল, যা হলে দরদালান থেকে লাফিয়ে নামতে হয়! না হয়নি। কিছুই হয়নি, কিন্তু নীলা বেরিয়েছিল। বেরিয়েছিল, কারণ তার ইচ্ছে করছিল বেরোতে। কিষান তাকে নিয়ে বেরোতে পারত সে নীলা জানে, জেনেও সে একা বেরিয়েছে। কারণ তার একা বেরোতে ইচ্ছে করছিল।

কিষান টাই ঢিলে করে মদের তাকের দিকে যায়, একটি কথা না বলে।

মদের তাক থেকে বোতল হাতে সোফার দিকে যায়, একটি কথা না বলে।

 রান্নাঘর থেকে মদের গেলাস আনে, একটি কথা না বলে।

 গেলাসে মদ ঢেলে পান করতে থাকে, একটিও কথা না বলে।

.

নীলা ফ্রিজের খাবার গরম করে টেবিলে এনে রাখে, একটি কথা না বলে।

একটি থালা রেখে যায় টেবিলে, কথা না বলে।

.

১৩.

রাতে কিষান বাড়ি ফিরে দেখে নীলা সোফায় বসে সামনে টেবিলের ওপর পা তুলে টেলিভিশন দেখছে, টেলিভিশনে কোনও ছবি নয়, নাটক নয়, রীতিমতো ফরাসি খবর। কিষান ঘরে ঢোকে, নীলা যেমন বসেছিল, তেমন বসে থেকেই বলে, আজ ফোন করেছিলে বাড়িতে?

কেন?

বাড়ি ছিলাম না তো, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

কিষান জিজ্ঞেস করে, কোথায় গিয়েছিলে?

বিশেষ কোথাও না। আটচল্লিশ নম্বর বাসে চড়ে শাঁ জার্মা দি প্রেতে গেলাম, ক্যাফে দ্য ফ্লোরে বসে চা খেলাম। তারপর বুলোভার্ড শাঁ জার্মায় হাঁটলাম। কত মানুষ হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে দেখি অদ্ভুত সুন্দর এক বাগান, লুক্সেমবার্গ বাগান। সেখানে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর… কার্তে লাতার এক ব্রাসারিতে দুপুরে খেলাম, তারপর, তারপর কী করলাম, ও তারপর

কিষান দাঁতে দাঁত চাপে। নীলা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে স্পষ্ট সে দেখছে। কিষানকে দেখেও সে টেবিল থেকে পা নামায়নি বরং জিজ্ঞেস করার আগেই নিঃসংকোচে, নির্ভয়ে, নিরুদ্বেগে, নির্বিকারে, নিশ্চিত নির্লিপ্তিতে বর্ণনা দিচ্ছে নিজের নিন্দনীয় নিষিদ্ধ আচরণ। নিশপিশ করা দুটো হাত কিষান মুঠো করে রাখে, মুঠো না করলে সে দুটো হাত নীলার চুলের মুঠি ধরে সোফা থেকে উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে বাইরে ফেলত, দরজার বাইরে।

যাও, এবার তোমার শখের ঘুরে বেড়ানোর সাধ মেটাও।

গা এলিয়ে, কেলিয়ে, নীলা বলে দেখলে তো দিব্যি ঘুরে এলাম, কোনও অসুবিধে হয়নি, রাস্তায় দু একজনকে অবশ্য জিজ্ঞেস করতে হয়েছে কোথাকার বাস এ সব। আমি কচি খুকি নই তা দেখলে তো!

তুমি যে কচি খুকি নও, সে বেশ আন্দাজ করতে পারছি। দাঁতে দাঁত। এরকম ব্যাটাছেলেদের মতো পা তুলে বসেছ কেন?

কে বলেছে ব্যাটাছেলেদের মতো! আমি তো একেবারে খাঁটি মেয়েদের মতো পা তুলে বসেছি। নীলা খিলখিল হাসে।

পা নামাও।

কেন? তোমার বসতে অসুবিধে হচ্ছে? নীলার সরল প্রশ্ন।

আমার চোখে অসুবিধে হচ্ছে। তোমার ওই উরু ফাঁক করে বসাটা দেখতে বিচ্ছিরি লাগছে। আবারও দাঁতে দাঁত।

তা হলে দেখো না। মিটে গেল। সরল উত্তর।

 ঠিক আছে দেখব না। দূরে যাও তুমি। কিষানের তপ্ত স্বর।

আমি কেন, তুমি দূরে যাও। বলে নীলা পা নামায়। পা নামায় এ কারণে যে কিষান খুব স্বাভাবিক ভাবে খুব শান্ত গলায় একটি খুব সত্যি কথা এখন বলতে পারে, বলতে পারে যে এটা আমার বাড়ি, আমি কোথায় বসব না বসব তা তুমি বলে দিতে পারো না।

খাবার দাও টেবিলে। দাঁত খিঁচিয়ে বলে কিষান।

খাবার কেন? মদ খাও। নীলা বলে।

মদ খাব কি খাব না, সে তোমার বলে দিতে হবে না। খেতে ইচ্ছে করলে আমি নিজেই খাব।

আবারও সেই আদেশ, খাবার দাও টেবিলে।

খাবার তো রাঁধিনি। নীলার শান্ত স্বর।

কেন?

সময় পাইনি।

তোমার নাকি সময়ের অভাব নেই। সময় নিয়ে কী করবে তাই ভেবে পাও না! বলতে গিয়ে ছোট চোখ আরও ছোট হয় কিষানের।

সে তো অকাজে ঘরে বসে থাকলে। নীলা দাঁতে নখ খুঁটতে খুঁটতে, বলে, এবারে পায়ের ওপর পা তুলে, কাল বেরোবার আগে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে যেয়ো তো।

কেন?

কিছু বই কিনব।

কী বই?

আজ সেইনের ধারে হাঁটতে গিয়ে দেখলাম ইংরেজি বইয়ের এক দোকান। আসলে এ শহরে একটি নয়, বেশ কটি ইংরেজি বইয়ের দোকান আছে। কিছু বই কিনলে সময় কাটবে।

আমার খুব হিসেব করে চলতে হয় নীলা। কিষান উঠে দাঁড়ায়, টাই ঢিলে করতে।

আচ্ছা আমি চাকরি বাকরি কিছু করলে তো পারি…এভাবে বসে থাকার চেয়ে…নীলা তাকায় কিষানের দিকে নরম চোখে।

তোমার তর সয় না নীলা, বড় অস্থির তুমি। বড় খাই খাই তোমার। বড় চাই চাই তোমার। ক’দিন হল এসেছ? দু মাস, তিন মাস…এরই মধ্যে তুমি ছটফট করছ!

আমি জীবনে কখনও এরকম বসে কাটাইনি। কলকাতায় লেখাপড়া করতাম, সঙ্গে টিউশনিও। নিজের হাতখরচটা হত।

তোমার হাতখরচ, পাখরচ, মাথাখরচ, যা যা খরচ আছে, আমি কি দেব না বলেছি? দিচ্ছি না?

নীলা হেসে বলল, তাহলে দাও, আমার হাতখরচ দাও। পা মাথার খরচ তো চাইছি না।

হাতখরচের দরকারটা কী, আমি বুঝতে পারছি না। তোমার যা দরকার সব আছে এ বাড়িতে। যা যা দরকার, সব পাচ্ছও। মদের তাকের দিকে যেতে যেতে বলে কিষান।

আমার আইসক্রিম খাবার দরকার। বাড়িতে কোনও আইসক্রিম নেই।

ঠিক আছে কাল আমি দশ প্যাকেট আইসক্রিম কিনে আনব, যত ইচ্ছে খেয়ো।

নীলা দাঁত থেকে নখ নামিয়ে জোরে হেসে বলে, আমার মাংস খাবার দরকার।

কে বলল দরকার? মাংস ছাড়া মানুষ বেঁচে আছে না? আমি বেঁচে নেই?

মদের বোতল টেবিলে শব্দ করে রেখে কিষান বলে।

 হ্যাঁ আছো, বেঁচে থাকাটাই তো কেবল আমার উদ্দেশ্য নয়। আরও কিছু দরকার।

কী দরকার?

 নীলা কিষানের চোখে চোখ রেখে ধীরে, শান্ত গলায় বলে, তুমি রুটির কথা বলছ, কেবল রুটি দিয়ে সব হয় না, গোলাপও দরকার হয়।

ঠিক আছে, কাল একশো গোলাপ কিনে তোমাকে দেব।

তুমি দেবে। কিষান, তুমি দিতে চাও আমাকে। কিন্তু আমি যে আমাকে কিছু দিতে চাই।

.

১৩.

কম্পিউটার বাক্সবন্দি করার চাকরি পেল নীলা। সপ্তাহে দেড় হাজার ফ্রাঁ। এই বা কম কীসে, নীলার কাছে এ অনেক। সকালে কিষান যখন ঘুম থেকে ওঠে, পেছন পেছন নীলাও ওঠে, কিষানের মতো নীলাও বাইরে বেরোয়, কিষান গাড়িতে, নীলা মেট্রোয়, গার্দ দ্য নর্দ থেকে দু নম্বর লাইন ধরে বেলভিল, বেলভিল থেকে এগারো নম্বরে উঠে মেট্রো টেলিগ্রাফ। মেট্রো থেকে নেমে রু পেলপোর্ত ধরে হাঁটলেই রাস্তার ওপর কারখানা। চাকরিতে ঢুকেছে এই খবরটি নীলা প্রথম দেয়নি কিষানকে। বাড়িতে কুরুক্ষেত্র বাধাক কিষান, সে চায়নি।

কিষান চণ্ডিগড়ের লোক, কুরুক্ষেত্রেই জন্ম, রক্তের টান বলে কথা। পাণ্ডবে কৌরবে যুদ্ধ বেধে গেল, আর কিষান তো ভগবানেরই সন্তান, ফাঁক পেলেই কৃষ্ণনাম জপে। নীলাকে বেশ অনেকদিন বলেছে, জন্মাষ্টমীর আগে আগে তাকে নিয়ে সে চণ্ডিগড় যাবে, কী ঘটা করেই যে কৃষ্ণের জন্ম উৎসব হয় চণ্ডিগড়ে তাকে দেখাবে সে। হোলি উৎসবও দেখাবে, রঙে ডুবতে চাইলে নীলাকে এমন রঙে ডোবাতে পারে কিষান যে নীলার জীবন ফুরিয়ে যেতে পারে কিন্তু রং ফুরোবে না। নীলা প্যারিসের স্থাপত্য দেখে হাঁ হয়েছে আর কত, চণ্ডীগড় দেখলেও তেমনই হবে, চণ্ডীগড় তো ফরাসি স্থপতি লা করবুসিয়ের করা। মসিয়ে হুসমান থেকে করবুসিয়ে কম কীসে! জারদা দ্য লুক্সেমবার্গ বা জারদা দ্য প্লানত দেখে নীলা উচ্ছ্বসিত হয়, চণ্ডিগড়ের পিঞ্জরবাগান, শুখনালেক, শান্তিকুঞ্জ দেখলেও কম হবে না। কিষানের বর্ণনাতেও নীলা আগ্রহ দেখায়নি চণ্ডিগড় যেতে। কলকাতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে নীলা চণ্ডিগড় থেকে আসা কিষানের যে কজন আত্মীয়কে দেখেছে, তাতে তার মনে হয়নি চণ্ডিগড়ে এদের সঙ্গ সে সামান্যও উপভোগ করবে।

খবর লুকিয়ে রাখা যায় না। কিষান জেনে যায় নীলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোনও এক বাক্সবন্দির দোকানে কাজ করে। যেদিন জানল কিষান, সেদিনই বাড়িতে ডাকল সুনীলকে।

সুনীল বাড়ি ঢুকে এ ঘর ও ঘর হেঁটে কিষানের মুখোমুখি বসে বলল, কী ব্যাপার, জরুরি তলব কেন, হয়েছে কী?

নীলা ফরাসি ভাষা শেখার বই পড়ছিল শুয়ে। সুনীলকে দেখে বই রেখে, ক্যাসেটেও বাজছিল ফরাসি উচ্চারণ শেখানো, বন্ধ করে, উঠে এল।

বাহ্, ভদ্রলোক কি পথ ভুলে? নীলার মুখে মিষ্টি হাসি।  

সুনীলের গম্ভীর মুখ, উত্তর নেই। তলবের কারণ সে তখনও বুঝে উঠতে পারছে না।

এ কেমন মেয়ে তুমি বিয়ে করালে সুনীল, এ তো কথা শোনে না, যা ইচ্ছে, তাই করছে। অভিবাদনের আগে আগে অভিযোগ জানায় কিষান। নীলা সোফায় নয়, খাবার টেবিলের একটি চেয়ার টেনে সামনে বসে।

কী করছে? ঘটকচূড়ামণি এখন বিচারকের আসনে।

ওকেই জিজ্ঞেস করো কী করছে। কিষান কাটা দাগের থুতনি তুলে নীলাকে দেখায়।

সুনীল মুখ খোলার আগেই নীলা বলে, খারাপ কিছু করছি না।

কত বড় স্পর্ধা দেখো আমাকে না জিজ্ঞেস করে ও নিজে চাকরি নিয়েছে।

তাই নাকি? সুনীল সুতীক্ষ্ণ চোখে তাকায় নীলার দিকে জানতে যে কিষান যা বলছে তা সত্যি কি না, নীলা সত্যি সত্যি কিষানকে না জানিয়ে কোনও চাকরি নিয়েছে কি না।

নীলা মাথা নাড়ে, নিয়েছে।

কত ফ্রাঁ পায় ওখানে, ও কটা ফ্রাঁ কি আমার কাছে চাইলে পারে না? ওর জন্য ঘর সংসার ফেলে এভাবে আজেবাজে যতসব কালো লোকদের সঙ্গে কাজ করতে হবে! কিষান এক দমে বলে নিয়ে দম ছাড়ে, সেই ছাড়া দমের সঙ্গে সঙ্গে পেটের তেল চায় শার্টের বোতাম ফেটে বেরোতে।

তুমি বুঝি সাদা? বলে নীলা রান্নাঘরে চপ্পলের চটাস চটাস শব্দ তুলে গেল চায়ের জল চড়াতে।

আমার মান সম্মান সব গেল সুনীল। কিষান বড় শ্বাস ফেলে।

 সামনে মদ নেই। টেলিভিশন খোলা নেই। শুকনো স্তব্ধতা সামনে নিয়ে দুজন বসে থাকে।

অনেকক্ষণ বাদে কিষান মলিন স্বরে বলে, সুনীল কিছু বলছ না যে! এর তো একটা বিহিত করতে হবে।

সাদা দেয়ালের দিকে উদাস তাকিয়ে সুনীল বলে, আমি কী বলব, তোমরা স্বামী স্ত্রী, তোমরা এর মীমাংসা করো।

ওকে চাকরি ছাড়তে বলো। কিষানের গলায় বাঘের জোর। অস্থির আঙুলগুলো মুঠোর ভেতর। 

এবার দেয়াল থেকে চোখ সরিয়ে সুনীল কিষানে চোখ ফেলে, আমি বলব কেন, তুমি বলো।

খানিক বিরতি দিয়ে সুনীল থেমে থেমে বলে, বিদেশ বিভুঁয়ে আমার মনে হয় দুজনের কাজ করাই ভাল, একজনের টাকায় তো পোষায়ও না। আমি আর চৈতালি দুজন চাকরি করছি, আমাদের বেশ ভাল চলে যায়। তুমি যদি মনে করো, তোমার টাকা পয়সা খুব বেশি…বউকে পালঙ্কে শুইয়ে রাখবে, সে তোমার ব্যাপার।

কিষান উঠে এক গেলাস জল খায়, আবার ফিরে আসে সোফায়, বলতে বলতে যে হ্যাঁ আমি জানি, দুজনের উপার্জন করা ভাল। এতে সংসারে সচ্ছলতা আসে। কিন্তু কী কাজ ওর করতে হবে, কী করলে ভাল, কী করলে মান সম্মানও থাকে, টাকা পয়সাও আসে, তা আমার চেয়ে ও ভাল বুঝবে?

সুনীল মাথা নাড়ে, না, নীলা কিষানের চেয়ে ভাল বুঝবে না।

সুনীলের এমন গম্ভীর মুখ নীলা এর আগে দেখেনি, যে ভাষায় বৈঠক চলছে, ইংরেজি, সে ভাষাতেই বলে সুনীল, তুমি যা করবে কিষানের সঙ্গে পরামর্শ করে করো। ও তোমার স্বামী, ও তো তোমার কোনও খারাপ চায় না।

দুজনে নীলার উত্তর আশা করছে, আশা করছে নীলা বলবে যে ঠিক আছে, মেনে নিচ্ছি, অন্যায় করেছি, কাল থেকে ওই চাকরিতে আমি আর যাচ্ছি না। এখন থেকে আমার স্বামীর আদেশ মতো চলব। ও যেদিন চাকরি করতে বলবে, সেদিন করব। যে চাকরি করতে বলে, সে চাকরি করব, কারণ ও আমার চেয়ে ভাল বোঝে কোন চাকরি ভাল, কোন চাকরি মন্দ। আমার ভাল ওর চেয়ে বেশি তো আর কেউ চায় না। ইত্যাদি ইত্যাদি…

নীলা নীরব থাকে।

নীরবতা ভাঙে সুনীল, বলে, এরকমও হয়, এখানকার বাঙালির বাচ্চাদের ও বাংলা শেখাল, ঘরেই একটা ইস্কুল খুলে নিতে পারে।

কিষান ঠোঁট বাঁকায়, বলো যে সরবনে বাংলার প্রফেসর হতে। এত কি সোজা এসব নাকি! একটা রেস্তোরাঁ খুলতে আমাকে বারো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

লীলা বলে, তোমার মতো গাধার তো বারো বছর লাগবেই। বাংলায় বলে।

যেন কিষান বলে কেউ এখানে উপস্থিত নেই, যেন মান সম্মান ফিরে পেতে কিষান, তার স্বামী কোনও জরুরি বৈঠকে বসেনি, নীলা সুনীলের দিকে মুখ করে বলে যায়, প্যারিসের ক্যাফে সংস্কৃতি আমাকে খুব মুগ্ধ করেছে। লোকেরা বসে আছে, খবরের কাগজ পড়ছে, বই পড়ছে, লিখছে, আবার সাহিত্যের আসরও বসছে ক্যাফেতে, কী চমৎকার তাই না? আচ্ছা, জঁ পল সার্ত্র নাকি ক্যাফে দ্য ফ্লোরে আড্ডা দিতেন, সিমোন দ্য বোভোয়াও? নতরদামের উলটোদিকে একটা বইয়ের দোকান আছে না, শেকসপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি! ওখান থেকে জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রথম বেরিয়েছে, জানেন সুনীলদা?

জেমস জয়েস কে? কিষান নীলাকে নয়, শুধোয় সুনীলকে।

নীলা উত্তর দেয়, আইরিশ লেখক।

কলকল করে বইছে নীলা, হেমিংওয়েও আড্ডা দিতেন বইয়ের দোকানটায়। টাকা ছিল না বলে দোকানটি থেকে পড়ার জন্য বই ধার নিতেন।

বলে নীলার আশঙ্কা হয় কিষান জিজ্ঞেস করবে, হেমিংওয়ে কে? ভাল যে করেনি, কারণ নীলা মনে একটি উত্তর তৈরি করেছিল ওই প্রশ্নের, হেমিংওয়ে আমার পিসতুতো দাদা হয় গো পিসতুতো দাদা।

সে রাতের বৈঠকে কিছু এগোল না। নীলার ব্যাপারটি অমীমাংসিত রেখেই সুনীল পুজোর চাঁদা নিয়ে পড়ল। ট্রেতে করে চা বিস্কুট আনল নীলা। চা খেতে খেতে সুনীলকে সেই বাঙালি লোকটির কথা জিজ্ঞেস করল, যার যাবার কথা ছিল কলকাতা। সেই লোক কলকাতা পৌঁছেছে, সেই লোক নীলার বাড়িতে শ্যানেল পৌঁছেও দিয়েছে, সেই লোক ফিরেও আসবে শিগরি। সেই লোক আবার কবে যাবে, নীলা জানতে উৎসুক। সেই লোক এ বছর আর যাবে না তবে এ বছর কে যাবে কলকাতা? এ বছর সুনীল নিজেই যাবে, পুজোর পর। আর নীলা কোন বছর যাবে? নীলা কোন বছর যাবে, সে কিষান জানবে।

রাতে ঘুমিয়েপড়া নীলাকে জাগায় কিষান, জামার বোতাম খুলতে মোটা লোমশ হাত বাড়ায়। নীলা সরিয়ে দেয় কিষানের হাত। কিষান শক্ত হাতে নীলার হাত চেপে চাপা কণ্ঠে বলে, আমি একটা বাচ্চা চাই নীলা।

নীলা বলে, আমাকে ঘুমোতে দাও।

প্রায় সে বলতে নিচ্ছিল, কেন, ইমানুয়েল তোমাকে বাচ্চা দেয়নি? কিন্তু উচ্চারণ করে না ও নামটি। করলেই, নীলার আশঙ্কা হয়, কিষান সুশান্তর প্রসঙ্গ ওঠাবে। শুয়েছে কিনা সুশান্তর সঙ্গে। হ্যাঁ শুয়েছে। নীলা নিজে কুমারী নয় বলে যে নিজেকে তার অপরাধী মনে হত, ইমানুয়েলের ঘটনা জানার পর তার সে বোধটুকু নেই, সেই অপরাধবোধ। নীলা বরং অনেক স্বস্তি বোধ করে আগের চেয়ে। ইমানুয়েল তাকে একরকম বাঁচিয়েছে।  

.

১৪.

চাকরি করতে গিয়ে নীলা দেখে বেশির ভাগই কালো, বাদামি আর হলুদ রঙের লোক বাক্সবন্দির কাজ করে। হাতে গোনা কজন কেবল সাদা। প্রথম দিনই মসিয়ে গিগু নীলাকে কী কাজ করতে হবে এবং কী করে, তার নিখুঁত বর্ণনা করলেন ফরাসি ভাষায়। নীলা মসিয়ে গিগুর কথা পুরোটাই শুনে গেছে একটি অক্ষর না বুঝে। গিগু ঘর থেকে বেরোলে ওই হাতে গোনা সাদার দল থেকে একটি মেয়ে, দানিয়েল, এগিয়ে এসে নীলাকে জিজ্ঞেস করে কিছু বুঝলে, কী বলে গেল?

নীলা মুখ মলিন করে বসেছিল। কিছুই বোঝেনি সে।

দানিয়েলে বুঝিয়ে বলল।

সেই থেকে দানিয়েলই ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেয়, যা কিছু বেরোয় গিগুর মুখ থেকে।

সেই থেকে দানিয়েলই নীলাকে চা খেতে নিয়ে যায় কাছের ক্যাফেতে।

সেই থেকে দানিয়েলকেই অল্প অল্প করে নীলা তার প্যারিসে আসার গল্প করে, কিষানের সঙ্গে তার জীবনযাপনের গল্প করে।

ক্যাথারিন, আরেকটি সাদা মেয়ে, ভাঙা ইংরেজিতে একদিন বলে, তুমি ভারত থেকে এসেছ তাই না?

নীলা হ্যাঁ বলার আগেই ক্যাথারিন বলেছে কিছু টাকা জমলেই সে ভারত যাবে। এই বাক্সবন্দির কাজ করে সে যা পায় তা জমিয়ে দূরের কোনও দেশে চলে যায়। গত বছর গিয়েছিল মালটায়। তার আগের বছর মার্টিনিতে। ক্যাথারিন কলেজ দ্য ফ্রান্সে ইন্ডোলজি পড়েছে, তার থিসিসের বিষয় বাউল। থিসিস লেখার শুরুতে, সে পশ্চিমবঙ্গের অজ পাড়াগাঁয়ে এক বাউলের বাড়ি মাস দুয়েক থেকেও এসেছে। থিসিস তার এখনও জমা দেওয়া হয়নি, আবার সে যাবে, সেই গ্রামে।

বাউলের প্রসঙ্গ আনায় ক্যাথারিনকে মুহূর্তে খুব আপন মনে হয় নীলার। সেদিন দুপুরে একসঙ্গে ব্রাসারিতে খেতে গেল দুজন। খেতে খেতে ক্যাথারিন বর্ণনা করল, কী করে সে হাতে ভাত খেয়েছে বাউলের বাড়িতে, কী করে মাইলের পর মাইল হেঁটেছে কাদাজলে। না কলকাতায় সে থাকেনি, ইচ্ছেও করেনি, ওই গ্রামে গ্রামে বাউলের জীবন দেখতেই তার ভাল লেগেছে। আর সবচেয়ে ভাল লেগেছে যা, যা সে নিয়েও এসেছে একগাদা, তা হল…

নীলার মুখে খাবার, শুনবে বলে সে চিবোনো বন্ধ রাখল।

 বিড়ি।

 নীলা অনেকক্ষণ ভুলে ছিল মুখের খাবার চিবোতে।

 খাওয়া শেষ করে ক্যাথারিন তার পকেট থেকে খুব যত্ন করে একটি বিড়ির প্যাকেট বের করে, দু আঙুলে আরও যত্ন করে একটি বিড়ি তুলে নিয়ে, টানে।

নীলা তার জীবনে কখনও এত কাছ থেকে বিড়ির গন্ধ পায়নি আগে। বিড়ি খাওয়া দেখেছে দূর থেকে, রাস্তার শ্রমিক বা ভিখিরিদের। আগে নীলার এমন জানাও ছিল না যে কোনও গন্ধ এত বিশ্রী হতে পারে।

বিড়ির সৌন্দর্য এবং স্বাদ যে অকল্পনীয় রকমের ভাল, ক্যাথারিন তা হাত পা মুখ মাথা নেড়ে বোঝাতে থাকে আর নীলা নির্বাক বসে বিড়ির বিশ্রী গন্ধ সইতে সইতে শুনতে থাকে এর অসামান্য গুণের কথা।

নীলা সেই বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে দানিয়েল আর ক্যাথারিনের সঙ্গে কারখানার পাশেই এক ক্যাফেতে ঢুকল। ওরা কফি খাবে, নীলা চা। চা কফি এলে নীলা বলে, চলো চেয়ার খালি আছে বসি গিয়ে।

দানিয়েল বলল, না এ দাঁড়িয়ে খাবার চা কফি।

নীলা জানত না, ক্যাফেতে তিন রকম দাম আছে খাবারের। ধরা যাক চা, দাঁড়িয়ে খেলে সাত ফ্রাঁ, বসে খেলে আঠারো ফ্রাঁ, আর বাইরের তেরাসে বসে খেলে তিরিশ ফ্রাঁ। দানিয়েল কাগজে তামাক মুড়ে সিগারেট বানায়। সিগারেট ফুঁকে ছাই ফেলে মেঝেয়। এও নাকি নিয়ম, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কফি খাওয়া লোকেরা কোনও ছাইদানি পাবে না সামনে, যা ফেলবে মেঝেয়।

তোমরা বাঙালি খাবার পছন্দ করো। নীলা জিজ্ঞেস করে।

নিশ্চয়ই। ক্যাথারিন বলে।

দানিয়েল খায়নি কোনওদিন বাঙালি খাবার। লাফিয়ে ওঠে সে প্রস্তাব শুনে।

নীলা ওই তখনই চা খেতে খেতে ক্যাফেতে, নেমন্তন্ন করে বসে দুজনকে। আগামীকাল সপ্তাহের মাইনে নেবে সে, নিয়ে সোজা বাড়ি, বাড়িতে রান্না করবে, কাজ শেষে দানিয়েল আর ক্যাথারিন সন্ধের দিকে চলে যাবে নীলার বাড়িতে, এরকম কথা হল। নীলা ঠিকানা আর ফোন নম্বর লিখে দিল।

পরদিন ঠিক ঠিক তাই করল নীলা। বেলভিল থেকে মাছ মাংস কিনে বাড়ি ফিরল। সারা বিকেল রান্না করল।

সন্ধেয় দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই এল। দানিয়েল ওয়াইন এনেছে দু বোতল।

টেবিলে ন’রকমের খাবার এনে রাখল যখন নীলা, দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই প্রথম উ লা লা, উ লা লা করল, তারপর মনে তাদের প্রশ্ন, নীলা আর কাকে কাকে নেমন্তন্ন করেছে। আর কাউকে না, কেবল ওদের দুজনকেই। দানিয়েল আর ক্যাথারিন পরস্পরের দিকে চেয়ে বিস্ময় বিনিময় করল।

নীলা, তোমার মাথার ঠিক আছে তো!

নীলা বলল, না ঠিক নেই। তার মন খারাপ।

কেন খারাপ।

 আরও দুটো পদ রান্না করতে চেয়েছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে হল না।

দানিয়েল ওয়াইন খুলে তিনটে গেলাসে ঢালল।

সঁতে।

বোনা পিতি।

নীলা ওদের থালায় খাবার বেড়ে দিল। কিন্তু নীলার পরিবেশন ওদের ঠিক মনমতো হয় না। নীলা দিতে চায়, প্রথম শাক ভাত, শাক শেষ হলে দিতে চায় নিরামিষ, নিরামিষ ফুরোলে মাছ ভাজা, তারপর মাছের ঝোল, তারপর মাংস…কারণ আলাদা আলাদা করে খেলে সব কিছুর আলাদা স্বাদ পাওয়া যায়, এ যুক্তি দানিয়েলের পছন্দ হয় না, একবারেই সে ন’পদের কিছু কিছুটা করে নিজের থালায় নেয়। বিয়েবাড়ির রেখে দেওয়া থালার খাবার ছুড়ে ফেললে ঠিক এরকমই জগাখিচুড়ি দেখতে লাগে, দেখে নীলার অস্বস্তি হয়। তার ধারণা, ওরা মোটেও এক একেকটি পদের স্বাদ আলাদা করে পাচ্ছে না। মাছ ভাজার সঙ্গে মাংসের ঝোল মেলাচ্ছে। নীলা আহা আহা করে ওঠে, তার আহা আহা বোঝা ওদের পক্ষে সম্ভব হয় না। খেতে খেতে দানিয়েল আর ক্যাথারিন উমমম উমমম শব্দ করে। এই শব্দের অর্থ, খুব স্বাদ।

মাছের ঝোল মুখে পড়তে দানিয়েলের চোখ মুখ কান লাল হয়ে ওঠে। ক্যাথারিন বাউলের বাড়িতে ঝাল খেয়েছে, সুতরাং তার, সে বলল, অসুবিধে হচ্ছে না। দানিয়েল ঝালের তরকারি ফেলে দিয়ে অঝালের দিকে মন দিল। খেতে খেতে দানিয়েল বারবারই বলল, ক্যাথারিনও, কখনও তারা এত পদ দিয়ে খায়নি।

কলকাতায় লোককে নেমন্তন্ন করলে আমরা তো এরকমই করি, এ এমন কোনও আহামরি ব্যাপার নয়।

অতিথির থালায় মাছের টুকরা শেষ হতে, আরেকটি টুকরো তুলে দেয় নীলা। আরেক চামচ ভাত। আরও একটু মাংস নাও। ওরা না বলে। তারপরও নীলা, হাতের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। ওরা অতিথি, ওরা তো না বলবেই, কিন্তু দিতে তো হবে। এরকম নিয়ম, এরকম নিয়ম দেখেই নীলা বড় হয়েছে কলকাতায়। দানিয়েল হেসে বলে, আশ্চর্য, তুমি ঠাকুরমাদের মতো করছ কেন!

ঠাকুরমার মতো নয়। নীলা ওদের বোঝাতে পারে না অতিথি হল নারায়ণ, অতিথি হল ভগবান, বাঙালির বিশ্বাস এই। ভগবান না মানলেও বাঙালি অতিথি মানে। বাঙালির ঘরে অতিথি এলে সবচেয়ে বড় আসনটি দেওয়া হয়, বড় বিছানাটি দেওয়া হয়, সবচেয়ে ভাল খাবারের আয়োজন করা হয়। ভালবাসি, এ কথাটি মুখে বলা শক্ত বাঙালির পক্ষে, খাইয়ে এবং দিয়ে ভালবাসা বোঝায় বাঙালি।

.

দানিয়েল আর ক্যাথারিন খেতে খেতে ওয়াইন পান করে, নীলা ওয়াইনে এক কি দু চুমুক দিয়েই রেখে দেয়। ওয়াইনে ওর অভ্যেস নেই।

মহাভোজ তখনও শেষ হয়নি, অতিথিরা বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে, খাওয়া স্থগিত রেখে দুবার সিগারেট ফুঁকেছে দানিয়েল, ক্যাথারিন বিড়ি, এর মধ্যে কিষান এল। এক বোতল দুধের মধ্যে দুফোঁটা চোনা।

দানিয়েল আর ক্যাথারিন দুজনই বঁজু বলল, কিয়ান বঁজু বলে শোবার ঘরে চলে গেল।

এই বুঝি তোমার স্বামী!

 নীলা মাথা নাড়ে, এই তার স্বামী।

নীলা ফ্যাকাশে মুখে শোবার ঘরে এসে গলা চেপে বলল, তুমি এমন কথা না বলে চলে এলে যে ওরা কী মনে করবে বলো তো।

ওরা কারা?

আমার সঙ্গে চাকরি করে। দয়া করে ওদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করো। এসো।

কেন?

ওরা তো সাদা। দেখছ না? কালো নয়। বাদামিও নয়। হলুদও নয়।

তো?

এসো, তুমিও খেতে বসো৷ অনেক রেঁধেছি আজ।

কী রেঁধেছ?

 এখানেই নীলা গেল ফেঁসে।

কী রেঁধেছ? মাছ মাংসের গন্ধ পাচ্ছি কেন?

 ওরা তো মাছ মাংস ছাড়া খায় না।

ওরা খায় না তো আমার কী? আমার বাড়িতে তো মাছ মাংস রাঁধার কথা না। কিষানের বিস্ফারিত চোখের সামনে নীলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

এই শেষ, আর রাঁধব না। কথা দিচ্ছি। অনুনয়ের স্বর নীলার। অন্তত অতিথি সামনে রেখে বাড়িতে গুমোট হাওয়া বওয়াতে চায় না সে।

তোমার আর রাঁধার দরকারও নেই। সামনে থেকে সরো। আমাকে আর জ্বালিয়ো না।

 নীলা সরে এল।

.

দানিয়েল আর ক্যাথারিন যতক্ষণ ছিল বাড়িতে, কিষান শুয়ে ছিল শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে।

ধুৎ

গার দ্য নর্দ থেকে গার দ্য অস্তারলিজ ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছ না কেন? বেরিয়ে যাব কোথায়? আপাতত আমার বাড়িতে এসো। তারপর দেখা যাক। . এই তোমার চাবি, সব রইল, আমি কেবল আমার জিনিসপত্র নিয়ে গেলাম। বাড়িঘর যেমন ছিল, আছে। বাড়ি ছাড়ার একটি কারণ, আমাদের মিলছে না, এ কথা কিষান তুমিও ভাল জানো। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে জীবনযাপন যে সহজ নয়, সে আমি জানি। চাকরি নেবার পরই তোমার অন্য রূপ দেখতে পাচ্ছি, তুমি আমাকে প্রতিটি মুহূর্তে অসম্মান করছ। কিন্তু একবারও ভেবে দেখতে চাওনি, ওই বাক্সবন্দির কাজ করে আমি কি খুব আনন্দ পাই, ও করব বলে কি লেখাপড়া করেছিলাম। আমি যে কারণে ও কাজটি নিয়েছি, তা হল, তোমার কাছে ভিক্ষে চাইতে আমার ভাল লাগে না। জানি, তুমি একে ভিক্ষে মনে করো না, তুমি মনে করো, তুমি তোমার স্ত্রীর ভরণ পোষণ করছ, দায়িত্ব পালন করছ, এ করলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তুমি বিনিময় দাবি করা, বিনিময়টি হচ্ছে, তোমার আদেশ মতো আমাকে প্রতিটি কাজ করতে হবে, তুমি ডানে যেতে বললে আমাকে ডানে যেতে হবে, বামে বললে বামে যেতে হবে, কারণ তুমি কর্তা, তুমি প্রভু, তুমি না হলে আমার জীবন চলবে না, আমি হলাম নেহাতই এক দাসী তোমার, তোমার ঘরদোর সামলে রাখার, রান্নাবান্না করার, পরিবেশন করার, আর রাতে বিছানায় তোমাকে যৌনানন্দ দেবার। এ ছাড়া আর কোনও ভূমিকায় আমাকে দেখো কি? অবশ্য দেখো, সেদিন বললে তোমার সন্তান দরকার। তোমাকে সন্তান দিতে হবে আমার। এ যেন আমার ব্যাপার নয়, কেবলই তোমার ব্যাপার। তুমি চাও বলে আমাকে দিতে হবে। এরকম তো হতে পারত যে আমরা চাইব। সে রাতে আমার দুজন বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে আমি বুঝলাম, এ বাড়িতে কাউকে নিমন্ত্রণ করার আমার কোনও অধিকার নেই। সম্ভবত কোনও বন্ধু থাকার অধিকারও আমার নেই। মাছ মাংসের গন্ধ নিয়ে তোমার ঢং অনেক দেখেছি, সারাদিন রেস্তোরাঁয় ওই গন্ধের মধ্যে থেকে এসে বাড়িতে সে গন্ধ আর চাও না। কী কারণ, কারণ আমাকে যে করেই হোক নিরামিষাশী বানাবে তুমি। এতকাল ধরে গড়ে ওঠা আমি, আমার অভ্যেস, আমার ভাষা, আমার স্বভাব, আমার রুচি সব জলাঞ্জলি দিয়ে আমাকে তোমার মনোমতো হয়ে উঠতে হবে। আমি অন্যায় কিছু করিনি, সে তুমি জানো। আমার ওপর তোমার রাগের মূল কারণ, তোমার আদেশ আমি অমান্য করেছি। এত বাধা নিষেধের মধ্যে আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। আমি এ বাড়ি থেকে গেলে আমিও বাঁচি, তুমিও বাঁচো। অনিশ্চিতের পথে পা বাড়ালাম। আপাতত এক বান্ধবীর বাড়িতে। আমার খোঁজ কোরো না।  নীলা। . চিঠিটি খাবার টেবিলের ওপর রেখে, তার ওপর চাবির গোছা, দানিয়েলের সঙ্গে নীলা বেরিয়ে এল পরদিন বিকেলে। গার দ্য নর্দ থেকে গার দ্য অস্তারলিজ। আগের রাতের এঁটো বাসনপত্র ওভাবেই রান্নাঘরে পড়েছিল। থাকুক, নীলা মনে মনে বলেছে। গার দ্য অস্তারলিজের ঠিক পেছনের পাঁচতলা একটি বাড়ির সারি সারি চিলেকোঠার একটি কোঠায় থাকে দানিয়েল, এককালে বড়লোকের বাড়ির চাকরানিরা থাকত ও সবে। বড়লোকেরা থাকত নীচতলায় আর চাকরানিরা ঠিক ছাদের তলায়, ছোট একটি চৌকি আর ছোট একটি টেবিল রাখার জায়গা ধরে এমন সব কোঠা, সাকুল্যে আট বর্গমিটার জায়গা। স্নানঘর নেই, করিডোরের এক কোণে একটি শুধু মলমূত্র ত্যাগের ঘর। দেশ থেকে শ্রেণীভেদ দূর হল, প্রভু-ভৃত্যের আমল গেল, চিলেকোঠাগুলোও খালি হল। খালিই পড়ে ছিল, আজকাল ছাত্রছাত্রীরা, নয়তো অল্প রোজগার যাদের, ভাড়া নেয়। দানিয়েল আটশো ফ্রাঁ দেয় মাসে ঘরটির ভাড়া। গত দু বছর সে এই চিলেকোঠাটিতেই আছে। টাকা পয়সা খুব একটা নেই, মাঝে মধ্যে এদিক ওদিক ছোটখাটো কাজ করে, আর করে লেখাপড়া, মেয়েদের পত্রিকায় লেখে, লেখা বলতে বইয়ের আলোচনা, তাও আবার যে কোনও বইয়ের নয়, মেয়েদের লেখা বইয়ের। দানিয়েল কানাডার মেয়ে, ফরাসি ওরও ভাষা, ওর মা অবশ্য আইরিশ। উনিশ শতকে আলুর দুর্ভিক্ষের সময় দানিয়েলের দাদু দিদিমা জাহাজে করে আয়ারল্যান্ড ছেড়ে উত্তর আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন। দানিয়েলের বাবার যদিও কানাডায় জন্ম, ফরাসি আর আদি আমেরিকানের রক্ত শরীরে, ওর ঠাকুরদাই ছিলেন সম্ভবত আদি আমেরিকান, যদিও দানিয়েল তাঁকে দেখেনি কোনওদিন, ঠাকুরদা প্রসঙ্গে কিছুই ওর বাবা ওকে বলেওনি, ব্যাপারটি দানিয়েলের বাবাকে এমনই অপ্রতিভ করত যে এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন উঠলে বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত, নয়তো চেঁচিয়ে প্রসঙ্গ থামাত। দানিয়েলের ভাই ফিলিপের মধ্যে একফোঁটা চিহ্ন নেই, কিন্তু দানিয়েলের নাকে, চোখে সেই পূর্বপুরুষের চিহ্ন, খানিকটা চিবুকেও, যদিও রং সাদাদের মতোই সাদা। দানিয়েলের আট বর্গমিটার জায়গার ঘরটিতে একটি বিছানা, একটি টেবিল, তার ওপর ছোট একটি কম্পিউটার, এক কোণে ছোট একটি রেফ্রিজারেটর, তার ওপর একটি চুলো, চুলোর পাশে জলের কল, বেসিন, দেয়ালে বইয়ের তাক, বইয়ের ঘাড়ে বই, মাথায় বই আর একটি হাতলঅলা চেয়ার, একটিই চেয়ার। আমার কিন্তু একটি বিছানা। দুটো বিছানা পাতার জায়গাও নেই। আর আমার দুটো তোশক নেই, দুটো লেপও নেই যে মেঝেয় বিছানা পাতব! চাপাচাপি করে শোয়া যাবে, যাবে না। নিশ্চয়ই যাবে। নীলা বলে। চাপাচাপি করে নীলা আগে অনেক শুয়েছে। গ্রামের কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ে হলে শহর থেকে রাজ্যির লোক নেমন্তন্নে যায়, বিয়েবাড়ির মেঝেতে টানা বিছানা পেতে সাত আটজন করে ঘুমোয় রাত্তিরে। অভ্যেস যে তার একবারেই নেই, তা নয়। আর বালিগঞ্জের বাড়িতেও কোনও মাসি বা পিসি এলে তার বিছানাতেই শোবার জায়গা করা হত। মাসি পিসিদের গায়ে গা ঘেঁসে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতে তার আনন্দও তো কম হয়নি, মঞ্জুষামাসির গা কাঁটা দেওয়া ভূতের গল্প তার এখনও মনে আছে। রাতে, দানিয়েল বলল নীলাকে খুব ভাল এক রেস্তোরাঁয় খাওয়াবে। তাহলে আমি ড্রেস পরে নিই কী বলো! দানিয়েল দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। নীলা পরনের কাপড় পালটে নীল জিনসের সঙ্গে লাল একটি শার্ট পরল, আর ওপরে জিনসের জ্যাকেট। হয়ে গেছে জানালে দানিয়েল ঘরে ঢুকে চোখ কপালে তুলল, কই তুমি না ড্রেস পরবে বললে। তা তো পরলামই। নীলা হেসে বলে। এ তো জিনস পরলে। ড্রেস তো পরলে না! নীলা ঠিক বুঝে পেল না দানিয়েল কী বলতে চাচ্ছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে চিকন গলায় বলে, দেখতে কি খুব খারাপ লাগছে? রায় দিয়ে দিলে, মোটে তাকে দেখতে খারাপ লাগছে না। বাইরের হাওয়ায় এসে নীলার ধিন তা তা ধিন তা তা ছন্দ ওঠে শরীরে। এমন সুখ তার প্যারিসে হয়নি কখনও, নিজেকে কখনও সে এত স্বাধীনতা পেতে দেখেনি। শুন্যে দু হাত ছুঁড়ে বলে, ভারতের দাসী পোষার শখ হয়েছিল কিষানলালের! কোথায় তোমার সেই দাসী এখন, কিষানবাবু? সখেদে বলে, আহা আরও আগে কেন পায়ের শেকল ছিঁড়িনি।  দু বাহুতে দানিয়েলকে জড়িয়ে সে সুখোচিৎকার করে, তুমি আমাকে বাঁচালে। তুমি একদিন না একদিন ওখান থেকে বেরোতেই নীলা। ওভাবে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে নাকি! নীলা প্রাণ খুলে হাসে। তাকে হাসিতে পায়। তাকে খুশিতে পায়। তার সারা শরীরে আনন্দ। সারা মনে স্ফুর্তি। রাতের রাস্তায় ছেলে মেয়েরা আনন্দ করতে নামে, নীলা দেখেছে। রাত বলে, অন্ধকার বলে যে কিছু নেই সে দেখেছে। তার সামনে আলোয় ঝলমল একটি জগৎ। এই জগতের প্রতি তীব্র আকর্ষণে নীলা লক্ষ করে গা কাঁপছে তার। দানিয়েলের কাঁধে হাত রেখে নীলা হাঁটে, নীলা হাঁটে না তো নীলা ওড়ে। দানিয়েলের হাত টেনে নেয়, হাতে হাত রেখে হাঁটে, আর সব মুক্ত মানুষের মতো হাঁটে। নীলা হাঁটে না তো নীলা ওড়ে। কী যে ভাল লাগছে তোমাকে দেখে নীলা। এ সত্যিকার তুমি। এ তুমি। মাদাম কিষানলালের মুখোশ পরিয়ে তোমার ভেতরের তুমিকে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। আর এখন, দেখো কী জীবন্ত তুমি! কী অসম্ভব সুন্দর তুমি! দেখো, দুশ্চিন্তার লেশমাত্র নেই তোমার মুখে। গোপন কোনও কষ্ট লুকিয়ে রাখার কোনও চিহ্ন নেই কোথাও। এ তুমি অন্যরকম। দানিয়েল মুগ্ধ চোখে নীলাকে দেখে আর বলে। নীলার হাতের মুঠোর ভেতর ওর হাতখানা কাঁপে, ঘামে। . শাতলের ক্যাফে জিমমারে ঢুকে দানিয়েল মেনু খুঁটিয়ে পড়ে স্পাগেটি বোলোনেস আর আর লাল ওয়াইন চাইল। মেনুতে স্যান্ডুইচ ছাড়া আর বাকি খাবার যেহেতু জানে না কী, দানিয়েলকেই বলল নীলা, তার জন্য একটি বেছে দিতে। একই খাবার হোক না, স্পাগেটি বোলোনেস। ওয়াইন কোনটা নেবে সাদা না লাল? অবশ্য, দানিয়েলের মতে, এ খাবারের সঙ্গে লালই যায়। লালই যায় তো লালই। কাঁটা চামচে স্পাগেটি যতবারই তুলতে নেয় নীলা, পিছলে পড়ে যায়। হাল ছেড়ে দেয় সে, স্পাগেটি কাঁটায় তোলাও অসম্ভব আর মুখে নিলেও আটাগোলার স্বাদ। বরং সে জমজমাট ক্যাফের ভেতরের মানুষ দেখে, পাশের টেবিলে একটি একুশ বাইশ বছর বয়সি ছেলেকে দেখে, ছেলেটির কানে দুল, ছেলেটির সঙ্গে যে মেয়ে তার কানে তো আছেই, একটি নয়, এক কানেই ছটি, নাকেও, কেবল নাকে নয়, চোখের ভুরুতে, ঠোঁটে, আর মেয়েটি হা হা করে হেসে উঠলে নীলা দেখে, মেয়েটির জিভে দুল। এ কী কাণ্ড, মেয়েটির চোখের ভুরু ফুটো করেছে? ঠোঁট, জিভ? ঘটনাটি যেন ডাল ভাত, দানিয়েল বলে, হ্যাঁ করেছে, ইচ্ছে করেছে তাই করেছে।  নীলা ভাবে, এরা ইচ্ছে যা করে, তাই করতে পারে। আর সে, নিজের জীবনের কথা খানিক ভাবে, ইচ্ছে যা করে, তা কখনই করতে পারেনি। করলে, বলা হত, যাচ্ছেতাই কাণ্ড করছে। শার্ট প্যান্ট পরে বাড়ি থেকে বেরোতে গেলেই অনির্বাণ তেড়ে আসতেন, কী পরেছিস কী! রাস্তায় তো লোকেরা ঢিল ছুড়বে। ঢিল থেকে বাঁচার কারণেই হোক, আর অনির্বাণের আদেশেই হোক নীলাকে পুরুষের পোশাক খুলে মেয়েদের পোশাক পরতে হত, সালোয়ার কামিজ নয়তো শাড়ি। ক্যাফে জিমমার থেকে বেরিয়ে লে আলের দিকে হেঁটে যেতে যেতে নীলা দেখে কিছু ছেলে মেয়ের চুল খাড়া হয়ে আছে ওপরের দিকে, মোরগের ঝুঁটির মতো, শজারুর কাঁটার মতো। চুলগুলো কালো নয়, বাদামি নয়, লাল নয়, সোনালি নয়, রাঙিয়ে হলুদ করেছে, সবুজ করেছে, গোলাপি করেছে। ও মা কী কাণ্ড। দানিয়েল এসবকেও বলে, ইচ্ছে করেছে তাই করেছে। কেন ইচ্ছে করেছে, জানার জন্য নীলার মন আঁকুপাকু করে। সমাজের নিয়ম কানুন ওদের ভাল লাগে না, তাই করেছে। এক ধরনের প্রতিবাদ। সমাজের অনেক নিয়ম নীলারও ভাল লাগে না। কিন্তু কখনও তার চুল রাঙানোর ইচ্ছে হয়নি। অত তাকত তার নেই। এত সুন্দর সুস্থ সমাজ এদের, এত চমৎকার নিয়ম কানুন, ভাল না লাগার মতো কী পেয়েছে রঙিনচুলো ছেলেমেয়েগুলো, জানার জন্য দানিয়েলের দিকে প্রশ্নচোখে তাকায় সে। দানিয়েলের দৃষ্টি তখন পমপিডুর উঁচু চুড়োয়, ওই চুড়ো থেকে প্যারিস দেখতে কেমন দেখায় তাই সে ভাবছে। নীলা এই এলাকায় আসেনি এর আগে। পমপিডু কি তেলের কারখানা? শুনে দানিয়েল এমন জোরে হাসে যে নীলা লজ্জায় মুখে হাত চাপা দেয়। হাসতে হাসতে দানিয়েল নীলার হাত ধরে ক্যাফে বো বোর ভেতর ঢোকে। ক্যাফেতে ভিড় উপচে পড়ছে, লোকের বসার জায়গা নেই, দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আছে, বেরিয়ে যাচ্ছে না, দাঁড়িয়েই ওয়াইন পান করছে। দানিয়েলের পেছনে জড়সড় দাঁড়িয়ে নীলা দেখে, তার ঠিক পাশেই এমনিতে বাঁশের মতো লম্বা তার ওপর উঁচু জুতো পরে আরও লম্বা হওয়া একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ওয়াইন খাচ্ছে, আর হেলেদুলে দুটো যুবকের সঙ্গে কথা বলছে। মেয়েটি বেশ সুন্দরী, পরনে লাল ফ্রক, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, জুতোর রংও লাল, মাথায় একটি টুপি পরা, সেটিও লাল। লাল ঠোঁটজোড়া পাখির ঠোঁটের মতো সরু করে যুবকদ্বয়ের একটিকে চুমু খায় মেয়েটি। চাপাচাপি ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে বলেই চুমু খাওয়া বড় কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় নীলার। মেয়েটি যখন অন্য যুবকের ঠোঁটে চুমু খায়, দানিয়েলের কানে কানে বলে সে, দেখো দেখো, মেয়েটি দুটো যুবককেই চুমু খেয়েছে। কোনটি তার প্রেমিক তবে? দানিয়েল নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে, ও মেয়ে নয়। ও ছেলে।  নীলা অনেকক্ষণ কোনও শব্দ পায় না উচ্চারণ করার। ছেলে হলে, মেয়ের মতো সেজেছে কেন? ইচ্ছে, তাই।  ঠিক আছে, নীলা মেনে নিল ও ছেলে, কিন্তু সে ছেলেদের চুমু খাবে কেন? নীলার গা শিউরে ওঠে যখন দানিয়েল বলে, ওরা সমকামী। জীবনে এই প্রথম নীলার কোনও সমকামী দেখা। যখন যাকে জড়িয়ে ধরতে বা চুমু খেতে ইচ্ছে, এরা খায়। যখন যে পোশাক পরতে ইচ্ছে করে, এরা পরে। মানুষের এই অবাধ স্বাধীনতা নীলাকে মোহিত করে। বসার জায়গা জোটে, ওয়াইনও আসে। দানিয়েল খেয়ে যায়, নীলা হঠাৎ হঠাৎ এক কি দু চুমুক। কী ব্যাপার খাচ্ছ না যে! ওয়াইন খেয়ে আমার অভ্যেস নেই। অভ্যেস নেই? তোমাদের দেশের লোকেরা কী পান করে তবে? হুইস্কি। ও তো খাবারের আগে খেতে হয়। খাবার খেতে গিয়ে কী পান করো?  জল। তোমার দেশের আর লোকেরা?  সবাই জল। সবাই জল? হ্যাঁ সবাই জল। . সবাই জল হলেও নীলা একটু একটু করে খেতে শিখছে ওয়াইন। একটি ব্যাপার সে চোখ কান নাক খুলে লক্ষ করে, সকাল সন্ধে ওয়াইন পান করা ফরাসিদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কলকাতায় সে দেখেছে, লোকেরা মদ কিনে কাগজে মুড়িয়ে নেয়, যেন বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে না পারে বোতলটি মদের, যেন ভাবা হয় তেলের বা ফলের রসের বা ওষুধের বোতল। নিখিল যখন মদ খায়, নিজের ঘরে বসে খায়, ভেতর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে, তবে। বাড়িতে অতিথি এলে মুখ সাতবার ধুয়ে মদের গন্ধ দূর করে তবে অতিথির সামনে আসে। মলিনা চিরকালই জানে, মদ খায় মন্দ লোকে। নীলাও তাই জানত, কিন্তু সুশান্তকে যখন মদ খেতে দেখল দু একদিন, মন্দ লোকে মদ খায় এ ধারণাটি দূর হল বটে, কিন্তু খেলে সুশান্তর মতো লুকিয়ে চুরিয়ে খাওয়াই নীলা মনে করত শোভন। এখন, এই আশ্চর্য স্বাধীন শহরে এসে নীলার বোধোদয় হয়, যদি কিছু করিই, তবে লুকিয়ে কেন গো! এ শহরে সে আরও লক্ষ করে, মদ না খাওয়াই বরং অন্যায়। লোকে খারাপ চোখে দেখে, ভাবে এর বুঝি কোনও সংস্কৃতি নেই, এসেছে কোনও ঝোপ জঙ্গল থেকে। যেহেতু স্পাগেটি জিনিসটি নীলার পেটে ঢোকেনি, নীলা ক্যাফে বো বো-তে, মাংস খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে, গোরু খাবে না, ভেড়ায় গন্ধ, গ্রিল করা মুরগি আছে, চলবে? চলবে। এর সঙ্গে পান করবে কী? কোকোকোলা। কোকোকোলা? বো বো-র যে লোক খাবার দিয়ে যায়, সে হেসে কুটিকুটি। এ কোন আজব জীব এসেছে, যে মাংসের সঙ্গে কোকোকোলা পান করে। নীলা লক্ষ করে লজ্জায় দানিয়েলের মাথা নিচু হচ্ছে। এ লজ্জা। এ স্রেফ লজ্জা। ওয়াইন না খাওয়া। এ অন্যায়। নীলা সিদ্ধান্ত নেয়, ওয়াইন পান করা দ্রুত করতে হবে তার, এই লজ্জা থেকে বাঁচতে তাকে হবেই। বো বো থেকে বেরিয়ে নীলাকে আরও এক ক্যাফেতে নিয়ে গেল দানিয়েল, ওখান থেকে এক আইরিশ পাবে, আইরিশ পাব থেকে ডিসকোটেকে, আলো নিবছে জ্বলছে আর বিষম জোরে গান বাজছে, তালে তালে লোকেরা নাচছে। দানিয়েল ধুন্ধুমার উল্লাসে নীলার হাত ধরে টানে, চলো নাচব। নীলা না না করে ওঠে, সে যাবে না, সে নাচতে জানে না। নাচতে না জানাও সে লক্ষ করে বিষম লজ্জার ব্যাপার। এক আজব জীবেরাই নাচতে জানে না। নাচ বলতে এখানে, নীলা লক্ষ করে সুরের তালে গা নাড়ানো। কেউ পা নাড়ছে, কেউ হাত, কেউ পিঠ, কেউ মাথা, কারও সঙ্গে কারও মিলছে না, তালে তালে শরীরের কিছু একটা নাড়ানোই নাচ। দানিয়েল একাই নেচে এল। এসে মুখ ভার করে বলল, তুমি আমাকে এত অপছন্দ করো? কেন? আমার সঙ্গে নাচলে না যে।  নীলা লজ্জায় কুণ্ঠায় মাথা নিচু করে বলল, আমি যে নাচতে জানি না। এ আবার না জানার কী আছে।  ছোটবেলা থেকে না নাচলে নাচ হয় না, তাই নীলা জানে। তার খুব নাচের শখ ছিল, অনির্বাণ মেয়েকে নাচ শেখাতে রাজি হননি বলে নীলার নাচও হয়নি। হারমোনিয়াম কিনে দিয়ে নাচের বদলে গান শিখতে বলেছিলেন। ওস্তাদ রেখে দিয়েছিলেন, বড় গাইয়ে হয়নি নীলা, তবে ভাল গাইতে জানে, ছোটখাটো আসরে আবদার করলে নীলা শরম না করে গেয়ে দেয়। ভারতে যারা নাচে, ভরতনাট্যম, কথক বা মণিপুরি, তারা সেই ছোটবেলা থেকেই নেচে আসছে। শরীর ওদের একতাল কাদার মতো, বেঁকে ধনুকের মতো হতে পারে। . দানিয়েল পথে বেরিয়ে বলে, তুমি যে আমাকে অপমান করেছ, তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছি অবশ্য। নীলা চমকে ওঠে, কখন? কখন আমি তোমাকে অপমান করলাম। বলছ কী দানিয়েল! আমি তোমার গেলাসে ওয়াইন ঢেলে দিলাম, আর তুমি কোনও ধন্যবাদ বলোনি। দানিয়েল বলে। বলে কী মেয়ে। দানিয়েলকে ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে মনে করছে নীলা। বন্ধুরা কখনও বন্ধুকে কোনও কারণে ধন্যবাদ বলে! নীলা অন্তত এ শিক্ষা পায়নি। কলকাতায় কোনও বন্ধু তার গেলাসে ওয়াইন ঢেলে দিলে, নীলা যদি ধন্যবাদ বলত, তা হলে সে বন্ধু নির্ঘাত একে অপমান বলে ভাবত। বাংলায় একটি কথাই আছে, ধন্যবাদ জানিয়ে আমাকে খাটো কোরো না। ঠিক আছে, বন্ধুকে যদি ধন্যবাদ না বলো, তবে কাকে ধন্যবাদ বলো? নীলা অপ্রতিভ কণ্ঠে বলে, অপরিচিত কেউ যদি হয়। আর সে যদি কিছু দেয় আমাকে বা কিছু করে আমার জন্য, তবে। ক্যাফে জিমমারের লোকটি তো তোমার বন্ধু ছিল না, তাকেও তো ধন্যবাদ বলোনি।  তাকে কেন ধন্যবাদ বলব? তুমি জল চাইলে, সে তোমাকে জল এনে দিল। সে কারণে তাকে ধন্যবাদ দেবে। আদেশ, বুঝলে নীলা, লোকটিকে তুমি আদেশ করেছ জল আনতে, অনুরোধ করোনি। ও লোক তো তোমার ক্রীতদাস নয়। ও ওখানে চাকরি করে। দানিয়েল এক দমে বলে যায়। নীলা ঠিক বুঝে পায় না কী বলবে। সে সাধারণত যেভাবে রেস্তোরাঁয় কিছু চায়, এক গেলাস জল দিন তো, সেভাবেই চেয়েছে। আদেশ করলে স্বরটি রুক্ষ হয়, অনুরোধ হলে স্বরটি নরম, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দোলে, এই পার্থক্য। দানিয়েলের আপত্তি নীলা দয়া করে শব্দদুটো বলেনি। আপনি কি দয়া করে আমাকে এক গেলাস জল দিতে পারেন এভাবে চাইতে হত। আসলে কী জানো দানিয়েল, নীলা ধীরে বলে, স্বরটি ভাঙা, ধন্যবাদ দেবার অভ্যেস নেই বলে সম্ভবত দিইনি, তবে ওই লোককে আমি মোটেও ছোট করে দেখিনি। অভ্যেস নেই? কেন অভ্যেস নেই? অভ্যেস নেই, কারণ তোমরা মানুষকে মানুষ বলে জ্ঞান করো না। দানিয়েল বলে। তাই কি!  তাই।  নীলা মনে মনে শক্ত চাবুকে নিজেকে চাবকায় নিজের এই অসভ্যতার জন্য, মানুষকে মানুষ না ভাবার জন্য। এই সমতার দেশে, কোনও মানুষই বড় নয়, কোনও মানুষ ছোট নয়, সবাই সমান। কেউ ছোট কাজ করে, কেউ বড় কাজ করে, কিন্তু সবাই মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকে। নীলা মনে মনে বলে, তাই তো হওয়া উচিত। শ্রেণীবিদ্বেষ নেই তার, তাই সে জানত। দানিয়েল আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল, আছে। বোধোদয় হয় নীলার। নিজেকে সে ঘৃণা করতে থাকে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ায়। চোখ জ্বালা করে। নীলা ছোটবেলায় দেখত, নিখিল রাত জেগে লাল বই পড়ছে। কী লেখা লাল বইয়ে? শ্রেণীসংগ্রামের কথা লেখা। নীলা তার উনিশ বছর বয়সেই মার্কস এঙ্গেলস পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে, কলেজে কমুনিস্ট দলে ভিড়েছে, মিটিং মিছিল করেছে, আর আজ কিনা সে নিজেই প্রমাণ করল সে শ্রেণীভেদ মানে, সে মানে যে লোকটি খাবার এনে দেবে ক্যাফে রেস্তোরাঁয়, সে ছোটলোক! এই সভ্য সমাজে এসে, এই সাম্যের দেশে এসে এই লিবার্তে, ইগালিতে আর ফ্রাতারনিতের দেশে, যেখানে নারী পুরুষে ভেদ নেই, ধনী গরিবে ভেদ নেই, সেখানে এসে নীলার শ্রেণীবিদ্বেষী মন এমনই প্রকট হয়ে উঠেছে যে দাঁতকপাটি মেলে নীলার দিকে তেড়ে আসছে। ছি! দানিয়েল, আমি জানি আমি অন্যায় করেছি। এরকম ভুল আর হবে না। আমাকে ক্ষমা করে দাও। বিনত স্বর নীলার। দানিয়েল শোনে, শুনে স্বস্তি পায়। দানিয়েলকে আরও স্বস্তি দিতে নীলা বলে, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে তিরিশ বছর ধরে কোন দল ক্ষমতায়, জানো? কমুনিস্ট। জ্যোতি বসুর নাম শুনেছ? তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা ভারতবর্ষে আর একজনও নেই। দানিয়েল হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়ায়। মুখ হাঁ। চোখ হাঁ। দম নাও মেয়ে, দম নাও। বানের জলে ভেসে এসেছি ঠিকই, সাম্যের অঞ্চল থেকেই এসেছি। তিরিশ বছর? হাঁ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে দুটো কেবল শব্দ আর সাদা ধোঁয়া। হ্যাঁ তিরিশ বছর!  কেন? কেন মানে, ভাল বলে। আমরা ভোট দিই বলে! কমুনিস্টকে ভোট দাও?  নিশ্চয়ই। ছি ছি। দানিয়েল সারা পথ ছি ছি করল।  সারা পথ দানিয়েল বলতে বলতে এল, স্তালিন যত লোক খুন করেছে, হিটলার তার চেয়ে অনেক কম করেছে। বলতে বলতে এল, মার্কস ভুল, এঙ্গেলস ভুল। বলতে বলতে এল, লেনিন ছিল আপাদমস্তক ভণ্ড। আস্ত সন্ত্রাসী। . নেমন্তন্ন নিকল নেমেরের বাড়িতে সন্ধেয় নেমন্তন্ন দানিয়েলের আর দানিয়েল যে ভারতীয় মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়েছে, তার। নতুন এক পত্রিকার সাংবাদিকের সঙ্গে বিকেলে দানিয়েলের ক্যাফে কায়রোতে রাদেভুঁ, সেই রাদেভুঁতে যাবার আগে সে বলে যায় নীলা যেন নেমন্তন্নে যাবার জন্য তৈরি হয়ে থাকে, সন্ধে সাতটায়। ও যখন ফিরে এল ঘরে, নীলা তখনও শুয়ে, এ মুভেবল ফিস্ট পড়ছে।  কী ব্যাপার তুমি এখনও তৈরি হওনি? দানিয়েল বোকা বনে যায় ঘরে ঢুকে।  নীলা আড়মোড়া ভেঙে বলে, এখনই? বাজে কটা? সাতটা। এ আর এমন কী! আমি তোমাকে সাতটায় তৈরি হয়ে থাকতে বলেছি। আমার তো এখনও স্নান করাই হয়নি। নীলা উঠে বসে।  বলো কী? দানিয়েলের ছোট চোখে ছোট চিবুকে দু টুকরো বিস্ময় এসে বসে। আমার তো কাপড় ইস্ত্রি করাই হয়নি।  দানিয়েল ধুপ করে শরীর ছেড়ে দিল চেয়ারে। ঠিক সাড়ে সাতটায় আমাদের পৌঁছতে হবে নিকলের বাড়িতে। তোমাকে তো আগেই বলেছি। সাড়ে সাতটার জায়গায় আটটা বা সাড়ে আটটা হলে কী ক্ষতি নীলা বুঝে উঠতে পারে না। কলকাতায় কোথাও নেমন্তন্ন থাকলে ঘণ্টা দেড়ঘণ্টা দেরি করেই সে যায়, সে কেন, সবাই যায়। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় পৌঁছোনো কেমন অস্বস্তিকর, দানিয়েলের কাছে অবশ্য কাঁটায় কাঁটায় না পৌঁছোনোই অস্বস্তির ব্যাপার। স্নান করতে আবার কাছের গণ স্নানাগারে যেতে হবে নীলার, ও সেরে আসতে গেলে দানিয়েল আত্মহত্যা করবে। দানিয়েলের স্নানের ঝামেলা নেই, ও মাসে একবার যায় স্নানাগারে, আর সপ্তাহে সপ্তাহে ঘরের তোলা জল মুখে গলায় ঘাড়ে হাতে ছিটিয়ে স্নান সারে। পরনে ওর কালো লম্বা জামা, আর নীলা তড়িঘড়ি হাতের কাছে যা পায়, ইস্ত্রি ছাড়াই, পরে নেয়। নীলা লক্ষ করেছে, ইস্ত্রি করা কাপড় জামা খুব কম লোকেই পরে। শীতের দেশ, বছরের বেশির ভাগ সময়ই সোয়েটার বা কোটের তলায় ঢাকা পড়ে থাকে না-ইস্ত্রি জামা। জিনস পরলে? নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছ। খারাপ দেখাচ্ছে?  জিনস তো দিনের বেলায়। কাজের জায়গায়। দানিয়েল সময়ের অভাবে নীলার জিনস মেনে নেয়। নীলা তড়িঘড়ি একটি লাল টিপ পরে নেয় কপালে, অন্তত এ যদি কিছু সৌন্দর্য রক্ষায় সাহায্য করে। দানিয়েলের ঘর থেকে গার দ্য অস্তারলিজ মেট্রোতে যেতে আড়াই মিনিট, গার দ্য অস্তারলিজ থেকে নিকলের বাড়ির কাছের মেট্রোতে পৌঁছোতে লাগে বাইশ মিনিট, আর সেই মেট্রো থেকে হেঁটে নিকলের বাড়িতে যেতে পাঁচ মিনিট। হাতে দেড় মিনিট থাকে। এক মিনিট হাতে রাখো, রাস্তা পার হওয়ার সময় যদি ট্রাফিকের লাল বাতি জ্বলে, তবে গেল এক, আর নিকলের বাড়ির লিফটে যদি লোকের ভিড় থাকে, তবে সিঁড়ি পেরোতে হবে, সিঁড়িতে যাবে আধ মিনিট। নীলার কারণে দানিয়েলের এই হিসেবে গোল বাধে। লাল বাতির ঝামেলা ছিল না, লিফটেও কোনও লোকের ভিড় ছিল না, তার পরও নিকলের বাড়িতে ঢুকতে বাজল সাতটা সাঁইত্রিশ। দানিয়েল প্রথমেই এই দেরির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিল। নিকল, তারও পরনে লম্বা কালো জামা, লাল চুলের সবুজ চোখের মেয়ে, নীলার চেয়ে লম্বায় দুবিঘত, বয়সে দুবিঘত বড়, দানিয়েলকে ক্ষমা করল। বাড়িতে আরও তিনজন অতিথি, মারিয়া সুয়েনসন, মিশেল কজ আর রিতা সিকসুস। সবাই দাঁড়িয়ে, সবার হাতে সরু শ্যাম্পেনের গেলাস, এক মারিয়া ছাড়া, তার গেলাসে কমলার রস। সবার পরনে কালো লম্বা জামা, নেমন্তন্নের সঙ্গে কালো লম্বা জামার একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে, নীলা অনুমান করে। ঢোকার পরই নিকল সহ অতিথি তিনজন নীলা আর দানিয়েলের দুগালে চকাস চকাস চুমু খেল। মারিয়া সুইডেনের মেয়ে, ফ্রেডরিকা ব্রেমের ফরবুনডেট নামের একটি নারী সংগঠনের নেত্রী, প্যারিসে এসেছে মেয়েদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিষয়ে একটি সভা হচ্ছে, ওতে বক্তৃতা করতে, মিশেল কজ প্যারিসের নয়, থাকে ফ্রান্সের দক্ষিণে, ফিজাক নামের এক শহরে, প্যারিসে এসেছে এই সভা শুনতে আর রিতা সিকসুসের কোনও সভা সমিতি নেই, জন্মেছে আলজেরায়, ইহুদি পরিবারে, প্যারিসেই বাস, ছবি পরিচালনা করে, নিকলের দীর্ঘদিনের বন্ধু, এ বাড়ির যে কোনও আড্ডায়, বিশেষ করে শনি রোববারে রিতার উপস্থিতি অনেকটা মাছের ঝোলে নুনের মতো, থাকা চাই। আর নিকল, মাস্টারি করে কলেজ দ্য ফ্রান্সে, দানিয়েলেরও পরিচয় আছে বলার, সে সাংবাদিক। নীলার পরিচয় সে ভারতের মেয়ে। কী করো? কিছু না। ভেরেন্ডা ভাজি। তাই তো নীলা ভাবে, এই প্যারিসে তার পরিচয় হয় কিষানলালের বউ নয়তো নীলাঞ্জনা মণ্ডল, শ্রমিক। ভেরেন্ডাভাজনেঅলা। দানিয়েল করুণা করে নীলার আরও এক পরিচয় উল্লেখ করল, তার বন্ধু। নীলা হাঁফ ছাড়ল। হাঁফ ছাড়তে না ছাড়তেই দুটো বীভৎস কুকুর নীলার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ও মাগো বাবাগো বলে তারস্বরে চিৎকার জুড়ল নীলা, আর হাসির রোল উঠল ঘরে। দানিয়েল ফ্লুন ফ্লুন বলে ভোঁতা নাকের একটিকে কোলে তুলে নিয়ে মাথাখারাপের মতো চুমু খেতে লাগল, আরেকটিকে নিকল তুলল কোলে, বাচ্চাদের মতো না কাঁদে না না কাঁদে না ভঙ্গিতে দুলতে লাগল। তুমি কুকুরকে ভয় পাও? মারিয়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে। নীলাকে ভয় পাচ্ছে মারিয়া, কারণ কুকুরকে জড়িয়ে ধরার বদলে নীলা চিৎকার করেছে। এরকম অদ্ভুত কাণ্ড মারিয়া কেন, এ বাড়ির কেউ দেখেনি এর আগে। নীলার আশঙ্কা হয়, পাঁচ জোড়া চোখ যেভাবে তাকে দেখছে, নিশ্চয় এদের সন্দেহ হচ্ছে যে তার মাথায় কোনও রোগ আছে। রিতা জিজ্ঞেস করল, খুব কোমল কণ্ঠে যদিও, আচ্ছা তোমার কি কোনও অসুখ টসুখ আছে। এরকম হয়, কিছু অসুখ থাকলে বিশেষ করে কুকুর দেখলে…। নীলাকে মানসিক রোগী হওয়ার যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করে দানিয়েল বলল, সম্ভবত ও আগে কুকুর দেখেনি। ওদের দেশে কুকুর নেই। নীলা পাঁচ জোড়া চোখের সামনে যদি বলতে পারত যে ঠিক তাই, নেই, তবে একরকম বাঁচত। বলল, আছে। আছে?  নিকল চমকাল। থাকলে ভয় পেলে কেন? পাঁচজোড়া চোখে একটিই প্রশ্ন। নীলা উত্তর দেবার সাহস পেল না। পাঁচ মানুষের চোখ এবার অন্যদিকে ফিরল। ফ্লুনের চোখও। নিকলের কোলেরটিরও, ফিফিরও। কালো চারটে বেড়ালেরও। এরপরের দীর্ঘ আলোচনায় নীলার অংশগ্রহণ মোটে জরুরি নয়। শ্যাম্পেন পান করতে করতে যে আলোচনাটি চলে, তা কুকুর বেড়াল বিষয়ে, সকালে চোখ মেলতেই কাকে নিকল দেখেছে তখনও ঘুমোচ্ছে, আর কোনটি লাফিয়ে তার বুকের ওপর বসেছে, কে ঘাড় কাত করে নিকলকে একবার দেখে সরে গেছে অন্য ঘরে, সকালের কোন খাবার কার পছন্দ হয়নি, কে সোফায় শুয়ে টেলিভিশন দেখতে দেখতে খাবার খেতে ভুলে গেছে, আর খেতে গিয়ে কোনটির কোন খাবার পছন্দ হয়নি, কোনটি অভিমান করে লেপের তলায় সারা বিকেল শুয়ে ছিল, কার আজ দুদিন ধরে মন খারাপ এসব। নীলা লক্ষ করে, সবাই বিষম আগ্রহ নিয়ে শুনছে এসব, মাঝে মাঝে আহা আহা করছে, মাঝে মাঝে হাতে হাসতে বেড়াল বা কুকুর কোনও একটিকে বুকে জাপটে ধরে নাক মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে লোমে। বেড়ালের গায়ের বোটকা গন্ধে নীলা প্রথম থেকেই নাক চেপে আছে, হঠাৎ হঠাৎ শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার ব্যাপারটি নিশ্চিত করে বাকি সময় শ্বাস বন্ধই করে রাখছে। একটি ব্যাপার সে লক্ষ করছে, এত সোফা চেয়ার খালি পড়ে আছে, তবু দাঁড়িয়ে পান করছে সবাই। কী জানি, কার শরীরের মাপ কী, কে কার চেয়ে কত উঁচু, কার জুতো কোথা থেকে কেনা নাকি কার জামাটি দেখতে কত চমৎকার তা বোঝাতেই। নীলা তার জিনস, তার কড়া হলুদ রঙের একটি না-ইস্ত্রি শার্ট, তার সবুজ রঙের জ্যাকেটের দিকে তাকিয়ে টের পায় তাকে উৎকট লাগছে দেখতে, অন্য কারও যেন চক্ষুপীড়া, নাসিকাপীড়া না হয় তাকে দেখে, আলগোছে সে বৃত্ত ভেঙে সোফার একটি কোণে গিয়ে জবুথবু বসে, বসে টের পায় এ নিয়ম নয়, নিয়ম দাঁড়িয়ে থাকা। বৃত্তে দাঁড়িয়ে থাকো, যতক্ষণ না তোমাকে বসতে বলা হচ্ছে, বৃত্তে দাঁড়িয়ে, তুমি যদি জংলি কিছু পরা থাকে, তাই দেখাও, তুমি যে গেঁয়ো ভূত, তুমি যে সংস্কৃতির স-ও জানো না, কোথায় কোন পোশাক পরতে হয়, কী করে মেরুদণ্ড লোহার মতো শক্ত করে দাঁড়াতে হয় তা জানো না, তা বোঝাও। নীলা বসেই থাকে, কুলকুল করে ঘামে, লক্ষ করে কারও গায়ে কোনও গরম কাপড় নেই, দরজার কাছে হুকে ঝুলিয়ে তবে ঘরে ঢুকেছে সবাই, কারণ ঘরের ভেতরটা ঠাণ্ডা নয়, ঘরের ভেতর ওম আছে, মানুষের ওম, কুকুর বেড়ালের ওম, উষ্ণ সংস্কৃতির ওম, দম্ভের ওম। এক কোণে ফায়ারপ্লেসে কাঠ পুড়ছে, আরেক পাশে বড় এক পিয়ানো। ধনীর বাড়িতে এ দুটো জিনিস না থাকলে চলে না। ঘর গরম করার যন্ত্র থাকলেও ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরিয়ে ঘর গরম করার মধ্যে আভিজাত্য আছে, আর পিয়ানো কেউ বাজাক না বাজাক, এটি থাকলে সম্ভ্রম থাকে। সবুজ জ্যাকেটখানা খুলে ঝুলিয়ে আসে হুকে, কারও যেন চোখ না পড়ে তার দিকে, এমন সন্তর্পণে। ও খুলেও সংস্কৃতি রক্ষা তার পক্ষে সম্ভব হয় না, কারণ তার কড়া হলুদ শার্ট থেকে অসংস্কৃতির আলো ছিটকে বেরোচ্ছে, সে আলো অন্যের চোখকে আঘাত তো করেই, অন্ধ করতেও ছাড়ে না। ফ্লুন বসন্তকালটা আবার খুব পছন্দ করে, বলতে বলতে নিকল সোফার দিকে এগোল। পেছন পেছন বাকিরা। বাকিদের বসতে অনুরোধ করে নিকল নিজেও বসল। বসন্তের ঘ্রাণ পাচ্ছ বাতাসে? সবাই এক বাক্যে সায় দেয়, ঘ্রাণ পাচ্ছে, নতুন পাতার ঘ্রাণ, নতুন কুঁড়ির ঘ্রাণ। জানালা সামান্য খোলা, ওতেই হুড়মুড় করে ঢুকছে বসন্তের ঘ্রাণ। নীলাও সে ঘ্রাণ পেতে শ্বাস নেয় লম্বা করে, তার ওই শ্বাসে বেড়ালের গায়ের ওই বোটকা গন্ধ ছাড়া কিছু ঢোকে না। বেচারা নীলা। কী ভীষণ ঠাণ্ডাই না গেছে এবারের শীতে! রিতা বলল। খুব ঠাণ্ডা গেছে বলে মারিয়া আর দানিয়েল মানল না, থাকতে মন্ট্রিয়ালে, থাকতে উপসালায়, দেখতে ঠাণ্ডা কাকে বলে।.দানিয়েল ছ বছর আগে কানাডা ছেড়ে এসেছে, ওই ঠাণ্ডা দেশে তার আর ফেরার শখও নেই, আর সে দেশের নামও সে নিতে চায় না, নাম নিলেই নাকি স্মৃতির এক পাহাড় বরফ তার গায়ের ওপর ধসে পড়ে। রীতিমতো আভালাঞ্জ। শীতকালের প্রসঙ্গ যে যত দ্রুত সম্ভব দূর করে। যে বিষয়টির দিকে মারিয়া হাত বাড়িয়ে আছে, সে সূর্য। কী অভাবনীয় এর কিরণ, কী মধুর এর তাপ, কী যে আশ্চর্য জাদু এর আলোয়। নীলা শ্বাস বন্ধ করতে ভুলে যায়, বেড়ালের বোটকা গন্ধও যেন নিমেষে উবে গেছে, বসন্তের এমন রূপ বর্ণনা শুনে। নীলা বরং ঘন ঘন শ্বাস নেয়। শ্বাস নেয়, কারণ স্মৃতিতে এখন তার চাঁদি ফাটানো সূর্য। সূর্যের কোনও মোহনীয় রূপ তার কোনওকালে দেখা হয়নি, দেখা হয়েছে এর রুক্ষতা, তিক্ততা, এর রোষ, ক্ষোভ, এর গা পোড়ানো চরিত্র। ভ্যাপসা বিচ্ছিরি গরমে নীলার বরাবরই ঘন ঘন শ্বাস পড়ে, এখনও তাই পড়ছে। জল তেষ্টাও পায়, এখনও তাই পাচ্ছে। জলতেষ্টাকে সে দাবিয়ে রাখে, যতটা অপাঙক্তেয় অবজ্ঞাত হওয়া যায়, সে হতে চায় এ আলোচনায়। কারণ, কোনও কারণে কেউ যেন আবার না ভাবে, নীলা কুকুরকেই নয় কেবল, সূর্যকেও ভয় পায়। আর তা শুনে দানিয়েলকে যেন এগিয়ে আসতে না হয় নীলাকে উদ্ধার করতে এই বলে যে ও সম্ভবত সূর্য দেখেনি বা ওদের দেশে সূর্য ওঠে না। চোখ আছে যেমন ওদের, চোখের লজ্জাও আছে। আর সে চোখের লজ্জার কারণে, ওরা বলে, সোফার এককোণে বসে খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে নখ খুঁটতে থাকা নীলাকে, আচ্ছা তোমাদের ভারতে এখন কী কাল? দানিয়েলই জিজ্ঞেস করে। তার বন্ধুটি যে একেবারে ফেলনা নয়, ভারতে কী কাল চলছে, শীতকাল না গ্রীষ্মকাল এই সহজ প্রশ্নটির উত্তর অন্তত দিতে পারবে, সে ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত হয়েই দানিয়েল প্রশ্ন করল, আর নীলাকে একাকিত্ব থেকে উদ্ধার করতেও। নীলা আসলে একা বোধ করছিল না, এখনই বরং সে একা বোধ করে।  ম্লান কণ্ঠে উত্তর দেয়, বসন্তকাল। বসন্তকাল? নিকলের ভুরুতে অবিশ্বাস। ভারত কি বিষুবরেখার উত্তরে না দক্ষিণে? প্রশ্ন। রিতা বলে, উত্তরে।  নিকল বলে না না দক্ষিণে। দানিয়েল বলে, বসন্তকাল হলে এ নিশ্চয়ই উত্তরে।  নিকল উঠে গেল, ফিরে এল হাতে একটি ঢাউস বই নিয়ে। পাঁচটা মাথা পৃথিবীর মানচিত্রে উপুড় হয়ে আছে। লাল (নিকলের), সোনালি (মারিয়ার), কালো (রিতার), বাদামি (মিশেলের), গাঢ় বাদামি (দানিয়েলের)। . মাথাগুলো দূর থেকে দেখে নীলা। এবার রিতা, সঠিক উত্তরের রিতা, নীলার দিকে ঝুঁকে বলে, কী নাম ওই পরিচালকের? ওই স্যালন দ্য মুজিক যে বানিয়েছে…সত্যজিৎ রায়। ওর ছবি দেখেছি আমি। আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি রিতার মুখে। নীলার মুখে হাসি ফোটে। কথা ফোটে।  ওঁর আর কী ছবি দেখেছ?  প্রায় সব ছবিই।  পথের পাঁচালি দেখেছ? নীলা উদগ্রীব। দেখেছি। তত ভাল লাগেনি।  ভাল লাগেনি? নীলা অবাক। চারুলতা? তাও দেখেছি। ওর সবচেয়ে ভাল ছবি হল স্যালন দ্য মুজিক, জলসাঘর। রিতার রায় শুনে নীলা, যেহেতু তার মতে পথের পাঁচালিই সত্যজিৎ রায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি, দমে যেতে গিয়েও যায় না, কারণ এক রিতাই একজন ভারতীয় তার ওপর বাঙালি সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান ধারণ করে আছে। জলসাঘর কেন, রিতা যদি মহাপুরুষ বা কাপুরুষও পছন্দ করে, নীলার মনে হয় না সে এতটুকু চুক চুক করবে। রিতাই আসলে একরকম নীলাকে উদ্ধার করে, নত মস্তক থেকে নখ খোঁটা থেকে সত্যিকার মুক্তি দেয়। নীলার কণ্ঠ থেকে কুণ্ঠা বিদেয় করে। আর কোনও ভারতীয় পরিচালকের ছবি দেখেছ? নীলা জিজ্ঞেস করে। দেখেছি আর দুএকটা। তবে তোমাদের ছবিতে খুব নাচ গান থাকে। তা থাকে, সস্তা মারদাঙ্গা, রুচির ছিটেফোঁটা নেই। হিন্দি ছবিগুলোকে নীলার অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ তার বা তাদের ছবি নয়। ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এদের ছবি দেখেছ? না দেখেনি। নাম শুনেছ? শোনেনি। রিতা নিজে এখনও কোনও বড় ছবি, যাকে বলে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, বানায়নি। এ অব্দি যা করেছে, সব ছোট। ছোট বলতে দু মিনিটের, পাঁচ মিনিটের, পনেরো মিনিটের। তিনটে তথ্যচিত্র করেছে কুর্দ মেয়েদের জীবন নিয়ে, আর একটি করেছে তুরস্কে রুশ মেয়েদের পতিতাবৃত্তি নিয়ে। পূর্ণদৈর্ঘ্য? ও বানানো সহজ, কিন্তু সহজ নয় প্রযোজক পাওয়া। দানিয়েল বলে, মেয়েদের পণ্য করে আজ বানাতে চাও কোনও ছবি, দেখবে প্রযোজকেরা লম্ফ দিয়ে আসবে ছবির খরচ দিতে। নিকল সংশোধন করে দেয়, পুরুষ প্রযোজক। টেবিলে বিভিন্ন মদের বোতল। শ্যাম্পেন আছে, পরতো আছে, মার্টিনি, ভদকা, হুইস্কি আছে, যে যা পান করো। নিকল গেলাসে ঢেলে দেয়, যে যা চাচ্ছে। মারিয়া সবেগে মাথা নাড়ে, সে মদ্যপান করবে না আগেই বলেছে, কারণ সে গাড়ি চালাবে। প্যারিসে এ দুদিনের জন্য গাড়ি? দুদিন পর সে যাচ্ছে দক্ষিণে, কান-এ। ওখানেও বক্তৃতা? না, ওখানে সমুদ্র। দক্ষিণী উষ্ণতা।   ও সুইডিশ, আর কিছু না জানলেও আইন মানতে জানে, মিশেল কজ চোখ টিপল বোলে। আমরা ফরাসিরা দুএক গেলাস পেটে না ফেলে স্টিয়ারিঙে হাত দিই না। নাকি এবসলুত লাগবে? এবসুলেটলি নট।  নীলা পরতো নেবে বলল। নেবে কারণ বোতলটি দেখতে অন্য বোতলের চেয়ে ভাল। আর পান করতে যেহেতু হবেই, যেহেতু পান না করলে ভাবা হবে সে এক গেঁয়ো ভূত। আর নিকল যখন হাতে দেয় গেলাস, নীলা ধন্যবাদ বলে। ম্যা(গ)সি বকু। এটির উচ্চারণ শিখতেই তার অনেকদিন লেগেছে। এম ই আর সি আই মেরসি, বি ই এ সি ও ইউ পি বিয়াকুপ। মেরসি বিয়াকুপ। তাই বলত। যেরকম বানান সেরকম উচ্চারণ। কিন্তু শুনে লোকে অবাক হয়, এ আবার কী আজব ভাষায় কথা বলছে এ মেয়ে! ফরাসিরা র উচ্চারণ করতে গেলে গ-এর মতো এক শব্দ বেরোয়, আর শব্দের লেজ বেশির ভাগ সময়ই এরা উচ্চারণ করে না। এ দেখে নীলার বদ্ধ ধারণা, বই পড়ে আর যে ভাষাই শেখা যাক, ফরাসি ভাষা নয়। নীলার মাথা খারাপ হবার জোগাড় হয় যখন দেখে ফরাসি সব জিনিসেরই, সব পদেরই লিঙ্গ আছে। বড় লিঙ্গপ্রেমী এরা। টেবিল চেয়ার দরজা জানালা খাতা কলম থাল বাসন সবকিছুরই লিঙ্গ আছে। টেবিল পুংলিঙ্গ তো চেয়ার স্ত্রীলিঙ্গ, বই পুংলিঙ্গ তো কলম স্ত্রীলিঙ্গ। দরজা কি পুংলিঙ্গ না স্ত্রীলিঙ্গ? স্ত্রীলিঙ্গ। কী কারণ? কোনও কারণ নেই। ব্রেসিয়ার কী লিঙ্গ। পুংলিঙ্গ। এ মেয়েদের জিনিস, এ পুংলিঙ্গ কেন? কারণ নেই। প্যান্টি? পুংলিঙ্গ, লিপস্টিক? এও পুংলিঙ্গ। মন্ত্রী কী লিঙ্গ? মন্ত্রী পুংলিঙ্গ। তবে মেয়ে মন্ত্রীদের উপায় কী? পুংলিঙ্গই ব্যবহার করছে, কেউ আবার দাবি তুলছে শব্দ বদলাবার। নীলার জানতে ইচ্ছে করে, পুংলিঙ্গটি কোন লিঙ্গ, পুংলিঙ্গ তো? না কি স্ত্রীলিঙ্গ। নীলা অনেকটা আশা ছেড়েই দেয়, এ ভাষা শেখা তার দ্বারা হবে না। এত লিঙ্গ সামলাবার ক্ষমতা ওর নেই। আপাতত ম্যা(গ)সি বকু বলতে পেরে সে স্বস্তি পায়। অন্তত তাকে অসভ্য বলে এখন আর কেউ গাল দেবে না। অতি সতর্ক সে, চোখ কান নাক মুখ সব খোলা, কোনও কারণেই যেন ধন্যবাদ বলতে ভুল না হয়। আলোচনা গড়িয়ে যাচ্ছে পুরুষ প্রযোজক থেকে নারী প্রযোজকে, নারী প্রযোজক থেকে নারী পরিচালকে, এরপর ব্যাক গিয়ারে একশো বছর পিছিয়ে যায়, সুসান বি এনথনি, এলিজাবেথ, কেডি স্ট্যানটন—ভোটের আন্দোলন। ভোট থেকে লাফিয়ে নারী শ্রমিক আন্দোলনে, ক্লারা জেটকিনের সভায়। সেই সভা থেকে আরও একটি লম্বা লাফে জন্মনিয়ন্ত্রণ। সেটির ফয়সালা হল। এখন কী? এই ফ্রান্সে, এই ইগালিতের সংসদে শতকরা দশজনও মেয়ে নেই। কী লজ্জা কী লজ্জা। সিমোন ভেইল, কী করেছে সংসদে বসে? কিচ্ছু না। আউসউইৎস থেকে বেঁচে এসে ডানপন্থী দলে ভিড়েছে, বোকামো ছাড়া আর কী! ক্যাথারিন ত্রতমেন? স্টারসবুর্গের মেয়র থাকাই ওর ভাল ছিল, সংস্কৃতিমন্ত্রী হয়ে কাজের কাজ কিছু করেনি। এলিজাবেথ গিগুকে বরং বাহবা দিতে হয়, পঞ্চাশ ভাগ মেয়েদের নাম থাকতে হবে দলের নমিনেশনে, এ একটা ঘটনা বটে। নমিনেশন পাওয়া মানে তো আর সংসদে বসা নয়। ভোটে আর কজন জিতবে! মারিয়া তার উঁচু নাক আরও খানিকটা উঁচুতে তুলে বলে, অবশ্য আমাদের দেশে এই ঝামেলাটা নেই। সংসদে মেয়েরা চল্লিশের ওপর। যা হবার ওই স্ক্যানডিনেভিয়াতেই হচ্ছে। নিকল বলে, মুখ মলিন তার। মারিয়া পরক্ষণেই ঝাঁজালো করে স্বর, ছাই হচ্ছে। একাডেমিক পদগুলোয় দেখো গিয়ে, বড় পদে কারা আছে, সব পুরুষ। মন দিয়ে বরফের দেশ থেকে আসা মেয়ে মারিয়াকে শোনে বাকিরা। বরফের দেশটি ছিল ভাইকিং জলদস্যুদের দেশ, জলদস্যুরা বিভিন্ন দেশে অতর্কিতে হামলা করত, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিত, শহর গুঁড়িয়ে দিত, দেদারসে মানুষ খুন করে রত্নরাজি ধনদৌলত লুট করত। জলদস্যুর উত্তরপুরুষ এবং উত্তরনারীরা এখন পৃথিবীর অন্যতম সভ্য পুরুষ এবং সভ্য নারী বলে পরিচিত, জলদস্যুর দেশ এখন সমতা সাম্য সুখ আর সমৃদ্ধির দেশ। মারিয়া বলে, মোনা সালিনের ব্যাপারটা জানো তো? ও তো প্রধানমন্ত্রী হয় হয় করেও হচ্ছে না। কারণ? সরকারি ক্রেডিট কার্ডে কবে নাকি চকোলেট কিনেছিল, গেছে ফেঁসে। হত পুরুষ, দেখতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যাপারটি নেহাতই তুচ্ছ। নীলা প্রায় বলতে নেয়, মেয়েরা রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হলেই কি সব সমস্যা ঘুচে যায়। কই, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশে তো মেয়েরা পেয়েছে ও পদ, কিন্তু সমাজে মেয়েদের অবস্থা যা ছিল, তাই তো আছে। কিন্তু বলে না, বরং গিলে ফেলে, পরতোর মতো গেলে। নীলার ধারণা, এ বাক্যও গর্দভের মন্তব্য বলে বিবেচিত হতে পারে। পারেই তো, নীলা ভাবে, বাপ স্বামীর লেজ ধরে ওসব দেশে মেয়েরা ক্ষমতায় আসে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়। ভারত হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। নীলা মনে মনে বলে। বোলে, নীলা, মনে মনে শোনে ওরা বলছে, তোমার ওই সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র ধুয়ে খাও। নীলা ধুয়ে খেল। ফরাসি বরদিওক্স ওয়াইনে ধুয়ে ইয়া বড় গণতন্ত্র গিলল। বরদিওক্স, ভুল। দানিয়েল শুধরে দেবে, বরদো। নীলা ভারতের নিচু জাতের মেয়ে, বড় জাতে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই তার। তবে ফরাসি জাতে উঠতে হলে কিছু জিনিস মকসো করলেই চলে। এদেশে জাতে ওঠার ব্যাপারটি অন্যরকম, জন্মপরিচয় তত দরকার হয় না, বরদো পান করাটা ভাল শিখে গেলে অনেকটা কাজ হয়, পান করা মানে যে গিলতে পারা তা নয়, গেলাস কী করে দু আঙুলে ধরতে হয়, কী করে প্রথম ছোট্ট চুমুকে জিভাগ্রে ভিজিয়ে মাথা ডানে কাত করতে হয়, তারপর সামনে পেছনে আলতো করে কী করে মাথা ঝাঁকাতে হয়, চুমুকে চুমুকে ছন্দময় বিরতি, এসব হচ্ছে শিল্প, এ শিল্প করায়ত্ত করতে পারলেই জাতে আশি ভাগ উঠে যাওয়া যায়, মই ছাড়াই। মিশেল কজ অম্লান বদনে বলে, যাই বলো বাপু, জগৎ বদলাচ্ছে। মেয়েরা কী অবস্থায় ছিল, এই ইয়োরোপের কথাই ভাবো না কেন! গির্জার লোকেরা মেয়েদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেনি? মেরেছে। নিকল হাত তুলে থামতে বলল সবাইকে। থামলে, ধীরে সে বলল, কিন্তু প্রতিটি শব্দে জোর দিয়ে, বদলাচ্ছে ওপরে ওপরে, ভেতরে ঠিক তাই আছে, যা বরাবরই ছিল। নারীর ওপর পুরুষের শোষণ। শোষণের কাঠামোর কিন্তু কোনও বদল হচ্ছে না। বরাবরই ছিল বলছ কী নিকল, মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তো এককালে ছিল। নারীর হাত থেকে পুরুষ তো ক্ষমতা নিল অস্ত্রের জোরে। নিকল জোর গলায় বলে, মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কোথাও কোনও কালেই ছিল না। ছিল যা, তা হল মাতৃলোকাল আর মাতৃলিনিয়ার সমাজ। সম্পত্তি মেয়েদের নামে হত, আর মেয়েদের পদবি বংশানুক্রমে গ্রহণ করা হত, এই যা। এ মাতৃতন্ত্র নয়। যদিও দানিয়েল বলেছিল তোমার আর মারিয়ার কারণে, যেহেতু তোমরা ফরাসি জানো, আমরা ইংরেজিতে কথা বলব, যা কথা, যা আলোচনা ইংরেজিতেই হচ্ছে, আর নীলা বেশ ভাল বুঝতে পাচ্ছে, হচ্ছে মারিয়ার কারণেই, নীলার কারণে এ আলোচনা ইংরেজিতে হওয়ার কোনও কারণ নেই, কারণ সে অংশগ্রহণ করছে না এতে, তার পক্ষে সম্ভবও নয়। এক গেলাস পরতো শেষ করে, অপাঙক্তেয় নীলা, নারী আন্দোলনে না পারুক, ফরাসি ভাষায় দক্ষতা দেখাতে বলল, জে পুর আভোইর দু ভিন রোগি সিল ভোউস প্লেইট! নীলা কী বলছে তা বোঝার ক্ষমতা কারও নেই। তাকে ইংরেজিতে বলতে হল সে কী বলতে চাচ্ছে। আমি লাল ওয়াইন খেতে চাই। উথলে ওঠে হাস্যরসফেনা। দানিয়েল শুধরে দেয় জ পু আভোয়া দু ভা রুজ সিল ভু প্লে। ঠোঁট বিযুক্ত করলেই গোল বাঁধছে। ঠোঁট জোড়া চেপে রাখে নীলা। নিকল ভাল ইংরেজি জানেনা বলে নীলা ভেবেছিল, এ কদিনে শেখা তার ফরাসি যথাসম্ভব আওড়াবে সে। অন্তত ঘরে ঢুকেই নিকলের দিকে হাত মেলাতে মেলাতে, কমেন্ট তালেজ ভাউজ? আর তাকে একই প্রশ্ন করলে, উত্তর, এত্রে বিয়েন। ভাল যে কুকুরের ঝাঁপিয়ে পড়া নীলাকে ফরাসি বলতে বিরত করেছিল। ওই হাসির স্রোতে সীল মাছের মতো মাথা ভেসে ওঠে নিকলের। আজ রাতে ভোজের আয়োজন নিয়ে তার যে পরিকল্পনা আছে, তার বর্ণনা। রেফ্রিজারেটরে শুয়োরের মাংস আছে, সে চাচ্ছে, একে রসুন দিয়ে রান্না করতে। মমমম মমমম শব্দ উঠল।  আলু সেদ্ধ। আর হল সালাদ। আর পনির। আর আছে তার্ত। নিকল।  মমমম মমমম। বাকিরা।  শেষে কফি। নিকল।  মমমমম। বাকিরা।  নিকল রান্নাঘরে চলে গেল রেফ্রিজারেটর থেকে শুয়োর বের করতে। পেছন পেছন দানিয়েল, দানিয়েলের পেছন পেছন রিতা। দেখে নীলা নিশ্চিত যে রান্না শেষ হতে রাত পার হবে। কিন্তু পাঁচ কি ছ মিনিটের মতো পার হয়েছে কি হয়নি, টেবিলে রান্না করা শুয়োর এনে রাখে নিকল, এত শিগরি কী করে শুয়োর গলেছে, তা আর সবার মাথায় ঢুকলেও, নীলার মাথায় ঢোকে না। নিকল ঝটপট বলে দেয় কে কোন চেয়ারে বসবে। যার যার পানীয়ের গেলাস হাতে নিয়ে টেবিলে চলে এসো। আলুসেদ্ধ তুলে নাও, আর শুয়োরের টুকরো। কী করে রান্না হয়েছে এটি? মাখনে ভাজা হয়েছে, ভাজার সময় এক কোয়া রসুন চটকে দেওয়া হয়েছে, ব্যাস। এটির নাম, রসুনে শুয়োর। ডান হাতে ভাত ডলে খাওয়ার মেয়ে নীলার হাতে কাঁটা চামচ, আর ছুরি। ডান হাতে কাঁটা চামচ, বাঁ হাতে ছুরি নিয়ে মাংস কাটতে গিয়ে ছিটকে পড়ে ছুরি, ছুরি তুলে আবার কাটতে গিয়ে ছিটকে পড়ে কাঁটা। এবার তুলে আর কাটাকাটিতে যায় না, শক্ত হাতে কাঁটা ছুরি ধরে রাখে, ভয় হয় মাংসে ছোঁয়ালেই হাত থেকে খসে পড়বে সব। আড়চোখে অন্য হাতগুলো দেখে সে, ডান হাতে ছুরি, বাঁ হাতে কাঁটা। কেউ যেন না দেখে, লুকিয়ে নিজের কাঁটা ছুরির হাত বদল করে নীলা। ছুরি বাঁ হাত থেকে ডানে নেয়, আর কাঁটা ডান থেকে বাঁয়ে। হাত বদলের পর নির্ভাবনায় ছুরি কাঁটা ফের মাংসে ছোঁয়াতেই পড়ল হাত খসে আবার। নীলার দিকে কেউ তাকাচ্ছে না নীলা লজ্জা পাবে বলেই সম্ভবত, তার চেয়ে যদি হইরই করে উঠত সব, বলত কী ঘটনা কী, তুমি বুঝি কাঁটা ছুরি ধরতে জানো না? মুঠো করে নয়, কাঁটার গায়ে তর্জনী রাখো, ছুরির গায়েও, কাঁটা ঢুকিয়ে দাও মাংসের পেটে, তারপর ডান হাতের ছুরিতে কাটো, বাঁ হাতের কাঁটায় তুলে নাও টুকরো। নীলা অন্তত হেসে বলতে পারত, কী জানো, আমাদের হাতে খেয়ে অভ্যেস। হাতে খাওয়ার স্বাদই আলাদা। হাতে খাবার ছুঁলে খাবারের সঙ্গে একরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়, আত্মীয়তামতো। টেবিলের নীরবতা, নীলার ছুরিপতন, কাঁটাপতন দেখেও না দেখা, তাকে দ্বিগুণ লজ্জায় ফেলে। লজ্জা থেকে নীলার মুক্তি নেই। দানিয়েলের দিকে আড়চোখে তাকায় সে, নীলার হাতখসা কাঁটা ছুরির শব্দ ওকে কতটা অস্বস্তিতে ফেলছে, অনুমান করার চেষ্টা করে। সম্ভব হয় না। নীলার পক্ষে সম্ভব হয় না মশলাহীন মাংস চিবোতে। আর সবার মতো নুন আর কালো লঙ্কার গুঁড়ো ছিটিয়েও নীলা লক্ষ করে কাজ হচ্ছে না। মাংস বিস্বাদই লাগছে তার জিভে। শুয়োরের শরীরের গন্ধ পাচ্ছে সে মাংসে। সারা টেবিল তখন উমমমমম উমমমমম করছে, নীলা একটি আলুসেদ্ধর কণা মুখে দিয়ে সালাদের আধখানা পাতা চিবিয়ে মুখের শুয়োরের গন্ধ দূর করল খানিক। তারপর পনির এসে মুখকে আবার বিনাশ করে দিল। এদিকে বড় বাগেত রুটি ছিঁড়ে যে যার থালার পাশে টেবিলের ওপর রেখেছে, দ্রুত, অভ্যস্ত এবং অবশ্যই সভ্য হাতে ছুরির মাথায় পনির নিয়ে রুটির ওপর লাগিয়ে রুটিপনির সোজা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে। বাগেত গড়াচ্ছে টেবিলের ছাইয়ে ধুলোয়। ও খাওয়া নীলার পক্ষে সম্ভব হয় না, পনিরের দুর্গন্ধ দূর করতে তার্তের আশ্রয় নিতে হল তাকে। তার্ত তাঁতা, সাদামাটা আপেল পাইএর নাম। কোনও এক বাড়ির কোনও এক দুবোন আপেল পাই বানিয়ে ভুল করে উপুড় করে ঢেলেছিল থালায়। তলার আপেল উঠে এল ওপরে, আর ওপরের আটাগোলা ভাজা চলে গেল তলে, তাই মনে ধরল লোকের, সেই থেকে আপেল পাইএর নাম গেল বদলে, তার্ত পম(আপেল) না হয়ে তার্ত তাঁতা। তাঁতা ছিল দুবোনের পদবি। নীলা কফি খাবে না। চা আছে? না চা নেই। সুতরাং জল গিলতে হয় নীলাকে। খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও খাবার টেবিলে বসে থাকার অভ্যেস নীলার নেই। ছটফট করে সে, কিন্তু উঠে ওই সোফায় গিয়ে বসতে পারে না, কারণ নিয়ম নেই। নিয়ম খাওয়া শেষে খাওয়ার টেবিলেই সময় কাটানো। অভিজাত ইংরেজ অবশ্য এক ঘরে মূল খাবারটি খায়, তারপর হাতে ন্যাপকিন নিয়ে উঠে যায় অন্য ঘরে মণ্ডা মিঠাই খেতে, খেয়ে আরেক ঘরে যায় চা বা কফি খেতে। রীতিমতো দৌড়োদৌড়ি করে খাওয়া। নীলা হিসেব করে দেখে নিকলের বাড়িতে খাবার টেবিলেই পার হয়েছে পুরো পাঁচ ঘণ্টা। বাঙালি আর ফরাসিতে পাঁচের একটি মিল লক্ষ করে সে। বাঙালির খাবার বানাতে সময় খরচা হয় পাঁচ ঘণ্টা, আর খাওয়া শেষ হয় পাঁচ মিনিটে। আর ফরাসিরা খাবার বানাতে সময় নেয় পাঁচ মিনিট, আর খায় সে খাবার পাঁচ ঘণ্টায়। নীলার ওই অস্থিরতা গুঁড়িয়ে দিয়ে নিকল গেলাস উঁচিয়ে ধরে, নীলার উদ্দেশ্যে। কী ঘটনা? আরতে টেলিভিশনে ভারতের ওপর এক্ষুনি একটি তথ্যচিত্র দেখানো হবে। ব্যাস চেয়ার ঘুরিয়ে বসল সবাই। নীলাকে ঠেলে দেওয়া হল সবার সামনে, পিয়ানোর পাশে, কুকুর বেড়াল সোফায়, ওদের চোখও তথ্যচিত্রে। টেলিভিশনের পর্দা জুড়ে শুন্য একটি টিনের থালা, ফুটো থালা। ক্যামেরা পেছন দিকে সরছে, থালা ছোট হচ্ছে, পর্দা জুড়ে খালি পা, হাঁটছে। এবার ক্যামেরা আরও দূরে সরল, খালি পায়ে, খালি গায়ে, মাথায় রুক্ষ চুল, নাকে সর্দি ঝুলছে এক আট বছরের ছেলে হাঁটছে রাস্তায়। হাতের ফুটো থালা এগিয়ে ধরছে রাস্তার লোকের দিকে, ভিক্ষে চাইছে। কেবল একটি ভিখিরিই নয়, এক ভিখিরির পেছনে আরও ভিখিরি। আর রাস্তায় মানুষের গিজগিজ ভিড়, ভাঙা ট্রাম ঘটঘট শব্দ করে এগোচ্ছে, আধভাঙা বাস ট্রাক ভিড়ের মধ্যে গলা ঢুকিয়ে দিচ্ছে ভয়াবহ শব্দে ভোঁ বাজাতে বাজাতে, আর এর মধ্যে শীর্ণ কটি গোরু হাঁটছে, ভিড়ের রাস্তায় কিছু গোরু বসে জাবর কাটছে, কিছু গোরুরগাড়ি হেই হেই করতে করতে ছুটছে। ভিখিরিতে উপচে গেছে ফুটপাত। আর সেই ছেলেটিই ফুটো থালা হাতে ঘরে ফিরছে, ঘর বলতে একটি ভাঙা ঝুপড়ি। ঝুপড়িটি একটি জলাশয়ের ওপর, সরু বাঁশে হেঁটে তবে ঢুকতে হয় ঝুপড়িতে, শুকনো পাতায় বানানো ঝুপড়িতে। ভেতরে এক দঙ্গল ভাইবোনের কিচির মিচির। ভাইবোনগুলো ভাতের হাঁড়ির ওপর হামলে পড়ছে। নীলা এক ঘর স্তব্ধতা ভেঙে বলল, নিশ্চয়ই খুব গরিব ঘরের কাহিনী দেখাচ্ছে। শশশশশ। নীলাকে ঠোঁট যুক্ত করতে বলা হচ্ছে। পর্দায় তখন ভাতের হাঁড়ি, শূন্য হাঁড়ি। সাঁকো পেরিয়ে মা যাচ্ছে কলসি ভরে জল আনতে নীচের জলাশয়টি থেকে। জল এনে চুলো ধরালো রেললাইনের ধারে। রেলগাড়ি যায়, আর চুলোর আগুন যায় নিভে। ধোঁয়ায় চোখ ঢাকতে ঢাকতে মা ভাত ফুটোচ্ছে। ক্যামেরায় আবার ভাতের হাঁড়ি। হাঁড়ির ওপর হামলে পড়ছে ছেলেমেয়েগুলো। মা ঠেলে সরাচ্ছে ওদের। এর পরের দৃশ্য, সেই ভিখিরি বালক বাইরে সাঁকোয় বসে খোলা আকাশের নীচে বসে মলত্যাগ করছে, নীচে বদ্ধ জলাশয়। তথ্যচিত্র শেষ হতেই রিতা প্রথম মুখ খুলল, আহ, কী চমৎকার ক্যামেরার কাজ। নীলা সোফার পাশ-টেবিল থেকে একটি ম্যাগাজিন টেনে ঝুঁকে রইল তার ওপর, যেন খুব মন দিয়ে সে পড়ছে ওটি। নীলা জানে,নীলা মুখ লুকোচ্ছে। কান খোলা, সে কানে ঢুকছে রিতার উচ্ছ্বাস। মিশেলের কণ্ঠ, আরতের তথ্যচিত্রের মতো তথ্যচিত্র হয় না। আর ক্যামেরা যখন জুম করল হাঁড়িতে, নেপথ্যসংগীতটা খেয়াল করেছ? এডিথ পিয়াফের ওই গানটার সুরটা না?  কোনটা, লা ভি লামোর…? না না, দ লর বেইসের…  নীলার চোখ ভোগ ম্যাগাজিনের ছবিতে স্থির হয়ে থাকে। এক সুন্দরী দুচোখে থই থই কামনা নিয়ে সমুদ্রতীরে উলঙ্গ শুয়ে আছে, আর পায়ের কাছে বালুতে পড়ে আছে একটি সুগন্ধীর শিশি, অপিয়াম। ম্যাগাজিন থেকে নীলা চোখ সরাল, অথবা মুখের সামনে থেকে ম্যাগাজিন সরাল যখন চেয়ার সরানোর শব্দ পেল কারও। ওঠার উদ্যোগ। ঠিক এটিই প্রাণপণ চাইছিল সে, উঠতে। প্রায় লাফিয়ে উঠে সবুজ জ্যাকেটখানা পরে নিল। দানিয়েল আবার অসভ্যতার দোষ না দেয়, মাথা নিচু, কিন্তু মুখে বলল, এ বিয়েনটট। ও বললেই বিদায়ের পাট শেষ হবে, তা নয়। নিকল, মিশেল আর রিতার গালে তিন দুগুণে ছটি চুমু খেতে হল নীলাকে। মারিয়াকে খেতে হল না কারণ নীলা আর দানিয়েলকে সে গাড়িতে অনেকটা পথ পৌঁছে দেবে, পথে নেমে যাবে দুজন, মারিয়ার সঙ্গে তখন হবে চুমোচুমি। দানিয়েলও তিনজনকে চুমু খেয়ে বলল, আবিয়াঁতো।  রিতা বলল, এ আমার সৌভাগ্য ভারতের ওপর তথ্যচিত্র দেখলাম একজন ভারতীয়কে সঙ্গে নিয়ে। নীলা হাসল, হাসতে হয় বলে হাসল। তা না হলে অবিনয়ী অথবা ধৃষ্ট বলে তার দুর্নাম হবে। মারিয়ার গাড়িতে নীলা পেছনে বসল, সামনে দানিয়েল। মারিয়া মন্দ্রগম্ভীর স্বরে বলল, সিটবেল্ট। সিটবেল্ট। সুইডিশ কানুন। পেছনের অন্ধকারে হাতড়ে সিটবেল্ট পেল বটে নীলা, তা বাঁধার কোনও উপায় পেল না। . যখন ঘরে পৌঁছল, অনেক রাত। দানিয়েল জামা কাপড় খুলে সোজা বিছানায়।  নীলার ঘুম পাচ্ছে না। তবু সে শুয়ে রইল, জামা কাপড় না পালটেই। দানিয়েল বলে, কী দীর্ঘশ্বাস ফেলছ যে! কী হয়েছে? না কিছু না। কথা বলছ না যে।  কী বলব, বলো! কেন কিছু কি বলার নেই! দানিয়েল নীলার কাঁধে হাত রেখে বলল। কেমন লেগেছে। নিকলকে, নিকলের আর বন্ধুদের? ভাল।  উঁহু, তোমার মন ভাল নেই নীলা। স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আসলে কী জানো, আমার নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে। এবার দানিয়েল নীলাকে নিজের দিকে ফেরাল।  কেন রাগ হচ্ছে? নিকলের বাড়িতে আমার যাওয়াই উচিত হয়নি। কেন উচিত হয়নি? দানিয়েলের প্রশ্নের উত্তরে অনেকক্ষণ নৈঃশব্দ্যের জলে নীলা ডুবে থাকে, প্রশ্নটি বারবার যখন তার কানের কাছে ঝিঁঝি পোকার মতো ডাকতে থাকে, নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দেখলে না কেমন গাধার মতো সারাক্ষণ ছিলাম। আমাকে এসব জায়গায় মানায় না। কিষানের ঘরের বউ হয়ে থাকাই বোধহয় ভাল ছিল, আপাদমস্তক গৃহবধূ। রাঁধব বাড়ব, ভারতীয় দু একজনের সঙ্গে কথা বলব, ব্যাস। আমি আসলে এই সমাজে চলার উপযুক্ত নই। দানিয়েল উঠে বসল, কী হচ্ছে কী? একটা ভাল জায়গায় গেলে, কোথায় তোমার মন ভাল হবে, আর তুমি কিনা অনুযোগ করছ! নীলা তেমন বিষণ্ণ গলায় বলে, আচ্ছা, তোমার কি ওই তথ্যচিত্রটা ভাল লেগেছে? নিশ্চয়ই। তোমার লাগেনি? নাহ্। বাহ আরতের মতো এত ভাল একটা চ্যানেল ভারতের ওপর ছবি দেখাচ্ছে, এর মূল্য অনেক, সে জানো? দানিয়েল, নীলা ধরা গলায় বলে, ভারতে ওরকম দারিদ্র্যই কেবল আছে তা নয়। প্রচুর ধনী লোক আছে ওখানে, প্রচুর মধ্যবিত্ত… দানিয়েল সশব্দে হেসে উঠে বলল, আরতে টেলিভিশন কি ভারতের ধনীদের ছবি তুলতে যাবে! ধন দেখালে বিল গেইটসের ধন দেখাবে। আর দারিদ্র্য দেখানোই তো ভাল। ভারতের জন্য লাভ, আর্থিক সাহায্য পাবে। দানিয়েল পিঠের পেছনে দুটো বালিশ রেখে আরাম করে বসে গুলোয়াজের গুঁড়ো পাতলা কাগজে পুরে সিগারেট বানিয়ে ধরাল। লম্বা একটি টান দিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে ঘরে, নীলার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, এ তো তুমি অস্বীকার করতে পারো না যে ভারত একটি গরিব দেশ। এ কি তুমি অস্বীকার করতে পারো যে পরিবারটিকে দেখাল আজ, সেরকম পরিবার নেই ভারতে? আছে। নিশ্চয়ই আছে। পৃথিবীর কত কোথাও মানুষ এমন মানবেতর জীবন যাপন করছে নীলা! এদের জন্য কিছু করা দরকার সবার। বিশেষ করে এই ধনী দেশগুলোর। ভারতে ধনী আছে, ঠিক আছে। কিন্তু ধনীদের জীবনযাপন তো আমরা জানিই। বরং এসব দরিদ্রের জীবন দেখলে আমরা উঠে বসি, ভাবি। সবাই না, যারা ভাবার, তারা ভাবে। যাদের হৃদয় আছে, তারা। এ অনেকটা, জানো নীলা, চাবুকের মতো আমাদের পিঠে পড়ে। নীলার কুণ্ঠিত কুঞ্চিত মন হঠাৎ ভিখিরির ভাঙা ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। দানিয়েলের হাতটি টেনে নিয়ে বলল, তুমি কী যে ভাল! তোমাকে যত দেখি, মুগ্ধ হই। দানিয়েল নীলার হাতটি আঙুলে বুলোতে থাকে। নীলার ভাল লাগে। এই, এত কাপড় চোপড় পরে ঘুমোতে এসেছ যে, আরামে ঘুমোতে পারবে না।  পাশ ফিরে বলে নীলা, ন্যাংটো ঘুমোনোয় আমার অভ্যেস নেই।  গায়ে লেপ টেনে গুটিসুটি শুয়ে থাকে সে। দানিয়েলের আঙুল নীলার বাহু থেকে ঘাড়ে, ঘাড় থেকে চুলে পৌঁছে। মাথায় কোনও নরম আঙুল ঘুরে বেড়ালে, নীলার ঘুম নেমে আসে চোখে। মলিনা প্রায়ই চুলে বিলি কেটে দিতেন, নীলা ঘুমোত। এই মা-হীন দেশে, দানিয়েল অনেকটা মায়ের মতো। নীলার ঘুম ছুটে যায় যখন দানিয়েলের আঙুল ওর বুকের ওপর হেঁটে বেড়ায়। ওর হাত সরিয়ে দিয়ে হেসে ওঠে, কাতুকুতু, না? না। না স্বরটি বেশ গম্ভীর।  নীলা ঘাড় ফিরে তাকায় দানিয়েলের দিকে। বাদামি চোখদুটোয় কাতুকুতুর দুষ্টুমি নেই। জানো, আমার মা এরকম চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন, আমার কী যে ভাল লাগে কেউ এরকম দিলে। তোমার ভাল লাগে? এই দেখো দিচ্ছি। কী সুন্দর কালো চুল তোমার। কী সুন্দর, তোমার গায়ের রং। গায়ের রং সুন্দর হবে কেন! সাদা না তো! নীলা ভেংচি কাটে নিজেকে। সাদা না বলেই তো সুন্দর। তোমার বাদামি রং পছন্দ? খুব। খুব। দানিয়েল হাত বুলিয়ে দিতে থাকে নীলার চুলে, ওর দিকে ফিরে, ওকে জড়িয়ে শিশুর মতো শুয়ে থাকে নীলা। মলিনার বুকে মুখ লুকিয়ে নীলা এমন করে রাতের পর রাত ঘুমিয়েছে। নীলার অতীত হঠাৎ এই চিলেকোঠার খোলা জানালা দিয়ে এক ঝাঁক আলোর মতো ঢোকে। কিন্তু আমার যে কোনও গুণ নেই দানিয়েল! নীলার ভাঙা স্বর। কে বলল নেই। আমার সবচেয়ে ভাল লাগে তোমার সারল্য।  দানিয়েলের আঙুল নীলার চুল থেকে কপাল, কপাল থেকে নাক বেয়ে ঠোঁটে নামে। তোমার ঠোঁট এত সুন্দর, বড় চুমু খেতে ইচ্ছে করে।  চুমু? ঠোঁটে?  নয় কেন? উহুঁ। উহুঁ মানে? চাও না? নীলা মাথা নাড়ে। চায় না। তোমার পা দুটো কী বিষম ঠাণ্ডা হয়ে আছে। দানিয়েল তার পা বাড়িয়ে নীলার দু পায় বুলোতে বুলোতে বলে। দানিয়েলের আঙুল নীলার শরীর থেকে সরে না। দানিয়েলের পা নীলার পা থেকে সরে না। নীলা আবার পাশ ফেরে। ঘুমকণ্ঠে বলে চলো ঘুমোই। অনেক রাত হয়েছে। তাতে কী, কাল রোববার। কাল কাজ নেই, সকালে ওঠার তাড়া নেই। তাই দানিয়েলের আঙুল ঘোরে নীলার শরীরে। আঙুল শরীরের অলি গলি ঘুরে উরুর ফাঁকে যায়। নীলা যতই উরু যুক্ত করে, দানিয়েল তা বিযুক্ত করে দেয়। এবার সে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে গিয়ে চেয়ারে বসে।  দানিয়েল এ কী করছ তুমি? কেন! তুমি কি চাও না? দানিয়েলের কণ্ঠে বিস্ময়। কী চাই না? সঙ্গম। মানে? আমি তো জানি তুমি চাও। কী করে জানো? দানিয়েল বলে, কেন, তুমি আমার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটোনি? তো? তুমি আমাকে পছন্দ করো, তাই বুঝেছি।  নীলা অবাক চোখে বলে, পছন্দ করি বলেই তো হাতে হাত ধরে হেঁটেছি। আর সঙ্গম… এসব কী বলছ, মেয়েতে মেয়েতে আবার ওসব হয় না কি? দানিয়েল ঠোঁট চেপে হাসে, হয় না তোমাকে কে বলেছে?  আমি কখনও শুনিনি! নীলা কেবল শোনেনি যে তা নয়, তার নিজের কল্পনাকে যতদূর বিস্তৃত করা যায় করে সে কোনও আবছা ছবিও খুঁজে পায় না, যা দেখে অন্তত অনুমান করবে যে মেয়েদের মধ্যে কোনও যৌনসম্পর্ক হয় বা হতে পারে। দানিয়েল বলে, অবাক সেও, আমি যে সমকামী তা তুমি বোঝোনি? কী করে বুঝবে নীলা দানিয়েল সমকামী। সমকামীরা দেখতে কেমন হয়। মানুষের মতোই তো। দানিয়েল দেখতে আর যে কোনও মেয়ের মতোই। কেন আমাকে দেখে বোঝোনি?  নাহ। ধাঁধা কাটে না নীলার। চোখের সামনে ঘরটি পাক দিয়ে ঘুরতে থাকে, ঘরটি শূন্যে ভাসে, ঘরটি ওড়ে। বিছানায় ফিরে এলে, দানিয়েলের আগ্রাসী জিভ নীলাকে লেহন করে বাকি রাত। নীলা বাকরুদ্ধ শ্বাসরুদ্ধ পড়ে থাকে বিছানায়। এক লজ্জায় শত লজ্জা ঢাকে নীলা। . প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে নীলার বিশ্বাস হয় না এ জীবন সে যাপন করছে। যেন স্বপ্নের ভেতর ঘটে যাচ্ছে এক এক করে ঘটনাগুলো। স্বপ্ন ভাঙলেই সে দেখবে কলকাতায় সে তার নিজের ঘরে, সেই বিছানায়, জানালায় বসে ভোরের আলো খুঁটে খাচ্ছে দুটো চড়ুই, চড়ুই দুটোর সঙ্গে তার মনে মনে কথা হবে। সুশান্তর সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হবার পর নীলা নিদ্রাহীন রাত পার করত, আর দিনের বেলা ঝিমোত, কখনও আবার পুরো দিন জুড়ে ঘুমোত, অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে জেগে উঠত। একবার দেখল, কোনও এক জঙ্গলে হাঁটছে সে, আর তার দিকে দৌড়ে আসছে একটি সিংহ, দৌড়োচ্ছ সে, হঠাৎ পেছন ফিরে দেখে যে সিংহ নয়, একশো সাপ আসছে ধেয়ে, দৌড়াতে দৌড়োতে বিশাল এক সমুদ্রের মধ্যে পড়ে নীলা, একেবারে তলে গিয়ে দেখে সেই সিংহটি বসে আছে। নীলাকে কিছু বলল না, খেতে এল না। সিংহের পেছনে একটি গাছ, সেই গাছের ওপর একটি বাড়ি। বাড়িতে ঢুকে দেখে মলিনা ঘুমোচ্ছেন। মলিনার ঘরের বন্ধ জানালা খুলে দিতেই সামনে রোদে ফাটা চৌরঙ্গির ব্যস্ত রাস্তা। সেই রাস্তায় ত্রস্ত পায়ে নেমে দেখে রাস্তার ওপর একশো সাপ ফণা তুলে আছে। মুহূর্তে কোনও আর মানুষ নেই সে রাস্তায়। কেবল সাপ, আর একা নীলা। নীলা সে দিন ঘুম থেকে জেগে লক্ষ করে তার সারা গা ঘামে ভিজে গেছে, আর বুকের ভেতর ধুকপুক। জেগে ওঠার দু এক মুহূর্ত অব্দি ভয়ে সে নীল হয়েই ছিল। স্বপ্নটির কথা যখনই পরে তার মনে হয়েছে, বুক ধুকপুক করেছে। রোববার সকালে ঘুম থেকে জেগে নীলা দেখে গায়ে কোনও জামা নেই, দানিয়েল দাঁত মাজছে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে। শুয়ে শুয়ে দানিয়েলের শরীরটি দেখে মনে হয় তার, রোদ্যাঁর জীবন্ত ভাস্কর্য। এরকম শরীর হাতের কাছে পেলে যে কোনও পুরুষই উতলা হবে। কিন্তু দানিয়েল কোনও পুরুষের হাতে তার শরীর কোনওদিন দেয়নি, দেবেও না। পুরুষের শরীর, ও বলে, বড় কুৎসিত, ওকে মোটেও উত্তেজিত করে না। নারীর শরীর করে। নীলার শরীর করে। দানিয়েলের শরীরের দিকে তাকিয়ে নীলার মনে হয় না এই শরীরটিকে সে কাছে পেতে চায়, চুমু খেতে চায়। দাঁত মেজে যখন ও দাঁতন রাখে বেসিনের কিনারে, নীলা দেখে মাজনটি গোলাপি রঙের। তার মাজনের রং। দানিয়েল, তোমারও একই রঙের মাজন? গোলাপি? আমার মাজন নেই। দানিয়েলের সরল উত্তর। তবে কী দিয়ে দাঁত মাজো তুমি? মাজি না।  এটি কার মাজন তবে?  এটি তোমার। নীলা উঠে বসে। তুমি আমার মাজন ব্যবহার করেছ?  দানিয়েল কলের তলে মাথা ঢুকিয়ে মুখ হাঁ করে, সেই হাঁয়ের ওপর জল পড়ে। মুখের জল ফেলে বলে, হ্যাঁ, তোমার মাজন। অসম্ভব নির্লিপ্ত স্বরে। তুমি অন্যের মাজন দিয়ে দাঁত মেজেছ? জেনেই মেজেছ? নাকি ভুল করে?  জেনে। দানিয়েলের কণ্ঠ শান্ত। যেন এ খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। বরং তার অবাক লাগে, নীলা এ নিয়ে এত প্রশ্ন করছে কেন! জানো, দানিয়েল, আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম, অন্যের দাঁতন কেউ ব্যবহার করে। বলে নীলা আবার ঢুকে যায় লেপের তলে, গা মাথা ঢেকে।  দানিয়েল কফির জল বসায় চুলোয়।  দানিয়েল যখন কফি বানিয়ে, গায়ে একটি টিশার্ট চড়িয়ে, চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে, নীলা লেপের তল থেকে মুখ বের করে বলে, তুমি কি কোনওদিন দাঁত মাজো না? দানিয়েলের আবারও শান্ত গলা, মাজি হঠাৎ হঠাৎ। ইচ্ছে হলে।  শেষ কবে মেজেছিলে? মনে নেই। নীলার একবার ইচ্ছে হয়, হাসে। আরেকবার ইচ্ছে করে লেপের তলে ঢুকে সে অনেকক্ষণ কাঁদে। নিজের জন্য কাঁদে। নীলার হাসাও হয় না, কাঁদাও হয় না। দানিয়েল বাইরে গেল, লিবারেশন পত্রিকা আর চারটে কোয়াসাঁ কিনে ফিরল। নীলা তখনও শুয়ে। কফি আর কোয়াসাঁ খেতে পত্রিকা পড়ছে যখন দানিয়েল, নীলা বলল, চা খাব। খাও। দাও। কেন দেব, করে নাও।  উঠতে ইচ্ছে করছে না যে! নীলা আহ্লাদি ঠোঁট ফোলায়। নীলার আহ্লাদ বোঝার ক্ষমতা দানিয়েলের নেই। নীলাকে উঠতে হয়, চা বানাতে হয়, চা পান করতে করতে ছোট জানালার বাইরে যেটুকু আকাশ, সেটুকু দেখতে হয় আর চা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে দুটো মাজন কিনে আনতে হয়, একটি দানিয়েলের জন্য, একটি নিজের, আর পুরনোটিকে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে, নিজেরটি দিয়ে দাঁত মাজতে হয়, আর দানিয়েল যখন বলে, পোর্ত দ্য সিনেকোর্তে বড় বাজার বসে রোববারে, যাবে নাকি? সেটি শুনতে হয়, এবং বলতে হয়, সে যাবে। দানিয়েল বলে, ও জায়গাটা তোমার ভাল লাগবে।  কেন? ওখানে অনেক কালোলোক বাদামি লোক আছে। সস্তা, দু নম্বর, পুরনো জিনিসপত্রের খোলা বাজারে এসে লক্ষ করে নীলা, নানা রঙের লোকদের এই ভিড় মোটেও তার ভাল লাগছে না বরং বিষম অস্বস্তি হচ্ছে। নীলার চোখের সামনে এক কালো ছেলে একটি ঘড়ির দোকান থেকে একটি ঘড়ি উঠিয়ে পকেটে ভরে নিয়ে সোজা চলে গেল হেঁটে। আরেকটি ছেলে একটি রোদচশমা নিয়ে চোখে পরে আয়নায় কেমন দেখাচ্ছে দেখে ওটি ফেরত না দিয়ে, দাম না দিয়ে দিব্যি চলে গেল। দানিয়েল পুরনো কাপড়ের স্তূপ খুঁজে দুটো জামা কেনে আর নীলা অবাক তাকিয়ে এই বিচিত্র জগৎ দেখে। কালো চশমায় ঢাকা মুখের কিছু লোক, সেতুর তলায় দাঁড়িয়ে আছে, পায়ের কাছে কালো ব্যাগ তাদের, ব্যাগের ভেতর জিনিসপত্র, পুলিশ আসছে, এরকম একটি রব শুনে ব্যাগ গুটিয়ে মুহূর্তে সব সরে গেল সেতুর তল থেকে। নীলা জিজ্ঞেস করে দানিয়েলকে, এসব কী হচ্ছে ওখানে? অবৈধ ব্যাবসা।  নীলা বুঝে পায় না এই চমৎকার সাজানো গোছানো সব ভালর শহরে অবৈধ ব্যবসা করে কেন লোকেরা। তার উৎসুক চোখ ভিড়ের দিকে যায়। ভিড় ঠেলে খেলা দেখানো লোকটির দিকে, কালো মাথার লোকটি ম্যাচবাক্সের মতো ছোট্ট দুটো বাক্সে ছোট্ট একটি বল নাড়ছে, খুব দ্রুত নাড়ছে, নাড়তে নাড়তে বাক্সে বলটি ঢেকে ফেলল, এবার বলতে হবে কোন বাক্সের নীচে বলটি। বাজি খেলা। একশো ফ্রাঁ হাতে দাও কালো মাথার, উত্তর সঠিক হলে একশো ফ্রাঁ সে দিয়ে দেবে, সঙ্গে আরও একশো ফ্রাঁ, দুশো। আর উত্তর বেঠিক হলে কালো মাথা সেই একশো ফ্রাঁ নিয়ে নেবে। দাঁড়িয়ে থাকতেই দুটো বাজি হয়ে গেল, দুজন পেল একশো ফ্রাঁ করে, একজন হারল। কালো বল যখন নড়ছে, নীলা স্পষ্ট দেখতে পেল বলটি কোন বাক্সের নীচে কালো মাথা ঢুকিয়েছে, নীলা চেঁচিয়ে ওঠে, ওই বাক্সে বল, আমি জানি। ঠিক আছে বাজি ধরো। দানিয়েল বলল, বাজি ধোরো না নীলা, হারবে। হারব কেন, আমি দেখেছি কোথায় বল। জিতবই। নীলা একশো ফ্রাঁ দিল কালো মাথাকে, লোকটি বাক্স ওঠাল, বাক্সের তলে কালো বল নেই। কালো বল অন্য বাক্সের তলে। আবার সে বাজি ধরল, আবার হারল। আবার ধরল, আবার হারল। দু মিনিটে চারশো ফ্রাঁ ফুরিয়ে নীলা যখন ভিড়ের বাইরে এল, দানিয়েল একটি দোকানের দেয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। বলল, হেরেছ, ঠিক না?  করুণ চোখে তাকাল নীলা। আমি জানতাম। কী করে? কারণ এরা সব ভণ্ড। লোক ঠকানোর ব্যবসা করে এরা। অবৈধ ব্যবসা। হঠাৎ বাজিখেলার ভিড় থেকে কিছু লোক চোখের নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল। ভিড় ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল। দানিয়েল বলল, দেখো, পুলিশের ভয়ে কেমন পালিয়ে গেল। তা ঠিক, পালিয়েছে। ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মধ্যে কালো মাথার সঙ্গী ব্যবসায়ীরা ছিল, যখন কেউ জেতে, ওরা জেতে। যখন কেউ হেরে যায়, হারে নীলার মতো মানুষ, লোভী তো বটেই, বোকাও, যারা জানে না, প্রতারক তার জাল কী করে ছড়িয়ে বসে। নীলা দেখে, বাদামি আর কালো রঙের লোকেরা লোক ঠকাচ্ছে, পুলিশের ভয়ে দৌড়াচ্ছে, দোকানের জিনিস চুরি করছে। কোন দেশের লোক এরা? নীলা নাক কুঁচকোয়। আফ্রিকার। এশিয়ার। দক্ষিণ আমেরিকার। ভারতের কেউ আছে বলে আমার মনে হল না। নীলা বলে। বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের।  তাই হবে। . তাই হবে। নীলা স্বস্তি পায়। স্বস্তি পায় বলে মনে করে, আসলে পায় না। নীলা জানে, বেশ ভাল করেই জানে যে ভারতে প্রতারকের অভাব নেই, রাস্তাঘাটে, আপিসে আদালতে, এমনকী সংসদেও বসে লোকেরা লোক ঠকাচ্ছে। রোববার, প্যারিসের নানা ফুটপাত ভরে ওঠে বাজারে। মাছ মাংস থেকে শুরু করে কাপড় চোপড়, থাল বাসন, এমনকী খাট পালঙ্ক। চারশো ফ্রাঁ গচ্চা দেওয়ার পর, ও এলাকা যত শিগরি সম্ভব ত্যাগ করে দুজন। মোঁপারনাসের এক গলিতে, দানিয়েলের ইচ্ছে, ছবি বিক্রি করতে লোক বসে প্রতি রোববার, দেখবে। রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট তাঁবু ফেলে নিজের আঁকা ছবি নিয়ে বসে আছে তত বেশি না বিক্রি হওয়া চিত্রকরেরা। ছবি দেখতে দেখতে নীলা অতীতে ফেরে, সেও শখের ছবি আঁকত এককালে। দানিয়েল নীলার উদাস চোখে তাকিয়ে সস্নেহে বলে, আবার রং তুলি হাতে নাও।  ধুৎ। খামোকা। চেষ্টা তো করো। প্যারিসে কি শ্রমিকের জীবন কাটাতে এসেছ? এ ছবির শহর তোমাকে যদি শিল্পী না করে তবে পৃথিবীর আর কোন শহর করবে? শিল্পী হবার কোনও গুণ আমার নেই দানিয়েল। কী করে জানো যে নেই?  জানি। কার যে গুণ আছে, কার যে নেই, নীলা। কার ভেতরে কোন সম্পদ লুকিয়ে আছে, তার আমরা কতটুকু জানি। ভ্যানগগের ছবি আজকাল কোটি ফ্রাঁয়ে বিক্রি হয়, বেঁচে থাকতে তার ছবি কেউ কেনেনি। অভাবে অসুখে লোকটা আত্মহত্যা করেছে। মিউজি দর্সের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দানিয়েল নিজের জীবনের কথা বলে। মন্ট্রিয়ালে সে আইন পড়তে শুরু করেছিল, ফেলে ঘোড়ার পেছনে দৌড়োল। ঘোড়া চালাত, আর অবসরে লোকদের ঘোড়া চালানো শেখাত। সেও একসময় আর ভাল লাগেনি। সব ছেড়ে, প্যারিস চলে এল, প্যারিসে এসে লেভাই কাপড়ের কারখানায় প্রথম চাকরি নিয়েছিল, তারপর লেভাই যখন এ দেশের শ্রমিকদের তত বেশি শোষণ করতে পারে না বলে চলে গেল গরিব দেশে গরিবদের শোষণ করতে, দানিয়েল ফুটপাতে পা ছড়িয়ে বসে প্যারিসের আশ্চর্য রূপ দেখত প্রতিদিন আর শহরে ঘুরে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে সস্তায় বই কিনে মাঠে রোদের তলে শুয়ে শুয়ে পড়ত। বই পড়তে পড়তেই তার লেখার ইচ্ছে হয়। লিখতে লিখতেই এখন লেখা ছাপা হয়। আর ছাপা যেহেতু হয়, দানিয়েল একটি বইও লিখে ফেলেছে। বইটি তার বাবাকে নিয়ে। বাবা পিয়ের লরু। পাণ্ডুলিপি কিছু প্রকাশকের কাছে ডাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকাশকের উত্তর এসেছে, লিখেছে এদিক ওদিক খানিকটা বদলালে বইটি ছাপা যায়। মিউজে দর্সেতে পুরো দিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দানিয়েল টাকা ধার দেয়, নীলা ইজেল কেনে, রং তুলি কেনে। নীলা ওড়ে, হঠাৎই ওড়ে, প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে। নীলা তখনও ঘোরে, আর তার নিখুঁত শরীর জুড়ে দানিয়েলের তৃষ্ণার্ত আঙুল আর জিভ খেলা করে। আঙুলগুলো শরীরের সব আনাচ কানাচ চেনে। কোথায় কোন ঠোঁট, সেই ঠোঁটের আড়ালে আরেক ঠোঁট, আর সেই ঠোঁটের গায়ে ভ্রমর ঘুমোয়, জাদুর ভ্রমর, ভ্রমর ছুঁলেই ফোয়ারায় জল ওঠে, সেই জলে ভেসে যায় সব। সব। নীলা সাঁতার জানে না। তুখোড় সাঁতারু দানিয়েলকে আঁকড়ে ধরে সে উতল নদী পার হয়। দানিয়েল পাড়ে উঠে নীলার কানে কানে বলে, আমার জাদুর ভ্রমরকে জাগিয়ে দাও। নীলা জাগায় না, ভ্রমরে বড় ভয় নীলার। ঘেন্না নীলার। . নীলার খুব জানতে ইচ্ছে করে দানিয়েল কবে নিজেকে বুঝল যে সে সমকামী। দানিয়েল বলে যখন সে ইস্কুলে পড়ত, বারো বছর বয়স, ইস্কুলের এক মেয়েমাস্টারের প্রেমে পড়েছিল প্রথম। ক্লাসে বসে হাঁ করে মাস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। তারপর? জোসেলিনের স্বামী ছিল, তিনটে বাচ্চা ছিল। ইস্কুলের পর প্রতিদিনই দানিয়েল চলে যেত জোসেলিনের বাড়ি। পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকত আর জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখত জোসেলিনকে। তারপর? একদিন জোসেলিন টের পেল জানালায় দুটো ব্যাকুল চোখ। সেদিন বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। দানিয়েলকে ভেতরে ডেকে আনে জোসেলিন। সারা গা তার কাঁপে যখন জোসেলিন তাকে স্পর্শ করে। সারা গা কাঁপে যখন জোসেলিন তাকে চুমু খায়। সারা গা কাঁপে যখন জোসেলিন তার গায়ের জামা খুলে দেয়, নিজেরটিও খোলে। তারপর? তারপর কী ঘটেছে দানিয়েলের মনে নেই। কেবল মনে আছে অসম্ভব এক আনন্দে সে জোসেলিনের বিছানায় গড়াগড়ি খেয়েছে। হাত পা ছুঁড়েছে আনন্দে। ইস্কুল ছাড়ার পর জোসেলিনের সঙ্গে সম্পর্কটিও যায়। চৌদ্দ বছর বয়সে দানিয়েল বাড়ি ছেড়ে এক কমিউনে থাকতে শুরু করে। কমিউনে ছিল পাঁচটি মেয়ে আর দুটি ছেলে। সম্মিলিত সংসার যাকে বলে। পাঁচটির মধ্যে দুটি মেয়ের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্ক ছিল। কমিউনে থাকাকালীনই দানিয়েল সমকামীদের বারে যেত, মদ খেতে খেতে যার সঙ্গে চোখাচোখি হত, ইঙ্গিত হত, তার সঙ্গে চলে যেত তার বাড়িতে অথবা নিয়ে আসত তাকে কমিউনে। রাত শেষ, সম্পর্ক শেষ। সকালে আবার যে যার জীবনে। পরদিন দেখা হলে, এমনও হত যে সে মনে করতে পারত না যে গতরাতে এর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। তারপর? পিয়ের লরু মারা গেল। দুমাস পর ক্লারা, দানিয়েলের মা। বাপ মায়ের টাকা দু ভাই বোনে ভাগ হল, নিজের ভাগের টাকায় সে বাড়ি কিনল মন্ট্রিয়ালে। একা জীবন। পরিবারের কারও সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকেনি। নিজের দাদা ফিলিপের সঙ্গেও না। তারপর? তারপর প্রেম হল গোটা চারেক। একসঙ্গে থাকাও হল, ছাড়াছাড়ি হল। আবার প্রেম হল, আবার থাকা হল। আবার ছাড়াছাড়ি। আর প্রেমিকার যখন অভাব, তখন বার থেকে রাতের সঙ্গী তুলে আনা। এভাবেই জীবন চলছিল দানিয়েলের। ব্যক্তিগত জীবন। আর বাইরের জীবনে ছিল ছোট চাকরি ছোট বেতন, কিন্তু অন্য উত্তেজনা, আন্দোলনের উত্তেজনা। সমকামীদের অধিকার আন্দোলনে নানা সভা সমিতি করে বেড়াত। মিছিলে গলা ফাটাত। তারপর? তারপর নিকল। ও কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিল মেয়েদের সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে বক্তৃতা করতে। কদিন ছিল। আর ও কদিনের মধ্যে দানিয়েলের সঙ্গে সখ্য, সঙ্গম সবই হয়। নিকল প্যারিসে চলে আসার পর দানিয়েলের মন পড়ে থাকে নিকলে। বুঝল এ কেবল যৌন সম্পর্ক নয়, এ প্রেম। সেই প্রেমেরই আকর্ষণে প্যারিস আসা। নিকলের বাড়িতেই ছিল পুরো চার বছর। চার বছরে প্রেমও গেছে, যৌনসম্পর্কও গেছে। কিন্তু বন্ধুত্ব রয়ে গেছে। গুলোয়াজের কড়া ধোঁয়া ছড়িয়ে দানিয়েল আরেকটি সিগারেট ধরায়। বলে, তোমার কি কখনও এমন হয়েছে, স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া কোনও ঘটনা, ধরো কুড়ি বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা, আচমকা একদিন মনে পড়ে? নীলা মাথা নাড়ে, এরকম হয়নি তার। আমার যখন ছবছর বয়স, আমার বাবা আমাকে ধর্ষণ করেছিল। ঘটনাটি, এই আট বছর আগে, মন্ট্রিয়ালে, একা বসে আছি ঘরে, বরফের ঝড় হচ্ছে, দেখছি, আলটপকা মনে পড়ল। নীলা চকিতে উঠে বসে। চোখের মণিতে, চোখের পাতায় অবিশ্বাস। আসলেই ঘটেছিল না কি অন্য কারও গল্প শুনে তোমার মনে হয়েছে, এ তোমার নিজের জীবনে ঘটেছে। নীলা দানিয়েলের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে। আসলেই ঘটেছিল। আমার স্পষ্ট মনে পড়েছে, মা গেছে বাইরে কাজে, একা বাড়িতে আমি, কুকুরকে নিয়ে খেলছি, বাবা আমাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর ধর্ষণ করল। আমার মুখের ভেতর তার পরনের শার্ট গুঁজে দিয়ে আমার চিৎকার বন্ধ করেছিল। তোমার আপন বাবা? আমার আপন বাবা। . প্যারিসে স্বপ্নের ঘোরে নীলা ঠিকই একদিন ছবি আঁকতে শুরু করল। তেলরঙে। এক দল মেয়ে সবুজ মাঠে নাচছে, আকাশ জুড়ে মেঘ। পশ্চিমে কালো মেঘ। দানিয়েল ছবিটিকে বসে দাঁড়িয়ে শুয়ে ডানে হেলে বাঁয়ে হেলে দেখে বলল, বড় মাতিসের প্রভাব। মোটেই না, মাতিস কাগজ কেটে সেঁটেছেন, আর এ আঁকা। আর এরা হাতে হাত ধরেও নাচছে না। বড় মন খারাপ করা ব্যাপার আছে।  এ তো খুশির দিন। খুশিতে ময়ূরের মতো নাচছে মেয়েরা। দানিয়েল ভুরু কোঁচকায়, তা হলে মেঘলা কেন? ঝকঝকে রোদ দাও। মেঘলা দিন তো মন খারাপ করা দিন। ছবিটির দিকে নেশাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে নীলা বলে যায়, মেঘ দেখলে ময়ূর যেমন আকাশে পেখম মেলে নাচে, মেয়েরা তেমন নাচছে। খরায় পোড়া শরীর তাদের। অনেকদিন পর আকাশে মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হবে। মেয়েরা খুশিতে ছুটে এসেছে বন্ধ ঘরের বাইরে, বাইরের ঝিরঝিরে হাওয়ায়। বৃষ্টিতে ভিজবে, গা শীতল হবে এদের, গায়ের ধুলোকালি দূর হবে। . ছবি আঁকার নেশায় নীলা বাক্সবন্দির কাজে অনিয়ম করতে লাগল। দানিয়েল ও চাকরি ছেড়ে, যে প্রকাশনী তাকে চিঠি লিখেছিল যে তার বই ছাপা যেতে পারে, সেখানেই একটি চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে, বই পড়ার চাকরি। বই পড়ে মন্তব্য করার। অভাবের মুখে নীলা একদিন সুটকেসে তার অলংকার খুঁজল, ইচ্ছে, বিক্রি করে দেবে। অলংকার নেই, কিষানলালের বাড়ি থেকে সব এনেছে, অলংকার আনতেই কেবল ভুলেছে। দানিয়েল বলেছে শুনে, এত উদাসীন হলে চলে না নীলা। টাকা পয়সা, আমি দেখেছি, হাতে থাকলে বেহিসেবি খরচা করো। তারপর ফুরিয়ে গেলে অন্যের কাঁধে চড়ো। তোমার কাঁধ থেকে নামাতে চাইছ আমাকে? দাও নামিয়ে? আমি চাইছি না। যে চাকরি আছে, তাই করতে থাকো আপাতত। এসব ছোট চাকরি আমার ভাল লাগে না। কার ভাল লাগে! কিন্তু থাকা খাওয়ার খরচা আছে না! সে তো জোগাতেই হবে। ছোট চাকরি ভাল লাগে না, তো বড় চাকরি খোঁজো, খুঁজতে তো হবে। নীলা এক সকালে বড় চাকরি এবং ভাল চাকরি খুঁজতে বেরোল, চাকরি খোঁজা বলতে পত্রিকা কিনে বিজ্ঞাপন দেখো, দু একটা ফোন নম্বর টোকো। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে পত্রিকা কেনা হয় নীলার, বিজ্ঞাপন দেখা হয় না, ফোন নম্বরও টোকা হয় না। সে হারিয়ে যায় বিশাল এক স্রোতে। একটি আনন্দস্রোত যাচ্ছে প্যারিসের রাস্তায়। লাল নীল বেলুন উড়ছে। আর সেই স্রোত নীলাকে নিতে নিতে জনদার্ক অব্দি নেয়। নীলা কলকাতায় অনেক মিছিল দেখেছে, এমন চমৎকার কোনও মিছিল দেখেনি। অভিভূত মুগ্ধ মোহিত নীলা আর সবার মতো জনদার্কের মূর্তির সামনে মাথা নোয়ায়, পায়ে ফুল দেয়। . বাড়ি ফিরে যখন সে দানিয়েলকে তার এই চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে, দানিয়েল চমকে তাকায়, সব্বনাশ করেছ। সব্বনাশের কী হল? বেঁচে যে ফিরেছ এই বেশি। নীলা বোকা বনে যায়। তাকে আরও বোকা করে দিয়ে দানিয়েল বলে, এরা বর্ণবাদী লিপেনের দল। এরা এ দেশ থেকে যত অসাদা আছে, এদের তাড়াতে চায়। জনদার্ক হচ্ছে এদের দেবী। আর তুমি কিনা এই চরম ডানপন্থীর সঙ্গে মিছিল করেছ? মিছিলে লোকদের পাশাপাশি হেঁটেছে নীলা। কই তাকে তো কেউ কিছু আঘাত করেনি, কিছু বলেনি। পাশাপাশি হেঁটে নীলা জনদার্কে ফুল দিয়েছে, ওদের কেউ তো বিষচোখে নীলার দিকে তাকায়নি। . ফরাসি গৌরব, ফরাসি সংস্কৃতি রক্ষা করতে লিপেন রাজনীতিতে নেমেছে। ফরাসি ছাড়া, সাদা ছাড়া অন্য কোনও জাতি, অন্য কোনও রং এ দেশে আসুক বা থাকুক লিপেন চায় না। লিপেনের ভয়, কালোয় ছেয়ে যাবে এ দেশ, সাদার হাত থেকে সাদার দেশ চলে যাবে কালোর হাতে, সাদাদের বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না, সাদা মেয়েরা বিয়ে না করার, সন্তান জন্ম না দেবার স্বাধীনতা পেয়ে গেছে, কিন্তু ওদিকে কালো মেয়েরা বছর বছর জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। কালোরা গ্রাস করে ফেলবে এ দেশ, সাদা সংস্কৃতি বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। সাদা ফুরোতে ফুরোতে একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই এ দেশ থেকে যত অসাদা আছে সময় থাকতে তাড়িয়ে দেশটির পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে, সার দিয়ে সাদার উৎপাদন বাড়াতে হবে, উঁচু জাতের মানুষ তৈরি করতে হবে। লিপেনের আবেগকে নীলা যুক্তি দিয়ে দেখে। আজ যদি, নীলা ভাবে, ভারত ভরে যেত আফ্রিকার জঙ্গল থেকে আসা লোকে, লুটপাট চালাত, ভারতীয়দের সব সুবিধেয় ভাগ বসাত, ভারতীয়দের করের টাকায় বসে খেত, আর নিজেদের অসভ্যতায় সংক্রামিত করতে শুরু করত সমাজ, তবে নীলা বেশ জানে, ভারতেও এমন বিদেশি তাড়াও আন্দোলন হত। যেভাবে ইংরেজ তাড়াতে হয়েছে, দেশের স্বার্থে, সংস্কৃতির স্বার্থে এদেরও তাড়াতে হত। হত না কি? হত। ঔপনিবেশিক শক্তি ছাড়াও তো অন্য কোনও শক্তি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পারে না কি? নিশ্চয়ই পারে। দানিয়েল বলে, হিটলারের জন্যও সম্ভবত তোমার এক ধরনের মমতা আছে। আছে, নীলা হেসে বলে, তার কাকা সিদ্ধার্থর আছে, কেবল সিদ্ধার্থ নয়, ভারতের অনেক লোকেরই আছে। তারা বলে, অমন মহাশক্তিমান কারও শৌর্যে বীর্যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। দানিয়েল দম বন্ধ করে শোনে নীলার যুক্তি। আবার নীলার বাবার যুক্তি অন্য, অনির্বাণ বিশ্বাস করেন শত্রুর শত্রু হল বন্ধু। হিটলার সুভাষ বসুকে সমর্থন জুগিয়েছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে। সুভাষ বসু বাঙালির গর্ব, কেবল বাঙালির নয়, পুরো ভারতবর্ষের গর্ব, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে মানুষ প্রাণপণ লড়েছেন। যে মানুষ কোনও আপসের মধ্যে ছিলেন না। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যাঁর বিশ্বাস ছিল না, যিনি শত্রুর বন্দুকের সামনে খালি হাতে দাঁড়াতে রাজি হননি। গুলির বিনিময়ে গুলি। তাই তো হয়। তা না হলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তি তো গান্ধীর আদর্শ মানত। তারা তো গুলির বিনিময়ে গুলিই করেছে। পশ্চিমের এই গান্ধীপ্রীতি অনির্বাণকে হাসায়। গান্ধী কিন্তু তাঁর কাহাকেও মারিব না, কেবল মার খাইব নীতি দিয়ে ইংরেজ তাড়াননি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইংরেজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙেছিল বলেই ভারতের পাট গুটিয়ে নিয়েছিল। দানিয়েল জিভে কামড় দেয়। হিটলারের সঙ্গে যে লোক বন্ধুত্ব করেছে, তাকে নিয়ে বাঙালির গৌরব? নীলা হেসে বলে, গুন্টার গ্রাসও এভাবে জিভ কেটেছিলেন লজ্জায়। কলকাতায় সুভাষ বসুর মূর্তিতে মানুষের ফুল দেওয়া দেখে। . ওরই মধ্যে এক মন উদাস করা বিকেলে নীলা বেরিয়ে পড়ে, এলোমেলো হেঁটে বেড়িয়ে পের লাসেজের দক্ষিণ দরজার উলটোদিকে ছত্রিশ নম্বর বাড়িতে ঢোকে, ক্যাথারিনের বাড়ি। ক্যাথারিনের সঙ্গে চা খেতে খেতে বাউলের গল্প করবে, আর ও চাপাচাপি করলে দুটো বাউলসংগীতও ওকে শুনিয়ে দেবে, এরকম ইচ্ছে। দরজায় কড়া নাড়লে ক্যাথারিন বেরিয়ে আসে। নীলাকে দেখে চমকে ওঠে, তুমি? অপ্রস্তুত হেসে নীলা বলে, একা লাগছিল খুব। ভাবলাম তোমার বাড়ি বেড়াতে যাই। ক্যাথারিন দরজা ধরে দাঁড়িয়ে, অবাক, বলে, কিন্তু তোমার তো আসার কথা ছিল না। না ছিল না। কোনও জরুরি দরকার আছে আমার কাছে? না তা নেই। তবে? নীলা লজ্জায় চোখ নামিয়ে বলে, আসলে পের লাসেজের কবরগুলো দেখার ইচ্ছে ছিল তো…। ও তাই বুঝি, ক্যাথারিন শুকনো মুখে বলে, তা কবরখানা তো একেবারে কাছে। নেমে হাতের বাঁদিকে সোজা চলে যাবে। তারপর একটু ডানে ঘুরতেই দেখবে বড় দরজা। শুনে, যত দ্রুত সম্ভব হয় নীলা সরে যায় ক্যাথারিনের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকা থেকে, ওর শুকনো মুখ থেকে, ওর কপালে ওঠা দুচোখ থেকে। নীলা যেতে যেতে পেছনে শোনে দরজা বন্ধ হবার খটাস শব্দ। নীলার জীবনে এরকম ঘটনা কখনও ঘটেনি। কলকাতায় বিকেলবেলা সে বন্ধুদের বাড়ি বেড়াতে চলে যেত, কোনও জরুরি কাজে নয়, আগে থেকে বলে রাখা নয়, এমনি। নীলার বাড়িতেও যে কেউ ওভাবেই আসে। অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথির মুখোমুখি নীলাকে হতে হয়েছে, তার পরও তো ঘরে এনে বসিয়েছে, চা বিস্কুট দিয়েছে, খেতে খেতে গল্প করেছে। শত্রুও যদি বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে, তাকেও ফেরাতে হয় না, এরকমই নিয়ম বলে জানে নীলা। মলিনা প্রবাদ আওড়ান প্রায়ই, শত্রুকে সবসময় বড় পিড়িটা দিতে হয় বসতে। বড় বড় পায়ে সিঁড়ি নেমে যায় নীলা, পেছনের খটাস শব্দ পেছনেই পড়ে থাকে না, এটি নীলার সঙ্গে সঙ্গে যায়। গার দ্য অস্তারলিজ অব্দি যায়। পরদিন নীলাকে অবাক করে ক্যাথারিন সেই বাক্সবন্দির কারখানায় আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি উপহার দিয়ে জিজ্ঞেস করে, পের ল্যাসেজেয় গিয়েছিলে? নীলা বলে, গিয়েছিল। কার কার কবর দেখলে, টিম মরিসনের কবর দেখলে তো? অস্কার ওয়াইল্ডের? বালজাক, শঁপা, এডিথ পিয়াফ, খুব মলিন একটি কবর পল এলুয়ারের, দেখেছ? সেই পল এলুয়ার যে লিখেছিল, ইল প্ল দ মা কর, কম ইল প্ল দ্য লা ভিল? সেই পল এলুয়ার যে লিখেছিল জা ক্রি ত নম, লিবার্তে। ক্যাথারিনকে দেখে একেবারে মনে হয় না, সে আদৌ মনে করছে গতকাল তার ব্যবহার মোটে অসুন্দর ছিল। ও নিয়ে একটি শব্দ সে উচ্চারণ করল না, বলল না, অন্তত এরকম যে কাল আমার ব্যস্ততা ছিল, বা আমার কোথাও যাবার ছিল। যেন ব্যাপারটিই খুব স্বাভাবিক যে, আমার বাড়ি যাবার তোমার কথা ছিল না, তুমি যাবে কেন, আমি যেদিন বলব, সেদিন যাবে। ক্যাথারিনের অশালীন ব্যবহারে ক্যাথারিনের লজ্জা হয় না, লজ্জা হয় নীলার। লজ্জায় নীলা ক্যাথারিনের চোখের দিকে তাকায় না। লজ্জায় সে বলে না, তোমার ব্যবহারে কাল আমি খুব কষ্ট পেয়েছি, পের লাসেজ দেখার কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না, ও আমি আগেই দেখেছি, বরং হেসে, যেন গতকাল বলে কোনও কাল আসলে আসেনি, যেন ক্যাথারিনের বাড়ির দরজায় নীলা আচমকা উপস্থিত হয়নি, ক্যাথারিন তাকে তাড়িয়ে দেয়নি, দুজনের শেষ স্মৃতি কিষানলালের বাড়িতে যে আমোদটুকু হয়েছিল ওটুকুই। বোদেলেয়ারের কবরটা কোথায়, পের লাসেজে? কিছুই ঘটেনি স্বরে নীলা বলে। সে দেখতে তোমাকে যেতে হবে মোপারনাস কবরখানায়। কিছুই ঘটেনি স্বর ক্যাথারিনেরও। ও আচ্ছা, ধন্যবাদ। নীলা মনে করে ধন্যবাদ বলে। নীলা ধন্যবাদ বলে না, ব্যবহার জানে না, কথা বললে নীলা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, দেয়াল বা চেয়ার টেবিলের দিকে, যে বলছে তার মুখের দিকে বা চোখের দিকে তাকায় না। নীলা মানুষকে তুচ্ছ জ্ঞান করে। এসব কথা কারখানার লোকের মুখে মুখে কানে কানে ঘোরে, নীলা টের পায়। নীলা ধন্যবাদ বললে ক্যাথারিনের মুখে চমৎকার একটি হাসি ফোটে। এরকম হাসি ফুটেছিল প্রথম যেদিন ক্যাথারিন তাকে বিস্ত্রো রোমায় নিয়ে গিয়েছিল খেতে। দুজন মুখোমুখি বসে এন্ত্রোকত খেল, পান করার জন্য লাল ওয়াইন থাকতে হয়, ছিল। খাওয়া শেষ হলে রেস্তোরাঁর লোক লাদেসিঁয়ো রেখে গেল, একশো বিরানব্বই ফ্রাঁ। ক্যাথারিন পঁচানব্বই ফ্রাঁ টেবিলে রেখে বলেছিল, আমার ভাগেরটা, এন্ত্রোকত আর কফি। ঠিক বুঝিনি, তোমার ভাগেরটা মানে? আমি তো তাই খেলাম। তোমার দিতে হবে সাতানব্বই, এন্ত্রোকত আর চা।  ক্যাথারিনের পঁচানব্বই ক্যাথারিনের দিকে ঠেলে দিয়ে দুশো ফ্রাঁর একটি নোট বের করে রেস্তোরাঁর লোকের হাতে দিয়ে নীলা বলেছিল, দুটোর দাম রাখুন। ক্যাথারিনের ভুরুতে সংশয় কাঁপে, কী ব্যাপার দুটোর দাম দিচ্ছ যে! ওর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে নীলার নিজেকে এক দাগি আসামির মতো মনে হল, যেন গুরুতর এক অন্যায় কাজ সে করতে যাচ্ছে, আর এ কাজের পেছনে তার বদ উদ্দেশ্য আছে। নীলাকে বুঝিয়ে বলতে হল, আমাদের দেশে আমরা এরকম ভাগ করে দাম দিই না, খেতে গেলে যে কোনও একজন মেটায় দাম। মানে, হয় আমি দেব, নয় তুমি দেবে। ক্যাথারিনের ভুরুতে সংশয় তখনও লেগে আছে দেখে নীলা ওর কাঁধে হাত রেখে হেসে বলেছিল, চলো উঠি। তুমি যে দাম দিলে, তোমাকে আমি বিনিময়ে কী দিতে পারি? ক্যাথারিন কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল। আমাকে কিছু দিতে হবে না। দিতে হবে কেন! তুমি এমন বিনিময়ের কথা ভাবো কেন বলো দেখি! ক্যাথারিনের ভুরু থেকে সংশয় নামে, মুখে হাসি ফোটে, চমৎকার হাসি। ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। নীলার মনে হয়েছিল, বিনিময়ের দায়িত্ব কাঁধ থেকে নেমেছে বলেই সম্ভবত ক্যাথারিনের সারা মুখে প্রশান্তি ছড়াল। ওরকমই চমৎকার একটি হাসি এখন ক্যাথারিনের ঠোঁটে। নীলা এত চমৎকার হাসতে জানে না। হাসলে ওর ভাঙা দাঁতটি বেরিয়ে আসে, ছোটবেলায় কলতলায় পড়ে ভাঙা। . লা ফামেলিয়া কিষানের কাছ থেকে ঠিকানা পাওয়া যায়নি বাক্সবন্দির কারখানার, মোজাম্মেলের কাছে ধরনা দিয়ে ঠিকানা জোগাড় করে দুদিন ফোন করে একদিন নিজে কারখানায় এসেও নীলার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি সুনীলের। অতঃপর এই ডাকের চিঠি, তোমার মা খুব অসুস্থ, কলকাতা চলে যাও যত শীঘ্র পারো। সুনীলের এই পরামর্শে নীলা হেসে ওঠে। নীলা হাসে কারণ তার কিছুতে মনে হয় না মলিনার অসুখ করেছে, যদি করেই থাকে, সে সর্দিজ্বর, আর সুনীল পরামর্শ দিচ্ছে নীলাকে কলকাতা যাওয়ার এ মলিনার কোনও অসুখের কারণে নয়, নীলার স্পর্ধার কারণে যে স্পর্ধায় সে কিষানের বাড়ি ত্যাগ করেছে, সুনীলকে যে কারণে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে, যেহেতু কিষান সুনীলকেই দোষ দিচ্ছে নীলার এই ধৃষ্টতার জন্য, আর প্যারিসের ভারতীয় মহলে নীলা যেহেতু মুখরোচক আড্ডার একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিষানের বউ পালিয়েছে রে, পালিয়েছে! আর সুনীলের যেহেতু ইচ্ছে হয় না এসব শুনতে, স্বামীর সংসার করতে নীলা প্যারিসে এসেছে, তার যদি স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে, সে বাপের বাড়ি চলে যাক, যা নিয়ম। নীলা প্রথম দানিয়েলকে খবরটি দেয়। শুনে দানিয়েল বলে, পরিষ্কার ষড়যন্ত্র। দেখো গিয়ে কিষান জড়িত আছে এর মধ্যে। আর, তোমার মার যদি অসুখ হয়েই থাকে তো তুমি গিয়ে অসুখ সারাবে নাকি? তোমাদের দেশে কি ডাক্তার নেই? তাই তো! নীলা বলে। তাই তো। দানিয়েলও। তারপর দুজন এক বোতল সাদা ওয়াইন শেষ করে। সাদা ওয়াইন, কারণ দানিয়েল এক থালা শামুক আর এক বাটি ঝিনুক শেষ করেছে। ওর রাতের খাবার। ওসবের সঙ্গে লাল ওয়াইন যায় না, যায় সাদা। নীলার শামুক ঝিনুক পোষায় না। ভেতো বাঙালি ভাত খেয়েছে। সবজি খেয়ে তার অভ্যেস হয়েছে। মাছ মাংস না হলেও আজকাল চলে তার। শুতে যাবার আগে দানিয়েল দুটো সুখবর দেয়, প্রথম–রিতা সিকসুস একটি ছবি বানাচ্ছে প্যারিসে বিদেশি মেয়েদের অবস্থা নিয়ে। এতে নীলার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। পাঁচশো ফ্রাঁও দেবে। দ্বিতীয়–দানিয়েল তার তিনজন বন্ধুকে বলেছে নীলার জন্য ভাল একটি চাকরি খোঁজ করতে। দানিয়েলকে জড়িয়ে ধরে নীলা নাচে। এই তো নাচলে! পেটে কিছু পড়লে নাচা যায়। হাত পা ছুঁড়ে ডিসকোটেকের নাচ নাচা যায়। ভরতনাট্যম নয়। দেখলে তো, যোগাযোগ থাকলে কী হয়! সেদিন নিকলের বাড়িতে যাওয়ার উপকারটা পেলে তো! নীলা অস্বীকার করতে পারে না।  রাতে তার ভাল ঘুম হয় না। সারারাত উঠে উঠে পেচ্ছাপ করে, রাতের পেচ্ছাপ জমা করতে হয় ঘরের বালতিতে, সকালে ভরা বালতি করিডরের কোণে বারোয়ারি পেচ্ছাপখানায় ঢেলে দিতে হয়। এ কাজটি নীলা নাক চোখ মুখ বন্ধ কোরে করে, করতে হয়। দানিয়েলই করত প্রথম প্রথম। কিন্তু একসময় অতিষ্ঠ হয়ে আদরের দুলালিকে বলল, এই মেয়ে, তুমি কি আমাকে তোমার চাকর পেয়েছ? না, নীলা দানিয়েলকে চাকর পায়নি মোটে, চাকর যে পায়নি তা প্রমাণ করতেই সপ্তাহে তিনদিনের জায়গায় পাঁচদিনই বালতি পরিষ্কার করে সে। সকালবেলা ছতলার করিডরের কোণে তয়লেতে যাবার লাইন লাগে, নীলা লাইন ভেঙে তয়লেতে ঢুকতে চেয়েছে কদিন, দানিয়েল বলেছে, এই মেয়ে, যে আগে সে আগে। যে আগে সে আগে, কনুই ঠেলে লাইন ভেঙে গা গলিয়ে আগে যাওয়ার বদঅভ্যেস নীলাকে ত্যাগ করতে হয়েছে। রোববার সকালে বুলানজেরিতে লাইন, বাসে উঠতে লাইন, নামতে লাইন, মেট্রোয় টিকিট কেনার লাইন, যেদিকে যায় সেদিকে লাইন, লাইনের শহর এটি, নীলার চোখ মুখ নাক বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে লাইন রক্ষা করতে হয়। যে আগে সে আগে, যে পেছনে, সে পেছনে। নীলা বরাবরই পেছনে। সবার পিছে, সবার নীচে, সবহারাদের মাঝে। . ভোরের আলো ফুটতেই নীলা তৈরি হয়। দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, এত সকালে নীলা যাচ্ছে কোথায়। এত সকালে নীলা ভোরের হাওয়ায় হেঁটে বেড়াবে, ক্যাফেতে ঢুকে চা আর কোয়াসাঁ খাবে, এত সকালে নীলা সকাল দেখবে শহরের। কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায় নীলা একা হাঁটে। দুতিনটে মাতাল রাস্তায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছ। মাথার কাছে খালি মদের বোতল। দুতিনটে লোক কুকুর নিয়ে বেরিয়েছে, কুকুরের হাওয়া খাওয়া আর প্রাতঃক্রিয়া দুটোই সারতে। কুকুরমূত্রে পথচারীর কোনও অসুবিধে হয় না, হয় মলে। শহরের ফুটপাতে কুকুরের মলের পাহাড় গড়ে উঠত, যদি না মল তোলার সরকারি এক সবুজ বাহিনী থাকত। সবুজ বাহিনীর চাকরিই হচ্ছে মটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে শহরের যত জায়গায় যত কুকুরনির্যাস আছে, তুলে সাইকেলের পেছনে বড় সবুজ বাক্সে ভরে শহরের বাইরে চলে যাওয়া। অত সকালেই রাস্তার ধারে এক সাদা ভিখিরি বসে গেছে, হাতে বড় একটি কাগজ ধরে রেখেছে, আমরা ক্ষুধার্ত। লোকটির পাশে বসে আছে লোকটির চেয়ে দ্বিগুণ বড় একটি কুকুর। দানিয়েল এ দৃশ্য দেখলে, নীলা জানে, কুকুরটির জন্য আহা আহা করবে, লোকটির সামনে রাখা টুপির ওপর দশ ফ্রাঁ রেখে তবে যাবে। কেবল দানিয়েলই নয়, এই ভিখিরি লোকটিকে যে লোকই পয়সা দেবে, দেবে কুকুরটির প্রতি মায়ায়। লোকের প্রতি নয়। নীলা মেট্রো ইশটিশনের ভেতরে দেখেছে, মেক্সিকান ছেলেরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আদি মেক্সিকান সংগীত বাজায়, অদ্ভুত এক ধরনের বাঁশি ওদের মূল বাদ্যযন্ত্র, সামনে টুপি থাকে, গিটারের খোল পড়ে থাকে, লোক যেন পয়সা ফেলে ওতে, লোকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে শোনে, শুনে বেশির ভাগই চলে যায়, পয়সা ফেলে না। মেট্রোয় বাজনা বাজিয়ে ভিক্ষে করা অবশ্য বেশ পুরনো ব্যাপার, কেউ কেউ জগৎবিখ্যাত সংগীতশিল্পী হয়েছে, জীবন শুরু করেছিল প্যারিসের মেট্রোয়। নীলার ধারণা, মেক্সিকান ছেলেরা যদি সংগীতে না যেয়ে কুকুরের খেলা দেখাত, ভাল পয়সা পেত। আমি ক্ষুধার্ত লেখা কাগজ নিয়ে আর হাতে একটি জলের গেলাস নিয়ে আজকাল অনেক মেয়েরাও বসে মেট্রোতে। সাদা মেয়ে। দানিয়েল বলেছে এরা কসোভা থেকে আসা, পূর্ব ইয়োরাপের গরিব দেশ থেকে আসা। পূর্ব ইয়োরোপের গরিব দেশ থেকে লোকেরা এখন ভিক্ষে করতে আসছে এখানে? কমুনিজম ভেঙে তা হলে ওদের লাভটা হয়েছে কী, যদি ভিক্ষেই করতে হয়! দানিয়েল বলেছে, কম্যুনিজম থাকাকালীন ওদের কোনও স্বাধীনতা ছিল না। কী স্বাধীনতা ছিল না? স্বাধীনতা ছিল না দেশের বাইরে যাবার।  নীলা প্রশ্ন করছে, হেসে, দেশের বাইরে গিয়ে ভিক্ষে করার? কেবল তো ভিক্ষেই নয়, ওসব দেশের শিক্ষিত মেয়েরা, যারা একসময় ইস্কুলের মাস্টার ছিল, অথবা বড় কোম্পানিতে বড় পদে চাকরি করত, কমিউনিজম ঝরে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, ইস্কুল বন্ধ হল, কোম্পানির দরজায় তালা পড়ল, কাজ কর্ম চাকরি বাকরিও ঝরে পড়ল, ঝাঁকে ঝাঁকে পতিতা হতে পশ্চিমে ধাইছে। এ নিয়ে দানিয়েল কোনও মন্তব্য করতে চায়নি। পৃথিবীর সব দেশ থেকে লেনিন স্তালিনের মূর্তি উপড়ে ফেললেও, শহরের নাম বা রাস্তার নাম থেকে লেনিন স্তালিন দূর করলেও এই প্যারিসে কেন একটি জায়গার নাম এখনও স্তালিনগ্রাদ, তা জিজ্ঞেস করলেও দানিয়েল উত্তর দেয়নি, বিরক্ত হয়েছে। . নীলা হেঁটে হেঁটে ল্যুভর জাদুঘরের পেছনে যায়, পেছনে রু দ্য রিভলি, পেছনে সুনীলের বাড়ি। সুনীল নীলাকে দেখে অবাক, এই সকালে তুমি কোত্থেকে? কোথায় থাকো! কী করো! চিঠি পেয়েছ! একটা খবর দেবে না! এদিকে কী রকম দুশ্চিন্তায় আছি, সে জানো? একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন। নীলা একটিরও উত্তর দেয় না। জিজ্ঞেস করে, কী অসুখ হয়েছে মার? সে জানি না। নারায়ণ, যে শ্যানেল পৌঁছে দিয়েছিল তোমাদের বাড়িতে, কলকাতা থেকে ফিরে এসেছে, সেই বলেছে যে মাসিমার অসুখ নিখিল ফোন করেছিল দুদিন, বলেছে তোমাকে কলকাতা যেতে। পারো তো আজই। এ কথা সে কথার পর নীলা আসল কথা পাড়ে। সোনার অলংকার। কিষানের সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই সুনীলের। শেষ কথা হয়েছে ফোনে, সুনীল ফোন করেছিল, নীলার কোনও খবর পেয়েছে কি না জানতে, কিষান বলেছে আমার কাছে জিজ্ঞেস করো কেন, নীলার খবর তুমিই তো ভাল জানো। আমি জানব কী করে? সুনীল অবাক। আমার বউকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছ, তুমি জানবে না তো কে জানবে। এই হল কিষানের উত্তর। কিষান বিশ্বাস করে, সুনীলের আশকারা পেয়ে নীলার এমন বাড় বেড়েছিল। কিষানের বিশ্বাস সুনীলের সঙ্গে শলা পরামর্শ করেই নীলা বাড়ি ছেড়েছে। ওই বেশ্যার নাম আমার সামনে আর নেবে না। বলে কিষান ফোন রেখে দিয়েছে। এরপর সুনীল আর কিষানের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। কিষানের তো প্রশ্ন ওঠে না। সুতরাং অলংকারের কথা জিজ্ঞেস করা সুনীলের নিজের পক্ষে সম্ভব হবে না, তবে কিষাণের বন্ধুদের সে জানাতে পারে। সুনীলের ধারণা, কিষান সে অলংকার ফেরত দেবে না। নীলারও ইচ্ছে করে সব দুর্ঘটনার জন্য সুনীলকে দায়ী করতে। দায়ী করে কিষানলালের সঙ্গে তার বিয়ে ঘটানোর জন্য। কিন্তু নীলা আবারও ভাবে, আজ যদি কিষানলাল না হয়ে অন্য এক ভারতীয় হত তার স্বামী, খুব একটা পার্থক্য হত কি! হত না, সে ওই বসে থেকেই দেখছে, চৈতালি সকালের খাবার তৈরি করে টেবিলে রাখছে, সুনীল খেতে বসছে। সুনীল ক্লিনিকে চলে গেলে টুম্পাকে ইস্কুলে ওই চৈতালিই দিয়ে আসবে, তারপর যাবে নিজের আপিসে। আপিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে টুম্পাকে ইস্কুল থেকে নেবে। বাচ্চাকে স্নান করানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো সব চৈতালিই করবে। ঘরদোর ঝাড়মোছ চৈতালিই করবে, রাতের রান্না, চৈতালিই। সংসারে সময় বেশি দিতে হয় বলে, চৈতালি চাকরি নিয়েছে কম সময়ের, আট ঘণ্টার জায়গায় চার ঘণ্টার। দানিয়েলের সঙ্গে নীলার যে সংসার, এতে কোনও বৈষম্যের ব্যাপার নেই। নীলা রান্না করল তো দানিয়েল বাসন ধুল। নীলা বাজার করল তো দানিয়েল রান্না করল। সে এ মাসে বাড়ি ভাড়া দিল তো পরের মাসে দানিয়েল দিল। নীলার হাতে টাকা নেই তো দানিয়েল সংসার চালাচ্ছে, হাতে টাকা এলে সে তা শোধ করে দেবে। নীলা চা খেল কেবল। চা খেয়ে বলল উঠি। উঠি মানে? কোথায় যাবে? কাজে। তারপর কাজ থেকে বাড়ি। বাড়িটা কোথায় শুনি। এক বান্ধবীর বাড়ি। বান্ধবীর বাড়িতে কদিন থাকবে? যতদিন ইচ্ছে। এভাবে হয় না, বুঝলে নীলা। একটা কিছু সিদ্ধান্ত নাও। কী সিদ্ধান্ত? হয় কিষানের কাছে ফেরো, নয় কলকাতা ফেরো। নীলা এরকমই একটা উত্তর মনে মনে জানত, যে সুনীল দেবে। সুনীল নাগাড়ে বলে গেল, নীলা যা ইচ্ছে তাই করছে। এভাবে যা ইচ্ছে তাই করে জীবন চলে না। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এরকম মনোমালিন্য হয়ই। সময়ে সব ঠিক হয়ে যায়। কিষান এখনও নীলার জন্য অপেক্ষা করছে, সুনীলের তাই মনে হয়। আর যদি চেষ্টা করে ব্যর্থ হতে হয়, দেখা যায়, সম্পর্ক কিছুতে টিকবে না, তবে কিষানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুক নীলা, পাকাপাকি ভাবে ছাড়াছাড়ির ব্যবস্থা হোক। তারপর সে অন্য কাউকে বিয়ে করুক, যার সঙ্গে জীবন যাপন সম্ভব হবে। কী অন্যায় করেছিল কিষান? তোমাকে মেরেছিল? না। বাইরে অন্য কোনও মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল? না। তবে কি ইমানুয়েলের ঘটনা? না।  তবে কী?  নীলা ম্লান হাসল। নীলা কুয়াশায় বেরিয়ে পড়ল। কিষানের কাছ থেকে অলংকার উদ্ধারের পথ কী আছে সামনে ভাবতে ভাবতে নীলা কুয়াশার ভেতর হাঁটে। মেট্রোয় চড়ে না। কারখানার কাজে যাওয়ার ইচ্ছেকে বাতিল করে ক্যাফে রিভলিতে বসে পর পর দুকাপ চা খায়। চা খেয়ে সে বাসে চড়ে, আগের মতো বাসে, নিরুদ্দেশ যাত্রায়। বাসে যা কখনও ঘটতে দেখেনি নীলা, ঘটে সেদিন। দুজন ইনস্পেক্টর টিকিট দেখতে উঠেছে যাত্রীদের। নীলা বসেছিল বাসের পেছনের দিকে, সাদা ইন্সপেক্টর সব লোক রেখে নীলার কাছে এল টিকিট চাইতে। প্যান্টের না কি জ্যাকেটের পকেটে টিকিট রেখেছে মনে করতে না পেরে সে এক এক করে পকেট খুঁজতে থাকে, টিকিটও বেরোতে থাকে একাধিক, যে টিকিটই ইনস্পেক্টরের হাতে দেয়, নাকচ করে দেয় পুরনো বলে। তাকে নতুন টিকিট দেখাতে হবে। এ পকেট, ও পকেট, হাতব্যাগ তন্ন তন্ন করে খোঁজে, চুপসে যায়, ঘামে, আর টের পায়, বাসের লোকগুলোর চোখ তার দিকে। পেছন ফিরে সবাই তাকে দেখছে। অসংখ্য সাদার মধ্যে নীলা এক অসাদা, অদ্ভুতুড়ে এক জীব, নীলা অন্যরকম, আর সব বাসযাত্রীর মতো সে দেখতে নয়। দাঁড়ালে, তার সন্দেহ হয়, লোকেরা তার পেছনদিকটায় তাকাবে লেজ আছে কি না দেখতে। নীলা টিকিট না নিয়ে বাসে চড়ে, দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজায়, সাদাদের নিজেদের জন্য করা সুযোগ সুবিধে বহিরাগত হয়ে দেদারসে ভোগ করে। ইন্সপেক্টরের ঠোঁটের কোণে দেখলে তো, অপরাধীকে চিনতে আমাদের ভুল হয় না। রং দেখলেই বুঝি কে টিকিট করেছে কে না করেছে ধরনের হাসি। হাতব্যাগের কাগজের আড়ালে লুকিয়ে ছিল নতুন টিকিটটি, শেষ অব্দি খুঁজে পায় সে। ইন্সপেক্টরের হাতে দিলে টিকিটের সময় মিলিয়ে নীলাকে ছাড়ল। তার মনে হয়, অনেকটা আশাহত হয়েই ছাড়ল। বাসের আর কারও কাছে ইন্সপেক্টর টিকিট দেখতেও চাইল না। আর কারও রং, সে লক্ষ করে, তার রঙের মতো নয়। হোটেল দ্য ভিলের সামনে বাস থামলে নীলা নেমে পড়ে। এই দালানটি সে বরাবরই মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখে, এত দেখে তবু দেখা ফুরোয় না। যেন অনন্তকাল সে এটির সামনে বসে বিমুগ্ধ নয়নে দেখতে পারবে এর স্থাপত্য, এতটুকু ক্লান্ত হবে না। নেমে সে দানিয়েলকে ফোন করে বলে দেয় সে কাজে যায়নি, তার ইচ্ছে করেনি। কেন ইচ্ছে করেনি, সে জানে না কেন ইচ্ছে করেনি। কী করছে নীলা? কিছুই করছে না। কোথায়? হোটেল দ্য ভিলের সামনে। কেন ওখানে গেছে, সে জানে না কেন। কখন বাড়ি ফিরবে, তাও সে জানে না। দানিয়েল বলে, ওখানেই থেকো। আমি আসছি। নীলা চায়নি দানিয়েল আসুক। ওভাবেই সে কাটাতে চেয়েছিল একা। তার আরও একটি ফোন করতে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু সে হাত গুটিয়ে রাখে। ফোনটি সে করে না, করে না কারণ তার ইচ্ছে করে না সে কোথায় থাকে কার সঙ্গে থাকে, আর কেনই বা কিষানের বাড়ি থেকে সে বেরিয়েছে এরকম প্রশ্নের সামনে পড়তে। নীলার ভয় হয়, পাছে সে শোনে সে বেশ্যা। . দানিয়েল এসে নীলাকে নিয়ে কাছের এক ক্যাফেতে ঢোকে। কী হয়েছে। নীলা হেসে বলে, কিছু হয়নি তো।  মন ভাল নেই তোমার নীলা, হয়েছে কী বলো?  কিছু হয়নি। কী করলে সকাল থেকে? সুনীলের বাড়ি গিয়েছিলাম। অলংকারের কথা জিজ্ঞেস করলাম। ফেরত পাবার কোনও সম্ভাবনা দেখছি না। দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, সে কারণেই কি এত ভেঙে পড়েছ? নীলাও হাসে, আমাকে দেখে তাই কি মনে হচ্ছে তোমার? না নীলাকে দেখে তা মনে হচ্ছে না। নীলাকে দেখে কিছুই অনুমান করতে পারে না দানিয়েল। আমি তোমাকে ভালবাসি নীলা, আমার কাছে সব খুলে বলো না কেন! কাতরতা দানিয়েলের কণ্ঠে। ভালবাসি শব্দটি নীলা দানিয়েলের মুখে আগেও শুনেছে। ঘরে। শব্দটি কখনও নীলাকে ফাঁপরে ফেলেনি, এখন ফেলছে। নীলার আশঙ্কা হয়, যে কেউ দানিয়েলের মুখে ভালবাসি শব্দটি শুনলেই বুঝে নেবে মেয়েটি সমকামী, আর ওর সঙ্গী, স্বাভাবিকভাবেই সমকামী। মেয়েতে মেয়েতে প্রেম কী করে হয়, নীলা বুঝে পায় না। আর মেয়েতে মেয়েতে কী করেই বা সত্যিকার সঙ্গম সম্ভব, যদিও প্রায় রাতেই দানিয়েলের পাশে শুয়ে ভোগ করে শীর্ষসুখ, বুঝে পায় না। এরকম সুখ সে নিজেই অবশ্য দিতে পারে নিজেকে, দানিয়েলের যে খুব একটা প্রয়োজন এ সুখ পেতে, নীলার মনে হয় না। নিজের শরীর নিয়ে সে নিজে কখনও খেলেনি, খেলা যে যায়, তাই সে কখনও জানত না। দানিয়েল বলেছে, যখন প্রেমিকার অভাব, তখন সে নিজেই নিজেকে যা সুখ প্রয়োজন, দেয়। শুনে নীলা অবাক হয়েছে। কত যে অবাক করা ব্যাপার চারদিকে। যৌনতা বিষয়ে বিষম লজ্জা ছিল নীলার, কেবল নীলার কেন, ভারতীয় মেয়ে মাত্রই থাকে, আর যে কথাই বলো যৌনতা বিষয়ে কোনও কথা নয়, এ লজ্জার জিনিস, এ লুকোনোর ব্যাপার, এ ঢেকে রাখার বিষয়। সুশান্তর সঙ্গে দু বছরে বড়জোর ছবার চুমু খেয়েছে দুজন। আর সেই ছটি চুমু খেতে কত না অপেক্ষা গেছে, কত না আড়াল তৈরি করতে হয়েছে। আর এখানে, নীলার ভাল লাগে আবার রাগও হয়, দেখে যে, ছেলেমেয়েরা দিব্যি রেলে বাসে, রাস্তায় বাগানে যেখানে ইচ্ছে চুমু খাচ্ছে একশো লোকের সামনে। ভাল লাগে ভালবাসা এরা লুকোয় না বলে, এদের ভেতর রাখঢাক বলে কিছু নেই বলে, এরকম হওয়াই তো উচিত, আর রাগ হয় এ কারণে কী রক্ষণশীলতার মধ্যে থেকে নীলা কত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। নীলা তো এদেশে জন্ম নিতে পারত, নীলা তো পুরো কৈশোর, যখন তাকে ঘরে বসে থাকতে হয়েছে, ঘুরে বেড়াতে পারত বন্ধুদের সঙ্গে, প্রেমিকের কোমর জড়িয়ে হাঁটতে পারত যেখানে সেখানে, থাকতে পারত তার যা খুশি করার স্বাধীনতা। নীলার অনেকটা বয়স অব্দি যা খুশি করা হয়ে ওঠেনি, পারেনি সে। এই এখন, কিষানের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে অনেকটা যা খুশিই করছে সে, একটি মেয়ের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক করা নিশ্চয়ই যা খুশি করা, নীলা অবশ্য এটিকে যা খুশি বলে না, এ সঙ্গম তার ইচ্ছেয় নয়, দানিয়েলের ইচ্ছেয়। সে দিব্যি ভেবে নিয়েছে নীলা তাকে ভালবাসে। দানিয়েল অবশ্য লক্ষ করে মাঝে মধ্যে, যে রাস্তায় হাঁটলে, রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেয় বসলে নীলা তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে সুদর্শন ফরাসি যুবকদের দিকে। এই ক্যাফেতেও, দানিয়েল যখন বকে চলছে, ঘণ্টাখানেক পর দানিয়েলকে উঠতে হবে, নিকলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে সে, নীলার চোখ অন্যদিকে। কী ব্যাপার আমার কথা শুনছ না? শুনছি। মোটেও শুনছ না। শুনছি। তবে যে অন্যদিকে তাকিয়ে আছো!  এখানেই ভুল করছ। যখন আমি মন দিয়ে কথা শুনি, তখন মুখের দিকে তাকাই না। তাকালে মনোযোগ নষ্ট হয় আমার। তা তাকাও কোথায়?  তাকাই চেয়ার টেবিলের দিকে, দেয়ালের দিকে। যেসব পদার্থ মনকে অন্যদিকে ফেরায় না। আর মুখ বুঝি অন্যদিকে ফেরায়? তা ফেরায়। নাক ভোঁতা না টিকোলো, চোখ কালো না বাদামি, হাসলে কি গালে টোল পড়ে, কথা বললে মুখের কোন কোন পেশি নড়ছে, কপালে ভাঁজ পড়ছে কিনা কোনও কারণে, আর যদি পড়েই কটি ভাঁজ পড়ে…এসব দিকে মন চলে যায়। দানিয়েল বলে, আমি কী বলেছি বলো তো? শুনেছ যখন! বলেছ, নিকলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। নিকলের আবার কী অসুখ হল হঠাৎ? নিকলের নয়। অসুখ পিপির। পিপিটা কে? পিপি হচ্ছে নিকলের বেড়াল। পিপি পেচ্ছাপ করছে না। দানিয়েল বলে। বেড়াল পেচ্ছাপ করছে না তো নিকলের হয়েছে কী?  তাই তো নিকলের মন খারাপ। ও মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যাবে।  নীলা চমকায়। বেড়াল খাচ্ছে না বলে কারও মনে অসুখ হয় আর সে অসুখ সারাতে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়! নীলা জোরে হেসে উঠতে চায়, কলিকালে কত কী দেখব বাবা! বলে অনেকক্ষণ সে হাসির রেশ ধরে রাখতে চায়, কিন্তু দমন করে নিজের কুকুরে স্বভাব। কুকুর বেড়ালের নাম শুনলে নীলার পা উসখুস করে লাথি লাগাতে। কুকুর বেড়ালকে সে লাথি লাগিয়ে আসছে হাঁটতে শেখার পর থেকে, বলা যায় লাথি লাগানো শেখার পর থেকে। পাঁচিল টপকে রাস্তার বেড়াল রান্নাঘরে ঢুকে পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে রাঁধা মাছ মাংস খেয়ে যায়, এ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তাই চোরা বেড়াল দেখলে একেবারে পেট বরাবর লাথি লাগানোই ছিল একরকম নিয়ম। রাস্তার নোংরা ঘাঅলা নেড়িকুত্তাগুলো বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকতে চাইলে লাথি মেরেই ওদের সরাতে হত। নীলা এই সভ্য সুন্দর কুকুরবিড়ালপ্রেমীর দেশে নিজের উসখুস করা পা দুটোকে ধমকে উদার করে। . এত কী দেখছ ওদিকে। নীলার চোখ যেদিকে, সেদিকে তাকিয়ে দানিয়েল দেখে এক ঝাঁকড়া চুলের যুবক দাঁড়ানো। নীলার স্বীকারোক্তি, সুদর্শন থেকে চোখ ফেরাতে পারি না। ছোঃ! একগাদা ঘেন্না ছুড়ে দেয় দানিয়েল। তুমি কি আবার আগের জীবনে ফিরতে চাও নীলা? দেখেছই তো পুরুষের সঙ্গে জীবনযাপন কী জঘন্য। তোমার শিক্ষা হয়নি? সব ছেলেই তো কিষান নয়। কিষান নয় তো সুশান্ত। ওই তো। সব পুরুষই এক। সব পুরুষই নারীকে অত্যাচার করে। সবাই এক না দানিয়েল। কেউ কেউ ভালও তো বাসে। ভালবাসা? এসপ্রেসোর কাপে চিনি নাড়তে নাড়তে দানিয়েল বলে, ও এক ধরনের জাল। পুরুষের ওই পাতা জালে আটকা পড়ে মেয়েরা। ভাবে, পুরুষ ছাড়া মেয়েদের চলে না। খুব চলে। এই দেখো আমাকে, আমার কি কোনও পুরুষের দরকার! নীলার চা ঠাণ্ডা হতে থাকে, দানিয়েলের চোখে তাকিয়ে মুখের কথা শোনে। দানিয়েলের পুরুষ ছাড়া চলছে, কিন্তু জগতের সবাই যদি দানিয়েলের মতো সমকামী হয়, জগৎ চলবে কী করে, নীলার প্রশ্ন। নীলা প্রাণী জগতের উদাহরণ দেয়, যে কোনও প্রাণীই স্বাভাবিক আকর্ষণ বোধ করে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি, মিলিত হয়, মিলিত হয় বলেই জন্মপ্রক্রিয়া চলছে, তা না হলে, সব মরে ভূত হয়ে যেত, জগৎটিও প্রাণীহীন হত, এমনকী উদ্ভিদহীন। ফিনিতো। দানিয়েল বলে, এসব পুরুষের সৃষ্টি করা নিয়ম। তুমি আমি কি কোনও বাচ্চা জন্ম দিতে পারব? পারব না। নীলা বলে। কফিতে চুমুক দিতে গিয়েও না দিয়ে দানিয়েল বলে, আর কত বাচ্চার দরকার এ জগতে? যথেষ্ট আছে। আর পুরুষশাসিত বৈষম্যের জগতে আরও বাচ্চা এনে তাদের বৈষম্যের মধ্যে ফেলার দরকার কী! একসময় তো আর বৈষম্য থাকবে না। এক হবে সব। সূদুর স্বপ্নের দিকে তাকিয়ে নীলা বলে। দানিয়েল বলে, যখন হবে তখন হবে…আর যৌনতার জন্য, নারী যেদিন বলবে তার কোনও প্রয়োজন নেই পুরুষের, সেদিনই হবে পুরুষের পরাজয়। তার আগে নয়। নীলা ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দেয়। এখানে ক্যাফেতে এক কাপ চা নিয়ে তিন চার ঘণ্টা পার করে লোকে। ক্যাফের বাইরে এদের দেখলে কী বিষম ব্যস্ত মনে হয়, যেন দৌড়োচ্ছ, ব্যস্ত ব্যস্ত বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে এরা আর ক্যাফেতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় বসে, ব্যস্ততার নীলা দেখে না কিছু। তার অনেক সময় মনে হয়, এদের চেয়ে কলকাতার লোকেরা অনেক ব্যস্ত, সত্যিকার ব্যস্ত, কিন্তু ব্যস্ততার কথা ওরা অত বলে না। এরা সপ্তাহে দুদিন ছুটি পায়, এই দুদিন দিব্যি ঘুরে বেড়ায়, শুয়ে থাকে, দুঘণ্টা বসে থেকে কাগজ পড়ে বলে শক্ত পরিশ্রম করে এলাম। ছো! শক্ত পরিশ্রমের এরা কিছুই জানে না। দেখত কলকাতার মুটে মজুর, দেখত রিকশাঅলা। কলকাতায় চায়ের দোকানে কেবল চা খাওয়ার জন্য যায় লোকে, খামোকা বসে থাকার জন্য নয়। এখানে ক্যাফেতে বসে অলস সময় কাটানো, বা সস্তা আড্ডাকেও সম্ভবত ব্যস্ততা বলে ধরে এরা। পরিশ্রমের সংজ্ঞাও আলাদা এখানে। ভোরবেলা থেকে রাত অব্দি মাথায় দুমণ করে একশোটি বালুর বস্তা নিয়ে দু মাইল দূরে যেখানে দালান তোলা হচ্ছে, হেঁটে পৌঁছে দিলে নীলা বলবে বেশ পরিশ্রম করে এসেছে লোকটি। নীলার কাছে পরিশ্রমের সংজ্ঞা হল এই। দানিয়েল যেদিন প্রথম বলেছিল, আমি শক্ত পরিশ্রম করেছি গত দুসপ্তাহ। কী পরিশ্রম? নীলা জানতে চেয়েছিল। গোটা দুই বই পড়ে সারাংশটা লিখেছি।  শক্ত পরিশ্রম কী করলে সেটা বলো।  ওটাই তো শক্ত পরিশ্রম। ওটা শক্ত পরিশ্রম? নীলা অবাক হয়েছে শুনে। হ্যাঁ। বই পড়ার মতো আরামের জিনিস আর আছে নাকি? কী বই?  গল্পের।  বাহ। এ তো অবসরের মজা। বলো কী? অবসরে আমি ঠিক ওই বইটিই হয়তো পড়তে চাই না।  হুম, ক পাতা লিখেছ? দু পাতা!  এমন চাকরি যদি আমি পেতাম। নীলা মনে মনে বলেছে। দানিয়েল তাকে আকর্ষণ করে আবার করেও না। দানিয়েলের কথায় যুক্তি আছে, আবার নেইও। নীলা দোলে। ভাল লাগায় না লাগায়। দানিয়েল যে যুক্তিই দিক, সুদর্শন পুরুষ থেকে নীলা চোখ ফেরাতে পারে না। তার ইচ্ছে করে পুরুষটি তাকে বলুক ভালবাসি। পুরুষটি তাকে চুমু খাক। তাকে নিয়ে শৃঙ্গারে মাতুক, পুরুষটি তার ভেতর ঘরে চলে যাক অপার আনন্দে। কিন্তু নীলা চাইলেই ব্যাপারটি ঘটে না। সে লক্ষ করছে, কোনও সুদর্শন পুরুষ তার দিকে ফিরে তাকায় না। কলকাতার রাস্তায় বেরোলে লোকে ফিরে ফিরে দেখত তাকে। এখানে রাস্তার বখাটে ছেলেরাও সিটি বাজায় না নীলাকে দেখে, যেন সে কেউ নয়, যেন সে বিদঘুটে একটি মাংসপিণ্ড, তাকে এড়াতে পারলেই বাঁচে সব। রূপসি বলে তাকে সবাই বলত কলকাতায়, তার রূপের কোনও দাম নেই এদেশে। দানিয়েল দাম দিচ্ছে, দানিয়েলের শরীর রোদ্যাঁর ভাস্কর্যের মতো সুডোল সুন্দর হোক না কেন, ওর মুখটি লাবণ্যহীন, কণ্ঠটি কর্কশ। নীলা শেষ অব্দি এক কুশ্রী মেয়ের সঙ্গে জীবন জড়াল কি! আসলে এ ঠিক জীবন জড়ানো নয়, দানিয়েলের প্রেমে সে পড়েনি, দানিয়েলকে নিয়ে কোনও স্বপ্ন সে দেখে না, ও কি জানে একথা? নীলার বিশ্বাস, জানে না। এত গভীরভাবে ভাবছে কী নীলা, দানিয়েল কফি শেষ করে জানতে চায়। কী ভাবছে তা নীলা বলে না, কিন্তু জিজ্ঞেস করে দানিয়েল তাকে কিছু ফ্রাঁ ধার দিতে পারবে কি না। কত?  এই ধরো, পাঁচ হাজার। পাগল হয়েছ। কী করবে ফ্রাঁ দিয়ে? কলকাতা যাব।  কলকাতা কেন?  মার অসুখ। ওই সুনীলের বাড়ি গেছিলে তো! ও তোমার মাথায় এসব দিয়েছে। যাও কলকাতা, দেখবে কীভাবে তোমাকে বন্দি করে ওখানে। দানিয়েল ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলে। আমার মার অসুখ, আমি দেখতে যাব। ব্যাস। তুমি গিয়ে অসুখ সারাবে? এমনই দেশ তোমাদের, ডাক্তার নেই? হাসপাতাল নেই? সব আছে, কিন্তু আমি দেখতে যাব।  এখন গিয়ে কোনও লাভ আছে? সৎকারের সময় না হয়ে যেয়ো। সৎকারের প্রশ্ন আসছে না। সেবার প্রশ্ন। ওখানে নার্স নেই সেবা করার? তুমি তো বলেছ কাজের লোক আছে অনেক। সব আছে। কারও অভাব নেই। কিন্তু আমি যাব কলকাতা… তা যাও। আমার কাছে এত টাকা নেই। অন্য কারও কাছে ধার করে দিতে পারবে? কেউ এত টাকা দিতে পারবে না। নীলা নিঃশব্দের কোলে মাথা রেখে বসে থাকে। চা তার অনেকক্ষণ শেষ হয়েছে। এখন গিয়ে যদি চলে আসো, তারপর সৎকারের সময় কি আবার যাবে? দানিয়েল তার কর্কশ কণ্ঠ যথাসাধ্য মধুর করে বলে। সৎকার সৎকার কোরো না দানিয়েল। আমার মার এমন অসুখ হয়নি যে তিনি মারা যাবেন। নীলা দাঁতে দাঁত পিষে বলে, চোয়ালের পেশি তার শক্ত হয়ে থাকে। তাহলে আর যাওয়া কেন? যাওয়া, কারণ আমার মা… দানিয়েল নীলাকে কথা শেষ করতে দেয় না, ভেংচি কেটে বলে, আমার মা, আমার বাবা, আমার ভাই, আমার বোন, যত্তসব। দানিয়েলের ভেংচিতে ভ্রূক্ষেপ না করে নীলা বলে, আমার মন বলছে মার কেবল সর্দিজ্বর হয়নি। অন্য কিছু। দানিয়েল নিজের কফির দাম টেবিলে ছুঁড়ে দিয়ে শব্দ করে চেয়ার সরায়। বাঁ হাতের মধ্যমাটি তুলে ধরে নীলার সামনে। নিজের বাঁ বাহুতে ডান হাতে চাপড় লাগিয়ে, কনুই তেঙে ঝাঁকুনি দেয়। দানিয়েলের সারা গা থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে দগদগে রাগ, সেই রাগ সামান্য দমন না করে সে ক্যাফের দবজা ঠেলে বেরিয়ে যায়, চেঁচাতে চেঁচাতে, লা ফামেলিয়া। লা ফামেলিয়া। . আবিয়াঁ তো কলকাতা যাবার আগে দুটো জায়গায় যাওয়া হয় নীলার। এক সানদানি, আর দুই ত্রকাদেরোয় মানসিক রোগের ডাক্তারের বাড়ি। সানদানিতে, কারণ রিতা সিকসুস তার তথ্যচিত্রের জন্য সাক্ষাৎকার নেবে। বাসিলিক দ্য সানদানির বাগানে বসে সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। বাগানের ভেতর সার্জ সান্তোসের বাড়ি। সার্জের সঙ্গে রিতার পরিচয়, তার বান্ধবী আন লরের কারণে, আন লরের মা ফ্রান্স বেনজাকিন জন্মেছে মিশরের এক ইহুদি পরিবারে, ফ্রান্সের যখন পাঁচ বছর বয়স, মিশর থেকে সব ইহুদিদের বের করে দেওয়া হয়েছিল, ফ্রান্সের পুরো পরিবার তখন চলে আসে ফ্রান্সে, রিতার প্রতিবেশী ছিল ফ্রান্স, এই সানদানিতেই, সানদানি তখন অনেকটা গ্রাম। সেই সানদানি এখন ঘিঞ্জি শহরতলি, চুরি ডাকাতি ছিনতাই হামেশা ঘটছে, সাদার বসতি খুব কম, বেশির ভাগই কালো আর বাদামি, বেশির ভাগই দরিদ্র, বেশির ভাগই লেখাপড়া না জানা, বেশির ভাগই বেকার। নীলাকে যখন সানদানির ঝকঝকে বাড়িঘরের দিকে আঙুল তুলে বলা হয়, এসব দরিদ্র লোকের বাড়ি, নীলা ঠিক বোঝেনি দারিদ্র্য বলতে এরা কী বোঝে। বাড়িগুলোর সামনে দাঁড়ানো সার সার গাড়ি দেখে নীলা বলে, এই গাড়িগুলো তবে কাদের? ওদেরই, ওই দরিদ্রদের। নতুন মডেলের দামি গাড়ি নেই বলে ওরা দরিদ্র। নতুন মার্সেডিজ হলে, বি এম ডব্লু হলে, লিমোজিন হলে ওরা দরিদ্র নয়, খুব সহজ অঙ্ক। নীলার চোখ দেখেছে কলকাতার বস্তি, এ চোখে আর কোনও দারিদ্র্য দারিদ্র্য ঠেকে না। নীলার চোখ দেখেছে লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষ, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, পেটে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই, অসুখে ধুকছে, চিকিৎসা নেই, নীলাকে তোমরা দারিদ্র্য দেখিয়ো না, যে লোকটি রঙিন টেলিভিশনের সামনে বসে ভরপেট খেয়ে এই মাত্র বেরিয়ে এল, গায়ে ফ্যাশনের জামা জুতো, জোরে গান ছেড়ে, মাথা দুলোতে দুলোতে গানের তালে, গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে আর যাই বলো দরিদ্র বোলো না, অন্তত নীলার সামনে। বোতাম টিপে বিশাল দরজা খুলে দিলে রিতার গাড়ি ঢুকে যায় সার্জের বাগানে। গির্জার ঠিক পেছনেই বাগান। বাগান বলতে ঘাসের মাঠ। মাঠে ছড়িয়ে আছে পুরনো পাথরের কফিন। কফিনের ওপর বসে কফি খাচ্ছে আন লর। মাঠে খেলছে রাফায়েল আর বেনজামিন। আন লরের দুই ছেলে। রিতা পৌঁছতেই এক দফা চুমোচুমি হল। দানিয়েল বাসিলিকের পাদদেশের বাড়িখানা দেখে অনেকক্ষণ উ লা লা উ লা লা করে। এত চমৎকার জায়গায় বাড়ি পাওয়া নাকি ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্য কি আর সাধে, সার্জ এই বাসিলিকের পরিচালক বলেই না! রিতার সঙ্গে নীলা আর দানিয়েল ছাড়াও আরও দুজন এসেছে, একজনের হাতে ক্যামেরা, আরেকজনের হাতে মাইক্রোফোন। নীলার বুক কাঁপে। ক্যামেরার সামনে সে কোনওদিন দাঁড়ায়নি আগে। রিতা তাকে কী প্রশ্ন করবে তার সে কিছুই জানে না। নীলার হাতের তালু ঘামতে থাকে, নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রিতা বলে, তুমি নাকে একটু পাউডার লাগিয়ে আসবে?  নীলা হাতে নাক মুছে বলে, না, ঠিক আছে। আর আমি পাউডার আনিওনি সঙ্গে। রিতার মুখ রক্তিম হয় শরমে। দানিয়েল নীলার কানে কানে চাপা স্বরে বলে, নাকে পাউডার লাগানো মানে নাকে পাউডার লাগানো নয়। এর মানে তয়লেতে যাওয়া। পেচ্ছাপ পায়খানা করা। তয়লেতে যাব কি না তা জিজ্ঞেস করলেই তো হয়? না, এ শরমের কথা।  শরমের? নীলা ঠিক বোঝে না, এ সমাজের শরম ঠিক কোথায় থাকে। এখনও গ্রীষ্মকাল আসেনি, এখনই মেয়েরা রাস্তায় আধন্যাংটো ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। কাপড় চোপড় ব্যাপারটিই ঝামেলার। শরম ধুয়ে খেয়েছে বলেই না এদের দেখতে এত মৌলিক দেখায়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে ক্যামেরার লোকটি বলল, মুখে একটু পাউডার লাগালে ভাল হয়। এই পাউডার সত্যিকার পাউডার। তয়লেত নয়। নীলার মুখে আন লর পাউডার মাখাতে নিয়ে যায়। আন লর-এর সাজানো ঘরদোর দেখে নীলা বলে, তোমাদের অনেকদিন বিয়ে হয়েছে? না তো আমাদের তো বিয়ে হয়নি। সার্জের কী হও তুমি তা হলে? প্রেমিকা হই। একসঙ্গে থাকো? নিশ্চয়ই। আজ ছ বছর ধরে সংসার করছি। আর বাচ্চারা? আমাদের বাচ্চা। আমার আর সার্জের। আন লর মিষ্টি হেসে বলে। নীলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পাউডার ঘসে। আজ রিতার অনুরোধে সে শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরা, কপালে লাল টিপ পরা বাঙালি মেয়ে নীলা। মনে মনে কলকাতা ঘুরে আসে নীলা। মনের এই এক বড় গুণ, এটি খুব দ্রুত উড়তে পারে। দুটো চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে মাঠে। নীলার সামনে বসে রিতা দেখে নিল ক্যামেরায় ঠিক ঠিক আসছে কি না নীলার মুখ আর পেছনের বাসিলিক, বিখ্যাত গির্জা, ফ্রান্সের সব রাজারা শুয়ে আছেন যে গির্জায়। দেখে নিন নীলার মুখে রোদ পড়ছে কি না, কপালের টিপটিকে দেখাচ্ছে কি না রক্তের মতো লাল। পড়ছে, দেখাচ্ছে। এবার মুখোমুখি বসে প্রথম প্রশ্ন, আচ্ছা নীলা, তুমি কপালে যেটি খোদাই করে লাগিয়েছ, সেটি তো তুমি যে বিবাহিত তার একটি প্রতীক, তাই না? না।  রিতা থতমত খায়, কিন্তু একটি বেদনার্ত হাসি ঝুলিয়ে রাখে ঠোঁটে, অপেক্ষা করে নীলার ব্যাখ্যার, কেন না। এটি বিয়ের কোনও চিহ্ন নয়, সব মেয়েরাই বিয়ের আগে টিপ পরে, দেখতে সুন্দর লাগে বলে পরে। রিতার প্রশ্ন, এটি কি স্থায়ীভাবে লাগানো হয়নি তোমার কপালে?  নীলা হেসে ওঠে, হেসে সে কাগজের টিপটিকে আঙুলে তুলে নিয়ে দেখায়, দেখো, এটি অস্থায়ী একটি জিনিস। এই পরলাম, এই খুললাম। কাট। . রিতার পছন্দ হয়নি টিপের ম্যাজিকটি। লাল একটি বিয়ের রং যদি নীলার কপালে খোদাই করা থাকত, সম্ভবত তার সুবিধে হত সাক্ষাৎকারে। কোলের ওপর প্রশ্নের কাগজে চোখ বুলিয়ে রিতা পরের প্রশ্ন করে, তুমি তো ভারতের মেয়ে, অত দূর দেশ থেকে প্যারিসে এসেছ স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে, তাই না? হ্যাঁ তাই। শুনেছি তুমি স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ। একটু বিস্তারিত বলবে, কেন? কারণ স্বামীর সঙ্গে আমার মেলে না। কেন মেলে না? মেলে না কারণ দুজন আমরা ভিন্ন ধরনের মানুষ। তোমার স্বামী তো ভারতীয়, তবে ভিন্ন কেন বলছ?  ভিন্ন কারণ আমাদের মানসিকতা ভিন্ন।  তোমার স্বামী শুনেছি অত্যাচার করত তোমার ওপর। খুলে বলো কী কী করত সে। অত্যাচার বলতে আসলে যা বোঝায় তা সে কিছুই করেনি। তোমার স্বামী তো তোমাকে মারত, কী করে মারত, কী ব্যবহার করত মারতে গিয়ে? চাবুক, নাকি লাঠি নাকি কোমরের বেল্ট। নাকি হাত… আমার স্বামী আমার গায়ে কখনও হাত তোলেনি। কাট। . রিতা হাত উঠিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করতে বলে। উঠে আসে নীলার সামনে, হাঁটু গেড়ে বসে বলে, তুমি বোধহয় আমার প্রশ্ন বুঝতে পারোনি নীলা। নীলা নির্ঘাত বেকায়দায় পড়ে। তার অস্বস্তি দেখে, রিতা জল জল বলে চিৎকার করে। আন লর দৌড়ে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে আসে। নীলার তেষ্টা পায়নি তবু পান করতে হয় জল, অর্ধেক জল হাতের কাছে রাখতে হয় যদি পান করার তাগাদা দেওয়া হয়। ক্যামেরা তাক করা নীলার মুখে।  রিতা শুরু করে আবার, তোমাদের ভারতীয় মহলে আর যে মেয়েরা স্বামীর ঘর ছেড়েছে, তাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই তোমার কথা হয়েছে। ওদের অবস্থার কথা কিছু বলো, ওদের ওপর ওদের স্বামী কী কোরে অত্যাচার করে। নাহ। এরকম কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। নীলার নিরীহ জবাব।  কাট।  এবার দানিয়েলের কাছে উঠে যায় রিতা। চেয়ার ফেলে কফিনের ওপর বসে দানিয়েলের সঙ্গে লঘুস্বরে কথা বলে। নীলা চেয়ারেই বসা, রোদের দিকে মুখ করা, পাউডার ঘসা মুখ। ফিরে এসে মুখে হাসি টেনে রিতা বলে, শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে নীলা। দেখেছি তুমি পশ্চিমি পোশাক পরো বেশি। শাড়িতেই কিন্তু তোমাকে মানায়। এবার নতুন প্রশ্ন, তোমাদের সংস্কৃতিতে তো সতীদাহ বলে একটা ব্যাপার আছে, তোমার স্বামীর মৃত্যু হলে, তোমাকেও চিতায় উঠতে হবে। সে পুরনো প্রথা। গত শতাব্দীতে এ প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মেয়েদের ভগাঙ্কুর ছেদ করা তো ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অংশ, তা কত শতাংশ মেয়ের ভগাঙ্কুর ছেদ করা হয় ভারতে? ভগাঙ্কুর ছেদ করা ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। আচ্ছা, তোমার সংসারজীবনের কিছু কথা বলো। তোমাকে তো সংসারের সব কাজ করতে হত তাই না? তা করতে হত।  কী কী করতে বলো তো? রান্না করা, বাসন ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া এসব।  তোমার স্বামী কী কী কাজ করত ঘরের? তেমন কিছু না।  তোমার স্বামী কখনও রান্না করেছে? না। ঘর পরিষ্কার করেছে? না।  সে কাজ থেকে ঘরে ফিরে কী কী করত? টেলিভিশন দেখত, মদ খেত… রিতা মাথা নাড়ে, বলো বলো আর কী কী করত… আর কী, খেত, ঘুমোত।  সংসারের খরচ দুজনে মেটাতে তাই না? না, আমার চাকরি ছিল না, আমার স্বামীই সব খরচ দিত। তুমি চাকরি করো, এ তোমার স্বামী চায়নি তো!  না চায়নি। তোমার স্বামী তোমাকে ঘরে বন্দি করেছিল তো, তাই না? ঘর থেকে বাইরে একা বেরোই সেটা চায়নি। তবে বন্দি বলতে যা বোঝায় তা ঠিক না। দরজার চাবি আমার কাছেও থাকত। তোমার স্বামী তো তোমার যা কিছু সম্পদ, তোমার স্বর্ণালংকার সব রেখে দিয়েছে। রাখেনি। ও আমি ভুলে ফেলে এসেছি।  তোমার স্বামী তোমাকে পর্দা করার জন্য চাপ দেয়নি, মানে মাথায় কাপড় চড়ানো? না। ও রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে ঘটে, হিন্দু পরিবারে নয়। তোমার স্বামী তো তোমাকে মাছ মাংস খেতে দেয়নি। কী খাবে না খাবে তাও তার আদেশে হত! তা ঠিক, ও নিরামিষাশী। চাইত ঘরে নিরামিষ রান্না হোক। আর তা না করলে কী করত? মারত? না মারেনি কখনও।  গাল দিত? তাও দেয়নি। তা হলে কী করত? মন খারাপ করত।  কাট। . সানদানি থেকে বেরিয়ে দানিয়েল বলে, কিষানের জন্য বেশ দরদ তো তোমার! নীলা জিজ্ঞেস করে, কী বলা উচিত ছিল আমার? কী বললে বোঝা যেত যে আমার দরদ নেই? বাদ দাও। দানিয়েল হাত ঝাঁকায়।  এই তথ্যচিত্রটা মূলত কীসের ওপর? মেয়েদের ওপর, মেয়েদের কী করে অত্যাচার করা হচ্ছে, সেসবের ওপর। নীলার মনে আরও প্রশ্ন, কোন মেয়ে? যে কোনও মেয়ে? ফরাসি মেয়েও? এটা আগেই তো বলেছি, বিদেশি মেয়েদের নিয়ে।  বিদেশি মেয়ে? জার্মান মেয়ে? সুইস মেয়ে? বেলজ?  ওরা তো ফ্রান্সে থাকতে আসে না। যারা আসে তারা। রুয়ান্ডার, সোমালিয়ার, মালির, ভারতের, পাকিস্তানের, ইরানের, আফগানিস্তানের মেয়েরা তাই না? দানিয়েল অনেকক্ষণ উত্তর দেয় না। মেট্রোয় ভিড় উপচে পড়ছে। সেই ভিড়ে গা ধাক্কা খেতে খেতে বলে, তুমি মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে নেওয়ার ঘটনা জানো না? এই ফ্রান্সে কত মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে নেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতির নামে এই নির্মমতা চলছে, এখানেও। তুমি যেন ব্যাপারটিকে সমর্থন করছ নীলা। নীলা বলে, গলায় জোর তার, আমি সমর্থন করতে যাব কেন! যা সত্য তাই বলেছি, ভারতে এই সংস্কৃতি নেই। এটা না থাক, অন্য কিছু আছে তো। সেসব বললে না কেন! এই তো বড় সুযোগ ছিল লোককে জানানো। যারা জানে না, তৃতীয় বিশ্বে মেয়েরা কী হারে বঞ্চিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, তাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না, পুরুষের দাসী হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য মনে করা হয় যে মেয়েদের জন্ম, সব বললে না কেন? এমনিতে তো অনেক বৈষম্যের উদাহরণ দাও। নীলা বলে, আমাকে যা জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তার উত্তর দিয়েছি। রিতা তোমার সাক্ষাৎকারে খুব একটা তুষ্ট নয়, সত্যি কথা বলতে গেলে।  নীলা পাঁচশো ফ্রাঁ কবে পাচ্ছে বা আদৌ পাচ্ছে কি না তা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করে না। মুখ বুজে থাকা, নীলা লক্ষ করেছে, অনেক সময় মঙ্গলজনক। কী ব্যাপার কথা বলছ না যে! দানিয়েলের অতুষ্ট বাদামি চোখ নীলার চোখে। কী বলব? কোনও প্রশ্ন করোনি তো!  তোমার সাক্ষাৎকারের পাট তো অনেকক্ষণ চুকেছে। এবার ধরায় ফেরো। স্বাভাবিক হও। নীলা হেসে ওঠে। খামোখাই হাসে সে। দানিয়েল নীলার হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে নীলা ভেবে নেয়, বলবে যে খামোখাই হাসছে। খামোখা হাসে তো পাগল লোকেরা। নীলা বলবে যে সে পাগল। . বাসিলিক সানদানি থেকে কনকর্ড পৌঁছল দুজন। কনকর্ড থেকে এক নম্বর লাইনে এখন যেতে হবে শার্ল দ্য গোল এতোয়াল। কিন্তু এতোয়ালের দিকে মেট্রো চলবে না। এতোয়াল থেকে নেশনের পথে তিন ইস্টিশন গেলেই ত্রকাদেরো। কনকর্ড থেকে মেট্রো চলছে না, এতোয়াল থেকেও চলবে না। দানিয়েল উঠে আসে পাতাল থেকে মাটিতে। দানিয়েলের পেছন পেছন নীলা। বাস ধরা ছাড়া গতি নেই। কনকর্ডের বাসস্টপে দাঁড়ায় দুজন, বাস আসছে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু লোক তুলছে না, তিল ধারণের জায়গা নেই বাসের ভেতর। মেট্রো চলছে না তাই ভিড় বাসে, বাসস্টপের দু একজন বলে। ট্যাক্সি দেখলেই দানিয়েল হাত লম্বা করে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, ট্যাক্সি যেমন যাচ্ছে, তেমন যেতে থাকে, কারও থামার লক্ষণ নেই। দেখে নীলা বলে, ভারতের মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে দেখছি। একরকম সে স্বস্তি বোধ করে দেখে যে কিছু অনিয়ম ঘটছে, এতদিন সে কোনও রেলগাড়ি বা বাসকে, সময়ের এতটুকু বাইরে যেতে দেখেনি। ঠিক পাঁচটা পঁয়ত্রিশে থামার কথা, পাঁচটা পঁয়ত্রিশে এসেই থামে, পাঁচটা চৌত্রিশেও নয়, পাঁচটা ছত্রিশেও নয়। ট্যাক্সি ডাকলেও তিন মিনিটে আসার কথা, তিন মিনিটেই আসে। হাত তুললে সে যে রাস্তায় হোক, যত রাত হোক, থামে। একটু অনিয়ম না হলে কেমন যেন দমবন্ধ লাগে, নীলা ভাবত। নীলা এই অনিয়ম দেখে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেয়। মুহূর্তে কনকর্ড মেট্রো ইশটিশনটি পুলিশ এসে ঘেরাও করে ফেলে। পুলিশের একজনকে দানিয়েল জিজ্ঞেস করে, ঘটনা কী? ঘটনা কিছু না। দুটো আত্মহত্যা ঘটেছে।  কী কারণ। ওই যা ঘটে। কারণ হল বসন্ত।  কারণ হল বসন্ত, নীলা হাঁ হয়ে থাকে। দানিয়েল নীলার হাঁয়ের ভেতর একবোঝা তথ্য গুঁজে দেয়। বসন্তকাল হল আত্মহত্যার ঋতু। দুটো যুবক চলন্ত গাড়ির তলায় ঝাঁপ দিয়েছে। মরতে চেয়েছে, মরেছে। এরকম প্রতি বসন্তকালেই লোকে রেলের তলে জীবন দেয়। এর কারণ, দানিয়েল আগেই জানিয়েছে যে বসন্তকাল। বসন্তকালে মানুষের আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হবে কেন, এই কারণটি নীলা জানতে চায়। বসন্ত এলে পশ্চিমিরা যত দূর জানে সে, আনন্দে মেতে ওঠে। তবে আত্মহত্যা কেন? দানিয়েল বলে, যারা একা, সঙ্গীহীন, তারা আত্মহত্যা করে এ সময়টায়। বসন্তকালে একাকিত্বের জ্বালা খুব বেশিরকম হয় কিনা। বসন্তই তো জানিয়ে দেয় যে গ্রীষ্ম আসছে, সুখের সময় আসছে, প্রেমের সময় আসছে, মিলনের সময় আসছে। সারা গ্রীষ্মকাল প্রেমিক প্রেমিকা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়াবে, আনন্দ করবে, আর যারা একা, মাঠে ঘাটে লেকের ধারে, সমুদ্রতীরে এত জোড়া দেখে আরও বেশি একা বোধ করবে, এই ভয়ে এই কষ্টে বসন্তকালেই, গ্রীষ্ম আসার আগেই আত্মহত্যা করে। নীলা বোঝে না। বুঝলে না তো! বুঝবে কেন? অন্যের কষ্টের কথা তুমি বুঝবে কেন! দানিয়েলের ব্যঙ্গোক্তি নীলাকে স্পর্শ করে না। ত্রকাদেরোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে অন্যমন হয়। ভাবতে থাকে রেলের চাকায় পড়ে খুলি উড়ে যাওয়া, গায়ের মাংস হাড় থেতলে ছিটকে পড়া দুটো যুবকের কথা। আত্মহত্যা করল কেবল সঙ্গী ছিল না বলে, সামনের দুটো মাসে তাদের আনন্দ করা হবে না বলে! নীলার যদি কোনও প্রেমিক না থাকত, নীলা কি আত্মহত্যা করতে পারত? পারত না। প্রেমই তো জীবনের একমাত্র সুখের ঘটনা নয়, আরও কত কী আছে, ঝরাপাতার মর্মর শব্দ শোনা আছে, মেঘের সঙ্গে এলোমেলো ভেসে বেড়ানোর খেলা আছে, দীর্ঘ বিকেল জুড়ে চমৎকার একটি কবিতার বই পড়ে ফেলা আছে, জীবন পূর্ণ করার সহস্র উপায় পড়ে আছে। মানুষকে বুঝতে শেখো নীলা, মানুষের কষ্টগুলোকে জানতে শেখো। নীলার জানা হয় না অনেক কিছু। ত্রকাদেরোর ডাক্তারখানায় রোগীর ভিড় দেখে নীলা ঘাবড়ে যায়। এত লোকের মনে কী অসুখ তার জানতে ইচ্ছে করে। নীলা দেখে, খুব মন দিয়ে কেউ পত্রিকা পড়ছে, কেউ পাশের জনের সঙ্গে গলা নামিয়ে কথা বলছে, কেউ ঝিমোচ্ছে। নিকল এসেছিল তার বেড়ালের পেচ্ছাপের অসুখ হয়েছিল বলে সে মনোকষ্টে ছিল, তা সারাতে। দানিয়েল এসেছে, নীলা কলকাতা যাচ্ছে বলে মনে সে আঘাত পেয়েছে, সেটি দূর করতে। নীলা অনুমান করে ঝিমোচ্ছে লোকটির নিশ্চয় বউয়ের সঙ্গে দু রাত ঝগড়া হয়েছে বলে এসেছে, পত্রিকা পড়ছে ভদ্রলোকের নিশ্চয় কয়েক রাত ভাল ঘুম হয়নি বলে এসেছে, আর পাশের জনের সঙ্গে কথা বলছে যে সম্ভবত কথা যখন বলে জোরে বলে বলে এসেছে। আর যে ষোলো সতেরো বছর বয়সি মেয়েটি জানালায় তাকিয়ে আছে, মেয়েটি, নীলা অনুমান করে, প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না বলে এসেছে। প্রথম বিশ্বের লোকের মনের সামান্য এদিক ওদিক হলে চলে না। মন থাকা চাই একশো ভাগ সুস্থ। মনের ভেতর কোনও রোগ শোক, কোনও দুঃখ কষ্ট, কোনও জ্বালা যন্ত্রণার চিহ্ন যেন না থাকে। শরীরে বল না থাকতে পারে, মনে যেন বল থাকে। আবেগ পরিমাণ মতো, কম বা বেশি হলে চলবে না। আর তৃতীয় বিশ্বে লোকের মনে পরিমাণ মতো কিছু নেই। এক কিলো শুয়োরে রসুনের কটি কোয়া চটকে দিলে স্বাদ হয় ভাল, তা নিয়ে প্রথম বিশ্বে গবেষণা চলে, তৃতীয় বিশ্বে চলে না, রসুনের পরিমাণ নিয়ে গবেষণা করার সময় নেই। পেটে ভাত নেই যাদের তাদের আবার রসুন, তাদের আবার মন। মন ধুয়ে জল খাওয়া গেলে, সে জলও খেত তৃতীয় বিশ্ব, খাবার জলের অভাব। দানিয়েলের হয়ে আসতে ঘণ্টা দুই লাগে। ও ঠিক বেরিয়ে আসে গির্জার স্বীকারোক্তি ঘরের জানালা থেকে পাঁড় ক্যাথলিকের মতো। বেরিয়ে বিষণ্ণ মুখ, নীলার দিকে না এগিয়ে দরজার দিকে। নীলা ভিড় কেটে দানিয়েলকে ফেরায়। নীলার দু বাহুর বেষ্টন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দানিয়েল বলে, আমাকে একা থাকতে দাও। তাকে একা থাকতে দেয় না নীলা, কারও মন খারাপ হলে একা থাকতে দিতে সে শেখেনি। তার যদি মনে কষ্ট হত কোনও, মলিনা এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন, চোখের জল মুছিয়ে দিতেন, আদর পেয়ে নীলার কষ্ট চলে যেত ত্রিসীমানার বাইরে। নীলার কখনও কোনও মনের ডাক্তার খুঁজতে হয়নি। কেন তোমার ডাক্তারের কাছে যেতে হল। আমি যদি কারণ হই, আমার সঙ্গে কথা বলো। মনের যা কথা আছে খুলে বলো। আমাকে বলো, আমাকে তো তুমি ভালবাসো, ভালবাসো না? নীলা দানিয়েলের চিবুক ধরে নিজের দিকে মুখটি ফিরিয়ে বলে। দানিয়েল চেঁচায়, বলেছি তো তোমাকে, আমাকে একা থাকতে দাও। তোমার মন খারাপ, একা থাকলে মন আরও খারাপ হবে। ডাক্তারের ঘরে ঢোকার আগে মন তোমার এত খারাপ ছিল না। বলে নীলা দানিয়েলকে জড়িয়ে ধরে আবার দুহাতে। নীলার হাত ছুড়ে নিজেকে মুক্ত করে দানিয়েল ত্রকাদেরোর বেদিতে গিয়ে বসে। পাশে বসে নীলা বড় মমতায় একটি হাত রেখে দানিয়েলের কাঁধে, বলে, এত সুন্দর শহর, এত সাজানো, সবার পেটে খাবার আছে, সবার বাড়ি আছে, সবার পরনে কাপড় আছে, সবার জন্য নিরাপত্তা আছে, তার পরও কেন মানসিক রোগের ডাক্তারের কাছে যেতে হয় এত লোকের। দানিয়েলের চোখে জল উপচে পড়ছে। নীলা আঙুলে তা মুছতে গেলে সে ঝটিতে সরিয়ে নেয় মুখ, মাথা, চোখ, চোখের জল। তুমি বুঝবে না নীলা, অন্ন বস্ত্র আশ্রয়ই সব নয় জীবনে, তুমি তৃতীয় বিশ্বের চোখ দিয়ে সবাইকে বিচার করতে চাও। মন বলে একটি জিনিস আছে, আর সে মন সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না। নীলা বলে, মন তৃতীয় বিশ্বেও আছে দানিয়েল, সে মন পাথর দিয়ে গড়া নয়। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ। আমিও অনেক কষ্ট পাই, আমার তো কোনও ডাক্তারের কাছে যেতে হয় না। কষ্টকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে। আমি কোনওদিনই শুনিনি, আমার দেশে লোকেরা মনের অসুখ সারাতে ডাক্তারের কাছে যায়। অনেকক্ষণ নীলা আর কথা বলে না, দানিয়েল তার চোখের জল প্রাণপণ আড়াল করে।  চলো সাঁস এলিজেতে হাঁটি গিয়ে, তোমার মন ভাল হবে। না। দানিয়েল কোথাও যাবে না। সে বাড়ি ফিরবে। সে একা থাকতে চায়। মনখারাপের হাত ধরে টানে নীলা, চলো সিনেমায় যাই। না।  চলো কোনও ক্যাফেতে বসি। না। সেইনের ধারে হাঁটি। না। থিয়েটার? না।  রাতে তোমাকে খাওয়াব লা তুর দারজোঁয়, চলো। না।  মরো গিয়ে। যত্তসব ঢং।

কলকাতা আছে কলকাতাতেই

প্রত্যেকের জন্য কলকাতার রাস্তা, ফুটপাত, এঁদো গলি নিজের ঘরের মতো, যেখানে সে বসতে পারে, ঘুমোতে পারে, এমনকী পচা আবর্জনার স্তূপ থেকে নিজের খাবার তুলে খেতে পারে। —ক্লদ লেভি স্ত্রস

কলকাতাকে যেমন রেখে গিয়েছিল নীলা, কলকাতা ঠিক তেমনি আছে। তবু তার মনে হয়, কলকাতা দেখতে মলিন হয়েছে আরও, ফুটপাতে নোংরা জমেছে আগের চেয়ে বেশি, ধুলো উড়ছে প্রচণ্ড, গাড়িঘোড়ার জটলা বেশি, আগেও ভেঁপু বাজত, এত তারস্বরে না, বাড়িঘরগুলো আগের চেয়ে রংওঠা, আস্তরখসা, দোকানপাটগুলো ছোট, ঘিঞ্জি, স্যাঁতসেঁতে, রাস্তাগুলো হঠাৎ সরু হয়ে গেছে, মানুষগুলো আরও কালো, মাঠে ঘাস আগের চেয়ে কম। ঘাসের রং গাছের পাতার রং আগের চেয়ে কালচে। নীলা দমদম থেকে গাড়ি করে বালিগঞ্জে আসতে আসতে নিখিলকে থেকে থেকে বলে, খুব বদলে গেছে কলকাতা।

নিখিল কলকাতার বদলে যাওয়া খোঁজে এদিক ওদিক। আর চালক রামকিরণ ময়লা রুমালে ঘাড়ের ঘাম মুছে বলে, দিদি, আপনি বদলেছেন, কলকাতা যেমন ছিল, তেমনই আছে।

বালিগঞ্জে বাড়িতে ঢুকে নীলার মনে হয়, বাড়িটিও অনেক ছোট হয়ে গেছে। নীলা বড় হয়ে তার ছোটবেলার বিশাল ইস্কুলবাড়িটি দেখতে গিয়েছিল একদিন, দেখে চিনতে পারেনি, ইস্কুলের যে বিশাল মাঠে নীলা দৌড়ে খেলত, সেই মাঠে দাঁড়িয়েই মাঠ খুঁজেছে, নদীর মতো বড় ইস্কুলের পুকুরটিকেও লেগেছিল ডোবা মতো।

মলিনার কী হয়েছে, কী অসুখ, নীলা কাউকে জিজ্ঞেস করেনি পথে, না নিখিলকে, না রামকিরণকে।

নীলাকে দেখে চিত্রা দৌড়ে খবর দিয়ে আসে মলিনাকে, দিদি এসেছে দিদি।

 চিত্রার এমনই নিয়ম, নীলা দেরি করে বাড়ি ফিরলেই এমন খবর নিয়ে দৌড়োত। নীলার হঠাৎ মনে হয়, সে আজ দেরি করে বাড়ি ফিরেছে। পথে যানজট ছিল, তাই দেরি। নন্দনে অপর্ণার নতুন ছবি দেখতে গিয়েছিল, তাই দেরি।

নীলা যা করে ফিরে, মা মা বলে ডাকে।

মলিনাকে শোবার ঘরে না পেলে রান্নাঘরে ঢোকে, রান্নাঘরে না পেলে পুজোর ঘরে, পুজোর ঘরে না পেলে উঠোনের সবজিবাগানে, ওতেও না পেলে নীলা বেশ জানত, মলিনা এখন বাড়ির ছাদে, রোদে কাপড় শুকোতে দিচ্ছেন।

নীলা মা মা ডেকে আজও শোবার ঘরে ঢোকে। শোবার ঘরে মলিনা। বোঁ বোঁ শব্দে পাখা চলছে, পাখার তলে মলিনা ঘামছেন। মলিনা ঘুমোচ্ছেন।

মা ঘুমোচ্ছ এই অসময়ে? ওঠো। আমি এসেছি।

নীলা এসেছে। মলিনা ওঠো। নীলাকে খেতে দাও। নীলাকে ঠাণ্ডা জল দাও। নীলাকে পাশে বসিয়ে গল্প শোনো, অনেক গল্প জমেছে ওর। গল্প বলতে বলতে ওর যদি গলা বুজে আসে, কোলে ওর মাথাটা নিয়ে, গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওকে বোলো, চোখের আড়ালে আর যাসনে মা। ঘুমপাড়ানি গান শোনাও নীলাকে, অনেকদিন পর তোমার পাশে তোমাকে জড়িয়ে ও ঘুমোবে, ওঠো।

নীলা শিয়রের কাছে বসে দেখছে মলিনার এক মাথা ঘন কালো চুল হাওয়ায় উড়ে গেছে, আর আস্ত একটি হাড়ের কঙ্কাল বোঁ বোঁ পাখার নীচে দুলছে। নীলা দোলে, নীলার ইফেল টাওয়ার দোলে।

চা দেব দিদি?

দিদি তার হ্যাঁ বলে না। না বলে না।

চিত্রা ডুকরে কেঁদে ওঠে। নীলা জানতে চায় না, চিত্রা কাঁদছে কেন।

উঠে যায়, উঠে দোতলায় নিজের ঘরে, নিজের বিছানায়। চিত্রা পেছন পেছন যায়, আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে, দিদি শুচ্ছেন যে, চান টান করুন, কিছু মুখে দিন।

চিত্রা তুই যা তো, আমাকে একটু একা থাকতে দে।

চিত্রা দাঁড়িয়েই থাকে দরজা ধরে। বলতে থাকে, মাসিমার এ যে হঠাৎ কী হল দিদি! এই চলছেন ফিরছেন, হঠাৎ বিছানা নিলেন। এখন তো উঠে দাঁড়াতে পারেন না আর। ঘুমের ওষুধ খেয়ে পড়ে পড়ে ঘুমোন। ঘুমোচ্ছেন বলে রক্ষে, না হলে ব্যথায় সে যে কী চিৎকার করেন। দেখলে আপনার সইবে না দিদি।

এত কথা বলছিস কেন? তোকে তো এত কথা জিজ্ঞেস করিনি। নীলা ধমকে ওঠে।

 চিত্রা পা পা করে নীলার আরও কাছে সরে এল।

মাসিমা কেবলই আপনার কথা বলছেন দিদি। এই তো বলে বলে ঘুমোলেন আজ আমার নীলা আসবে রে, কইমাছ ভাজ, সর্ষেইলিশ কর, রুইমাছের ঝোল কর, সন্দেশ নিয়ে আয়।

তুই এ ঘর থেকে যা না, খানিকক্ষণের জন্য যা। নীলা বালিশে মুখ গোঁজে। চিত্রা যেন শব্দ নয়, এক একটি আগুনের পিণ্ড নীলার দিকে ছুড়ছে।

কত লোক আসে মাসিমাকে দেখতে, কেউ তো ভাল করতে পারে না। কতরকম ডাক্তারবাবু আসেন। কতরকম ওষুধ দিয়ে যান। কোনও ওষুধে তো মাসিমা ভাল হচ্ছেন না। দিন দিন বিছানার সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। দুদিন আগেও নরম করে দিলে দুটো ভাত খেতে পারতেন, এখন তো কিছুই মুখে ওঠে না। চিত্রা আবার ফুঁপিয়ে ওঠে।

চিত্রা একাই নীলাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল, এরপর যন্ত্রণা দিতে আসেন মঞ্জুষা, এতদিন পর এলি রে নীলা বলে হু হু করে কেঁদে উঠলেন।

বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদলেন আর বললেন, কেন আগে এলি না রে। তুই বিদেশে এটা খেতে পারছিস না, ওটা খেতে পারছিস না, বাড়ি ফিরে এলে তোর জন্য নিজে হাতে কত কিছু রাঁধবেন, বলেছিলেন। তোকে মুখে তুলে খাওয়াবেন। মায়ের হাতের রান্না খাওয়ার ভাগ্য তোর বুঝি আর হল না…

নীলা এবার বালিশে গোঁজা মুখ তুলে চেঁচায়, কী হয়েছে তোমাদের, ভেউ ভেউ করে সব এত কাঁদছ কেন। একটু দূরে সরো সবাই।

মঞ্জুষা বসেই থাকেন আর বলতে থাকেন, ডাক্তারবাবু আর ওষুধ দিচ্ছেন না, বলেছেন ওষুধ আর কাজ দেবে না। ব্যথার কটি ওষুধ কেবল চলছে। তাতে তো আজকাল ব্যথাও কমছেনা। ক্যান্সার নাকি নাড়ি থেকে থেকে লিভারে গেছে, কাল বলে গেলেন হাড়ে ঢুকেছে, আবার বললেন মাথাতেও। কাল সারারাত দিদি কাতরালেন ব্যথায়, বসে বসে তাই দেখতে হল।

নীলা এবার উঠে যায় বিছানা থেকে, দৌড়ে যায় স্নানঘরে।

বাইরে থেকে মঞ্জুষা বলেন চানটা করে খেতে আয় নীলা।

নীলা নীরবতা চাইছে। নীরবতা সম্ভবত বড় দুর্লভ জিনিস এ মুহূর্তে। সে চাইছে না কেউ কোনও নিখুঁত বর্ণনা দিক মলিনার শরীরের বা ইচ্ছের। মলিনার ইচ্ছের কথা নীলা সেই ছোটবেলা থেকেই জানে, মলিনার কোনও ইচ্ছে কখনও পূরণ হয়নি, তিনি চেয়েছিলেন অনির্বাণের সামান্য ভালবাসা পেতে, পাননি। অনির্বাণ মণ্ডল যে ভালবাসেন না কাউকে তা নয়, বাসেন, তবে মলিনাকে নয়, স্বাতী সেনকে। মলিনা একবার কাঞ্জিপুরম শাড়ি দেখে এসে বলেছিলেন, কী সুন্দর শাড়ি গো। একটা পরতে পারলে বেশ হত।

অনির্বাণ কাঞ্জিপুরম শাড়ি কিনে মলিনাকে দেননি, দিয়েছেন স্বাতীকে, স্বাতীকে সেই শাড়ি পরিয়ে সিমলায় নিয়ে গেছেন বেড়াতে। মলিনার সাধ ছিল কোনও একদিন দার্জিলিং যাবেন, অনির্বাণের কোনও দিনই সময় হয়নি মলিনাকে দার্জিলিং নেবার। স্বাতী দেখতে মলিনার চেয়ে ফর্সা ছিল, স্বাতীর ওই একটি গুণের কারণে অনির্বাণ স্বাতীর পিছু ছাড়েননি। বুদ্ধি হবার পর থেকে নীলা কখনও দেখেনি অনির্বাণ আর মলিনা এক ঘরে এক বিছানায় শুয়েছেন। মলিনা যত্ন করে স্বামীর বিছানা গুছিয়ে দিতেন, অনির্বাণ স্বাতীর সঙ্গে রাতের আমোদ আহ্লাদ সেরে বাড়ি ফিরে খেতে বসে কোন নিরামিষে নুন হয়নি, কোন মাংসে তেল বেশি পড়েছে, কোন ভাজা পুড়ে গেছে এসব নিয়ে চেঁচিয়ে গোছানো বিছানায় ঘুমোতেন নাক ডেকে। মলিনার জীবন ওরকমই ছিল। ইচ্ছের গায়ে শেকল পরিয়ে তিনি তাঁর জীবন কাটিয়েছেন এ সংসারে।

.

বিকেলে বাড়ি ভরে গেল মলিনাকে দেখতে আত্মীয়স্বজনে। বাড়ির মাঠ ভরে গেল ঝকঝকে গাড়িতে। মলিনার দিদি জামাইবাবু, তাদের ছেলে, ছেলের বউ, ছেলের বউয়ের দু বাচ্চা, মলিনার কাকিমা, দুই কাকাতো বোন কাকাতো বোনের ছেলে পল্টু, অনির্বাণের দাদা, দিদি, পিসতুতো দাদা, তার মেয়ে মিঠু, আর দুজন প্রতিবেশী গৃহবধু। চৌকাঠের জুতোর ঢিবিতে জুতো রেখে সব ঢুকে যাচ্ছে মলিনার ঘরে, হাতে কারও আপেল আঙুর কমলালেবু, কারও হাতে বেদানা, ডালিম, কেউ নিয়ে এসেছে হরলিকস, কেউ আবার বাটি ভরে শিংমাছের ঝোল এনেছে, কেউ এনেছে ঘরেপাতা খাঁটি দই, কারও হাতে ফুল। মলিনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে জিনিসগুলো সামনে রাখছেন মঞ্জুষা। মঞ্জুষা জানেন যে ফুলের ঘ্রাণ মলিনার নাকে গন্ধিপোকার গন্ধ হয়ে ঢোকে, বেদানা বা কমলার রস মুখে ঢোকালে বমি হয়ে বেরিয়ে যায়। মলিনা শুকনো চোখে আত্মীয়দের খানিকক্ষণ দেখে আবার চোখ বোজেন। যেন সারাজীবন নিরন্তর পরিশ্রম করার পর এখন এত ক্লান্ত যে চোখ মেলার শক্তিও নেই। মলিনাকে দেখে কেউ আহা বলে, কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কেউ আঁচলে চোখ মোছে, হাতপাখায় কেউ বাতাস করে গায়ে, কেউ হাত বুলোতে থাকে মলিনার হাড়সার হাতে।

আর ভিড় থেকে ভেসে আসতে থাকে

এই কদিন আগেও তো হেঁটেছেন! কথা বলেছেন।

আহা শরীরের কী হাল হয়েছে?

 পেটটা আজ বেশি ফোলা লাগছে।

চোখের হলুদটা আরও বেড়েছে।

নীলা ভিড় কেটে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। নীলার পেছন পেছন ভিড়ের মানুষগুলোও এক এক করে। মঞ্জুষা নীলাকে তাড়া দেন, শাঁখা সিঁদুর পরে আয় তো। এত লোক এসেছে, কী বলবে বল।

লোকেরা কি আমার শাঁখা সিঁদুর দেখতে এসেছে?

তা দেখতে আসেনি, কিন্তু চোখ তো বাড়িতে রেখে আসেনি কেউ। এ নিয়ে দেখিস, কথা হবে।

হোক।

 নীলা শাঁখা সিঁদুর পরা অনেক আগেই ছেড়েছে, ও পরার কোনও ইচ্ছে তার নেই। জানালায় গিয়ে সে দাঁড়ায়, সেই জানালা, তাকালে প্রতিবেশীর বাড়ির পিঠ দেখা যায়, আর পিঠের তলে এক বোঝা আবর্জনা, আবর্জনা খুঁটে খাচ্ছে রাস্তার দুটো নেড়ি কুকুর। নীলার মগ্নতা ভাঙে মলিনার দাদার কণ্ঠস্বরে, হোয়াই ডিডন্ট হি কাম, নীলা?

কে?

 কিষানলাল। আমি ভেবেছিলাম, হি হ্যাজ অলরেডি এরাইভড ইন ক্যালকাটা, আড্ডা ফাড্ডা দেব, হি ইজ রিয়েলি এ জেন্টেলম্যান।

তা বটে। কিন্তু সে আসেনি। নীলা একা এসেছে!

আমি প্যারিসে কখনও যাইনি। বাট আমি জানি, প্যারিস ইজ এ ওয়ান্ডারফুল সিটি, আই উড লাভ টু গো দেয়ার। কিষানলালের বাড়িতে থাকা যাবে তো! আই এম সিওর হি হ্যাজ এ বিউটিফুল বিগ হাউজ।

নীলা বলে, কথা বলতে গিয়ে এত ইংরেজি ব্যবহার করছেন কেন? বাঙালি মানুষ, বাংলায় কথা বলুন।

বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা তাঁর চিরকালের স্বভাব। নীলা কখনও আপত্তি করেনি আগে, নিজেও সে মলিনার দাদার সঙ্গে বাংলা ইংরেজি মিলিয়েই কথা বলত।

হো হো শব্দে হেসে ওঠেন মলিনার দাদা, আত্মসম্মানে তাঁর আঘাত লাগেনি, বরং তাঁর সম্মান, নীলা অনুমান করে, তিনি ভাবছেন, যে বেড়েছে। তাঁর জিভে বাংলা শব্দ সহসা আসে না, এ নিয়ে কোনও লজ্জার বদলে গর্ব হচ্ছে তাঁর।

অনির্বাণের দিদি নীলাকে টেনে জানালা থেকে সরান। কী, এত চুপচাপ কেন নীলা! কথা বলো। কথা না বললে কষ্ট হয়ে বেশি। কী করবে বলো, আমাদের কারও কি হাত আছে মলিনাকে সারানোর… সব ভগবানের ইচ্ছে… মলিনার জামাইবাবু একটি সিগারেট ধরিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বলেন, তা প্যারিসে জীবনযাপন কেমন চলছে। স্বামী ভাল কামায় তো? আই হার্ড দ্যাট হি আর্নস গুড মানি।

মলিনার কাকাতো বোন নীলার হাত দুটো তুলে ধরে, দেখো দিকিনি, কেমন খালি হাত, গয়নাগাটি খুলে রেখেছ কেন! শাঁখা সিঁদুরও পরোনি। কেমন বিধবার মতো দেখাচ্ছে।

আরেক কাকাতো বোন বলে, বাচ্চা কাচ্চা কবে হবে! যা নেবে, তাড়াতাড়ি নিয়ে নাও।

এবার মলিনার দিদির মেয়ে বলে, কোলের বাচ্চার মুখে দুধের বোতল ঢুকিয়ে দিয়ে দোলাতে দোলাতে, তোমার বাচ্চা তো জন্মেই ফরাসি নাগরিক হবে, তাই না!

মলিনার কাকিমা পল্টুকে ডেকে নীলার সামনে দাঁড় করায়। কী তোর দিদিকে নাকি প্যারিসের কথা জিজ্ঞেস করবি! করেছিস। পনেরো বছর বয়স পল্টুর, দিদিকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না কিছু, দিদিমার পেছনে মুখ লুকোয় সে। এই পল্টুটাকে বিদেশে নেওয়া যায় কি না দেখো তো। ছেলেটা মোটে লেখাপড়া করতে চাইছে না দেশে।

অনির্বাণের পিসতুতো দাদা সাধন দাস নীলাকে আড়ালে ডেকে বড় শ্বাস ফেলে বলেন, মিঠুর জন্য কিছু কি করতে পারবে নীলা? একটা বিয়ে টিয়ের বন্দোবস্ত যদি করতে পারো…

নীলা অনুমান করে, আত্মীয়দের বিশ্বাস তার হাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এখন। কেউ জানে না যে সে নিজে সুনীলের কাছ থেকে বিমানভাড়ার টাকা ধার করে কলকাতা এসেছে। কেউ জানে না কারও কোনও সমস্যার সমাধান করা নীলার দ্বারা সম্ভব নয়। কেউ জানে না কার বিয়ে হচ্ছে না, কার লেখাপড়া হচ্ছে না এ দেশে, সে এসব জানতে চায় না। নীলা চায় বাড়ি থেকে অতিথিরা সব বিদেয় হোক, মলিনার পাশে বসার অবসর জুটুক তার, মলিনার বোজা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার যতক্ষণ না তিনি চোখ খোলেন, খুললে নীলা দেখাবে মার জন্য একজোড়া জুতো এনেছে সে প্যারিস থেকে, একটি ঘড়ি এনেছে হাতে পরার, আর একটি ক্রিম মুখে মাখার, বয়সের রেখা মুছে দেওয়ার ক্রিম।

চিত্রা আর মঞ্জুষা ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। চা বিস্কুট দেওয়া হচ্ছে ঘরে ঘরে।

নীলা দুর্লভ নীরবতা খোঁজে।

.

মিঠু একটি সাদা সুতি শাড়ি গায়ে, ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়েছিল, পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে নীলার দিকে, ইতিউতি তাকিয়ে গলা চেপে বলে, তোমার সঙ্গে একটু কথা বলব।

বলো।

 এখানে না। চলো না তোমার ঘরে যাই।

 নীলা দোতলায় নিজের ঘরে মিঠুকে নিয়ে ঢুকল। মিঠু ঘরের দরজা ভেজিয়ে বিছানায় বসল। বসে নীলার দুহাত চেপে ধরে বলল, আমার জন্য কিছু করো নীলা।

কী করব।

একটা ছেলে, যে কোনও একটা ছেলে খুঁজে দাও। তোমার চেয়ে চার বছরের বড় আমি জানো তো। বাবা কেরানি ছিলেন, সে ভাল চাকরিটা গেছে। এখন সে আপিসেই দারোয়ানের কাজ করেন। দাদা বেকার বসে আছে। বিয়ের জন্য যেই আসে, আমার রং তাদের পছন্দ হয় না। আমি কালো বলে, কেউ বিয়ে করতে চায় না আমাকে। বাবার এমন পয়সাও নেই যে ছেলে কিনতে পারে। বিয়ে না হওয়া এ সমাজে কী ভয়ংকর অপরাধ নীলা, তোমার বিয়ে হয়েছে, তুমি বুঝবে না। সেই কবে বি এ পাশ করে বসে আছি। বাপমায়ের সংসারে আমি একটা বোঝা ছাড়া কিছু নই। আমি অকল্যাণ। আমার ছায়া দেখাও পাপ। বিদেশের কোনও ছেলে, আমি ধর্ম টর্ম দেখব না, যে ধর্মেরই হোক, কানা হোক, খোঁড়া হোক, যদি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়…। এ দেশে তো আমাকে বিয়ে করার কেউ নেই, পণ দেবার ক্ষমতা আমার বাবার নেই। কী করে হবে বিয়ে, বলো!

মিঠুর ডাগর চোখে জল। মিঠুর দীঘল ঘন চুল পিঠে ছড়িয়ে আছে। মিঠুর পানপাতার মতো মুখে নীল আতঙ্ক। মিঠুর মেদহীন দীর্ঘ কালো শরীরের লাবণ্য নীলা দুচোখ ভরে দেখে।

দাদাকে বলি দাদা তুমি বিয়ে করছ না কেন? দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তোর বিয়ে না দিয়ে কী করে করি। দাদারও তো বয়স কম হল না। আমার বিয়ে হচ্ছে না বলে নিজে বিয়ে করতে পারছে না। আমার ভয় হয় নীলা। বিয়ে হয় না বলে সমাজে মুখ দেখানো যাচ্ছে না আর।

মিঠুর হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নীলা বলে, বি এ পাশ করেছ। কোথাও চাকরি বাকরি করো। বিয়ে না হলে কী হয়? মানুষ মরে যায়?

বিয়ে কি আমি আমার জন্য চাইছি নীলা! বাবা মার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। অন্ধকার। আমার গায়ের রং দেখি সবার মুখে। এ যে কত বড় অপরাধ আমার, আমি কালো। দূর দূর করে আমাকে তাড়ায় সবাই। নীলা, যদি কেউ বিয়ে কোরে আমাকে দাসীবাঁদির মতো রাখে রাখুক, তবু বিয়েটা করুক। যদি পাও, বুড়ো হোক, পাগল হোক…

নীলা কোনও আশাও দেয় না মিঠুকে। মিঠু তার মুখের নীল আতঙ্ক মুখে নিয়ে ফিরে যায়।

.

অনির্বাণ সন্ধের পর বাড়ি ফিরে নীলাকে ডাকেন। যেমন ছিলেন তিনি, তেমনই আছেন। ঘরে ফিরে আগের মতো তিনি জামা জুতো খুলে, হাত মুখ ধুয়ে, পাজামা ফতুয়া পরে বসেন সোফায়। দিনের পত্রিকায় চোখ বুলোন। নীলা যখন সামনে মুখোমুখি বসল, অনির্বাণের চোখ দিনের পত্রিকায়।

কিষানের সঙ্গে হয়েছেটা কী তোর?

কিছু হয়নি তো।

অনির্বাণ চশমা খুলে ফতুয়ার কোনায় চশমার কাচ মুছে আবার পরে নিয়ে বলেন, জীবন যে খুব অল্পদিনের, দেখছ না? তোমার মার অবস্থা তো দেখছ! জীবনের মূল্য যদি না বোঝা, যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াও, ভবিষ্যতের বারোটা বাজিয়ে যদি বসে থাকো, হঠাৎ একদিন দেখবে জীবন ফুরিয়ে গেছে। কিছুর আর সময় নেই। পালটাবার বা নতুন করে গড়ার।

মানুষটি সারা জীবন ভবিষ্যতের কথাই বলেছেন নীলা আর নিখিলকে, ঠিক এভাবে। নীলা মনে করতে চেষ্টা করে, অনির্বাণকে কখনও সে কাঁদতে দেখেছে কি না।

অনির্বাণ মন্দ্রগম্ভীর স্বরে বলেন, কিষানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে সেদিন। ও বলল, তুমি যদি ভদ্র হয়ে থাকো, আর দশটা মেয়ের মতো স্বামীর ঘর করতে চাও, স্বামীর কথা মতো চলতে চাও, তবে সে তোমাকে ক্ষমা করবে, ঘরে নেবে। না হলে কাগজে কলমে সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে তার কোনও আপত্তি নেই। এই সোজাসাপটা ভালমানুষটাকে খেপিয়ে দিয়েছ নীলা। দুশ্চিন্তায় আমি ঘুমোতে পারি না।

নীলা অনির্বাণের ঠোঁটের দিকে উদাস তাকিয়ে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখতে দেখতে বলে, বাবা, তুমি কখনও কেঁদেছ?

হঠাৎ কাঁদার কথা উঠছে কেন?

উঠছে কারণ আমি ওঠাচ্ছি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে কখনও, তোমার জীবনে, তুমি কেঁদেছ কি না। মনে করে দেখো তো, কারও জন্য কেঁদেছ কি? কারও জন্য না হলেও নিজের জন্য কেঁদেছ কি না। চোখে কখনও হঠাৎ অনুভব করেছ যে জল? ওই চোখদুটো, চশমার আড়ালে, চশমা, মাত্র যার কাচ মুছে নিয়ে পরলে, সেই চশমার আড়ালে যে চোখ, সে চোখের কথা বলছি। ওই চোখদুটো থেকে এক ফোঁটা জল কখনও ঝরেছে? বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে কোনও, দেখলে তোমার গাল ভিজে গেছে কীসে যেন, চোখে হাত দিলে, দেখলে হাত ভিজে গেল, চোখ থেকে জল গড়ালে তো এমনই হয় তাই না? হাত ভিজে যায় মুছতে গেলে। এমন হয়েছে তোমার কখনও? অথবা বালিশ, শুয়ে কাঁদলে বালিশ ভিজে যায়। এরকম হয়েছে কখনও?

পাগল হয়ে গেছিস নাকি? অনির্বাণ ধমক লাগান।

 নীলার অদ্ভুত শান্ত কণ্ঠ, হ্যাঁ হয়েছি।

অনির্বাণ আবার চশমা খুলে হাতে নেন। এবার আর চশমার কাচ মোছর জন্য নয়। নীলার দিকে তীক্ষ্ণতা ছুড়ে দিতে।

অনির্বাণের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা পরোয়া না করে নীলা বলে অনুতাপ বলে একটি শব্দ আছে কখনও শুনেছ? কখনও অনুতাপ করেছ? কখনও করোনি। করার দরকার হয়নি। মাকে বিয়ে করেছিলে, তোমার টাকার দরকার ছিল বলে। মিটেছে। পণের টাকা নিয়ে নিজে ডাক্তারি পড়েছ, ডাক্তার হয়েছ, মিটেছে। মা এ সংসারে দাসীর মতো ছিল, ছিল না কি? ছিল। তাতে লোকে কেউ কিছু বলেনি, কারণ মেয়েরা স্বামীর সংসারে দাসীর মতোই থাকে। প্রভু হবার আনন্দও ভোগ করেছ। ওদিকে আবার স্বাতী সেনকে রেখেছ তোমাকে অন্য রকম আনন্দ দিতে। লোকে এতেও মন্দ কিছু বলেনি, কারণ পুরুষদের ওরকম দু একজন কিছু মেয়েমানুষ বাইরে থাকেই, থাকাটা তেমন খারাপ কিছু নয়। লোকে তোমাকে মন্দ বলেনি, বরং দেবতা ঠাউরেছে, কালো পেঁচি বউকে কখনও তাড়িয়ে দাওনি বলে। এদিকে নিষ্ফলা নপুংসক যে নও, তারও প্রমাণ রেখেছ, দুটো ছেলেমেয়ে হইয়ে। দুটো ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে বড় ডিগ্রি নিয়েছে, এও সাতজনকে শোনানোর বিষয়, এতেও জিতেছ। এক কানাকড়ি মেয়ের বিয়েতে পণ লাগেনি, বেঁচেছ। লোকের কাছে আরও বলার সুযোগ হয়েছে মেয়ে তোমার বিদেশে থাকে। বিদেশে কেমন আছে কেমন থাকে তা তো আর লোকে জানতে চায় না, বিদেশে থাকা মানেই ভাল থাকা। মায়ের মতো মেয়েও যেন স্বামীর দাসী হয়ে জীবন পার করে, তা হলেই ষোলো কলা পূর্ণ হয়। তা না হলে মেয়ে আবার ডিভোর্সি হয়ে বাপের বাড়ি উঠলে তো ঝামেলার শেষ নেই। ছেলে এখন বড় চাকরি করে, রাজনীতিও করে, একদিন, কে জানে হয়তো মন্ত্রী ফন্ত্রীও হয়ে বসবে। বাহ! কানায় কানায় পূর্ণ জীবন, সার্থক জীবন। অনুতাপ আর যাকে করা মানায়, তোমাকে না। তাই না বাবা?

অনির্বাণকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নীলা চলে যায় অন্য ঘরে, মলিনার ঘরে। মলিনা চোখ বুজে আছেন, নীলা কাছে বসে মলিনার হাতটিতে আঙুল বুলোতে নিয়েছে যেই, সূর্যমুখীর কুঁড়ির ফুল হয়ে ফোটার মতো মলিনার বোজা চোখ খোলে।

মা কিছু বলবে?

 তোমার বাবাকে কিছু বোলো না। বিপদে আপদে তোমার বাবাই তো ভরসা। মলিনার ক্লান্ত ভাঙা স্বর।

মা, তোমাকে আমি প্যারিস নিয়ে যাব। চিকিৎসা করাব। তুমি ভাল হয়ে উঠবে। তোমাকে বলেছি না প্যারিসে কত কী আছে দেখার। সব তোমাকে দেখাব, সব।

মলিনার চোখদুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়, আমি ভাল হয়ে যাব?

 নিশ্চয়ই তুমি ভাল হয়ে যাবে। ওখানে কত ভাল ভাল ডাক্তার। তারপর সমুদ্রের ধারে একটা চমৎকার বাড়ি বানাব। পাহাড়ও থাকবে পেছনে। তুমি তো সমুদ্র খুব ভালবাসো, তাই না?

মলিনা শিশুর মতো মাথা নাড়েন।

এ দেশেও কত কিছু দেখার আছে। আমি তোমাকে দার্জিলিং নিয়ে যাব, সিমলা নিয়ে যাব, কাশ্মীর নেব।

মলিনা বলেন, সেই ক্লান্ত অস্ফুট স্বর, না কাশ্মীর না।

ঠিক আছে কাশ্মীর না, কাশ্মীরে গণ্ডগোল। জয়পুর যাবে না মা? গোয়াতেও তো যাবে। গোয়ার সমুদ্রে সাঁতার কাটব আমরা…

.

মলিনার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়। চোখদুটো বোজেন, ধীরে, তারপর জোরে। এত জোরে যে নাক চোখ মুখ সব কুঁচকে দলামোচা করা কাগজের মতো দেখতে লাগে।

নীলা মলিনাকে জড়িয়ে রাখে।

হঠাৎ মঞ্জুষা বলে চিৎকার করেন মলিনা।

মঞ্জুষামাসি নেই মা। চলে গেছেন। বলো কী লাগবে।

 চিত্রা দৌড়ে আসে চিৎকার শুনে।

 দিদি, মাসিমাকে ওই লাল ওষুধটা খাইয়ে দিন। চিত্রা বলে।

ব্যথার ওষুধ। দুটোর জায়গায় তিনটে বড়ি জলে গুলে খাইয়ে দেয় নীলা।

ব্যথা কমার নাম গন্ধ নেই।

নীলা নিখিলকে ডেকে তোলে, দাদা বেশ তো ঘুমোচ্ছ। মা যে ব্যথায় চিৎকার করছেন। উঠে এসো। কোন ডাক্তার দেখছে মাকে, তাকে শিগরি ডাকো!

অনির্বাণ নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন, ডেকে তোলে তাঁকেও নীলা, ডাক্তার ডাকতে বলে। অনির্বাণ ধমকে ওঠেন, এত রাতে আবার কীসের ডাক্তার!

ঘুমন্ত বাড়ির ভেতর গোঙানোর শব্দ কেবল। মলিনা সারারাত গোঙান, চিৎকারের শক্তি চলে গেছে। নীলা অসহায় বসে থাকে পাশে। মনের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মলিনার কষ্টগুলো নিজের শরীরে নিতে চায়, চায় মলিনার সব দুঃখগুলো আলতো করে তুলে নিয়ে নিজের হৃদয়ে ধারণ করতে।

.

হা ফামেলিয়া

সকালে বেরোবার আগে অনির্বাণ একবার উঁকি দেন মলিনার ঘরে। নিখিলও। প্রাতরাশ সেরে, উঁকিপর্ব সেরে ঝাড়া হাত পা, সারাদিনের জন্য হাওয়া হয়ে যেতে কারও কোনও অনুশোচনা হয় না।

নীলা পথ আগলে বলে, মার এমন অসুখ রেখে সকাল হতেই গটগট করে বেরিয়ে যাচ্ছ যে সব।

চাকরি আছে না!

 চাকরি? সারাজীবন তো চাকরিই করবে। মোটা বেতনের চাকরি। ছুটি নাও।

কী করব ছুটি নিয়ে। মাকে কি সারাতে পারব?

সারাতে না পারলে। পাশে থাকো। তোমাকে দেখবেন মা।

দেখবেন কী, ঘুমিয়েই তো কাটাচ্ছেন।

 সময় নষ্ট কোরো না। তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। অনির্বাণ নিখিলকে তাড়া দেন।

এই বাস্তবজ্ঞানবিবর্জিত মেয়ের কথায় কান দিয়ো না নিখিল, বেরোও। একজনের জীবন থেমে আছে বলে সংসারের বাকি মানুষদের জীবন থেমে থাকবে নাকি! ভারী গলায় বলেন অনির্বাণ।

যাও। যত পারো টাকা কামাই করো গিয়ে। তোমাদের সম্ভবত থাকারও দরকার নেই। কেবল ডাক্তার পাঠিয়ে দিয়ো। না পারো, ডাক্তারের নাম ঠিকানা দিয়ে যাও। আমিই আনার ব্যবস্থা করব। নীলা বলে, ক্লান্ত কণ্ঠ। 

সকালে সূর্যমুখী ফোটে।

আজ বিকেলে গঙ্গার ধারে যাবে বেড়াতে?

মলিনার মুখে শিশুর হাসি। তিনি যাবেন। বহুকাল তাঁর বাড়ির বাইরে বেরোনো হয়নি। বাড়ির বাইরে কোথাও যে একটি জগৎ আছে, বহুকাল দেখা হয়নি তাঁর।

 পই পই করে নীলা কী খাচ্ছে না খাচ্ছে সে খোঁজ নেন মলিনা। স্বর ফুটতে চায় না, তবু ফোটান, চোখ বুজে আসতে চায়, তবু তিনি খুলে রাখেন। মনের জোরে রাখেন। নীলা বলে সে খুব ভাল খাচ্ছে, চিত্রা রাঁধছে খুব ভাল, কইমাছ ভাজা, পুঁইশাক, চিতলমাছের ঝোল…

ঝোলে ধনেপাতা দিয়েছে তো!

দিয়েছে মা।

নিজে তিনি কিছুই খেতে পারেন না, সারাদিনে এক কাপ দুধ যদিও মুখে নেন, তাও বমি হয়ে যায়। নীলা মলিনাকে দেখে আর ভাবে, স্বামী সন্তানদের খাইয়ে নিজে এঁটোকাঁটা খেতেন, বাসি খাবার খেতেন। সংসারে মায়েরা যা করে, মলিনা তাই করেছেন। ওই করে অসুখ বেঁধেছে। নিজের দিকে কখনও তাকাননি, নিজের সামান্য সুস্থতার দিকে, সুখের দিকে। নীলাও কোনওদিন ফিরে দেখেনি মলিনা কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন, মলিনার অসুখ করছে কি না। বাড়ির আর সবাই যেমন দেখেনি। এখন নীলার চেতন ফিরেছে, এখন সে মরিয়া হয়ে মলিনাকে ভাল খাওয়াতে চাচ্ছে, নিজের হাতে মুখে তুলে। মলিনাকে সে সুস্থ করে তুলতে চাইছে। কিন্তু মলিনার পক্ষে কারও কোনও স্নেহ মমতা, কারও শ্রদ্ধা সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। বড় দেরি হয়ে গেছে নীলার। নীলা প্রাণপণ চায় সময়কে পিছিয়ে দিতে, পারে না। প্রাণপণ চায় নিজের ভুলগুলি শুধরে নিতে, পারে না। সময়ের সময় নেই দাঁড়াবার, এ যখন যায়, যায়। মানুষের ভুলগুলি, অন্যায়গুলি সঙ্গে নিয়েই যায়।

.

ডাক্তার প্রশান্ত এলেন দুপুরের পর। অনেকদিনের চর্চায় হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দন করতে, ডাক্তারের অপ্রস্তুত মুখ দেখে হাতের আঙুল গুটিয়ে নিয়ে, যেন হাতটি আসলে করমর্দনের জন্য সে বাড়ায়নি, কোন ঘরে যেতে হবে ডাক্তারকে তা দেখাতেই কেবল হাতটি প্রসারিত করা, এর বেশি কিছু নয়, নীলা হাঁপ ছাড়ে, ভাগ্য ভাল যে ডাক্তারের গালে চুমু খাবার জন্য সে ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়নি। তাহলে শহরে নীলার নাম ছড়িয়ে যেতে মোটে দেরি হত না যে নীলা কেবল নষ্ট হয়ে যায়নি, তার মাথায় কোনও গোলমালও দেখা দিয়েছে।

ডাক্তার মলিনার রক্তচাপ মাপলেন, নাড়ি দেখলেন, বললেন যে ওষুধ তিনি লিখে দিয়েছেন, তাতেই চলবে।

তাই চলছে না ডাক্তারবাবু। কড়া ওষুধ দিন ব্যথার। মরফিন ইঞ্জেকশন দিন।

পাকাচুলো ডাক্তার, নাকের ওপর ঘোলা চশমাটি বছর তিরিশের পুরনো বলে নীলার মনে হয়, দুপাশে মাথা নেড়ে বলেন, মরফিন এখনই না। আরও পরে।

কত পরে?

কত পরে, তা ডাক্তার বলেন না। কেবল বলেন, পরে।

.

মরফিন পরে দেবার কারণটি শেষ অব্দি ডাক্তার ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ধারণা, মরফিন জিনিসটি সুবিধের নয়, এটি নিলে নেশা হয়।

নীলার বিস্ময় চোখে ধরে না। গায়ে পায়ে নামে। লোমকূপে। সারা গা তার কাঁপে ক্রোধে। যে মানুষটি যে কোনও মুহূর্তে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করবেন, তাঁর জন্য করা হচ্ছে মরফিনের নেশা হওয়ার আশঙ্কা!

নীলা বলে, হোক, মরফিনের নেশা হোক আমার মার। মার কখনও কোনও নেশা ছিল না। বাড়ির আর সবার নানা রকম নেশা আছে। আমি খুব করে চাইছি আমার মা যেন মরফিনের নেশা করেন। লিখে দিন মরফিন।

ডাক্তারিতে নীতি বলে আমাদের একটা ব্যাপার আছে তো। আমরা এর বাইরে যেতে পারি না। ডাক্তার তাঁর ঘোলা চশমাটি নাক থেকে চোখের দিকে ঠেলে বললেন।

রাখুন আপনার নীতি। মরফিন লিখে দিয়ে যান। আমি মাকে ইনজেকশন দেব। নীলা তার ত্রিগুণ বয়সী ডাক্তারকে ধমক দিয়েই বলে।

এরকম নিয়ম নয় নীলা জানে। গুরুজনদের সম্মান করার শিক্ষা জন্মের পর পরই সবাই পায় এ দেশে। নীলাও পেয়েছে, গুরুজন যাহা আদেশ করিবে, তাহাই পালন করিবে। গুরুজনের চোখের দিকে তাকাইয়া কথা বলিবে না। তাহাদের সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথা বলিবে, উচ্চকণ্ঠে না। গুরুজন মিথ্যা বলিলেও সে মিথ্যা মানিয়া লইবে। গুরুজন মন্দ কাজ করিলেও বলিবে, ইহা মন্দ নয়, ইহা ভাল। গুরুজন ভুল করিলে কখনও তাহা শুধরাইতে যাইও না, ভুলকেই ঠিক বলিয়া মানিয়ো। গুরু যদি গোরুর মতো ব্যবহার করে, তবে চক্ষু বন্ধ করিয়া রাখিয়ো। ইত্যাদি ইত্যাদি।

নীতির জলে ডুবে ডাক্তার খাবি খাচ্ছেন। মরফিনের পরামর্শ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।

পশ্চিমে যে ব্যাপারটি চলছে ইদানীং, ইউদেনেশিয়া, নীলার হঠাৎ মনে হয়, মন্দ নয়। আগে সে ইউদেনেশিয়াকে চরমতম নিষ্ঠুরতাই মনে করত। আজ, তার মনে হতে থাকে, বেঁচে থাকার অধিকার যেমন মানুষের আছে, মরে যাবার অধিকারও তার থাকা উচিত। এটিও মানবাধিকার। কী লাভ বেঁচে থেকে যখন যন্ত্রণা পোহানো ছাড়া সামনে আর কিছুই থাকে না।

যাবার সময় ডাক্তার বলে যান, এত উত্তেজিত হওয়ার কী আছে! অসুখ তো হঠাৎ করে হয়নি। দীর্ঘদিনের পোষা অসুখ। একটা ফুসকুড়ি মতো ছিল অন্ত্রে, ও থেকে রক্ত যাচ্ছিল, ওটি কেটে ফেলে দিলেই হত। না ফেলার কারণেই তো ক্যান্সারে দাঁড়িয়েছে। রোগীর পরিবার নিয়ে এই এক ঝামেলা পোহাতে হয় আমাদের। সময়মতো চিকিৎসা করাবে না, সময় চলে গেলে, মাথা গরম করবে।

.

বিকেলে নিখিল বাড়ি ফিরে গাড়ি পাঠিয়ে দেয় অনির্বাণকে হাসপাতাল থেকে তুলে আনতে। অনির্বাণ ফিরলে নীলা বলে, রামকিরণকে অপেক্ষা করতে বলো, আমি বেরোব।

কোথায় বেরোবে?

নীলা উত্তর দেয় না। নিখিলকে বলে মলিনাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গাড়িতে তুলতে।

 নিখিলকে ধমকে থামায় অনির্বাণ। ওরও মতো পাগল হয়েছিস তুই।

নিখিলও মত দেয়, এ পাগলের মতো কথাই বটে। যে মানুষ হাঁটতে পারে না, দাঁড়াতে পারে না, উঠে বসার শক্তি নেই যার, হাত পা প্রায় অবশ, সেই মানুষকে নিয়ে গঙ্গার ধারে যাওয়া।

মরার আগেই মেরে ফেলার ফন্দি এঁটেছে নাকি!

হতবাক দাঁড়িয়ে থাকা নীলাকে টেনে বারান্দায় নেয় নিখিল, বলে, তোর হয়েছে কী বল তো! এমন পাগলামো করছিস কেন! মার শরীর তো দেখছিস! এ সময় টানাটানির কোনও মানে হয় না!

নীলা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে।

কী যে হল মার হঠাৎ! নিখিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

দীর্ঘশ্বাসটি, নীলার বিশ্বাস, কৃত্রিম।

.

মলিনা ব্যথায় চিৎকার করছেন। বারান্দা থেকে সেই কাতর চিৎকারধ্বনি শুনছে সে। তার ইচ্ছে করে না সেই ভয়ংকর কষ্টের সামনে যেতে, দেখতে দুঃসহ যন্ত্রণায় কোঁকড়ানো মুখ। বারান্দার গ্রিল শক্ত মুঠোয় ধরে রাখে সে, কোথাও সে যাবে না, এখানে দাঁড়িয়েই সে জীবনের যত দুর্ভোগ দুর্যোগ দেখা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে। কিন্তু যায়, পেছন ফিরে যখন দেখে টেলিভিশনে ধুন্দুমার নাচ হচ্ছে, আর সোফায় পাজামা আর ফতুয়া পরে অনির্বাণ বসে আছেন, হাতে দিনের পত্রিকা, চোখ বুক কাঁপানো কোমর দুলোনো তরুণীদের নাচে, সেদিকে।

টেলিভিশনটি বন্ধ করে, অনির্বাণের নাক বরাবর বসে বলে, কাল যে বলেছিলাম, অনুতাপের কথা। অনুতাপ হয় তোমার কোনও কারণে?

কী কারণে হবে? অনির্বাণ চশমা খোলেন। আবার সেই তীক্ষ্ণ চোখ।

হবে এই কারণে যে তুমি মার চিকিৎসা করোনি। দশ বছর ধরে মার রক্ত যাচ্ছিল, অর্শরোগের কারণে রক্ত যাচ্ছে বলেছ। বলোনি? এখন তো জানো, ওই রক্ত যাওয়া কোনও অর্শরোগের কারণে ছিল না। মার যে পেটে ব্যথা হত, বলোনি, ও কিছু না! মা খামোকা আহ্লাদ করছেন! ব্যথার কথা বলে মা নাকি আসলে শুয়ে আরাম করতে চান। বলোনি? বলেছ। মা তোমার মনোযোগ পেতে মিথ্যে বলছেন, বলোনি? বলেছ। এখন তো সব বুঝেছ। অনুতাপ হয় না? একবারও অনুতাপ করো না, যখন একা বসে থাকো, একবারও মনে হয় না যে এ রোগ হত না যদি তুমি মার চিকিৎসা করতে আগে থেকে। আগে যদি অবহেলা না করতে। তুমি তো গ্যাস্ট্রোএনটারোলজির প্রফেসর ছিলে, ছিলে কী এখনও আছো, অনুতাপ হয় না? অনুতাপ হয় না একবারও যে তুমি ডাক্তার বলে মা তোমার ওপর ভরসা করে ছিলেন, আর তুমি ফিরেও তাকাওনি, বিনা চিকিৎসায় মাকে মরতে হচ্ছে। হয় তো অনুতাপ, হয় না?

চিকিৎসা তো চলেছেই, এখনও চলছে। কেমোথেরাপি কি কম দেওয়া হল! অনির্বাণ গলা চড়ান।

বাজে কথা বোলো না। কেমোথেরাপি কোনও চিকিৎসা নয়। ক্যান্সার ঘটিয়েছ, আর এখন কেমোথরাপি দিয়ে লোক ভোলাচ্ছ যে চিকিৎসা করছ। চিকিৎসা যখন করার দরকার ছিল, তখন করোনি। এ তো তুমি ভাল জানো, জানো না? অনুতাপ হয় না? নীলার কণ্ঠে ক্রোধ, চোখে ঘৃণা।

আজও আমি অনকোলজিস্ট পাঠিয়েছি।

 সে তো লোক দেখানো। লোককে দেখাচ্ছ যে বড় ডাক্তার এনেছ।

অনির্বাণ নিখিলের দিকে চেয়ে সমর্থন খোঁজেন, কী বলছে এই মেয়ে, শহরের সবচেয়ে নামকরা অনকোলজিস্ট…

ফাক ইয়োর অনকোলজিস্ট।

হোয়াট?

ফাক ইয়োরসেল্ফ।

এটুকুর পর নীলা কাঁদে। বাড়ি কাঁপিয়ে কাঁদে।

.

কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে নীলা, সোফায়। ঘুম ভাঙে মলিনার চিৎকারে আর অনির্বাণের নাক ডাকায়। বাড়ির একটি ঘরে অসহনীয় যন্ত্রণায় কাঁদছেন একজন, আর অন্য ঘরে সুখনিদ্রা যাচ্ছেন আরেকজন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর তাঁরা এক ছাদের তলে বাস করেছেন। গুমোট, এত স্তব্ধতা চারদিকে। মলিনা যেমন শরীরের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, নীলা ওই স্তব্ধতার মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থেকে মনের যন্ত্রণায় কাতরায়। নীলার ভয় হয়। মলিনাকে স্পর্শ করতে তার ভয় হয়। বোঁ বোঁ পাখার তলে মলিনার পা বরফঠাণ্ডা হচ্ছে আর মাথায় গ্রীষ্মের মধ্যাহ্ন। আহা মলিনার কেন বিদেশি কুকুর হয়ে জন্ম নেওয়া হল না।

সকালে সূর্যমুখী চোখ ফোটে।

চিত্রা নীলাকে চা করে দে রে!

চিত্রা শুয়ে ছিল ঘরের মেঝেয় কাঁথা বিছিয়ে। কাঁথা গুটিয়ে উঠে যায় চা করতে।

দরজাটা বন্ধ করে এস তো আমার কাছে। মলিনা বলেন।

নীলা দরজা বন্ধ করে।

 বালিশের তল থেকে চাবি নিয়ে আমার আলমারিটা খোলো।

মলিনার কন্ঠ মনে হয় চাঁদের দেশ থেকে আসছে। এমন ক্ষীণ।

নীলা আলমারি খোলে।

ডান দিকের ড্রয়ারে দেখো কিছু কাগজ আছে।

 নীলা কাগজ নিয়ে এল।

মলিনা বললেন এটা তোমার কাছে রাখো। এটা তোমার।

নীলা কাগজ খুলে দেখে তার নামে ভেতরে কুড়ি লক্ষ টাকার চেক।

সে চমকে ওঠে, এত টাকার চেক দেখে। এত টাকা তুমি আমাকে দিচ্ছ কেন মা? নীলা দেখে মলিনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে বালিশে। জল মুছে দিয়ে ধরা গলায় বলে, এ টাকা দিয়ে তোমার চিকিৎসা করাব মা। তুমি ভাল হবে। আবার আগের মতো হাঁটবে, গান গাইবে। মনে আছে তুমি যে গাইতে আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি, যা দিয়েছ তারি অযোগ্য ভাবিয়া কেড়েও তো কিছু নাওনি…

বালিশে জল গড়াতে থাকে মলিনার।

দেখো মা আমি গাইছি গানটি…

নীলা গাইতে থাকে মেঝেয় বসে মলিনার মাথার পাশে মাথা রেখে, ভেজা বালিশে। বালিশ ভিজতে থাকে আরও, নীলার চোখের জলে মলিনার সিঁথিতে ঝাপসা হয়ে আসা সিঁদুরও মুছতে থাকে।

নীলার গলা বুজে আসে, গান শেষ হয় না।

 চাঁদের দেশ থেকে আসা স্বর আবার, দেশে থেকো, বিদেশ যেয়ো না।

.

বাড়িতে হুলস্থুল শুরু হয়। নিখিল জানাল, দানিয়েল নামে একটি মেয়ে ফোন করেছিল প্যারিস থেকে। সে আজ রাতে এসে পৌঁছোচ্ছে কলকাতায়। অনির্বাণ বাজার করতে গেছে, বিদেশি অতিথির জন্য ভাল মাছ মাংস কিনতে। তাছাড়া অনির্বাণের দুজন বন্ধুও দুপুরে খাবে। রাতে খাবে কিছু আত্মীয়। এক চিত্রার ওপর চাপ বেশি পড়ে যায়। খবর পাঠিয়ে চিত্রার মা মাসিকে আনা হল। নীলা দূর থেকে বাড়ির ভোজউৎসব দেখে। নিখিলের ব্যস্ততা দেখে।

আচ্ছা তোর বিদেশি অতিথি কী পান করবে? ফরাসি ওয়াইন না হলে কি চলবে? ভারতীয় ওয়াইনের ব্যবস্থা করলে হবে তো!

নীলা কাঁপা কণ্ঠে বলে, দাদা, মার পাশে একটু বসো। একটু কথা বলো মার সঙ্গে। গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দাও।

ডাক্তার বলেছে আরও দুমাস বাঁচবে মা। নিখিল বলে।

আমার ভয় লাগছে দাদা।

নিখিল বিমানবন্দর থেকে দানিয়েলকে নিয়ে বাড়ি এল সন্ধেবেলা। বাড়িতে আত্মীয়দের ভিড়ও বেড়েছে। সবাই দেখতে এসেছে মলিনাকে। রাতের ভোজ শেষ হলে অনির্বাণ মলিনার নাড়ি টিপে এসে মলিনার দাদা আর জামাইবাবুর সঙ্গে ফিসফিস করে শ্মশানঘাট, খাটিয়া, টাকা ইত্যাদি কথা বলেন।

নীলার কানে আগুনের শলার মতো ঢোকে প্রতিটি শব্দ। একা সে পুড়তে থাকে। নীলার পোড়া কাঁধে হাত রেখে, দানিয়েল ফিসফিস করে বলে, এত দূর থেকে তোমার কাছে এলাম, দেখে একটু খুশি হলে না মনে হচ্ছে।

ফিসফিসের কোনও উত্তর দেয় না সে।

নীলার বিছানাতেই দানিয়েলের ঘুমোনোর ব্যবস্থা হয়। নীলার বান্ধবী নীলার বিছানায় ঘুমোবে, এ নিতান্তই স্বাভাবিক, পশ্চিমে সূর্য ডোবার মতো, মলিনার কষ্ট পাওয়ার মতো। দুটো বেশি বালিশ পেতে বিছানা গুছিয়ে দিয়ে আসে চিত্রা। ঘুমোতে যাবার আগে অনেক রাত অব্দি বসার ঘরে বসে দানিয়েলের সঙ্গে ফরাসি বিপ্লব, ফরাসি সুগন্ধী নিয়ে কথা বলে নিখিল আর অনির্বাণ।

নীলা একা বসে ছিল মলিনার বিছানার পাশে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। মধ্যরাত পার হলে দানিয়েল মলিনার ঘরে বেড়ালের মতো নিঃশব্দে ঢুকে, বলে, চলো ঘুমোতে যাবে।

তুমি ঘুমোও, আমি মার কাছে বসব।

তুমি খুব ক্লান্ত নীলা, তোমার ঘুম দরকার। এভাবে না ঘুমিয়ে শরীর খারাপ করলে তোমার মার কাছেই তোমার থাকা হবে না। তোমাকে নিয়েই বাড়ির লোকেরা ব্যস্ত হবে। তার চেয়ে রাতটা ঘুমিয়ে, সকালে এসে বোসো এখানে। দানিয়েল ফিসফিস করে বলে।

বাড়িটি, নীলা দেখে, ফিসফিসে ফিসফিসে ভরে উঠছে।

 দানিয়েল নীলার ক্লান্ত শরীরকে টেনে নিয়ে যায় দোতলায়।

সারারাত নীলার নিস্তরঙ্গ শরীরে দানিয়েলের তৃষ্ণার্ত জিভ খেলা করে। নীলার মরাকাঠ শরীর হঠাৎ বানের জলে ভেসে যায়। দানিয়েল নিখুঁত শিল্পীর মতো নীলার শরীরে আঁকতে থাকে ওর স্বপ্নের ছবি।

নীলা শীৎকারে, শীর্ষসুখে যখন আকণ্ঠ ডুবে আছে, ভোরের আলো এসে চুমু খাচ্ছে তার এলো চুলে, তখনই চিত্রার চিৎকার তাকে পাথর করে দেয়।

.

দানিয়েল বেরিয়ে যায়, হিন্দুর সৎকারউৎসব ও দেখেনি কোনওদিন। দেখবে, এ এক নতুন অভিজ্ঞতা ওর জন্য।

নীলা বিছানা থেকে ওঠে না। নিখিল এসে ডেকে যায়। চিত্রা ডাকতে এসে বলে যায়, দিদি, মাসিমা অস্থির অস্থির করছিলেন, আর নীলা নীলা বলে ডাকছিলেন। ওই ডাকেই তো আমার ঘুম ভাঙে। তারপর মাসিমাকে কত ডাকি, মাসিমা আর কথা বলেন না। চোখ খোলেন না।

চিত্রা সরে গেলে নীলা উলঙ্গ শরীরে নেমে আসে বিছানা থেকে, ঘরের দরজায় খিল এঁটে দেয়। সারাদিন দরজায় শব্দ হয়, কেউ টোকা দেয়, কেউ ধাক্কা, কেউ ওপাশ থেকে শেষবার মায়ের মুখ দেখার অনুরোধ করে, কেউ আদেশ করে, মঞ্জুষা ভাঙা গলায় করেন, মলিনার দিদি দাদা ভারী গলায় করেন, অনির্বাণও কী কারণে নীলা জানে না, ডাকতে আসেন। কারও জন্য দরজা খোলে না সে।

সারাদিন জানালার হলুদ রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে থাকে নীলা, রাস্তার ফেরিঅলার ডাক, বাস ট্রাকের চিৎকার, সৎকারউৎসবের কোলাহল কিছুই তাকে স্পর্শ করে না।

রাতে অতল নিস্তব্ধতার বুক চিরে চিত্রার মিহি কান্নার শব্দ বাড়ির গুমোট বাতাসে ভাসতে থাকে।

নীলার বুক চিরে কোনও দীর্ঘশ্বাস বেরোয় না, চোখ জ্বালা করে এক ফোঁটা জল বেলোয়।

.

মলিনার দুঃখগুলোর ওপর গোলাপজল ছিটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল নীলার। যেন দুঃখগুলো সুগন্ধ পেতে পেতে ঘুমিয়ে পড়ে কোথাও, ময়দানের ঘাসে, বিড়লামন্দিরের সিঁড়িতে। সন্ধেবেলা আলতো করে তুলে বাড়ির ছাদে রেখে এলে দুঃখগুলো দুঃখ ভুলে চাঁদের সঙ্গে খেলত হয়তো বুড়িছোঁয়া খেলা। দুঃখরা মলিনাকে ছেড়ে কলতলা অব্দি যায়নি কোনওদিন। যেন এরা পরম আত্মীয়, খানিকটা আড়াল হলে বিষম একা পড়ে যাবেন মলিনা, কাদায় পিছলে পড়বেন, বাঘে ভালুকে খাবে।

মলিনাকে দুঃখের হাতে সঁপে বাড়ির মানুষগুলো অসম্ভব স্বস্তি পেত। দুঃখগুলোকে পিঁড়ি দিত বসতে, চা বিস্কুট দিত। নীলার ইচ্ছে ছিল বেড়াতে নিয়ে গিয়ে মলিনার দুঃখগুলো গঙ্গার জলে, কেউ জানবে না, ভাসিয়ে দেবে একদিন। কচুরিপানার মতো, খড়কুটোর মতো, মরা সাপের মতো ভাসতে ভাসতে দুঃখরা চলে যাবে দূরে… অনেক দূরে। নীলার কোনও ইচ্ছে পূরণ হয়নি, মলিনার দুঃখগুলো মলিনার সঙ্গে শ্মশান অব্দি গেছে।

.

আমরা এমনি ভেসে যাই

পুরো সপ্তাহ কলকাতার রাস্তায় ঘুরে ভিড়ভাট্টা ধুলোবালি যানজট ভেঁপুতে কাতর হয়ে, ফুটপাতের আলুকাবলি খেয়ে পেটের অসুখ বাঁধিয়ে, মনিক ক্লদ ম্যাথুর পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে দুদিন আড্ডা দিয়ে, চোখ বিস্ফারিত করে নিখিলের মাতৃদায় দেখে দানিয়েল প্যারিস ফিরে গেল। যাবার আগে নীলাকে সেধেছিল যেতে। নীলা যায়নি।

অনুতাপ? তুমি তো প্যারিস থেকে নাও আসতে পারতে। তোমাকে না দেখেই সম্ভবত মলিনার যেতে হত। নিজেকে দোষী ভাবছ তো! কক্ষনও নিজেকে কোনও কিছুর জন্য দোষী ভাবতে নেই নীলা, দোষী ভাবলে জীবন আর এগোয় না। স্থবির জলাশয় হতে চাও? তা হলে ভাবো।

এসব বলে পাথরে টোকা যতই দিতে চেয়েছে দানিয়েল, পাথরে শব্দ হয়নি। ঠেলেছে, পাথর নড়েনি।

দানিয়েলের শব্দবাক্য বাড়ির পেছনের আবর্জনায় ছুঁড়ে দিয়ে নীলা বলেছে, যথেষ্ট বিরক্ত করেছ আমাকে, আর কোরো না।

নীলার এ বাক্যই দানিয়েলের জন্য যথেষ্ট ছিল পেছনে আর ফিরে না তাকাবার। কিন্তু ও দরজার কাছ থেকে ফিরে মনিক ম্যাথুর ঠিকানা লেখা কাগজটি রেখে বলে যায়, নিকলের বন্ধু মনিক। চমৎকার মহিলা। যদি প্রয়োজন মনে করো কখনও, যেয়ো।

.

রাতগুলো আগের চেয়েও আরও বেশি স্তব্ধতার জলে ডুবে থাকে। কেউ আর এ বাড়িতে কাতরায় না। চিত্রাও আর কাঁদে না। মলিনার ঘর থেকে মলিনার বিছানা বালিশ সব ফেলে ঘর খালি করে ধুয়ে মুছে দিয়েছে চিত্রা। অনির্বাণ সে ঘরে টেবিল পাতবেন, রোগীর শোয়ার টেবিল, চেয়ার পাতবেন চারটে কি পাঁচটা, হাসপাতাল থেকে ফিরে রাতে রোগী দেখবেন সে ঘরে। হলুদ রোদ্দুর চলে গিয়ে অন্ধকার এসে বসে জানালায়, নীলা সেই অন্ধকারের দিকেই তাকিয়ে থাকে। ঘোর অমাবস্যার দিকে নীলার চোখ স্থির হয়ে থাকে।

অমনই এক রাতে, নিখিল এসে নীলার শিয়রের কাছে বসে, পিঠে হাত রেখে নীলার, বলে, কষ্ট তো তোর একার হচ্ছে না, কষ্ট আমাদের সবারই হচ্ছে। কিন্তু কী করা যাবে, মাকে কি ফিরিয়ে আনতে পারব! পারব না। জীবন তো আমাদের যাপন করতেই হবে। এটাই তো নিয়ম, বাস্তব খুব নির্মম হয়, কিন্তু মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

অমাবস্যার ঘোরে নাকি জ্বরের, নীলা বলতে থাকে, আমাদের একটি মা ছিল, মা আমাদের খাওয়াত, শোয়াত, ঘুম পাড়াত। গায়ে কোনও ধুলো লাগতে দিত না, পিঁপড়ে উঠতে না, মনে কোনও আঁচড় পড়তে দিত না, মাথায় কোনও চোট পেতে না। মাকে লোকেরা কালো পেঁচি বলত, আমরাও। বোকা বুদ্ধু বলে গাল দিতাম মাকে। মা কষ্ট পেত, মা কষ্ট পেলে আমাদের কিছু যায় আসত না। আমাদের কিছুতে কিছু যায় আসত না, মা জ্বরে ভুগলেও না, মা জলে পড়লেও না। মাকে মা বলে মনে হত, মানুষ বলে না। মা মানে সংসারের ঘানি টানে যে, মা মানে সবচেয়ে ভাল রাঁধে যে, বাড়ে যে, কাপড় চোপড় ধুয়ে রাখে, গুছিয়ে রাখে যে, মা মানে হাড়মাংস কালি করে সকাল সন্ধে খাটে যে, যার খেতে নেই, শুতে নেই, ঘুমোতে নেই। যার হাসতে নেই, যাকে কেবল কাঁদলে মানায়, শোকের নদীতে যার নাক অব্দি ডুবে থাকা মানায়। মা মানে যার নিজের কোনও জীবন থাকে না। মাদের নিজের কোনও জীবন থাকতে নেই। মা ব্যথায় চেঁচাতে থাকলে বলি, ও কিছু না খামোকা আহ্লাদ। মরে গেলে মাকে দিব্যি পুড়িয়ে ফেলি। ভাবি যে বিষম এক কর্তব্য পালন হল। মা নেই, এতেও আমাদের কিছু যায় আসে না।

বাজে বকিস না তো, খাবি আয়। নিখিল নীলাকে টেনে, প্রায় কোলে তুলে নিয়ে গেল খাবার টেবিলে।

.

অনির্বাণ আর নিখিল দুজনই তিনদিনের ছুটি নিয়েছে। তিনদিন বাড়িতে কেবল ভাত আর নিরামিষ সেদ্ধ হবে। তিনদিন পর পুরুত ডেকে মায়ের শ্রাদ্ধ দিতে হবে নীলাকে। নিখিলের মাতৃদায় চলবে পুরো এক মাস। নিখিল সেলাই ছাড়া সাদা কাপড় এক টুকরো কোমরে পেঁচিয়েছে, আরেক টুকরো গলায়, হাতে কুশাসন। যেখানেই বসবে, কুশাসন পেতে। খাবার মধ্যে দুবেলা সেদ্ধ শাকান্ন আর চিড়া মুড়ি দই। এক মাস এই শোক চলবে নিখিলের। নীলার জন্য এক মাসের নয়, শোক তিনদিনের, বিয়ে হয়েছে তার, এক বংশ থেকে আরেক বংশে গেছে, সে এখন পর, মাতৃদায় তেমন নেই। অনির্বাণও আচার অনুষ্ঠান পালন করছেন যথারীতি। মাস গেলে মলিনার শ্রাদ্ধে কত লোক নেমন্তন্ন করবেন, তারই এখন থেকে হিসেব চলছে। শ্রাদ্ধ শেষ হলে অনির্বাণ আর নিখিল দুজনেরই ব্যস্ততা বাড়বে। মৃত্যুর স্মৃতিকে পেছনে ফেলে সামনে এগোবে। পেছনের কিছুর জন্য হাহাকার করে সময় নষ্ট করার যুক্তি না দেখেন অনির্বাণ, না দেখে নিখিল। একা নীলাই কেবল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে, কী অর্থ এই জীবনের।

.

মলিনার ঘরে হঠাৎ ঢুকে নীলা মা মা বলে ডাকে। ডেকে সে চমকে ওঠে, খালি ঘর, একটি টিমটিমে প্রদীপ জ্বলছে ঘরের মাঝখানে। মলিনার বুকে মাথা রেখে তার শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল, সুশান্ত চলে যাবার পর যেমন শুয়েছিল। টেলিভিশনের বিকট শব্দ আর নিখিলের হা হা হাসির যন্ত্রণায় নীলা কুঁকড়ে যেতে থাকে, চিত্রা এসে নীলাকে প্রদীপের সামনে থেকে তোলে।

চিত্রা, মা কী বলতে চেয়েছিলেন?

তা আমি কী করে বলব দিদি।

 মুখে একটু জল চাইছিলেন? ওষুধ চাইছিলেন ব্যথা কমার?

তা কী করে বলব দিদি?

 মা কি আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছিলেন? ভয় পাচ্ছিলেন?

মৃত্যুর সময় কেমন লাগে, কী বলতে ইচ্ছে হয়, কী করতে, তা তো আমি জানি না দিদি! যাঁরা মরেছেন তাঁরা জানেন।

.

মলিনা নেই বলে কটি বিষাক্ত সাপ উঠে এসেছে উঠোনে, ফিরে যাচ্ছে না জলায় বা জংলায়। কাপড়ের ভাঁজে, টাকা পয়সার ড্রয়ারে, বালিশের নীচে, গেলাসে বাটিতে, ফুলদানিতে, চৌবাচ্চায়, জলকলের মুখে ইঁদুর আর তেলাপোকার বিশাল সংসার। মলিনা নেই বলে মাধবীলতাও আর ফুটছে না। দেয়াল ঘেঁষে যে রজনীগন্ধার গাছ ছিল, কামিনীর, মরে গেছে। গোলাপবাগানে গোলাপের বদলে শুধু কাঁটা আর পোকা খাওয়া পাতা। বুড়ো জাম গাছে বিচ্ছুদের বাসা, পেয়ারা গাছটি ঝড় নেই বাতাস নেই গুঁড়িসুদ্ধ উপড়ে পড়েছে। মিষ্টি আমের গাছে একটি আমও আর ধরে না, নারকেল গাছে না একখানা নারকেল। সুপুরি গাছেদের নাচের ইস্কুল এখন বন্ধ। মলিনা নেই বলে সবজির বাগান পঙ্গপাল এসে খেয়ে গেছে, সবুজ মাঠটি ভরে গেছে খড়ে, আগাছায়।

মলিনা নেই, মলিনার না থাকা জুড়ে দাপট এখন অদ্ভুত অসুস্থতার, নীলার শ্বাসরোধ করে আনে দুষিত বাতাস, মলিনার না থাকার দৈত্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে ঘাড়ে, মলিনার না থাকার শকুন ছিঁড়ে খাচ্ছে নীলার সর্বাঙ্গ, মলিনার না থাকার উন্মত্ত আগুন পুড়িয়ে ছাই করছে, মলিনার না থাকার সর্বগ্রাসী জল নীলাকে ডুবিয়ে নিচ্ছে। নীলাও মলিনার মতো নেই হতে চায়।

.

নেই হওয়ার নানা পথ আছে, মনিক ম্যাথুর বাড়ি যাওয়া নয়। কিন্তু নীলা মনিকের বাড়ি যায়।

মনিক মলিনার বয়সি। অথচ কী দিব্যি বেঁচে আছেন। হাত পায়ের প্রতিটি নখ নিখুঁত করে রাঙানো, চোখের পাতায় গাঢ় নীল রং, পাপড়িগুলোয় রঙের প্রলেপে উজ্জ্বল, গালে রং, ঠোঁটে রং, বাদামি চুলকে রাঙিয়ে সোনালি করেছেন, স্তন ফুটে বেরোচ্ছে এমন পাতলা জামা পরেছেন। নীলা কোনওদিনই মলিনাকে মুখে কোনও রং লাগাতে দেখেনি। ভয় ছিল, কালোর ওপর রং পড়লে কী জানি আরও বিদঘুটে না দেখায়। মনিক ঝটপট চা বানিয়ে আনলেন, চা খেতে খেতে বললেন, জীবনের অর্থ কী জানো? ডগলাস আদামস বলেছিলেন জীবনের অর্থ বিয়াল্লিশ, আমার মনে হয় ভুল বলেছিলেন, জীবনের অর্থ আসলে সাতচল্লিশ।

মনিক স্তন দুলিয়ে হাসেন। নীলার হাসি পায় না।

মনিক উচ্ছল উজ্জ্বল প্রাণবান মানুষ। বয়সে ছোট এক বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করেছিলেন, সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে দিল্লি চলে যাচ্ছেন এখন। আলিয়ঁজ ফ্রসেজে ফরাসি ভাষা শেখাতেন, ভাষা শেখানো ছেড়ে ফরাসি দূতাবাসে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন, তাই কলকাতার পাট চুকোতে হবে তাঁর। কিন্তু কলকাতার এই বাড়িটি বিক্রি করবেন করবেন করেও মন তাঁর সায় দিচ্ছে না।

কলকাতার মতো, বুঝলে নীলা, শহর হয় না! যদি বাস করার জন্য কোনও শহর চাও, তো কলকাতা।

নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তা তুমি কি ফিরে যাচ্ছ প্যারিসে? মনিক জিজ্ঞেস করেন।

নাহ।

দুটো জার্মান শেফার্ড ঘরে দাপট দেখিয়ে হাঁটে। লুলু আর ভুলু। বিদেশি কুকুরের বাংলা নাম!

মনিকের ওই প্রেমিক ছোকরাটি নাম রেখেছে। লুলুর গলায় ভুলুর পিঠে হাত বুলিয়ে মনিক ওদের খেলতে পাঠান বাগানে।

লুলু ভুলুকে নিয়েই আমার সংসার। অনেক পুরুষের সঙ্গে সংসার করে দেখেছি, কুকুরের সঙ্গে সংসার করায় আনন্দ বেশি। কারণ বিশ্বাস হল সবচেয়ে বড় ব্যাপার। মানুষ বিশ্বাস ভাঙে, কুকুর ভাঙে না। তুমি কুকুর পোষো?

নাহ।

নীলা তার মলিন মুখ আর উদাস দুচোখ নিয়ে বসে থাকে। সুতি একটি সাদা শাড়ি গায়ে, শাড়ির আঁচল গড়াচ্ছে মেঝেয়, উড়ো খুড়ো চুল, গালের ত্বক ফেটে চৌচির, নখে পুরনো রং আধখেচড়া হয়ে আছে।

মনিক অনেকক্ষণ তাকিয়ে নীলার দিকে, বলেন, তোমাকে দেখে একটা জিনিস আমার মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, তুমি অমর! কখনও মরবে না।

নীলা আগ্রহ দেখায় না মনিকের এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা শুনতে, কিন্তু মনিক বলে যান, চোখের সামনে কেউ মরলে তুমি এত কষ্টে কাতর হও যে মনে করতে ভুলে যাও, মানুষ লক্ষ লক্ষ প্রজাতির ভিড়ে একটি প্রজাতি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সহস্র কোটি গ্যালাক্সির ভেতর ছোট্ট একটি গ্যালাক্সিতে সহস্র কোটি সৌরজগতের ছোট্ট একটি সৌরজগতে ছোট্ট এক গ্রহে মানুষ নামক প্রাণী বাস করছি। তুমি একটি বিন্দুর মতো, আসলে একটি বিন্দুর মতোও না, তারও চেয়ে ক্ষুদ্র, ক ফুট লম্বা তুমি, আমার চেয়ে দু ইঞ্চি বেশি যদি হও, পাঁচ ফুট ছয়। আমার চেয়ে পাঁচ কিলো যদি কম হও, ষাট কিলো, এই বিশাল মহাজগতে কোথাও দেখতে পাও তোমার অস্তিত্ব? তোমার মায়ের? মানুষের চেয়ে ওই কাদাঘাঁটা কচ্ছপ বেশিদিন বাঁচে। প্রকৃতি এমনই। প্রকৃতিকে জয় করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা আসি, যাই। আমরা এমনি এসে ভেসে যাই। এক পলকে মানুষের আয়ু ফুরোয়। হিসেব করতে পারো বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীর এই মাটিতে কত কিছুর জন্ম হচ্ছে, কত কিছু বিলীন হচ্ছে। ডায়নোসর এককালে দাপটের সঙ্গে বেঁচে ছিল, কোথায় এখন তারা, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মানুষের অস্তিত্বও একসময় আর থাকবে না, মানুষের ইতিহাসই অতীতের গর্ভে গর্তে তলিয়ে যাবে। এই মহাজগতে আমরা কেউ না, কিচ্ছু না…

মনিকের সবুজ চোখদুটো উদাস।

উদাস চোখ নিমেষে চঞ্চল হয়। আচ্ছা তুমি কি পরজন্মে বিশ্বাস করো?

নীলা মাথা নাড়ে, সে বিশ্বাস করে না।

পরজন্মে বিশ্বাসীদের একটা সান্ত্বনা থাকে, এ জীবনে তো এ কাজটা করা হল না, পরের জন্মে না হয় করব। কিন্তু যদি বিশ্বাস করো জীবন একটিই, তবে অপেক্ষা কোরো না। যার যার জীবন তার তার। সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়, যা পাবে, সব গ্রহণ করবে। স্বার্থপর হবে নীলা, এ ছাড়া গতি নেই। লুফে নাও, গোগ্রাসে নাও।

মনিকের মুখ তিজেভির মতো চলে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে মখমলের সোফায় পা তুলে বসে বাগানের মিঠে রোদ্দুরে বিশ্বাসী কুকুরের খেলা দেখতে দেখতে, নীলা জানে, চমৎকার চমৎকার সব কথা বলা যায়।

হঠাৎই প্রসঙ্গ ছাড়া প্রশ্ন করে বসে নীলা, তোমার মা আছেন মনিক?

 আছেন। তুলুজের এক গ্রামে থাকেন। একানব্বই বছর বয়স।

বাড়িতে আর কে কে আছে?

 মা একাই থাকেন।

 একা?

হ্যাঁ একা।

তুমি গিয়ে থাকো না তোমার মার সঙ্গে?

আমার সময় কোথায়? আর মাও চান না ছেলেমেয়ে গিয়ে তাঁকে বিরক্ত করুক। যার জীবন তার নীলা।

স্বনির্ভরতার অহঙ্কার কে ছাড়তে চায়? বছরে একবার ক্রিসমাসের সময় মাকে দেখতে যাওয়া হয়। তাও সব বছর হয়ে ওঠে না।

তোমার মা একা পারেন রান্নাবান্না করতে? ঘর গোছাতে?

এখনও পারছেন। না পারলে বুড়োবুড়িদের সরকারি বাড়িতে চলে যাবেন, ওখানে দেখাশোনার লোক থাকবে।

.

অর্ধেক বেলা মনিকের বাড়িতে কাটিয়ে নীলা যখন বাড়ি এল, নিখিল জানাল, গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে কড়িকাঠে ঝুলে গত রাতে আত্মহত্যা করেছে মিঠু।

.

অ রভোয়া

মিঠুকে শুইয়ে রাখা হয়েছে মেঝেয়। লাল একটি শাড়ি পরানো হয়েছে। গলায় ফুলের মালা, কপালে চন্দন। পায়ে আলতা। মিঠু বেঁচে থাকতে নিশ্চয়ই এত সাজেনি। মিঠুর জন্য সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মিঠুকে সাজাও, খাটিয়া সাজাও।

লোক দেখতে এসে বলে যাচ্ছে, আহা কী নিখুঁত মুখ মেয়েটির। কী টিকোলো নাক! কী দীঘল কালো চুল। আহা চিবুকের তিলটি মেয়েকে আরও মায়াবী করেছিল। মেয়েটার স্বভাব চরিত্র, কী বলব, ফুলের মতো পবিত্র ছিল। মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটত, গুরুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে কোনওদিন কথা বলেনি, বেয়াদবি করেনি। লেখাপড়া জানা মেয়েরা আজকাল কি আর আদব কায়দা মানে! কিন্তু মিঠু মানত। মিঠু একা হাতে সংসারের সব কাজ করত, এত লক্ষ্মী ছিল!

নীলা দেখে মিঠুর মা বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছেন, কাঁদছেন কিন্তু সে কাঁদায় এক ধরনের তৃপ্তি আছে।

সাধনবাবু, মিঠুর বাবাও পাঞ্জাবির খুঁটে চোখের জল মোছেন, তাঁর কপালের দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো আগের মতো নেই। মিঠুকে নিয়ে এখন কারও আর দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন কেবল কেওড়াতলা, নিমতলা, এখন মুখাগ্নি, এখন ছাই। মিঠু এ জগৎ থেকে জন্মের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আগুনে পোড়া তার কালো শরীরের কালো ছাই নিয়ে সংসারে কেউ দুর্ভাবনার মধ্যে পড়বেনা। মিঠু আত্মহত্যা করে কালো হওয়ার অপমান থেকে যত না বাঁচল, ওর বাপ মাকে বাঁচাল আরও, ওর দাদাকেও বাঁচাল, ওর দাদা এখন দেখে শুনে ভাল পণ নিয়ে একটি মেয়ে বিয়ে করতে পারে।

.

মিঠুর এই মৃত্যু নীলাকে বাকরুদ্ধ করে আবার।

.

নীলাকে ঠেলে সজাগ করে অনির্বাণ জানতে চান কবে সে প্যারিস ফিরছে।

প্যারিস আর যাচ্ছি না। আমি এখানেই থাকব।

এখানে কোথায়?

এখানে এই কলকাতায়।

 কলকাতায় কোথায়?

এই বাড়িতে।

বিয়ের পর স্বামীর বাড়িই তোর বাড়ি। স্বামীর বাড়িতেই তোর সব অধিকার। বাপের বাড়িতে মেয়েরা বেড়াতে আসে, থাকতে না। অনির্বাণ ভারী গলায় ভারী কানুন টানেন।

নীলা তার ঘরটিতে চোখ বুলোয়। তার বিছানা বালিশ, তার বইপত্র, শাড়ি কাপড়, পুরনো চিঠি, তার শখের তানপুরা, হারমোনিয়ম সব এ ঘরেই। প্যারিসের সুটকেসের জীবনের মতো জীবন নয়, অনেক প্রসারিত।

কী কারণে নীলাকে প্যারিস যেতে হবে? কারণ হল আত্মীয়রা এমনকী পড়শিরাও কানাঘুষা করছেন, নীলা বুঝি স্বামী ছেড়ে দিয়ে এসেছে।

হ্যাঁ এসেছি। তো ওদের হয়েছে কী?

অনির্বাণ গলা ফাটিয়ে বলেন, ওদের কিছু হয়নি। হয়েছে আমার। আমার আর এ সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। বংশের মুখে চুনকালি দিতে চাস?

স্বামীর সঙ্গে যদি আমার না মেলে, তবে এ কি চুনকালি দেওয়া হল?

 হল। অনির্বাণ জোর দেন এই হল-য়।

এই সমাজে থাকতে হলে, সমাজের আর দশটা লোক যেন ভাল বলে সেভাবে থাকতে হবে। প্যারিসে স্বামীর বাড়ি ফিরে যা, নয়তো মিঠুর মতো আত্মহত্যা করে আমাদের মুক্তি দে। এই আমার শেষ কথা।

অনির্বাণ তাঁর শেষ কথা বলে চলে যাওয়ার পর নীলা বাথটাবের ঠাণ্ডা জলে শুয়ে থাকে অনেকক্ষণ। না, চোখে এক ফোঁটা জল নেই নীলার।

.

গভীর রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে, মলিনার খালি ঘরের খালি মেঝেয় শুয়ে একটি বাহু ছড়িয়ে দিয়ে সামনে, যেমন করে প্রায় রাতে এসে মলিনার গায়ের ওপর বাহু ছড়িয়ে, নীলা ঘুমোত, ফিসফিস করে বলে, মা তুমি নেই কেন? প্রদীপের আলোয় পিঠ করে শোয়া নীলার ছায়া বিশাল দৈত্য হয়ে তাকেই ছিঁড়ে খেতে আসে। নীলা সিদ্ধান্ত নেয় সে কলকাতা ছেড়ে যাবে।

মায়ের শ্রাদ্ধটা শেষ করেই যা। অনির্বাণ থেকে শুরু করে মলিনার কাছের দূরের সব আত্মীয় বলেন।

মলিনার শ্রাদ্ধে নীলার এতটুকু আগ্রহ নেই। লোক খাওয়ানো, পুরুত খাওয়ানো, এসবে সে কোনও যুক্তি দেখে না।

তোর মার আত্মা কষ্ট পাবে, এমন করিস নে।

নীলা হেসে বলে, মার কষ্ট সয়ে অভ্যেস ছিল, মার আত্মাও কষ্ট সইতে পারবে, এ কোনও ব্যাপারই না।

যাব বলে সুটকেস গোছানো হতে পারে, কিন্তু যাওয়া অত শিগরি হয় না। টিকিটের তারিখ ঠিক করো, ব্যাঙ্কের চেক ভাঙাও, টাকা তোলো, টাকা পাঠাও, নানান ঝামেলা।

পুরনো টিকিটে প্যারিস ফেরার যাত্রা বাতিল হয়ে গেছে, সুতরাং নতুন টিকিট করা চাই। শ্রাদ্ধ অব্দি যখন থাকতে চাইছে না, ঠিক আছে, অনির্বাণ নিখিলের হাতে টাকা দেন, সস্তায় কলকাতা প্যারিস টিকিট কিনতে।

নীলা পথ আটকায় নিখিলের। ও টাকা দিয়ে দাও, আমি কিনব টিকিট।

 টিকিট কিনবে টাকা কোথায় পাবে?

এ কথা গোপন থাকে না, মলিনা তাঁর বাবার সম্পত্তি যা পেয়েছিলেন, বিক্রি করে ব্যাঙ্কে রেখেছিলেন, ব্যাঙ্কের সেই কাগজপত্র মলিনার ড্রয়ারে নেই, নীলার হাতে।

কত টাকা?

 কুড়ি লক্ষ।

অনির্বাণ ধপাস করে বসে পড়েন। মাথায় হাত। এত টাকা কী করবি তুই? যা দরকার কিষানলাল দেবে। এ টাকা রেখে যা, সংসারের অনেক খরচা আছে। পুরনো বাড়ি, ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে।

এ বাড়ি তো আমার নয়, আমি এ বাড়ির কেউ নই। এ তোমাদের বাড়ি, তোমরা করো যা করার। আমার টাকায় লোভ কোরো না।

তুই কি জানিস যে আইনত এই টাকা তিন ভাগে ভাগ হবে। এক ভাগ কেবল পাবি তুই। আর কোথায় কোনও মেয়েকে শুনেছিস টাকা নিতে? সব মেয়েরাই তো ভাইকে দিয়ে দেয় নিজের ভাগ।

ভাগাভাগি করতে চাইলে মা আমার নামে লিখে দিতেন না।

লিখে দিলেই হবে। উত্তরাধিকার বলে একটা ব্যাপার আছে না?

উত্তরাধিকার বলে যে একটি ব্যাপার আছে তা অনির্বাণ মলিনার আত্মীয়দের বাড়িতে ডেকে নীলাকে বোঝাতে অনুরোধ করেন। মলিনার দিদি, জামাইবাবু, দাদা, বউদি এমনকী মঞ্জুষাও এসে মাথা নেড়ে সায় দেন, যে উত্তরাধিকার বলে একটি ব্যাপার আছে। স্বামীর ঘরে যদিও জীবন পার করে, মেয়েরা কি বাপ ভাইকে ভুলে থাকে? থাকে না। পারলে জীবন দেয়। বাপ মায়ের সম্পত্তির কিছুর ওপর কোনও মেয়েরা লোভ করে না। লোভ করলে লোকে ভাল বলে না, মেয়েদের আর কিছু থাক, লোভ থাকা মানায় না। মেয়েরা হবে নির্লোভ, নিঃস্বার্থ নির্দোষ, নিষ্পাপ, নির্বিরোধ, নিবেদিত, নিখাদ, নিভৃত, নির্মল, নিরহঙ্কার, নির্ঝঞ্ঝাট…

মলিনারও কাণ্ড, মাথার ঠিক ছিল না, কী করতে কী করেছেন, এসব কি ধরতে আছে! না কি এ সই মলিনার নয়, হবে হয়তো, মলিনাকে ফুসলিয়ে বা নিজেই নকল সই দিয়ে কাজগুলো নীলা তলে তলে করেছে। আর যদি সই সত্যিকার সই-ই হয়, এত টাকা প্যারিস নিয়ে নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। কিষানলাল তো আর এমন নয়, যে টাকা কম কামায়, দুটো রেস্তোরাঁর ব্যবসা, বহাল তবিয়তে আছে। আর যদি গোঁই ধরে, ঠিক আছে, টাকা কলকাতার ব্যাঙ্কে রেখে দিক, বিপদ আপদের কথা তো বলা যায় না, নয়তো এখানে একটা বাড়ি কিনে রাখুক, ভাড়ার টাকা নীলার ব্যাঙ্কে জমা থাকবে। লোকে বিদেশ গিয়ে টাকা রোজগার করে দেশে টাকা পাঠায়। কেউ দেশের টাকা বিদেশে খরচার জন্য নেয় না।

নীলা কি পাগল?

নীলা বলে, হ্যাঁ সে পাগল।

পাগলকে কে সামাল দেবে!

 নীলার ধারণা, দেখতে খারাপ দেখায় বলে, অনির্বাণ নিখিলকে পরামর্শ দেননি নীলার বিরুদ্ধে মামলা করতে। মাঝে মাঝে সমাজের চোখের কারণে অনেক অন্যায়কেই থাবা গুটোতে হয়। এতে কপাল ভাল থাকলে বেঁচে যাওয়া যায়, নীলা যেমন বাঁচে। তবে ব্যাঙ্কগুলো নীলার জুতোর সুকতলি খসিয়ে ছাড়ে, মাড়োয়ারি ব্যাঙ্কারের মুখে প্রতিদিন খই ফোটে, এত টাকা দেশ থেকে চলে যাবে, এ কি মুখের কথা, কেন যাবে, কোথায় যাবে, কী কারণ, এত টাকা কোত্থেকে এল, করের কাগজ কোথায়, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমতি নিয়ে এসো, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানো হচ্ছে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

জুতোর সুকতলি খসিয়ে অন্তত একটি ব্যাপার নীলা সম্ভব করতে পারে, হাজার পঞ্চাশেক টাকা সে তুলতে পারে, বাকিটা তার প্যারিসের ব্যাঙ্কে পাঠাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ঠিকঠিক জমা দিতে পারে, যদিও কবে টাকাটা প্যারিস পৌঁছবে, সে সম্পর্কে মাড়োয়ারি সঠিক কিছু বলতে পারেনি। অনিশ্চয়তার হাতে ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে নীলা টিকিট কেনে।

প্রতিদিন বিমান যায় না কলকাতা থেকে প্যারিস, গেলে নীলা সেদিনই কে এল এম-এ চড়ে বসত। দিল্লি বোম্বেতে যে সুবিধে তা কলকাতায় নেই। দিন দিন পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে পড়ছে ভারতের আর সব রাজ্য থেকে। এখানকার বাঙালি বাবুরা বাণিজ্যে মন না দিয়ে লেখাপড়ায় মন দেন বেশি, রাজনীতিও ভিন্ন, সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার, যে দলই কেন্দ্রে যায়, চুলের মুঠি ধরে সমাজতন্ত্রকে নামাতে চায় পশ্চিমবঙ্গের মঞ্চ থেকে, আর নামাতে গেলে রাস্তাঘাট থাকা চাই ভাঙা, কলকারখানা থাকা চাই অচল, বিমানবন্দরে চাই যত কম বিমান, অর্থনীতি ধসিয়ে সমাজতন্ত্র ভাঙার ঝনঝন শব্দ শুনতে কান পেতে আছে কেন্দ্রের বাবা।

.

দু সপ্তাহ অপেক্ষা করা ছাড়া নীলার গতি নেই। দু সপ্তাহ নীলার কাছে দু বছর মতো সময় মনে হয়। নীলা পালাতে চায় এই নোংরা সমাজ থেকে। কলকাতাকে তার আর আপন মনে হয় না, এ শহরে তার জন্ম, এ শহরে কেটেছে তার শৈশব কৈশোর, অথচ এ শহরকেই তার মনে হতে থাকে সবচেয়ে অচেনা, যেন এ শহরের সঙ্গে কোনওদিন তার কোনও ভাব ছিল না, এ শহরের ধুলোয় শরীর মেখে সে খেলেনি কোনওদিন, গঙ্গার হাওয়ার সঙ্গে মনে মনে তার কোনওদিন কোনও কথা হয়নি। কলকাতা এখন নীলার কাছে আস্ত একটি শ্মশান, যে শ্মশানে দাঁড়িয়ে প্রতিরাতে একটি কুকুর কাঁদে, আর কোণে নেশাগ্রস্ত পড়ে থাকে চিতা জ্বালানোর কজন লোক। কলকাতা ছিল মলিনার ধনেখালি শাড়ির আঁচল, যে আঁচলে ঘাম মুছে, চোখের জল মুছে দাঁড়িয়ে থাকতেন মলিনা, দরজায়। কলকাতা ছিল মলিনার গভীর কালো চোখ, যে চোখ ডানা মেলে উড়ে যেত, রোদ্দুরে, রাত্তিরে, যেখানেই নীলা ভাসে, ডোবে, পাড় পায়, খুঁজত নীলাকে। কলকাতা ছিল মলিনার এলো চুলের হাতখোঁপা, ভেঙে পড়ত, হেলে পড়ত, রাজ্যির শরম ঢাকত নীলার। কলকাতা ছিল মলিনার হাতে সর্ষের তেলে মাখা মুড়ি, মেঘলা দিনে ভাজা ইলিশ, ভুনি খিচুড়ি। কলকাতা ছিল মলিনার হাতের ছ জোড়া রঙিন চুড়ি। কলকাতা ছিল বাড়ির আঙিনায় মা মা বলে ডাকার আনন্দ। কনকনে শীতে মলিনার কাঁথার তলে গুটিসুটি শুয়ে পড়া, ভোরবেলা শিউলি ছাওয়া মাঠে বসে ঝাল পিঠে খাওয়া, অন্ধকারে মুড়ে, দূরে, নৈঃশব্দ্যের তলে মাটি খুঁড়ে কলকাতাকে পুরে, পালিয়েছে কারা যেন, কলকাতা বলে কেউ নেই এখন, কিছু নেই নীলার। খাঁ খাঁ একটি শ্মশান সামনে, একটি কুকুর, আর কজন নেশাগ্রস্ত লোক।

ফোঁসকা পড়া গরমে ঘেমে নেয়ে মনিকের ছায়ায় মায়ায় আশ্রয় নেয় নীলা।

 কলকাতার নয়, ফরাসি দেশের গল্প বলো মনিক।

মনিক লাল অমৃতে ডুবে ফরাসি দেশের গল্প বলেন। অলস দুপুর জুড়ে লুলু ভুলু বারান্দায়, মনিকের গাড়ির চালক সুরঞ্জিত আগুনের হলকা থেকে গা বাঁচাতে গাছের ছায়ায়, রাঁধুনি বিন্দিয়া গুনগুনাচ্ছে, বিনুনি বাঁধছে, মালি হরিদাস লুলু ভুলুর পাশে গল্প বলা দাদার মতো শুয়ে আছে। আর ঠাণ্ডা ঘরে বসে মনিকের সবুজ চোখ ঝলমলিয়ে ওঠে গল্প বলতে বলতে। দক্ষিণ ফ্রান্সের শাতো মনতান-এ তার পূর্বপুরুষের বাস ছিল, এখনও সেই শাতোয় গিয়ে সেই হরিণ মাথার দিকে, সেই নিখুঁত তাপেসিরি পলকহীন চোখে দেখে। মনিকের প্রতি লোমকুপ থেকে ছিটকে বেরোতে থাকে আভিজাত্যের অহংকার। পরক্ষণেই, শাতো মনতান ভেঙে পড়ার নির্মম দৃশ্য কল্পনা করে তাঁর লোমকূপ বুজে যেতে থাকে, বাস্তিল ভাঙার দৃশ্য যেন তিনি নিজের চোখে দেখছেন, বিপ্লবের বিকট চিৎকার যেন নিজের কানে শুনছেন, কেঁপে ওঠে মনিকের স্তনজোড়া, ভয়ে।

তারপর তো ওই, ইগালিতে। ইগালিতে শব্দটি দুবার উচ্চারণ করেন তিনি।

.

আমি কাল দিল্লি যাচ্ছি তিনদিনের জন্য, কিন্তু বিষম দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এই তিনদিন লুলু ভুলুকে খাওয়ানোর লোক পাচ্ছি না। মনিকের চোখে শ্যাওলা রঙের দুশ্চিন্তা।

তুমি এ কাজটা করবে নীলা? তোমাকে আমি চাবি দিয়ে যাচ্ছি। দেখিয়ে দিচ্ছি কোথায় খাবারগুলো রাখা, রেফ্রিজারেটরে কিছু, বাইরে কিছু, দু বোতল বিশুদ্ধ জল। তিনবার জল বদলাবে, আর খাবার দেবে দু বেলা।

নিশ্চয়ই করব। এ কোনও ব্যাপার হল! কিন্তু…

কিন্তু কী?

বিন্দিয়া, হরিদাস, আর ওই সুরঞ্জিত,ওরা থাকছে না?

তা থাকছে।

মনিক সিগারেট ধরান। ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে দেয়ালে টাঙানো সুনীল দাসের ঘোড়ায়, বলেন, থাকছে কিন্তু…

কিন্তু কী?

কিন্তু আমার লুলু ভুলু তো এখানকার কুকুরদের মতো আবর্জনা খায় না, ফেলে দেওয়া হাড় হাড্ডিও খায় না। ওদের জন্য প্যারিস থেকে প্যাকেটের খাবার আসে।

তো?

আমার সন্দেহ হয়, ওরা লুলু ভুলুকে খাওয়াবে না। মনিক গলা নিচু করে বলেন।

নীলা উৎসুক জানতে, খাওয়াবে না কেন?

কারণ ওরা নিজেরা ও খাবার খেয়ে ফেলবে।

 নিজেরাই খেয়ে নেবে? বলো কী! কখনও খেয়েছে আগে?

খায়নি।

তবে?

খেতে পারে।

বিশ্বাস কী! খেতে পারে।

.

নীলা বিষম এক বিবমিষা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

বাড়ির উঠোনে সেদ্ধ ভাত ছড়িয়ে নিখিল আকাশে তাকিয়ে কা কা কা কা করছে।

কা কা শব্দ শুনে কাক এসে ছড়ানো ভাত খাবে, তারপর নিখিল খাবে। মাতৃদায় সহজ জিনিস নয়, কাককে খাইয়ে তবে নিজে খেতে হয়।

নিখিলের পেছনে দাঁড়িয়ে নীলা বলে, আচ্ছা তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে মা কাক হয়ে গেছেন?

পাগল নাকি তুই? নিয়ম, তাই করতে হয়। নিখিল আকাশ থেকে মুখ না ফিরিয়ে বলে।

নিজেকে কমুনিস্ট বলো, আবার তারাপীঠের মন্দিরে গিয়ে ফুল দাও, খাবার আগে কাক খাওয়াও! মেলে না কিছু। নীলা মরা সবজি বাগানে একটি পচা টমাটো পায়ে চটকে বলে।

শুনে নিখিল শুকনো ঠোঁটে হাসে। নীলা টেনে নিয়ে যায় নিখিলকে ঘরের ভেতর। গলার ধড়া খুলে নেয় এক টানে, ইস কী অবস্থা, এই পরেই স্নান করছ, গায়েই এই কাপড় শুকোচ্ছ! জামা পরো তো, খোলো এসব। এভাবে মায়ের ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। যত্তসব অদ্ভুত রীতি। যাও স্নান করে এসো, জামা জুতো পরে এসো, চলো কোনও ভাল রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেয়ে আসি।

বাদ দে। আর কটা দিন মাত্র আছে। নিখিল ক্লান্ত গলায় বলে। সে যাবে না কোথাও, সেদ্ধ শাকান্নই খাবে।

তবে কাকের আগে নিজে খাও। নীলা নিখিলের মুখের ভেতর খাবার ঠেলে দেয়।

খেয়ে, ঘরের গুমোট গরম থেকে বেরিয়ে মাঠে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে নিখিল। চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে।

নীলাও পাশে এসে বসে।

দাদা সত্যি করে বলো তো, তুমি কি এই ধর্ম কর্ম হিন্দু আচার এসব আসলেই বিশ্বাস করো?

এসব কি বিশ্বাসের জিনিস?

তা হলে করো কেন?

 এক ধরনের মজা আছে এসবে।

 মজা? আমি তো কোনও মজা দেখি না। যুক্তিহীন জিনিস সব। ফালতু আবেগ।

 ধর, আজ যদি পুজো উঠে যায়, তোর কি ভাল লাগবে? খালি খালি লাগবে না? উৎসবের আনন্দ আর কোথায় পাবি।

তোমার মনে আছে দাদা, এই মাঠে আমরা যখন লুকোচুরি খেলতাম, তুমি ওই বেদিটার পেছনে বেশির ভাগ সময় লুকোতে! আর তোমাকে সবার আগে খুঁজে পেতাম আমি।

তোর লুকোনো ছিল অন্যরকম। আমগাছের মগডালে।

মনে আছে সেই প্রফুল্লদের বাড়ির পেয়ারাগাছের কথা? তুমি গিয়ে সব পাকা পেয়ারাগুলো চুরি করে আনলে..আর প্রফুল্ল বাবার কাছে বিচার নিয়ে এল।

নিখিল হা হা হাসে।

 কেমন লেগেছিল বাবার পিটুনিগুলো? উফ।

আর রাতে, পূর্ণিমা রাতে, এত বাড়িঘর ওঠেনি তখন আশপাশে, মা মাঠে বসে রজনীকান্তের গান গাইতেন, সে কী চমৎকার গানের গলা ছিল মার…

অনেকক্ষণ দুজনের কেউ কোনও কথা বলে না।

সূর্যাস্তের আকাশের লালচে রঙের দিকে উদাস তাকিয়ে নীলা নীরবতা ভাঙে, জানো দাদা, মা একদিন ফিরে আসবেন। ফিরে কলতলায় পায়ের কাদা ধুতে ধুতে বলবেন, হঠাৎ দার্জিলিং গিয়েছিলাম, তোরা সব ভাল ছিলি তো! দার্জিলিঙের গল্প শোনাতে শোনাতে মা আমাদের খাওয়াবেন রাতে, নেপথলিনের গন্ধঅলা লাল পাড় শাড়ি পরে এই মাঠে বসে মা আমাদের আগের মতো গান শোনাবেন…

নীলা চকিতে উঠে দাঁড়ায়, বলে, আজ রাস্তায় দেখলাম, পঁচাশি বছরের এক বুড়ো হেঁটে যাচ্ছে। ওর কী দরকার ছিল বেঁচে থাকার। কাউকে বাঁচতে দেখলে অসম্ভব রাগ হয় আমার। পৃথিবীর সব গাছ যদি মরে কাঠ হয়ে যেত, পাহাড়গুলো ধসে যেত বাড়িঘরের ওপর, নদী সমুদ্র শুকিয়ে চর হয়ে যেত, সেই চরে পশুপাখি মানুষ এক বিষম অসুখে কাতারে কাতারে মরে যেত! আর এই কুৎসিত পৃথিবীটা যদি মহাকাশে ছিঁড়ে পড়ত হঠাৎ, সুর্যের দু হাত কাছে গিয়ে ঝলসে যেত, ছাই হয়ে যেত।

নীলা খেয়াল করে তার গা কাঁপছে। শিথিল হয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীর। নিখিলের পাশে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে সে, ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, জানো দাদা, আমার খুব একা লাগে। ভীষণ একা লাগে।

তুই কি সত্যি প্যারিস চলে যাচ্ছিস?

আমার কি না যেয়ে উপায় আছে, দাদা?

কবে ফিরবি?

 কোথায়?

কোথায় আবার? কলকাতায়।

 নীলা উত্তর দেয় না।

বাবার কথায় রাগ করেছিস তো! তুই চলে গেলে আবার ঠিক ঠিকই ভেবে মরবেন, কেমন আছিস ওখানে, সুখে আছিস তো!

সুখ! দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে সুখ শব্দটি।

বাবা জানেন না কিষানলাল যে বিয়ে করেছিল আগে। আমি সেদিন মাত্র জানলাম, সুনীল বলল। কাউকে বলিনি।

বোলো না। কী দরকার। বাবা আবার চুনকালির ভয়ে অতিষ্ঠ হবেন।

তুই সে কারণেই কিষানকে ছেড়ে গিয়েছিলি, তাই বলল সুনীল। ও বিয়ে নাকি অনেকটা পাতানো বিয়ে ছিল, নাগরিকত্ব পাবার জন্য। ওটাকে ধরিস না।

ধরছি না।

এবার গিয়ে ভাল একটা শ্যানেল পাঠাস তো, আগে যেটা পাঠিয়েছিলি, নকল ছিল।

নকল কী করে বুঝলে?

মোটে গন্ধ নেই। কলকাতা থেকে যে শ্যানেল কিনি, ওতে কড়া গন্ধ থাকে।

আমি যেটা পাঠিয়েছিলাম, সেটাই আসল শ্যানেল।

ওটা কবেই ফেলে দিয়েছি।

 আসল ফেলে নকলটা ব্যবহার করছ তো! আমার অতগুলো টাকা জলে ফেললে।

নীলার ভাল লাগছিল ওভাবে ঘাসে শুয়ে থাকতে। ফুরফুরে হাওয়ায় নীলার চুল উড়ছিল। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে ঘরে ফিরছে। পাঁচিলের ওপর প্রতিবেশীর দুটো বেড়াল বসে ছিল, ওরাও লেজ গুটিয়ে ফিরে যাচ্ছে।

নিখিলও একসময় বলে, যাই ইন্টারনেটে চ্যাট করি গিয়ে।

নীলা শুয়ে থাকে ঘাসে। আকাশে একটি একটি তারা ফুটতে থাকে, আর নীলা একটি উজ্জ্বল তারা খোঁজে। নীলা যখন ঘোট, মলিনা একবার বলেছিলেন, মানুষ মরে গেলে আকাশে তারা হয়ে ফুটে থাকে।

.

নীলার যাবার দিন, মঞ্জুষা এসে নীলার সুটকেস গুছিয়ে দিতে দিতে বারবারই বলেন, মানিয়ে থাকিস কিষানলালের সঙ্গে। বিয়ে তো তোকে জোর করে কেউ দেয়নি, তোর নিজের ইচ্ছেতেই হয়েছে।

অনির্বাণ প্যারিসে ফোন করে কিষানলালকে জানিয়ে দেন নীলা কখন কটায় গিয়ে পৌঁছবে। পিতার কর্তব্য করেন তিনি।

বিমানবন্দরের ভেতরে ঢোকার আগে, নিখিল পকেট থেকে একটি কৌটো বের করে নীলার হাতে দেয়, এটা রাখ।

কী এটা?

মার ছাই।

 মা আমার কাছে মা, ছাই নয়। নীলা ফিরিয়ে দেয় কৌটো।

.

বিমানে ঢুকে চেয়ারে হেলান দিয়ে কলকাতাকে অ রভোয়া বলে নীলা।

তারপর জিজ্ঞেস করে নিজেকে, নীলা তুমি জানো তুমি কোথায় যাচ্ছ? কার কাছে যাচ্ছ?

নিজেকেই উত্তর দেয় সে, না।

তুমি কি জানো তোমার এই জীবন নিয়ে কী করবে তুমি?

 না।

.

বেনোয়া দুপঁ

দমদম থেকে শার্ল দ্য গোল।

 মাঝখানে বেনোয়া দুপঁ ঘটে যায়।

নীলা বসেছিল জানালার ধারে, পাশের আসনে বেনোয়া। সোনালি চুলের বেনোয়া। নীল চোখের বেনোয়া। গোলাপি ঠোঁটের বেনোয়া। ফরাসি যুবক বেনোয়া। ছ ফুট তিন ইঞ্চি বেনোয়া। নীল জিনস বেনোয়া। সাদা টিশার্ট বেনোয়া। কালো বুটজুতো বেনোয়া। ম্যাক ল্যাপটপ বেনোয়া।

.

চোখে চঞ্চলতা বেনোয়ার, বারবার নীলায়, নীলার উদাস চোখে, এলো চুলে, গালের কালো তিলে, কপালের ছোট্ট কাটা দাগে। মাথার ওপরের ছোট আলো ল্যাপটপে আর বেনোয়ার চোখের আলো নীলায়, জানালায় মাথা রেখে বাইরের অদ্ভুত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা নীলায়। অন্ধকার সরিয়ে উজ্জ্বল একটি তারা খোঁজা নীলায়।

সাদা মেঘবালিকারা পাখির মতো উড়ে উড়ে যাচ্ছে কোথাও, বাড়ি ফিরছে! সবাই বাড়ি ফেরে, মেঘেরাও, কেবল নীলাই ফেরে না।

রাতের খাবার নিয়ে এলে, নীলা বলে দেয় সে খাবে না।

 বেনোয়া শুরু করে এভাবে, অন্ধকারে কী দেখছেন এত?

আমাকে বলছেন?

 হ্যাঁ আপনাকেই।

 ম্লান হেসে বলে নীলা, অন্ধকারে অন্ধকার দেখছি।

 অন্ধকারে কিছু কি দেখা যায়?

 যায়, অন্ধকার দেখা যায়।

অদ্ভুত।

অন্ধকারেরও রূপ আছে। অন্যরকম।

 বেনোয়া শ্যাম্পেন পান করে ধীরে। বলে, আমার দেখা হয়নি কোনওদিন।

.

শ্যাম্পেন শেষ করে খাবার খেতে খেতে বেনোয়া আবার বলে, এই বিমানে সম্ভবত আর কেউ নেই যে কিছু খাচ্ছে না, পান করছে না। কেবল অন্ধকার দেখছে।

নীলা ফেরে না।

প্যারিস যাচ্ছেন বেড়াতে?

 নীলা ফেরে না।

দুঃখিত, আমি বোধহয় আপনাকে বিরক্ত করছি।

নীলা ফেরে, কিছু বলছেন আমাকে?

 প্যারিস যাচ্ছেন বেড়াতে?

নাহ!

তবে?

 থাকতে।

প্যারিসে কী করছেন, লেখাপড়া?

না।

 চাকরি?

না।

 বেনোয়ার চোখে নীল কৌতূহল, তার চোখের নীল মণির সঙ্গে গাঢ় নীল হয়ে সেঁটে থাকে।

ওখানে কি একা থাকেন? না কি সংসার আছে?

নীলা উত্তর দেয় না।

ওখানে আত্মীয় আছে?

 নীলা মাথা নাড়ে। নেই।

তবে কে আছে?

কেউ নেই।

তাহলে বলুন একা থাকেন ওখানে।

 খাওয়া শেষ হওয়ার পরও বেনোয়া লাল ওয়াইনের নতুন বোতল নেয়।

আমি বেনোয়া দুপঁ।

 নীলা মাথা নাড়ে, শুনেছে সে যে সে বেনোয়া দুপঁ।

 আপনি? আপনার নাম?

 নীলা।

 নীলা, দ্যা ভারতীয় সুন্দরী।

.

নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারে, বেনোয়া দুপঁ তার সঙ্গে কথা বলতে চায় আরও। এরকম হয়, দীর্ঘ বিমানযাত্রায় একঠায় বসে থাকা ক্লান্তিকর বলে পাশের যাত্রীকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে, কেন যাওয়া হচ্ছে, কী করা হয়, কোথায় থাকা হয়, বিয়ে হয়েছে কি না, বিয়ে হলে বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে কি না, বাচ্চা কাচ্চা হলে বয়স কার কত, কী খেতে পছন্দ, কী গান পছন্দ, কোনও বিশেষ শখ আছে কি না, থাকলে কী, যদি কোনও বইয়ে চোখ বুলোতে থাকে পাশের জন, কী বই এটা, কার লেখা, এই লেখক আর কী বই লিখেছে, কোনটা তার পড়া হয়েছে, কোনটি হয়নি জিজ্ঞেস করে বারো ঘণ্টার যাত্রাকে কমিয়ে অন্তত দু ঘণ্টায় আনা যায়। বেনোয়া দুপঁ এই একঘেয়ে বসে থাকার চেয়ে পাশের রহস্যময়ীর রহস্য উদ্ধারে ব্যস্ত হতে চাইছে। গতবার প্যারিস যাওয়ার সময়, নীলার পাশের আসনে বসে থাকা ওলন্দাজ মেয়েকে নীলা এরকমই প্রশ্ন করেছিল, যত না একঘেয়েমি কাটাতে তার চেয়ে বেশি সাদা রঙের আকর্ষণে, সাদা রং কী করে, কী খায়। বয়স তেতাল্লিশ গাব্রিয়েলার, পাঁচ বছর ধরে ভারত থেকে কাপড় কিনে নিয়ে যায় নিজের দেশে বিক্রি করতে, কেবল কাপড় নয়, পাথরের মালা, দুল, আগরবাতি, শিবমূর্তি। কত টাকায় কেনে, কত লাভ হয়, কত টাকা বাড়িভাড়া দিতে হয় তার, কত টাকা খাওয়ার খরচা, কত যায় ভ্রমণে এসবের হিসেবও দিয়েছিল, আরও ব্যক্তিগততে গিয়ে বলেছিল, বিয়ে থা করেনি সে, একা থাকে, তবে একেবারে একাও নয়, মাঝে মাঝে প্রেম হয়, প্রেমিকের সঙ্গে দুবছর একবছর কাটানোও হয়, গাব্রিয়েলার শেষ প্রেমিক ছিল আবু নাসের, মিশরের ছেলে, মাস দুই পর নাসেরকে সে বলেছে ব্যস, যথেষ্ট হয়েছে, এবার বিদেয় হও, নাসের বিদেয় হওয়ার লোক ছিল না, শেষে পুলিশ ডেকে বিদেয় করতে হয়েছে। তারপর গভীর ব্যক্তিগততে গিয়ে বলেছিল, নাসের দুমিনিটে কাত। হা হা। কখনও গেছ আমস্টারডামে? না। কী আছে দেখার? পতিতা। পতিতা দেখার জিনিস? নিশ্চয়ই। রাস্তার কিনারে সারি সারি কাচের ঘরে পতিতারা উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে, তাই দেখতে লক্ষ লোকের ভিড় হয় ও শহরে। নীলা ওয়াক করে। আর কী আছে দেখার? আর দেখার আছে স্বাধীনতা। কী রকম? উড়ে বেড়াবার। মারিহুয়ানার ধোঁয়া পিঠে দুটো পাখা বসিয়ে দেয়, তারপর শহর জুড়ে উড়ে বেড়াও, নেচে বেড়াও হা হা। বিমান থামলে সেই গাব্রিয়েলা বাই বলে নেমে গেল, পেছন ফেরেনি, নীলার ঠিকানাও নেয়নি, নিজেরটিও দেয়নি। প্যারিস থেকে কলকাতা যাবার পথেও প্রায় ওরকম হয়েছিল। নীলার পাশে এক শিখ যুবক তার জীবনের শুরু থেকে শেষ অব্দি নিজের জীবনের সব গল্প বলে নীলার গল্প শুনে গুরুনানকের জীবনের নানা দর্শন বর্ণনা করে কলকাতায় নেমে গেল। নীলা জানে ওই শিখের সঙ্গে নীলার আর কখনও দেখা হবে না, শিখের নামটিও নীলার জানা হয়নি। সে জানে নাগাড়ে বারো ঘণ্টা বসে থাকাকে কেবল বসে থাকা যেন না মনে হয় সে কারণে গল্প বলা এবং শোনা।

জানে বলে এ যাত্রায় নীলা কোনও আগ্রহ দেখায় না বেনোয়ার লাগামছাড়া উৎসাহের।

বেনোয়া এই প্রথম ভারতে এল, ভারতের দিল্লিতে নেমেছিল, আগ্রা ঘুরে চন্দননগর গেছে, চন্দননগর থেকে কলকাতা, ওখানে দুদিন কাটিয়ে ফিরে যাচ্ছে প্যারিসে। ভালয় ভালয় ফিরছে, অসুখ বিসুখ কিছু করেনি। অবশ্য প্যারিসের ডাক্তার তাকে ভারতে যাবার আগেই ম্যালেরিয়া থেকে শুরু করে যত রোগ শোক আছে পৃথিবীতে সব কিছুর প্রতিরোধক দিয়েছিল। আফ্রিকা যাবার বেলাতেও তাই হয়েছিল বেনোয়ার। 

আমার তো কোথাও গেলে ওষুধ লাগে না। আপনার লাগে কেন?

 আমাদের লাগে।

 আপনাদের মানে?

ইয়োরোপিয়ানদের। সাদাদের।

ও।

.

আচ্ছা, ভারতীয় মেয়েরা এত সুন্দরী হয় কেন?

 নীলা চমকায় প্রশ্ন শুনে। কিন্তু এটিই প্রশ্ন বেনোয়ার, ভারতীয় মেয়েরা কেন এত সুন্দরী!

কই আমি তো সুন্দরী নই!

 বেনোয়া হাসে।

ভারতীয় মেয়েদের যে এত মিথ্যে বলার অভ্যেস আছে, তা অবশ্য আমার জানা ছিল না।

বেনোয়া তার ভারত সফরে কোথায় কত মেয়ে দেখেছে, এবং কোথায় কোন মেয়েকে দেখে মনে হয়েছে, ভগবান নিজের হাতে তৈরি করেছেন, এবং রাস্তায় ভিখিরি মেয়েদের থেকেও সে চোখ ফেরাতে পারেনি, এসব বলে বলে নীলাকে বাইরের অন্ধকার থেকে ফেরায় এবং শেষে একটি কথাই জোর দিয়ে বলে যে এ তার অনেক বড় সৌভাগ্য যে সে একজন ভারতীয় মেয়ের পাশে বসে আছে এবং কথা বলছে। কিন্তু সে একাই বকবক করছে, নীলা যদি কেবল হ্যাঁ না বা আচ্ছা ছাড়া আরও কিছু বলে, কিছু পূর্ণ বাক্য টাক্য, বেনোয়া দুপঁর জীবন সার্থক হবে।

আমি সুন্দরী হব কেন? আমি তো সাদা নই।

সাদা মেয়েরা বুঝি সুন্দরী? সাদা মেয়েরা ফ্যাকাশে। দেখেছেন কেমন কুৎসিত ভঙ্গিতে হাঁটে, ফ্যাসফ্যাস করে কথা বলে। বুক চিতিয়ে, ঘাড় উঁচিয়ে, দেখতে কেমন উটের মত লাগে। এদের সঙ্গে ঘুমোনো যায়, কিন্তু প্রেম করা যায় না। বেনোয়া ঝুঁকে বলে, নীলার দিকে।

তাহলে এ অব্দি কোনও সাদা মেয়ের প্রেমে পড়েননি?

প্রেমে পড়েছিলাম এক ইথিওপিয়ার মেয়ের। আগুনের মতো সুন্দরী। কিন্তু সে মেয়ে,… গন উইদ দ্য উইন্ড।

প্রেম করলে ভারতীয় মেয়ের সঙ্গে করব। এ আমার সিদ্ধান্ত। বেনোয়া চোখ টেপে।

ভারতীয় মেয়ে পাবেন কোথায়? ভারতে তো থাকেন না।

না থাকি। প্যারিসে কি ভারতীয় মেয়ের অভাব আছে?

 যারা আছে সবাই বিবাহিত।

 আপনিও কি বিবাহিত?

আমিও।

বেনোয়ার কপাল ভাঁজ পড়ে সাতটা।

তবে যে বললেন কেউ নেই আপনার?

 আমি স্বামীর সঙ্গে থাকি না। তাকে আমার কেউ বলে মনে হয় না।

 বেশ জটিল ব্যাপার।

বেনোয়া এরপর নিজের বিয়ের কথা বলে, নিজে সে বিয়ে করেছে এক সাদাকে। একটি মেয়ে আছে, জ্যাকলিন, তরতর করে বড় হয়ে যাচ্ছে।

আপনার বয়স কত নীলা? কুড়ি পার হয়নি নিশ্চয়ই।

সাতাশ।

সাতাশ? দেখে, উনিশ মতো লাগে।

আপনার কত?

পঁচিশ।

 পঁচিশ? নীলা অবাক হয়।

 কেন দেখে কি বেশি বয়স লাগে? কত ভেবেছিলেন?

নীলা ভেবেছিল বিয়াল্লিশের নীচে নয়। কিন্তু কমিয়ে বলে তিরিশ কি বত্রিশ।

 শুনে হা হা হাসে বেনোয়া, রীতিমতো বুড়ো বানিয়ে ফেলেছিলেন।

কপালে সাতটা, চোখের কোণে চার দ্বিগুণে আট মোট পনেরোটা ভাঁজ, কী করে সে ভাববে বিয়াল্লিশ নয়।

.

বিমানের ভেতর আলো নিবে যায়, ব্যাস চেয়ার পেছনে হেলিয়ে ঘুমিয়ে যাও সব। ঘুম না এলে টেলিভিশনে বোবা ছবি দেখো, শব্দ শুনতে চাইলে চেয়ারের হাতলে লাগানো শব্দ যন্ত্র কানে লাগিয়ে শব্দ শোনো।

টেলিভিশনের শব্দ শুনতে না চাও, গান শোনো। বেনোয়া ছবিও দেখবে না, শব্দ যন্ত্রও কানে লাগাবে না, গান শুনবে না, ঘুমোবেও না। একটির পর একটি লাল ওয়াইনের বোতল শেষ করছে আর বলছে, পাসকালের সঙ্গে তার চার বছর আগে বিয়ে হয়েছে, প্রথম প্রথম বেশ উত্তেজনা ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন যেন একঘেয়ে লাগছে, ঠিক এরকম ধরাবাঁধা জীবন সে চায়নি, অন্য কিছু চেয়েছিল, অন্যরকম কিছু।

কী রকম?

ঠিক জানি না কী রকম। তবে অন্যরকম।

বিমানের কেউ কেউ হাতের কাছের আলো বইয়ে ফেলে পড়ছে, কেউ হাঁ হয়ে আছে টেলিভিশনের দিকে। কেউ চেয়ারে ঘুমোচ্ছ, কেউ আবার তিনটে চেয়ার দখল করে লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছ। বেনোয়া ফিসফিস করে, কারও যেন ঘুম না ভাঙে, আর ফিসফিসের কারণে তার নীলার দিকে সরে আসতে হয় অনেকটা। নীলারও সরতে হয় বেনোয়ার দিকে অনেকটা।

প্যারিসে কোথায় থাকেন?

ছিলাম গার দ্য নর্দের কাছে, এরপর পাঁচ এরনদিসময়, গার দ্য অস্তারলিজের কাছে, এক বান্ধবীর বাড়িতে।

এখন কি বান্ধবীর বাড়িতেই উঠবেন।

ঠিক জানি না।

আপনি কি সমকামী?

 নীলা জানালায় তাকায়, অল্প অল্প আলো ফুটছে।

না কি উভকামী?

.

নীলা উন্মূল উদ্বাস্তুর মতো, বেনোয়াও তা টের পায়। নীলার কণ্ঠেও তা, অনিশ্চয়তা।

প্যারিসে কারও সঙ্গে প্রেম করেননি?

নীলা মাথা নাড়ে।

কোনও ফরাসি প্রেমিক?

না।

আপনি কি সবসময়ই কথা এত কম বলেন।

কম বলছি কোথায়!

আমি একটু  বাচাল তা জানি। কিন্তু ভারতীয়রাও বাচাল শুনেছি। আপনাকে আমার ভারতীয়র চেয়ে ইয়োরোপিয়ান মনে হচ্ছে বেশি।

ইয়োরোপিয়ানরা কি কম কথা বলে?

 মেপে কথা বলে। যার তার সঙ্গে বলে না। খামোখা বলে না।

 আপনিও না?

মেপে হয়তো বলছি না, কিন্তু খামোখা বলছি না।

 কী উদ্দেশ্য শুনি?

আপনি আমার কাছে এখনও রহস্য। উদ্দেশ্য রহস্যের গভীরে যাওয়া।

নীলা তাকায় বেনোয়ার নীল চোখে। স্বপ্নে যে সব সুদর্শনকে প্রেমিক হিসেবে ভেবেছে এতকাল, বেনোয়ার সঙ্গে তাদের কারও তুলনা হয় না। বেনোয়া নীলার যে কোনও স্বপ্নপুরুষের চেয়ে বেশি সুদর্শন। সোনালি কটা চুল বেনোয়ার কপালে পড়েছে এসে, ইচ্ছে করে চুলগুলো সরিয়ে দেয় সে। ইচ্ছে করে চুল সরিয়ে দিতে গিয়ে স্পর্শ করতে বেনোয়ার উজ্জ্বল ত্বক।

ইচ্ছেকে প্রশ্রয় না দিতে নীলা জানালায় ফেরায় চোখ। আকাশে অদ্ভুত এক আলো। এরকম আলো নীলা কখনও দেখেনি।

কী অপূর্ব! নীলা গলা চেপে চিৎকার করে ওঠে। এত সুন্দর কী করে হয় রং?

ইচ্ছে করে দিগন্তের ওই রংগুলোকে স্পর্শ করতে, মুঠো মুঠো তুলে আনতে ওই রং, গায়ে মাখতে।

বেনোয়াও ঝুঁকে থাকে, জানালায়, নীলায়।

 নীলা টের পায় না বেনোয়া তার হাতটি নিয়েছে হাতে, সে হাতে আঙুল বুলোচ্ছে।

নীলার চোখের মুগ্ধতার দিকে অপলক তাকিয়ে বেনোয়া বলে অপূর্ব!

 তাই না?

 তাই।

এত চমৎকার আলো আমি আর আগে দেখিনি।

আমিও না। এত আলো কোথায় পেলেন আপনি, নীলা?

নীলা চমকে তাকায়। দেখে বেনোয়ার চোখ আকাশে নয়, তার চোখে।

আপনি আকাশের আলো দেখেননি?

দেখেছি, আমি আপনার চোখের আলো দেখেছি।

নীলা জানে, বেনোয়ার এই আবেগ আর কিছুক্ষণ পর নিবে যাবে। প্যারিস পৌঁছে বেনোয়া বাই বলে নেমে যাবে। স্বপ্নালু চোখদুটো নেমে যাবে। হাজার অচেনা মানুষের স্রোতে ভেসে যাবে। আর নীলা দাঁড়িয়ে থাকবে, না কুলে, না জলে।

কিন্তু নীলাকে অবাক করে প্যারিস পৌঁছে বেনোয়া বলে, খুব তাড়া নেই নিশ্চয়ই আপনার। গার দ্য অস্তারলিজের উলটোদিকে যাবেন তো। আমার বাড়িতে এক কাপ কফি খেয়ে গেলে নিশ্চয়ই আপনার বান্ধবী রাগ করবে না খুব।

ও জানেই না আমি এসেছি। নীলা হেসে বলে।

 তা হলে আপনার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না প্যারিসে? আমার সৌভাগ্য, চলন চলুন।

বেনোয়া গাড়ি রেখে গিয়েছিল বিমানবন্দরের গাড়ি পার্কিংয়ে। লাল পুযো।

নীলাকে তুলে নিয়ে সোজা রু দ্য রেনের দিকে যায় সে। প্যারিসের স্নিগ্ধ সুন্দর সকাল দেখতে দেখতে যায় নীলা, ফুসফুস ভরে হাওয়া নেয়। বসন্ত নাকি গ্রীষ্ম এখন, নীলা হিসেব করে না, সে হাওয়ায় বসন্তের ঘ্রাণ পাচ্ছে। কলাপাতা রঙের সবুজে ছেয়ে আছে ঘাস, সবুজ পাতার পোশাকে সেজে আছে প্যারিস। গাছে ফুল, ঘাসে ফুল, বাড়ির জানালায় ফুল, ফুলেশ্বরী প্যারিসকে নতুন চোখে দেখে নীলা।

বেনোয়া বাড়ির সামনে গাড়ি রেখে নিজের সুটকেস নামিয়ে নেয়, নীলার দুটো থেকে যায় পুয়োর পেটে।

সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়ি বেনোয়ার।

 নীলা জিজ্ঞেস করে, আপনার বউ বাড়ি নেই?

বউ থাকে স্টারসবুর্গে। ওখানে মেয়রের অফিসে চাকরি করে, ছুটিছাটায় প্যারিসে আসে।

বেনোয়া নিস্পৃহ কণ্ঠে বউয়ের স্টারসবুর্গ থাকার খবরটি দেয়। নীলা সোফায় বসে ঘরটি দেখে, আবছা আলো ঘরটিতে, জানালার ভারী পর্দা ফুড়ে আসছে সকালের রোদ। সোফার পাশে একটি বিছানা, তার পাশে গানের যন্ত্র, গানের যন্ত্রের পাশে একটি তাকে কিছু বই, কিছু সিডি, কিছু ভিডিও। ঘরটির সামনে খোলা রান্নাঘর, কফি বানানোর মেশিনে জল ঢালতে ঢালতে বেনোয়া জিজ্ঞেস করে, কফিতে চিনি?

আমি কফি খাই না।

 তবে কী খান?

চা।

চা তো নেই।

তবে যাই বলে নীলা উঠে দাঁড়াল। কফি খেতে ডেকেছে বেনোয়া তাকে, কফি যে সে খায় না, তা আগে সম্ভবত জানানো উচিত ছিল তার, যেহেতু সে জানায়নি, চায়ের সরঞ্জামাদি জোগাড় করা এখন সম্ভব নয়, যেহেতু সম্ভব নয়, এবং তার পক্ষে কফি পান করাও সম্ভব নয়, তবে, নীলা অনুমান করে, তার বিদায় নেওয়াই ভদ্র আচরণ। নীলার যাই শুনে বেনোয়া কফি রেখে সামনে এসে দাঁড়ায় নীলার। চোখে চেয়ে থাকে। নীলা চোখ নামিয়ে নেয়।

পান করার কিছু নেই বলে চলে যেতে হবে? বেনোয়া জিজ্ঞেস করে।

নীলা উত্তর দেয় না, নখের তলের ময়লা খোঁটে।

নীলার হাতদুটো ধরে বেনোয়া নীলার কাছে সরতে থাকে, সরতে সরতে ধুকপুক করা বুকের কাছে। নীলা ছিটকে সরে যায়, আর ছিটকে সরে যাওয়া দ্য ভারতীয় সুন্দরীকে টেনে এনে বুকে জড়িয়ে গভীর চুমু খায় বেনোয়া।

কী হচ্ছে কী! নীলা নিজেকে ছাড়িয়ে বলে।

আমাকে পান করো নীলা, আমাকে পান করো। বেনোয়া নিবিড় কণ্ঠে বলে।

নীলার মনে হয় না এ বাস্তবে ঘটছে। মনে হয় এখনও সে বিমানের ভেতর বসা, আর আকাশের অদ্ভুত আলোর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছে।

এমন চুমু নীলাকে কেউ খায়নি কোনওদিন। নীলা জানে না চুমু এরকম গভীর হতে পারে। তার সমস্ত শরীর অবশ মতো হয়ে আসে, আর অবশ মতো শরীরটিকে তুলে তুলো-মেঘের মতো নরম বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একটি একটি করে জামা খুলে ফেলে। কী সুন্দর তুমি, নীলা ও নীলা, ভগবান তোমাকে নিজের হাতে গড়েছেন বলে বলে নীলার সারা শরীরে চুমু খায় বেনোয়া। চুলে কপালে কানে চোখে নাকে ঠোঁটে জিভে গালে চিবুকে গলায় ঘাড়ে পিঠে বুকে বাহুতে হাতে আঙুলে স্তনে পেটে তলপেটে নিতম্বে উরুতে উরুসন্ধিতে হাঁটুতে পায়ে নখে পায়ের পাতায়।

নীলার সারা শরীর ভিজে ওঠে চুমুতে। চোখ বুজে থাকে সে।

এত সুখ সে তার সাতাশ বছরের জীবনে কখনও পায়নি।

এত আনন্দ তার জীবনে কখনও আসবে সে ভাবেনি। এই নির্মম নিষ্ঠুর কুৎসিত পৃথিবীতে ভালবাসা যে এত গভীর হতে পারে, সঙ্গম যে এত অসম্ভব সুন্দর হতে পারে, আগে সে কখনও অনুমানও করেনি।

.

নীলার জীবনে, নীলার অলক্ষেই ঘটে যায় বেনোয়া দুপঁ।

বেনোয়ার বেনো জল

সারাদিন ঘোরে কাটে নীলার। সন্ধেয় দানিয়েলের বাড়িতে নীলাকে পৌঁছে দিয়ে বেনোয়া বলে যায়, কাল সন্ধে সাতটা। মোপারনাস, ক্লসারি দ্য লিলা। ঠিক তো?

ঠিক।

 দানিয়েল ঘরেই ছিল, দরজা খুলে নীলাকে দেখে অবাক, তুমি প্যারিসে? কবে এলে?

 আজ।

 নীলা ঘরে ঢুকে দেখে ঘর সেই আগের মতোই, তবে ঘরে অন্য এক মেয়ে।

ও নাতালি, আমার প্রেমিকা।

নাতালি পাতলা জামা গায়ে বিছানায় শুয়েছিল। উঠে বসল। প্রথম পরিচয়ের বেলায় যা করে, হাতে হাত ধরে ঝাঁকানো, তা চলে নীলা আর নাতালিতে, আর দানিয়েলের সঙ্গে নীলার গালে গাল লাগিয়ে চুমু।

নাতালি প্রভান্সের মেয়ে, প্যারিসে নতুন এসেছে, এখন, হ্যাঁ এখানেই থাকবে। নাতালি মিষ্টি হাসে। ছোট করে কাটা বাদামি চুল মাথায়, বাদামি চোখ। বাদামি চোখদুটোও হাসে। নীলা কে, তার পরিচয় দিতে হয় না নাতালিকে, সে জানে, দানিয়েলই নীলার গল্প করেছে ওর কাছে।

আমি তো জানি তুমি আর ফিরবে না, প্যারিসে। দানিয়েল বলে।

 নীলা চেয়ার টেনে বসে, ভেবেছিলাম ফিরব না, কিন্তু ফিরতে হল।

কোথায় উঠেছ?

নীলা এর উত্তর তক্ষুনি দিতে পারে না। দানিয়েলের বাড়িতে উঠেছে বলেই সে জানে। কিন্তু প্রশ্ন তার জিভকে ভারী করে রাখে।

দানিয়েল সিগারেটে লম্বা একটি টান দিয়ে বলে, প্রথমেই বলে নিই, এ ঘরে কিন্তু এখন নাতালি আর আমি থাকছি, তোমাকে অন্য কোথাও থাকতে হবে।

সিগারেটটি দানিয়েল নাতালিকে দেয় ফুঁকতে।

তা যাবে কোথায় জানো?

 নীলা জানে না, দানিয়েলের এখানে আশ্রয় না মিললে সে যাবে কোথায়।

 পকেটে রাখা বেনোয়ার ঠিকানা ফোন নম্বর লেখা কাগজটি সে স্পর্শ করে, যেন সে বেনোয়ার শরীর স্পর্শ করছে। শরীরে তার অদ্ভুত এক শিহরন জাগে। বেনোয়ার তীব্র শীৎকার এখনও তার কানে লেগে আছে, এখনও শরীর ভিজে আছে বেনোয়ার বেনো জলে। এখনও নীলা ঘোরে।

নাতালি সিগারেটটি আবার দানিয়েলকে দেয় ফুঁকতে।

 টানবে মারিহুয়ানা?

নীলা কোনওদিন মারিহুয়ানার স্বাদ নেয়নি। স্বাদ নিতে গিয়ে, এক টানেই মাথা ঝিমঝিম করে নীলার।

ঘরে ছড়িয়ে আছে নাতালির জুতো জামা। বেড়েছে বই। টেবিলে একটির জায়গায় দুটো কম্পিউটার।

আমার ছবিগুলো? ইজেল? নীলা জিজ্ঞেস করে।

দানিয়েল মারিহুয়ানায় টান দিয়ে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ঘরে জায়গা নেই। ফেলে দিতে হয়েছে।

দানিয়েল মজা করছে, নীলা ভাবে।

সত্যি করে বলো, কোথায় রেখেছ ইজেল, আমি ছবি আঁকা শুরু করব আবার। নীলার দিকে একটি স্বপ্নশিশু হামাগুড়ি দিতে দিতে এগোয়।

দানিয়েল আবারও বলে, ফেলে দিয়েছি।

নীলার সংকোচ হয় ইজেল আর ছবি বিষয়ে আর কোনও প্রশ্ন করতে। দানিয়েল ওগুলো ফেলে দিয়েছে, এর অর্থ ওগুলো বিরক্তিকর ঠেকেছে তার কাছে, তাই যদি হয়, ওগুলোর প্রসঙ্গও বিরক্তিকর নিশ্চয়ই।

বদল করে সে প্রসঙ্গ, তোমার ওই মনিকের সঙ্গে কলকাতায় দেখা করেছিলাম।

তাই নাকি? মনিক চমৎকার মানুষ, তাই না? দানিয়েলের উচ্ছ্বাস উপচে পড়ে।

মনিক কলকাতা অন্ত প্রাণ। কলকাতা সম্পর্কে এত বিস্তর জ্ঞান তাঁর, এমন জ্ঞান কোনও কলকাতা বিশেষজ্ঞরও নেই। জঁ রাসিন কলকাতা বিষয়ে কী জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি জানেন মনিক। এত ধুলো, এত ভিড়, এত নোংরা কলকাতা, তারপরও ওই কলকাতাকে ভালবেসে তিনি থেকে গেছেন ওখানে। গরিবদের দুহাতে সাহায্য করেন। এমন বড় হৃদয়ের মানুষ, সহসা দেখা যায় না। বাঙালি জাতিকে এত ভাল আর কেউ বাসেনি।

নীলা দানিয়েলকে থামিয়ে বলে, আমার মনে হয় না।

কী মনে হয় না?

মনে হয় না মনিক খুব বড় হৃদয়ের মানুষ। মনে হয় না তিনি কলকাতার মানুষদের সত্যিকার শ্রদ্ধা করেন। নীলা তার মনে না হওয়ার কথাকটি বলে শুধু, কেন তার মনে হয়, তা বলতে যাবার আগেই দানিয়েল বারুদের মতো জ্বলে ওঠে, চেঁচিয়ে চিলেকোঠা চৌচির করে,

তুমি এক আশ্চর্য চরিত্র নীলা। মোটেও তুমি লোককে বাহবা দিতে চাও না। মনিকের মতো মেয়ের প্রশংসা তুমি করতে চাও না। আমি তোমার জন্য কম করেছি? তোমার জন্য আমি কলকাতা পর্যন্ত গেছি, গেছি তোমার পাশে থাকার জন্য, তোমাকে সাহস আর শক্তি জোগাতে। তোমার জন্য ভেবেছি, তোমার জন্য করেছি, আর বিনিময়ে তুমি কী করেছ? জঘন্য ব্যবহার করেছ, যাচ্ছেতাই রকম অবহেলা করেছ, অপমান করেছ। এই প্যারিসে তোমার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না, আমি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম, আমি দিয়েছিলাম আমি। অথচ প্রথম দিনই তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যে কথা বলেছ। বলেছ, নাচতে জানো না, অথচ তুমি নাচতে জানো। নিকলের বাড়িতে তোমাকে নেমন্তন্ন খেতে নিয়েছি, তুমি ইচ্ছে করেই ভাল কোনও ড্রেস পরোনি, পরে গেছ জিনস। এত তোমাকে খাতির করল নিকল, ওকে তুমি যাওয়ার আগে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত বলোনি। ক্যাথারিনের বাড়িতে হঠাৎ গিয়ে হাজির হয়েছিলে, এমন অদ্ভুত আচরণ এ দেশে কেউ করে না, ক্যাথারিন না হয়ে অন্য কেউ হলে পুলিশ ডাকত, ও তোমাকে সাহায্য কম করেছে? তুমি জানতেই না কারখানার কাছে কোথায় রেস্তোরাঁ, ও তোমাকে চিনিয়েছে, পোস্টাপিস কোথায় তাও তো তুমি জানতে না, ও দেখিয়ে দিয়েছে। অথচ ওর সঙ্গে তুমি অনেকদিন হেসে কথা বলোনি। তুমি ভাবো, অন্যরা তোমার জন্য করবে, করাটা অন্যের দায়িত্ব আর তুমি রানির মতো বসে সব উপভোগ করবে আর যারা করবে তাদের দিকে তুমি অবজ্ঞা ছুড়বে, এভাবেই জীবন চলবে তোমার, ভেবেছ? দেখলাম তো কী বুর্জোয়া পরিবারের মেয়ে তুমি। খামোখা তো স্বভাব নষ্ট হয়নি। যা চাও, পেয়ে যাও হাতের কাছে, কোনও কিছু পেতে তোমার পরিশ্রম করতে হয় না। তোমার এই স্বভাব বদলাও নীলা, নাহলে ভুগে মরবে। কেউ তোমার দাস বা দাসী হবার জন্য বসে নেই। ইয়োরোপের ধনীরাও এত প্রাচুর্যের মধ্যে থাকে না, ভারতের মতো গরিব দেশে যেমন তুমি ছিলে। আর এখন এখানে এসেছ শ্রমিকের জীবন যাপন করতে? দারিদ্র্য পোহাতে? ধনীর আবার শখের শেষ নেই। তুমি ওই ইজেল চাইছ আর ছবি, ফেলে দিয়েছি। তুমি ছবি না, ছাই আঁকতে জানো! কিছু হয় না ওসব। ওগুলো ফেলে দেওয়ার মতো জিনিস, তাই দিয়েছি। আর বেশি কথা না। আমাদের নেমন্তন্ন আছে। বেরোতে হবে। তোমাকে আর সময় দিতে পারছি না নীলা। যথেষ্ট বিরক্ত করেছ আমাকে, আর নয়।

নীলা দ্রুত বেরিয়ে যায় ভারী সুটকেসদুটো নিয়ে। একটি একটি করে সুটকেস ওপর থেকে নীচে নামায়, এখানে রামকিরণ নেই যে সুটকেস নামাবে, এখানে সিঁড়ির কাছে গাড়ি অপেক্ষা করছে না যে সে উঠে বসবে, চালককে গন্তব্য বলে দেবে। এখানে তার কোনও গাড়ি নেই, চালক নেই, এবং সবচেয়ে বড় যেটি নেই তার, সে হল গন্তব্য। নীচে নেমে, রাস্তায়, নীলার ইচ্ছে করে কাছের ফোন বুথ থেকে ফোন করে বেনোয়াকে।

কী বলবে! আমাকে তোমার বাড়িতে আশ্রয় দাও! লজ্জার কী আছে আর তার! সব লজ্জা কি আজ সারাদিন বেনোয়ার বেনোজলে ভেসে যায়নি!

নীলা প্রথম কিছুক্ষণ ইতস্তত করেও ফোন করে বেনোয়ার নম্বরে, বেনোয়া ফোন ধরেও।

কী করছ?

তোমাকে ভাবছি। হা হা।

 সত্যি?

সত্যি সত্যি সত্যি।

 আমিও ভাবছি তোমাকে।

বান্ধবী নিশ্চয় তোমাকে পেয়ে খুব খুশি?

 নীলা থামে এখানে। বান্ধবী যে তাকে পেয়ে খুব খুশি হয়নি, এ কথা নীলার জিভে গড়াগড়ি খায়। জিভ থেকে খসে পড়লেই নীলা বেনোয়ার কাছে প্রমাণ করবে সে এ শহরে অবাঞ্ছিত এক মানুষ। নীলার ভয় হয