Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

প্রিয় কবিতা

Reading Time: 16 minutes
ছবিঃ সুদীপ্ত দাশ

অমলকান্তি 

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

………………………………….. অমলকান্তি আমার বন্ধু, ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম । রোজ দেরি করে ক্লাসে আসত, পড়া পারত না, শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে এমন অবাক হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত যে, দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের । আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল । অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায় নি । সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল । ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর, জাম আর জামরুলের পাতায় যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে । আমরা কেউ মাস্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল । অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারে নি । সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে । মাঝে-মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে ; চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে । “ আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি । আমাদের মধ্যে যে এখন মাস্টারি করে, অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত; যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল, উকিল হলে তার এমন-কিছু ক্ষতি হত না । অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া । অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারে নি । সেই অমলকান্তি- রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে ভাবতে ভাবতে যে একদিন রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছিল ।

মনে মনে বহুদূর চলে গেছি 

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

………………………………………………. মনে মনে বহুদূর চলে গেছি – যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয় জন্মেই হাঁটতে হয় হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি পথ তো একটা নয় – তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা নদীর দু – প্রান্তের মূল একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূণ্য দুদিকেই কূল, দুদিকেই এপার-ওপার, আসা- যাওয়া, টানাপোরেন – দুটো জন্মই লাগে মনে মনে দুটো জন্মই লাগে।

বুক পেতে শুয়ে আছি ঘাসের উপরে চক্রবালে 

শঙ্খ ঘোষ

……………………………………………..

বুক পেতে শুয়ে আছি ঘাসের উপরে চক্রবালে তোমার ধানের মুখে ধরে আছি আর্ত দুই ঠোঁট তুমি চোখ বন্ধ করো, আমিও দুচোখ ঢেকে শুনি যেন কোন্ তল থেকে উঠে আসে পাতালের শ্বাস সমস্ত দিনের মূর্ছা সেচন পেয়েছে এইখানে মুহূর্ত এখানে এসে হঠাত্ পেয়েছে তার মানে নিজের পায়ের চিহ্ন নিজে আর মনেও রাখেনি আমিও রাখিনি কিছু, তবু হাত রাখে পিছুটান মাটিতে বসানো জালা, ঠান্ডা বুক ভরে আছে জলে এখনও বুঝিনি ভালো কাকে ঠিক ভালোবাসা বলে ?

তুমি  বিশ বছর আগে ও পরে 

রফিক আজাদ

………………………………………………. তুমি যেসব ভুল করতে সেগুলো খুবই মারাত্মক ছিলো | তোমার কথায় ছিলো গেয়ো টান, অনেক গুলো শব্দের করতে ভুল উচ্চারণঃ ‘প্রমথ চৌধুরী’কে তুমি বলতে ‘প্রথম চৌধুরী’ ; ‘জনৈক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে সর্বদাই ‘জৈনিক’ ব’লে ফেলতে | এমনি বহুতরল ভয়াবহ ভুলে-ভরা ছিলো তোমার ব্যক্তিগত অভিধান | কিন্তু সে-সময়, সেই সুদূর কৈশোরে ঐ মারাত্মক ভুলগুলো তোমার বড়ো-বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলুম | তোমার পরীক্ষার খাতায় সর্বদাই সাধু ও চলতির দূষণীয় মিশ্রণ ঘটাতে | ভাষা ব্যবহারে তুমি বরাবরই খুব অমনোযোগী ছিলে | বেশ ভালো হাবাগোবা-গোছের লাজুক ও অবনতমুখী মেয়ে ছিলে তুমি | ‘শোকাভিভূত’ বলতে গিয়ে ব’লে ফেলতে ‘শোকভূত’ | তোমার উচ্চারণের ত্রুটি, বাক্যমধ্যস্থিত শব্দের ভুল ব্যবহারে আমি তখন একধরনের মজাই পেতুম | ২০ বছর পর আজ তোমার বক্তৃতা শুনলুম | বিষয় : ‘নারী স্বাধীনতা’ ! এতো সুন্দর,স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে, যে, দেখে অবাক ও ব্যথিত হলুম | আমার বুকের মধ্যে জেকে- বসা একটি পাথর বিশ বছর পর নিঃশব্দে নেমে গ্যালো |

তোমার চোখ এত লাল কেন 

নির্মলেন্দু গুণ

…………………………………………….

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক, শুধু ঘরের ভিতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য । বাইরে থেকে দরজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত । আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ আমাকে খেতে দিক । আমি হাতপাখা নিয়ে কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না, আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে । আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক ; আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না, পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরো একটা তেলে-ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না । এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি । আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরজা খুলে দিক । কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক । কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করুক ; ‘তোমার চোখ এত লাল কেন ?’

কেউ কথা রাখেনি 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

…………………………………………. কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী আর এলোনা পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি। মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে! নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে? একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভিতরে রাস-উৎসব অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা কত রকম আমোদে হেসেছে আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি! বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও… বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা! বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল, যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে! ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড় বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ এখনো সে যে-কোনো নারী। কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!

সেই গল্পটা

পূর্ণেন্দু পত্রী

………………………….. আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। শোনো। পাহাড়টা, আগেই বলেছি ভালোবেসেছিলো মেঘকে আর মেঘ কি ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা সে তো আগেই শুনেছো। সেদিন ছিলো পাহাড়টার জন্মদিন। পাহাড় মেঘকে বললে – আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে। মেঘ পাহাড়কে বললে – আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে। ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম নদী পুরুষেরা জ্বলন্ত কাঠ। সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে পাহাড় ছিলো মেঘের ঢেউ-জলে। হঠাৎ, আকাশ জুড়ে বেজে উঠলো ঝড়ের জগঝম্প ঝাঁকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাই এর ভঙ্গিতে ছুটে এল এক ঝাঁক হাওয়া মেঘের আঁচলে টান মেরে বললে – ওঠ্ ছুঁড়ি! তোর বিয়ে। এখনো শেষ হয়নি গল্পটা। বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়েটা হয়ে গেলো ঠিকই কিন্তু পাহাড়কে সে কোনোদিন ভুলতে পারলনা। বিশ্বাস না হয় তো চিরে দেখতে পারো পাহাড়টার হাড়-পাঁজর, ভিতরে থৈথৈ করছে শত ঝর্ণার জল।

রাত্রি 

অমিয় চক্রবর্তী

……………………….. অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি তাই চুপি চুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে বলি, শোনো, সৌরতারা-ছাওয়া এই বিছানায় সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি— কত দীর্ঘ দুজনার গেলো সারাদিন, আলাদা নিশ্বাসে— এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে ছুঁই কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা— অতন্দ্রিলা, হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না, দেখি তুমি নেই ।

আমিই সেই মেয়ে

শুভ দাশগুপ্ত

…………………………………. আমিই সেই মেয়ে। বাসে ট্রেনে রাস্তায় আপনি যাকে রোজ দেখেন যার শাড়ি, কপালের টিপ কানের দুল আর পায়ের গোড়ালি আপনি রোজ দেখেন। আর আরও অনেক কিছু দেখতে পাবার স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে যাকে ইচ্ছে মতন দেখেন। আমিই সেই মেয়ে। বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে দিনের আলোয় যার ছায়া মাড়ানো আপনার ধর্মে নিষিদ্ধ, আর রাতের গভীরে যাকে বস্তি থেকে তুলে আনতে পাইক বরকন্দাজ পাঠান আপনি আর সুসজ্জিত বিছানায় যার জন্য অপেক্ষায় অধীন হয় আপনার রাজকীয় লাম্পট্য আমিই সেই মেয়ে। আমিই সেই মেয়ে- আসামের চাবাগানে ঝুপড়ি কামিন বস্তি থেকে যাকে আপনি নিয়ে যেতে চান সাহেবি বাংলোয় মধ্যরাতে ফায়ার প্লেসের ঝলসে ওঠা আলোয় মদির চোখে দেখতে চান যার অনাবৃত শরীর আমি সেই মেয়ে। রাজস্থানের শুকনো উঠোন থেকে পিপাসার জল আনতে যাকে আপনি পাঠিয়ে দেন দশ মাইল দূরে সরকারি ইঁদারায়- আর কুড়ি মাইল হেঁটে কান্ত বিধ্বস্ত যে রমণী ঘড়া কাঁখে ঘরে ফিরলেই যাকে বসিয়ে দেন চুলার আগুনের সামনে আপনার রুটি বানাতে আমিই সেই মেয়ে। আমিই সেই মেয়ে- যাকে নিয়ে আপনি মগ্ন হতে চান গঙ্গার ধারে কিংবা ভিক্টোরিয়ার সবুজে কিংবা সিনেমা হলের নীল অন্ধকারে, যার চোখে আপনি একে দিতে চান ঝুটা স্বপ্নের কাজল আর ফুরিয়ে যাওয়া সিগারেটের প্যাকেটের মত যাকে পথের পাশে ছুঁড়ে ফেলে আপনার ফুল সাজানো গাড়ি শুভবিবাহ সুসম্পন্ন করতে ছুটে যায় শহরের পথে- কনে দেখা আলোর গোধুলিতে একা দাঁড়িয়ে থাকা আমিই সেই মেয়ে। আমিই সেই মেয়ে- এমন কি দেবতারাও যাকে ক্ষমা করেন না। অহংকার আর শক্তির দম্ভে যার গর্ভে রেখে যান কুমারীর অপমান আর চোখের জলে কুন্তী হয়ে নদীর জলে বিসর্জন দিতে হয় কর্ণকে। আত্মজকে। আমিই সেই মেয়ে। সংসারে অসময়ের আমিই ভরসা। আমার ছাত্র পড়ানো টাকায় মায়ের ওষুধ কেনা হয়। আমার বাড়তি রোজগারে ভাইয়ের বই কেনা হয়। আমার সমস্ত শরীর প্রবল বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। কালো আকাশ মাথায় নিয়ে আমি ছাতা হয়ে থাকি। ছাতার নিচে সুখে বাঁচে সংসার। আপনি আপনারা আমার জন্য অনেক করেছেন। সাহিত্যে কাব্যে শাস্ত্রে লোকাচারে আমাকে মা বলে পুজো করেছেন। প্রকৃতি বলে আদিখ্যেতা করেছেন- আর শহর গঞ্জের কানাগলিতে ঠোঁটে রঙ মাখিয়ে কুপি হাতে দাঁড় করিয়েও দিয়েছেন। হ্যা, আমিই সেই মেয়ে। একদিন হয়ত হয়ত একদিন- হয়ত অন্য কোন এক দিন আমার সমস্ত মিথ্যে পোশাক ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমিই হয়ে উঠবো সেই অসামান্যা খোলা চুল মেঘের মত ঢাকবে আমার খোলা পিঠ। দু চোখে জ্বলবে ভীষণ আগুন। কপাল-ঠিকরে বেরুবে ভয়ঙ্কর তেজরশ্মি। হাতে ঝলসে উঠবে সেই খড়গ। দুপায়ের নুপুরে বেজে উঠবে রণদুন্দভি। নৃশংস অট্টহাসিতে ভরে উঠবে আকাশ। দেবতারাও আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে বলতে থাকবেন মহামেঘপ্রভাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং কালিকাং দক্ষিণাং মুণ্ডমালা বিভুষিতাং। বীভৎস দাবানলের মত আমি এগোতে থাকবো ! আর আমার এগিয়ে যাবার পথের দুপাশে মুণ্ডহীন অসংখ্য দেহ ছটফট করতে থাকবে- সভ্যতার দেহ প্রগতির দেহ- উন্নতির দেহ- সমাজের দেহ হয়ত আমিই সেই মেয়ে ! হয়ত ! হয়ত বা।

তোমার জন্য কবিতা 

সমুদ্র গুপ্ত

…………………………………. তোমার আকাশ থেকে আমার জন্য কেবলই লাবণ্য ঝরে না মেঘ জমে শিশিরের ঘাম হয়ে শিলা ও পাথর জমে মেঘে বিষ্টির নাম করে । হাওয়ার চাদর উড়িয়ে তোমার অস্তিত্ব নামে নেমে আসে আমার পাতা ও কাণ্ডের ওপর পাখির পালক হয়ে স্নিগ্ধতা গড়িয়ে পড়ে কোনো কিছু স্নেহ নয় প্রিয়তা নয় পাথর গড়িয়ে পড়ে গলে যায় । তোমার আকাশ থেকে আমার ওপরে কোনোই লাবণ্য ঝরে না তবু টিকে থাকি বেঁচে থাকি বিষ্টির লবণ একদিন লাবণ্য জমাবে আমাদের জীবন শিকড়ে ।

নিঃসঙ্গতা 

আবুল হাসান

………………………… অতটুকু চায়নি বালিকা! অত শোভা, অত স্বাধীনতা! চেয়েছিল আরো কিছু কম, আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক! অতটুকু চায়নি বালিকা! অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম! চেয়েছিল আরো কিছু কম! একটি জলের খনি তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

ইচ্ছে ছিলো 

হেলাল হাফিজ

……………………………. ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো। ইচ্ছে ছিলো সুনিপূণ মেকআপ-ম্যানের মতো সূর্যালোকে কেবল সাজাবো তিমিরের সারাবেলা পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো। ইচ্ছে ছিলো নদীর বক্ষ থেকে জলে জলে শব্দ তুলে রাখবো তোমার লাজুক চঞ্চুতে, জন্মাবধি আমার শীতল চোখ তাপ নেবে তোমার দু’চোখে। ইচ্ছে ছিল রাজা হবো তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো, আজ দেখি রাজ্য আছে রাজা আছে ইচ্ছে আছে, শুধু তুমি অন্য ঘরে।

প্রচুর দূরত্ব হয়ে আছো

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

……………………………………………… পৃথিবী কি আয়তনে যাচ্ছে বেড়ে অথবা ক্রমাগত হয়ে আসছে সীমিত আমি তার কিছুই বুঝতে পারিনা! এদেশ থেকে ওদেশে যাওয়া যেন বিকেলে পার্কে বেড়াতে এলাম- কিন্তু একজন মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে আমার অ-নে-ক সময় লেগে যায়। পৃথিবী কি ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে অথবা সীমিত হয়ে আসছে আয়তনে আমি তার কিছুই বুঝতে পারি না! তোমার কাছে পৌঁছাতে আমার এক যুগ কেটে গেল ।

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি 

আ বু  জা ফ র  ও বা য় দু ল্লা হ

………………………………… আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল। তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা, কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে। আমি উচ্চারিত সত্যের মতো স্বপ্নের কথা বলছি। উনুনের আগুনে আলোকিত একটি উজ্জ্বল জানালার কথা বলছি। আমি আমার মা’য়ের কথা বলছি, তিনি বলতেন প্রবহমান নদী যে সাতার জানে না তাকেও ভাসিয়ে রাখে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে নদীতে ভাসতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে মা’য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমি বিচলিত স্নেহের কথা বলছি গর্ভবতী বোনের মৃত্যুর কথা বলছি আমি আমার ভালোবাসার কথা বলছি। ভালোবাসা দিলে মা মরে যায় যুদ্ধ আসে ভালোবেসে মা’য়ের ছেলেরা চলে যায়, আমি আমার ভাইয়ের কথা বলছি। যে কবিতা শুনতে জানে না সে সন্তানের জন্য মরতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে ভালোবেসে যুদ্ধে যেতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে সূর্যকে হৃদপিণ্ডে ধরে রাখতে পারে না। আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল কারণ তিনি ক্রীতদাস ছিলেন। আমরা কি তা’র মতো কবিতার কথা বলতে পারবো, আমরা কি তা’র মতো স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো! তিনি মৃত্তিকার গভীরে কর্ষণের কথা বলতেন অবগাহিত ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন বীজ বপনের কথা বলতেন সবত্সা গাভীর মত দুগ্ধবতী শস্যের পরিচর্যার কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। যে কর্ষণ করে তাঁর প্রতিটি স্বেদবিন্দু কবিতা কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না শস্যহীন প্রান্তর তাকে পরিহাস করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে মাতৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত হবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে আজন্ম ক্ষুধার্ত থেকে যাবে। যখন প্রবঞ্চক ভূস্বামীর প্রচণ্ড দাবদাহ আমাদের শস্যকে বিপর্যস্ত করলো তখন আমরা শ্রাবণের মেঘের মত যূথবদ্ধ হলাম। বর্ষণের স্নিগ্ধ প্রলেপে মৃত মৃত্তিকাকে সঞ্জীবিত করলাম। বারিসিক্ত ভূমিতে পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করলাম। সুগঠিত স্বেদবিন্দুর মত শস্যের সৌকর্য অবলোকন করলাম, এবং এক অবিশ্বাস্য আঘ্রাণ আনিঃশ্বাস গ্রহণ করলাম। তখন বিষসর্প প্রভুগণ অন্ধকার গহ্বরে প্রবেশ করলো এবং আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট তাম্রলিপির মত রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হলাম। তখন আমরা সমবেত কন্ঠে কবিতাকে ধারণ করলাম। দিগন্ত বিদীর্ণ করা বজ্রের উদ্ভাসন কবিতা রক্তজবার মত প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না পরভৃতের গ্লানি তাকে ভূলুন্ঠিত করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না অভ্যূত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না পলিমাটির সৌরভ তাকে পরিত্যাগ করবে। আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তিনি স্বপ্নের মত সত্য ভাষণের কথা বলতেন সুপ্রাচীন সংগীতের আশ্চর্য ব্যাপ্তির কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। যখন কবিকে হত্যা করা হল তখন আমরা নদী এবং সমুদ্রের মোহনার মত সৌভ্রত্রে সম্মিলিত হলাম। প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মত অগ্নিগর্ভ হলাম। ক্ষিপ্রগতি বিদ্যুতের মত ত্রিভূবন পরিভ্রমণ করলাম। এবং হিংস্র ঘাতক নতজানু হয়ে কবিতার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইলো। তখন আমরা দুঃখকে ক্রোধ এবং ক্রোধকে আনন্দিত করলাম। নদী এবং সমুদ্রে মোহনার মত সম্মিলিত কণ্ঠস্বর কবিতা অবদমিত ক্রোধের আনন্দিত উত্সারণ কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না সে তরঙ্গের সৌহার্দ থেকে বঞ্চিত হবে। যে কবিতা শুনতে জানে না নিঃসঙ্গ বিষাদ তাকে অভিশপ্ত করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে মূক ও বধির থেকে যাবে। আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল আমি একগুচ্ছ রক্তজবার কথা বলছি। আমি জলোচ্ছ্বাসের মত অভ্যূত্থানের কথা বলছি উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের মত কমলের চোখের কথা বলছি প্রস্ফুটিত পুষ্পের মত সহস্র ক্ষতের কথা বলছি আমি নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননীর কথা বলছি আমি বহ্নমান মৃত্যু এবং স্বাধীনতার কথা বলছি। যখন রাজশক্তি আমাদের আঘাত করলো তখন আমরা প্রাচীন সংগীতের মত ঋজু এবং সংহত হলাম। পর্বত শৃঙ্গের মত মহাকাশকে স্পর্শ করলাম। দিকচক্রবালের মত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলাম; এবং শ্বেত সন্ত্রাসকে সমূলে উৎপাটিত করলাম। তখন আমরা নক্ষত্রপুঞ্জের মত উজ্জ্বল এবং প্রশান্ত হলাম। উৎক্ষিপ্ত নক্ষত্রের প্রস্ফুটিত ক্ষতচিহ্ন কবিতা স্পর্ধিত মধ্যাহ্নের আলোকিত উম্মোচন কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না সে নীলিমাকে স্পর্শ করতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে মধ্যাহ্ন প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত হতে পারে না। যে কবিতা শুনতে জানে না সে সন্ত্রাসের প্রতিহত করতে পারে না। আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমি শ্রমজীবী মানুষের উদ্বেল অভিযাত্রার কথা বলছি আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতির কথা বলছি শৃঙ্খলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকারের কথা বলছি, আমি অতীত এবং সমকালের কথা বলছি। শৃঙ্খলিত বৃক্ষের উর্দ্ধমুখী অহংকার কবিতা আদিবাস অরণ্যের অনার্য সংহতি কবিতা। যে কবিতা শুনতে জানে না যূথভ্রষ্ট বিশৃঙ্খলা তাকে বিপর্যস্ত করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না বিভ্রান্ত অবক্ষয় তাকে দৃষ্টিহীন করবে। যে কবিতা শুনতে জানে না সে আজন্ম হীনমন্য থেকে যাবে। যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম তখন চতুর্দিকে ক্ষুধা। নিঃসঙ্গ মৃত্তিকা শস্যহীন ফলবতী বৃক্ষরাজি নিস্ফল এবং ভাসমান ভূখণ্ডের মত ছিন্নমূল মানুষেরা ক্ষুধার্ত। যখন আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম তখন আদিগন্ত বিশৃঙ্খলা। নিরুদ্দিষ্ট সন্তানের জননী শোকসন্তপ্ত দীর্ঘদেহ পুত্রগণ বিভ্রান্ত এবং রক্তবর্ণ কমলের মত বিস্ফোরিত নেত্র দৃষ্টিহীন। তখন আমরা পূর্বপুরুষকে স্মরণ করলাম। প্রপিতামহের বীর গাঁথা স্মরণ করলাম। আদিবাসী অরণ্য এবং নতজানু শ্বাপদের কথা স্মরণ করলাম। তখন আমরা পর্বতের মত অবিচল এবং ধ্রুব নক্ষত্রের মত স্থির লক্ষ্য হলাম। আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমি স্থির লক্ষ্য মানুষের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের কথা বলছি শ্রেণীযুদ্ধের অলিন্দে ইতিহাসের বিচরণের কথা বলছি আমি ইতিহাস এবং স্বপ্নের কথা বলছি। স্বপ্নের মত সত্যভাষণ ইতিহাস ইতিহাসের আনন্দিত অভিজ্ঞান কবিতা যে বিনিদ্র সে স্বপ্ন দেখতে পারে না যে অসুখী সে কবিতা লিখতে পারে না। যে উদ্গত অংকুরের মত আনন্দিত সে কবি যে সত্যের মত স্বপ্নভাবী সে কবি যখন মানুষ মানুষকে ভালবাসবে তখন প্রত্যেকে কবি। আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমি বিচলিত বর্তমান এবং অন্তিম সংগ্রামের কথা বলছি। খণ্ডযুদ্ধের বিরতিতে আমরা ভূমি কর্ষণ করেছি। হত্যা এবং ঘাতকের সংকীর্ণ ছায়াপথে পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করেছি। এবং প্রবহমান নদীর সুকুমার দাক্ষিণ্যে শস্যের পরিচর্যা করছি। আমাদের মুখাবয়ব অসুন্দর কারণ বিকৃতির প্রতি ঘৃণা মানুষকে কুশ্রী করে দ্যায়। আমাদের কণ্ঠস্বর রূঢ় কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কণ্ঠকে কর্কশ করে তোলে। আমাদের পৃষ্ঠদেশে নাক্ষত্রিক ক্ষতচিহ্ন কারণ উচ্চারিত শব্দ আশ্চর্য বিশ্বাসঘাতক আমাদেরকে বারবার বধ্যভূমিতে উপনীত করেছে। আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। আমার সন্তানেরা আমি তোমাদের বলছি। যেদিন প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ সূর্যের মত সত্য হবে সেই ভবিষ্যতের কথা বলছি, সেই ভবিষ্যতের কবিতার কথা বলছি। আমি বিষসর্প প্রভুদের চির প্রয়াণের কথা বলছি দ্বন্দ্ব এবং বিরোধের পরিসমাপ্তির কথা বলছি সুতীব্র ঘৃণার চূড়ান্ত অবসানের কথা বলছি। আমি সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীতের কথা বলছি। যে কর্ষণ করে শস্যের সম্ভার তাকে সমৃদ্ধ করবে। যে মৎস্য লালন করে প্রবহমান নদী তাকে পুরস্কৃত করবে। যে গাভীর পরিচর্যা করে জননীর আশীর্বাদ তাকে দীর্ঘায়ু করবে। যে লৌহখণ্ডকে প্রজ্জ্বলিত করে ইস্পাতের তরবারি তাকে সশস্ত্র করবে। দীর্ঘদেহ পুত্রগণ আমি তোমাদের বলছি। আমি আমার মায়ের কথা বলছি বোনের মৃত্যুর কথা বলছি ভাইয়ের যুদ্ধের কথা বলছি আমি আমার ভালবাসার কথা বলছি। আমি কবি এবং কবিতার কথা বলছি। সশস্ত্র সুন্দরের অনিবার্য অভ্যুত্থান কবিতা সুপুরুষ ভালবাসার সুকণ্ঠ সংগীত কবিতা জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা। আমরা কি তাঁর মত কবিতার কথা বলতে পারবো আমরা কি তাঁর মত স্বাধীনতার কথা বলতে পারবো ?

শান্তিনিকেতনে ছুটি

নরেশ গুহ

…………………………… দূরে এসে বসে থাকি : সে হয়তো এসে ব’সে আছে। হয়তো পায় নি ডেকে, একা ঘরে জানালার কাঁচে বৃষ্টির বর্ণনা শুনে ভুলে গেছে এটা কোন সাল । ভুলে গেছে জীবনের দরিদ্র ধীবর আর জাল জোড়া দিতে পারবে না । যদি দেয়, তবু ক্ষীণ হাতে সেই ধূর্ত মাছটাকে পারবে না ডাঙায় ওঠাতে । পারলেও অভিজ্ঞান সে-অঙ্গুরি হয়তো বা ফিরে পাবে না কখনো তার শীতল পিচ্ছিল পেট চিরে । যদি পায় ? যদি তার এত কাল পরে মনে হয় — দেরি হোক, যায়নি সময় ? শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি : ছুটি শেষ । ভিজে আলতা- লাল শূণ্য পথ। ডাকঘরে বিমুখ কাউন্টর চুপ। কাল হয়তো রদ্দুর হবে, শুকোবে খোয়াই, ভিজে ঘাস । লোহার গারদ ঘেরা আম্রকুঞ্জে কবিতার ক্লাশ কাল থেকে ফের। ঘুমে ফোলা চোখ, ভাঙা- ভাঙা গলা, কবে সে মন্থর পায়ে পাতা-ঝরা ছাতিমতলায় একা এসে ঘুরে গেছে? ঘন্টা গুনে হঠাৎ কখন অকারণে দিন গেলো। ছায়াচ্ছন্ন শান্তিনিকেতন। কলকাতায় ফিরে যদি— যদি আজ বিকেলের ডাকে তার কোনো চিঠি পাই ? যদি সে নিজেই এসে থাকে ?

যেহেতু তুমি, যেহেতু তোমার 

তসলিমা নাসরিন

………………………………………………. তোমার কপালের ভাঁজগুলোকেও আমি লক্ষ করছি যে আমি ভালবাসি, ভালবাসি কারণ ওগুলো তোমার ভাঁজ, তোমার গালের কাটা দাগটাকেও বাসি, যেহেতু দাগটা তোমার আমার দিকে ছুড়ে দেওয়া তোমার বিরক্ত দৃষ্টিটাকেও ভালবাসছি, যেহেতু দৃষ্টিটা তোমারই। তোমার বিতিকিচ্ছিরি টালমাটাল জীবনকেও পলকহীন দেখি, তোমার বলেই দেখি। তোমাকে দেখলেই আগুনের মতো ছুটে যাই তোমার কাছে, তুমি বলেই, হাত বাড়িয়ে দিই, তুমি বলেই তো, হাত বাড়িয়ে রাখি, সে হাত তুমি কখনও স্পর্শ না করলেও রাখি, সে তুমি বলেই তো।

মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়

জয় গোস্বামী

……………………………………………. বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কথা ভাবো ? বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি । বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো । বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে ? সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে ? আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো ! স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চোখ বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক । রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যোৎস্না এসে পড়ে আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই ? কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই ?

কন্যাশ্লোক

মল্লিকা সেনগুপ্ত

…………………………….. আশ্বিনের এক প্রাগৈতিহাসিক সকালে শ্রীরামচন্দ্র যে দুর্গার বোধন করেছিলেন স্বর্গের দেবপুরুষগণ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যে রণদেবীকে অসুর নিধনে পাঠিয়েছিলেন সেই দুর্গাই একুশ শতকে নারীর ক্ষমতায়ন। তাঁর মহাতেজ চিরজাগরুক আগুন হয়ে জ্বলে উঠুক মাটির পৃথিবীর প্রতিটি নারীর মধ্যে। হে মহামানবী, তোমাকে সালাম!   মেয়েটির নাম দুর্গা সোরেন বটেক মায়ের ছিলনা অক্ষর জ্ঞান ছটেক। সর্বশিক্ষা অভিযানে পেয়ে বৃত্তি দুর্গা হয়েছে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি। সাঁওতালি গান, ইংরেজি ভাষা বাঁ হাতে কম্প্যুটারে শিখেছে ইমেল পাঠাতে। অঙ্কের স্যার ভুল হলে যোগ বিয়োগে গায়ে হাত দেয় পড়া শেখানোর সুযোগে। দুর্গা জানেনা কোনটা যৌন লাঞ্ছনা স্যারটা নোংরা বটেক!–কথাটা  মানছ না? শেষে একদিন স্যারের নোংরা হাতটা মোচড়ে দিয়েছে দুর্গা, মেরেছে ঝাপটা! ওরে অর্ধেক আকাশে মাটিতে শ্যাওলা আকাশে উড়বে, হবে কল্পনা চাওলা। যদি না বিমান ভেঙে পড়ে তার দুদ্দাড় মহাকাশচারী হবেই বটেক দুর্গা। বিশ্বায়নে পণ্যায়নে খণ্ড খণ্ড মানচিত্রে বাংলা বিহার রাজস্থানে সাধারণী নমস্তুতে! পণ্যব্রতে, পত্নীব্রতে মোহমুদ্রা,ধ্বংসমুদ্রা প্রযুক্তিতে গৃহকর্মে সাধারণী নমস্তুতে!    আমার দুর্গা পথে প্রান্তরে স্কুল ঘরে থাকে আমার দুর্গা বিপদে আপদে আমাকে মা বলে ডাকে। আমার দুর্গা আত্মরক্ষা শরীর পুড়বে, মন না আমার দুর্গা নারী গর্ভের রক্তমাংস কন্যা। আমার দুর্গা গোলগাল মেয়ে, আমার দুর্গা তন্বী। আমার দুর্গা কখনো ঘরোয়া, কখনো আগুন বহ্নি। আমার দুর্গা মেধাপাটেকর, তিস্তা শিতলাবাদেরা আমার দুর্গা মোম হয়ে জ্বালে অমাবস্যার আঁধেরা। আমার দুর্গা মণিপুর জুড়ে নগ্নমিছিলে হাঁটে আমার দুর্গা কাস্তে হাতুড়ি, আউশ ধানের মাঠে। আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে,স্বর্গে এবং মর্ত্যে আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে। আন্দোলনে উগ্রপন্থে, শিক্ষাব্রতে কর্মযজ্ঞে রান্নাঘরে, আঁতুড় ঘরে। মা তুঝে সালাম ! অগ্নিপথে, যুদ্ধজয়ে, লিঙ্গসাম্যে, শ্রেণিসাম্যে দাঙ্গাক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে। মা তুঝে সালাম! মা তুঝে সালাম! মা তুঝে সালাম!

ক্ষমা ঘেন্না করে দাও…

অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

……………………………… তোমাকে যে ডেকেছিল, সে তো অন্যলোক যাকগে যাক, ভাগ্যে থাকলে প্রসন্ন হোক তার দিনকাল। দয়াময়ী বলোতো এবার আমি কোনও দোষ করিনি। আপশোষ নেবার জন্য আমি ডাক পাব কেন? কেন অতর্কিতে, সাধ্য নেই, তবু বাধ্য যেতে হবে জ্যাকপট জিতে? হলে ঝাড়পিট বই……অখাদ্য ভিলেন…… তার সাথে দয়াময়ী, কালরাত্রে কোথায় ছিলেন, ভুল করেও জানিনি তো! তবু ভীত ঠান্ডা কুয়াশায়… গুপ্তচরেরা এসে জেরা করে কি আনন্দ পায়! তোমাকে দেখেছে যারা, তারা অন্যলোক… দৃষ্টির প্রসাদে … স্বাদে তারা ধন্য হোক! আমি তো প্রবল অন্ধ, তুমি জানো বন্ধ ঘরে থাকি। সেই আমাকেই ফেলে, আলো জ্বেলে, এ কোন মাজাকি! এই দেখ হৃৎপিন্ডত … মজ্জা দেখ… চূর্ণিত মগজ। দেখ আর মাপো হাড়, ফিতে নিয়ে ক’ফুট ক’গজ! রক্তে দেখ লোহা কম, অস্থিতে ক্যালসিয়ামও নেই… চ্যাম্পিয়নস মিটএ কেন যেতে হবে তবু আমাকেই? কিছুই চাইনা আর, ভালবাসা…স্নেহ…প্রেম…প্রীতি… ক্ষমা ঘেন্না করে দাও। শুদ্ধ বললে চাইছি নিষ্কৃতি…

একজন টেরোরিস্টের চিঠি 

সুবোধ সরকার

…………………………………………… প্রিয়তমাসু আমি তিনদিন খাইনি। কেউ কোনও খাবার দিয়ে যায়নি। কী করে দেবে? গুহার বাইরে প্রচন্ড বরফ পড়ছে। যে কোনও দিন আমি গুলিতে মারা যাব। যে কোনও দিন তুমি টিভির পর্দায় আমার মুখ দেখতে পাবে।আমি গুহার ভেতর সারারাত কম্পিউটরের সামনে বসে। কতদিন আমি বকুল ফুলের গন্ধ পাইনি। কতদিন আমি গরম রুটি খাইনি। কতদিন আমি তোমার ঘাসে হাত দিইনি। কালো ঘাস। আঃ! ভাবলেই চে গুয়েভারা ছুটে বেড়ায় শরীরে। স্টালিনকে হাতের মুঠোয় ধরে বসে থাকি। তার মুখ দিয়ে গরম বেরিয়ে আসে। আঃ, গরম। আমার স্টালিন ভালো আছে। তোমার সাইবেরিয়া? হা,হা,হা… এখানে কেউ আমার জন্মদিন কবে জানে না। আমি পড়াশুনায় ভাল ছিলাম। অধ্যাপক বাবার ছেলে। কম্পিউটরে আমার চাইতে কেউ ভাল ছিলনা। আজ আমি গুহায় বসে আছি।কিন্তু কেন? প্রিয়তমাসু,মাই লাভ,তুমি এর উত্তর পাবে যদি অত্যাচারের ইতিহাস পড়ো। কত হাজার কোটি ডলার খরচ করে ওরা গরিবকে আরও গরিব করে চলেছে। ১১ বছরের একটি বালককে একটি পাউরুটি কিনে দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোর কি হয়েছে রে? সে গোগ্রাসে পাউরুটি কামড় দিয়ে বলেছিলঃ আমার বাবা-মাকে ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে,জ্যান্ত। ছেলেটা খেতে খেতে কর গুনছিল, বাবা-মা, দুই ভাই, তিন বোন…এক,দুই,তিন,চার,পাঁচ… হ্যাঁ, এগারো জন। ছেলেটার নাম বলব না। কে খোঁজো। আজীবন খুঁজে যাও। প্রিয়তমা, আমাকে আর বেশি দিন ওরা বাঁচিয়ে রাখবেনা। তার আগেই আমি ওদের দু’দুটো ঘাঁটি উড়িয়ে দেব। ওদেরতো পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায়না, ওরা আবার জন্মায়, আবার গনতন্ত্র বানায়, আবার পার্লামেন্টে যায়।আবার প্রেস মিট করে। একটা সত্যি কথা লিখি, ওরা গনতন্ত্র দিয়ে যা করায়, আমরাও AK-47 কে, দিয়ে তাই তাই করাই। ওদেরটা দোষ নয়, আমাদেরটা দোষ। আমি মারা যাব। তার আগে একবার, যদি একবার তোমাকে দেখতে পেতাম। তোমার হাত ধরতে পারতাম।যদি একবার তোমার ভেতরে ঢুকতে পারতাম, যেভাবে বরফ ঢোকে গুহায়,যেভাবে শিকড় ঢোকে পাথরে,যেভাবে ভাইরাস ঢোকে কম্পিউটরে। আজ আমি একজন টেররিস্ট। হয়তো এটাই আমার শেষ চিঠি। বলতো,কেন আমার মত ছেলে টেররিস্ট হবে? কেন আমি ঘর-বাড়ি ছেড়ে,মায়ের হাতের খাবার ছেড়ে, ভাল চাকরী ছেড়ে;গুহার জীবন,জঙ্গলের জীবন, বরফের জীবন বেছে নিলাম? আমি মাতাল হতে পারতাম।লম্পট হতে পারতাম। একজন মাতালকে মেনে নেয় সমাজ। একজন লম্পটকে মেনে নেয় রাষ্ট্র। একজন মাফিয়া বিধায়ককে মেনে নেয় এসেম্বলি। কিন্তু একজন টেররিস্টকে মেনে নেয়া যায়না। কতদিন তোমার স্নান করা চুলের গন্ধ পাইনি। চোখ ভরে আসে জলে। পাউরুটি খাওয়া শেষ করে ১১ বছরের ছেলেটি বলেছিল,আর আছে? আমি আর একটা পাউরুটি কিনে দিয়ে বলেছিলাম; শোন্ তুই বড় হয়ে কী করবি? সে বলেছিলঃ বদলা নেব। ছেলেটার মুখ ভেসে ওঠে যেই মনে হয় আমার সামনে অনেক অনেক কাজ। অনেকগুলো খারাপ কাজ। ভুল বললাম,অনেক,অনেক,ভালো কাজ। আমাকে ক্ষমা করো। মা’কে একবার দেখে এসো। বোকা মেয়েটা আমার মা হয়ে কোনও অন্যায় করেনি। ইতি- কোন নাম নেই পুনশ্চঃ আমি মরে গেলে, আমাকে তুমি ‘আকাশ’ বলে ডেকো।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>