বাবা একটি বটবৃক্ষের নাম


সেলিম রেজার বাবা মোহাম্মদ ইউনুছ

‘বাবাদুটো অক্ষরের নাম। মানে এক বিশাল সমুদ্র বা তার থেকেও অধিকতর বেশি। বাবা একটি সুশীতল, ছায়াঘন বটবৃক্ষের নাম। বাবা-শব্দের ব্যাপকতা কেউ কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। বাবাকে নিয়ে লিখতে হবে অনুভূতির কথা কিন্তু সেই অব্যক্ত কথাগুলো বাবা পড়তে বা জানতেই পারবে না। কারণ উনি হজ্বে যাবার পথে চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে অকস্মাৎ মৃত্যু বরণ করেন। আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন সেই ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪-এ। বাবাকে হারানোর ক্ষতটা এখনো শুকায়নি। বাবা’র স্মৃতি নিয়ে  কিছু লিখবো বলেই ঠিক করেছিলাম কিন্তু সময়-সুযোগ না হওয়াতে শেষ পর্যন্ত লেখা হয়ে উঠেনি। বাবাকে নিয়ে অনেকেই আমরা তেমন কিছু ভাবি না। কিন্তু বাবাই প্রথম শিক্ষক যে আমাদেরকে নৈতিক জ্ঞান দান করেন। শত কষ্টের মাঝেও বুঝতে দেন না, উনি কতটা পরিশ্রম করছেন। সাংসারিক উন্নতি আর আয়ের বোঝা কিন্তু বাবার কাঁধেই থাকে।অক্লান্ত পরিশ্রম তবুও হাসির ঝলক, বুঝতে দেয় না তাঁর খাটনির কথা। জীবনের ঘানি টানতে টানতে বাবা এক সময় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, প্রতিনিয়ত বার্ধক্য তাকে গ্রাস-জর্জরিত করে। তখন অনেকটা অসহায়, দুর্বল হয়ে পড়েন। রোগব্যাধি তাকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। এ সময় প্রত্যেক বাবা চায় তার সন্তান পাশে থাকুক। শিশু অবস্থায় সবসময় যেমন সব প্রয়োজনে তিনি ছিলেন সন্তানের পাশে। সন্তানের কাছ থেকে অবহেলা কিংবা দুর্ব্যবহার পেলে বাবার হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।  

ছোট শিশুদের প্রতি আমরা যতটা না সচেতন ততটা যদি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি হতে পারতাম তাহলে সমাজে বৃদ্ধাশ্রম নামের জেলখানা থাকতো না।বিশ্বব্যাপি বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা কিন্তু একদম হাতেগোনা কয়েকটা হতে পারতো। বাবা-মায়ের প্রতি যত্ন সব সন্তানদের একান্ত ফরজ। দুনিয়ায় যত বাবা-মা আছেন সবার সুস্থতা এবং যারা আমাদের ছেড়ে গেছেন তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষভাবে প্রার্থনা করুন।মা-বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ উপহার। দুনিয়ার সব মানুষের বিকল্প কল্পনা করা সম্ভব হলেও মা-বাবার বিকল্প নেই। কবির ভাষায়- “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে” আমার মাঝেও যে এক শিশুর পিতা ঘুমিয়ে আছে সেটা ভাবলেই চোখে জল আসে। বাবা-মানেই যোদ্ধা। আজকের বাবা দিবসে, আমার অতি সাধারন হয়েও অসাধারন বাবাকে জানাচ্ছি শুভেচ্ছাপূর্ন কৃতজ্ঞতা। বাবা শুধু সুশীতল ছায়াই নয় বরং আমাকে দিয়েছেন গর্ব করার পূর্ন অধিকার। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি-এই কথাটা বলা হয়ে উঠেনি, তুমিই আমার পৃথিবী কিন্তু আজ আমার পৃথিবী শূন্য। সমাজ সংসারে পারিপার্শ্বিক রূপ রেখায় অনেক কিছুই বদলে যায়-যাচ্ছে; মায়া-মমতা বিলীন হচ্ছে, হাইটেক সময়ে সবাই নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত। যেকোন দুঃসময়ে বাবাকে সব সন্তানই খুব বেশি মিস করে। অনেকেই বলে-পিতৃহারা সন্তানকে পিঁপড়াও কামড়ায়; সুযোগে সবাই স্টিমরোলার চালায়। বেঁচে থাকার অনাবিল আনন্দে,  দৈন্য-কষ্টের তীব্রতায়, কঠিন-জটিল সমস্যায় বাবাই হয়ে ওঠেন বিপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা সহায় কিংবা একমাত্র আশ্রয়স্থল। মানবজীবনে বাবার অবদান এবং গুরুত্ব অপরিসীম।

অনেকের বাবা সেলিব্রেটি হলেও আমার  বাবা অতি সাধারণ।তবে আমার চোখে উনিই শ্রেষ্ঠ সেলিব্রেটি। বাবা,আমাদেরকে উনার আর্দশে মানুষ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রচেষ্টায় হরহামেশা তিনি লেগে থাকতেন। আজ সুখের দিনে বাবা নেই। আসলে আমরা সময়ে অনেক কিছুর কদর করি না, কিন্তু অসময়ে খুঁজে বেড়ায় তার যথাযথ মূল্যায়ন করার জন্য।

কন্টকাকীর্ণ পথে পাড়ি দেয়া প্রত্যেক সন্তানই বাবাকে স্মরণ করে। কিন্তু সময় যে বড় নিষ্ঠুর। বাবা-মাকে হারিয়ে নিঃস্ব সন্তানরা কোন কূল কিনারা পায় না। আজকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা যতটা না কোট টাই পরা সভ্য হচ্ছি ততটাই নৈতিক অবক্ষয়ে পতিত হচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায়শই দেখা যায়- বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি অত্যাচার যে চরমে তার নমুনা। আমরা কেন তাঁদের প্রতি সহনশীল হতে পারছি না? কেনই বা আমরা বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করছি? সবাই যে এমন তা কিন্তু না।    

লালন-পালন, আর সাধ ও সাধ্যের যোগানদাতা বাবা। বাবাই সেরা, হউক আমার বাবা কিংবা অন্যের। আমি গর্বিত উনার সন্তান হতে পেরে। কারণ উনিই শাসনের ছলে একদিন বলেছিল-‘ আমি অন্য বাবাদের মতো না

কথায় কথায় শাসাবো না

তোমরাই ভালো বুঝো ভবিষ্যতে কী করবে

তোমরাই ভালো বুঝো কী নিয়ে ঘরে ফিরবে’।

শুধু ভালোবাসা বা আদর-শাসন নয়,  একজন বাবা  দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে তাঁর সন্তানকে বড় করে তোলেন। সমাজের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। খেটে খাওয়া শ্রমিক, কৃষক, রিকশাচালকের সন্তানরা অনেক সময় উকিল, ব্যারিস্টার, বিসিএস ক্যাডার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে স্বগর্ভে সমাজে প্রতিষ্টিত হচ্ছে। প্রায়শই দেখা যায়…হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করছে। সেইসব বাবাদের স্যালুট। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। আমাদের সবার উচিত বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। তারা বৃদ্ধ বয়সে যাতে কোনোভাবে অবহেলার শিকার না হন সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। অনেক সন্তান রয়েছে, যারা মা-বাবার দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নয়। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা, সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। বাবা প্রত্যেক সন্তানের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস। বাবা’র প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানাতে আজ বিশ্বব্যাপি ১৬ জুন ‘ বিশ্ব বাবা দিবস’ পালন করা হয়। 

প্রতিবছর জুনের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশেও আজকাল বেশ ঘটা করেই বাবা দিবস পালিত হয়ে থাকে। বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে।বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে কোনদিন উদ্‌যাপনের প্রয়োজন হয় না। তবুও বাবা দিবসে সন্তানরা সুযোগ পায় বাবাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানানোর। প্রতিদিনই হোক বাবা দিবস ।সকল বাবার প্রতি শ্রদ্ধা…  

বাবাকে লেখা সেলিম রেজার কবিতাঃ

বাবা ফিরবে বলে তাকিয়ে আছি পথে

( হজ্বে যাবার পথে ১৩ সেপ্টম্বর ২০১৪ইং চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে অকস্মাৎ মৃত্যুতে বাবার পূর্ণ্যস্মৃতিতে নিবেদিত )

বাবা কবে ফিরবে তুমি

অপেক্ষা করছি বুকে টেনে নেবে বলে

শত ভিড়েও খুঁজে নেবে তোমার পুত্রধনকে

চোখের আড়াল হতে দেবে না কখনো;

কিন্তু বিধিবাম তুমিই আজ চোখের আড়াল হলে

ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি ফিরতি ট্রেনে ফিরবে বলে

সবাই ফিরে যে যার মতো

একটি বার ফিরো একটি বার শাসন করো

কথা দিলাম তোমার অবাধ্য হবো না কখনো আর

তোমার পছন্দের যা কিছু সব ঠিকঠাক

বাবা তুমি কী জানো

উড়োজাহাজের শব্দে মা শূন্য আকাশে তাকিয়ে

এখনো ভাবে তুমি ফিরছো আমাদের মাঝে

মনে পড়ে একদিন তুমি শাসনের ছলে বলেছিলে

‘আমি অন্য বাবাদের মতো না

কথায় কথায় শাসাবো না

তোমরাই ভাল বুঝো ভবিষ্যতে কী করবে

তোমরাই ভাল বুঝো কী নিয়ে ঘরে ফিরবে’

আজ খুব বেশি মনে পড়ছে তোমায়

বাবা তুমি কেমন আছো!!

বিধাতার অশেষ মেহেরবানীতে নিশ্চয়ই ভালো আছো

মা আমাদের আছে আঁকড়ে

ভাই বোনেরা সবাই মিলে করছি প্রার্থনা

তুমিও থেকো জান্নাতুল ফেরদৌসে

আল্লাহ্‌র অশেষ মেহেরবানী হাজ্বীদের কাতারে

আমাদের জন্যে করো দোয়া

আমরাও যেন তোমার মতো করে মরতে পারি

গায়ে এহ্‌রামের কাপড় জড়িয়ে মক্কা মদিনার পথে…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত