অপত্য-সমুদ্র


রুমা মোদকের বাবা প্রিয়তোষ মোদক

বাবা দিবস।বাবাকে নিয়ে বিশেষ দিবস সামনে রেখে লিখতে বসা।হ্যা খুব ইচ্ছে করেই।এই যে যাদের জন্য, যা কিছুর জন্য নিজেকে নিংড়ানো অনুভব,কখনো যার অবিরত অবয়ব সনাক্ত করতেও ভয় হয়, থৈ হারাই ভেবে সেই তাঁকে নিয়েই লেখা! দুঃসাধ্য দুঃসাহস বৈকি। সেই দুঃসাহস করেছি আমি একটি বিশেষ দিন সামনে রেখে, সেই আমি যে আমি দিবস টিবস সামনে রেখে লেখার প্রথাগত ধারণা ভেঙেচুরে লিখে যাই,লিখেই যাই হোক বা না হয়ে উঠুক কিছু। আজ লিখতে বসেছি,কারণ এর আগেও আমার বাবা চলে যাবার পর বারকয়েক কেউ কেউ বলেছেন, বাবাকে নিয়ে লিখতে। আমি  ঠিক কাগজ কলম নিয়ে বসেছি। কিন্তু পারি নি। বারবার থেমে গেছি।

সমুদ্র অভিমুখী স্রোতস্বিনী নদী, কাকচক্ষু জলের প্রশান্ত দীঘিতে অবগাহনের বিমূর্ত অনুভব বোধকরি কাগজ কলম তবু প্রকাশে সক্ষম।কিন্তু কূলহীন, থৈহীন যে অপত্য সমুদ্রে আমি নিমজ্জিত থেকেছি আকণ্ঠ, কোনদিন ভাবিনি এর থেকে ভেসে উঠতে হবে, ভেবেছি এই ডুবে থাকার নামই অপার শান্তি,স্বস্তি কিংবা এই ডুবে থাকার নামই বেঁচে থাকা কিংবা এর অস্বাভাবিকরকম স্বাভাবিকতায় কিছু ভাবারই অবকাশ পাইনি, সেই প্রবহমান আশ্রয় যখন সরে গেলো  স্নেহ আর নির্ভরশীলতার আর্দ্রতা গিলে খেয়ে আমাকে শুষ্ক মরুতে ফেলে, তখন সত্যি আমি পথ হারিয়ে ফেলি,খেই হারিয়ে ফেলি।হারিয়ে ফেলি জীবনের মানে। বাবাকে নিয়ে লিখবো কী, বাবাহীন জীবনের খেই ইতো খোঁজে পাই নি এখনো।

বাবাকে নিয়ে লিখতে গেলে কোথা থেকে শুরু করতে হয়? যখন তিনি পিতা হয়েছেন,আমি বাবা নামের একটা সত্তার বিপুল ও বিশাল ছায়ার মানে বুঝতে শিখেছি তখন থেকে নাকি যখন তিনি পিতা হন নি,মাতৃহীন এক বিশাল সংসারের বড় সন্তান হিসাবে জীবন শুরু করেছেন কুরুক্ষেত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর কর্ণের মতো,সকল যোগ্যতা সত্ত্বেও কেবল নিয়তির সাথে যুদ্ধের জন্য। সব অপ্রাপ্তি সব অনায্য সব দুর্ভাগ্য সঙ্গে নিয়ে যিনি মহামতি বুদ্ধের মতো নির্বিকার, বোধীপ্রাপ্ত বুদ্ধের মতো নির্মোহ। জীবনের কাছে তার পাওয়ার ছিলো অনেককিছু, কিন্তু পান নি অনেক কিছুই। সেই বেদনা আজ বাবাহীন পৃথিবীতে আমাদের বেদনায় মুষড়ে দেয় অথচ তাঁর কোন অভিযোগ ছিলো না, কোন বেদনাবোধে তাড়িত দীর্ঘশ্বাস ভুলেও বাতাসে ভেসে লাগেনি আমাদের দায় কিংবা দায়িত্বের তাড়ায়। ফলে আমরা ভেবেছি বাবা বোধহয় এমনই, কেবল আমাদের দিয়ে যাওয়াই  কাজ তাঁর। আমাদের কিছুই দেয়ার নেই তাঁকে। পার্থিব কী দিয়ে খুশি করা যায় এমন নির্মোহ ঋষিকে?

  কোথা থেকে শুরু করবো আমি? পিতৃত্বের অন্তস্থ ফল্গুধারা যখন তাঁর  সুকঠোর শাসন আর সুশিক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকতো শীতল প্রস্রবণের মতোই। অনেকগুলো বছর যার খোঁজই পাইনি আমরা, সেখান থেকে?  নাকি অভাব অভিযোগ হীন এক লড়াকু যোদ্ধার সেই জীবন যুদ্ধ শুরুর বিন্দু থেকে, যা কখনোই কোন আফসোস বা আক্ষেপের আবেগে বলেন নি তিনি। বরং অবসরের ক্লান্ত ফাঁকে তিনি কখনো গল্পগুলো বলতেন ঈশপের মতো,যেনো অবচেতনেও জীবনকে প্রস্তুত রাখি যে কোন লড়াইয়ের জন্য। এ যেনো এক আবশ্যকীয় হিমোগ্লোবিনের ধারা,নিয়ত প্রতিবন্ধকতাময় যাপনে লড়াইয়ের প্রস্তুতি,বেদনার সুঁই ফোঁড়ে অমিয় জীবন প্রবেশ করছে রক্তরবাহে অন্তর্গত চেতনা প্রবাহে। আসলে কোথা থেকে শুরু করি আমি থৈ পাইনা। থৈ পাইনা।

বাবার উপর আমার অনেক অভিমান করার কথা ছিলো অথচ তা আমি করতে পারি নি কোনকালে। বাবারও অনেক অভিযোগ থাকার কথা আমার প্রতি। অথচ কী এক অদ্ভুত বোঝাপড়ায় তাঁর বদমেজাজের সাথে, অন্তস্থিত বিপুল স্নেহস্রোতের সাথে নীরব বোঝাপড়া আমার। আমার সব অক্ষম অযোগ্যতা ক্ষমাপূর্বক তিনি যেমন আশ্রয় দিয়েছেন নির্ভয় ডানার নিচে। আমার স্বাধীন ইচ্ছায় বারবার বাঁধা দেওয়া আপসহীন বাবার উপর কোন অভিমানের জন্মই হয় নি আমার ভেতরে।    

অন্য অনেক কিছুর কথা বাদ রাখি,বান্ধবীর বোনের বিয়ে কিংবা সহপাঠীরা মিলে চড়ুইভাতি, অনুমতি মিলবে না জেনে চাইতামই না কোনদিন।    

কিন্তু কতোবার শহরের মঞ্চে উঠে উপস্থাপনা করতে চেয়েছি, অভিনয় করতে চেয়েছি। বেতারে সঞ্চালনার ডাক পেয়েছি,বাবার না। কেঁদে চোখ ফুলিয়েছি, যেনো কিছুই হয়নির মতো বাবা ডেকেছেন, খেতে এসো। কী স্বাভাবিক অথচ অমোঘ অলঙ্ঘনীয় স্বর!

আমার সাধ্য কী ঠোঁট ফুলিয়ে বলি, আমি খাবো না। আমি রাগ করেছি!         

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। বাবা আমার মার্কশিট প্রশংসাপত্র এডমিট কার্ড নিয়ে বসে আমাকে বোঝাচ্ছেন, শখ ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হয়েছো। এটাই তোমার অর্জন। ভর্তি হতে হবে না। এখানেই ভর্তি হয়ে যাও স্থানীয় কলেজে। আমি বক্তব্যের আকস্মিকতায় বিমূঢ়, কেঁদেই চলেছি তাঁর সামনে। তিনি বলছেন, আর আমি টের পাচ্ছি যুদ্ধটা তিনি করছেন নিজের সাথে নিজে। যে পরিবার থেকে কোন ছেলেই কোনদিন শহরের সীমা পেরিয়ে বাইরে পড়তে যায় নি, সেই পরিবারের এই প্রজন্মের বড় মেয়ে আমি,নিজের সংস্কার, অভিজ্ঞতা, মধ্যবিত্তের আপসকাম অতিক্রম করে তিনি কিছুতেই পেরে উঠছিলেন না সেই যুদ্ধে। বোধহয় তার এই যুদ্ধ অতিক্রম করেছিলো অতীতের সব রূঢ় যুদ্ধ। মা যখন আমাকে ভর্তি করতে নিয়ে যান, ভারাক্রান্ত মন যথাসম্ভব অস্বীকার করে বেঁধে দিচ্ছেন আমার তোশক বালিশ, থালা গ্লাস আর সবশেষে এক বাণ্ডিল পোস্টকার্ড । প্রতি সপ্তাহে একটা চিঠি লিখবে কেমন আছো জানিয়ে।  কোথায় তার সেই বাঁধা দেয়ার কঠোর অবস্থান। অপার স্নেহের কলমে তিনি কেবল আমায় লিখে চলতেন, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করো। শরীর স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রেখো। কোনোদিন কোনোদিন ভুলেও লিখেন নি, ভালো করে লেখাপড়া করো, ভালো ফল করো। তবু যখন ভালো ফল নিয়ে বাড়ি ফিরতাম, ডেকে ডেকে সবাইকে বলতেন। আহা বাবার চেহারায় প্রতিফলিত সেই অমিয় সুখ, আজ মনে হয় এ আমার স্বর্গবাসেরও অধিক।

ভার্সিটি ছুটি হলে পোস্টকার্ড লিখে জানাতাম,এতো তারিখে বাড়ি ফিরছি। দূর থেকে দেখতাম দোকানের বারান্দার এমাথা ওমাথা হাঁটছেন আমার অপেক্ষায়। আর তার পরদিন থেকে শুরু হতো তাঁর সীমিত সামর্থ্যের ঈদ। আমার পছন্দের ছোটমাছ, সোনারু হাজির দোকানের কেক….যতোটা সাধ্যে কুলায়।

অসুখে পরতাম যখন, সেই অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করা দৃঢ় বাবাটাকে আমি চিনতে পারতাম না।নির্ঘুম রাত জেগে বসে আছেন পাশে, বারবার জানতে চাইছেন, খাবে কিছু? হরলিক্স? একটু লাল চা? আহা বাবা, পরদিন সকাল বেলায় অফিস তাঁর। দুপুরে ফিরে ড্রেস না বদলেই আমার খাবারের থালা নিতেন হাতে, মাছের টুকরো না রুচলে একটু ডিম ভেজে দেই? একটু ঘি? মার জন্য অপেক্ষা নেই। নিজেই তৈরি করে নিতেন এটা সেটা। আমাকে খাওয়ানোর পর যে সামান্য অবশিষ্ট সময় থাকতো হাতে,নিজে নাকেমুখে গুঁজে দৌড়াতেন।      

কেবল নিজেকেই লিখছি,লিখে যাচ্ছি। তিনি যে এক হার না মানা স্পার্টাকাস! যে স্পার্টাকাসদের গাথা কখনো ইতিহাসে লেখা হয় না। যতোদিন আমরা আছি তাঁর জৈবিক সন্তান আর তাঁর অনন্য আদর্শ ধারণ করা সন্তানেরা, আমরা জানি আমাদের সাথেই শেষ হয়ে যাবে তাঁর স্মৃতিও। কেউ মনে রাখবে না আর। যেমন মনে রাখে নি পাথরে পাথর ঘষে আগুন জ্বালানো সেই আদিম মানবকে, মনে রাখে নি পুরাপোলিও নবপোলিও সভ্যতায় যারা প্রাণ সঞ্চার করেছিলো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য।

বংশানুক্রমিকভাবে এক অসম্ভব মেধাবী জিন বহন করা পরিবার তাঁর। আমার প্রপিতামহ  সেই প্রায় ১৫০ বছর আগে আইন পেশার জন্য গ্রাম ছেড়ে গঞ্জে বসতি স্থাপন করেছেন। শিক্ষা আর সুরুচির এক অন্তর্গত স্রোত সেই পরিবারে বয়ে চলে সময়ের অগ্রগামীতা সঙ্গে নিয়ে। প্রপিতামহের অকাল প্রয়াণ একটা পরিবারকে ফেলে দেয় অকূল অনিশ্চয়তায়।  আমার পিতামহরা তিন ভাই এন্ট্রাসে কী যেনো খুব ভালো রেজাল্ট করেও লেগে যেতে বাধ্য হলেন জীবিকা নির্বাহে।

অন্য দুজন ঠিকঠাক খাপ খাইয়ে নিতে পারলেও, আমার পিতামহ বারবার চাকরি ছাড়তেন নিজের তীব্র নৈতিকতা আর বদমেজাজের কারণে। আর এর কারণেই একদিন ব্রেন্সট্রোক করে অর্ধাঙ্গ অবশ শয্যাশায়ী হলেন। তার আরো কয়েক বছর আগে আমার ছোটকাকাকে দু বছরের রেখে নবম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে চলে গেছেন আমার পিতামহী।

নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আমার বাবাকে পিতামহ দিয়ে আসেন মাধবপুর।ট্রেইলারিং কাজ শিখতে। বারান্দায় ঘুমিয়ে মশার কামড়ে হাত মুখ ফুলিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে।পিতামহ প্রচণ্ড মেরেছিলেন তাঁকে সেদিন। তাঁর বখে যাওয়ার কথা, তাঁর ট্রেকলেস হওয়ার কথা তিনি প্রচণ্ড জেদি হয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র পড়িয়ে। মেট্রিক, ইন্টার….হয়তো এই জেদ তাঁকে নিয়ে যেতো অনেক দূর। কিন্তু এই যে ভাগ্যহত কর্ণ! রথের চাকা যার বিণাদোষে দেবে যায় যুদ্ধক্ষেত্রে।

পিতামহের অর্ধাঙ্গ অচল হওয়ার পর মাত্র ১৭ বছর বয়সে ৮ জনের সংসারের হাল ধরেন বাবা। তারপর তো কেবল লড়াই চালিয়ে যাওয়া! একটি সংসার কয়েকটি মুখ টিকিয়ে রাখা। তিনি যখন মহাপ্রস্থানে গেলেন, লোকজন সান্ত্বনা দেয় আমাদের। সুখের প্রস্থান তাঁর। ভাইবোন সব প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়েরা।ভাতুষ্পুত্র ভাতুষ্পুত্রীরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার। একই কলেজের স্টুডেন্ট বলে বাবাকে হাসপাতালের বড় বড় সব ডাক্তাররা দেখছেন পরিবারের সদস্যের মতো। ভাগ্নে আর ভাস্তি ডাক্তার দুজন আই সি ইউ তে সবসময় তাঁর পাশে। যেতে হয় সবার, এমন যেতে পারে কজন!

সেইতো জন্মের সাথে যে অমোঘ সত্য নিয়ে জন্ম নেয় মানু,  সেতো মৃত্যু। তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করে গেছেন ষোল আনার জায়গায় আঠারো আনা। কিন্তু জীবনের কাছে তিনি পেয়েছেন কী? এই ভাবনা যখন পীড়িত করে তখন এক ঋষিতুল্য মনীষীকে দেখি, যার কিচ্ছু চাওয়ার নেই জীবনের কাছে।  তিনি কী পেয়েছেন বলে আমরা তুচ্ছ আবেগে ভারাক্রান্ত হই অথচ কী সুখী ছিলেন তিনি নিজে! কোন প্রত্যাশা নেই কারো কাছে অভাব নেই অভিযোগ নেই! এক নিকাটাত্মীয়ের ঘুষ দিয়ে চাকরি হলে তিনি অবাক হয়ে আমাকে বলেন, সত্যি ঘুষ দিয়ে চাকরি হয়!! বেশিদিন আগে নয়,তিনি পেনশনে যাবার বছর ১০ পরে। অথচ আমার মা অভিযোগ করেন,যেসব চেয়ারে তিনি চাকরি করেছেন সেসব চেয়ারে আর যারা বসেছে তাদের সবার শহরে তিন চারটা বাড়ি। আর আমাদের সম্বল কয়েক পুরুষের বসত ভিটা। অস্পষ্ট মনে পড়ে আমার মা ঘ্যানঘ্যান করতেন, ঐ জায়গাটা রাখো,মাসে মাসে টাকা দিয়ে দেবে। জায়গার মালিক দিতে রাজি। আর আমার বাবা নির্বিকার একটা বার্মিজ টেম্পল আকৃতির রেডিওর নব ঘুরিয়ে গান শোনছেন- পিয়ার কিয়াতো ডরনা কিয়া…..।

এক অসম্ভব রুচিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন আমার বাবা। তীব্র দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট, তবু পরীক্ষা শেষ হলে আমার জন্য ঠাকুরমার ঝুলি আনতে ভুলছেন না। ভুল হচ্ছে না ক্লাসে প্রথম হবার প্রগ্রেস রিপোর্টটা  হাতে তুলে দেয়ার দিনই নতুন বইয়ের সেট কিনে আনতে। হেমন্ত, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র কে আমরা চিনেছি তাঁর হাত ধরে। চিনেছি শরৎ বঙ্কিম বিভূতিভূষণ আর জুলভার্ণকে।

আমার বাবার অন্তিম যাত্রার সময় লোকে লোকারণ্য। কতো কথা কতো স্মৃতি কতো আহাজারি! পাড়া পড়শি, আত্মীয় পরিজন, নেতা মুরুব্বি কে নেই। কেউ একজন বলছেন, দাদা কোনদিন কোন মন্দিরে যেতেন না। আমার কানে ধাক্কা দিলো কথাটা। ঘরেও কী কোনদিন তাঁকে দেখেছি বসেছেন কোন অলৌকিক শক্তির কাছে নত হয়ে? কোনদিন দেখি নি। তখনই মনে হলো বাবাকে তো কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি, ঈশ্বর নিয়ে তাঁর ভাবনা কী! আর তো জানা হবে না কোনকালে। মা যখন চাল-কলার ভোগ সাজাতেন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে, বাবা বলতেন, ঠাকুর তোমাকে খাওয়ায় নাকি তুমি ঠাকুরকে খাওয়াও?

বাবার দৃষ্টিভঙ্গি দর্শন বুঝি এই কয়টি কথাতেই মূর্ত। বাবা চলে যাবার পর খুব কষ্ট হতো। খুব বেশি নির্ভরশীল ছিলাম যে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল  খাবো না নাপা, তাও বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিতাম। শান্তনু ক্ষেপাতো আমাকে, এফ সি পি এস ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপশন প্রিয়তোষানন্দ অনুমোদন না দিলে খাওয়া হবে না। আমার বাবা শ্রী প্রিয়তোষ মোদক। হিন্দুদের অন্ধ বিশ্বাসের ধর্মীয় গুরুর নামের সাথে ‘আনন্দ’শব্দটি যোগ হয় বলে আমাদের অন্ধ নির্ভরশীলতা দেখে নামটি এভাবে বলতো শান্তনু।

প্রতিদিন কাঁদতাম তখন,বৃষ্টি এলে কাঁদতাম, বাবা ভিজছেন। প্রচণ্ড রোদ উঠলে কাঁদতাম বাবা রোদে পুড়ছেন। ধীরে ধীরে বাবাকে হৃদয়ে আত্মস্থ করেছি আমি। মনে হয় পঞ্চভূতে মিশে তিনি আমাকে দেখছেন। কে বলে তিনি নেই? চোখের সামনে নেই। আমি কেনো কাঁদি? আমার কষ্ট হচ্ছে বলে। কিন্তু তিনিতো মুক্তি পেয়েছেন এই নশ্বর পৃথিবীর ভব যন্ত্রনা থেকে, রোগ জরা ব্যাধি থেকে। তিনি তো গেছেন অনন্ত শান্তির পথে। তাঁর জন্য কাঁদি নাকি। স্বার্থপর আমরা তো কাঁদি আমাদের কষ্ট হচ্ছে বলে।                      

                                                                                   

 

                                                        

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত