| 17 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস

মেয়ের স্মৃতিকে যেভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাবা

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

‘নিরমা…ওয়াশিং পাউডার নিরমা…’ ভারতের কাপড় ধোয়ার এই গুঁড়া পাউডারের বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল যেন ভোলার নয়। জিঙ্গেলটি একসময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। এমনকি কাপড় ধোয়ার পাউডারের ক্ষেত্রে এই গান দেশটিতে আইকনে পরিণত হয়েছিল। ডিটারজেন্ট পাউডারের প্যাকেটের গায়ে সাদা ফ্রকের ছোট্ট মেয়ের অবয়বের লোগো যেন খুব চেনা হয়ে গিয়েছিল মানুষের। এমনকি ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও বিজ্ঞাপনটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পাউডারটির সঙ্গে পরিচিত ছিল এ বাংলাদেশের মানুষও।

তবে পাউডারের প্যাকেটের গায়ের নিরমা নাম ও ঝলমলে ওই ছোট্ট মেয়ের ছবির পেছনে রয়েছে খুবই বেদনাদায়ক এক গল্প। ভারতের গণমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে একবার তুলে ধরা হয়েছিল সেই তথ্য।

বলা হয়, গুজরাটের এক তরুণ রসায়নবিদের স্বপ্নকে সত্যি করেছিল বিজ্ঞাপনটি। সামান্য থেকে শুরু করা গুজরাটের ব্যবসায়ী কারশানভাই প্যাটেলের এই পণ্যকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিল ‘ওয়াশিং পাউডার নিরমা’ জিঙ্গেলটি। ১৯৬৯ সালে ব্যবসা শুরু করেছিলেন কারশানভাই প্যাটেল। প্রথম দিকে তিনি আহমেদাবাদে ভূতত্ত্ব এবং খনি দপ্তরের অধীনে চাকরি করতেন। ওই কাজ করার পাশাপাশি সকাল–বিকেল সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই ডিটারজেন্ট পাউডার বিক্রি করতেন। নিজের বাসায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একটি ঘরে বসে এই পাউডার তৈরি করতেন কারশানভাই নিজে। শুরুতে কেউ চিনত না পণ্যটি। তাই অনেকে ফিরিয়ে দিতেন। দিনে বড়জোর ১৫ থেকে ২০ প্যাকেট বিক্রি হতো। তবে দমে যেতেন না কারশানভাই। তাঁর পণ্যটিকে জনপ্রিয় করতে নানা ধরনের ব্যবসায়িক বুদ্ধি বের করতেন।

যেমন একবার করলেন কি, এক কেজি পাউডারের দাম রাখলেন মাত্র ৩ রুপি। এত কম দামে এত পরিমাণ পাউডার, দ্রুত মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করল। কারণ, সে সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের গুঁড়া পাউডার। যার দাম ছিল ১৫ রুপির মতো। শুরু হলো ভালো ব্যবসা। ১৯৭২ সালের দিকে ব্যবসার সফলতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন কারশানভাই। তখন চাকরিতে বেশি সময় দিতে পারতেন না। সারাক্ষণ ব্যবসার চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। তাই নিজ থেকে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।
ব্যবসায় আরও বেশি সময় দিতে শুরু করেন। কিছু কর্মীও নিয়োগ দেন। তাতে একটু একটু করে বাড়াতে শুরু করে ব্যবসা। বিভিন্ন দোকানে বাকিতে পাউডার দিতেন। সমস্যা হলো ঠিক সময় দাম পরিশোধ করতেন না অনেকে। পুঁজিতে ঘাটতি পড়তে শুরু করে। তখনই ব্যবসা বাড়াতে বিজ্ঞাপন প্রচারে যান কারশানভাই।

এ সময় ম্যাজিকের মতো কাজ করেছিল তাঁর ডিটারজেন্ট পাউডারের জিঙ্গেলনির্ভর বিজ্ঞাপনটি। বিশেষ করে সে সময় থেকে বহু বছর ঘরে ঘরে গৃহিণীদের কাছে পৌঁছেছিল এর সুর। এক বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে দিতে বলেন কারশানভাই প্যাটেল। পাউডারের প্যাকেটের ওপর আঁকানো হয় ‘নিরমা গার্ল’-এর একটি ছবি। নিরমা ছিল কারশানভাইয়ের ছোট্ট মেয়ে। এক দুর্ঘটনায় মারা যায় আদরের মেয়েটি। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। আদরের মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুতে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন কারশানভাই। মেয়েকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। নিরুপমা ছিল মেয়েটির নাম, যাকে আদর করে নিরমা ডাকতেন। তাই মেয়েকে সারা জীবন স্মৃতিতে ধরে রাখতে প্যাকেটের গায়ে মেয়ের ছবি আঁকালেন কারশানভাই।
বাঙালি ইলাস্ট্রেটর ধীরেন্দ্রনাথ শূরের তুলির ছোঁয়ায় প্যাকেটের গায়ে ফুটে ওঠে ‘নিরমা’র ছবি। জিঙ্গেল হলো ‘ওয়াশিং পাউডার নিরমা…ওয়াশিং পাউডার নিরমা! দুধ সি সফেদি নিরমা সে আয়ি…সবকি পছন্দ নিরমা’। আর এই জিঙ্গেল চলে গেল মানুষের মুখে মুখে। সব দোকানে নিরমার খোঁজ শুরু হয়। ক্রেতার চাহিদার জোগান দিতে দোকানদারেরাও বাধ্য হন নগদ টাকায় কারশানভাইয়ের কাছ থেকে পণ্য কিনতে।

১৯৮৫ সালের মধ্যে নিরমা ওয়াশিং পাউডার ভারতের বেশির ভাগ অঞ্চলে সর্বাধিক জনপ্রিয়, ঘরের ডিটারজেন্ট হয়ে ওঠে। ১৯৯৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় নিরমা। এভাবেই ছোট্ট মেয়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখলেন বাবা। গড়ে তুললেন ৪২ হাজার ৫০০ কোটি রুপির প্রতিষ্ঠান। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিক কারশানভাই। বিশ্ব এখন আরও উন্নত প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরমাও ভারতজুড়ে তাদের ছয়টি কারখানায় সর্বশেষ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত