ফিকির

দামি দামি সব ফরেন মদের বোতল দেখে খানিকটা আশাহতই হলো শামীম। এসব তো ঢাকাতেই পাওয়া যায়। বান্দরবান মানেই তো পাহাড়িদের দোচুয়ানি, পচা ভাত আর লতাপাতার আরক মিশিয়ে যা তৈরি হয়। সেই আটাশ বছর বয়স থেকে সে মদ খাচ্ছে, এখন চুয়াল্লিশ, চেখে দেখা তো দূরের কথা, দোচুয়ানি কখনো চোখেও দেখেনি। কেবলই শুনে আসছে। ভেবেছিল বান্দরবানে এসেই খাবে। সময় পায়নি। এসেছে দুদিন আগে, আলোড়ন খীসার আমন্ত্রণে। নালীগিরি দেখতেই কেটে গেছে প্রথম দিন। দ্বিতীয় দিন কেটেছে স্বর্ণমন্দির ও নীলাচল দেখে। সেদিন সন্ধ্যায় রিসোর্টে ফেরার পর এতটাই ক্লান্ত ছিল, মদ-টদ খাওয়ার আর মুড় থাকল না।
রাতে ফোন করে আলোড়ন খীসা বলল, কালকের দিনটা থেকে যান শামীম ভাই। কাল রাজবাড়িতে বার্ষিক পুণ্যাহ শুরু হবে। আবার কখন আসবেন তার তো ঠিক নাই। দেখে যান, ভালো লাগবে।
শামীম প্রথমে দোনোমনায় ছিল। যখন শুনল সন্ধ্যায় রাজবাড়িতে পার্টি হবে এবং সেই পার্টিতে বোমাং যুবরাজ ক্য সাইন প্রু চৌধুরী তাকে নিমন্ত্রণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে দোনোমনা ভাবটা কেটে গেল। পার্টি মানে তো মদ। আর মদ মানে অনাস্বাদিত সেই দোচুয়ানি।
বান্দরবানের সাংস্কৃতিক জগতে আলোড়ন খীসা পরিচিত নাম। ডিসি-এসপি এবং স্থানীয় রাজনীতিকরাও তাকে সম্মান করে। আর বোমাং রাজবাড়ির দরজা তো তার জন্য সবসময় খোলা। যুবরাজের সঙ্গে তার বহুদিনের বন্ধুত্ব। রাজবাড়িতে ছোটখাটো কোনো অনুষ্ঠান হলে তার নিমন্ত্রণ থাকবেই। আর বার্ষিক পুণ্যাহে তো কথা নেই, তার উপস্থিতি অনিবার্য।
সকাল ন’টার আগেই শামীমকে নিয়ে রাজবাড়ি চলে গেল আলোড়ন। পাঁচ দিন ব্যাপী বার্ষিক পুণ্যাহ’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হলো ঠিক দশটায়। হাতে স্বর্ণখচিত তলোয়ার নিয়ে, রাজকীয় পোশাক পরে, সৈন্য-সামন্ত বেষ্টিত হয়ে রাজপ্রাসাদ থেকে অতিথিদের নিয়ে পায়ে হেঁটে পুরাতন রাজবাড়ি মাঠের মঞ্চে এলেন বোমাং রাজা অংশৈ প্রু চৌধুরী। পাহাড়ি বাদ্যযন্ত্রের সুরে, পাহাড়ি তরুণীরা রাস্তার দু-পাশে দাঁড়িয়ে ফুল ছিটিয়ে তাকে বরণ করে নিল। অস্থায়ী রাজমঞ্চে হেডম্যান, কারবারি ও প্রজাদের কাছ থেকে রাজকীয় কায়দায় খাজনা আদায়ের মধ্য দিয়ে তিনি সূচনা করলেন ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ। সে এক দেখার মতো ঘটনা। জীবনে কখনো দেখেনি শামীম। দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল, না এলে বড় ভুল হয়ে যেত।
দুপুরে খেল রাজবাড়িতেই, অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে। তিনটার দিকে রিসোর্টে ফিরে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর চলে গেল নীলাচল। আকাশ আর পাহাড়ের গভীর মিতালী গড়ে উঠেছে ভূপৃষ্ট থেকে দু-হাজার একশ ফুট উপরের এই পাহাড়ে। এখানে বসে মেঘ আর পাহাড়ের কোলাকুলি উপভোগ করতে করতে কাটিয়ে দেওয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নীলাচলের বিকেলটা মনোরম। শেষ বিকেলে দেখা যায় সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। তখন মনে হয় জায়গাটা বাংলাদেশের নয়, ভারতের নয়, চীন কিংবা আমেরিকারও নয়; পৃথিবীর বাইরের কোথাও, প্রকৃতি যেখানে মনের খেয়ালে রঙে ও রেখায় বিশাল ক্যানভাসে আঁকে দৃষ্টিনন্দন চিত্র।
নীলাচলে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটাল শামীম। সূর্যাস্তের পরপরই একটা অটোরিকশা নিয়ে আলোড়ন হাজির। শামীমকে তুলে চলে গেল রাজবাড়ি। তখন একজন দুজন করে আসতে শুরু করেছে নিমন্ত্রিত অতিথিরা। সাড়ে সাতটা নাগাদ সবাই পৌঁছে গেল। অধিকাংশই বিদেশি, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাসের বড় বড় অফিসার। রাজকন্যা ডনাই প্রু নেলী ইউরোপভিত্তিক একটি এনজিওতে বড় পদে চাকরি করে। সেই সুবাদে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর ঢাকাস্থ দূতাবাসের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তার খাতির। তার নিমন্ত্রণেই এসেছে তারা।
আটটা নাগাদ দোতলার সুসজ্জিত কক্ষে শুরু হলো পানপর্ব। দোচুয়ানির আশা বাদ দিয়ে শামীম ব্ল্যাক লেভেলের বোতল থেকে দুই পেগ ঢেলে নিল গ্লাসে। শুরুতে সে দুই পেগ নেয়। বহুদিনের নিয়ম। প্রথম দু-পেগ ধীরে ধীরে টানে। আলোড়ন নিয়েছে গিলবিজ জিন। লেবু-লবণ আর সেভেন আপ মেশানো জিন তার কাছে অমৃতসম। অন্য সময় হলে প্রথম দুই পেগ শেষ করতে পাক্কা আধা ঘণ্টা লাগিয়ে দিত শামীম, অথচ এখন কুড়ি মিনিটেই সাবাড়। এক ঘণ্টার মধ্যে পেটে চালান করে দিল পাঁচ পেগ। ততক্ষণে দুলুনি শুরু হয়ে গেছে। শরীরটাকে মনে হচ্ছে উড়ন্ত ফানুস। মদ খেলে তার এমনই মনে হয়। দু-বার বারান্দায় গিয়ে দুটো সিগারেট ফুঁকেছে। ষষ্ঠ পেগটি শেষ করার পর তার মনে হলো, এখানে বসে থেকে কী লাভ? সবাই সাদা চামড়ার বিদেশি, কথা বলে মজা পাওয়া যাচ্ছে না। আলোড়নের সঙ্গেই বা কতক্ষণ গেজানো যায়। তারচেয়ে বরং মেলার মাঠটা ঘুরে দেখাটাই উত্তম। আলোড়নকে বলে সে নিচে নেমে গেল।
রাত ন’টা। মেলা এখনো জমজমাট। শহরবাসী আর দূরদূরান্তের পর্যটকরা ভেঙে পড়েছে। মেলার মাঠে বসেছে পুতুলনাচ, যাত্রাপালা ও নাগরদোলা। বাহারি পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছে ছোট-বড় বিস্তর দোকান। পুতুলনাচ তার ভালো লাগে না। ঢাকার শিল্পকলা একাডেমীতে সপরিবার একাধিকবার দেখেছে। ভালো লাগে যাত্রাপালা। অন্য সময় হলে যাত্রার আসরে ঢুকে পড়ত। এখন হাঁটতে ভালো লাগছে। পৌষের জাঁকানো শীত আর হুইস্কির উষ্ণতায় এক অপার্থিব ভালোলাগা তৈরি হয়েছে তার ভেতর। হাঁটতে ইচ্ছে করছে। হাঁটতে হাঁটতে দূরের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কুয়াশাচ্ছন্ন চন্দ্রিমা উপভোগ করতে ইচ্ছে করছে। আর ইচ্ছে করছে রোখসানার সঙ্গে কথা বলতে। তাকে মনে পড়ছে খুব। ছুটি পেলে সেও আসতো। একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে। মাসখানেক আগে দশ দিন ছুটি কাটিয়েছে, এই মাসে ছুটি চাইবে কোন মুখে? আসেনি ভালোই হয়েছে। মদ পছন্দ করে না সে। মদ খেতেই খেতেই মরেছে তার বাবা। হয়ত এ কারণেই। শামীমের খাওয়াটাকে এলাউ করেছে বাধ্য হয়ে। তবে পনের দিনে একবার। কারণ, সে জানে, যতই বারুণ করুক, কোনো লাভ নেই, শামীম খাবেই।
রোখসানাকে ফোন দেবে বলে মুঠোফোনটা যেই না পকেট থেকে বের করল, অমনি সামনে দাঁড়াল এক যুবক। কাঁধে ব্যাগ, পায়ে ক্যাড্স, পরনে জিন্সের প্যান্ট ও জ্যাকেট, মাথায় কালো ক্যাপ।
আপনিও এখানে শামীম ভাই?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনি? হেসে বলল শামীম।
ওহ শামীম ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন না! আমি মুকুল। মুকুল হাজরা। শিল্পকলা একাডেমীর এক অনুষ্ঠানে আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।
ওহ! শিল্পী মুকুল হাজরা?
হা হা ভাই, এতক্ষণে চিনতে পারলেন।
হ্যাঁ, মনে পড়েছে। বেইলি রোডে আপনার একটা অ্যালবামের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানেও তো গিয়েছিলাম। সেই পাঁচ-ছয় বছর আগের কথা, তাই না?
না ভাই, ঠিক চার বছর আগে।
হতে পারে। ভুলে গিয়েছিলাম। তা কেমন আছেন?
ভালো। আপনি কবে এসেছেন?
তিন দিন হয়ে গেল।
কোথায় উঠেছেন?
পর্যটন মোটেলে। আপনি?
আমি কোথাও উঠিনি।
ওঠেননি! রাতে থাকবেন কোথায়? আজ তো আর মনে হয় না কোথাও রুম খালি পাবেন। রাজপুণ্যাহ উপলক্ষ্যে শত শত পর্যটক এসেছে, সব রিসোর্ট বুকড্।
দেখা যাক, একজনকে ম্যানেজ করতে বলেছি, ব্যবস্থা একটা সে করবেই।
বেনসন লাইটের প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করে হাজরার দিকে বাড়িয়ে ধরল শামীম। একটা নিল হাজরা। সিগারেট ধরিয়ে শামীম বলল, আপনি বরং আমার সঙ্গে চলুন। আমার বিশাল রুম, ডাবল বেড, আরামসে দুজন থাকা যাবে।
তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই শামীম ভাই।
খুব ভালো হবে। আমারও একা একা ভালো লাগে না। ফোন করে লোকটাকে না করে দিন।
হাজরা যাকে রুম ম্যানেজ করতে বলেছিল ফোন করে তাকে না করে দিল। সিগারেট টানতে টানতে তারা একটা চায়ের স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চিনি ছাড়া দু-কাপ লাল চা অর্ডার করল শামীম।
চা অর্ধেকটা খেয়ে শামীম বলল, চলুন।
এখুনি?
না, আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় যাব।
কোথায়?
রাজবাড়ির দোতলায়।
ওখানে কী?
আরে আসুন না। গেলে বুঝতে পারবেন।
হাজরাকে নিয়ে সোজা দোতলায় উঠে গেল শামীম। আলোড়ন ততক্ষণে পুরোপুরি টাল। ছয় পেগ শেষ করেছে। হাজরাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল শামীম। তখন যুবরাজ এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। আলোড়নের সঙ্গে কানে কানে কী একটা বিষয়ে আলাপ করল। হাজরাকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল আলোড়ন। যুবরাজ খুশি কি বিরক্ত চেহারা দেখে বোঝা গেল না। স্মিত হেসে হাজরার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলল, ড্রিংকস চলবে তো, না?
থ্যাংকস, নিচ্ছি। বলল হাজরা।
এক পেগ ভদকা নিয়ে আলোড়নের বাঁ-পাশে বসল হাজরা। বরফ আর পানি মেশাল গ্লাসের কানায় কানায়। শামীম বসল ডান পাশে। আরেক পেগ নিয়েছে সে। তিন ঢোকেই গ্লাসটা খালি করে ফেলল হাজরা। উঠে আরও দুই পেগ নিল। তার আদেখলেপনা দেখে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো আলোড়ন। তবে প্রকাশ করল না। হাজরা এসেছে শামীমের সূত্রে, শামীম তার অতিথি, বিরক্তি তো সে প্রকাশ করতে পারে না।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যে পাঁচ পেগ সাবাড় করল হাজরা। শামীম আরেক পেগ নিয়ে হাজরাকে বলল, মঞ্চ তো খালি। চাইলে আপনি গান গাইতে পারেন।
আলোড়ন বলল, তাই তো! উঠুন উঠুন, আপনার গান শুনতে চাই।
হেলেদুলে মঞ্চে উঠল হাজরা। তবলচি, বাঁশিওয়ালা প্রস্তুত ছিল। হারমোনিয়াম বাজিয়ে মান্না দে’র সেই বিখ্যাত ‘কফি হাউস’ গানটা গাইল সে। গলা মন্দ নয়। মদের নেশায় একটু জড়ানো। সেটা অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। শ্রোতারা মুহুর্মুহু করতালি দিল। তাতে উৎসাহ বেড়ে গেল তার। কোণার দিকে কোনো এক শ্রোতা বলে উঠল, ওয়ান মোর। ব্যাস, সে কি আর দেরি করে? শুরু করে দিল দ্বিতীয় গান। শেষ করার পর শ্রোতারা আবারও মুহুর্মুহু করতালি দিল। করতালি শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয় গান শুরু করে দিল সে। অধিকাংশ শ্রোতার চোখেমুখে বিরক্তিভাব ফুটে উঠল। শামীমও বিরক্ত। নেশার ঘোরে হাজরার কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে। মদন আর কাহাকে বলে! তার কানে কানে আলোড়ন বলল, কী আর করা, শুরু করেছে যেহেতু শেষ করুক।
শেষ করল হাজরা। হাততালি এবার খুব একটা পড়ল না। তবু শুরু করল চতুর্থ গান। শামীমের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোড়ন হাসল। শামীম বলল, এ কারণেই এরা বড় শিল্পী হতে পারে না, বুঝলেন? পরিমিতিবোধের অভাব।
অতিথিদের কয়েকজন উঠে বারান্দায় চলে গেল, কেউ গেল ওয়াশরুমে। গান শেষ করল হাজরা। কয়েকজন শ্রোতা মৃদু করতালি দিল। পঞ্চম গান শুরু করতে যাবে, অমনি শামীম মঞ্চে উঠে তার কানে কানে বলল, অনেক হয়েছে, এবার নামুন।
নেশাতুর কণ্ঠে হাজরা বলল, ওহ শামীম ভাই! আমার বিখ্যাত গানটি তো গাওয়াই হলো না।
তার হাত ধরে টানতে টানতে শামীম বলল, আজ নয়, আরেক দিন। এখন ডিনার টাইম, অতিথিরা বিরক্ত হচ্ছে। আসুন, আসুন।
ডিনার না করেই তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল শামীম। ডিনার করে যাওয়ার জন্য খুব করে বলল যুবরাজ, কিন্তু শামীমের খিদে নেই, মদের সঙ্গে এটা-ওটা খেয়ে পেটটা ঢোল। হাজরারও তাই। গেটের বাইরে এসে একটা অটোরিকশা নিয়ে রিসোর্টে চলে গেল দুজন।
রাত এগারোটা। বিছানায় গা এলিয়ে রোখসানাকে ফোন দিল শামীম। ছেলে আর মেয়ের সঙ্গে কথা বলল। ছেলেটা এইটে পড়ছে, মেয়েটে সিক্সে। বাবার জন্য দুজনেরই মন খারাপ। মেয়েটা বড় আহ্লাদি। রোজ রাতে বাবাকে চুমু না দিয়ে ঘুমাতে যায় না। কাঁদে কাঁদো গলায় বলল, বাবা, তোমাকে কত দিন আপ্পি দিতে পারছি না বলো তো? কবে আসবে তুমি?
আমি কালই ফিরব, মা। তুমি খেয়েছ?
হ্যাঁ। তুমি?
আমিও।
এখন তবে ঘুমাও?
আচ্ছা।
ফোন রাখল শামীম। হাজরা ফেসবুকে ব্যস্ত। কারো সঙ্গে চ্যাট করছে। ড্রেস চেঞ্জ করে ওয়াশরুমে ঢুকল শামীম। বেরিয়ে তোয়ালেতে মুখ মুছে সোফায় বসল। হাজরা ফোনে রঙ্গ-রসের আলাপ করছে। নিশ্চয়ই গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে। কথার ধরণে তাই বোঝা যাচ্ছে। কথা বলতে বলতে খাট থেকে নেমে সোফায় এসে বসল। ফোনের অপরপ্রান্তে কে কী বলল কে জানে, হাজরা বলল, নাও, শামীম ভাইকে ভালো করে চাক করে দাও।
জিবে কামড় দিল শামীম। ইশ্, হাজরার মাথাটা গেছে। পরক্ষণে আবার ভাবল, সত্যি কে সে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলছে? অন্যকে চাক করে দেওয়ার কথা কি গার্লফ্রেন্ডকে বলা যায়? নিশ্চয়ই কোনো কলগার্ল।
ফোনটা কানে ধরল শামীম। ওপ্রান্তে জনৈক তরুণীর জড়ানো কণ্ঠস্বর, হ্যাল্লো!
শামীম বলল, কিছু মনে করবে না, আমরা এখন আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছি। আপনার বন্ধুর অবস্থা টালমাটাল, যে কোনো মূহূর্তে ছিটকে পড়তে পারে। হা হা হা।
তরুণী বলল, ওহ্ নো শামীম ভাই, হাজরা আমার ফ্রেন্ড, আপনি হাজরার ফ্রেন্ড, তার মানে আপনি আমারও ফ্রেন্ড।
হা হা হা। তা অবশ্য ঠিক বলেছেন। কী নাম আপনার?
আমার নাম? আমার নাম প্রিমা।
বাহ, বেশ সুন্দর নাম। বাসা কোথায়?
গুলশানে। আপনার?
মোহাম্মদপুর।
হাজরাকে নিয়ে একদিন বেড়াতে আসুন আমার বাসায়।
নিশ্চয়ই। যাব একদিন।
শীত থাকতে থাকতেই আসুন। ওম দেব।
হা হা হা। এই শীতে ওম পেলে অবশ্য মন্দ হবে না।
কে জানে হঠাৎ শামীমের কী মনে হলো, বলল, নিন, হাজরার সাথে কথা বলুন।
তরুণী বলল, ওহ্ ডিয়ার, আরেকটু থাকুন না প্লিজ।
শামীম বলল, আমার একটা জরুরি ফোন এসেছে। ওটা শেষ করে আবার কথা বলব। নিন, কথা বলুন।
ফোনটা হাজরাকে দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল শামীম। তার নিন্মাঙ্গের তাপমাত্রা এখন তুঙ্গে। ড্রিংক করলে তার এমনই হয়। তার উপর বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে উত্তেজক আলাপ। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হস্তমৈথুন করল সে। শরীর-মনে নেমে এল প্রশান্তি। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঢুকে পড়ল কম্বলের নিচে। হাজরা তখন উত্তেজনার চূড়ান্তে। কথা বলতে বলতেই সে ওয়াশরুমে ঢুকল। হয়ত সেও হাতের কাজটা সারবে। শামীমের মনে হচ্ছে ঘুর্ণয়মান একটা যানে চড়ে বসেছে সে। যানটা তাকে নিয়ে তলিয়ে যাচ্ছে হিমাঙ্কের নিচে। তলিয়ে যাওয়াটা সে বেশ উপভোগ করতে থাকে। একটা সময় নাক ডাকতে শুরু করে। হাজরা কখন পাশে শুলো টের পেল না।
পরদিন একসঙ্গে ঢাকায় ফিরল দুজন।
হাজরার কথা ভুলে গিয়েছিল শামীম। কত কাজ তার, ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রায় কুড়ি দিন পর হঠাৎ একদিন হাজরার ফোন। দেখা করতে শামীমের অফিসে আসতে চায়। কেউ অফিসে আসতে চাইলে তাকে কি আর না করা যায়? শামীম বলল, আসুন, আড্ডা দেওয়া যাবে। হয়ত আশেপাশে কোথাও ছিল হাজরা, আধা ঘণ্টার মধ্যেই হাজির। শামীমের অফিসটা চমৎকার। আট তলায় তার রুম। উত্তর দিকটায় কাচের জানালা। বাইরে তাকালে ঢাকা শহরটাকে নিউইয়র্ক সিটির মতো মনে হয়। আর বৃষ্টির দিনে মনে হয় ঢাকা নয়, দার্জিলিং শহর। সেদিন ছিল ঘন কুয়াশা। বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ব্যাগে করে হাফ বোতল কেরুর জিন এনেছে হাজরা। দুজনে খেতে খেতে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত আড্ডা দিল।
তিনদিন পর একটা গিটার নিয়ে হাজরা আবারও হাজির। অনেকক্ষণ আড্ডা দিল। গিটার বাজিয়ে তিনটা গান গাইল। কথায় কথায় হাজরা বলল, আমার বান্ধবী তো সেদিন আপনার খুব প্রশংসা করল, শামীম ভাই।
শামীম বলল, বলেন কী! কথা বলেছি তো মাত্র একদিন। তাও ফোনে।
সে আপনার ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে আপনার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনেছে।
তাই নাকি?
আপনার গত এক মাসের পোস্টগুলো পড়েছে। আপনি নাকি গুছিয়ে মনের কথা লিখতে পারেন। ফটো অপশনে গিয়ে ছবিগুলোও দেখেছে। আপনি নাকি বেশ মার্জিত মানুষ। বোঝাই যায় না আপনার বয়স চুয়াল্লিশ।
হা হা হা। কিন্তু কই, লাইক-টাইক তো দেয়নি।
সে এমনই। ফেসবুকে এক্টিভ, বাট সহজে কাউকে লাইক-কমেন্ট করে না।
সেলিব্রেটি।
না, বলতে পারেন নিভৃতচারী।
তা অবশ্য বলা যায়।
চলুন না একদিন ঘুরে আসি।
কোথায়? তার বাসায়?
হ্যাঁ। আমাকে বলেছেও।
কী বলেছে?
আপনাকে নিয়ে একদিন বেড়াতে যেতে।
একা থাকে নাকি?
বলতে গেলে একাই। সঙ্গে এক বান্ধবী থাকে। সে উড়নচন্ডী। হিল্লি-দিল্লি করে বেড়ায়। ভ্রমণপিয়াসী আর কি। আমার বান্ধবী খুব ভালো মেয়ে। মজা পাবেন।
হা হা হা। তার মানে প্রস্টিটিউট?
না, ঠিক তা বলা যাবে না। সবার সাথে যায় না। হাতেগোণা দু-চারজনের সাথে সম্পর্ক। তার মধ্যে আমি একজন।
তাহলে চলুন একদিন।
আজ যাবেন?
না, আজ নয়। সন্ধ্যায় এক বন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেতে হবে। কাল-পরশু হতে পারে।
আপনার ইচ্ছা।
কিছু নিতে হবে?
কী আর নেবেন? হুইস্কির একটা বোতলেই হবে। খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যাবে।
শুধুই আড্ডা?
হা হা হা। আপনি চাইলে অন্য কিছুও হতে পারে।
টাকা দিতে হবে না?
ও তো টাকাপয়সা ওভাবে নেয় না। তবে আপনি খুশি হয়ে দিলে নেবে।
কত টাকা?
এই ধরুন হাজার পাঁচেক।
তাহলে তো যাওয়াই যায়।
আসুন তবে। একদম আলাদা টেস্ট। হা হা হা।
সেদিনের মতো বিদায় নিল হাজরা। ভাবনায় পড়ে গেল শামীম। এক মন বলে, রোখসানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে, সে তাকে কতই না ভালোবাসে, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করাটা কি ঠিক হবে? আরেক মন বলে, স্ত্রীর সঙ্গে সেক্স মানে তো অভ্যাস। সেক্সের মজা কি আর পাওয়া যায়? মজা হচ্ছে পরনারীতে। পরনারীর সঙ্গে সঙ্গমের চেয়ে মধুর আর কী আছে পৃথিবীতে? আর কদিন? কয়েক বছর পরেই তো যৌবন ফুরিয়ে যাবে। তখন কোটি টাকা খরচ করেও যৌবনের স্বাদ আর নেওয়া যাবে না। সময় থাকতে যতটা পারা যায় চেটেপুটে খেতে পারলেই লাভ।
একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করতে লাগল শামীম। বিয়ের পর অন্য নারীর সংসর্গে কখনো সে যায়নি। প্রেম করেছে দু-একটা, তবে রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া পর্যন্তই, কখনো বিছানায় যায়নি। হাজরার প্রস্তাবটা তার ভেতরে উত্তেজনার জোয়ার এনেছে। নীতি-নৈতিকতার দড়ি-দড়া সব ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে।
পরদিনও উত্তেজনাটা প্রশমিত হলো না। মাথার ভেতরে কেবলই ঘুরপাক খেতে লাগল। কিন্তু প্রশমন তো করতে হবে। দেরি করা যাবে না, আজই হয়ে যাক। ডায়াল করল হাজরার মোবাইল নম্বরে। তার ফোন বন্ধ। আবার ডায়াল করল। আবারও একই কথা, দ্য ফোন ইজ আনরিচেবল এট দ্য মোমেন্ট। হাজরা হয়ত ঘুমাচ্ছে। শিল্পী মানুষ, রাত জেগে হয়ত কোনো পার্টিতে গান করেছে।
তখন দুপুর সোয়া বারোটা। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ফ্যান, কম্পিউটার সব বন্ধ হয়ে গেল। অফিসে জেনারেটর নেই। বিদ্যুৎ কখন আসে ঠিক নেই। ততক্ষণ বসে বসে ঘামতে হবে।
কিন্তু না, দেরি করল না, দশ মিনিটের মাথায় চলে এল। কম্পিউটারটা ওপেন করে ফেসবুক সাইন ইন করল শামীম। নিউজ ফিডে ভেসে উঠল একটা নিউজ লিংক। প্রতারণার অভিযোগে যুবক-যুবতী গ্রেপ্তার। যুবকের নাম মুকুল হাজরা, যুবতীর নাম হোসনে আরা প্রিমা। দীর্ঘদিন ধরে তারা ফাঁদ পেতে নানা ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায় করছিল। যারা প্রিমার ফ্ল্যাটে যেত, গোপনে প্রত্যেকের বিশেষ মুহূর্তের ভিডিও করে রাখত তারা। পরে সেই ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করত।
চেয়ার থেকে উঠে জানালার সামনে এসে দাঁড়াল শামীম। বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, ঢাকা নয়, নিউ ইয়র্ক নয়, দার্জিলিং নয়; সে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্গের বারান্দায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত