Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Flood_myth

লোকসংস্কৃতি: বিশ্ব মিথে বন্যাকথা । দেবলীনা রায়চৌধুরী ব্যানার্জি

Reading Time: 7 minutes
 
“There are more things in heaven and Earth, Horatio, than are dreamt of in your philosophy”, Shakespeare-এর এই কথাটা কিন্তু খাঁটি সত্য। সত্যিই পৃথিবীর আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে এমন কিছু তত্ত্ব বা বিষয় ‘বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার’। সেইসব বিষয়গুলির মধ্যে একটি হলো পুরাণসাহিত্য। না, আমি কিন্তু শুধু ভারতের কথাই বলছি না। গোটা পৃথিবীর আদিযুগে যে সভ্যতাগুলির কথা আমরা পাই, তার আস্তিনের ভাঁজে ভাঁজে লুকানো আছে অদ্ভুত সব মিথ। ঘটনা নয় ঠিকই কিন্তু সেগুলিকে গল্প নামে আখ্যা দিতেও বাঁধে। এই মিথগুলি কিন্তু মানব সভ্যতার প্রথম ইতিহাস। আর এখন যে কথাটা নিয়ে খুব তর্ক বিতর্ক – Borderless World is a dream – তার জেরে বুড়ো পৃথিবীর আত্মা যেন মহাকালের বুকে বিলীন হতে হতে আঙুল তুলে ঠাট্টা করে আধুনিক পৃথিবীকে।
 
দেখুন এই মিথলজি ব্যাপারটা এতই পরিব্যাপ্ত যে তা দশটি বই লিখলেও শেষ হবে না। তাই মাত্র একটা মোটামুটি সাম্প্রতিক ও চেনা ঘটনা নিয়ে গল্প করব। বিষয় যদিও একটি, গল্প কিন্তু অনেকগুলি বলব আপনাদের, অনেকগুলি দেশের গল্প । আর গল্পের মধ্যে দিয়ে আমরা খুঁজে বের করব একটাই তত্ত্ব বা সত্যকে। এটাই হলো Comparative Mythology বা তুলনামূলক পুরাণসাহিত্যের মজা। ঠিক যেন সেই চেনা গানটির মতো বলে, “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”। ভিন্ন দেশ , ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা , পরিবেশ – কিন্তু কি অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখা যায় সমগ্র পৃথিবী জুড়ে। যেন সব প্রাচীন পুরাণকারেরা মিটিং করে এক একটি বিষয় ঠিক করে , তার উপর নিজের নিজের মতো কল্পনার ঘোড়া ছুটিয়ে তৈরি করেছে পুরাণের গল্পগুলি।
 
আচ্ছা আপনাদের কয়েকটা নাম বলি, নিশ্চই সেগুলি চেনা। বায়ু, হিক্কা, মহা, আয়লা, ফণী, বুলবুল, আম্ফান …. রোসো বাবা, ভয় দেখাচ্ছি না। এইগুলি সবই ভয়ংকর সব ঘূর্ণিঝড়ের নাম যেগুলি সাম্প্রতিক কালে বার বার আছড়ে পড়েছে পৃথিবীর কোলের উপর। ভূগোলবিদরা এই ঘটনার জন্য অনেক কারন দেখিয়েছেন। তারা বলেছেন, বন্যার জন্য বরফ গলা জলরাশি বা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এমনকি দূষণও ভীষণ ভাবে দায়ী। তবে আজ আমরা সে বিষয়ে ঢুকব না।
 

পুরাণপর্বে প্রবেশ করার আগে একবার মনস্তত্ত্বের কড়া নেড়ে দেখি। ফ্রয়েড তার Interpretation of Dreams বইতে বলেছেন, বন্যা বা প্রচুর জলের স্বপ্ন দেখা হলো কোন কিছু সৃষ্টি বা সম্ভাবনার আভাস। Psychology বা মনস্তত্ত্ব ও পুরাণ সাহিত্যের আত্মীয়তা কিন্তু বহু পুরনো। অনেক মানসিক রোগ ও নিরাময়ের নাম, কমপ্লেক্স, বিকার, প্রবণতা, প্রভৃতির নাম ও পটভূমি কিন্তু পুরাণ সাহিত্য থেকে নেওয়া। যেমন ইডিপাস কমপ্লেক্স, লেসবিয়ানিসম, এমনেশিয়া, স্যাটিরিয়াসিস ইত্যাদি মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধীয় শব্দ বা টার্মগুলি যা বহুল পরিচিত তার শিকড় কিন্তু পুরাণ সাহিত্যের ভুমিপ্রান্তের গভীরে ঢুকে আছে। আসলে পুরাণ সাহিত্যে অন্তর্গত যে কোন বিষয়ের কিন্তু একটা চিহ্নগত দিক বা অর্থ আছে। মানে গল্প হিসেবে, গল্পের চরিত্র হিসেবে আমরা যা পড়ি, তা রূপকধর্মী, যার ভিতরে থাকে গভীর অর্থ।
 
এবার যদি একবার পুরাণসাহিত্যের দরজায় টোকা মারি, দেখতে পাবো – ভিন্ন ভিন্ন দেশের পুরাণ, পৃথক পরিসর জুড়ে থাকলেও, তাদের দার্শনিক বা প্রতীকী অর্থ কিন্তু একান্নবর্তি পরিবারের সর্বজনীন অলিন্দের মতো। অর্থাৎ বিবিধের মাঝে যেন মহান এক সাদৃশ্য। প্রাচীন পুরাণ সাহিত্য তো প্রকৃতিপূজার কথা বলে, তাই প্রকৃতির প্রতিটি অবস্থা , উপাদান বা মূলসূত্র কিন্তু আমরা পুরাণকথায় অনায়াসে পাই। বন্যা, প্লাবন, জলোচ্ছাস যাই বলি না কেন, এগুলি সব একটি বা দুটি নয়, সবকটি প্রাচীন সভ্যতার পুরাণ সাহিত্যেই আছে।
 
শুরু করি বিশ্বের সব থেকে সুপরিচিত ও উজ্জ্বল গ্রীক সভ্যতার পুরাণকথা নিয়ে। চিকিৎশাশাস্ত্র, মনস্তত্ত্ব, ইংরেজি সাহিত্য, নাট্যশাস্ত্রে গ্রীক মিথলজির প্রভাব যথেষ্ট লক্ষ্যণীয়। গ্রীক পুরাণ অনুসারে, পৃথিবীতে তিনটে প্রচণ্ড বন্যা হয়েছিল – ওজিগেস, ডিউক্যালিন ও দার্দেনাস। Critias বইতে প্লেটোর কথায় ওজিগেস হলো “primal flood” বা আদি বন্যা। ডিউক্যালিনের কথা আমরা পাই Bibliotheca বইতে যার সাথে পরবর্তীকালে বাইবেলের নোয়ার গল্পের সাথে ভীষণ মিল। এই গল্প অনুযায়ী প্রমিথিউস নিজের হাতে তৈরি করা মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য তার পুত্র ডিউক্যালিনকে বলেছিলেন একটা নৌকা বানিয়ে কিছু মানুষকে তাতে উঠিয়ে নিতে। তারপরেই আকাশের দেবতা তথা দেবরাজ জিউস এই বন্যা পাঠান। ডুবে যায় গোটা পৃথিবী, আর এই নৌকায় বেঁচে থাকা মানুষগুলির থেকে নতুন ভাবে মানবজাতির সৃষ্টি হয় আবার। একই রকম কাহিনি আমরা পাই ব্যাবিলনিয়ান সভ্যতায় Epic of Gilgamish বইতে। গল্পের নায়ক গিলগামিশের দেখা হয় উটা-নাফিস্তিম নামে এক অমর ব্যক্তির সাথে, যিনি এক ভয়ংকর বন্যা পরিস্থিতিতে একখানা নৌকায় চেপে রক্ষা পান। একই গাঁথা আবার সুমেরিয় সভ্যতাতেও পাওয়া যায় তাদের ধর্মগ্রন্থ Eridu Genesis- এ। যেখানে দেবতা এনকি, নতুন তৈরি করা মানুষের শহরকে বন্যায় ধ্বংস করার আগে জিউসুদ্রাকে একই ভাবে একটা নৌকা বানিয়ে আসু বন্যার কবল থেকে বাঁচিয়ে দেন।
 
হিন্দু পুরাণের গল্প তো মোটামুটি সবারই চেনা। বিষ্ণুপুরাণ অনুসারে, সপ্তম মনু অর্থাৎ শ্রদ্ধাদেব বা বৈবস্বত মনু মহাপ্লাবনের ঠিক আগে একটি সোনালী মাছের দেখা পেয়েছিলেন। সেই কথা বলা, সোনালী মাছ নিয়ে মনু বাড়ি আসেন, আর তা দিনে দিনে বড় হতে থাকে। ছোট পাত্র থেকে বড়, তারপর তার থেকেও বড় পাত্রে রেখেও মাছটির স্থানাভাব হতে থাকে। নদীতে ছেড়েও তিনি পরিস্থিতি সামলাতে পারেন না, এমনই বড় হতে থাকে সেটি। শেষে সেই অতিকায় সোনালী মাছটি নিয়ে সমুদ্রে ছাড়ার সময় মাছটি আত্মপরিচয়ে জানান যে সে শ্রীবিষ্ণুর মৎসাবতার। তার পিঠে চেপে চারবেদ সহ মনু ও সপ্তর্ষিগন রক্ষা পান। পূর্বেকার কল্পের সমাপ্তির সময় এই ভয়ংকর বন্যা হয়েছিল এমন বলা আছে ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Flood myth
 
প্রচণ্ড বন্যার কথা সবকটি সভ্যতা ও মিথলজিতেই কিন্তু আমরা পাই। একটা যুগের শেষ বা একটা যুগের শুরু, অথবা দুটি যুগের সংযোগস্থলে এক ভীষণ প্লাবনের কথা আমরা পাই। চায়নার পুরাণকথাতে আমরা প্লাবনের যে কাহিনী পাই, তাতেও কিন্তু যুগাবসানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আদি চৈনিক মিথে আছে, যখন মানুষ উদ্যত ও দুর্বিনীত হয়ে পরে, ঈশ্বর প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন ও পর পর ঝড় বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মাধ্যমে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। এক চাষী এই বজ্র-বিদ্যুতের দেবতা লেইশেংকে বন্দী করে ফেলেন এক শক্ত লোহার খাঁচায়। ক্রুদ্ধ লেইশেং ফুসতে থাকেন তার বন্দিদশায় । একদিন সুযোগ পেয়ে তিনি চাষীটির দুই ছেলে মেয়েকে বলেন তাঁকে মুক্ত করে দিতে, পরিবর্তে তিনি এই দুইজনকে বাঁচিয়ে নেবেন আসু মহাপ্লাবন থেকে। মুক্তি পেয়েই বজ্র-দেবতা এই দুটি ছেলে মেয়েকে একটা বিশাল বড় লাউ দেন, যার ভিতরটা পরিষ্কার আর ফাঁপা করে নিয়ে বজ্রদেবতার কথা মতো তারা আশ্রয় নেয়। শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। টানা নয়দিন বৃষ্টির পর, সমস্ত পৃথিবী ডুবে যায়, ধ্বংস হয়ে যায় সব কিছু। শুধু এই দুটি ছেলে মেয়ে বেঁচে যায়। তারাই পরবর্তীকালে মানুষ সৃষ্টি করে। এই কাহিনীতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, এই বিধ্বংসী বন্যা একই সঙ্গে একটি যুগের অবসান ও পরবর্তী যুগের সূচনা নির্দেশ করে।
 
নর্ডিক পুরাণে আবার এই প্রলয়-প্লাবন নিয়ে বেশ অদ্ভুত একটা গল্প পাওয়া যায়। দেবতাদের রাজা ওডিন বিশাল এক তুষার দানব ঈমিরকে হত্যা করেন। এই ঈমিরের রক্তের বন্যায় ভেসে যায় পৃথিবী। তার শরীর থেকে আকাশ ও ধরিত্রী তৈরি হয়। আর বেলজেমির দানব ও তার স্ত্রী একটা গাছের গুঁড়ি দিয়ে নৌকা বানিয়ে কোনভাবে বেঁচে যায়। তাদের থেকেই মানবজাতির সৃষ্টি। যেমন তেমন বন্যা নয় মশাই, এ যে একেবারে যাকে বলে রক্তপ্লাবন।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Flood_myth
 
জাপানের পুরাণ Kojiki ও Nihon Shokiতে জানা যায় যে ইজানাগি ও ইজানামি নামে এক পুরুষ ও নারী জন্মেছিল একটা তেলজাতীয় তরলের উত্তাল সাগর থেকে যখন স্থলভূমি ছিল এই সাগরের নিচে। আবার দেখুন ইজিপশিয়ান বা মিশরীয় পুরাণে তো এক আধটা বন্যা নয়, হাপি নামে একজন দেবতাই বরাদ্দ হয়েছেন যিনি নাকি প্রাচীন মিশরের বার্ষিক বন্যা ও প্লাবনের কর্মকর্তা।
 
মায়া বা ইনকা মিথলজিও কিন্তু অগাধ জলরাশি বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিষয়কে বাদ দিতে পারেনি। মায়া সভ্যতার পুরাণ Popol Vhu অনুসারে, চৈনিক মিথের মতোই দেবতাদের সঠিকভাবে সম্মান না জানিয়ে মানুষ আহ্বান করে তাদের ভয়ংকর রোষ। তারপরই বন্যায় প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত ও নষ্ট হয়ে নতুন মানব জাতির সৃষ্টির পথ প্রশস্ত হয়। ইনকা মিথেও তিনবার নাকি সমগ্র জীবজগত বন্যায় বিনষ্ট হয়। এক প্রজন্ম মানুষ নাকি আবার কাঠের তৈরি ছিল। কিন্তু ভেসে যায় সব রসাতলে।
 
রসাতল। শব্দটিকে ভাঙলে দুটি শব্দ পাওয়া যায়, রস ও অতল। অর্থাৎ প্রচুর পরিমাণ তরল পদার্থের গভীরে অবস্থান। এই যে ক্যাটাক্লিসম বা মহাপ্লাবন ও অগাধ জলরাশির কথা বা ধারণা বিশ্বব্যাপী পুরাণসাহিত্যে বহুল প্রচলিত তার পিছনে কিন্তু যথেষ্ট কারণ আছে। কল্পনার পক্ষীরাজের উড়ান যতই আকাশছোঁয়া হোক, বাস্তব বা জীবনের রহস্য কিন্তু অনেক বেশী চমকপ্রদ। কথায় বলে না, Truth is stranger than fiction। আর হবে নাই বা কেন! কল্পনা তো মানুষের মনের মধ্যে তার চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে আঁকা ছবি। আর এই চিন্তা ভাবনা বা অভিজ্ঞতা তো বাস্তব থেকেই পাওয়া, জীবন থেকেই আহরণ করা। তাই বাস্তবের ঘটনা বা জীবনের পথ চলতে পাওয়া প্রতিটি ধাপ সেই কল্পনার ছবিতে রঙ হয়ে মিশে থাকে। আজ যে আমরা পুরাণকথায় রোমাঞ্চকর, স্বপ্নাতীত কাহিনীগুলি দেখি, তার ভিতেও পাওয়া যায় কিছু যুক্তি ও বাস্তবতা যদি অবশ্য তা রীতিমতো ভৌগোলিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখা যায় তবেই।
 
বন্যা বা flood বা প্লাবন যাই বলি না কেন, সেটা সম্পূর্ণই যে প্রাচীন মানুষদের মনগড়া কাহিনী, তা কিন্তু নয়। তা না হলে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তরে, ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার মানুষ একই ধরনের কাহিনী উদ্ভাবন করেন কি করে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, আনুমানিক প্রায় সাত হাজার বছর আগে, মধ্য প্রাচ্যে তুষার যুগের অবসানে, গলে যাওয়া বরফ পৃথিবীর অনেকটা জায়গা জুড়ে বিধ্বংসী প্লাবন নিয়ে আসে। যার একটা ভয়াবহ প্রভাব মানুষকে বিহ্বল ও বিভ্রান্ত করে। আবার এও সত্যি যে এখন যেমন আম্ফান, সুনামি প্রভৃতি নামজাদা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখি আমরা, তেমনই সেই প্রাগৈতিহাসিক কালেও তো এমন বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতো। মানুষ বুঝেছিল প্রকৃতির অমোঘ ক্ষমতা। তার এক একটা করাল প্রকোপের সামনে পরে, জনজীবন ধ্বংস হয়ে গেছে বার বার। ধ্বংসাবশেষের উপর গড়ে ওঠে নতুন জীবনযাত্রা অস্তিত্বের তাগিদে। এতটা বাস্তব রসদ পেয়েই পৃথক সভ্যতার লোক-কবিদের কথায় ফুটে উঠেছে এক ছাঁচের আলাদা আলাদা প্লাবন-গাঁথা।
Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,Flood_myth
 
প্রকৃতি যেমন সৃষ্টি করে, তেমনই তার এক করাল, বিধ্বংসী রূপও আছে। এ কথা বলা বোধহয় বাহুল্য হবে না যে প্রকৃতি প্রকৃতপক্ষে সর্বশক্তিমান। আজকালকার টেকনোলজি, যান্ত্রিকতার প্রসার তার ক্ষমতাকে তুড়ি মেরে এগোতে চাইলেও , মনের গভীরে সবাই জানে যে, যখনই প্রকৃতি নিজের হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, চারিদিকে তখন ‘ত্রাহিমাম ত্রাহিমাম’ রব উঠে যায়। সমস্ত যুক্তি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তির গালভরা ব্যক্তিত্ব তখন শিশুর মতো থতমত খেয়ে হিমসিম খেয়ে যায়। সম্ভবত তাই, বিশ্বের প্রাচীন ঋষি, দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের কল্পনায় প্রকৃতির প্রভাব এতটা লক্ষ্যণীয়। খেয়াল করে দেখবেন, নরককে যেমন মিথলজিতে ভূত্বকের নিচে কল্পনা করা হয়েছে কারণ তা স্বর্গের (পৌরাণিক বিশ্বাসে আকাশ) ঠিক বিপরীতে। এর মধ্যে অবশ্যই একটা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ আছে। কিন্তু ভৌগোলিক কারণ কি একদমই নেই? ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত এই বিষয়গুলির কোন প্রভাব নেই কি? বরং পৃথিবীর গভীরে আগুন ও গলিত খনিজ পদার্থ, মূল্যবান ধাতুর অস্তিত্ব টের পেয়েই মানুষ নরক বা মৃত্যুলোকের অধিপতি যমরাজ, কুবের, হেদেস বা লুসিফারদের ধনবান ও প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ দেখিয়েছে। একইভাবে বন্যাও মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে নিশ্চিন্তে একটা স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে সমগ্র পৃথিবীর পুরাণকথায়। বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের বিধ্বংসী রূপের পরিচয় তো মানুষ তার পরিবেশ থেকেই পেয়েছে। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন ধ্বংসের সাথে সাথে সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গেও এই বন্যা বা জলাধিক্যের কনসেপ্ট জুড়েছে মানুষ? নিছক কল্পনা? নাকি জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা? সিগমণ্ড ফ্রয়েডের মতে, স্বপ্নে মাঝেই মাঝেই এই যে আমরা প্রচুর জল দেখি – নয় নিজেদের ডুবতে, বা ভাসতে অথবা পারাপার করতে – তা আসলে আমাদের অবচেতন মনের মাতৃজঠরে থাকা সময়ের স্মৃতি। একটি ক্ষুদ্র ভ্রূণ থেকে একটু একটু করে শিশু হয়ে ওঠা – এই পুরোটাই কিন্তু গর্ভের মধ্যে একটা জলময় অবস্থায় হয়ে থাকে। চিকিৎশাশাস্ত্রে যাকে বলে অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড। মাতৃগর্ভে এই তরল রীতিমতো উৎসেচক, পরিপোষক পদার্থ বা নিউট্রিয়েন্টস ও অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ যা একটি আণবিক ভ্রূণকে একটি শিশুপ্রাণ হিসেবে তিল তিল করে তৈরী করে। মনো ও চিকিৎশা বিজ্ঞানীদের মতে, চেতন মনের স্মৃতিতে না থাকলেও, মানুষের প্রথম যন্ত্রণার স্মৃতি হলো মায়ের গর্ভের উষ্ণতা, নিশ্চিন্ততা, আরাম ও অন্ধকার থেকে তার বিচ্যুতি। এই কারণেই ফ্রয়েড বলেন যে আমরা যখন মনে মনে একাকিত্ব বা হীনমন্যতায় ভুগি, তখন অবচেতন মন আমাদের সেই সৃষ্টিসুখের সময়, নিরাপদ ও যন্ত্রণাহীন স্মৃতির আভাস দেয় অথৈ জলের স্বপ্নের মাধ্যমে। আর এটাই বোধহয় প্রশ্নটির সঠিক উত্তর। অর্থাৎ মানুষ যেমন বন্যায় ধ্বংস হতে দেখেছে অনেক কিছু তেমনই জলের প্রাণদায়ী শক্তিকেও দেখেছে মানব শরীরের মধ্যেই সৃষ্টির আদি প্রহর থেকে। তাই বন্যা বা প্লাবন কিন্তু শুধু এখনকার বিষয় নয়, প্রাচীন মিথের প্রাঙ্গণেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিস্ময়কর কাহিনী হয়ে থেকে গেছে। এইভাবেই বন্যা বা জলরাশি বিশ্বব্যাপী পুরাণসাহিত্যে ধ্বংসের সাথে সাথে সৃষ্টিতত্ত্বেরও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে রয়ে গেছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>