Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,friday special/ bangla golpo nahar trina

ইরাবতীর ছোটগল্প: ম্যাঁ ম্যাঁ । নাহার তৃণা

Reading Time: 5 minutes

এই শহরের বিত্তবানেরা ক্রমেই স্বাস্থ সচেতন হইতেছে। তাহাদের খাদ্য তালিকায় তেল, ঘি, মশলাদার  খাদ্যের উপর প্রতিনিয়ত চোখ রাঙানির খড়গ চলে। অর্গানিক খাদ্যের প্রতি তাহারা বর্তমানে অনুরক্ত। কেহ কেহ আসক্ত। এই শ্রেণিটি পাণীয় হিসেবে গ্রীনটি’র অতি ভক্ত। এটি পান করিয়া তাহারা দিন শুরু করে। রাত্রিকালেও অনেকে পানপূর্বক নিদ্রা যায়। শহরের নামীদামী পণ্যসামগ্রীর দোকানগুলিতে বর্তমানে গ্রীনটি নামক পাণীয়ের নানা ব্র্যান্ডের রমরমা আদর। 

‘সুন্দর জীবন’ ইন্সুরেন্সে চাকরিরত ফেকুউল্লাহ একদিন সেরূপ একটি অভিজাত দোকানে সুট্ করিয়া ঢুকিয়া পড়ে। তাহার পকেটের সেই জোর নাই যে সে দোকানের কোনো পণ্যে হাত দেয়। সে প্রয়োজনও অবশ্য তাহার ছিল না। বাতানুকূল পরিবেশে শরীরকে খানিক শান্তি দেওয়ার প্রয়োজনেই উক্ত অভিজাত দোকানের  অভ্যন্তরে ফেকুউল্লাহর প্রবেশ করা। কিন্তু সে কথা জানাজানি হইলে তাহার ঘোর বেইজ্জতি হইবে, তাহাকে হেনস্থার চূড়ান্ত করিয়া সেখান হইতে বিতাড়িত করা হইবে। ইহা সে বিলক্ষণ জানিত। অসহায় মানুষকে হেনস্থা করিবার মতো সুখ ক্ষমতাবানেরা সহজে ছাড়ে না। কাজেই ফেকুউল্লাহ কিছু কিনিবার উদ্দেশ্যেই সেখানে গিয়াছে এমন ভাব ধরে। সে শপিংকার্টের গহ্বরে হাতের কাছে যাহা পাইয়াছে তাহা দুই চারিখানা রাখিয়া, কার্ট ঠেলিতে ঠেলিতে, শরীর জুড়াইবার শান্তি উপভোগ করিতে করিতে, দোকানময় চক্কর কাটিতে শুরু করে। এই কাজটি সে প্রায় করিয়া থাকে।

বিভিন্ন আইলে থরে থরে রকমারি পণ্য সামগ্রী সাজানো। দেখিয়াও চোখের সুখ। দোকানময় প্রচুর বিত্তবান ক্রেতা। চোখ-কান খোলা রাখিলে টের পাওয়া যায় তাহারা সকলেই এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় মত্ত।  ক্রয়ের ক্ষেত্রে কে কাহাকে টেক্কা দিবে সেই প্রতিযোগিতা। একটি আইলের সম্মুখে ক্ষুদ্র জটলা দেখিয়া ফেকুউল্লাহ ঘটনা কি বুঝিতে চায়। উত্তেজিত এক ক্রেতা উচ্চস্বরে যাহা বলিতেছেন তাহার মর্ম হইলো-এক বিশিষ্ট গ্রীনটি কোম্পানী ব্যবসা গুটাইয়া লইবার কারণে তাহাদের অনেকের প্রিয় গ্রীনটির উৎপাদন বন্ধ হইয়া যাইবে। আগামিতে প্রিয় ব্র্যান্ডের পানীয়টি আর নাগালের মধ্যে পাওয়া সম্ভব হইবে না। ইহা কী প্রকারে মানিয়া লওয়া যায়! উক্ত ব্র্যান্ডের চা বন্ধ হইলো তো কী এমন ক্ষতি হইবে- জটলার কেহ একজন এমন বেরসিকের ন্যায় প্রশ্ন করায়, উত্তেজিত অনেকগুলি কণ্ঠ তাহার প্রতিবাদে হইহই করিয়া কীসব কহিলেন যাহা স্পষ্ট বোঝা গেল না। তবে ফেকুউল্লাহ ইহা স্পষ্ট  বুঝিলো, উপস্থিত  ভদ্রলোক- ভদ্রমহিলাগণ উক্ত চায়ের ব্যাপক ভক্ত। নতুবা দেশের নানাবিধ সমস্যা কিংবা বৈষম্যে যাহারা টুঁ-শব্দটিও করেন না; নানা অন্যায়-অবিচার যাহাদিগকে তিল পরিমাণ মুখর করিতে ব্যর্থ হয়। সেই তাহারাই জটলা বাঁধিয়া কেমন ঝন‌ঝন্ করিয়া বাজিতেছেন। স্বীয় পছন্দে টান পড়িবার আশঙ্কা ইহাদের কেমন জোটবদ্ধ করিয়াছে। যথেষ্ট কাতর করিয়া তুলিয়াছে। 

ফেকুউল্লাহ জীবনে কখনও গ্রীনটির স্বাদ কেমন তাহা চাখে নাই। সে টঙ দোকানের ফুটাইতে ফুটাইতে কড়াকষ্টা দুধচা বা লালচা খাইয়া অভ্যস্ত। বিত্তবানেদের আহাজারি তাহার নিকট কৌতুক মনে হওয়ায় সে  হাসি চাপিয়া অকুস্থল হইতে সরিয়া আসে। ইহার পর পণ্যভরা কার্টখানা দোকানের কোনো এক আইলের চিপায় রাখিয়া দোকান ত্যাগ করিয়া মেসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করিলো।

মেসে ফিরিয়া সে তাহার মেসমেট এবং জানে জিগার দোস্ত লতিফুর কে দোকানের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করে। উক্ত ঘটনার পর তাহার মস্তিষ্কে যে একখানি বুদ্ধির উদয় ঘটিয়াছে তাহাও খুলিয়া বলিলো। লতিফুরের বুদ্ধি প্রখর, ব্যাপার বুঝিতে তাহার বিলম্ব হইলো না। তবে বুদ্ধিটা ভালো হইলেও তাহা একবার পরীক্ষা করিয়া দেখা দরকার। পরদিন হইতে দুইজনে সেই ব্যাপারটি পরীক্ষা করিবার নিমিত্তে কাজ আরম্ভ করিয়া দিলো। কয়েকদিন পরীক্ষা নিরীক্ষা করিবার পর দুই বন্ধু নিশ্চিত হইলো যে স্বাদগন্ধে অতুলনীয় একটি পানীয়ের সন্ধান তাহারা পাইয়াছে। সেই স্বাদ এই বেকুব জাতিকে একবার দিতে পারিলে তাহাদের জীবন স্বার্থক বলিয়া প্রমাণিত হইবে। কিন্তু বুদ্ধি যতই ভালো হউক, তাহা প্রসারের জন্য যে ক্ষমতা প্রয়োজন তাহাদের উহা নাই বলিয়া ফেকুউল্লাহ ব্যাপক বিমর্ষ হইয়া পড়িল। তাহাতেও লতিফুরের বুদ্ধির ঝোল মিশ্রিত করিয়া একদিন ঠিকই নতুন রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেল। দুইজনে রাতভর পরামর্শ করিয়া একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাইল।

দুই বন্ধুর সম্মিলিত বুদ্ধি পকেটে পুরিয়া সেইদিন অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিক বিলম্বে ফেকুউল্লাহ ‘সুন্দর জীবন’ অফিসে পৌঁছায়। বিলম্ব হেতু,  বড় সাহেবের ভৎর্সনার সংবাদ তাহার নিকট পৌঁছাইবার আগেই সে বসের কক্ষে গিয়া উপস্হিত হয়। অন্যান্য অফিসের ন্যায় এই অফিসের বস অতটা খেউড়ে নন, কিছুটা স্বাভাবিকত্ব তাহার মধ্যে বর্তমান। কাজেই ফেকুউল্লাহকে তাহাদের বুদ্ধির খুঁটিনাটি খুলিয়া বলিতে কোনোরূপ সমস্যায় পড়িতে হইলো না। সমস্তটা শুনিয়া সুন্দর জীবন ইন্সুরেন্সের বড় সাহেব উৎফুল্ল চিত্তে হাতের আঙুল মটকাইলেন। ইহার পর তিনি তাহার এক শিল্পপতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি কিনা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের পাণ্ডা, তাহাকে ফোন করিলেন। বসের মুখ দেখিয়া ফেকুউল্লাহর বুঝিতে বাকি থাকিলো না, তাহার বুদ্ধি জব্বরভাবে তাহার মনে ধরিয়াছে। এখন দুইটি শর্তে সে তাহার বুদ্ধি হস্তান্তর করিবে- ব্র্যান্ডের নাম তাহাদের নামেই হইতে হইবে এবং তাহাকে উক্ত পণ্যের মার্কেটিং প্রধান করা লাগিবে।   

নতুন বাণিজ্য চালুর সমস্ত ব্যবস্থা পাকা হইবার পর ফেকুউল্লাহ আর লতিফুর একখানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সারিলো। বিজ্ঞাপনের নিমিত্তে একটি বড় বাজেট লইয়া মডেল হিসাবে দুই ব্যক্তিকে বাছাই করিলো। একজন দেশের নামকরা সেলিব্রেটি, অন্যজন ইউটিউবের জনপ্রিয় এক চিকিৎসক। যাহাদের কথায় উচ্চবিত্তরা যথেষ্ট আস্থা রাখেন। উক্ত দুইজনকে একদিন পাঁচ তারকা হোটেলে লাঞ্চের দাওয়াত দিয়া ‘ফেকুলেকু’ ব্র্যান্ডের প্যাকেটে বিদেশী গ্রীনটিব্যাগ ঢুকাইয়া চা খাওয়ানো হইলো এবং তাহা ভিডিওতে ধারণ করা হইলো। বাড়ি ফিরিবার সময় দুইজনের হাতে সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের রিটার্ন টিকেট ধরাইয়া দিলো। 

মাস ছয়েক পরের কথা।  শহরের দোকানে দোকানে নতুন এক গ্রীনটি ব্র্যান্ডের ব্যাপক জনপ্রিয়তার খবর ব্যাপক মাত্রায় প্রচারিত হইতে দেখা গেল। শহরের নানা সড়কের বিশাল বিশাল বিলবোর্ডও দখল করিল ‘ফেকুলেকু’ ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে দুই সেলিব্রেটির চা পানের দৃশ্য দেখিয়া  বিত্তবানদের অনেকেই সেই গ্রীনটি লইয়া লুতুপুতু বক্তব্য রাখিয়া বিনা পয়সায় তাহার প্রচারণার কাজটি সারিলেন। ফলে উক্ত গ্রীণটির কপালে বিপুল সংখ্যক ক্রেতা জুটিতে বিলম্ব হইলো না। প্রচার- প্রচারণার মক্কা হিসাবে পরিচিতি সোশ্যাল মিডিয়াও বাদ রহিল না। লেকুফেকু পানরত নর-নারীর নানা ভঙ্গিমার ছবিতে অনেকের টাইমলাইন ভাসিয়া গেল। দামে অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় সস্তা হওয়ায় অনেক মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বাস্থ্য সচেতন সদস্যেরাও উক্ত গ্রীনটির ভোক্তার সারিতে নাম লেখাইলেন। গ্রীনটির নামকরণটি যতই আজগুবি বা অর্থহীন হউক না কেন স্বাদে অতুলনীয়, ইহা সকলে একবাক্যে স্বীকার করিলেন।  

এদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাগানের বিশেষ একটি গাছের পাতা ঝরিয়া যাইবার অদ্ভুত এক রোগ সনাক্ত হওয়ার খবর পত্রিকার পাতায় খবর হিসাবে আসিতে লাগিল। তদন্ত কমিটি গঠনে ওস্তাদ জাতি দ্রুত তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করিল। সরেজমিন তদন্তে কমিটির কেহই গাছের পাতা ঝরার রোগটি সম্পর্কে কিছু ঠাহর করিয়া উঠিতে ব্যর্থ হইলেন। উক্ত কমিটির সর্ব কনিষ্ঠ তরুণটি তাহার বয়োজ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের বুঝাইতে ব্যর্থই হইলেন- পাতা যদি ঝরিবেই তাহা হইলে বাগানে কিংবা গাছের তলদেশে যে পরিমাণ পাতার ডাঁই থাকিবার কথা তাহা গেল কোথায়? দুই বয়োজ্যেষ্ঠের বক্তব্য ছাগলে খাইয়া গিয়েছে। ইহা অস্বাভাবিক নহে। খাইতেই পারে। সে বিষয়ে খুব সন্দেহের কিছু নাই। কিন্তু দেশের সর্বত্র সত্যিই কি এত লাগামছাড়া চারপায়া ঘুরিয়া বেড়ায়? যাহারা কেবলমাত্র পাতা খাইতেই দৃশ্যমান হয় এবং খাওয়া শেষে অদৃশ্য হইয়া যায়?

‘তর্ক করা তরুণদের স্বভাব’- এহেন বক্তব্যের রোষে পড়িয়া তরুণটি ক্ষোভ লইয়া মুখে কুলুপ আঁটিলো। ‘তদন্ত কমিটির নিকট হইতে যথা সময়ে তদন্তের রির্পোট পাওয়া যায় না’, অতীতের এহেন কলঙ্ক মুছিয়া অতি দ্রুত শলা পরামর্শ মতো রির্পোট পেশ করা হইলো। জানা গেল আফ্রিকা হইতে আগত ‘শিরশিরা’ নামক এক ব্যাকটেরিয়ার কারণে বিশেষ গাছটির পাতা ঝরিয়া যায় এবং একই সাথে তাহা অতি দ্রুত মাটিতে মিশিয়াও যায়। যে কারণে বাগানে বা সংশ্লিষ্ট গাছের নীচে স্তূপকৃত পাতা দেখা যাইবার কথা থাকিলেও তাহা ঘটিতেছে না। এই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে আশু পদক্ষেপ না লইলে দেশের ঐহিত্যবাহী এই ফলটির ফলনে ব্যাপক ক্ষতিসাধনের আশঙ্কা। এই বিষয়ে পদক্ষেপ লইবার নিমিত্তে তিনজনের একটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হইল। বলাবাহুল্য, উক্ত কমিটিতে মুখফোঁড় তরুণটিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় নাই।

এইদিকে শহরের বেশ কিছু খানদানী এলাকা হইতে ঘনঘন বিশেষ এক পশুর ডাক শোনা যাইতে লাগিলো। যাহার মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়া গেল। অবস্থা এমন দাঁড়াইল যে, একসময় তাহা সংবাদ মাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ হিসাবে পরিবেশিত হইতে শুরু করিলো। মধ্যবিত্তের মহল্লাও বাদ গেল না। এই ডাকের কোনো আগা মাথা নাই। যখন তখন শোনা যাইতে লাগিলো। অতি প্রত্যুষে কিংবা গভীর রাত্রিতে ডাকটি অনেকের নিকট বিশেষ যন্ত্রণার কারণ হইল। পড়ন্ত দ্বিপ্রহরের নৈঃশব্দ্য ছিঁড়িয়া অথবা ক্লান্ত সন্ধ্যায় বিশেষ প্রাণীটির মুর্হমুর্হ কলরবে শহর ভরিয়া গেল। 

বিশেষ পশুটির ডাকাডাকিতে মানুষের ঘুম হারাম হইবার দশা। উঠিতে বসিতে এক রব কাহাতক আর সহ্য হয়। অন্যদিকে বিশেষ গাছের পাতা ক্রমে সহজলভ্যতা হারাইয়া প্রায় দুর্লভের খাতায় নাম লিখাইতে শুরু করিলো। উক্ত পাতা যাহাদের প্রধান খাদ্য হিসাবে নির্ধারিত ছিল, একসময় সেই পশুকুলের ভিতর হাহাকারের রব উঠিলো। পশু এবং জনস্বাস্হ্য বিভাগ হইতে তাহাদের খাদ্যাভাস পরিবর্তনের সুপারিশ আসিলেও পশুকুল নতুন খাদ্য গ্রহণে খুব একটা আগ্রহ দেখাইলো না। ‘ঠেলার নাম বাবাজী’, ‘ক্ষিদার পেটে সবই সয়’- পশুপালন বিভাগের এই পরামর্শের প্রতি আস্থা রাখিতে দেশের খামারিদের প্রতি আবেদন রাখা হয়। কিন্তু তাহাতেও খুব একটা সুবিধা হইলো না।

শহরটির মানুষ এবং বিশেষ পশুকুলের চিৎকার এখন একই শব্দ তরঙ্গে প্রক্ষেপিত হইয়া আকাশ-বাতাস মুখরিত রাখে। কান পাতিলে আপনিও হঠাৎ হঠাৎ শুনিতে পাইবেন- ম্যাঁ! ম্যাঁ!! 

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>