অতিমানবতা নিঃসঙ্গতা এবং একজন নীৎসে

 
“নারীর কাছে যাচ্ছ যাও, যাওয়ার আগে চাবুক নিয়ে যাইয়ো
যখন যাবে নারীর কাছে, লাঠি একটা রাখবে কাছে
নারীর একমাত্র ভালো কাজ হচ্ছে বীরপুত্র সন্তান জন্ম দেওয়া
বীর পুরুষের কাছে অবসর বিনোদনের উপায় মাত্র, বড়জোর সঙ্গিনী”
 
এমন কিছু মন্তব্য করার কারণে নিৎসেকে অনেকেই প্রচন্ড পুরুষবাদী নারীবিদ্বেষী হিসেবে প্রচার করতে চায়। এদেশে অনেকেই তাই মনে করে যে, নিৎসে একজন উগ্র নারীবিদ্বেষী। আসলে বিষয়টা এতোটাও সরলীকরণ করা ঠিক নয়। নিৎসেকে খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছেন। আর খুব অল্প মানুষেই তাঁর দর্শন উপলব্ধি করতে পেরেছেন। দু চারটি লাইন দেখে পুরুষবাদী প্রচার চালানো অযৌক্তিক লাগে আমার কাছে।দেশীয় অনেক সাহিত্যিক, সমালোচকদের একটা কমন ধারণা হলো নিৎসের প্রেম “লু সালোমের” প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই এমন ধারণা পোষণ করেন তিনি। আসলে ছোট বেলায় নিৎসে অনেক নিপীড়িত হয়েছেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে তাই বিরূপ প্রভাব পরেছে ছোট বেলায়।”লু সালোমে” সেই সময়কার একজন নামি চিন্তাবিদ, সমালোচক, লেখক, সমন্বয়কারী ছিলেন। দেখতেও সুন্দর ছিলেন।ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো যেমনটি ছিলেন ঠিক তেমনটি বলা চলে। উনি এতো গুণ ও রুপের অধিকারী ছিলেন যে ফ্রয়েড সহ সেই সময়কার অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি তাঁর প্রেম প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে তিনি নিৎসে কে পনেরো দিন তাঁর সাথে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেসময় নিৎসে তাঁকে মুগ্ধ করতে গিয়ে তাঁর দর্শন বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। ঠিক এই প্রসঙ্গে এদেশীয় সমালোচকরা রগরগে ভাবে বলে বেরান নিৎসে ব্যর্থ হয়েছে তাই নারী বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন। আমি বলবো বিষয়টা ঠিক এমন নয়। নিৎসে লু সালোমের সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন বলেই তিনি আরো গভীরে চিন্তা করার রসদ যোগাতে পেরেছিলেন। বরং তিনি কৃতজ্ঞ ছিলেন। লু সালোমে তাঁর বয়সের চেয়ে ছোট তরুণ কবি রাইনার মারিয়া রিলকে প্রেমের সম্পর্ক চর্চা করেছিলেন। এটা একটা দৃষ্টান্ত যে প্রেমের কোনো বয়স নেই।
 
 
এদেশীয় অনুবাদ এতোটাই অপাঠ্য ও অমূলক সমালোচনা হয়েছে যে উপর থেকে আলো পরেনি তলায় অন্ধকার এখনো রয়েছে। নিৎসেও কম মজা করেনি অবশ্য। উনি রহস্য করে অনেক কিছু বলেছেন, লিখেছেন। হঠাৎ একদিন বলে বসলেন “ঈশ্বর মৃত” কী একটা অবস্থা তাই না।এদেশীয় সমালোচকেরা শুধুই নাস্তিকতা দেখতে পেয়েছেন। স্যাটায়ার বোঝেনাই। সে সময় শিক্ষিত করবার নামে আফ্রিকা ও উপনিবেশ গুলোয় যা শুরু হয়েছিলো , পোপ তন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার এতোটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তাই তিনি প্রতিবাদ করেছেন উচ্চ কণ্ঠে।
 
 
সে সময় তিনি অতি মানব দর্শনের ধারণা পেশ করেন। হিটলারের ভুল বোঝার দায় নিৎসেকে আজও নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তিনি নাকি ফেসিজমের প্রবক্তা। কী আশ্চর্যজনক একটি মিথ্যে! আমরা তাঁর অতিমানব ও নিঃসঙ্গতার দর্শন আলোচনা করলেই বুঝতে পারবো হিটলারের সাথে সাথে আমাদের বুঝতে পারার ভুল।
 
 
তাঁর জীবনযাপন ছিল সরল। তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রটেস্টান্ট ধর্মযাজক।নিৎসে ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি চিরায়ত সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্বের শিক্ষার্থী হিসেবে মেধার পরিচয় দেন। মেধার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী লাভের পূর্বেই চব্বিশ বছর বয়সে বাজেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিক্যাল ফিলোসফির প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা শুরু করেন। সে সময় তিনি লেখেন “The Birth Of Tragedy” গ্রন্থ। ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হল অ্যাপোলনীয় ও ডায়োনিজীয় ভাবনার।নিৎসের উপর ডায়োজনীয় আবেগের প্রভাব অনেকখানি। নিৎসের চিরসঙ্গী নিঃসঙ্গতা।এই নিঃসঙ্গতা তাঁর কাছে আত্মপ্রেম।লু সালোমের প্রতি ভালোবাসা এবং ব্যর্থতা তাঁকে নিয়ে গেলেন অনন্য উচ্চতায়। “Thus Spoke Zarathustra” গ্রন্থে Ubermensch বা র্্যবেরমেনশ বা ওভার ম্যান বা অতি মানব ধারণার চিন্তা পেশ করেন। “I teach you over man, Man is something that shall be overman. What have you done to overcome him? “
জরুথ্রুস্ট বলেছিলেন, আমি তোমাদের অতিমানবতা শেখাচ্ছি। সে মানুষকে অতিক্রম করে যাবে। তাকে অতিক্রম করার জন্য তুমি কী করেছো?
নিৎসে মনে করেন যে, অতিমানবের পক্ষেই সম্ভব বিশাল জীবন প্রবাহকে অনুসন্ধান করবার।তার সঠিক মূল্যায়ন করার। কারণ ইচ্ছাশক্তির উপরেই সব নির্ভর করে।
 
“Ecce Homo” একে হোমো গ্রন্থে নিৎসে বলেছেন, যেসব মূল্যবোধ উপসনা বা ভক্তি করা হয় তার বিপরীত বা উল্টোটাই মানুষের অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ এবং ভবিষ্যতের মহৎ আবিষ্কারকে নিশ্চিত করতে পারে।
 
নিজস্ব চিন্তাধারার কারণেই তিনি ছিলেন চির একাকী, চির নিঃসঙ্গ।অথচ অনন্ত শক্তির অধিকারী। তিনি সীমাবদ্ধতা দেখেছেন প্লেটো, এরিস্টটল,ফিকটে,স্পেনোজা,ডেকার্ট,কান্ট প্রমুখ দার্শনিকের।কেবল মাত্র শোপেনহাওয়ারকে সবসময় শ্রদ্ধা করতেন। এবং তিনি বলেছেন কোনো দার্শনিক কে যদি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয় তাহলে তিনি শোপেন হাওয়ারকে মন থেকে শ্রদ্ধা করবেন। শোপেনহাওয়ারের will বা “দ্যা ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড আইডিয়া’র ” বিমূর্ত বিষন্নতা হ্রাস করে নিৎসেকে।”Doctrine” বৌদ্ধিকতা থেকে তিনি শিখলেন কীভাবে বিচ্ছিন্নকরা সম্ভব নিজের ইস্পা ও কামনা থেকে। কীভাবে নিজেকে দেখা যায় অনেক দূর থেকে।তিনি শোপেনহাওয়ারের নিঃসঙ্গতা ধারণ করে ক্লাসিক্যাল ফিলোসফিকে পৌঁছে দিলেন পোস্ট মর্ডান ফিলোসফির জগতে। রেখে গেলেন নিঃসঙ্গতার অনন্য এক দৃষ্টান্ত। বোঝালেন সবাইকে দুর্বার এক হাহাকার যেন হার মানায় পাহাড় সমান বিশালতাকেও।
 
 
 
তথ্যসূত্র :
১। Ecce Homo – Friedrich Nietzsche.
২। Thus Spoke Zarathustra – Friedrich
Nietzsche.
৩। The Birth Of Tragedy – Friedrich
Nietzsche.
৪। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন – ড. আমিনুল ইসলাম।
৫। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস – বার্ট্রান্ড রাসেল।
৬। পাহাড় প্রমাণ জীবণ দর্শন : ফ্রেডরিক নিৎসে-
সীমা চৌধুরী।
৭। দর্শন-দিগ্ দর্শন – রাহুল সাংকৃত্যায়ন ।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত