গালাগালি ও নবারুণ ভট্টাচার্যকে আবিষ্কার

এমন নয় তাঁকে আমি খুব পছন্দ করি, তাঁর যুগকেও নয়। কিন্তু তবু তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করছি সুতীব্রভাবে। কেননা তিনিই একমাত্র, যিনি একেবারে Solid ভাবে বলেছেন পাগল, বেকার, ছিন্নমূল, বিত্তহীন, ভ্যাগাবন্ড এবং কন্ঠহীনের কথা। আর কোন লেখক তার সমগ্র জীবন জুরে শুধু এদেরই স্থান দেননি। সবাই কম বেশি প্রেম, নারী, সংসার, ধন, মান, দারিদ্র্য সব মিলে-জুলে লিখেছেন। বাংলার প্রথাগত মধ্যবিত্ত পাঠকের কাছে তিনি একজন Criminal লেখক। কারণ, তিনি কবিতায় গালিবাজীর সূচনা করেছেন। লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী এবং নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের ছেলে তিনি। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৩), বঙ্কিম পুরস্কার এবং নরসিংহ দাস পুরস্কার।

কেন তিনি:

ষাটের দশকের পশ্চিমবঙ্গ। স্বাধীনতা কেবল ২২-২৪ বছরের তরুণ। হাজার হাজার বেকার, কৃষক আত্মহত্যা করছে প্রতি বছর। ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে যৌথভাবে মানুষের খাবার খোজা নিয়মিত দৃশ্য। খুন, ধর্ষণ, পাচার, মাদক খুব স্বাভাবিক বিষয়। বোমাবাজি, পুলিশের হাতে ছাত্র খুন যেন ডালভাত। অন্যদিকে উচ্চবিত্তের অঢেল বিলাসিতা, লাগামছাড়া দুর্নীতি সর্বত্র এবং সরকারী সন্ত্রাস সমাজজীবনে বিবেকবান মানুষের কণ্ঠ চেপে ধরছে দিন দিন। এরকম একটি Suffocating সময়ে জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইমা’ থেকে উদ্ভূত মাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ থেকে সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি পাওয়া যে ‘কাউন্টার কালচার’ তথা হাংরি আন্দোলন ইয়োরোপীয় সাহিত্যে শুরু হয়েছিল, পশ্চিমবংগীয় পত্রিকা ‘কল্লোল’ তার ই সূচনা করেছিল বাংলায়ও। এযুগে সমীর, মলয়, শক্তির হাত ধরে শেষে এলেন নবারুণ। ঐ সময়ে যে আর্থ-সামাজিক অবস্থা তৈরি হয়েছিল, একজন সাহিত্যিক হিসেবে তারা অগ্রজের ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং সেটা না নিলে তারা ইতিহাসের কাছে অপরাধী থাকতেন।

কি লিখেছেন:

নবারুণের মত প্রতিবাদী কবিই বলেছিলেন প্রথম:

“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না
এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না
এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না
আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেব
বুকের মধ্যে টেনে নেব কুয়াশায় ভেজা কাশ বিকেল ও ভাসান
সমস্ত শরীর ঘিরে জোনাকি না পাহাড়ে পাহাড়ে জুম
অগণিত হৃদয় শস্য, রূপকথা ফুল নারী নদী
প্রতিটি শহীদের নামে এক একটি তারকার নাম দেব ইচ্ছে মতো
ডেকে নেব টলমলে হাওয়া রৌদ্রের ছায়ায় মাছের চোখের মত দীঘি
ভালোবাসা-যার থেকে আলোকবর্ষ দুরে জন্মাবধি অচ্ছুৎ হয়ে আছি-
তাকেও ডেকে নেব কাছে বিপ্লবের উৎসবের দিন।”
-এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না (১৯৮৩)

এরকম তার সব কবিতায় তিনি বিপ্লবের কথা বলেছেন। নষ্ট সমাজ ভাঙ্গার কথা বলেছেন। সত্যিই প্রতিদিন এমন বীভৎস মৃত্যুর খবর জেনে এটুকু কি উপলব্ধি হয় না যে এই মৃত্যু উপত্যকা কি করে আমার দেশ হয়?

“তিরিশ হাজার লোক ভাসছে
নোনা জলের ধাক্কায় তাদের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে
সেই জন্যে আমার একটা মোটরগাড়ি চাই।
লোড শেডিং-এ গলে যাচ্ছে বরফ রেফ্রিজারেটরে
মর্গের মধ্যে মড়ার চারপাশে বরফ গলছে
সবুজ টিকটিকির মতো সতর্ক থাকুন
বসন্ত আসছে
কিন্তু আমার একটা মোটরগাড়ি চাই।

পাখা বন্ধ করে দিয়েছি অসাড় নভেম্বরে

উইণ্টার প্যালেস এসে দখল করছে আমাকে

বেড়ে যাচ্ছে কোলেসটেরল, বমন, বুলেটের বরাদ্দ

মোমবাতি না থাকলে একটা হরিজনকে ধরে

জ্বালিয়ে দাও

তবুও আমার একটা মোটরগাড়ি চাই”
-আমার একটা মোটরগাড়ি চাই

এত বিপুল মৃত্যু আর ধংসের মাঝেও আমাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। একজন দায়িত্বশীল সাহিত্যিক নয় মানুষ হিসেবে এই ‘ফালতো’ নবাবী আর সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদ করা অপরাধ নয়।

নিউক্লিয়ার যুদ্ধে

বিশ্ব যেবার ধ্বংস হয়ে যায়

গোটা মানব সংসারই যখন

ছাইয়ের গাদা

সব দেশ যখন শেষ

তারও পরে বেরিয়েছিল

শারদীয়া ‘দেশ’

অপ্রকাশিত, এক আঁটি

রাণুকে ভানুদাদা

– বিশ্ব ধ্বংস

যুদ্ধ নিয়েও আমাদের উদাসীনতাকে দেখেছেন এভাবে।

সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ এক কল্প চরিত্র ‘ফ্যাতারু’। ফ্যাতাড়ুরা উড়ে গিয়ে হানা দেয় কখনও আই পি এল খেলা চলাকালীন, কালোবাজারিদের ভয় দেখাতে, ভণ্ড প্রগতিশীল সাহিত্যিকের মুখোশ খুলতে, অনুষ্ঠান পণ্ড বা জোচ্চোরের বিয়ে ভণ্ডুল করতে।

তিনি কবিতায় গালি পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন:
“এক দিকে চাষিরা মার খাচ্ছে
অন্যদিকে ওনারা দাঁত কেলাচ্ছে
কবিতা পাঠ করছে
বানচোদগুলো মানুষ না অ্যামিবা ! ”

যাহোক, উনি যে সময়ের কবি সে সময়ে দাঁড়িয়ে কোনভাবে চুপ থাকা সম্ভব না। একজন তীক্ষন অনুভূতি সম্পন্ন সুস্থ মানুষ যার অস্ত্র লেখনী, তাঁর লেখায় উঠে আসতে লাগল ক্ষোভ, ক্রোধ, ঘৃণা। গালিগুলো তার প্রতীক মাত্র। একজন কবি কী পারেন? পারেন কবিতা লিখতে, ক্যামেরার সামনে কথা বলতে, এবং শেষমেষ পারেন রাস্তায় নামতে। তিনি সবই করছেন। তার দায়িত্ব তিনি পালন করছেন। আমাদের এখানে যারা লিখছেন, কথা বলছেন, আজকের এই Suffocating সময়ে দাড়িয়ে তারা কী লিখছেন, কী বলছেন কিংবা রাস্তায় কে কবে তাদের দেখেছে?

এখন বলি আমরা মধ্যবিত্ত পাঠক যারা চেপেচুপে চলে সবজায়গায় মধু মধু আহা আহা এবং সাধু সাধু ভাষা ও সান্ত্বনার শান্তি খুঁজি, তাদের কথা। গালি দেখলেই চমকে ওঠার অভ্যাস পরিবর্তন করুন। গালি যখন আবর্জনাময় মস্তিষ্কের মুখ থেকে বেরোয়, তখন সে মুখ সুন্দর হলেও সেটা গালিই বটে। কিন্তু একজন তীক্ষ্ণ বিবেকবান মানুষ যখন গালি দেন, গালির দিকে না তাকিয়ে সময় এবং বিষয়ের দিকে মনোযোগী হন। হাতিয়ে দেখুন, তিনি আপনাকে বাঁচাতেই মরিয়া হয়ে কথা বলছেন যদিও শুধু কথা বলার সময় তখন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। দেয়াল থেকে পিঠ হয়তো আর ইঞ্চি দশেক দূরত্বে। ‘ভাবুন, ভাবা প্রাকটিস করুন’।
নয়তো তাঁর মতই বলতে হবেঃ

“মানুষ যদি বিদ্রোহ করতে ভুলে যায়
তখন তাকে মনে করিয়ে দেওয়া
কি পাপ?…

কত জায়গায় তো ফেলি আমি দেশলাই
একবারও ভুল করে নয়
যদি কেউ আগুন জ্বালায়।

ভয় করে, এর পরে হয়তো একদিন
মানুষ আগুন জ্বালাতে ভুলে যাবে।”

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত