Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

সোহেল হাসান গালিবের কবিতা

Reading Time: 3 minutes

আজ ১৫ নভেম্বর কবি,অধ্যাপক ও সম্পাদক সোহেল হাসান গালিবের  শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার কবিকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

ডার্কচেম্বার

অসুস্থ হলেই ভালো। এখন এমনই মনে হয়। ধীরে সুস্থে, তর্ক-টর্ক ছেড়ে অন্য কারো ভাবনায় ঢুকে পড়া যাবে। ডার্কচেম্বারের পাশ দিয়ে জানি খালি পায়ে হাঁটা প্রয়োজন। যদি ফলস কোনো শব্দে দুপুরের রোদ ওঠে, আই মিন, ওপরের থেকে মেঘগুলি সরে যায়, হয়তো দেখেই ফেলতে পারি একটি পারুল ডাকে ইশারায়, শিস দিয়ে। কাকে? কিছুটা পার্পল, রেড-ভায়োলেট এই থতমত মুহূর্তের ফাঁস যেন মিটমিট হাসিতে ছড়ায়। গুইসাপ তার ধূসরতা নিয়ে এত যে বিব্রত বেড়ালের গাম্ভীর্যও ভরে গেল নিঃশব্দ ঠাট্টায়।

অনুতাপ

জানালার বুকে নীল—নুয়ে থাকা আকাশের আর্চ
ঢলে পড়ুক না হেসে ইউক্যালিপ্টাসের পাতায়,
যেভাবে ফুটুক ফুল, ব্যালকনি থেকে এ নির্জন
সুদূরতা মুছে গেলে যেন সে রাতারগুল নাম
রাতের বাতাসে ভেসে যাবে। অনুশোচনার মন
কতটুকু জ্বলে জোনাকির বনে? খুলে ফ্যালো ধীরে
চোখ থেকে চোখ। যত দূরে হোক বিন্দু বিন্দু তারা—
কেঁপে কেঁপে নিভে যাক আয়ু তার, জলের গভীরে।

দ্বিরাগমন

চলে গিয়ে ফিরে সে এসেছে। নাগকেশরের বনে এমন দুলছে হাওয়া, সাপের ফণাও হেলে পড়ে।

ইশারাই আমাদের মাতৃভাষা। বলে কেউ। তবু কে জানাবে তাকে সম্ভাষণ, এই কুন্দফুল ছাড়া!

ফিরে এসে চলে গেছে তাই। নাগলিঙ্গমের বনে এত নির্জনতা, পাখিদের স্বপ্নভঙ্গ হয় বুঝি—

এই ভয়ে তির তির করে বয়ে চলে শীতলক্ষ্যা…

ফুল তোলা

ঘ্রাণই তবে ফুলের গর্জন। জারুলের বনে তাই সুচির স্তব্ধতা। স্তব্ধতার বুকে এই ভাঙা পার্ক। এইখানে এসো। এসে দ্যাখো, কত নির্ঝঞ্ঝাট বসে প্রত্যাখ্যান-পত্রগুলি আজ বারবার পড়া যায়— ঠান্ডা ছায়া ফেলে ক্ষুব্ধ অক্ষরের মুখের ওপর। কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে খুনের পরিকল্পনা কবে ঝরে পড়েছিল— ওই লেক জুড়ে ভাসছে। ভাসুক। জলে না নেমেও কিছু ফুল তুলে আনা যেতে পারে।

বৃক্ষরোপণ

আজ ভোর না হতেই কে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল একা— কোমরে পিস্তল নেই, অথবা ফুলের তোড়া হাতে।

কেউ ওকে আর ফলো করো না, ডেকো না খামাখাই। বসে থাকতে দাও ওই লেবুকুঞ্জে, স্তব্ধতার পাশে।

কবরের জায়গাটুকু আগে থেকে মেপে রাখা ভালো। আরও ভালো নিজ হাতে নিজেরই শিথানে শিউলি পোঁতা।

টিয়ে পাখি তার সব কথা টুকে রাখুক না গাছে— লিখুক না চিঠি, দিনভর, পাতাকুড়ানির কাছে।

আয়ুরেখা মুছে মুছে

নাম বলা বারণ এখানে, তবু তার নামে আজ শুরু করি গান। গান আমি গাই না কারো কাছেই। ভুলে যাক দেবযানী, কার হাত ধরে পেয়েছিল কবে কুয়ো থেকে ত্রাণ। সমাধি-ফলক ছুঁয়ে ফুল তুলে এনে সাজাই দোলনা, পড়ে-থাকা ফুলদানি। বিকেলের মনে এই কল্কে-ফোটা আলো, যাকে ঠিক রৌদ্র বলা দায়, তার কাছে অত্রি পুষ্যা অরুন্ধতী যতটুকু পুনর্ভবা, ততটুকু হৃদয় এখানে। এখানে আমার মর্মডোবা সব চিন্তার ভাসান— জলে ডুব দিয়ে শুনতে পাবো না কোরাস, যেই সব কোরালের—তারই জন্যে হাওয়ায় গম্ভীরা। যে পুরুষ নারীর বিহ্বল অঙ্গে স্বেদহিম স্বস্তি পাবে বলে আকাশ আলুল-করা মেঘ হাত তুলে ডাক দেয় এবং ওড়ায় তার বুকের ভেতর থেকে—কোনো কবুতর বক নয়, কাকাতুয়া-শাদা ছেঁড়াপাতা— সে জানে না শূন্য বার্তা ভেসে যায় ডিঙি নৌকা হয়ে; অনেক পালক, পলকের জ্যোৎস্নাবাহী ওইসব কম্পমান ডিঙি, ফেরে ঢেউয়ে ঢেউয়ে, ভেড়ে না কোথাও…

আয়ুরেখা মুছে মুছে এতটা এসেছি। ভয়ে ভয়ে। পুষ্প বা পাদুকা—কোনো চিহ্নই রাখি নি পিছে ফেলে। সূর্যাস্ত কি ফেলে গেল কিছু—চুনশাদা বালুচরে? মন্থর স্রোতের টানে থেমেছে ইঞ্জিন—যেন তারই পূর্বাভাস পেয়ে। একে একে ভেসে যায় নৌকাগুলি শেয়ালের ধর্ম জেগে ওঠা থমথম কাশবনে। বাতাসে গুটিয়ে হাতা, গগনশিরীষ এল কবে ছোট্ট জানালার পাশে! বিস্মৃতির মৃদু ঘ্রাণঝরা সময় মোমের মূর্তি—জ্বলে ওঠে, তাই গলে যায়। অঙ্গুলিহেলনে শুধু, এই ধূর্ত পৃথিবী এখন কাছ থেকে নগ্নিকাই দেখে নেয়। দেখাতে কি পারে? নির্বাক বাদুড় যতদূর ওড়ে—ছেয়ে ফ্যালে হিম তমসায়। তমস্বিনী, কার হাত ধরে পার হব এ রাত্রির গুহা—অমাময়ী মা আমার! ভয়ে ভয়ে এখানে এসেছি। আয়ুরেখা মুছে মুছে। তাই আর পুষ্প, পাদুকার কোনো চিহ্নই রাখি নি পিছে ফেলে। পাথুরে চোয়াল ঠেলে, শুনতে পাই, এতদিন পর গম্ভীর দেয়াল ডাকছে আমাকেই নাম ধরে—‘আয়’।

মাছকে সাঁতার শেখালাম আমি, পাখিদের গান, দিলাম মেঘের বুকে ওড়বার মন্ত্র। তবু জলে হেঁটে যেতে নিজেকেই অবিশ্বাস। তোমাকেও দেখি পার হও ‘তরাসিয়া’ উপবন কলার ভেলায়।

দেবি, তুমি পার হও তরঙ্গিয়া। সে তরঙ্গে যায় ভেসে ঘট, ডুবন্ত ঘাটের থেকে। এই দিকে আমি থেরগাথা খুলে নিয়ে খানিকটা ঘুমাবার আগে গাবসন্ন্যাসীর মতো মহানিমগাছ-তলে এসে

ভাবি, কোথা থেকে আসে এই গন্ধ, ছাতিম ফুলের? শ্রমণেরা গিয়েছিল কবে তার নাগাল পেরিয়ে? বারুদস্তম্ভিত পৃথিবীর থেকে এমন দুপুর যতদূরে থাক, সেই তারাকুঞ্জ থেকে রাত্রিবেলা

উড়ে চলে যাওয়া শাদা হাঁস তার দেখা পেয়েছে কি?

তোমার মুখের দিকে ফিরে তাকালেই যদি সব বোঝা যেত, কাঠবিড়ালির পিছে পিছে এতদূর আসবার মানেই ছিল না। থাকতাম চুপচাপ অর্জুন ফুলের মতো সম্ভ্রান্ত যোনির কাছে বসে

ডাকতাম ইশারায় বরুণ ফুলের হাসিটিরে…

পাখির প্রয়াস যেন—যদিও মানুষ, তবু দ্যাখো তোমার পায়ের কাছে এখনো পালক পড়ে আছে। জলপিয়ানোর থেকে তুলে নিয়ে টলমল টোড়ি কেবল কম্পনটুকু রেখে যাচ্ছি গাছের পাতায়।

এখানে পাহাড় নেই, সবুজের চূড়া কিছু দূর। রয়েছি উপান্তে একা, ধূলিধুম নাগরিকতার মোহন আড়ালে। কাঠগোলাপের হাসিটির নিচে সারাটা দুপুর—কাঠবিড়ালির হৃদয় যেমন।

গলিত মোমের ছোঁয়া লেগেছিল কবে একদিন; মেঘের গা বেয়ে চেরিফুলের চুম্বন আজ ঝরে। বাতাসে ধুনুরি—সব দৃশ্য ভেঙে হয়ে যাচ্ছে গান। এখন আমারও বন্ধ ওড়া, কার্নিশের ’পরে ঠাঁই—

পড়ে যাই—গড়িয়ে গড়িয়ে মৃত্যু—মীড় ও গমকে; নিরীহ প্রেতের মতো তোমার সকাশে গিয়ে সুর হয় কথা। হয়তোবা নাই শোনো তুমি—অর্থহীন সেই প্রগল্ভতা। শুধু লক্ষ করো, তোমার পায়ের

খুব কাছে, এখনো পালক পড়ে আছে। ধসে যাওয়া কোনো ভবনের ছায়া জলের ওপর পড়েছে কি?

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>