eyes-of-a-blue-dog-by-gabriel-garcia-marquez

ইরাবতী প্রবন্ধ: পিটার কেরির মূল্যায়নে মার্কেজ । আহমেদ বাসার

Reading Time: 3 minutes

দু’দুবার ম্যানবুকার পুরস্কারজয়ী অস্ট্রেলিয়ান ঔপন্যাসিক পিটার কেরি বলেছেন- জেমস জয়েসের মতো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজও আমাদের অদেখা পৃথিবীর আলো দেখিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আমাদের সময়ের এই মহত্তম লেখক দেখিয়েছেন যে, বিশাল ও উদার হৃদয় প্রতিভার জন্য প্রতিবন্ধক নয়। তিনি মার্কেজ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এভাবে- ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে আমার দুই অস্ট্রেলিয়ান বন্ধু কলম্বিয়া থেকে ফিরে এসে আমাকে তাদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কাহিনী লিপিবদ্ধ করতে বলে। যার মধ্যে একজন অপরিচিত লেখক গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে কথোপকথনও অন্তর্ভুক্ত। আমি খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও তারা আমাকে ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড’ উপন্যাসের একটি ইংরেজি সংস্করণ পড়ার জন্য ধার দেয়। তারা কেউ তখনও এটি উপলব্ধি করতে পারেনি যে, আসলে তারা আমার জীবনকেই বদলে দিতে যাচ্ছে।

আমি তাদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার হল- আমি বইটি ফেরত দিতে ভুলে গেলাম। যদিও এটি ঠিক নয়, তবু আমি নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নিলাম যে, এই গ্রন্থটি আমার কাছেই থাকবে। কারণ এটি আমার যতটা দরকার, তাদের ততটা নয়। এ সময়ে আমি একজন পাকা চোর হয়ে উঠলাম, যখন আমি আমার স্বদেশের সাহিত্যের প্যাট্রিক হোয়াইট কথিত ‘পিঙ্গল বর্ণের বাস্তবতা’ থেকে পালানোর পথ খুঁজছিলাম; স্থবির পথকে করতে চাচ্ছিলাম ঝঞ্ঝামুখর। সত্যি বলতে আমি উন্মুখ ছিলাম উজ্জ্বল ও নবরূপে আবির্ভূত হওয়ার জন্য। এই গল্পগুলো এ ক্ষেত্রে ভালোই কাজ করছিল। কিন্তু আমি তখনও বড় চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে উঠতে পারিনি। গল্পগুলোতে স্থান নামের অনুপস্থিতি ছিল একটি ভালো দিক, যা আমি উপেক্ষা করতে চাচ্ছিলাম এবং আমি এতটাই তরুণ ছিলাম যে, মায়ারনিয়ং যে একটা অদ্ভুত নাম আর ওয়ানথাগি যে নিজেই একটি কবিতা তা উপলব্ধি করতে পারিনি।

কুড়িটি গল্প ও একটি উপন্যাস আমাকে দশ বছরের মধ্যে ঔপনিবেশিক বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু তার প্রথম ধাপ শুরু হয়েছিল, নির্দ্বিধায় বলা যায়, যখন আমি ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড’ উপন্যাসটি খুললাম এবং পাঠ করলাম- ওই সময় মাকোন্দো ছিল পালিশ করা পাথরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত স্বচ্ছ জলের একটি নদীর তীরে অবস্থিত জরাজীর্ণ ইটের তৈরি কুড়িটি বাড়ির একটি গ্রাম। যা ছিল প্রাগৈতিহাসিক ডিমের মতো ধবল ও বিকট। পৃথিবী এতটাই তরুণ ছিল যে, অনেক কিছুরই তখন নামকরণ করা হয়নি। ফলে ইশারা ও ইঙ্গিতের মাধ্যমে এগুলোকে নির্দেশ করতে হতো।

এভাবে গার্সিয়া মার্কেজ আমার সামনে সেই কাক্সিক্ষত দরজাটি খুলে দিলেন, যার ওপর আমি ক্ষীণভাবে আঁচড় কাটছিলাম।

সত্যি বলতে কি, তিনি এর আগেই আমাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিলেন এই লাইনটি দিয়ে- ‘বহুবর্ষ পরে, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল আরিলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মনে পড়ে যায় সেই দূরবর্তী অপরাহ্নের কথা, যেদিন তার বাবা তাকে সঙ্গে নিয়ে বরফ আবিষ্কার করেছিলেন’।

এরপর তিনি পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে আমাকে প্রভাবিত করে গেছেন। আমি গার্সিয়া মার্কেজে আসক্ত হয়ে পড়লাম এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে আমি জানতাম না যে, আমি কী পাঠ করছি! আমি কলম্বিয়ার কিছুই চিনতাম না, শুধু মাকোন্দো গ্রামটি ছাড়া। এভাবে আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে, একজন বিদেশী পাঠক যেভাবে অস্ট্রেলিয়ান কোনো পরিবার বা সামাজিকগোষ্ঠী সম্বন্ধে পরস্পর সম্পর্কিত সুদীর্ঘ কাহিনী পরম্পরা পাঠ করে; সেভাবে এই ঔপন্যাসিক ব্যক্তিগতভাবে যেন কোয়ালা (ছোট ভালুকের মতো লেজবিহীন পেটের থলেতে বাচ্চা বহনকারী অস্ট্রেলিয়ান প্রাণীবিশেষ) ও প্লাটিপাসকে (অস্ট্রেলিয়ার স্তন্যপায়ী প্রাণী) আবিষ্কার করেছেন।

এমনকি দশ বছর পরে যখন আমার নিজস্ব রচনায় মার্কেজ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন এবং আমি মায়ারনিয়ং ও ওয়ানথাগির মতো নামগুলোকে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করেছি; স্বদেশের আধিভৌতিক ও নিষ্ঠুরতার প্রতিও যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে উঠেছি, তখনও আমি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাইনি- কীভাবে নিজস্ব সংস্কৃতির বীজ থেকে একজন গার্সিয়া মার্কেজের জন্ম হয়!

সুতরাং আমি আমার প্রজন্মের অনেকের মতো ঝড়ো প্রশস্তির সুরে বলতে চাই- আমি গার্সিয়া মার্কেজের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এমনকি তার রচনার ভুল পাঠও আমাকে ঋদ্ধ করেছে।

আমাদের সময়ের এই শ্রেষ্ঠতম লেখকের মৃত্যুর পর অবশ্যই আমাকে এটি স্বীকার করতে হবে। যদি আমি মোটা দাগে বিষয়টিকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরি তাহলে বলতে হয়, একজন লেখকের শ্রেষ্ঠত্ব নানাভাবে চিহ্নিত হতে পারে। কিন্তু এটা নির্মোহভাবে হতে পারে অনুবাদ ও সমুদ্রের দূরত্ব অতিক্রম করে যখন ওই লেখক অন্য কোনো দেশ ও প্রজন্মের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

জেসম জয়েস ও টিএস এলিয়টের মতো গার্সিয়া মার্কেজও আমাদের অদেখা পৃথিবীর আলো দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আমাদের অধিকতর সাহসী করে তুলেছেন এবং গল্পের স্বকীয় পথে আমাদের ফিরিয়ে এনেছেন।

[সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান]

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>