জেন্ডার, সেক্স এবং সেক্সচুয়ালিটি – ‘‘আমরা কী এতই ভিন্ন”

নারী, পুরুষ, সেক্স, এবং সেক্সচুয়ালিটি। সারা বিশ্ব এই বিষয়গুলো নিয়ে সরব এবং প্রতিনিয়ত এই বিতর্ক করে যাচ্ছে। নারী, পুুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার এই পরিচয় এবং বৈষম্যেও বলয় থেকে বেরুনোর প্রয়োজনেই বিতর্ক কিংবা আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। জরুরি এই অর্থেও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারী পুরুষ কিংবা ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কের প্রশ্নে এখনো সেই পুরনো অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারনায় ভীষণ একাট্টা। আধুনিক চেতনায় মানবিক সম্পর্ক মাপতে তারা রাজি নন ফলে কিছু একটা এদিক ওদিক হলেই গেল গেল রব ওঠে এবং বড্ড অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন সমাজের কর্তারা।

মানবিক এবং বৈষম্যহীন সম্পর্ক এবং একজন মানুষের জীবন যাপনে সেক্স যেমন জরুরি বিষয় তেমনি এ নিয়ে প্রত্যেকটি মানুষের উদারতার সাথে জ্ঞান থাকাও অত্যন্ত জরুরি।

সেক্স এবং জেন্ডার আসলে কী ?

সেক্স এবং জেন্ডার এক নয়। এ শব্দ দুটির অর্থ এবং ব্যাঞ্জনা আলাদা করে বুঝতে হবে। বাংলা ভাষায় শব্দ দুটির কোন অর্থ নেই। এদের প্রতিশব্দও আমাদের ভাষায় অনুপস্থিত। সেক্স একটি শারীরবৃত্তীয় ধারণা আর জেন্ডার মূলত সমাজ মনস্তাত্বিক অবস্থা। প্রথমটা জন্মার্জিত লিংঙ্গ, দ্বিতীয়টা মানসিক অনুভূতি প্রসূতযৌন পরিচয়। একজন মানুষ যে সেক্স নিয়ে জন্মাবেন জেন্ডারও তার মতই হতে হবে এই ধারণাটি সম্পূর্ন ভুল এবং সমাজ প্রত্যায়িত। সহজ করে বলা যায়- সেক্স হল নারী এবং পুরুষ উভয়ের সমাজে পরিচিত হবার একটি বায়োলজিক্যাল পার্থক্যসমূহ। যেমন ক্রোমসোম বিন্যাস, হরমোন, প্রোফাইল, বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীন পার্থক্য নিরূপনকারী সেক্স অঙ্গসমূহ। আর জেন্ডার বলতে বোঝায় আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি কর্তৃক বিভাজিত সুর্নিদিষ্ট বৈশিষ্টসমূহ। যেমন, পুরুষতন্ত্র এবং নারীবাদ।

এ প্রসঙ্গে এনসাইক্লোপিডিয়াতে বলা হয়েছে – – sex  refers to the phychological hormonal and genetic makup (xx or xy chromosome) of an individual; Gender is a cultural category that contain roles, behaviors, rights, responsibilities privileges and personality traits assigned by that specific culture to men and women.

হেনরী বেঞ্জামিন তার ট্রান্সেক্সুয়াল ফেনোমেনন প্রবন্ধে প্রায়শই বলেছেন: জেন্ডার ইজ লোকেটেট এ্যাভোব, এ্যান্ড সেক্স ইজ বিলো দ্যা বেল্ট। অর্থাৎ সোজা কথায়, সেক্স সমগ্র বিষয়টিকে “দেহ কাঠামো” নামক ছোট্ট চৌহদ্দির মধ্যে আটকে ফেলতে চায়। সেখানে জেন্ডার বিষয়টিকে নিয়ে যেতে চায় অবারিত নীলিমায়। যৌনতার শারীরবৃত্তির বিভাজন মেনে নিয়েও বলা যায়, সামাজিক অবস্থার (চাপের) মধ্য দিয়েই আসলে এখানে একজন নারী ‘নারী’ হয়ে ওঠে; আর একজন পুরষ ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠে।

একজন নারী এবং পুরুষের শরীরের কিছু পার্থক্য ছাড়া মেয়ে এবং নারীর তেমন কোন পার্থক্য নেই। শুধু মাত্র যৌন এবং পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এবং অন্যসব অঙ্গ একই রকম। এর বাইরে নারী পুরুষের মধ্যে মিলই বেশী। এই জৈবিক বা শারীরিক গঠনকে প্রাকৃতিক লিঙ্গ বলে। তাদের শারীরিক গঠনের জন্যই ছেলেরা পুরুষ লিঙ্গ অবস্থান করে আর মেয়েরা নারী লিঙ্গে অবস্থান করে। এই জৈবিক বা শারীরিক পার্থক্য প্রকৃতিই তৈরী করেছে, আর এই পার্থক্য সব পরিবারে, সমাজে, দেশে একই রকম। শরীরের এই গঠনের জন্য পৃথিবীর সব জায়গায় ছেলে হচ্ছে ছেলে আর মেয়ে হচ্ছে মেয়ে। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে অন্য যে পার্থক্য বিদ্যমান যেমন কাপড়, চলনবলন, শিক্ষা, এবং তাদের প্রতি সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি সবটাই সমাজ তৈরী করেছে। তবে এই সামাজিক বা সাংস্কৃতিক পার্থক্য প্রতিটি সমাজে ও পরিবারে একরকম হয় না। যেমন কিছু মেয়ের লম্বা চুল থাকতে পারে। অবার কিছু মেয়ের ছোট চুল। আবার কিছু পরিবারের ছেলেরা ঘরের কাজে সাহায্য করে,কিছু ছেলে করে না। কিছু মেয়ে ঘরেই কাজ করে কিছু মেয়ে হাট বাজারের কাজও করে থাকে। নারী ও পুরুষের এই সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংজ্ঞাকেই সামাজিক লিঙ্গ (জেন্ডার) বলে।

উদাহরণ দিয়ে বলা যায় সমাজ এমন একটি নিয়ম বানিয়েছে যে, মেয়েরা ঘরে বন্দি থাকবে, ছেলেরা বাইরে যাবে,ছেলেরা ভাল স্কুলে যাবে, ভাল চাকরী করবে পারিবারের দায়-দায়িত্ব নেবে। মেয়ারা হবে সেই ছেলেদের অধীন।

এই সামাজিক লিঙ্গিয় বৈষম্য প্রকৃতির তৈরী নয়। প্রকৃতি দু’ধরনের শারীরিক কাঠামো তৈরী করেছে। সমাজ তাকে বৈষম্যের ভিত্তিতে নারী ও পুরুষে পরিণত করেছে, আর সমাজই তৈরি করেছে মেয়েলী এবং পুরুষালী বৈশিষ্ঠ।

আমাদের সমাজ নারী  আর পুরুষের জন্য জন্মের পরেই দুই ধরনের দাওয়াই বাৎলে দেয়। নানা রকম বিধি নিষেধ ও অনুশাসন আরোপ করে। পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে কথা বলার স্টাইল পর্যন্ত সব কিছুই এখানে লৈঙ্গিক বৈষ্যম্যে নির্ধারিত হয়। এর বাইরে পা ফেলা মানেই যেন নিজ লিঙ্গের অমর্যাদা। কোন ছেলে নরমভাবে কথা বললেই  খোঁটা দেয়া হয় মেয়েলী স্বভাবের বলে। আর নারীর ওপর হাজারো বিধি নিষেধের পাহাড় তো আছেই। ফলে এই দুই লিঙ্গকে  আশ্রয় করে তৈরী হযেছে ভিন্ন দুটি বলয়।  এই সামাজিক সংজ্ঞার কারনেই মেয়ে এবং ছেলের পার্থক্য বেড়ে যায় এবং মনে হয় নারী এবং পুরুষ যেন একেবারেই দুটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা।

এই সামাজিক লিঙ্গই ছেলে ও মেয়ে তথা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরী করেছে। সমাজই নির্ধারণ করে দেয় যে, পুরুষ হচ্ছে উত্তম আর নারী অধম। এই সমাজ পুরুষকে কাজের জন্য মজুরী দেয়। নারীকে কম মজুরী দেয় বা কিছুই দেয় না। বলে যে পুরুষেরা ক্ষমতাবান আর নারীরা ক্ষমতাহীন, অথচ সত্য হচ্ছে এই যে, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একজন নারী ও একজন পুরুষ রয়েছে, কিন্তু সমাজ আমাদের এই পুরুষের মধ্যে যে নারী অথবা নারীর মধ্যে যে পুরুষ রয়েছে তাকে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয় না। পক্ষান্তরে, মেয়ে এবং ছেলের মধ্যকার মিলগুলোকে উৎসাহিত কারার পরিবর্তে প্রচলিত সমাজ এবং সংস্কৃতি অমিল বা পার্থক্য গুলোকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আর সে জন্যই ছেলে এবং মেয়ে ভিন্ন ভাবে বড় হয়ে ওঠে। তাদেরর গন্তব্যও হয় আলাদা। এই বৈষম্যই নারী এবং পুরুষের মধ্যে বিরাজমান বিবাদ ও বিতর্কের কারণ।

সারা পৃথিবীতেই সামাজিক লিঙ্গীয় পার্থক্য হচ্ছে মূলত পিতৃতান্ত্রিক, যার গোড়ায় রয়েছে পুরুষের আধিপত্য। এগুলি পুরুষকে সহায়তা করে, কারণ বিরাজমান সামাজিক লিঙ্গীয় সামাজিক পার্থক্য আসলে নারী বিদ্বেষী। ফলে মেয়েরা অনেক প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে থাকে এবং তারা বৈষম্য ও নির্যাতনের মুখোমুখি হয় প্রতিনিয়ত, আর একারণেই ছেলেদের মেধার বিকাশ যে ভাবে ঘটে মেয়েদের সেভাবে ঘটে না প্রায়ই।

এই ধরণের পাথ্যর্ক শুধু মেয়েদেরই ক্ষতি করছে তাই নয়। ক্ষতি হচ্ছে দেশের ,পরিবারের এবং সমাজের। নানা ধরণের অনমনীয় গুনাবলী, দায়িত্ব ছেলেদেও উপরেও চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তারাও বন্দি এবং সামাজিক লিঙ্গীয় পার্থক্যের শিকার।

সেক্সচুয়ালিটি বলতে যা বুঝি :

সেক্সচুয়ালিটি হল মানুষের একটি একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। একজন মানুষের আরেক জনের প্রতি যে এক ধরনের নিবিড়তম যৌন অনুভূতি বা আকর্ষন তাই সেক্সচুয়ালিটি। তার ধরন বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে বা প্রকাশ ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে নারী  পুরুষ প্রতি,পুরুষ পুরুষের প্রতি, নারী নারীর প্রতি ছাড়াও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের যৌন অনুভূতি বা আকর্ষন হয়ে থাকে। কে কার সাথে থাকবে বা যৌনতায় জড়াবে এগুলো তাদের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় এবং হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের সমাজ নারী পুরুষের সম্পর্ক ব্যতিত অন্য যৌন সম্পর্ক মেনে নেয় না। এমনকি এই সমাজ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকেও স্বীকৃতি দেয় না। এই সমাজ তাদের ভিন্ন চোখে দেখে, তাদের একঘরে করে রাখে। তাদের জন্য সমাজে কোন সুযোগ সুবিধা নেই। বলা যায় অস্পৃস্য ভেবে তাদের দূরে দূওে রাখে এবং সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখে।

অথচ তারাও তো মানুষ। লিঙ্গীয় পরিচয়ের বাইরে তার একটি বড় পরিচয় সে মানুষ। একটি মানুষ হিসেবে তার যে সব অধিকার আছে তার সবই তো তৃতীয় লিঙ্গেও ওই মানুষটির পাবার অধিকার আছে। কিন্তু এই সমাজ, সংসার,সংস্কার সব কিছু থেকেই তাদের বঞ্চিত করে রাখে। পরিবারে থাকার অধিকার থেকে শুরু করে জীবিকার অধিকার, শিক্ষার অধিকার এইসব ধরনের অধিকার থেকেই বঞ্চিত। সমাজ এতটাই তাদের হেয় প্রতিপন্ন করে যে তারা ভাবতে বাধ্য হয় “ আমরা কি এতই ভিন্ন ”।

না তারা মোটেও ভিন্ন নয়। তারাও মানুষ। লিঙ্গীয় পরিচয় একমাত্র পরিচয় নয়। উপরের জেন্ডার বিষয়ক আলোচনায় এটাই প্রতিয়মান হয়।  সকলের সাথে চলার অধিকার থেকে শুরু করে এমনকি কারো সাথে যৌন সম্পর্কের অধিকারও তার আছে। বিধি নিষেধের ঘেরাটোপে বন্দি করে আমরা তাদেরকে বঞ্চিত করতে পারি না। সুন্দর স্বাভাবিক জীবন থেকে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত