| 5 মার্চ 2024
Categories
সময়ের ডায়েরি

যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীনতার বাণী সমুন্নত রাখতে হবে

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আমেরিকার মিনিয়াপোলিসে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর সে দেশে তোলপাড়। দাঙ্গা, প্রতিবাদ সব শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকার বর্ণবাদ ও জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গাকে অন্যচোখে অনুসন্ধান করেছেন লেখক, কবি ও কলামিস্ট মিল্টন বিশ্বাস।


‘প্রতিটি মানুষই সমান এবং একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি’ এই বাণীকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বাণী রচিত হয়েছিল আজ থেকে ২৪৩ বছর আগে। অথচ ২০২০ সালে যেখানে করোনা-ভাইরাসের মহামারিতে দিশেহারা পৃথিবী, যখন আমরা ভাবছি মানুষ পাল্টে যাবে ব্যাধি থেকে অব্যাহতি পাবার পর, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। খোদ আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে লক্ষাধিক মানুষ। মরার ওপর খাড়ার ঘা’র মতো জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও লুটপাটে সাধারণ মানুষকে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে এ ধরনের হত্যা মানুষকে সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বাঁচার সুযোগ নষ্ট করে হতাশার সাগরে নিক্ষেপ করেছে। ঘাড়ে হাঁটু বাধিয়ে মাটিতে ঠেসে ধরে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির হত্যার ভিডিও দেখে আমরা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠেছি। কেবল মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনেপোলিস শহরে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড খুন নয় জর্জিয়ায় প্রতিবেশী এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির গুলিতে ২৫ বছর বয়সী নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ যুবক আহমুদ আরবেরির মৃত্যুর ঘটনারও আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

আসলে ২৫ মে পথচারিদের ভিডিও এবং সিসিটিভিতে ধারণকৃত ফুটেজে দেখা যায় ফ্লয়েডকে (৪৬) গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার তার ঘাড় চেপে রাখায় শ্বাস নিতে কষ্ট হলেও মুক্ত না করায় তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।ওই অফিসারের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এবং এ সপ্তাহে আদালতে হাজির হবেন তিনি। অপর তিন পুলিশ অফিসারকেও বরখাস্ত করা হয়েছেন। ১ জুন এক অফিসিয়াল ময়না তদন্তের মাধ্যমে ফ্লয়েডের মৃত্যুকে একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৭৫ টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। করোনা-ভাইরাস মহামারিজনিত কারণে যে সমস্ত রাস্তাগুলি নির্জন ছিল, তা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিক্ষোভকারীদের দ্বারাপূর্ণ হয়েছে। বিক্ষোভের মুখে ৪০ টিরও বেশি শহর তাদের কারফিউ আরোপ করেছে বা বাড়িয়ে দিয়েছে। নিউইয়র্কের হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও ফুটেজে বিখ্যাত শহরগুলোর বড় বড় দোকানে লুটপাট দেখানো হয়েছে।

২.

৪০১ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে প্রথম ক্রীতদাসদের আগমন ঘটে। তারপর অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক দুঃস্বপ্নের রাত্রি। তবে ২৪৩ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ১৭৭৬ সালের ২ জুলাই ইংল্যান্ডের শাসন থেকে পৃথক হওয়ার জন্য ভোট দিয়েছিল আমেরিকার দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস।এর দুইদিন পর ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন আসে কংগ্রেসের হাত ধরেই। অবশ্য ব্রিটেনের সঙ্গে পৃথক হওয়ার জন্য চূড়ান্ত স্বাক্ষর ২ আগস্টে অনুষ্ঠিত হলেও প্রত্যেক বছর ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। আসলে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের আগে ১৩টি উপনিবেশ একসঙ্গে ইংল্যান্ডের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিল। ভার্জিনিয়া উপনিবেশের জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন প্রধান সেনাপতি এবং স্বাধীন আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট (১৭৮৯-১৭৯৭)। স্বাধীনতা যুদ্ধে জয় পাওয়ার জন্য ২৫ হাজার বিপ্লবী আমেরিকানকে জীবন দিতে হয়। একইসঙ্গে ২৭ হাজার ব্রিটিশ ও জার্মান সেনার মৃত্যু ঘটে যুদ্ধে। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের পাঁচজনের একটি কমিটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করেন। টমাস জেফারসন, জন অ্যাডামস, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন এ কমিটির অন্যতম সদস্য। টমাস জেফারসন ছিলেন মূল লেখক। রচিত ঘোষণাপত্রটি নিয়ে কংগ্রেসে তর্ক-বিতর্ক হয় এবং পরিশেষে সেটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

১৭৭৬ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, সেদিন উৎপাটিত হয়েছিল সব পরাধীনতার শৃঙ্খল, বহাল হয়েছিল বাকস্বাধীনতা, পত্রিকা ও প্রকাশনার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, এমনকি কোনো আইন পরিবর্তনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করার স্বাধীনতা পেয়েছিল সবাই, আমেরিকায় বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ। অর্থাৎ নিজেকে প্রকাশ করার যে স্বাধীনতা, সংবাদপত্র, রেডিও-টেলিভিশন তথা গোটা মিডিয়ার যে স্বাধীনতা তাও স্বীকৃতি পায়।সেদিন ব্যক্তি জেনেছিল ধর্ম পালনে রাষ্ট্র কাউকে বাধ্য বা নিষেধও করবে না। যে যার ধর্ম পালন করবে। সেদিন থেকে এখনো নিরাপদে ও নিশ্চিন্তে স্বাধীনভাবে নিজের ধর্ম পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র শান্তির ভূমি। প্রায় আড়াই’শ বছর ধরে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে চলেছে। এজন্য ২০১৬ সালে জয়ী হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি সব আমেরিকানের প্রেসিডেন্ট। …আমি এজন্য এসেছি যেন আমরা একসঙ্গে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই আমেরিকাকে গ্রেট করার জন্য কাজ করবো।’ তাঁর এই বক্তব্যের স্পিরিট এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থেকে। 

আমেরিকার ইতিহাসে ১৭৭৬ সালের জুলাই মাসের শুরু হয়েছিল আশা জাগানিয়া অনেক বার্তা নিয়ে।সেই সালের ২ তারিখ ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক। কারণ ওই দিন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনীতিবিদরা তৈরি করেছিলেন স্বাধীনতার স্তম্ভ। জেফারসনের হৃদয় তখন আন্দোলিত স্বাধীনতা ও মুক্তির নিশানায়। কংগ্রেসের ক্লোজিং সেশনে উপস্থাপিত প্রতিপাদ্য ৪ জুলাই চূড়ান্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বতন্ত্র মহিমা ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে; স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। অদ্ভুত হলেও সত্য জন অ্যাডামস এবং টমাস জেফারসন উভয়ই ছিলেন যুুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রেসিডেন্ট আর তাদের মৃত্যু হয় একই তারিখ অর্থাৎ ৪ জুলাই। সেদিন ১৮২৬ ছিল স্বাধীনতা ঘোষণার পঞ্চাশ বছর। ডিক্লারেশনে স্বাক্ষর না থাকলেও James Monroe ছিলেন আরেক স্বাধীনতার জনক যিনি পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন ১৮৩১ সালে।ত্রিশতম প্রেসিডেন্ট Calvin Coolidge জন্মগ্রহণ করেন ৪ জুলাই ১৮৭২ সালে।তিনি একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি স্বাধীনতা দিবসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।১৭৭৭ সালে প্রথম যেদিন দিবসটি উদযাপনের সূচনা হলো সেদিনকার সকালটা ছিল বর্ণিল। তেরবার তোপধ্বনি আর অভিবাদনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া সেই দিনটি আজও স্মরণীয় হয়ে আছে ইতিহাসে। প্রার্থনা, বক্তৃতা, প্যারেড আর আতশবাজির সন্ধ্যাটাও ছিল মনোরম। ১৭৭৮ সালে জর্জ ওয়াশিংটন, জন অ্যাডামস আর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একত্রিত হন। ভোজের আয়োজন করা হয় প্যারিসেও। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্স ও স্পেন ছিল আমেরিকার মিত্র। দিবসটিতে আমেরিকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বহু শিশু আনন্দ নৃত্যে মেতে ওঠে। কার্টুন আর বাদ্যের তালে মুখরিত করে তোলে এক একটি রাজ্য। ২৪৩ বছরে উপনীত হয়ে স্বাধীনতা দিবসটি উদযাপনে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এসেছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব জোয়ারে তবু পুরানো অনেক কিছু এখনো প্রচলিত আছে। সপ্তাহজুড়ে প্যারেডগুলো সম্পন্ন হয় সকালে, সন্ধ্যায় হয় আতশবাজি আর পারিবারিক পুনর্মিলনী; রাত্রি জেগে ওঠে সংগীতের মূর্ছনায়। কোনো কোনো শহরের সুউচ্চ টাওয়ার থেকে আলোককিরণ ছড়িয়ে পড়ে গ্রীষ্মের বাতাসে। দিবসটিতে আপনি শুনতে পাবেন দেশাত্মবোধক গান আর জাতীয় সংগীত, ‘গড ব্লেস আমেরিকা’, ‘আমেরিকা বিউটিফুল’, ‘দিস ল্যান্ড ইজ ইয়োর ল্যান্ড’ প্রভৃতি স্লোগান। কখনো বা প্রত্যন্ত অঙ্গরাজ্যের লোকায়ত সুরে যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে আপনাকে।

কিন্তু আমেরিকার স্বাধীনতার এই গৌরব ও ঐতিহ্য বারবার বিশ্ববাসীর কাছে কদর্য রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে তাদের বর্ণবাদী আচরণ এবং যুদ্ধংদেহি পলিসির কারণে। কেবল সাম্রাজ্যবাদের করালগ্রাস নয় নিজের দেশের মধ্যে নানাবিধ অনৈক্য আমেরিকাকে বিতর্কিত করে তুলেছে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতি মার্কিন নীতি হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি গুরুত্বারোপ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং প্রতিরক্ষা খাতে অনেক দেশের যৌথ কর্মসূচি চলমান রয়েছে তাদের সঙ্গে। এরই মধ্যে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অনেকটাই অপ্রত্যাশিতভাবেই জয় পান রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের গোঁড়া সমর্থক তিনি। তাঁর শাসনামলে মার্কিন রাজনীতি চরমভাবে দ্বিধাবিভক্ত। এখন ঐক্যবদ্ধ সমাজ সেখানে অনুপস্থিত। এজন্যই বিভিন্ন শহরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতাদের আক্রমণ করেছেন তিনি। সংঘাত উসকে দেওয়ার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও দায়ী করেছেন।

৩.

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।আগেই বলেছি, মিনেপোলিস পুলিশ তাকে ঠুনকো অভিযোগে গ্রেফতারের পরে শারীরিকভাবে অত্যাচার করায় শ্বাসরোধে তার মৃত্যু ঘটে। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ ও বিচার সম্পর্কিত কিছু তথ্য এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ কর্তৃক বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার আফ্রিকান-আমেরিকানদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি তা একেবারেই অমানবিক।

যুক্তরাষ্ট্রে অনেকদিন থেকেই আফ্রিকান-আমেরিকানদের মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।যে সমস্ত ঘটনায় পুলিশ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে সেগুলির জন্য পরিসংখ্যান বলে দেয় মার্কিন জনসংখ্যার শ্বেতাঙ্গদের সামগ্রিক সংখ্যার তুলনায় মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কৃষ্ণাঙ্গদের অনেক বেশি। ২০১৯ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যান অনুসারে আফ্রিকান-আমেরিকানরা জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ, অথচ তারা পুলিশের গোলাগুলির শিকার ২৩ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সাল থেকে শ্বেতাঙ্গ আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে, বেড়েছে কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতন।

দ্বিতীয়ত মাদকের অপব্যবহার তথা সেবনের জন্য শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে উচ্চতর হারে গ্রেফতার হয় কৃষ্ণাঙ্গরা।হিস্পানিকদের কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া বিরূপ আচরণের শিকার হন এশিয়ান, আমেরিকান-ভারতীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের লোক। ২০১৮ সালে মাদক সেবনের জন্য যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের মধ্যে প্রতি এক লাখে আফ্রিকান-আমেরিকান ছিল প্রায় ৭৫০ জন এবং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান ৩৫০ জন। অর্থাৎ মাদক সেবনের ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের মতই অপব্যবহারে অভ্যস্ত হলেও কিংবা তাদের সংখ্যা সম হারে চিহ্নিত হলেও গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে আফ্রিকান-আমেরিকানদের সংখ্যাটা বেশি। একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের গাঁজা রাখার দায়ে সাদাদের চেয়ে ৩.৭ গুণ বেশি গ্রেফতার করা হয়েছে যদিও বর্ণগতভাবে উভয় জনগোষ্ঠীর গাঁজা সেবনের হার তুলনামূলকভাবে একই ছিল।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী কারাগারে বন্দি কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় পাঁচগুণ এবং হিস্পানিক-আমেরিকানদের তুলনায় দ্বিগুণ।২০১৮ সালে কৃষ্ণাঙ্গরা মার্কিন জনসংখ্যার প্রায় ১৩ শতাংশ, কিন্তু দেশের বন্দিদের সংখ্যায় প্রায় এক তৃতীয়াংশ। অন্যদিকে কারাগারের বন্দিদের প্রায় ৩০ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ যা মোট মার্কিন জনসংখ্যার শূন্য শতাংশেরও বেশি নয়। ১ লাখে শ্বেতাঙ্গ বন্দি দু’শত হলে তা কৃষ্ণাঙ্গের দিক থেকে এক হাজার। মার্কিন কারাগারের  বন্দি সংখ্যা এক বছরের বেশি সাজা প্রাপ্ত কয়েদিদের দ্বারা চিহ্নিত হয়। গত এক দশক ধরে বন্দি কৃষ্ণাঙ্গের সংখ্যায় কারাগারের হারে হ্রাস পেলেও তারা এখনও অন্য জাতিদের চেয়ে বেশি।

প্রকৃতপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ ইউরোপের চেয়েও খারাপ।জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদে অষ্টম দিনেও বিক্ষোভ চলছে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েক ডজন বড় বড় শহরে রাতারাতি কারফিউ আরোপ করা হয়েছে। কোথাও বা কারফিউ আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও অশান্তি শেষ করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুলিশ হেফাজতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান নাগরিক অশান্তি রোধে সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেকে ‘আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে ঘোষণাও করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কোনো শহর ও রাজ্য বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ‘তাদের বাসিন্দাদের রক্ষা’ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি সেনাবাহিনী মোতায়েন করবেন এবং  ‘দ্রুত তাদের সমস্যার সমাধান করবেন’। কেবল পুলিশের দ্বারা হত্যা নয় উপরন্তু বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে আক্রমণাত্মক ও বলপ্রয়োগে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে ব্যাপকভাবে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। সাংবাদিকদের উপর অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ ঘটেছে। হত্যার বিচার চেয়ে চলমান আন্দোলনে সাংবাদিকদের ওপর দেশটির পুলিশ প্রায় ৯০ বার হামলা চালিয়েছে। পুলিশ সরাসরি এক সাংবাদিককে রাবার বুলেট ছুড়ে মেরেছে। নিজেদের সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। গত ২৯ মে লাইভ কভারেজ চলাকালে মিনেসোটা পুলিশ সিএনএন-এর সাংবাদিক ও ক্রুদের গ্রেফতার করে। সেখানে লাইভে দেখা যায় একে একে সাংবাদিক ও তার ক্রু সদস্যদের হাতকড়া পড়িয়ে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হচ্ছে। তবে গণবিক্ষোভ মূলত নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। ওই হতভাগার মৃত্যুর পর প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রপতি একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন- ‘জর্জ ফ্লয়েডের নৃশংস মৃত্যুতে সমস্ত আমেরিকান যথাযথভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল এবং বিক্ষোভ করেছিল তবে মৃতের স্মৃতি অবশ্যই ক্রুদ্ধ জনতার দ্বারা বিলুপ্ত হতে পারে না।’ ৩১ মে কয়েকটি শহরজুড়ে লুটপাট ও সহিংসতার দৃশ্যকে ‘পুরোপুরি অবমাননা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, নগরীর প্রতিরক্ষা জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি- ‘আমি দাঙ্গা, লুটপাট, ভাঙচুর, হামলা এবং সম্পত্তির অযৌক্তিক ধ্বংস বন্ধ করতে হাজার হাজার সশস্ত্র সেনা, সামরিক কর্মী এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের পাঠাচ্ছি।’ এখনও পর্যন্ত প্রায় ষোল হাজার সেনা অশান্তি মোকাবেলায় মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি আমেরিকার মাটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীকে জনগণের বিক্ষোভ দমনে ব্যবহার করছেন। অথচ বিক্ষোভকারীরা তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘আমাদের হত্যা বন্ধ করো’ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরগুলোয় রাস্তায়। 

যুক্তরাষ্ট্রে দশকের পর দশক ধরে বর্ণবাদ চলে আসছে।পুলিশের বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করা নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো স্পষ্টত বলেছে ‘আপনি যদি কালো বর্ণের হন, তাহলে আপনি হত্যার শিকার হবেন।’শ্বেতাঙ্গের চেয়ে তিন গুণ বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মারা যান পুলিশের হেফাজতে। পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতার বেশির ভাগ শিকার হন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিরা। নিউইয়র্কে সামাজিক দূরত্ব নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের ৮০-৯০ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ বা লাতিনো।

অর্থাৎ করোনাভাইরাসে আক্রান্তের দিকে তাকালেও শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের বৈষম্য স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।করোনায় সাদা চামড়ার মানুষের চেয়ে কালোরা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছে। এই তথ্য শুধু করোনো মহামারিকালেই নয়, অন্য সময়েও খাটে। দেশটিতে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের গড় আয়ু তিন বছর কম। ঘনবসতি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং অপরাধপ্রবণ নগরে বসবাস করে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ। আর্থিক অনটন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ফলে সন্তানদের সাধারণ স্কুলে পড়াতে বাধ্য হয় এসব মানুষ। স্বাভাবিক সময়েও যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সাদা-কালোর বৈষম্য রয়েছে। শ্বেতাঙ্গরা কারাগারে কম সময় বাঁচে। আর কারাগারের বাইরে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের চেয়ে কারাগারে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুহার কম। এর অর্থ হলো, বাইরের চেয়ে কারাগারে ভালো চিকিৎসাসেবা পায় কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিরা।

৪.

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির যুগে এসেও আমেরিকায় বর্ণবাদের ঘটনা করোনা-ভাইরাসের মহামারির মধ্যে আমাদের বিহ্বল ও ক্রুদ্ধ করে তুলেছে।আসলে শ্বেতাঙ্গরা সত্য থেকে অনেক দূরে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের বিশাল পরিবর্তন, অগ্রগতি এখনো শ্বেতাঙ্গদের চোখে পড়ে না। তারা বিশ্বকে ককেশীয় চশমা, গোলাপ রঙের ভেতর দিয়ে দেখে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে আর বিক্ষোভ প্রশমনের জন্য জনগণকে ন্যায্য বিচার পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে হবে। কারণ গণবিক্ষোভকে শুধু বামপন্থীদের অরাজকতা বলে উড়িয়ে দিলেও কিংবা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে দেশটি যখন বিপর্যস্ত, তখন বিশাল এই বিক্ষোভ নতুন বিপদে ফেলেছে দেশটিকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ জাতির কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। আর এই ঐক্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বাণীতে পরিস্রুত হতে হবে। তাহলেই মিলবে মুক্তি।

 

 

 

 

 

 

One thought on “যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাধীনতার বাণী সমুন্নত রাখতে হবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত