| 16 এপ্রিল 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে মেয়েরা

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

 

পঞ্চাশ পরবর্তী বাংলা কবিতায় প্রকট বা প্রচ্ছন্ন শারীরিক উল্লেখ শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে কৃত্তিবাস পর্বের আত্মজৈবনিক বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার ধাক্কায়।   সেই ধারাবাহিকতা ও পরম্পরা পরবর্তী সময়ের বাংলা কবিতাতেও প্রবাহিত হয়েছে । মানবী বিদ্যাচর্চার ধারাবাহিকতা  আমাদের এই সময়ের প্রাপ্তি । নারীকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার ‘নতুনত্ব’  এখন কতটা তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে মেয়েদের দিকে নতুন করে তাকানোর একটা সর্বজনগ্রাহ্যতা বোধহয় নতুন সংযোজন।  বাঁধাধরা পড়াশুনোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য শিল্পে নারী ও পুরুষের প্রতিনিধিত্ব বা রিপ্রেজেন্টেশনকে দেখে নেবার চল অধুনার ।  সাম্প্রতিক ঘটনা এ-ও যে , যে দ্বৈতবাদ থেকে নারী বনাম পুরুষ, প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতি, বা জ্ঞাতা বনাম জ্ঞেয়র ধারনাগুলো  আসে, সেই দ্বৈতবাদই এখন প্রশ্নের মুখোমুখি  সারা বিশ্বের সব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেই ।  পুরুষ বিষয়ী , নারী বিষয়, পুরুষ জ্ঞাতা , নারী  জ্ঞেয় (“ স্ত্রিয়াশ্চরিত্রাঃ /দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ” এই অতি জনপ্রিয় কথনের মূলেও সে ধারণা) , পুরুষ কর্ষণকারী , নারী প্রকৃতির মত, বসুন্ধরার মত, মৃত্তিকার মত ভোগ্যা ও কর্ষণযোগ্যা । এই প্রাচীন দ্বৈততা ভেঙে , অর্থাৎ এর ভেতরের ক্ষমতাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলারই প্রচেষ্টা নারীকে বিষয়ী করে তোলার মধ্যে ।

অথচ গোড়ার দিকে দ্বৈতবাদকে মেনে নিয়েই নারীবাদের প্রথম প্রণেতারা ভেবেছিলেন , নারীকে হতে হবে পুরুষের সমান ও সমকক্ষ । সেই হয়ে ওঠার তাগিদে এমনকি নিজের নারীত্বকে বিসর্জনও দিতে হতে পারে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদীদের কাছে চিন্তাটা পাল্টেছে বলেই, নারীবাদী এখন আর নারীকে নির্‌যাতিত , পুরুষের শাসনের বলি হিসেবেই শুধু দেখাননা, বরঞ্চ নির্মাণ করতে চান নারীর নিজস্ব বিশ্ব ।  আর সেখানেই এসে পড়ে নারীকে বিষয়ী করে তোলার প্রচেষ্টা ।

বিষয় হিসেবেই  কিন্তু নারীকে দেখতে অভ্যস্ত আমরা।  জনপ্রিয় সাহিত্য শিল্পের কাছে সেটাই প্রশ্নচিহ্নহীন ধরে নেওয়া। উপভোক্তা নারী পুরুষ যে-ই হোন, তাঁকে আমোদ দেবে, বিনোদন দেবে নারীর এই বিষয়-মূর্তিই। এটাই পুরুষ শাসিত সমাজের সহজ ছক।  নারী পুরুষের মিউজ, তার প্রেরণা, তার আকাংক্ষার বিষয় , সম্ভোগের বস্তু, হাসিল করার পণ্য । সে একাধারে দেবী ও দানবী, অথবা হয় দেবী নয় দানবী। এই ব্যাপারের প্রতিফলন অবধারিতভাবে ঘটেছে কবিতাতেও।

‘নারীর কবিতা বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তাই আগে বুঝে নিতে চাই নারীর সেই প্রতিমা, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় যা প্রতিফলিত। সে প্রতিমা পুরুষেরই কল্পনা … উর্বশী আর লক্ষ্মী, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় নারীর এই দুই স্টিরিওটাইপই সবচেয়ে প্রবল, পশ্চিমী আলোচনার ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে অ্যাঞ্জেল হোর ডিকটমি। …পুরুষতন্ত্রের সেই পরম্পরার মধ্যে থেকেই মেয়েরা লেখেন। …’(সুতপা ভট্টাচার্‌য, ‘কবিতায় নারী, নারীর কবিতা’, মেয়েলি পাঠ, পৃ ৪৪-৪৮)

ঠিক এই একই ব্যাখ্যায় উপনীত হয়েছিলেন সিনেমা চর্চার ক্ষেত্রে লরা মালভে, তাঁর ‘ভিজুয়াল অ্যান্ড আদার প্লেজারস ‘ প্রবন্ধে, ১৯৭৩ সালে।  যা থেকে উঠে এসেছিল নতুন এক তত্ত্ব ।  লাকাঁ ও ফ্রয়েডের ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল জনপ্রিয় ছায়াছবির নারীবাদী বিশ্লেষণের নতুন ধারণাটি, ‘ মেল গেজ ‘ বা ব পুং দৃষ্টির তত্ব । সে তত্ত্বও বলছে একই কথা । মূলস্রোত ছায়াছবি , হলিউডের বিখ্যাত ছবিগুলিই ধরা যাক, নারীকে দেখায় বিষয় হিসেবে। দুভাবে বিষয় করা হয় নারীকে। হয় ভয়ারিস্টিক বিষয়। সে পুরুষচোখে নারী লালসাময় বেশ্যা । নতুবা ফেতিশিস্টিক বিষয় । সে পুরুষচোখে , পুরুষচাহনিতে নারী দেবী, ম্যাডোনা, মা। রিরংসা থেকে পবিত্রতা । সুতপা ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘উর্বশী-ছবি”  আর ‘লক্ষ্মী-ছবি’।  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে” থেকে শঙ্খ ঘোষের “পায়ে শুধু পড়ে থাক স্তব্ধ এলোচুল “ অব্দি।

মাটির তলায় চাপা পড়া উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তনের মতই, বাংলা কবিতার কর্ষণভূমি এর পরে আর কোনদিন পূর্ববৎ রইল না, থাকার কথাও নয়। পুরুষী কবিতার ট্র্যাডিশনে প্রোথিত ও প্রতিষ্ঠিত হল যৌনতাবিষয়ক অনবদমিত স্বীকারোক্তি। নতুন রক্তসঞ্চালন হতে শুরু করেছে বাংলা কবিতার ভাষা ও ভাবনায়।  “গুল্মলতা উদ্ভিদ অরণ্যঘন পর্ণমোচী বৃক্ষের সারি পাহাড় পর্বত সান্নুদেশে … আমি এক সুচতুর ব্যাধ নির্ভুল লক্ষ্যভেদে গাঁথি প্রভুর অসীম কৃপায় অলৌকিক আমার বর্শাফলকে তরল লাভাস্রোতে তাম্রখন্ডে বিম্বিত অতলান্ত গহবর তাক করে ।“ ( বেলাল চৌধুরী, ‘লক্ষ্যভেদ’।) লক্ষ্য করব, এক বা একাধিক ইমেজের সহায়তায়, অথবা সরাসরি, এক সচেতন যৌন ইশতেহার রচনার তীব্র ইচ্ছা এইসব লেখা তাঁদের দিয়ে লেখাচ্ছিল। ‘আমি ড্রামে কাঠি দেওয়ামাত্র ওর শরীর ওঠে দুলে / ড্রি রৃ ড্রাও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে/ তিন নম্বর স্ট্রোকের সঙ্গে নিতম্বেতে ঢেউ … আমি তখন ড্রাম বাজিয়ে নাচাই ওকে, মারি এবং বাঁচাই ওকে/ ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে / যেন গালাই এবং ঢালাই করি  – “ ( তুষার রায় , ‘খুলে যায় তালা’) ।

অর্থৎ, এখানে প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছি একটিই কথাকে, ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়। কিন্তু সেই লেখা মূলত পুরুষ কবিদের কলম থেকে। “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা… শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/ নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর – আঁষটে গন্ধ” ( বেলাল চৌধুরী , ‘শরীর দিয়েই শরীর”)  এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙ্গালির রান্নার মাছের মতই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায় । ভুরু তুলে কানে হাত দিয়ে “আ ছি ছি” বলে ওঠার মত আর থাকবে না পুরুষের লেখায় “স্তন” “যোনি” “লিঙ্গ” এমনকি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বহুকথিত “নুংকুটি নতমুখ”এর মত প্রয়োগগুলিও।

এই প্রেক্ষিতটুকু না থাকলে আজকের আলোচনারও মানে থাকছে না কোন । কেননা, বারে বারেই নারীর এই ‘বিষয়’- মডেল যেহেতু সামনে, নারী যেহেতু পুরুষের শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রস্থল তাই সেটিকে আলাদা করে নজরে আনার প্রয়োজন আছে অবশ্যই।

বাঙালির রচিসংস্কৃতির অবদমিত যৌনবোধের প্রকাশ যখন কবিতার মানক, জীবনানন্দীয় কুয়াশায় যখন তরুণ কবিরা আচ্ছন্ন, তখনি কৃত্তিবাস আন্দোলন আনল ভাংচুরের পালা। মেধার সরণি ছেড়ে আত্মজৈবনিকের , স্বীকারোক্তির নতুন দিগন্ত খুললেন এই আন্দোলনের পুরোধা প্রধান পুরুষ কবিরা ।  সুনীল-শরৎ-শক্তি-তারাপদ… পাশাপাশি তুষার রায়, বেলাল চৌধুরী তন্ময় দত্তরা। সেই মুহূর্তের অ-প্রাতিষ্ঠানিকতার শেষ কথা এই কবিদের হাত থেকে বেরিয়ে আসা তাজা স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাগুলি। বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক প্রভাব। কবিতায় মেয়েদের পদচারণা তখন যথেষ্ট সীমিত।

রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ব্যক্তিগত সব স্তরকে ছুঁয়ে গেছে স্বীকারোক্তি । অবধারিতভাবে এসে পড়েছে যৌন স্বীকারোক্তি। এবং সচেতনভাবে ।  সচেতন, কেননা, কলকাতায় এসে গেছেন গিন্সবার্গ। কৃত্তিবাসের ষোল নম্বর সংকলন সম্বন্ধে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ষোল নম্বর সংকলনে কৃত্তিবাস ফেটে বেরুল। তারিখ ১৩৬৯ চৈত্র। …কবিত্বের খোলস ছেড়ে একদল অতৃপ্ত যুবকের অকস্মাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্যে যে প্রচন্ড অস্বস্তি ও বেগে-এর প্রয়োজন ছিল। অ্যালেনদের সাহচর্য তা জুগিয়েছিল আমাদের । সংখ্যাটি কলকাতা পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অশ্লীলতা সম্পর্কে। …ঘামে নুন, যোনিদেশে চুল( পৃঃ ৫), দেখেছি সঙ্গম ঢের সোজা, এমনকি বেশ্যারও হৃদয়ে পথ আছে ( পৃঃ ২২)  , যোনির ঝিনুকে রাখা পোকাগুলি মুক্তা হয়ে গিয়েছে বিস্ময়ে ( পৃঃ ৪৫)…আসলে যে কান্ড ঘটেছিল সব কবিদের  বুকের মধ্যে তা হল প্রচন্ড বিরক্তি থেকে উদ্ভুত ধ্বংস করার ইচ্ছে – সৃষ্টির নামান্তর – যা কিছু পুরনো পচা, ভালমন্দ সোনারুপোর খনি, এমনকি নিজেদের শরীর ও অস্তিত্ব – সর্বস্বের সর্বনাশ। “ ( শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় , কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কৃত্তিবাস পঞ্চবিংশ সংকলন, ১৯৬৮)।

একটি স্পষ্ট কর্মসূচী নিয়েই এই কবিরা এসেছেন শরীরের অনুভবকে সাদা কাগজের বুকে বদলি করতে। “কিছুক্ষন ডুবেছিল যোনির ভিতরে জিভ লবণের স্বাদ ছাড়া আর/ কিছুই আনেনি তবু অসম্ভব ভালবাসাবাসি হল অসম্ভব / এই নিয়ে তোমাকে আমার/ একুশটা পুনর্জন্ম দেওয়া হল এত মৃত্যু মানুষেরও জানা ছিল ।“ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস চৈত্র ১৩৬৯ –এর “কয়েক মুহূর্তে” শীর্ষক বিস্ফোরক কবিতাটির মধ্য দিয়ে এভাবেই প্রথাসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতায় যৌনতার ব্যবহার। বকলমে যা নারীর উদযাপন। ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়, এই বস্তুই আসলে নারীর মুখধারণ করে এসেছিল। পুরুষ কবিদের কলম থেকে “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা… শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/ নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর – আঁষটে গন্ধ” ( বেলাল চৌধুরী , ‘শরীর দিয়েই শরীর”)  এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙ্গালির রান্নার মাছের মতই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায় ।

পুরুষের কবিতায় এরপর কিছুদিন কেবলি শরীরী উদযাপন। নারীশরীরকে একটা আলাদা মর্যাদার জায়গায় স্থাপন করেছে এতদিনে এই সব কবিতা। যদিও কল্লোল যুগেও চেষ্টা হয়েছিল, বুদ্ধদেব বসুর কিছু গদ্য যেভাবে কবিতায় ব্যবহৃত শরীরী সংকেত বহনকারী শব্দদের পক্ষ নিয়ে লেখা হয়েছিল । তবু কৃত্তিবাসের পর্বটি নারীর বিষয়ায়নের একটা বড় ধাপ, জলবিভাজিকাও বলা চলে। সেইকারণেই এ দশকের উল্লেখ পরবর্তী যে কোন দশককে নিয়ে আলোচনায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

তবে শুধুই কিন্তু যৌনতা নয়। প্রেমের কবিতাতেও পুরুষ কিন্তু নারীকে অবিশ্রান্তভাবে বিষয় করে গেছেন, সেই পঞ্চাশ দশক থেকে পরবর্তী প্রতি দশকে।

বিখ্যাত নীরার কথা না হয় নাই বললাম। স্নিগ্ধ, লাবণ্যস্নাত নীরাকে অনেক বিভঙ্গে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে এক আলাদা সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছিলেন সুনীল।

“বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল

স্বপ্নে বহুক্ষণ

দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–দিকচিহ্নহীন–

বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে

তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের

নীল দুঃসময়ে।

দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি

আজই কি ফিরেছো?

স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ংকর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন

তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত, দুই উরু ডুবে কোনো জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো,

অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।“

( হঠাৎ নীরার জন্য)

তাকে অনেকে সত্যিকারের জীবনে খুঁজেছে, নানারকম গবেষণার কথা শুনি । নানা গসিপ, গালগল্প, কিংবদন্তী নীরাকে নিয়ে।

কিন্তু নীরা সত্যি করে থাকতে পারে নাকি? এরকম পালকের মত মেয়ে কি হয়, নরম আর সুন্দর? আবার একইসঙ্গে, অনেক অনেক মেয়ের মধ্যে কি তুমি নীরাকেই খুঁজে চলছ না, সুনীলের কবিতাগুলোর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে না নীরাকে টুকরো টুকরো করে বের করে নেওয়ার ইতিহাস, নানা মেয়ের থেকে?

একইসঙ্গে, আসলে নিজের কিশোরসুলভ ভালবাসার আঁচ সারাজীবন একইরকম বাঁচিয়ে, একইরকম করে ভল্টে রেখে দিয়ে ভালবাসার মূলধন, আর সুদের মত একটু একটু করে তা থেকে আসা ওমটুকু, চেখে চেখে নেওয়া কষ্টমেশানো সুখটুকু, তাই দিয়ে তুমিই কি আসলে নির্মাণ করছ না নীরাকে?

চাঁদের নীলাভ রং , ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ

অথবা

অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানাল

আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতাপাতা

ও যে বহুদূর

পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর

কী করে ওখানে যাব, কী করে নীরাকে

খুঁজে পাব?

নীরা, তুমি কালের মন্দিরে

ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর

জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর

কখনো সুনীল নীরাকে দূর থেকে, দূরের করে করে দেখছেন । এই দূরত্ব কিসের? সত্যিকারের নীরা কী করে এত দূরে থাকবে। এ নিশ্চয়ই সুনীলের নিজের তৈরি নীরা। যে নীরা সবসময়েই বহুদূর হয়ে থাকে।

অথচ সে নীরার শরীর আছে ভীষণ রকম।  অথচ সেই নীরারই জ্বর হয়, সে শুয়ে থাকে, সে জানতেই পারেনা তার ঘুমের ভেতরে কখন সুনীল এসে তার মাথার পাশে বসেন, তার গায়ের পাশে রেখে যান নিজস্ব কবিতা। নীরা বোধ হয় দাঁতও মাজে, তার গালে আলো পিছলোয়, সে রুখু চুলে যখন এলোমেলো ঘরে পরার জামা পরে থাকে, তখন তো সেই নীরাকে বেশ মানুষ মানুষই মনে হয়, বেশ আমারই মত, আমারই কাছাকাছি মনে হয়।

আবার একইসঙ্গে বুঝতে পারি, এই কবিতার ভাষা সুষমা আসলে নীরাকে রোজকার জগত থেকে সজোরে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, একদম অন্য একটা ভুবনে নিয়ে ফেলছে…

এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই, শুধু তুমি, নীরা

এ কবিতার মধ্যরাত্রে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে

ঘুমের ভিতরে তুমি আচমকা জেগে উঠে টিপয়ের

থেকে জল খেতে গিয়ে জিভ কামড়ে এক মুহুর্ত ভাববে

কে তোমায় মনে করছে এত রাত্রে — তখন আমার

এই কবিতার প্রতিটি লাইন শব্দ অক্ষর কমা ড্যাশ রেফ

ও রয়ের ফুটকি সমেত ছুটে যাচ্ছে তোমার দিকে, তোমার

আধো ঘুমন্ত নরম মুখের চারপাশে এলোমেলো চুলে ও

বিছানায় আমার নিঃশ্বাসের মতো নিঃশব্দ এই শব্দগুলো

এই কবিতার প্রত্যেকটি অক্ষর গুণিনের বাণের মতো শুধু

তোমার জন্য, এরা শুধু তোমাকে বিদ্ধ করতে জানে

তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও, আমি বহু দূরে আছি

আমার ভযংকর হাত তোমাকে ছোঁবে না, এই মধ্যরাত্রে

আমার অসম্ভব জেগে ওঠা, উষ্ণতা, তীব্র আকাঙ্খা ও

চাপা আর্তরব তোমাকে ভয় দেখাবে না — আমার সম্পূর্ণ আবেগ

শুধু মোমবাতির আলোর মতো ভদ্র হিম,

. শব্দ ও অক্ষরের কবিতায়

তোমার শিয়রের কাছে যাবে — এরা তোমাকে চুম্বন করলে

তুমি টের পাবে না, এরা তোমার সঙ্গে সারা রাত শুয়ে থাকবে

এক বিছানায় — তুমি জেগে উঠবে না, সকালবেলা তোমার পায়ের

কাছে মরা প্রজাপতির মতো লুটোবে | এদের আত্মা মিশে

থাকবে তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, চিরজীবনের মতো

বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্নার জলের মতো

হেসে উঠবে, কিছুই না জেনে | নীরা, আমি তোমার অমন

সুন্দর মুখে বাঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো | আমি অন্য কথা

বালার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর করবো মনে-মনে

ঘর ভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে

. নিজস্ব চোখে তাকাবো |

তুমি জানতে পারবে না — তোমার সম্পূর্ণ শরীরে মিশে আছে |

আমার একটি অতি ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি শব্দের আত্মা |

পড়তে পড়তে ঘোর লাগে। কবিতা তাত্ত্বিকেরা বলেছে, সুনীল কিশোর সুলভ কবিতা লিখে গেছ নাকি সারাজীবন। তাই সুনীলের কবিতা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতেই পারে নি। শুধু আমাদের মত অনেক মেয়েই , এক বয়সে,  মিশে  গেছি সুনীলের তৈরি মেয়েদের সঙ্গে ।

সুনীলের শব্দরা আমার গোটা কৈশোর আর প্রথম যৌবনের দিনগুলোকে যে ভাবে নির্মাণ করেছিল, সেই ছাঁচটাকে ভেঙেচুরে আমি কোথায় হারিয়ে ফেলব ? আমার কাছে, চির যুবক নীললোহিতএর গদ্যেও এই একই কিশোর থেকে বড় না হয়ে উঠতে পারা যুবককে পাওয়া যায়। খ্যাপাটে বাউন্ডুলে এই যুবক ত তোলাই থাকবে, অক্ষত। নিজের নারী হয়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে, আমার একটুকরো অল্পবয়সের সঙ্গে।

নীল লোহিত আর নীরা এই দুই আলাদা অথবা কেন্দ্রস্থলে এক সত্তাকে নিয়ে মাতামাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারপর চলতেই থাকবে। প্রতি প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের কিশোর বয়সে নিজেকে নীরা ভাববেন আর নিজের প্রেমিককে নীললোহিত । এই ভাবনার ভেতরে আছে কবির রচিত  তীব্র নার্সিসিজম থেকে শুরু করে  শরীর বোধ, স্বীকারোক্তির আঁচ, এবং নারীকে দেখার পুরুষদৃষ্টির এক মোলায়েম উপস্থিতির যাদু। এই নারী নির্মাণ অন্যভাবে পরবর্তী অনেক গুলো প্রজন্মে আসবে। পুরুষ কলমে নারীর অভিজ্ঞানটি রচনা করে দিয়েছেন সুনীল এভাবেই… চিরতরে। এক দীর্ঘস্থায়ী মডেল।

পুরুষ দৃষ্টির এক বাহুল্য থেকে গেছেই তবু সুনীল গংগোপাধ্যায়ের লেখায়।

যে বিষয়ে বিশ্বজিত রায়ের বক্তব্যটি পুরোটাই তুলে দেবার মত :

আমার বহুবার মনে হয়েছে সুনীল সন্দীপনের আত্মজৈবনিক উপন্যাস প্রকাশ্য ও নিহিতার্থে নারী-বিদ্বেষী । কৃত্তিবাসের জীবন-যাপনে নারীবিদ্বেষের নানা চেহারা প্রকাশিত । তাঁরা হয়তো সে বিষয়ে সে সময় সচেতন ছিলেন না । সুনীলের নীরা বিষয়ক প্রেমের কবিতায় অবশ্য প্রেমের স্বভাবধর্মে সে বিদ্বেষ আর নেই । ভদ্রতা ও লাজুকতা, মায়াবী পুরুষ-পুরুষ বেদনা সেই প্রকাশ্য-নিহিত বিদ্বেষকে অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে । কৃত্তিবাসের আদিপর্বের ভাবগত খামতি বুঝতে গেলে কবিতা সিংহের লেখা খুবই মন দিয়ে পড়া জরুরি বলে মনে হয় ।( ফেসবুকে ‘শীতে পুরুলিয়ায় আসুন’ নামের একটি বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত নানা জনের মন্তব্য প্রতি মন্তব্যের সূত্রে আমার এই কথাগুলি আবার মনে হল ।)

লেখালিখির ক্ষেত্রে এ কথাটা বেশ চালু যে নিজের সঙ্গে ‘রিলেট’ করতে পারছি কি না । যদি পারি তবেই লিখি । এই নিজের সঙ্গে ‘রিলেট’ করতে চাওয়া ও পাওয়া কখনও কখনও বেশ বিপত্তিজনক । যেমন বেশ মনে পড়ছে সুনীলের কবিতায় ছিল কবির পক্ষে তিন নম্বর লাইন খুব গুরুত্বপূর্ণ । প্রথম লাইন প্রেরণা থেকে আসে, তারই সঙ্গে আসে অনায়াস দ্বিতীয় । তারপর তৃতীয় নিয়ে যত সমস্যা । সুনীলের উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন চরিত্র তখন দেখি রবীন্দ্রনাথও কবিতার তৃতীয় লাইনে আটকে যাচ্ছেন । সুনীলের রবীন্দ্রনাথ — সুনীল নিজেকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ভাবছেন গড়ছেন । সুনীলের প্রথম আলো তে নিবেদিতার হাত মুছিয়ে দিচ্ছেন বিবেকানন্দ । তার দুদিন বাদে বিবেকানন্দের মৃত্যু হবে , নিবেদিতার চিঠিতে ও বিবেকানন্দ সম্পর্কিত স্মৃতিকথায় সে মুহূর্তের বিবরণ আছে । বিবেকানন্দের শরীর ভেঙে গেছে । বুঝতে পারছেন সময় আসন্ন । তাই যিশু যেমন তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন তেমনই বিবেকানন্দ নিবেদিতার হাত মুছিয়ে দিচ্ছেন । সুনীল তাঁর উপন্যাসের কথনে লিখেছিলেন বিবেকানন্দ নিবেদিতার চাঁপার কলির মতো আঙুল মুছিয়ে দিতে লাগলেন । এই চাঁপার কলির মতো আঙুল শুধু বহু ব্যবহৃত উপমাই নয় এক্ষেত্রে বেশ দুর্বল বলেই মনে হয় । এই যে নিজের মর্জি, প্রবণতা ঢুকে পড়ছে সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে, সত্যিকথা সেই ঢুকে পড়াটা অনেক সময়ই অনিবার্য, তার থেকেই যত বিপত্তি । ইংরেজ রোমান্টিক কবিরা লেখালিখির ক্ষেত্রে না-হওয়ার ক্ষমতাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন । আমি নিজের অহং ও প্রবণতাকে বাদ দিয়ে যাকে নিয়ে লিখছি তার মতো হয়ে উঠতে পারছি কি না ; তাকে তার জায়গা থেকে ভাবতে পারছি কি না এটাই না-হয়ে ওঠা। এর মধ্যে সমানুভূতি মিশে থাকে । পুরুষ লেখকদের আত্মকথনে, আত্মজৈবনিক উপন্যাসে অনেক সময় নিজের অহং হয়ে ওঠে বড়ো । তখন পার্শ্ববর্তী নারী চরিত্রগুলি সম্বন্ধে সমানুভূতির ছিটে-ফোঁটাও চোখে পড়ে না । এ কাণ্ড সন্দীপন, সুনীলের উপন্যাসে খেয়াল করেছি । আরও কারও কারও কথা বলা যায় । প্রায়ই মনে হয় সর্বগ্রাসী পুরুষ চরিত্র তাঁর যাবতীয় ইচ্ছে-অনিচ্ছে নিয়ে বক-বক করেই যাচ্ছেন । পাশের চরিত্রগুলির যে কোনও কথা থাকতে পারে তা ভাবার ইচ্ছেও নেই অবকাশও নেই । না-হওয়ার ইচ্ছে, ক্ষমতা, সমানুভূতি কথকের অধিগত নয় । আত্মকথা ক্রমশই আত্মরতি হয়ে উঠছে, জন্ম নিচ্ছে ক্ষমতার স্বর । এই আত্মরতিময় আত্মকথনের রীতি অবদমিত বাঙালি সমাজের পুরুষ পাঠককে বেশ নির্ভার মৌতাতময় করে তুলত । এই জাতীয় লেখা সে জন্যই বেশ জনপ্রিয় হত । এখন যখন সেই পুরনো লেখা ও পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবি তখন এসব মাথায় ঘোরে । কাউকে আলাদা করে দোষ দিচ্ছি না, শুধু বাংলা সাহিত্যের নগণ্য পাঠক হিসেবে কী ও কেন বুঝতে চাইছি ।”

গদ্যে , উপন্যাসে নারী নির্মাণ , সেই পুরনো এঞ্জেল হোর ডিকটমিই বার বার সুনীলের লেখায়। সত্যি বলতে কি, এ ধারাও নতুন নয়। সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে। সব পুজোর জন্য যে রবীন্দ্রনাথ গঙ্গাজল শুধুই।

রবি ঠাকুরের “শেষের কবিতা”  থেকেই নারীর নির্মাণ হচ্ছে দুই প্রান্ত ধরে। এক দিকে মাতৃমূর্তি, পবিত্রতার কল্যাণী মূর্তির লাবণ্য আর অন্য দিকে নব্যা, আধুনিকা সিসি আর লিসি… তরল , কেতাদুরস্ত কিন্তু “অকল্যাণময়ী” হয়ত বা!

“এ দিকে ওর দুই বোন, যাদের ডাকনাম সিসি এবং লিসি, যেন নতুন বাজারে অত্যন্ত হালের আমদানি– ফ্যাশানের পসরায় আপাদমস্তক যত্নে মোড়ক-করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট-বিশেষ। উঁচু খুরওয়ালা জুতো, লেসওয়ালা বুক-কাটা জ্যাকেটের ফাঁকে প্রবালে অ্যাম্বারে মেশানো মালা, শাড়িটা গায়ে তির্যগ্‌ভঙ্গিতে আঁট করে ল্যাপ্‌টানো। এরা খুট খুট করে দ্রুত লয়ে চলে; উচ্চৈঃস্বরে বলে; স্তরে স্তরে তোলে সূক্ষ্মাগ্র হাসি; মুখ ঈষৎ বেঁকিয়ে স্মিতহাস্যে উঁচু কটাক্ষে চায়, জানে কাকে বলে ভাবগর্ভ চাউনি; গোলাপি রেশমের পাখা ক্ষণে ক্ষণে গালের কাছে ফুর ফুর করে সঞ্চালন করে, এবং পুরুষবন্ধুর চৌকির হাতার উপরে বসে সেই পাখার আঘাতে তাদের কৃত্রিম স্পর্ধার প্রতি কৃত্রিম তর্জন প্রকাশ করে থাকে।“

এর পরই পাঠক হিসেবে আমাদের তৃষিত অপেক্ষা হবে লাবণ্যের আবির্ভাবের জন্য। সেটা এইরকম…

“একটি মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সদ্য-মৃত্যু-আশঙ্কার কালো পটখানা তার পিছনে, তারই উপরে সে যেন ফুটে উঠল একটি বিদ্যুৎরেখায় আঁকা সুস্পষ্ট ছবি– চারি দিকের সমস্ত হতে স্বতন্ত্র। মন্দরপর্বতের নাড়া-খাওয়া ফেনিয়ে-ওঠা সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী, সমস্ত আন্দোলনের উপরে– মহাসাগরের বুক তখনো ফুলে ফুলে কেঁপে উঠছে। দুর্লভ অবসরে অমিত তাকে দেখলে। ড্রয়িংরুমে এ মেয়ে অন্য পাঁচজনের মাঝখানে পরিপূর্ণ আত্মস্বরূপে দেখা দিত না। পৃথিবীতে হয়তো দেখবার যোগ্য লোক পাওয়া যায়, তাকে দেখবার যোগ্য জায়গাটি পাওয়া যায় না। …মেয়েটির পরনে সরু-পাড়-দেওয়া সাদা আলোয়ানের শাড়ি, সেই আলোয়ানেরই জ্যাকেট, পায়ে সাদা চামড়ার দিশি ছাঁদের জুতো। তনু দীর্ঘ দেহটি, বর্ণ চিকন শ্যাম, টানা চোখ ঘন পক্ষ্মচ্ছায়ায় নিবিড় স্নিগ্ধ, প্রশস্ত ললাট অবারিত করে পিছু হটিয়ে চুল আঁট করে বাঁধা, চিবুক ঘিরে সুকুমার মুখের ডৌলটি একটি অনতিপক্ক ফলের মতো রমণীয়। জ্যাকেটের হাত কব্‌জি পর্যন্ত, দু-হাতে দুটি সরু প্লেন বালা। ব্রোচের-বন্ধনহীন কাঁধের কাপড় মাথায় উঠেছে, কটকি কাজ-করা রুপোর কাঁটা দিয়ে খোঁপার সঙ্গে বদ্ধ।“

আশ্চর্য হয়ে দেখব, প্রথম দিকের অনেক গুলি উপন্যাসে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও এই “নায়িকা” র নির্মাণ করেছেন, প্রেক্ষাপটে কয়েকটি  উগ্র আধুনিকাকে রেখেই। রবি ঠাকুরের মত পুংক্ষাণূপুংক্ষ না হলেও, তাতে স্পষ্ট লেখা থাকে একটা দ্বৈততার কথা, সিসি লিসি বনাম লাবণ্যে যে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে আছে অতি চর্চিত, মহার্ঘ, অতি সচেতন সাজগোজের উগ্রতা ( পড়ুন = চরিত্রের উগ্রতা), যা নায়িকা নয়, প্রতিনায়িকা অথবা সরাসরি ভ্যাম্পের রোলে ঠেলে দেয় নারীচরিত্রগুলোকে, অন্য দিকে অসচেতন, ঢলোঢলো কাঁচা সৌন্দর্য, যা আত্মার বিশুদ্ধতাকে দেহসৌষ্ঠব ফুঁড়ে নায়কের চোখের সামনে হাজির করছে। নায়িকারা সর্বদাই কিছুটা সাজগোজে অন্যমনস্ক হবেন, এ যেন তারপর থেকে দাঁড়িয়ে গেল বাংলা আইডিওলজির সঙ্গে সমান্তরালে, সাহিত্য শিল্পেও।

দেখা যাক, সুনীলের প্রতিদ্বন্দ্বী-তে কীভাবে এসেছে এই সংজ্ঞায়ন।

“মেয়েদুটির নাম মালবিকা আর কেয়া। মালবিকা তার পায়ের জুতো, শাড়ির রং, আংটির পাথর, হাতব্যাগ, টিপ সব মিলিয়ে পরেছে। চুল বাঁধার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, সে এক-একদিন এক-এক রকমভাবে চুল বাঁধে। নিজের রূপ সম্পর্কে মেয়েটি সজাগ। মুখে সেই হালকা অহংকারের ছায়া পড়েছে। কেয়া মেয়েটি খানিকটা এলোমেলো স্বভাবের, পোশাকের পারিপাট্য নেই, কিন্তু মুখখানি তার ভারী সুন্দর – বড় বড় চোখদুটিতে সরল সৌন্দর্য। “

এই বর্ণনা থেকে লেখকের বা তার নির্মিত নায়কের পক্ষপাত স্পষ্ট, বাংলায় এই পক্ষপাত কিন্তু চলবে, একেবারে কালবেলা-র মাধবীলতা পর্যন্ত।  বলা ভাল সমরেশ মজুমদারে এসে বাঙালি মেয়ের এই ইমেজ কালমিনেশনে পৌঁছবে। “মাধবীলতাকে সে চেনে না… শুধু এটুকুই মনে হয়েছে মেয়েটি নরম এবং বোকা নয়। …মাধবীলতার নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে, এবং সেটাকে গুছিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলার ক্ষমতা রাখে। এরক সতেজ ডাঁটো আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে কোনও মেয়েকে অনিমেষ দেখেনি। কলকাতায় এসে নীলার সঙ্গে আলাপ হয়েছি। নীলা অবশ্যই খুব ডেসপারেট মেয়ে, কোনও রকম ভিজে ব্যাপার ওর নেই। কিন্তু নীলা কখনওই আকর্ষণ করে না, বুকের মধ্যে এমন করে কাঁপন আনে না। যে কোনও পুরুষবন্ধুর মতো নীলার সঙ্গে সময় কাটানো যায় …নীলার মানসিকতা বদ্ধ, মাধবীলতার মতো এমন দ্যুতি ছড়ায় না। “

রাবীন্দ্রিক লাবণ্যর থেকে আলাদা হয়েও আসলে কোথাও এক থেকে গেছে মাধবীলতা। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র, বহু কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ের মত আমারও কমবয়সের ফ্যান্টাসির উপাদান সে। সবচেয়ে বড় কথা , সে মেয়ে মেয়ে, সে নারী, অথচ নারীর যে অবয়বটি আরোপিত সেই তথাকথিত “ফ্যাশন”-সর্বস্ব নয়, আবার নীলার মত “পুরুষালি”-ও হলে তাকে চলবে না।

এখানেও বহাল রয়েছে পুরুষের দৃষ্টিকোণ, অবশ্যই। নির্মাণ যে করছেন একজনে পুরুষই!

কিন্তু এর আগে পরে এমন চরিত্র নির্মাণ অনায়াসেই করে ফেলবেন সুনীল, যে মেয়েরা আত্মস্থ, স্বাধীন, পুরুষনিরপেক্ষভাবে থাকতে চায় ও ভালবাসে, এবং তাদের রূপ এই সহজ , ফর্মুলার মত দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। একে কি বলব, সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলা? মানিয়ে নেওয়া?

ধরা যাক প্রতিদ্বন্দ্বীর মেয়ে সুতপা । সুনীলের বর্ননায়, মূল উপন্যাসে যে মেয়েটি এইরকম : “সুতপা এক হাত দিয়ে শাড়িটা একটু উঁচু করে পা টিপে টিপে হাঁটছে। একটা ময়ূরকন্ঠী রঙের ছাপা শাড়ি পরেছে সুতপা, হাতে একটা সাদা রঙের ব্যাগ। …তাকে এখন একজনে পুরোপুরি মহিলা বলা যায়। ।। সুতপার বুক দুটি ভরাট সুগোল, হাঁটার ভঙ্গিতে খানিকটা মাদকতা মাখানো, ফরসা মুখটাতে একটা অন্যরকম আভা।“ পুরুষের নির্মিতি হলেও , নিজের অজান্তেই সুনীল কিন্তু ভেঙে ফেলেছেন ছাঁচ, ব্যবহারহীন একরকমের আত্ম-পরিতৃপ্ত চরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করে ফেলেছেন সুতপাকে।

সিনেমায়, সেই অবিস্মরণীয় ক্যালকাটা ট্রিলজির একটি, প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে,  সত্যজিৎ যাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন, ছাতে , একলা একলাই, কাল্পনিক পুরুষ সংগীর কাঁধে হাত রেখে নেচে চলতে।খুঁজে নিয়েছে অফিসে বসের মনোরঞ্জন ও পার্টিতে বল ডান্স করার উপযোগী শরীর কামড়ে থাকা ভয়েলের শাড়ির চটুলতা, যা তার মডেলিং-কামনার সঙ্গে একেবারে মানানসই।

অবজেক্টিভ বা তন্ময়ভাবে দেখা মেয়েদের চরিত্রায়ণ একদিকে, অন্যদিকে আপন মনের মাধুরী মেশানো , কল্পিত স্টিরিওটাইপ নারীর আদল… এই দুই মেরুর মাঝামাঝি অসংখ্য নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন সুনীল। তাঁর লেখার ব্যক্তিত্বময়ী মায়েদের পাই সেই সময়ের মেয়েদের মধ্যে। আবার পূর্ব পশ্চিমে বেশ কিছু স্বাধীনতা উত্তর স্বাধীনচেতা মেয়ের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তিনি। তবু, পুরুষদৃষ্টির প্রাবল্য ভাসিয়ে নিয়েছে সব চরিত্রকেই । কোথাও যেন অপেক্ষা থেকেই গেছে গোটা বাংলা সাহিত্য জুড়েই, মেয়েদের কথার। ঠিক যেমন, মেয়েদের কলমের ও।

 

কৃতজ্ঞতা: যশোধরা রায়চৌধুরীর পাতা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত