এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু

আজ ২০ জুলাই কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী গীতা দত্তের প্রয়াণ দিবস। ইরাবতী পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।


 

অশোককুমার, মধুবালা, মদন পুরী এবং কে এন সিংহ। ঠিক ষাট বছর আগের এক দুপুরে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন মুম্বইয়ের ফিল্ম স্টুডিয়োয়। শক্তি সামন্তের ‘হাওড়া ব্রিজ’ সিনেমার গানগুলোয় কার অভিব্যক্তি কেমন হবে, তারই মক্‌শো করছিলেন। সেই ঘরে সুরকার ওমকার প্রসাদ নাইয়ার ঢুকতেই কপট ধমকালেন দাদামণি। ‘তোমার নামে তো নালিশ আছে। তুমি নাকি কিশোরকে রফির মতো করে গাইতে বলেছ? সে তো ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে!’ ঠিক স্টেজের ম্যাজিশিয়ানের মতো, ফেডোরা হ্যাটটা নামিয়ে অশোককুমারকে বাও করে ও পি নাকি বলেছিলেন, ‘ইউ আর হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট। আমি কিশোরকে ওর গলায় রফির টোনাল কোয়ালিটি আনতে বলেছি। আশাকেও কয়েক বছর ধরে গীতার সেনসুয়ালিটি প্র্যাকটিস করাচ্ছি। হয়তো লোকে আমাকে পচা ডিম ছুড়বে। কিন্তু এদের কেরিয়ার ঘুরে যাবে।’

সেই বছরেই ও পি-র তির নিশানায় লেগে গিয়েছিল। ১৯৫৮ সালে ‘হাওড়া ব্রিজ’-সিনেমার ‘আইয়ে মেহেরবান’ গানটা শুনে সকলে থ’ হয়ে গিয়েছিলেন। কিছু দিন আগেই ‘চলতি কা নাম গাড়ি’-তে ‘হাল ক্যায়সা হ্যায় জনাব কা’ শুনে প্রথম বার কানে খটকাটা লেগেছিল। এ বারে একেবারে নিশ্চিত হওয়া গেল। আশা ভোঁসলে তাঁর স্বরক্ষেপণে গীতা দত্তের ‘আন্দাজ়’ মেশাতে চেষ্টা করছেন। না, তিনি গীতা দত্ত হতে চেষ্টাই করেননি। কিন্তু গীতাকে দেখেই সপ্তসুরের স্বর্গটা ঠিক কোথায়, সুরতরঙ্গের কোন রাস্তা ধরলে সেখানে পৌঁছনো যেতে পারে, সেটা চিনে-বুঝে নিয়েছেন। সবই ‘ফোকাস্‌ড’ থাকার সুফল। আশা বহু বছর ধরে আদাজল খেয়ে লেগে থেকে, গীতা দত্তের ভাগ্যদোষে ফেলে দেওয়া ব্যাটনটা তুলে নিতে পেরেছিলেন।

হ্যাঁ, গীতারই ব্যাটন। সেরা নেপথ্যগায়িকার রাজদণ্ডটা লতা মঙ্গেশকরেরও আগে এসেছিল গীতা দত্তের হাতে। তিনিই ছিলেন সেই সময়ে তামাম ভারতের মহিলা ‘সিংগিং-সুপারস্টার’। লুকিয়ে-চুরিয়ে আজও বলা হয়, ‘লতাকণ্ঠী, আশাকণ্ঠী হওয়া যায়। কিন্তু গীতাকণ্ঠী হওয়া যায় না।’ তার কারণ, তিনি অননুকরণীয়। তাঁর স্বরযন্ত্রটা আসলে ঈশ্বরের নিজের তৈরি মোহনবাঁশি। তার সঙ্গে ভীষণ আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর সুরে রোম্যান্স, উৎসব, যন্ত্রণা, ছলনা— সব অমন তীব্র ভাবে বেজে উঠত। কিন্তু সেই সাধারণের চাইতে বেশি অনুভব করতে পারাটাই তাঁর কাল হল।

মেরা সুন্দর সপনা

শুরুর জীবনে গীতার মিল আর এক পিহুকণ্ঠীর সঙ্গে। লতা মঙ্গেশকর। তাঁর চেয়ে বছরখানেকের ছোট গীতার জন্ম ১৯৩০-এ । ঠিক লতার মতোই কিশোরীবেলায় বাড়ির বারান্দায় গুনগুন করতে গিয়েই বম্বের সুরকার হনুমান প্রসাদের নজরে এসেছিলেন। যে পরিমাণ স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁর জন্ম, তাতে তাঁর ঘিঞ্জি দাদরের ওই একচিলতে বারান্দায় দাঁড়ানোর কথাই নয়। কিন্তু নিয়তি যে গীতার আজন্ম শত্রু। বাংলাদেশের ফরিদপুরের ধনাঢ্য জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ রায়চৌধুরীর দশ সন্তানের পঞ্চম ছিলেন তিনি। আরামে-বিলাসে, জলের ধারে বসে ভাটিয়ালি শুনে দিন কাটছিল ধীরে। সব তছনছ করল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপানি সেনার ভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রথমে কলকাতা, সেখান থেকে বম্বে এলেন ঘোষ রায়চৌধুরীরা। খোয়া গেল জমিদারি ভূষণ। এতটাই গরিব হয়ে গেলেন যে, বছর বারো-তেরোর গীতা গানের টিউশন দিতেন। বাসের পয়সা বাঁচাতে মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। যে বাড়িতে গান শেখাতেন, গরিব বলে তাঁকে মাটিতে বসতে বলা হত। এই জীবনই গীতাকে মহাসঙ্গীত শিখিয়েছিল।

প্রথম গানেই গীতা মেয়েটির রিনরিনে গলার সূক্ষ্ম বুননে মোহিত হয়েছিলেন শচীন দেব বর্মণ। তাঁর পরের ছবি ছিল ‘দো ভাই’। ন’টা গান দিয়ে বসলেন ছোট্ট মেয়েটাকে। শুধু বললেন, ‘বম্বেতে বাঙালিদের খুব নাম। মান রেখো মা।’ স্বাধীনতার বছরে সেই ছবিই গীতাকে রাতারাতি সেরা তিন গায়িকার সরণিতে এনে দেয়। সকলে একমত, জোহরাবাই অম্বালেওয়ালি-র পাকা গিঁটকিরি বা নুরজাহানের ফিনফিনে গলার থেকেও কোথায় যেন অন্য এই নতুন মেয়েটির সুর রাগ ছন্দ। এর হবেই। তখন যুগের চল ভক্তিগীতি। গীতার করুণ গলায় সমর্পণ, আকুতি তো খুব ভাল ফুটত। তাই দেবতার গান গেয়েই ভারী যশ হল তাঁর। বিখ্যাত হতেই সেই টিউশন-বাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ এল। গীতা গেলেন ও জোর করে মাটিতে  বসলেন। সিনেমার গানে গীতার এই অভিমান, হৃদয়বৃত্তি আর নারীর অহংকেই সুন্দরী নায়িকার কণ্ঠে শোনা যেতে লাগল। রোম্যান্টিক গানে তাঁর কচি গলাটি পেতে বাড়ির সামনে লাইন লাগালেন নির্মাতারা। গীতার তীক্ষ্ণ বাঙালি টানকে কাজে লাগিয়ে তাঁর লোকসঙ্গীতের ধার বাড়ালেন শচীনকর্তা। রেডিয়োর নব ঘোরালেই শোনা যেত, ‘বর্মণদা কি ধুনমে গীতা রয় কি সুনহেরি সরগম। ফিল্ম শবনম।’ তার পর বাজিমাত করল পঞ্চাশের দশক।

ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান

এই সদ্য কাটা দেশটার কোণে কোথাও জমা হয়েছে জখম হতাশা, কোথাও উন্মত্ত বিত্ত, কোথাও কারখানার কানফাটা সাইরেনকে চুপ করিয়ে দেয় ক্লাবের জ্যাজ়-ট্রাম্পেটের শব্দ। এই সব পরস্পরবিরোধী সত্তাকেই ‘নোয়া’ গোত্রীয় চলচ্চিত্রের সাদাকালোয় সাজাতে শুরু করলেন নির্মাতারা। সেই ধূসর সিনেমার মদির আবহে চাই শ্রাবস্তীর কারুকাজ করা উর্বশীগীতি। এই সব গানকে প্রাণ দিয়েই এক নম্বরে উঠে এসেছিলেন গীতা। তখন স্বরলিপি তৈরি করেন মদনমোহন, নৌশাদ, এস ডি, ও পি নাইয়ার। কথা লেখেন সাহির লুধিয়ানভি, মজরুহ সুলতানপুরী। সেই দারুণ দিনে ‘আয়েগা আনেওয়ালা’-র উত্তুঙ্গ সাফল্যের পরও লতাকে পাতলা গলার জন্য শাসন করছেন যুগপুরুষরা। আশার জুটছিল বি-গ্রেড সিনেমার শরীরী গান। এমন সময়ই প্রথাগত তালিম ছাড়া শুধু মাত্র অসাধারণ এক্সপ্রেশন রেঞ্জে শ্রোতাকে বুঁদ করে, সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্তব্ধ করে গীতা অনায়াসে গাইলেন, ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল জিনা ইহাঁ। জ়রা থমকে, জ়রা বচকে, ইয়ে হ্যায় বম্বে মেরি জান।’

ভাব-গায়কির পাটরানি গীতা দত্তকে বুঝতে হলে, গুরু দত্তকে জানতে হবে। আর গুরু দত্তকে জানতে গেলে তাঁর সিনেমা বুঝতে হবে। ‘ক্লাসিক নোয়া’ ধারার ‘বাজি’ দিয়ে গুরু দত্ত ছবি পরিচালনা শুরু করেছিলেন। এস ডি বর্মণ ‘বাজ়ি’ সিনেমায় একটি গজ়লে পরিয়ে দিয়েছিলেন পাশ্চাত্যের ঝংকার।

সেই গানটাই হল ‘তদ্বির সে বিগড়ি হুয়ি তকদির বনা দে’। লিপ দিয়েছিলেন গীতা বালি। ‘বাজ়ি’র মহরত শট। ভাইয়ের প্রথম ছবি। উনি আমাদের বাড়ির সকলকে নিয়ে গিয়েছিলেন মহালক্ষ্মী স্টুডিয়োর মহরতে।’ গুরু দত্তের ছোট বোন, চিত্রশিল্পী ললিতা লাজ়মি এমন ভাবে স্মৃতিগুলো পড়ছিলেন যেন এক্ষুনি সামনে দেখছেন সবটা। ‘গীতাদিদি তখন আঠেরো। বিরাট স্টার। নানা ভাষায় প্রায় ন’শোটা গান গেয়ে ফেলেছেন। গলা তো মধুতে ডোবানো। নিখুঁত নাকমুখ। হরিণের মতো চোখ। আমার মা বাসন্তী পাড়ুকোন সে দিনই ওঁকে বাড়িতে আসতে বললেন। ওই গানটা যেন ভাইয়েরই ভাগ্যটা বদলে দিল।

‘‘গীতাদিদি লিমুজ়িনে চেপে আমাদের বাড়ি আসত। এসেই কোমরে শাড়ি গুঁজে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ত। আনাজ কাটছে, গান শোনাচ্ছে। চিরকাল এমন ভার্সেটাইল। অগাধ ক্ষমতার অধিকারী। ওর কূল পাওয়া যায় না। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে হলেই আমার নাম বলে দিত। ওই লালি-র সঙ্গে বেরোচ্ছি। আমি ছিলাম ওদের চিঠি বওয়ার লোক।’’

দুই বাড়িই যে বাধা দিচ্ছিল সম্পর্কে। কোঙ্কনি পরিবারের ছেলে, সিনেমা করার চেষ্টা করে। সব দিক দিয়ে নাকি তাকে গীতার অযোগ্য মনে করতেন রায় পরিবার। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ বিয়েতে পাড়ুকোনরাও একটু খুঁতখুঁত করছিলেন। রায় পরিবার এক বাঙালি যুবকের সঙ্গে গীতার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন। গীতা নাকি সেই যুবকটিকেও আশকারা দিয়েছিলেন। কানে আসতে ছটফট করে উঠলেন গুরু দত্ত। এক দিন রাস্তাতেই গীতাকে আটক করলেন। গীতা দত্ত তাঁকেই কথা দিলেন। গীতার ছোট ভাই মিলন রায় আজ চোখ বুজলেই সেই গোধূলি লগ্ন দেখতে পান। ‘‘১৯৫৩-য় ওই বিয়ে ছিল ‘বিগেস্ট ওয়েডিং এভার’। দু’মাইল গাড়ির লাইন। বৈজয়ন্তীমালা, নূতন, রফি সাব, লতা, পি সি সরকার, গীতা বালি… কে আসেননি!’’ সেই রূপকথার রাত ভোলেননি ললিতা লাজ়মিও। ‘‘সবচেয়ে বেশি মনে আছে কনেকে। লাল বেনারসি, ওড়না, এক গা গয়না, কপালে চন্দন। ভাই পরেছিলেন সিল্কের ধুতি-পাঞ্জাবি। অল্প বয়সের দুটি ছেলেমেয়ে। সাতাশ আর একুশ। কী যে সুন্দর দেখতে হয়েছিল! খুব সুখী লাগছিল ওদের।’’

বাঙালি সাজে বিয়ের দিনে গীতা দত্ত ও গুরু দত্ত


 

পেয়ার মে জ়রা সমহলনা…

সুখ হল পদ্মপাতায় জল। বিয়ের কিছু দিন পরেই গুরু দত্ত নিজের হোম প্রোডাকশন ছাড়া স্ত্রীর অন্যত্র গাওয়া নিষিদ্ধ করলেন। গীতার গলায় তখন যৌবনের ফাগুন। তাঁর এগিয়ে যাওয়ার সময়। তখনই তাঁর পায়ে দত্ত পদবির বেড়ি। প্রথমে অবশ্য শাপে বর হল। গুরু দত্তের ছবিতে গান নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ এক চরিত্র। সে দ্রুত লয়ে কাহিনির বাঁক ঘোরায়, নায়কের সিদ্ধান্তে অনুঘটকের কাজ করে, দেখা দেয় লাস্যময়ী সুন্দরীর রূপে। ‘রাত নশিলি রং রঙ্গিলি’, ‘বাবুজি ধীরে চলনা’, ‘জানে কহাঁ মেরা জিগর গয়া জি’ গাইবার সুযোগ পেয়ে প্রতিভাকে বিকশিত করার সুবিশাল হরিৎক্ষেত্র পেলেন গীতা।

কিন্তু গীতা আর গুরু স্বভাবে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। সংসারজীবনে সেটাই চড়া ফাঁকের সৃষ্টি করল। গীতা এই রাগছেন, আবার হিহি হাসছেন, তার পরই একটুতেই কাঁদছেন। ঠিক নিজের গানগুলোর মতো। সব অনুভূতি একটু উচ্চগ্রামের। অন্য দিকে গুরু দত্ত আত্মমগ্ন মানুষ, দিবারাত্র নিজের সেই নোয়া-পৃথিবীতে বুঁদ। উল্লাস পছন্দ করতেন না। যে গুরু দত্তের সঙ্গে প্রায়ই পিকনিকে গিয়ে ভীষণ মজা করতেন গীতা ও গোটা পরিবার, হাতে সিনেমার সংখ্যা বাড়তেই তিনি অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। কেবলই কাজ। গীতার থেকে আর একটু গিন্নিপনা আশা করেন। এ দিকে জীবনকে চেটেপুটে না চাখলে ‘বোহেমিয়ান’ গীতার গান আসে না। গীতার ভাই মিলন রায় বলেছেন, ‘‘তিন-চার ঘণ্টা রেওয়াজ করত রাঙাদি। গলা বাঁচিয়ে চলত। টক, আইসক্রিম খেত না। বরাবরই আশ্চর্য সব ক্ষমতা ছিল। বিদ্যুতের গতিতে গান তুলতে পারত। দিনে ছ’টা গানও রেকর্ডিং করেছে। হয়তো ছ’টা গানই স্বতন্ত্র। রাঙাদির কাছে কোনও ব্যাপারই নয়। কথাশিল্পীর সঙ্গে শব্দ নিয়ে কিছুক্ষণ বসত। তার পর বার কয়েক রিহার্সাল করেই টেক! এর পরেই হয়তো আমাকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে প্রিমিয়ারে ছুটল। কী ভীষণ ‘লাইফ’ ছিল ওর মধ্যে।’’

কথা ওড়ে। সংসার-সন্তানে আটকে যাচ্ছেন গীতা। মধুর-সঙ্গীতে তাঁর পাশাপাশিই লতা মঙ্গেশকরের জায়গাটাও জমাট ছিল। দিদির সঙ্গে প্রতিনিয়ত তুলনায় আশাই বরং একটু কাঁচা মাটিতে। এমন দিনে গীতা হঠাৎ পশ্চিমে হেলতে, সুরকাররা আশাকেই আবার ডাকলেন।

ও পি নাইয়ারের সঙ্গে আশার আন্তরিক সম্পর্কের গুঞ্জন ফিল্ম-মহল্লায়। এই ও পি নাইয়ারকে গুরু দত্তের সঙ্গে আলাপ করিয়ে তাঁকে ‘ব্রেক’ দিয়েছিলেন গীতাই। চিরকালের বিতর্কিত ও পি কৃতজ্ঞতা নিয়ে মাথা ঘামান না। তাঁর যা ভাল লাগে তাই করেন। গীতার গলায় তাঁর সৃষ্টি ‘যাতা কহাঁ হ্যায় দিওয়ানে’ তখন সকলে গোপনে শোনে। কারণ ওই আবেদনকে হজমই করতে পারেনি পঞ্চাশের সমাজ। ভীষণ শরীরগন্ধী বলে সে গানকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো। অনেক সমালোচনাতেও ও পি নিজেকে বদলাননি। তিনি দেখলেন, গীতার মাদক-স্বরই তাঁর প্রয়োজন। কিন্তু গীতার অনেক বাধা। কাজেই অন্য কাউকে দিয়ে গাইয়ে নিলেই হয়। আশা খাটতে প্রস্তুত। পরে তিনি নিজেই এ কথা স্বীকার করেছেন। বলেছেন, আশার প্রতি পক্ষপাত করে তিনি গীতার প্রতি অন্যায় করেছেন।

 

মেরা নাম চিন চিন চু

গুরু দত্তের শর্ত, সংসার ও সন্তানের অগ্রাধিকার শিরোধার্য করেও সুরকাররা ঠিক একটি করে গান গীতার জন্য তুলে রাখছিলেন। সেই গানই সিনেমার তুরুপের তাস হয়ে উঠত। এই রাস্তাতেই গীতা-ও পি-র জুটি ফিরেছিল শক্তি সামন্তের ‘হাওড়া ব্রিজ’-এ। ভায়োলিন, ড্রামবাদ্য, হেলেনের তুফান-নৃত্য সব থাকলেও, সে গান আজ এত দূর আসতই না, যদি না গীতা তাঁর রঙিন স্বরটি ছোঁয়াতেন।

সুরকারের দাক্ষিণ্যে, লোকে বলে বিশ্বাসঘাতকতায়, ভ্যাম্পের বদলে হিরোইনের কণ্ঠের গান পেতে শুরু করলেন আশা। আর ‘সিনিয়র’ গীতার কপালে নর্তকীর গান! ‘আইয়ে মেহেরবান’ গেয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আশা ভোঁসলে ঘুরে দাঁড়ালেন। কিন্তু ওই এক ক্যাবারে গানেই মাত করলেন গীতা। আশার গান মুগ্ধ করল, গীতার গান শিরা-উপশিরার রক্ত চঞ্চল করে দিল। পরে এক সাক্ষাৎকারে ‘হাওড়া ব্রিজ’-এর অমোঘ ক্যাবারেটি প্রসঙ্গে হেলেন বলেছিলেন, ‘দিদি আগুন লাগিয়ে দিতেন গানে। শটে আপনিই আমার সেরাটা বেরিয়ে আসত! কেয়া শোখি, জজ়বাত, অদা, নজ়াকত!’

এই কালজয়ী ‘চিন চিন চু’ গীতা-ও পি জুটি-র শেষ গান!  ‘ও পি নায়ার ক্লাসিকস’-সংকলনে আশা ভোঁসলের গান ৮১। আর গীতা দত্ত জ্বলজ্বল করছেন মাত্র ১৮টি রত্নের জৌলুসে। হিটের স্ট্রাইক-রেটে অনেক অনেক এগিয়ে গীতা দত্ত।

তুমি যে আমার…

এ ভাবেই যখন তিনি শেষ হয়ে গিয়েছেন বলা হয়েছে, আসমুদ্রহিমাচল কাঁপানো হিট নিয়ে ফিরেছেন। উত্তম-সুচিত্রা-নচিকেতা-হেমন্তের সঙ্গে কাজ করে বাংলা গানে সোনা ফলিয়েছেন। সে সময়ে গুরু-গীতার ভুল বোঝাবুঝির ফাটলে জমছে সন্দেহের কালো মেঘ। তৎকালীন গসিপ কলাম লিখেই দিচ্ছে, ওয়াহিদা রহমান গীতা দত্তের সংসারে সাপ হয়ে ঢুকেছেন। গুরু দত্ত ছবি করায় মন বসাতে পারছেন না। অন্য দিকে সুরকারদের ধৈর্য ভাঙছে। গীতা দত্ত রিহার্সালে আসছেনই না। এর পর তাঁর গান আশার কাছে কেন চলে যাবে না? আশাই বা কেন সে সুযোগ হারাতে দেবেন? স্বামী-স্ত্রী প্রবল সুরাসক্ত। অষ্টপ্রহর চলছে বিষপান।

গুরু দত্তের ছায়াসঙ্গী লেখক-পরিচালক আব্রার আলভি। তিনি পরে বলেছেন, ‘গুরু দত্ত জিনিয়াস। জাগতিক চাওয়া-পাওয়া বোঝেন না। হয়তো ওয়াহিদা রহমানের মধ্যে তিনি কোনও ‘মিউজ়’ পেয়েছিলেন। এই যেমন, ‘পিয়াসা’-য় ওয়াহিদা রূপোপজীবিনীর চরিত্র করবেন। কিন্তু নিজে কখনও এমন মহিলাই দেখেননি! গুরু দত্ত তাঁকে সেই পাড়ায় নিয়ে গিয়ে সত্যিকারের দেহপসারিণীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। সবই পরদার স্বার্থে। অথচ তার কত অপব্যাখ্যা হল! গীতা রেগে টং! ওয়াহিদার গলায় গান গাইতে চাইলেন না। গুরু দত্ত খেপে গেলেন। এ ভাবে নায়িকার গলায় না গাইতে চাইলে কম গুরুত্বপূর্ণ গানই তো জুটবে।’ মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখিয়েছেন আলভি। বলেছেন, গীতা দত্তও খুব সহজ মানুষ ছিলেন না। নিজেই ওয়াহিদার নাম দিয়ে ‘খুব দরকার, অমুক জায়গায় এলে ভাল হয়’ বলে চিঠি লিখে দেখা করতে বলেছিলেন। গুরু দত্ত চলে গেলেন। অমনি লুকানো জায়গা থেকে বেরিয়ে এলেন গীতা ও তাঁর এক বোন। শুরু হল জেরা। গুরু দত্ত তিতিবিরক্ত। আবার গীতাকে ছাড়া থাকতেও পারছিলেন না। এ সবে কি শিল্প বাঁচে?

আলভির দাবি, হুল্লোড়প্রিয়তাও গীতাকে আর্থিক ও মানসিক ভাবে নিঃস্ব করেছে। তাঁকে ঘিরে একটা বিশ্রী বৃত্ত তৈরি হয়েছিল। গুরু দত্ত বলতেন, এরা গীতাকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। আলভি সাক্ষী, শুধু ওয়াহিদা নয়, এই বন্ধুদের জন্যই এক যুবককে ঘিরে তুমুল মনোমালিন্য হয়েছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।

তখন সুখের সময়


না যাও সাইয়াঁ…

ফিল্মপণ্ডিতদের মতে, শিল্পীদের সঙ্গে তাঁদের অভিনীত চরিত্রকে এক করে দেখার জন্য ইন্ডাস্ট্রির অনেক ক্ষতি হয়েছে। ‘কাগজ় কে ফুল’-এর কাহিনি যেমন! সিনেমায় গুরু দত্তই নায়ক ও চিত্রনির্মাতা-র ভূমিকায়! তিনি স্ত্রীকে ভুলে অভিনেত্রীতে মজেছেন। এই নবাগতা নায়িকা সাজলেন ওয়াহিদা!  বড় খেদে তাঁকে কণ্ঠ দিলেন গীতা। ‘ওয়ক্ত নে কিয়া কেয়া হসিন সিতম!’ জল্পনার ষোলো কলা পূর্ণ হল। ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’-এর  পরিচালক আব্রার আলভি বলেছিলেন, ‘ওয়াহিদার এক ভাই গুরু দত্তের সঙ্গে বোনের জোর করে বিয়ের রটনা ছড়িয়ে দেন। গুরু দত্ত কিন্তু সে ফাঁদে পা দেননি। গীতা বুঝলেন না। সেই থেকে ওয়াহিদার সঙ্গেও ভীষণ তেতো হয়ে গেল সম্পর্কটা। এই ছবিটির শ্যুটিংয়ের শেষে ওয়াহিদা-গুরুর বাক্যালাপই ছিল না। তবু গুরু দত্তকে বিঁধেই চলেছিলেন গীতা। বাচ্চাদেরও সরিয়ে নিয়েছিলেন। ললিতা লাজ়মি বলেছেন, ‘‘ভাইকে নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হয়েছিল। কোমা থেকে উঠে ‘গীতা’ ‘গীতা’ বলে চিৎকার করে উঠতেন। দুর্বোধ্য রসায়ন।’’

পরিচারককে বাদ দিলে, গুরু দত্তকে শেষ জীবন্ত দেখেছিলেন এই আলভি-ই। ১৯৬৪ সালের ৯ অক্টোবর রাতে গুরু দত্তের বাড়িতে ছিলেন শুধু তিনিই। দু’বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে বার বার দেখতে চাইছিলেন গুরু। গীতা কিছুতে পাঠাবেন না।

পর দিন সকালে, তিন বারের বার, গুরু দত্তের আত্মহত্যার চেষ্টা সফল হয়। তিনি যখন মরণঘুমে গেলেন, গীতা কী যেন বুঝে পাগলের মতো ফোন করছিলেন। পর দিন ছিল মহাপঞ্চমী। বেলা বাড়লে গুরু দত্তের চিতায় গীতারও অনেকখানি ছাই হয়ে গেল। প্রায় এক বছর নিজের তিন সন্তানকে চিনতে পারতেন না।

তবু সন্তানদের মুখ চেয়ে ভাঙা টুকরোগুলো জুড়ে ফিরতে চাইলেন তিনি। বাদ সাধল ফিল্মি দুনিয়ার স্বার্থপর সমীকরণ। গীতাকে আর ‘গাইতে ডাক দেওয়া হচ্ছিল না’। অজস্র স্টেজ শো করে, এমনকি বাংলা ছবিতে অভিনয় পর্যন্ত করে সংসার টানতে হচ্ছিল। ললিতার মনে পড়ে যায়, সে সময়ও কলকাতায় গাইতে গেলে কেমন তাঁর জন্য এক আলমারি শাড়ি আনতেন। প্রিয় ননদের শিশুকন্যা কল্পনা লাজ়মির জন্য আসত এক গাড়ি ভালবাসার উপহার। বিদেশনিবাসী ছোট ভাইটিকে একবেলার জন্য কাছে পেতে আচমকা প্লেনের টিকিট পাঠাতেন। স্বজনেরা দুর্জনের থেকে এই ঔদার্য আড়াল করতে বলতেন। কিন্তু দিদিটি যে গীতা দত্ত। নিজের দুঃখ ঢোঁক গিলে সয়ে গান করে নেন,  কিন্তু অন্যের কষ্ট দেখতে পারেন না!  সুযোগ নিয়েছিল অনেকে। তাঁর বাড়িতে তখনও চাটুকারের ভিড়। এদের সকলের ভরণ-পোষণ ভগ্নমন-ভাঙা স্বাস্থ্য গীতার কাঁধে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ লোকপ্রিয় এক পৃথুলা কৌতুকাভিনেত্রীর বিরুদ্ধে!

ননহি কলি শোনে চলি

মিলন রায় বিষণ্ণ হন। ‘‘গায়িকাদের মধ্যে সেরা সুন্দরীও আমার দিদি। গুরুদাই ওঁকে নায়িকা করে ছবি শুরু করেছিলেন। ‘গৌরী’। সেটা তুলতে পারলে আবার ইতিহাস হত।’’

একমাত্র এস ডি বর্মণই নাকি গীতার জন্য তুলে রাখা গান কিছুতে অন্যদের দিতে চাইতেন না। তিনি তাঁর এই সুর-দুহিতার জন্য একটা আলাদা সিনেমা হচ্ছে শুনেই রাতদিন এক করে দিয়েছিলেন। হাজারো কাজের ভিড়েও, এই একটি  ছবি বাতিল হতেই ভীষণ ভেঙেও পড়েছিলেন। আক্ষেপ করতেন, ‘গীতার লগেই কম্পোজ়িশন। অর লগেই লিখা। অহন গানডার কী হইব!’ সহধর্মিণীকে বলতেন, গীতা ছাড়া এ গানের জীবনবোধ কারও নেই। এই মেজাজ ধরতে হবে তো! সে তো যে কেউ পারবে না। কেবল হায় হায় করতেন তিনি।

অর্থের অনটনে সে সময়ে গীতা প্রচুর অনুষ্ঠান করেছেন কলকাতায়। বাংলা সিনেমাতে মুখ দেখাতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু ষাটের দশকের মাঝামাঝি, গুরু-হীন গীতা দত্তের ছবি মনে করতে হলেই প্রত্যক্ষদর্শীরা আঁতকে ওঠেন। লোকমুখে শোনা যায়, ‘কী অবস্থা! স্টেজে ওঠার মুখে বসে পড়লেন। ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’ ডুয়েটের গোটাটাই হেমন্তকে একা গাইতে হচ্ছিল।’  নিন্দুকে বলত, কষ্টের ঘুণপোকা সম্রাজ্ঞীর মসলিন কেটে দিয়েছিল। ললিতা লাজ়মির অন্য মত। ‘‘বয়সের সঙ্গে গলাও তো ঘুরবে। তাই তো ‘শচীমাতা গো’ আর ‘কৃষ্ণনগর থেকে আমি কৃষ্ণ খুঁজে এনেছি’ আলাদা আলাদা ভাবে মিষ্ট।’’

গীতা দত্তের সংক্ষিপ্ত জীবন বেশি কষ্টের ছিল, না কি অকালমৃত্যু— তা নিয়েও তর্ক ওঠে।  সকালে হসপিটালে প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা চলছে। বিকেলে স্টুডিয়োয় এসে দুষ্টু  নায়িকার ‘লড়কপন’ ফোটাচ্ছেন অক্লেশে। ‘মুঝে জান না কহো মেরি জান’ বলে পঙ্‌ক্তিটির শেষ আখরে নিজেকে নিঃশেষিত করে দেওয়া সেই টান! রেকর্ডিংয়ে সকলে সন্ত্রস্ত। গায়িকা কুঁকড়ে গিয়েছেন, দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছেন না! তখনই খিলখিল হেসে উঠলেন তিনি। তাই নিয়েই আবার ঘুরল রেকর্ড। সে হাসি কি নিষ্ঠুর জীবনকে তুচ্ছ করতে পারার ব্যঞ্জনা? এই সিনেমাটি ছিল বাসু ভট্টাচার্যের ‘অনুভব’! ১৯৭১-এ মুক্তি পেতেই আবারও দিকে দিকে গীতাবন্দনা। তখনও আশা ছিল।

ঠিক পরের বছর। বয়স মাত্র ৪১। ১৯৭২-এর ২০ জুলাই, মুম্বইয়ের রোগশয্যায় পাখির কণ্ঠ দিয়ে সঙ্গীতের বদলে ভলকে ভলকে রক্ত উঠে এল। সে সময়ে বড় চোরাবালি-টান। রোগে বা স্বেচ্ছায়, পঁয়ত্রিশ পেরোলেই জীবনপ্রদীপ নিবিয়ে ‘হল অব ফেম’-এর ছবি হয়ে যাচ্ছিলেন নক্ষত্ররা। গুরু দত্তের পর গীতা বালি, মধুবালা। ইন্ডাস্ট্রি বলছিল, ক’মাস আগে মীনাকুমারীর মতোই একই রোগে, প্রায় সম-আয়ুতেই ফুরিয়ে গেলেন গীতা দত্ত। সেই সিরোসিস অব লিভার। নায়িকা ও গায়িকা, দুই জীবনদাত্রীরই প্রাণ টেনে নিয়ে তাঁদের যেন বইয়েরই শেষ পাতায় আটকে রাখল ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’-এর ছোটি বহু। ঠিক গুরু দত্তের সিনেমার দৃশ্যের মতোই ঘোলাটে সেই রাতে এমন সব সমাপতনে অনেকেরই শরীরে শিহরন জেগেছিল।

এ খবরে নাকি অসুস্থ এস ডি সাব বলেছিলেন, ‘যাক।’ হয়তো এই ‘যাক’-এর মানে জানে শুধু শচীন কর্তার নিজস্ব মিউজ়িক রুমটি। গীতা যখন আর গাইতে পারছিলেন না, তখন সেখানে হঠাৎ এক দিন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন। সকালে শুধু মীরা দেববর্মণকে বলেছিলেন, ‘গৌরী’র ওই গানটা কোনও সিনেমায় দেবেন না। বিকেলে দুম করে রেকর্ডিংয়ে ঢুকে নিজেই কানে হেডফোন পরেছিলেন। যন্ত্রীদের বললেন, ‘বুজ়লা, য্যানো বিলের পাড়ে একতারা বাজতাসে।’

শচীনকর্তা নিজেই গেয়েছিলেন শুধু ফরিদপুরের গীতার জন্য সরিয়ে রাখা সেই পল্লিগীতি। সে গান আজও যেন গীতা দত্তের জন্যই বিলাপ করে।

 বাঁশি শুনে আর কাজ নাই,

 সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি!…

ঋণ: আনন্দবাজার আর্কাইভস, প্রদীপ চক্রবর্তী, সান্ত্বনা রায়চৌধুরী

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত