গল্পের নায়ক কিশোর কুমার

Reading Time: 4 minutes

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠে ছিল কৈশোরের ছোঁয়া। গানে গানে নিজের গায়কীতে মনের আবেগকে সুরের মায়ায় বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি অভিনয়েও তিনি সবার মন ভরিয়ে দিয়েছেন রসিকতায়। তিনি এক ও অদ্বিতীয় কিশোর। চিরদিনের রসিক এ মানুষটি ছিলেন অনেক গুণের অধিকারী।

কিশোর কুমারের প্রথম প্লেব্যাক জিদ্দী সিনেমায়।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠে ছিল কৈশোরের ছোঁয়া। গানে গানে নিজের গায়কীতে মনের আবেগকে সুরের মায়ায় বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি অভিনয়েও তিনি সবার মন ভরিয়ে দিয়েছেন রসিকতায়। তিনি এক ও অদ্বিতীয় কিশোর। চিরদিনের রসিক এ মানুষটি ছিলেন অনেক গুণের অধিকারী। তিনি একাধারে গায়ক ও অভিনেতা। এ ছাড়া গীতিকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং চিত্রপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। এখনও তিনি সংগীতপিপাসুদের সুরের জাদুতে আচ্ছন্ন করে রেখেছেন! ব্যক্তিজীবনে তিনি যেমন ছিলেন প্রচন্ড খামখেয়ালী, তেমনি রসিক। রেকর্ডিংয়ে, আড্ডায়- সবখানে মেতে থাকতেন হৈ-হুল্লোড়ে।

কিশোর কুমারের শেষ গানটি।


১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে হৃদরোগের কাছে হেরে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে অজানার দেশে পাড়ি জমান ভারতীয় উপমহাদেশের এই অমর সংগীতশিল্পী-অভিনেতা। তার চিরকিশোর কণ্ঠে গাওয়া ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’ কিংবা ‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’র মতো গানগুলো আজও শ্রোতাকে এক মায়াবী ঘোরে টেনে নিয়ে যায় ভালোবাসার অসীম পথে। এখনও কিশোর কুমারকে শুধু ভারত নয়, উপমহাদেশের সেরা কণ্ঠশিল্পী হিসেবে স্মরণ করা হয়। ৪ আগস্ট তার জন্মবার্ষিকী। উপমহাদেশের কিংবদন্তি এই তারকার কিছু অজানা গল্প তুলে ধরা হলো পাঠকেদের জন্য।

আভাস কুমার গাঙ্গুলি ভারতের মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়াতে এক বাঙালি পরিবারে ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট কিশোর কুমারের জন্ম। তার প্রকৃত নাম আভাস কুমার গাঙ্গুলি। বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি পেশায় উকিল ছিলেন। আর মা গৌরী দেবী ছিলেন ধনাঢ্য পরিবারের মেয়েঅ প্রখ্যাত বলিউড তারকা অশোক কুমার তার বড় ভাই। চার ভাইবোনের মধ্যে কিশোর ছিলেন সবার ছোটঅ শৈশব থেকেই গান ও অভিনয়ের প্রতি অদ্ভুত টান ছিল কিশোরের। বড় ভাই অশোকের সাফল্য তাকে বেশ প্রভাবিত করেছিল। ভাইয়ের অনুপ্রেরণাই কিশোরকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকদূর। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রখ্যাত গায়ক কুন্দন লাল সায়গলের ভক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি তাকে নকল করে গানও গাইতেন।

লতা হাসছেন রেকর্ডিং মানেই এক অন্যরকম কিশোর কুমার। ইয়ার্কি, হই-হুল্লোড়। সবচেয়ে মজা হতো, দ্বৈত গানের সময়। রেকর্ডিংয়ের সময় সবাইকে হেডফোন পরতে হয়। এমনই একদিন কানে হেডফোন লাগিয়ে সবাই বসে আছেন স্টুডিওতে। কিশোর কুমারের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের দ্বৈত গান। কিশোর কুমারের অংশ গাওয়া হয়ে গেছে। এবার লতা মঙ্গেশকরের পালা। কিন্তু কিশোর কুমার নাচের এমন সব ভঙ্গি করছেন যে, লতা মঙ্গেশকর গান গাইবেন কি, কিছুতেই হাসি চেপে রাখতে পারছেন না। হঠাৎ কিশোর কুমারের মজা করা থেমে গেলো। লতা মঙ্গেশকরকে গাইতে দিতে হবে তো! রেকর্ডিংয়ে এসে লতা মঙ্গেশকর খুব মনোযোগী থাকতেন। কিন্তু কিশোর কুমারের সামনে পড়লে কি আর সে উপায় আছে? লতা মঙ্গেশকর গান তুলছেন, কিশোর কুমার তার পেছনে লাগা শুরু করে দিলেন। নানান রকম হাসির কথা বলে লতা মঙ্গেশকরকে একটানা হাসিয়েই যাচ্ছেন। লতা মঙ্গেশকরকে কিশোর কুমার বোনের মতো ভালোবাসতেন।

টেনশন আক্রান্ত মজার মজার গান গাইতেন বলে অনেকের মনে হতে পারে যে, কিশোর কুমার হয়তো কখনো চিন্তায় থাকতেন না। এমন ভাবাটা ভুল। আগে যতই মজা করেন না কেন, রেকর্ডিং শুরুর কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ বদলে যেতেন কিশোর কুমার। শুধু তাই নয়। বাড়িতে নিজে গানটা তুলেই ফোন করতেন শচীন দেব বর্মন অথবা পঞ্চমকে। বারবার শোনাতেন। গানের ব্যাপারে যতক্ষণ সাড়া না পেতেন, ততক্ষণ টেনশনে থাকতেন তিনি। বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, ঠিক হচ্ছে তো? কিশোর কুমার যদিও বুঝতে দিতে চাইতেন না, তিনি গান নিয়ে কতটা টেনশনে ভুগছেন। তাই রেকর্ডিং শেষ করেই দ্রুত বাড়ি চলে যেতেন। শুনতেনও না। বলতেন, ‘গানটা এখন আর শুনবো না। আপনারাই বলবেন কেমন হয়েছে।’

মেহবুবা ‘শোলে’ ছবির ‘মেহবুবা ও মেহবুবা’ গানটি কিন্তু কিশোর কুমারেরই গাওয়ার কথা ছিলো। তার বাড়িতে গানটি তৈরি হচ্ছে। গানটি পঞ্চম যেভাবে গাইছিলেন তিনি সেভাবে তুলতে পারছিলেন না। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর হঠাৎ কিশোর কুমার বলে উঠলেন, ‘পঞ্চম, যাই বলো, এই গানটা আমার থেকে তোমার গলায় অনেক ভালো লাগছে। এটা তুমিই গেয়ে দাও।’ এমনই আর একটি গান ‘ক্যারাভান’ ছবির ‘পিয়া তু অব তো আ যা’। আশা ভোঁসলে ও পঞ্চমের দ্বৈত গান। হওয়ার কথা ছিলো কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলের। কিন্তু এই গানের মাঝে একটা শ্বাসের অংশ আছে। সেটি কিছুতেই আসছে না কিশোরের। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে পঞ্চমকে বললেন, ‘বুঝলে, এটা তুমিই গেয়ে দাও’। আর একটা গান ছিলো ‘দিল সে দে’। এই গানটাও কিশোর কুমারের অনুরোধে গেয়েছিলেন পঞ্চম। এখনকার দিনে কেউ এভাবে নিজের গান ছেড়ে দেবে!

মঞ্চের মাপ কিশোর কুমার কোনো কনসার্টে গান করার আগে মঞ্চের মাপ জেনে নিতেন। বলতেন, ‘আমার বড় স্টেজ চাই। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি গাইতে পারবো না। আমি নেচে-কুঁদে গাইবো।’ আর মঞ্চে তিনি এমন সব কাণ্ড-কারখানা করতেন যে, বাদকরাও বাজনা থামিয়ে হাঁ হয়ে দেখতেন।

বিপাকে কিশোর কুমার হারমোনিয়াম ভালো বাজাতে পারতেন না। বাজাতে গিয়ে ভুল হলে হাল ছেড়ে দিয়ে খালি গলায় গেয়ে দিতেন। সিঙ্কোপ্যাটেড নোটস থাকলে তো তার যেন দম আটকে আসতো!

ইয়ে জো মোহাব্বত হ্যায় ‘কটি পতঙ্গ’ ছবির ‘ইয়ে যো মহব্বত হ্যায়’ গানটি কিশোর কুমার প্রথম ফোনে শোনেন। শুণেই দারুণ খুশি। গানের দৃশ্যে নায়ক মাতাল হয়ে গানটি করবেন। সেই অভিব্যক্তি তিনি অনায়সে গানে তুলে আনলেন। অথচ জীবনে কখনো মদ ছুঁয়েও দেখেননি তিনি। শুধু চা খেতেন। কোনদিন মদ না খেয়েও এভাবে গানের মধ্যে নেশা ফুটিয়ে তোলা যায়, সেটা কিশোর কুমার ছাড়া আর আরো পক্ষে সম্ভব নয়।

নেপথ্যে ইমোশনাল গান, দুঃখের গান, রোমান্টিক গান তো তিনি অসাধারণ গাইতেনই। আর আনন্দের গান? তাহলে আর কথাই থাকতো না। গানের মাঝে কিছু কিছু কথা কিশোর কুমার নিজে থেকেই জুড়ে দিতেন। গাওয়ার আগে কার লিপে গানটা থাকবে, ছবিতে তার চরিত্র কেমন, পরিস্থিতি কী, অথবা গানে কোন ধরণের ঘটনা দেখা যাবে- সব কিছু মাথায় রাখতেন তিনি।

 

কিশোর কুমারের জনপ্রিয় বাংলা গান * আমরা অমর সঙ্গী * এ আমার গুরুদক্ষিণা * আমার স্বপ্ন যে * তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে * এক পলকে একটু দেখা * কী আশায় বাঁধি খেলাঘর * আশা ছিল ভালোবাসা ছিল * পৃথিবী বদলে গেছে * একদিন পাখি উড়ে * আজ এই দিনটাকে

কিশোর কুমারের জনপ্রিয় হিন্দি গান * রূপ তেরা মাস্তানা * মেরে স্বপনো কি রানী * কোড়া কাগজ থা ইয়ে মন মেরা * ইয়ে জো মোহাব্বত হ্যায় * মেরে সামনে ওয়ালি খিড়কি মে * ফুলো কে রঙ সে * ও মেরি শর্মিলী * ও মাঝি রে * ইয়ে শাম মাস্তানি * হামে তুমসে পেয়ার কিতনা।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>