অবনীবাবুর গ্রাম

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comজিনিসটা কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছেন না অনুপমা। এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী করে যে হারিয়ে ফেললেন ভেবেই অবাক হচ্ছেন। অবশ্য একে হারিয়ে ফেলা বলা চলে না।  ঘরের মধ্যেই হয়ত কোথাও রেখে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু কোথায়? সকাল থেকে এখনও অবধি সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খুঁজে দেখেছেন।

ইদানীং ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা চরমে গিয়ে পৌঁছেছে। কিছুদিন আগের ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে চশমা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চোখের যা অবস্থা চশমা ছাড়া সমস্তটাই ঝাপসা লাগে। সেই ঝাপসা দৃষ্টি দিয়েই সকাল থেকে বাড়ি ওলটপালট করলেন। দুপুরে কাজে এসে চুন্নি চশমা পেল ডালের কৌটোর ভেতর। এরকম বহু ঘটনা আছে। তাই সেই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো টেবিলের উপর নির্দিষ্ট একটা বাক্সের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুশান্ত।

ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে টর্চটা নিয়ে অনুপমা এবার খাটের তলায় আলো ফেললেন। স্তুপীকৃত ব্যাগ, বাসন, ট্রাঙ্কের ফাঁক-ফোকর দিয়ে আলো যতটুকু পৌঁছালো তাতে কোথাও সেই জিনিস নজরে এল না। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করলেন। আজকাল একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। টর্চ অফ করে এসে বসলেন খাটের উপর।

বাতের ব্যথার জন্য শরীর নড়াচড়াতে কষ্ট। তবুও মরিয়া হয়ে খুঁজে যাচ্ছেন সকাল থেকে। নইলে সন্ধ্যার পর থেকে আর নিস্তার নেই।অনুপমা চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন। দিন চারেক আগে সুশান্ত এসে যখন জিনিসটা দিয়ে গেল তারপর ঠিক কোথায় রাখলেন…।

আচমকা মনে হল জিনিসটা চুরি হয়নি তো? কিন্তু চুরি কে করবে? চুন্নি? পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে ও। ঘর মুছতে গিয়ে এক টাকার কয়েনও কুড়িয়ে পেলে ফেরত দেয়। আর থাকল রামলাল। রামলাল কবে এই ঘরে ঢুকল অনুপমা মনে করার চেষ্টা করলেন। ধুসস! যতসব আজেবাজে ভাবনা। প্রতিদিন বাজারটা পৌঁছে দিয়েই বেরিয়ে যায় ও। বাড়িতে বিশেষ কেউ আসে না। তাই চুরির প্রশ্নও আসে না। তাছাড়া এই জিনিস আদৌ কি চুরি হবার মতো..? ভাবনায় ছেদ পড়ল। পাশের ঘর থেকে বিকট এক চিৎকার ভেসে এল হঠাৎ।

“ফুটো করে করে সব শেষ করে ফেলল। ভেঙে পড়বে এবার” অবনীবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন।

অনুপমা দরজার সামনে এসে বললেন ” কী হল আবার?”

“সব শেষ করে ফেলল”

“কে?”

“শুনতে পাচ্ছ না নাকি? কখন থেকে ঠোকর মেরেই যাচ্ছে”

অনুপমা কান পেতে শুনলেন একটা কাঠঠোকরা পাখি অনবরত ঠোকর মারছে গাছে।

“বাবার নিজে হাতে লাগানো গাছ। ঢিল মেরে তাড়াও ওটাকে”

“তাড়াচ্ছি দাঁড়াও। অত চিৎকার কোরো না” বিরক্ত কন্ঠে কথাটা বলে অনুপমা বেরিয়ে গেলেন বাইরে।

অবনীবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। ঠোকরের আওয়াজ আর পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চিন্তে আবার পা নাচানো শুরু করলেন। সব গাছ বাবার নিজে হাতে লাগানো। রোজ ঘন্টার পর ঘন্টা রোদ, বৃষ্টি, মাটি মেখে নিজের শখের বাগান বাড়িয়ে তুলতেন বাবা। সার সার সুপুরি বাগানের পেছনের জঙ্গলেই আম,কাঁঠাল,পেয়ারা,নারকেলের ভীড়। বেলা বাড়লে অনেক চেনা-অচেনা পাখির ডাক শোনা যায়।

নারায়ণগঞ্জের পনেরো বিঘে জমি ঠাকুরদার নিজের কষ্টের পয়সায় কেনা। এত জায়গা এ তল্লাটে আর কারো নেই। সুপুরি, আর মাঠের ফসলের ব্যবসায় টাকাও আসত ভালো। সেই টাকায় এলাকার সবচেয়ে প্রথম পাকা বাড়ি হল তালুকদার বাড়ি। পাকা বাড়ি হলেও বাবা ইচ্ছে করেই ছাদ দিতে দেননি।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার আলাদা একটা শব্দ আছে। সেই শব্দ শুনেই বোঝা যায় বৃষ্টির গতি। অবনীবাবু বুঝলেন জোরে নয়। হাল্কা, ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

বর্ষার সময়। যখন তখন বৃষ্টি নামে। প্রতিবার রাস্তার ওপাশের ডোবাটা এই সময় জল, কচুরিপানায় টলমল করে। পিন্টুদের পুকুরের সাথে যুক্ত থাকায় প্রচুর মাছ আসে সেখানে।টাকি, রুই, খোলসা, কই। বিকেলে গ্রামের বাচ্চাগুলোর মাছ ধরার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পান অবনীবাবু। কথাটা মনে হতেই চেঁচিয়ে উঠলেন “বাচ্চাগুলো এলে গোটা কয়েক মাছ দিয়ে যেতে বলো তো। অনেকদিন ভাজা খাই না। আগে আমি ধরতাম, আর মা ভাজত। ঘি, মাছ ভাজা…” বলে অবনীবাবু হাসলেন। বেশ জোরেই। কিন্তু ওঘর থেকে কোনো প্রত্যুত্তর শোনা গেল না।

দুই

কথাটা অনুপমার কানে এসে পৌঁছালো না। সারাদিনই কিছু না কিছু বলতে থাকেন অবনীবাবু। আর সেই অনুযায়ী উত্তর দিয়ে যেতে হয় তাকে। কিন্তু আজ ও ঘরে বসে থেকে উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই। জিনিসটা পাওয়া না গেলে আজ রাতেও ঘুমোতে পারবেন না।

ছাল বাকল ওঠা মান্ধাতা আমলের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোন থেকে নম্বর বের করে কারো সাথে কথা বলা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কানে ঠেসে না ধরলে কিছুই ঠিকঠাক শোনা যায় না। ছেলে অর্কপ্রভ অনেকবার বলেছিল টাচ ফোন কিনে দেবে। অনুপমা প্রত্যেকবারই প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেছেন ” তিনকাল গিয়ে এককাল আছে। এখন আর টাচ ফোন দিয়ে কী করব?”

অর্ক মাকে বোঝানোর চেষ্টায় বলেছে ”অনেক সুবিধে হয় তাহলে। অ্যানড্রয়েড ফোন দিয়েই আজকাল সব কাজ হয়”

অনুপমা প্রতিবারই প্রবল আপত্তি জানিয়ে না করে দিয়েছেন “এর মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝব না। যেভাবে চলছে বরং সেভাবেই…”

অর্ক আর কথা বাড়ায়নি। সে কথা বাড়াতে পছন্দ করে না। ছোটবেলা থেকে প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন গম্ভীর প্রকৃতির অর্কপ্রভ বাইরের নামি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বি.টেক। এখন চাকরি সূত্রে বছর সাতেক ব্যাঙ্গালোরে বউ বাচ্চা নিয়ে সেটেলড। দেড় বছর আগে যখন ঘটনাটা ঘটল চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে চেয়েছিল। অনুপমা বাধা দিয়ে বলেছিলেন “বললাম তো আসতে হবে না। আমি সামলে নিতে পারব। তাছাড়া চুন্নি, রামলাল তো আছেই”

অর্কপ্রভ আসেনি। ফোনের ওপাশ থেকেই যতটা পারা যায় দায়-দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে। অনুপমা লোহার মতো শক্ত কী-প্যাড গুঁতিয়ে ফোন লাগালেন। দু’বার রিং হয়ে কেটে গেল। তিন নম্বর বার অর্ক ফোন তুলে বলল “মিটিং-এ আছি। বেরিয়েই কল ব্যাক করছি”। আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না অনুপমা।

ভেবেছিলেন ছেলেকে বলে যদি কিছু উপায় বের করা যায়। অনুপমা আবার চেষ্টা করলেন সুশান্তকে। সুইচড অফ। ওর দেওয়া দুটো নম্বরেই কাল থেকে অসংখ্যবার ট্রাই করেছেন। কোনোটাতেই পাচ্ছেন না। এসব ভাবতে ভাবতে আচমকা একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। সুশান্তর ওখানে গিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়? তাহলেই তো সমস্যা চুকে যায়। টেবিলের উপর রাখা কার্ডটা ভালো করে দেখলেন। কন্ট্যাক্ট নাম্বরের নীচে ঠিকানা লেখা। ছয় মাস আগে অর্ক যখন এসেছিল তখন দু’বার গিয়েছিলেন তার সাথে। চিনতে অসুবিধে হবে না।

পরক্ষণেই মাথায় আসল অবনীবাবুর কথা। ঘরে একা রেখে যাবেন কীভাবে! আরেকটু পরেই চুন্নি কাজে আসবে। ওর উপর ভরসা করে রেখে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? এছাড়া আর উপায়ও বা কী! সুশান্তকে কবে ফোনে পাওয়া যাবে তার নেই ঠিক।  অতদূর থেকে অর্কও মনে হয়না বিশাল কোনো সাহায্য করতে পারবে। এর চেয়ে ভালো সশরীরে নিজে গিয়ে নিয়ে আসা। তাহলে অন্তত কিছুদিনের জন্য রেহাই।

অনুপমা মনস্থির করলেন চুন্নিকে রেখেই বেরোবেন। ও সমস্তটাই জানে। তাও আরও একবার বলে যেতে হবে। বাসন মাজা, কাপড় কাচার সাথে ওর আজকের এক্সট্রা কাজ হবে দাদুর সাথে বসে গল্প করা। অ্যাক্সিডেন্টে চোখ দুটো খোয়ানোর পর থেকেই অবনীবাবু রোজ জানালার দিকে মুখ করে ইজিচেয়ারে বসে পা নাচান। আশপাশ থেকে ভেসে আসা গ্রামের এক একটা শব্দ খুব মন দিয়ে শোনেন। শুকনো পাতা মারিয়ে যাবার শব্দই হোক বা বর্ষাকালে কাদা মাখা স্যান্ডেলের চটচট শব্দ। কোনো কিছুই কান এড়ায় না তার। চোখে দেখতে না পারলেও শব্দ শুনেই চলমান গ্রাম অনুভব করেন।

সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার পরই অবনীবাবুকে ধরে ইজিচেয়ারে বসিয়ে দেন অনুপমা। তারপর চা নিয়ে এসে নিজেও বসেন পাশে। সেই থেকে শুরু হয় কথা। সুপুরির খোল পড়ার আওয়াজ পেলেই অবনীবাবু শুরু করেন ছোটবেলায় কীভাবে সেটাকে টানা গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করতেন সেই গল্প।

“একজন খোলের উপর চড়ে বসত আর সামনের জন মাটিতে টেনে হিচড়ে এগিয়ে নিয়ে চলত” বলে অবনীবাবু হাসেন। অনুপমাও হোহো করে হেসে উঠেন।

সবচেয়ে মুস্কিল হয় নারকেল পড়লে। ঝুপ করে নারকেল পড়া মাত্রই অবনীবাবু নাড়ু খাওয়ার হাজারটা গল্প জুড়েন। সাথে বারবার খাবার আবদার। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করেন। শরীরের বয়স তেষট্টি হলেও তিনি আরও বেশি বুড়িয়ে গেছেন। মাথা ভর্তি পাকা চুল, কুচকে যাওয়া চামড়ার সাথে বাড়তি পাওনা বাতের ব্যথা। এত ধকল আর সইতে পারেন না। তবুও জান ঢেলে যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করেন একাত্তর বছরের এই বৃদ্ধ মানুষটার জন্য। এতগুলো বছর ধরে শুধু…

“দিদা ঝাঁটা কোথায়?” অনুপমা পেছন ফিরে দেখলেন চুন্নি এসে গেছে।

||তিন||

“তোর দিদা বকুলদের বাড়ি থেকে কখন ফিরবে?” অবনীবাবু প্রশ্ন করলেন।

“বলেছে সন্ধ্যা হবে”

“কটা বাজে এখন?”

“সাড়ে তিনটা”

“শুনেই বুঝেছিলাম”

“কী?” চুন্নি অবনীবাবুর দিকে তাকাল।

“বালতির আওয়াজ। পটলার বাবা এই সময় মাঠ থেকে ফেরে। কুয়োর পারে বসে সাবান ঘষে ঘষে স্নান করে।”

কী কান রে বাবা! চুন্নি মনে মনে ভাবল।

“আগে তো আমাকে আর পটলাকে এক সাথে বসিয়ে পিঠে সাবান ঘষে দিত। স্নান করাত” অবনীবাবু মুচকি হাসলেন। “ঝগড়ার পর থেকে আর কথা বলে না। উঠোনে তো বেড়াও দিয়ে দিল”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবনীবাবু বললেন ” যা মারটা ঢেলে দিয়ে আয়। গরুগুলো না খেয়ে আছে”

“দিচ্ছি”

“অল্প পোয়ালও দিস”

“আচ্ছা”

আচমকা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার তীব্র আওয়াজ। সাথে মেঘের ডাক।

“জানালাগুলো আটকে দে” অবনীবাবু চেঁচিয়ে বললেন।

এই সময় প্রচন্ড মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। বৃষ্টির জন্য অন্য কিছু শোনা যায় না। যদিও চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির আওয়াজ শোনার মধ্যে একটা মজা লুকিয়ে আছে। ছোটবেলায় মাটির বারান্দায় বসে কাগজের ছোট ছোট নৌকা ভাসিয়ে দেওয়ার খেলা চলত। বৃষ্টি থামলে দেখা হত কারটা কতদূর পৌঁছেছে। প্রতিবারই জিতে যেত শিমুল। এত জলের মধ্যেও কীভাবে যেন শুধু তার নৌকাই ডুবত না। অনেক চেষ্টা করেও তাকে কোনোবারও হারানো যেত না। অবনীবাবু শিমুলের অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন।

সেবার ঘোর বর্ষা। শিলাবতি নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পার ঘেঁষে ইতিমধ্যে অনেক ঘর জলের তলায়। অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রচুর লোকসান। নদী আয়তনে বেড়ে উপরে উঠে এসেছে অনেকটাই। গ্রাম জুড়ে সতর্কতা। পারে যাতে কেউ না যায়। শিমুলের বাবা সামান্য ভাগচাষী। তারও প্রচুর লোকসান হয়ে গেছে।

একদিন বিকেলে শিমুল এল। সঙ্গে ওমু আর টিটু। বলল মাছ ধরতে যাবে। শিলাবতির পাড়ে। বাড়িতে না জানিয়েই ভয়ে ভয়ে সেখানে পৌঁছল ওরা। চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। যেদিকেই চোখ যায় জল আর জল। পাড়ের বট, ডুমুর সব কোমর জলে দাঁড়িয়ে। জলে ভেসে যাচ্ছে ভাঙা বাড়ি ঘরের অবশিষ্টাংশ। নদীর এই ভয়ংকর রূপ দেখে ওরা তিনজন ভেবড়ে গেলেও শিমুল ধার বরাবর আরও এগোতে থাকল। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের কিছু বাড়িতে দেখা যাচ্ছে কুপি,হ্যারিকেনের আলো। তিন বন্ধু বলল আর যাবে না। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শিমুল তাদের বাড়ি চলে যেতে বলে ছিপ হাতে এগিয়ে যেতে থাকল সামনে।

পরদিন সকাল। তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। হঠাৎ দূর থেকে একটা হইহই শোনা গেল। অনেকেই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল শিমুলের বাবা সেই প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে খালি গায়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ছুটে যাচ্ছে। পেছনে তার দাদা, মা, গ্রামের আরও কিছু লোক। দুপুরে শোনা গেল শিমুলের লাশ পাওয়া গেছে। আগেরদিন সন্ধ্যায় মাছ ধরতে গিয়ে পাড়ের মাটি ভেঙে জলে ডুবে যায় শিমুল। বর্ষায় ফুলে ওঠা শিলাবতি সেই দেহ টেনে নিয়ে চলে যায় অনেকদূর। কিছু মাঝি লাশ দেখে খবর দেয় গ্রামে।

প্রচন্ড বৃষ্টিতে মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। শিমুলের বাবার সেই অসহায় চিৎকার কানে বাজে।

“একি! কাঁদছ কেন?” চুন্নি অবাক হল।

অবনীবাবু নাক টেনে একটু কেশে নিয়ে বললেন “শিমুলটা মারা গেল। কেন যে আটকাইনি আমরা”

চুন্নি কী বলবে ভেবে পেল না।

দেখল চোখের কোণ বেয়ে এক বিন্দু জল গড়িয়ে এসে পড়ল ইজিচেয়ারের হাতলে।

চার

লোকগুলো দৌঁড়াচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন।  হাসপাতালের করিডোর।

আশপাশে বসে থাকা সমস্ত পেশেন্টের ভীড়,নার্সদের কোলাহল কাটিয়ে লোকগুলো এগিয়ে যাচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। স্ট্রেচারে শোয়ানো মানুষটার চোখ বন্ধ। মাথার পেছনে বাঁধা কাপড়ের টুকরো শুষে নিচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই বাঁচানো যাবে না।লোকগুলো দৌঁড়াচ্ছে।

“আরে দিদি চেপে বসুন না একটু। এত জায়গা থাকতে…”

পরের কথাটা অনুপমার কানে গেল না। সাইড দিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে প্রচন্ড গতিতে একটা অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে গেল। তাই শোনা গেল না। অনুপমা জানালার ধারে চেপে গেলেন। মহিলাটি পাশে এসে বসল।

বাসে উঠে চোখ লেগে এসেছিল একটু। তিনরাত ধরে ঘুমাতে না পারার ফল। একটা মানুষ অনবরত একই কথা বলে গেলে কে-ই বা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। তাই শরীরে হাজার ব্যথা, কষ্ট নিয়েও আজ সুশান্তর কাছে যেতে হচ্ছে।

শান্তি শব্দটা অনুপমার অভিধান থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অনেকদিন। বাসে উঠে চোখ লেগে আসা মাত্র আবার সেই আজেবাজে স্বপ্ন!  পরশু দিন অর্ক ফোন করে জানিয়েছিল ওর কথা হয়েছে ডক্টর চৌধুরীর সাথে। পরের মাসে একবার চেক আপ করিয়ে আনতে বলল।

জানালা দিয়ে শোঁশোঁ হাওয়া ঢুকে পেকে যাওয়া চুলগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনুপমা জানালার বাইরে চোখ রাখলেন। অনেকদিন আসা হয় না এদিকে। বাজার ঘাট সব রামলালই করে দেয়। তাই বাড়ি থেকে বের হতে হয়না বিশেষ। রামলাল কাজে ব্যস্ত। তাই দু’দিনের বাজার আগেই করে রেখে গেছে। নাহলে আজ ও-কেই পাঠানো যেত। ক্ষয়ে যাওয়া শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলতে হত না।

অবনীবাবুকে বাড়িতে একা রেখে কোথাও বের হন না অনুপমা। একান্তই দরকারে চুন্নিকে রেখে…। গ্রামের ঠাকুর বকুল মাস্টারের বাড়িতে মনসা পুজোর নেমন্তন্ন আছে। কথাটা বলে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। চুন্নি ঠিকঠাক সামলাতে পারছে তো? একরাশ দুশ্চিন্তা গ্রাস করল হঠাৎই। অনুপমা অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

“থাকেন কোথায়?” প্রশ্নটা পাশ থেকে এল।

সেদিকে না তাকিয়েই অনুপমা উত্তর দিলেন “নারায়ণগঞ্জ”

“বাপরে! সে তো অনেকদূর”

জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে অনুপমা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই

“ওখানে আমার মামাবাড়ি ছিল” বলে মহিলাটি হাসলেন।

অনুপমা আর কিছু বললেন না।

“সেই ছোট্টবেলা থেকে ওখানকার মাটি মেখে বড় হয়েছি। মামাবাড়ি গেলেই হ্যারিকেনের আলোয় গল্পের বই পড়তাম। এখন তো বোধহয় ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে।”

মহিলাটির ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি দেখে অনুপমা বুঝলেন অনেক পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে তার। মানুষ নস্টালজিক হলেই এভাবে হাসে।

“হ্যাঁ এসেছে”

“শেষ গিয়েছিলাম আট-ন বছর আগে। মামা মারা যাবার পর সব জায়গা জমি বিক্রি করে দাদারা শহরে চলে এল। তারপর আর যাওয়া হয়নি”

“ওহ”

অনুপমা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মহিলাটি আবার বলল “আচ্ছা গ্রামে কি এখনও সেই রেওয়াজটা আছে?”

“কিসের?”

“ঐ যে জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় শিলাবতির পাড়ে খাওয়া-দাওয়া, রাত কাটানো। কী যে মজা হত…!”

কয়েক মুহূর্ত ভাবতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো পরপর কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল চোখের সামনে।

নারায়ণগঞ্জে বিয়ে হয়ে আসার মাত্র কয়েকমাস হয়েছে তখন। অনুপমা শহরের মেয়ে। প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জে এসে প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধে হত। একদিন সন্ধ্যায় অবনীবাবু হাট থেকে বাড়ি ফিরে নদীর পারে রাত কাটানোর কথা বললেন। সাথে জানালেন খাওয়া দাওয়া ওখানেই হবে।

কথাটা অনুপমা ঠাট্টার সুরে নিলেও রাতে সত্যিই সেখানে বউ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অবনী তালুকদার। অনুপমা পরে জেনেছেন বছরের একটা দিন জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় প্রতিবছরই গ্রামের লোক জড়ো হয় সেখানে। নদীর পার দিয়ে গিজগিজ করে মানুষ। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বেলে তৈরী হয় রান্না।

সেদিন চারিদিকের হইহই কাটিয়ে অনুপমার চোখ গিয়ে ঠেকল মেঘহীন আকাশের থালার মতো গোল চাঁদটার গায়ে। নিজেকে উন্মুক্ত করে সমস্ত আলো ঢেলে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। পূর্ণিমার পূর্ণাঙ্গ চাঁদকে এত কাছে দেখে অনুপমার মনে হয়েছিল এক্ষুণি বোধহয় ছুঁয়ে ফেলা যাবে!

মাঝরাতে আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল বিকট এক জন্তুর আওয়াজে। নদীর পাড় দিয়ে সমস্ত মানুষ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঘাসের নরম বিছানায়। প্রচন্ড ভয় পেয়ে অনুপমা উঠে চুপচাপ বসেছিলেন। নদীর কুলকুল শব্দ, ঝিঁঝিঁর ডাকের মাঝে জেগে থাকা চাঁদটাকে অপূর্ব লাগছিল দেখতে।কিছুক্ষণ পর অবনীবাবু টের পেয়ে বললেন, “শেয়ালের ডাক এটা। দূরের জঙ্গলে আছে। ভয় পাবার কিছু নেই।”

কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি কাটেনি। ভেতর ভেতর ছিলই। অনুপমা কাছে চেপে এলেন। অনেক কাছে। অবনীবাবুর স্পর্শে কেমন যেন একটা সাহস পাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে।

খোলা আকাশের নীচে দুটো না-ঘুমানো মানুষ জোৎস্নার আলো মেখে পড়ে রইল সারারাত। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু সেই স্পর্শ! অনুপমা চোখ বন্ধ করলে আজও টের পান।

“কী হল বললেন না তো?”

মহিলাটির কথায় সম্বিৎ ফিরল।

“হ্যাঁ এখনও মানে…” অনুপমা কথাটা শেষ করতে পারলেন না।

“দেখি ভাড়াটা করবেন” কন্ডাকটর এগিয়ে এল। অনুপমা ব্যাগ থেকে দুটো দশের নোট বের করে বললেন “একজন”

“কোত্থেকে?”

“এভিনিউ রোড”

কন্ডাকটর থুথু লাগা টিকিট সমেত চার টাকা খুচরো ফেরত দিয়ে বললেন “সামনের দিকে এগিয়ে যান।” অনুপমা সিট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় পেছনে না তাকালেও বুঝতে পারলেন সেই মহিলা ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

পাঁচ

“মারা যাবে কেন? বললাম তো, সব বেঁচে আছে”। বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটা বলে পাশ ফিরে শুল চুন্নি। এই নিয়ে চার বার একই কথার উত্তর দিতে দিতে মাথাটা চটে গেছে।

অবনীবাবু নম্রভাবে বললেন “এত বৃষ্টি হল কিন্তু একটা ব্যাঙেরও ডাক শুনতে পেলাম না”

চুন্নি কোনো কথা বলল না। চোখের পাতা জুড়ে ঘুম ঘুম ভাব। এক হাত মাথার নীচে দিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে ও। ঘর অন্ধকার। অবনীবাবু খাটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আছেন।

ঝিঁঝিঁগুলো একনাগাড়ে কিছুক্ষণ ডেকে কয়েক সেন্ডেকের বিরতিতে আবার ডেকে উঠছে। সেই শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরময়। বর্ষাকালে ঝিঁঝিঁর ডাক আরও তীব্র হয়। রাত বাড়লে ডাকও বাড়ে অবনীবাবু মুচকি হাসলেন।

রাতের অন্ধকারে ঘরে বসে ঝিঁঝিঁর ডাক শোনায় যে কী আনন্দ! পড়া ফাঁকি মেরে দুই ভাই, দিদি-বোন সবাই একসাথে লুকোচুরি খেলার কথা মনে পড়ল অবনীবাবুর। বাবা ওই সময় তনুদের বাড়ি যেত আড্ডা দিতে। বারান্দায় বসে মা উনুনে সবে ভাত চড়িয়েছে। সেই সুযোগেই দুরন্তপনা শুরু। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ নাকে ধাক্কা মেরে বাড়িয়ে দিত খিদে। সেই জন্য আরও জোরে দৌড়।

একবার গোয়ালঘরের পেছনে লুকোতে গিয়ে দাদাকে সাপে কাটল। সে কী চিৎকার!কোনোমতে জানে বেঁচে গিয়েছিল। দাদা সুস্থ হওয়ার পর বাবা সব কটা ভাইবোনকে পরপর দাঁড় করিয়ে কাঁচা কঞ্চি দিয়ে পিটিয়েছিলেন। বাবা মারা যাবার পর কঞ্চিটা গোয়াল ঘরের বেড়াতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ করে সেই কঞ্চির কথা মনে পড়ল।খাটের থেকে উঠে মেঝেতে পা বাড়াতেই হাত লেগে কিছু একটা পড়ল। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল চুন্নির।

“কী হল? কোথায় যাচ্ছ?”

“গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখতে কঞ্চিটা আছে কিনা। অনুপমা ফেলে দেয় যদি…!”

“তুমি বসো। আমি দেখে আসছি”

অবনীবাবু আশ্বস্ত হয়ে খাটে হেলান দিলেন।

ক্লান্ত বিধ্বস্ত অনুপমা যখন ঘরে এসে লাইট জালালেন ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে। ভয়ংকর জ্যামের জন্য এত দেরি হল ফিরতে। সমস্ত শরীর টনটন করছে ব্যথায়। বাস যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে আরও অনেকটা হাঁটতে হয়েছে। চুন্নিকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। ধীর পায়ে এসে দেখলেন অন্ধকারে খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি।

অনুপমা ধীর কন্ঠে বললেন, “প্রসাদ খেয়ে আস্তে দেরি হয়ে গেল।”

অবনীবাবু তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না  “সব ব্যাঙগুলো কি মারা পড়ল নাকি। এত বৃষ্টি হল কিন্তু…!”

অনুপমা পাশের ঘরে এসে ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলেন। কয়েক সেকেন্ড উলটে পালটে দেখে গুঁজে দিলেন মেশিনটার ফুটোয়। ইউএসবি পোর্টে পেনড্রাইভটা ঢোকানো মাত্রই অসংখ্য ব্যাঙের ছন্দবদ্ধ ডাকে ভরে উঠল ঘর। অনুপমা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন সেই অন্ধকারের মধ্যেই অবনীবাবু হেসে যাচ্ছেন আপনমনে।

ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরের উপর দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল আচমকা। ব্যাঙের ডাক লোড করা পেনড্রাইভটা কাল থেকে খুঁজে না পাওয়ার জন্যই আজ সুশান্তর কাছে যেতে হল। বেন্টিং স্ট্রিটে ওর বিশাল স্টুডিও। ওখানেই এডিটিং আর সাউন্ড ডিজাইনিং এর কাজ করে । অনুপমা  রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে এভিনিউ রোডের এই টুবিএইচকে ফ্ল্যাটে চলে আসার আটবছর হয়ে গেল। জায়গা জমির ভাগ নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে তুমুল অশান্তি। শেষে অনুপমাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শহরে চলে আসার। অবনীবাবুকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলেও বারবার ফিরে চলে যেতেন সেখানে। বিক্রি হয়ে যাওয়া সাতপুরুষের ভিটেটাকে  ছুঁয়ে দেখতে চাইতেন। এভাবেই বেশকিছু বছর কাটল। কিন্তু দেড় বছর আগের সেই দুর্ঘটনা দুম করে বদলে দিল সব।

অনুপমা রান্নাঘরের লাইট জাললেন। শেল্ফ থেকে একটা বাটি নিয়ে কিছু নাড়ু ঢাললেন তাতে। ফেরার সময় কিনেছিলেন। লাইট অফ করে বেরিয়ে এলেন বাইরে।

দুর্ঘটনায় চোখ খোয়ানোর সাথে ব্রেনেরও কিছু পার্ট ড্যামেজ হয়েছিল অবনীবাবুর। অপারেশনের পর কাউকেই ঠিকঠাক চিনতে পারতেন না। শুধু উন্মাদের মতো নারায়ণগঞ্জের বহু পুরানো কথা আউড়ে যেতেন দিনরাত।

ডক্টর চৌধুরী বলেছিলেন মেমরি ডিসঅর্ডার। নতুন কিছুই মনে থাকবে না। পুরানো স্মৃতিই আঁকড়ে বেঁচে থাকবেন। এসব কেসে রিকভারির চান্স কম।

অবস্থা আরও খারাপ হল কিছুদিন পর। চোখের আড়াল হলেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। ঘরে আটকে রাখা যেত না।

অবস্থা দেখে ডক্টর চৌধুরীই বুদ্ধিটা দিলেন। সাউন্ড থেরাপি। রিকভারি হবে না কিন্তু পাগলামিটা অনেকাংশেই কমতে পারে।

অর্ক খোঁজ লাগিয়ে সুশান্তকে পেল। বিভিন্নরকম সাউন্ড মেকিং, ডিজাইনিং, ফোলি নিয়ে ওর কারবার। টুবিএইচকে ফ্ল্যাট সাউন্ডপ্রুফ করার জন্য চার দেওয়ালে লাগানো হল অ্যাকুস্টিক ফোম প্যানেল। গাড়ির হর্ন, শহরের কোলাহল, লোকের চিৎকার কোনোকিছুই আর ঢুকতে পারল না ভেতরে।

নাড়ুর বাটিটা অবনীবাবুর হাতে ধরিয়ে অনুপমা বললেন “সেদিন যেই নারকেলটা পড়ল। সেটা দিয়ে বানিয়েছি”

অবনীবাবু কোনো উত্তর দিলেন না। মুচকি মুচকি হাসলেন।

ঘরের চারিদিকে সেট করা সাউন্ড সিস্টেম থেকে ছিটকে বেরচ্ছে অজস্র ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝিঁর আওয়াজ। থ্রিডি সাউন্ড এফেক্টে তা যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যন্ত্রের কী অসীম ক্ষমতা! অনুপমা মনে মনে ভাবলেন।

পাঁচদিন ধরে বর্ষার সমস্ত আওয়াজ শোনানো হচ্ছে অবনীবাবুকে। এত বৃষ্টি অথচ ব্যাঙের ডাক নেই কথাটা বলে বলে মাথা খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই শরীরে হাজার কষ্ট নিয়েও অনুপমা আজ বেরোলেন।

প্রতিদিন অবনীবাবুর সাথে গ্রাম নিয়ে হাজার হাজার মিথ্যে কথা বলা অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে। চুন্নিও ব্যাপারটা জানে। সকাল হলেই পেনড্রাইভ পোর্টে গুঁজে দেন অনুপমা। এক একদিনের জন্য মার্ক করে রাখা এক একটা পেনড্রাইভ। সেগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাতে হয়। গ্রামের অনেক শব্দই নিপুণভাবে ডিজাইন করে দিয়েছে সুশান্ত। মোরগের ডাক, বৃষ্টির শব্দ, বালতির আওয়াজ, সাইকেলের বেল…। এসব শুনতে শুনতে অনুপমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হয় শহর নয়, এটা সত্যিই যেন সেই প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জ। মুখ ফস্কে অনেক সময় বেরিয়েও যায়। আজকে বাসের সেই মহিলাটার কথাগুলো মনে পড়ল অনুপমার।

অনেক রাত। অদ্ভুত একটা উত্তেজনায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার ভেতর অসংখ্য দৃশ্য চিলের মতো পাক খাচ্ছে। অনুপমা পাশ ফিরে  দেখলেন অবনীবাবু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন।

হাল্কা ভলিউমে ঝিঁঝিঁর ডাকে গমগম করছে ঘর। চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে কাঁচের জানালায়।

অনুপমা টের পেলেন অস্বস্তিটা পুরো শরীর জুড়ে হচ্ছে। জানালার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে উঠে পাশের ঘরে গেলেন। তারপর কাঁপা হাতে টেবিলের উপর রাখা বাক্সের ভেতর শেয়ালের ডাকের পেনড্রাইভটা খোঁজা শুরু করলেন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত