জ্ঞাতনামার কূলকিনারা

 

 

উপুড় হয়ে থাকা লাশটা দেখতে হচ্ছিল অনেক দূর থেকে। উৎকট গন্ধে কাছে ভিড়বে কে! নাকে হাত চেপে রাখতে হলেও, গিয়ে দেখি তুরাগের তীর লোকে লোকারণ্য। এ দেশে হাটে-মাঠে কি নির্জনে, কোথাও একটা কিছু হলেই হলো, শ’দুয়েক মানুষ জমতে লাগবে বড়োজোর পনেরো মিনিট। দেখার হুজুগে আমার মতো পুলিশ বা তার পোশাককে পাত্তা না দেয়া তখন সাধারণ ঘটনা। সাংবাদিকরা তাদের আদর করে বলেন ‘উৎসুক জনতা’। খবর পাঠকদের মুখে শুনলে মনে হয় উৎসুক জনতার কৌত‚হল মহান ব্যাপার। উৎসুক জনতা কেবল তাকিয়ে থাকে সামনের দিকে, যেখানে কিছু ঘটেছে বলে তারা জানে বা শুনেছে। কী হয়েছে জানতে চাইলে বেশিরভাগ সময়ে অর্ধেক মানুষ নির্ঘাত বলতে পারবে না। পায়ের নীচে বুট ডোবানো কাদা মাড়িয়ে আর হাতে মানুষ ঠেলে খানিক এগোই তবু।

সামনের অনেকটা জায়গায় কাদা আর কচুরিপানা ছাড়া কিছুই নেই। না উটকো মানুষ, না গভীর পানি। সেখানে কেবল দুর্গন্ধের দেয়াল। মনে পড়ে, সামান্য একটা ইঁদুর মরল বলে সেদিন রাতভর সারা বাড়ি উলট-পালট করে টেবিলের নীচের ড্রয়ার থেকে খুঁজে বের করতে হলো; তবেই শ্বাস নেয়া। আর এ তো আস্ত মানুষ! নাকে হাত কি টিস্যু চাপলেও লাভ হয় না। তবে লাশের খবর পেয়ে এসে তা দেখাটা জরুরি। পানিতে ডুবে ডুবে ধূসর-সাদায় অচেনা দেশের ম্যাপের মতো ছোপওলা মুখ আর কাঁধ-গলা দূর থেকে দেখারও বা কী! হর-হামেশা লাশ দেখতে দেখতে ওসব ততদিনে চোখে সয়ে যাওয়া। তবু দুর্গন্ধময় ঘন বাতাসে চোখ খোলা যায় না। যেন কেবল নাক নয়, চোখ-কান-মুখ এমনকি চামড়া দিয়েও ঠেলেঠুলে ঢুকে যাচ্ছে না-টানতে চাওয়া গন্ধ। গায়ের শক্তি দিয়ে কাদায় ডোবা বুট উঠিয়ে নিয়ে সামনে আবারো গেঁথে দিই। সবুজ-বেগুনিতে মাখামাখি কচুরিপানার বেষ্টনীর উপর দিয়ে এগোতে থাকি। সামান্য পুড়ে কালচে বা ভিজতে ভিজতে গাঢ় বাদামি হওয়া দু’একটা চ্যালাকাঠ পাতাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে। সেসব সরিয়ে আরেকটু এগোনো যায় বই কি। স্রোতের ঠেলায় ভাসতে ভাসতে কাঠের টুকরো আর পানার মতো মন ভুলে আটকে ছিল লাশটা। ঢেউয়ের তোড়ে মৃদু দুলতে থাকা শরীরটা সামান্য কাত হয়ে একবার এদিক তো আরেকবার ওদিক; যেন মৃত শরীরে পুনরায় জীবন দেয়ার চেষ্টা চলছে। ক্লান্তির কাছে হার মানা হাত-পায়ে এলোমেলো পেঁচিয়ে থাকা ছাপা শাড়ি হঠাৎ স্রোতের দিক ধরে ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। পিছুটানে আবারো ফিরে আসে, ডুবে ডুবে বর্ণহীন হয় কিংবা ভিজে হয় আরো গাঢ়। মুখটা এদিকে একটু ফিরতেই ফুলে ওঠা ঘাড়ের উপরে কানের সোনালি দুলটা দেখা যায়। ফিরে কনস্টেবলকে ডাকব ভাবলেও চোখ আটকে থাকে লাশের দুলতে থাকা কানের দুলে।

আগেকার দিনের নকশাদার মাকড়ি, বহু ব্যবহারে রঙটা সোনা আর পিতলের মাঝামাঝি। দু’এক মুহূর্তের জন্য দুর্গন্ধের অনুভূতি লোপ পায় আমার। কাদায় গর্ত করে করে নিজের অজান্তেই আরো তিন-চার পা এগোই। ভালো করে লক্ষ করতে না করতেই মাকড়িটা পানির নীচে অদৃশ্য, তারপর আবারো স্পষ্ট… হ্যাঁ, ওটা আমার খুব চেনা। নিজের ভাবনামতো কথা আমাকে দিয়ে বলাতে না পেরে প্রায়ই তিনি জেদি হয়ে উঠতেন। মাথার ঝাঁকুনিতে এক গুচ্ছ কোঁকড়া চুল তখন পেঁচিয়ে যেত কানের দুল দুটোতে। প্যাঁচ খোলার আগেই আমি তার ঘর থেকে বিদায় নিতাম। কারণ, খালাম্মার অবিশ্বাস আর রাগ চরমে ওঠার পরে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে থাকত না। গোঁ ধরে থাকা মানুষটার দিকে তাকালে মনে হতো তিনি তো বটেই, তার চুল-প্যাঁচানো মাকড়িদুটোও রাগে থরথর করে কাঁপছে। ওই কাঁপুনি দেয়া মাকড়ি চেনায় আমার ভুল হতে পারে না।

বুটের তলে কাদার গর্তগুলোকে চোরাবালির মতো বুজিয়ে দিতে দিতে কখন পিছনে সরে এসেছি জানি না। ফোনে শরিফের ছোটো ভাই আরিফকে আসতে বলি। ফোন রাখতেই দুর্গন্ধটা আবারো নাকে তীব্র ধাক্কা দেয়। ফোনে হুট করে মায়ের লাশ মেলার খবর পাওয়া অবিশ্বাস্য নিশ্চয়। আমি কী করে নিশ্চিত আরিফ বারবার জানতে চায়। তাই কানের দুলের কথাটা না বলে পারি না। ওটা ছাড়া বাকি শরীর-মুখ পানিতে ভাসা কিংবা ভাসতে ভাসতে ডোবা লাশের মতোই বৈচিত্রহীন; জন্মানোর ঠিক পরপর শত শিশুর শত সদৃশ মুখের মতো।

শরিফ মারা যাবার পরে বছরখানেক ওই বাড়িতে আমাকে হাজিরা দিতে হয়েছিল। যেতে যেতে শরিফের মায়ের উপরে মায়া পড়ে গেল। প্রায় অবশ্য ওই মায়ার কারণেই গিয়ে উপস্থিত হতাম। তবে বেশিরভাগ সময়ে যেতে হতো জরুরি তলব পেয়ে ছোটার মতো। আরিফের ফোন পেলে দুশ্চিন্তায় কাজকর্ম ফেলে দিতাম ছুট। শরিফের জন্য তার যে আফসোস, জানতাম আমাকে দেখলে তার কিছুটা কমে। তবে খালাম্মার সামনে যাওয়ার অর্থ ছিল একই কাহিনির শত রজনী। বহুবার বলতে বলতে প্রতিটা শব্দ মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই বেশিরভাগ সময়ে কাহিনি এগোত প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে…
‘কী কইতেছিলা যেন, শরিফ চৌরাস্তায় মোটর সাইকেলে হেলান দিয়া খাড়াইয়া আছিল, হ্যারপর?’ তিনি ঘটনার যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করতেন।

‘তারপর আর কী, ঢাকার দিক থেইকা আসা একটা বাস চৌরাস্তা পার হইয়া মাইমিনসিঙের রাস্তায় উঠল,’ আমিও আকস্মিক প্রশ্ন বুঝে নিয়ে উত্তর দিতাম।
‘হ্যারপর কইছিলা শরিফ বাসটারে থামাইল, তাই না?’
‘হ্যাঁ। প্রথমে চৌরাস্তার মাঝখানের ট্রাফিক পুলিশরে ইশারায় দাঁড় করাইতে কইছিল। সে লাঠি উঁচু কইরা ধরলেও বাসটা দাঁড়ায় নাই। কাটাইয়া চইলা যাওয়ার ধান্দা আছিল। কিন্তু সামনে গাড়ি-টারি থাকায় খাড়াইতে হইছিল। শরিফ তখন মোটর সাইকেল ফালাইয়া ধীরে ধীরে বাসের দিকে আগাইয়া গেছিল।’
‘তুমি ঠিক জানো, বাস শরিফই আটকাইছিল?’
‘জি, খালাম্মা, আমি ভালো কইরা খোঁজখবর নিয়াই কইতেছি।’
‘আচ্ছা, অন্য কোনো কারণেও তো বাসটা থামাইতে পারে, পারে না?’
‘তা পারে। কিন্তু শরিফ বাস থেইকা চান্দা তোলার জন্যই দাঁড় করাইছিল- এইটা আমি নিশ্চিত। ঈদের মাত্র এক দিন আগের কথা। বাসে ঠাসা এতগুলা মানুষ মিছা কতা কইতে পারে না, আপনেরে আগেও কইছি।’
‘আগে কী কইছ জানি না। আবার কও। শরিফ গিয়া ওদের কাছে ট্যাকা চাইল?’
‘জি। ট্যাকা চাইতেই ড্রাইভার কইল, ঈদ বইলা চান্দা আপনেরে দুইবার দিমু নিকি? কালিয়াকৈর থেইকা আসনের সমে তো নিলেন। ঢাকার রাস্তার ওই পাম্প থেইকা একটু খালি ত্যাল নিয়া ঘুইরা আইলাম, অহন আবার দিতে হইব? শরিফ তারে ধমকাইয়া কইল, মিছা কতা কবি না। ড্রাইভার কইল বাসের মানুষেরে জিগান। এক কথায় দুই কথায় তর্ক লাইগা গেলে শরিফ বাসের ভিতরে আইসা ড্রাইভাররে মারধোর শুরু করল। কইল, শালা, যতবার আমার এই চৌরাস্তা দিয়া যাবি ততবার ট্যাকা দিয়া যাবি।’
‘এই কথা শরিফ কইল! তুমি তো সেইখানে আছিলা না, কেমনে জানলা?’
‘অনেক মানুষ আছিল, খালাম্মা, বিশ্বাস করেন। তারা কইছে। চিল্লাপাল্লা দেইখা আশেপাশের বাসের ড্রাইভাররা নাইমা আইছে। বাসের কয়েকজন ধইরা মাইরা শরিফরে রাস্তায় নামাইছে। ঈদের সমে মানুষের বাড়ি যাওনের তাড়া, ঝামেলা দ্যাখলে তারা ধৈর্য রাখতে পারে না। ড্রাইভারদের সঙ্গে মিল্যা দিছে শরিফরে মাইর লাগাইয়া।’
‘হ্যারপর?’ খালাম্মার চোখ রক্তের মতো লাল হয়ে উঠত আলাপের এইখানে এসে। বিছানা থেকে ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠে আবারো গুছিয়ে বসতেন তিনি। কানের মাকড়িদুটো ঘন ঘন দোল খেত। মাকড়ির নীচ দিয়ে গলা বেয়ে ঘাম পড়ত ঘাড়ে।
‘কও, কও হ্যারপর কী হইল?’
‘কী আর, শরিফের কাপড় ছিঁড়তে টাইম লাগে নাই, হাত-পা ভাঙতেও। কিছুক্ষণের মইদ্দে শরিফের মুখটাও চেনার উপায় আছিল না। জানেন না, মাইনষে তো শরীরের মধ্যে আস্ত একটা জিঘাংসা নিয়া বেড়ায়, জুতমতো কাউরে পাইলে আচ্ছা কইরা পিটাইতে মন চায়। তাই উপস্থিত মানুষগুলা যে যার মনের খিদা মিটাইয়া নিছে।’
‘আহ্হা…আহা রে আমার শরিফ, কত্ত শখ কইরা বাপে নাম রাখছিল…’ হাতে মুখ ঢেকে শরিফের মা বিছানায় শুয়ে পড়তেন এটুকুর পর। ঘরের ফ্যানটা বাড়িয়ে দিয়ে ওই সুযোগে কোনোদিন চম্পট দিতাম আমি। কোনো কোনোদিন পারতাম না। অসহায়ত্বের কথাগুলো শোনার জন্য তার মাথায় হাত রেখে বসে থাকতাম। বিছানা ছেড়ে উঠে তিনি বলতেন, ‘আমার পোলাটা মানুষরে ভয় দেখাইয়া ট্যাকা আদায় করত, এইটা আমারে বিশ্বাস করতে হইব? কত কষ্ট কইরা মানুষ করলাম, মিছা কতা কইতে শিখাই নাই কুনোদিন। তার কাছে কুনো ট্যাকা চাই নাই, খালি চাইছি মানুষ হউক। সে ক্যান তোমার মতো হইতে পারল না, বাবা? তোমারই তো বন্ধু আছিল, একসঙ্গেই তো তোমরা আইলা এই লাইনে। কী থেইকা কী হইয়া গেল কও দেখি…’
এটা ঠিক, কাছাকাছি সময়েই চাকরি শুরু করেছিলাম আমরা। শরিফ গেল ট্র্যাফিকে, আমি থানায়। সে অবশ্য পরে বলেছিল, ‘তুই যখন ঘুষ খাবি না, চান্দাও তুলবি না, তাইলে পুলিশে আইলি কী করতে? আজাইরা কুনো অফিসে কেরানি হ গিয়া।’ আমাকে কিছু বলতে না দেখে সে হেসেছিল, ‘তোর কথা বাদ। আমি যা চাইছি, তা-ই পাইছি, বুঝলি?’ শরিফের এই সমস্ত কথা বলে আমি খালাম্মাকে যুক্তি দিতে পারতাম। কিন্তু কখনো দিইনি।
তিনি গুনগুনিয়ে কাঁদতেন। আমি তার কোঁকড়া চুলে বিলি কাটতাম। কখনো আমার একটা হাত ধরে তিনি ডুকরে উঠে বলতেন, ‘তুমিই আমার সন্তান, বাবা, তুমিই আমার শরিফ। মনে রাইখো, শরিফ খারাপ হইয়া গেছিল এইটা আমি বিশ্বাস করি না।’ আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু তিনি আমার মুখ থেকে শুনতে চাইতেন, ‘বলো, তারা অন্যায়ভাবে পিটাইয়া মারছে আমার ছেলেরে, বলো, মারে নাই?’ তার জিদের সামনে কোনোদিন মিনমিন করে বলতাম, ‘অন্যায়ভাবে মারছে ঠিকই, খালাম্মা, কিন্তু শরিফের দোষ আছিল।’ আমার কথার পিঠে তাকে উন্মাদের মতো মনে হতো। মাথার চুল থেকে এক ঝটকায় আমার হাত সরিয়ে দিতেন। লাফিয়ে উঠে বলতেন, ‘এতগুলা মানুষ মিল্যা বিনা বিচারে একজনরে পিটাইয়া মারলে দোষ হয় না?’ তার শরীর থরথর করে কাঁপত। তার কানের মাকড়ি কাঁপত। আমার উপস্থিতি তিনি আর গ্রাহ্য করতেন না তখন। হাতদুটোয় শক্ত মুঠি করে উদ্ভ্রান্ত চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। দেখলে মনে হতো সন্তানের হন্তারকের প্রতিচ্ছবি তিনি মেঝেতে খুঁজে চলেছেন।

‘কই, কোথায়? কোথায় আম্মা?’ মোটর বাইকের শব্দ বন্ধের সঙ্গে সঙ্গেই আরিফের কান্নামেশানো গলা শুনতে পাই। তার প্রশ্ন কানে আসে চিৎকারের মতো অথচ অস্পষ্ট। লাশের দিকে না গিয়ে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না শুরু করে। অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে, ‘তিনদিন হইল আম্মার খোঁজ নাই। আমি সারাদিন ঘুইরা ঘুইরা খুঁজতেছি। এত্ত দেইখা-শুইনা রাখতাম, তারপরেও নদীর কিনারে কেমনে গেল কে জানে। মাইনষে কয় মাথা খারাপ মহিলা, কই না কই চইলা গেছে, আর পাওয়া যায় নেকি! আম্মার মাথা খারাপ আছিল না, ভাই, আপনে তো জানেন।’
‘আমি জানি,’ আরিফকে সান্তনা দিই, ‘আমি তো সবই জানি রে, ভাই।’
আঙুলের ইশারায় আটকে থাকা লাশটা দেখালে আরিফ সেদিকে ছুটে যেতে চায়। পিছন থেকে টেনে ধরি। তবে না-ধরতেই মনে হয় কিছু একটা যেন থামিয়ে দেয় তাকে। যা হোক, লাশটা তুলে আনা তখন জরুরি। দুপুরের চড়া রোদ মাথায় নিয়ে শত মানুষ নাকে হাত চেপে দাঁড়িয়ে। খানিক পরে আরিফের হাতও তার নাকের উপরে গিয়ে শক্ত হয়ে বসে। কাঁদতে কাঁদতে বারকয়েক বমি ঠেকায় সে। তিন জন কনস্টেবলকে বলি লাশটা উঠিয়ে আনতে। কৌতূহলী আরিফ জুলজুল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কনস্টেবলদের মধ্যে দুজন লাশের চার-পাঁচ ফুটের মধ্যে যেতেই বমি করে ফেলে। আরেকজন বমি ঠেকাতে ঠেকাতে পিছন দিকে হাঁটা শুরু করে। আমার ধমকে কোনো কাজ হয় না। লাশের কাছাকাছি যেতেই যেন তাদের হাত-পা অবশ হয়ে আসে। কোনোমতে ফিরে এসে সামনের জনসমাগমের দিকে তাকিয়ে একজন বক্তৃতার ভঙ্গি করে বলে, ‘আসেন না, ভাই, হাত লাগান কেউ, তার আহ্বানে উৎসুক জনতার মধ্যে আলোড়ন দেখা যায়। ম্যাজিকের মতো দ্রুত ভিড় হালকা হয়। মুহূর্তে কে কোনদিকে ছুটে চলে যায় বলার উপায় নেই। সরল লোকেরা পালালেও কিছু অনঢ় কিসিমের মানুষ এক হাত নাকে আর এক হাত কোমরে রেখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারা যে এগিয়ে আসবে না সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত, আবার তামাশা দেখার লোভটা তাদের জন্য সামলানো কঠিন। তাদের মধ্যেই কারো গলা শোনা যায়, ‘এইটা মেথরের কাম। তাদের কাউরে ডাকেন না! আরেকজন আগবাড়িয়ে বলে, ‘আমি কাছে থেইকা একজনরে ডাকতে পারি।’ আমি সায় দিলে সে মেথর ডাকতে চলে যায়। খানিক পরে হাঁটু অব্দি উঁচু করে লুঙ্গি বাঁধা খালি গায়ের এক লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে। খর্বাকৃতি লোকটি কী করে আস্ত একটা লাশকে ফুট পাঁচেক উঁচু পাড়ে টেনে ওঠাবেÑ আমার মাথায় ঢোকে না। শেষবার পানের নেশার ঘোর থেকে তখনো বেরোয়নি মানুষটা। একটা টাল খেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে যে সে পারবে। তাকে দেখে বোঝা যায় কোনো কাজেই তার ‘না’ নেই। বাদামি ধাঁচের অযত্নে বেড়ে ওঠা এক মাথা উস্কোখুস্কো চুল ঝাঁকিয়ে সে কেবল এক বোতল বাংলা মদের আব্দার করে। আমার প্রতিক্রিয়ার আশায় ময়লায় ঠাসা নখ দিয়ে খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে ঢাকা থুঁতনি চুলকাতে থাকে। আমি পাঁচশ টাকার নোট বের করে তার হাতে দিই। কোমর থেকে পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটা নোটের সঙ্গে গুছিয়ে আবারো যত্ন করে গুঁজে রাখে সে। তারপর এতটুকু সময় নষ্ট না করে লুঙ্গিতে মালকোঁচা মেরে পানির দিকে এগোতে থাকে। সে-ই ছিল একমাত্র মানুষ যে সেখানে আসার পর থেকে একবারও নাকে হাত চাপা দেয়নি। আমি তার কথা ভাবি, অভ্যাস নাকি নেশার প্রভাব? যা হোক, সোজা গিয়ে সে লাশটা ঠেলে প্রথমে তীরে নিয়ে আসে। সমবেত লোকজন গন্ধের তীব্রতায় পিছনের দিকে একযোগে সরে যায় কিছুটা। আমি এগোই, সঙ্গে আরিফও। ফুলে উঠলেও, কাছে থেকে খালাম্মার মুখ আমি তখন অনেকটা ধরতে পারি। আগের দেখা তার বিভিন্ন মুখভঙ্গি পানিতে ডোবা বিকৃত মুখ ছাপিয়ে আমার চোখের সামনে নাচানাচি করতে থাকে। তিনি আমার মুখে ছেলের অপমৃত্যুর কাহিনি শুনতে ডাকতেন নাকি আমাকে দেখতে ডাকতেন, আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। একসময় বিরক্ত হয়ে যাওয়া বন্ধ করেছিলাম। ভুলে থাকার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু গাজিপুর চৌরাস্তা দিয়ে যতবার গেছি, শরিফের কথা মনে পড়েছে। অবধারিতভাবে তখন খালাম্মার কথা ভাবতে ভাবতে আমি জাগ্রত চৌরঙ্গীর দিকে তাকিয়েছি। অস্ত্র আর গ্রেনেড হাতে মুক্তিযোদ্ধার সাদা ভাষ্কর্যের দিকে তাকিয়ে আমি ভেবেছি, মুক্তিযুদ্ধে কত মানুষ পঙ্গু হয়ে ফিরেছে, কত মানুষ খুন হয়েছে… ওই পঙ্গুত্ব, ওই মৃত্যু কত গৌরবের! আর তার ঠিক নীচে শরিফ যখন শরীরের সমস্ত হাড় ভেঙে ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিল, তা ছিল কতটা লজ্জার!
‘কেউ একজন হাত লাগান না, পাড়ে উঠামু ক্যামনে?’ মেথরের চিৎকারে ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসি। লোকজন আরো পিছনে সরে যায়। পিছনে তাকিয়ে দেখি আরিফ আপ্রাণ চেষ্টায় বমি ঠেকাচ্ছে। কনস্টেবলদের মতো হরহর করে বমি করা থেকে অন্তত নিজেকে বাঁচাতে পারছে বলে মনে হয়। চোখের পানি নাকের পানি এক করে বলে, ‘আম্মার মুখের পানের গন্ধ, চুলের নারকেল তেলের গন্ধ মনে আসতেছে। কিন্তু এই গন্ধ নিতে পারতেছি না, ভাই।’ লালাভরা মুখে আরো কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে, মাঝেমধ্যে শুধু ‘আম্মা’ শব্দটা বোঝা যায়। কাউকে এগোতে না দেখে শেষে নিজেই যাই। মেথর নদীর দিক থেকে ঠেলে দেয় আর আমি টেনে তুলি। খালাম্মার শরীরে হাত দিতেই গন্ধের অনুভ‚তি চলে যায়, মনে হয় তার গলা শুনতে পাচ্ছি, ‘মনে রাইখো, তুমি আমার সন্তান।’ কনস্টেবল এগিয়ে আসে, ‘লাশ নিতে কি ভ্যান আনব, স্যার?’ আরিফের করুণ অবস্থা দেখে তাকে চলে যেতে বলি। বলি, ‘লাশ থানায় যাবে। তুমি দাফনের ব্যবস্থা করো গে, যাও।’ সে মোটর বাইকের দিকে এগোয়। বছরের পর বছর শত লাশকে লাশ বলার পরেও তখন ‘লাশ’ কথাটা উচ্চারণে মুখে এত বাধে কেন জানি না। তবে ওখানে উপস্থিত সবার কাছে ওটা লাশই বটে। আচ্ছা, আরিফের কাছেও কি ওই বিকৃত লাশটা কেবলই লাশ? অন্যমনষ্ক হয়ে বাঁশের চাটাইয়ে প্যাঁচানোর আগমুহূর্তে খালাম্মার কানের মাকড়িতে পেঁচিয়ে থাকা কচুরিপানার কালচে শিকড় সরাই। দুলটা আঙুল দিয়ে নেড়ে দেখি একটু; ছুঁতেই কাদা সরে চকচকে সোনালি ঝিলিক। এভিডেন্স তালিকায় ছবি রেখে আরিফের হাতে তুলে দেব। কেন যেন বারকয়েক আঙুল দিয়ে খামোখা দোলাই দুলটা। ছোঁয়া পেয়ে ওটাও জীবিতের মতো অর্ধবৃত্তাকার দোল অনুসরণ করে। দোলা বন্ধ হলে চাটাই টেনে দিই মুখের উপরে। পা ঝুলিয়ে ভ্যানের কোণে বসি। মোটর বাইকটা নিয়ে কনস্টেবলকে থানায় যেতে বলি। ভ্যান রওনা দেয়ার পরেও আরিফের কোনো সাড়াশব্দ পাই না। পিছনে তাকিয়ে দেখি বাইকের উপরে মূর্তির মতো বসে আছে। দাফনের ব্যবস্থার জন্য তাড়া দেব নাকি আরেকবার? ভাবলেও কেন যেন পকেট থেকে ফোন বের করতে ইচ্ছে হয় না। প্রায়ই লাশ দেখতে অভ্যস্ত আমারো কখনো দেখি লাশের পাশে বসে অবশ অবশ লাগে। আরিফ হঠাৎ পিছন থেকে এসে ধুলো উড়িয়ে ভ্যানের পাশ দিয়ে চলে যায়। যেতে যেতে ছড়িয়ে পড়া গন্ধের বাতাসে একটা হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিয়ে যায়। খালাম্মার সঙ্গে জড়ানো আমার বিভিন্ন স্মৃতিতেও একটা মন্থন ঘটে। ভাবতে থাকি কোনটা আগে কোনটা পরে। ভাবতে ভাবতেই থানার গেট উপস্থিত। লাশকে তখন নম্বর আর পরিচয় দেয়ার পালা; আমার জন্য নতুন কিছু নয়।
চাটাই সরিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে প্রথমে কানের মাকড়ি দুটো খুলে নিই।

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত