| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

গন্ধ

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comসকাল থেকেই একটা গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে। গন্ধটা কীসের, বুঝতে পারছেন না অনিমেষ। বসিরহাটে থাকাকালীন দেখতেন বুড়িদির মা খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার সময় উনুনে কাঠ গুঁজে দিতেন। সেই পোড়া কাঠের গন্ধের মতো? নাহ্। ছোটবেলায় তাঁরা খেলার মাঠের ধারে শীতের সন্ধ্যায় পাতা জ্বালিয়ে হাত-পা সেঁকে নিতেন। সেইরকম গন্ধ? ঠিক তাও নয়। কেমন যেন ঝাঁঝালো। গন্ধটা ঘন হয়ে নাকে এসে ঢুকছে। দম আটকে আসছে তাঁর। আশেপাশে দৃষ্টি পেতে রেখে চোখ ঘোরান অনিমেষ। কোথাও কিছু পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন নেই। বেলা অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। তবু রয়েই গেছে গন্ধটা। একইরকম তীব্র।

সরমা, দুধ পুড়ছে নাকি রে?

না তো কাকু। দুধ তো আসেইনি। সতুদা আজ ওবেলা দুধ দেবে বলেছে।

তাহলে কি ওভেনে ভাতের মাড় পড়ল? অনিমেষ পোড়া গন্ধের উৎস খুঁজছেন।

ভাত কখন রান্না সারা! গ্যাস মুছে এখন জামাকাপড় মেশিনে দিলাম। কাচতে হবে।

তাহলে কীসের গন্ধ রে?

কই, আমি তো পাচ্ছি না! ও কাকিমা, তুমি কোনও গন্ধ পাচ্ছ?

কীসের গন্ধ?

কী জানি। কাকু বলছে গন্ধের কথা।

কাছাকাছি এসে নাক শুঁকে শুঁকে দেখেন মালা। কোনও গন্ধই তাঁর নাকে ধরা দেয় না। অনিমেষের দিকে চোখ সরু করে দেখেন তিনি। তারপর বিরক্ত মুখে চোখ পাকিয়ে বলেন, সারাদিন তো কোনও কাজ নেই। তাই গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছেন! একাকিত্ব থাকলে ওসব হয়, বুঝলি সরমা। তুই তোর কাজে যা। যত্তসব!

সরমা ফিক করে হেসে সরে যায়। কথাগুলো মালা খুব জোরে বলেননি। তবে এত আসতেও বলেননি যে অনিমেষের কানে পৌঁছবে না।

একাকিত্ব! শব্দটা বেশ ভালো লাগে অনিমেষের। বাইরের দিকে চোখ রেখেই মনে মনে তিনি মালাকে তারিফ করেন। দারুণ বলেছ মালা। একাকিত্বই আমার ভালো লাগে। এই জায়গাটায় সারাদিন একা-একা বসে নানা কথা ভাবি। চমৎকার কেটে যায় সময়। ও তুমি বুঝবে না। নিজেকেই তিনি এসব কথা বললেন। তারপর গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন।

অনিমেষ একজন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ। অন্তত তিনি নিজেকে সেরকমই মনে করেন। সংসারের দায়-দায়িত্ব তাঁর কিছুই নেই এখন আর। একসময় ব্যবসা করতেন। নিজের একটা ছাপাখানা ছিল। ট্রেডল মেশিন। রমরম করে সেই ব্যবসা চলত। এলাকায় ছাপাখানা মানে তাঁর ‘মডার্ন প্রেস’। স্কুলের প্রশ্নপত্র, লিটল ম্যাগাজিন, ছোটখাট বই, লিফলেট, রাইটিং প্যাড, ভিজিটিং কার্ড, কী না ছেপেছেন! তারপর সেই মেশিনের কাজও ক্রমশ কমে এল। ডিটিপির চল শুরু হল। বাজারেই বসে গেল দু-দুটো ডিটিপি মেশিন। দুজন অল্পবয়সি ছেলে বাজারের মধ্যে কম্পিউটার নিয়ে কাজ শুরু করল আলাদা আলাদা ভাবে। ওদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও টের পেতেন অনিমেষ। আর সেই প্রতিযোগিতায় তাঁর প্রেস ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে লাগল। এর সঙ্গেই জেরক্স অফসেট এল। ‘মডার্ন প্রেস’ আর মডার্ন রইল না। ডিটিপিই তার গায়ে প্রাচীন প্রিন্টংয়ের ছাপ লাগিয়ে দিয়েছিল। সেসময় ট্রেডল মেশিনে খুব-একটা ছাপার কাজ হচ্ছিল না। তিনিও ক্রমশ প্রাচীন হয়ে যাচ্ছিলেন সম্ভবত। সময়ের সঙ্গে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না।

মাঝে মাঝে খবরের কাগজে নানা রঙের লিফলেট থাকে। ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন ব্যবসার নানা ঘোষণা ও সুবিধাপ্রাপ্তির প্রলোভন লেখা। কাগজের ভাঁজে দিয়ে দেয় কাগজওয়ালা। সেসব ট্রেডল মেশিনে ছাপা নয়। অফসেটে ছাপা। বোঝেন তিনি। আজকাল বাড়ির বাইরে বের হন না অনিমেষ। তাই বাইরের খবরা খবরও তেমন পান না। তাই লিফলেট বা এই জাতীয় কিছুও ট্রেডল মেশিনে ছাপা হয় কিনা, জানেন না তিনি।

খবরের কাগজের ছেলেটা ভোরের আলো ফুটতেই অদ্ভুত কায়দায় কাগজ পাকিয়ে ছুঁড়ে মারে। আর অবধারিত ঘরের দরজায় এসে ধাক্কা খায়। অনিমেষ প্রতিদিনই ভোরে উঠে পড়েন। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দিনের সূচনা দেখেন। ঘুমন্ত রাত শেষ হয়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। একটু একটু করে আলো এসে মুছে দিচ্ছে আবছা অন্ধকার। তখনই দেখেন এই কাগজ ছুঁড়ে-দেওয়ার কৌশল। সাইকেল থেকে পা না নামিয়ে, ধীর গতিতে চালাতে চালাতেই কী সুন্দর করে ছেলেটা ছুঁড়ে মারে পাকানো কাগজ! খুব কমই ভুল জায়গায় এলিয়ে পড়ে। এও এক আর্ট। গোটা জীবনটাই একটা আর্ট। যারা যত দ্রুত এই আর্ট রপ্ত করতে পারে, তারা তত ভালোভাবে টিকে থাকে। অনিমেষ ইদানিং এসবই ভাবেন। আরও নানা ভাবনা তাঁর মাথায় পাক খায়।

প্রায় সারাদিনই দোতলার বারান্দার এক কোণে ইজিচেয়ারে বসে থাকেন তিনি। তাঁর স্ত্রীর সুগার আছে। প্রেশারও আছে। আরও এটা-সেটা আছে। যেমন মাঝে মাঝে গ্যাস বা অম্বল হয়। এই সমস্তের জন্য নিয়ম করে ওষুধ খান। তাছাড়া যতই সর্বক্ষণের কাজের মেয়ে সরমা থাকুক, সংসারে কাজের অভাব নেই। তাই নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন মালা। অথচ অনিমেষের কোনও কাজ না-থাকার মতোই কোনও রোগও নেই। অন্তত তেমন কোনও রোগ ধরা পড়েনি। আর নেই বলেই ওষুধ খাবার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে সময় কাটানোর অবকাশও নেই তাঁর।

অনিমেষকে যে সংসারে কোনও কাজ করতে হয় না, তার কারণ তাঁকে ভরসা করে কেউ কোনও কাজের কথা বলে না। তাই সারাদিন ভাবেন। শুধু ভেবেই যান। ভেবে ভেবে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন তিনি। যেমন গরমকালটা আসে গুটিগুটি পায়ে। তবে আচমকা বেড়ে যায় তার আধিপত্য। ছোটবেলায় দেখতেন তাঁদের পাড়ার পুলকদা ডুবসাঁতার দিয়ে অনেকটা যেতে পারত, তারপর হঠাৎই ভুস করে মাথা তুলত জলের ওপরে। সেইরকম ভাবেই আচমকা গরম এসে মাথা তুলে দাঁড়ায় যেন। আবার শীত আসে কারও হাত ধরে। হয় নিম্নচাপের বৃষ্টি, নয়তো মেঘলা আকাশের পিছু-পিছু। কালীপুজো শেষ হয় আর শীত কার্তিক মাসের পায়ে পায়ে এসে হাজির হয়। অঘ্রাণ মাস থেকে জানান দেয় ‘আমি আছি, আমি আছি’। বর্ষা আবার আসে কিশোরী মেয়ের মতো নেচে নেচে। তার উপস্থিতি টের পাইয়ে দেয়। মেঘের ওড়াওড়ি আর হাওয়ার দাপটের সঙ্গে বৃষ্টি আসে।

বৃষ্টির কথা মনে পড়লে বা বৃষ্টি দেখলেই কিশোরী বৃষ্টির কথা মনে পড়ে তাঁর। কিশোর বয়সে বৃষ্টির হাত ধরে ছুটে ছুটে চলে গিয়েছিলেন অনেকটা পথ। মাঠের আল ধরে। ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘ আকাশে। পুজোর ছুটিতে বলাইয়ের মামার মেয়ে বৃষ্টি এসেছিল তাদের বাড়িতে। বলাইদের বাড়িতে প্রতিবছর দুর্গাপুজো হত। সেইবারই প্রথম এসেছিল বৃষ্টি। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল তার সঙ্গে। দুর্গা পুজো সবে শেষ হয়েছে। লক্ষ্মীপুজোর আগে বৃষ্টি ফিরে যাবে বাবা-মার সঙ্গে। ফেরার আগের দিন ওভাবে ছুটেছিলেন দুজনে। ফিরে আসার সময়ও হাত ধরাধরি করে ফিরেছিলেন।

তারপর কীভাবে যেন সবাই একসাথে বড় হয়ে গেলেন। অনেক বছর বাদে এক পুজোয় বৃষ্টি আবার এসেছিল। সঙ্গে তার কচি ছেলে। একটু তাড়াতাড়িই বৃষ্টির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অবাক হয়ে অনিমেষ জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোর বিয়ে হয়ে গেল? ছেলেও হয়ে গেছে?

বিয়ে হবে না তো কি? তুমি তো কিছুই বললে না। তাই বিয়ে করে ফেললাম। বলেই খিলখিল হাসি।

কথাটা মজা করেই বলেছিল হয়তো বৃষ্টি, কিন্তু শুনেই অনিমেষের বুকের ভেতরে একটা লোহার বল গড়িয়ে গিয়েছিল। আর কখনও বৃষ্টির সঙ্গে দেখা হয়নি। দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই আর। কেননা বসিরহাটের পৈতৃক বাড়িঘর ছেড়ে বিরাটিতে চলে এসেছেন তাঁরা।

এই জমিটা কিনেছিলেন বাবার এক বন্ধু। রিটায়ারমেন্টের পর এখানে বাড়ি করে থাকবেন ভেবেছিলেন তিনি। এয়ারপোর্টের কাছে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে বিরাটির এই জমির সন্ধান পেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ের কঠিন অসুখ ধরা পড়ার পর অনেক টাকার দরকার পড়েছিল। তখনই অনিমেষকে জমিটা কিনে নিতে বলেছিলেন তিনি। অনিমেষ জমিটা কিনে নিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, এখানে ছাপাখানার কাজ ভালো জমবে। তার আগেই ছাপাখানা নিয়ে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়ে গেছে। তাছাড়া কাকা নানাভাবে তাঁদের অপদস্ত করে চলেছেন। ঠাকুরদার জমিতে তাঁরও অধিকার আছে। কিন্তু সেই অধিকার নিয়ে এতটাই বাড়াবাড়ি শুরু করলেন কাকা যে, অনিমেষদেরই বসতভিটে ছাড়া করার উপক্রম হল। বাবা মারা গেছেন, সংসারে অনিমেষই তখন মাথা। তাই যা-কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হবে। কাকার সঙ্গে আলোচনার পরে শেষমেষ টাকা পয়সার রফা হল। বাবার জমানো টাকা আর রফার টাকা মিলিয়ে জমিটা কিনলেন, বাড়ি করলেন। তারপর একসময় অনিমেষরা চলে এলেন বিরাটিতে। পাকাপাকিই চলে এলেন। অনিমেষ অবশ্য বাড়ি তৈরির কাজ চলার সময়ই প্রেস করে ফেলেছেন। পারিবারিক ব্যবসা থেকে খুব-একটা আয় হচ্ছিল না। প্রেস, ছাপা এইসব নিয়ে তাঁর সুপ্ত একটা ইচ্ছে ছিল। সেই ইচ্ছে সফল হল বলে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। মাও তাঁর ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অনিমেষ মন-প্রাণ দিয়ে প্রেসের ব্যবসাটা করেছেন। ফলও পেয়েছেন।

ভাবনার মধ্যেই পোড়া গন্ধটা তীব্র হয়ে তাঁর নাকে এসে ঝাপটা মারে আবার। গভীর দুশ্চিন্তা নিয়ে দিন কাটে। একসময় বেলা গড়িয়ে বিকেল এল। দুপুরের খাওয়ার পরেও চেয়ারে বসেই ঝিমোন তিনি। আজ তাঁর ঘুম আসছে না। তীব্র গন্ধটা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। বহুদিন বাড়ির বাইরে পা রাখেননি সেভাবে। আজ তাঁর বেরোতে ইচ্ছে করছে। পায়জামার ওপর হালকা নীল ফতুয়া চাপিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। পায়ে চটি গলানোর সময় একবার মালা জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় যাচ্ছ এখন? হঠাৎ?

‘এই একটু বেরোচ্ছি।’ এটুকু বলেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন। তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, তাঁর বেরোনো নিয়ে মালার আর কোনও জিজ্ঞাসা নেই। আর কারও নেই। আর কারও বলতে অবশ্য সরমা। ছেলে কৃষ্ণনগরে পোস্টিং। এতদূর থেকে যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছিল না বলে সেখানেই থাকে বউ আর ছেলেকে নিয়ে।

(২)

জ্যেঠু, ও জ্যেঠু। ডাকটা শুনেই পিছন ফিরে দেখলেন চোদ্দ-পনের বছরের একটি ছেলে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁকেই ডেকেছে ছেলেটি, বুঝতে পারেন অনিমেষ। তবু সংশয় ঘিরে ধরে তাঁকে। আজকাল কেউ তাঁকে কাকু বা জ্যেঠু ডাকে না। এই ছেলেটির আশেপাশের বয়সের ছেলেমেয়েরা তাঁকে দাদু বলেই ডাকে। সংশয় নিয়ে একবার সামনের দিকে তাকান তিনি। দুজন মহিলা হেঁটে যাচ্ছেন। কাছাকাছি আর কেউ নেই। তাঁকেই যে ডাকছে নিশ্চিত হয়ে পেছন ফিরে দেখেন, ছেলেটি ঠিক তাঁর পেছেন এসে দাঁড়িয়েছে।

আপনাকে বাবা ডাকছে। আঙুল তুলে একটি হলুদ রঙের দোতলা বাড়ির দিকে দেখাল সে।

তোমার বাবার নাম কী? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন অনিমেষ।

বিপ্রতীপ সমাদ্দার। ঝটিতি জবাব দেয় সে।

বিপ্রতীপ! চেনা মনে হচ্ছে না তো! তাঁকেই-বা ডাকছে কেন বিপ্রতীপ নামের লোকটা? ছেলেটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন অনিমেষ। ছেলেটা ‘আসুন’ বলে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। তিনিও পিছন পিছন হাঁটতে থাকেন। দোতলার সিঁড়ির প্রান্তে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে যে, তাকে চিনতে পারছেন না অনিমেষ। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকেন তার দিকে। ভুল করে তাঁকে ডাকেনি তো! ভাবেন তিনি।

আসুন আনিমেষদা, ওপরে আসুন। কতদিন বাদে আপনাকে দেখলাম।

কতদিন বাদে! তার মানে আমার পূর্ব পরিচিত! বিস্মিত অনিমেষ। কিছুতেই মনে পড়ছে না কীভাবে পরিচিত। মনে মনে লজ্জিত হন তিনি। চেনা মানুষকে না-চিনতে পারা লজ্জার ব্যাপার বইকি! লোকটির বয়স আন্দাজ চল্লিশ-বেয়াল্লিশ হবে। তাঁর তিয়াত্তর। তবু তাঁকে দাদা বলে ডাকছে! এই বয়সের লোকেরা সাধারণত তাঁকে কাকা ডাকে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবছেন অনিমেষ।

বসুন দাদা। সোফা দেখিয়ে দিল সে। উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি, বুঝেছি। না-চেনারই কথা। আমি লাল্টু। লাল্টু সমাদ্দার। একবার পুকুরে ডুবে যাচ্ছিলাম। আপনি আমাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁচিয়েছিলেন।

লাল্টু! একটা সরু সুতোর মতো স্মৃতিরেখা ক্রমশ জেগে উঠছে। চকিতে স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠল। হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। আমি সেদিন চশমা চোখেই নেমে পড়েছিলাম। সেটা জলে ডুবে গেল, তবু তুলে আনতে পারলাম তোমাকে। হা-হা করে হেসে ওঠেন অনিমেষ। হাসে লাল্টুও।

বিপ্রতীপ তোমার ভালো নাম? তোমার ছেলে বলল। তখন তো বুঝতেই পারছিলাম না কে বিপ্রতীপ। তুমি কী একটা ছদ্মনামে যেন লিখতে।

সেসব ছাড়ুন দাদা। ছেলেমানুষী বুদ্ধি ছিল।

এখন বুঝি লেখোটেখো না আর?

না না। ওসব আমার জন্য ছিল না। এখন বুঝি। তখন অল্প বয়সের পাগলামো ছিল আর কি!

অনিমেষ ভাবলেন, সাহিত্য পত্রিকা করা এক ধরনের পাগলামিই বটে। বাবু মিত্ররাও পত্রিকা করত সে সময়। অনেকদিন টেনেছিল পত্রিকাটা। বাবু এখন একটু নাম-টাম করেছে নাকি। একদিন মালা বলছিল বাবুর কথা। পেপারে গল্প বেরিয়েছে বলে মালা শুনেছে কার কাছে। লাল্টুর কাছে আর সেসব প্রসঙ্গ তুললেন না। অন্যদিকে ঠেলে দিলেন কথা। তোমাদের বাড়িটা ঠিক চিনে উঠতে পারিনি। পুকুরটা…

এই বাড়িটাই আমাদের। তখন একতলার বাড়ি ছিল, আর অনেক জায়গায় ভাঙাচোরা। তাই চিনতে পারেননি বোধহয়। পুকুরটা বুজিয়ে ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে অনিমেষদা। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট রাস্তা চলে গেছে। সেখান দিয়ে গেলেই ‘শ্রীপর্ণা আবাসন’। আপনি বোধহয় এদিকে আসেন না অনেকদিন। তাই খোঁজখবর পাননি।

নাহ্‌। অনেকদিন মানে অনেকদিনই। প্রেস বেচে দেওয়ার পর কিছুদিন এটা-ওটা করে চালিয়েছি। তারপর সেসবও ছেড়ে দিয়ে একবারেই গৃহবন্দি। ছেলের পয়সায় খাই আর কি! আর স্মৃতি নিয়ে ডুবে থাকি। তোমার কথা বেশ মনে আছে। অনেকদিনই ভেবেছি। কিন্তু সেই কিশোর মুখটাই ভাসে মনের পর্দায়।

সেই চেহারা কি আর থাকে দাদা? বয়স তো কম হল না। চুয়াল্লিশ চলছে।

চুয়াল্লিশ! তা হবে। প্রায় বছর কুড়ি-বাইশ কি তারও বেশি বছর পরে দেখলাম তোমাকে। সেবার চাকরি পাওয়ার পরেপরেই একবার এসেছিলে আমার প্রেসে।

হ্যাঁ মনে আছে। চাকরির প্রথম মাইনে পাওয়ার পর বাড়ি এসেছিলাম দুদিনের জন্য। তখনই আপনার প্রেসে দেখা করতে গিয়েছিলাম মিষ্টির প্যাকেট হাতে।

অনেক কথা হল লাল্টুর সঙ্গে। তার স্ত্রী আর ছেলের সঙ্গে আলাপ হল। কথায় কথায় লাল্টু জানাল, একই অফিসে চাকরি করত দুজনে। সেখান থেকেই প্রেম আর বিয়ে। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। মাও চলে গেছেন বছর পাঁচেক হল। দিদির এক ছেলে, এক মেয়ে। ওরাও ভালো আছে। লাল্টুর কথা শুনতে শুনতে অনিমেষ খেয়াল করেন, ওর চেহারা একদম বদলে গেছে। তবে উজ্জ্বল চোখজোড়া একইরকম আছে। থুঁতনির নীচের ছোট্ট কাটা দাগটাও লাল্টুর পরিচিতির সাক্ষ্য বহন করছে। ফেরার পথে প্রশান্তি অনুভব করছিলেন অনিমেষ। উনিশ-কুড়ি বছর বয়সে লিটল ম্যাগাজিন করত লাল্টু আর কয়েকজন মিলে। অনিমেষের প্রেসে ছাপা হত। তাছাড়া অবশ্য উপায়ও ছিল না। তখন তো একটাই প্রেস এই তল্লাটে। দু-তিন বছরে কয়েকটা সংখ্যা বেরিয়েছিল। অন্যদের মতো এরা প্রেসের টাকা মেরে দিত না। দেরি হলেও ঠিক দিয়ে দিত। এজন্য এই দলটার প্রতি অনিমেষের আলাদা ভালোবাসা ছিল। একসময় দক্ষিণ ভারতে চাকরি পেয়ে গেল লাল্টু। তারপর আর বের করেনি ওর বন্ধুরা। লাল্টু এখনও ওখানেই চাকরি করে। ছুটিতে এসেছে দিন দশেকের জন্য। বাড়ি রিপেয়ার আর ভাগ্নের বিয়ের জন্যই তার আসা। গল্পে গল্পে জানলেন তিনি।

লাল্টুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার স্মৃতির স্বরণি বেয়ে হাঁটছিলেন তিনি। লাল্টুর তিন বছরের বড় দিদির নাম ছিল সুমনা। ওদের পত্রিকার প্রুফ দেখে দিত। বানান ভালো জানলেও প্রুফের সিম্বল জানত না। সুমনাকে হাতে ধরে প্রুফ দেখা শিখিয়েছিলেন অনিমেষ। এখন ভাবলে লজ্জা করে, মেয়েটিকে ভালো লাগত তাঁর। সুমনার বিয়েতে নিমন্ত্রণও করেছিল লাল্টু। কিন্তু যেতে পারেননি অনিমেষ। বিষণ্ণতা ছেয়ে ছিল দেহমনে। অথচ তখন তাঁর মালা ও ছেলে অম্বুজকে নিয়ে সুখী সংসার!

এতদিন আগের কথা। তাও তাঁকে কেউ মনে রেখেছে ভেবে মনটা খুশিতে ভরে উঠল অনিমেষের। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এতটা পথ টুকটুক করে হেঁটে এসেছেন। আর কেউ তো চেনা বলে ধরা দিল না! তবু দোতলা থেকে লাল্টু দেখতে পেয়ে চিনে ফেলেছে বলে পুরনো কারও সঙ্গে দেখা হল। লাল্টুদের গেট পেরোনোর সময় মিষ্টি একটা গন্ধ পেলেন তিনি। গোলাপ? রজনীগন্ধা? বেলফুলও হতে পারে। ওদের পাঁচিলঘেরা বাড়িতে কোনও বাগান চোখে পড়েনি অবশ্য।

বাজারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নানা দোকানপাট দেখলেন ঘুরে ঘুরে। ‘মডার্ন প্রেস’ এখন কাচঘেরা দোতলা ঘর। ‘সিওর সাকসেস’। চাকরির পরীক্ষার ট্রেনিং সেন্টার। পাশের মুদিখানাও তার সঙ্গে জুড়ে গেছে। বাচ্চুও দোকান বেচে দিল! হতাশ হন অনিমেষ।

বাড়ি ফিরে খুব ক্লান্ত লাগছিল অনিমেষের। বহুদিন বাদে অনেকটা পথ হাঁটলেন। মাঝে একবার সিঁড়ি ভেঙে লাল্টুদের বাড়িতে উঠেছেন আর নেমেছেন। আবার নিজের বাড়িতেও দোতলায় উঠতে হল। চটিজোড়া র‍্যাকে রেখে বসলেন তাঁর দৈনন্দিনের সঙ্গী ইজিচেয়ারে।

সন্ধে পেরিয়ে গেছে সামান্য আগে। পাখিরা বাসায় ফিরেছে। এখনও তাদের কলকাকলি শোনা যাচ্ছে একটু একটু। তিনি একাকিত্বের ঘেরাটোপে ফিরে এসেছেন আবার। লাল্টুর ভাবনা ঘিরে আছে এখনও। লাল্টু তাঁর থেকে অনেকটাই ছোট। তবু দাদা ডাকে। ওর বন্ধুরাও দাদা ডাকত। লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেমেয়েরা তাঁকে বরাবর দাদাই ডেকে এসেছে। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল মেয়ের ডাকে।

– বাবা, চা।

চমকে তাকিয়ে দেখলেন মেয়ে সুমিকে।

– কখন এলি?

– কিছুক্ষণ আগে।

– পার্থ আসেনি? কোথায় সে?

– না। একাই এসেছি।

– সেকি! পার্থ এল না কেন?

মাকে জিজ্ঞাসা কোরো… বলতে বলতে চলে গেল সুমি। মেয়ের গলাটা বড্ড বেসুরো লাগছে! বাপের সঙ্গে আদুরে সুরে কথা বলে সুমি। আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। কেন এমন লাগছে তা আর জানা হল না। সে চলে গেছে ঘরে। ডেকে জিজ্ঞেস করতেও মন চাইল না আর।

রাতে খেতে বসে জানলেন মেয়ে সংসার ছেড়ে চলে এসেছে একেবারে। অনেকদিন ধরেই সমস্যা চলছিল। এসব তাঁকে কেউ জানায়নি। জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি। আপাতত এখান থেকেই স্কুলে যাতায়াত করবে সুমি। পরে স্কুলের কাছে কোনও ঘরভাড়া নিয়ে থাকবে। মেয়ের এইসব ঘটনা শুনতে শুনতেই তিনি সকালের সেই গন্ধটা পেলেন।

– হ্যাঁ রে সুমি, আজ সকালে তোর আর পার্থর মধ্যে খুব ঝামেলা হয়েছিল নাকি?

– সে তো রোজই হচ্ছিল। নতুন কী!

– না না, বলছি আজ সকাল সাড়ে দশটা-এগারোটা নাগাদ একটু বেশিই ঝামেলা হচ্ছিল? মনে মনে অঙ্ক মেলাচ্ছেন, এমন ভঙ্গিতে ভ্রু কুঁচকে সুমির দিকে তাকিয়ে বললেন অনিমেষ।

– হ্যাঁ হচ্ছিল। আজ স্কুল কামাই করেছিলাম। পার্থও অফিস কামাই করে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করল।

অনিমেষ মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার খাবারের প্লেটে চোখ রাখলেন। সুমি সন্দেহের চোখে জিজ্ঞাসা করল, তুমি সময়টা এভাবে বললে কী করে বাবা? পার্থ তোমাকে ফোন করেছিল?

আরে না না, পার্থ কি আমাকে ফোন করে কখনও? আসলে কী জানিস, সেই সময়টাতেই একটা গন্ধ… কথা হারিয়ে ফেলেন অনিমেষ।

থামাও তোমার গন্ধ বিচার! কদিন ধরেই এই এক হয়েছে! এই গন্ধ পাচ্ছেন, সেই গন্ধ পাচ্ছেন! খাওয়া হয়ে গেছে। এবার দয়া করে উঠে শুয়ে পড়ে আমাদের উদ্ধার করো। ঝাঁঝিয়ে ওঠেন মালা। পিন ফোটা বেলুনের মতো চুপসে গেলেন অনিমেষ। বেসিনে হাত ধুয়ে বিছানার দিকে চলে গেলেন ধীর পায়ে। মনে মনে বললেন, সুমি আমার আত্মজা। তার সংসারের ভাঙনের গন্ধ পাবো না, তা কি হয়! অন্য লোকের শুভাশুভের গন্ধ পাই আমি। গন্ধটা এতদূর থেকেও পেলাম। সংসার-দহনের গন্ধ অন্যকিছুর সঙ্গে মেলে না রে সুমি মা!

 (৩)

অনিমেষ প্রেস বিক্রি করার পর মাঝে কিছুদিন দোকানে দোকানে বইখাতা, পেন-পেন্সিল সাপ্লাই করতেন। ছেলে অম্বুজকে যত্ন করেই বড় করে তুলেছেন মালা। সে ব্যাঙ্কে ভালো চাকরিও পেয়েছে। অর্থের দিক থেকে কোনও ত্রুটি রাখেননি অনিমেষ। যখন যেখানে বলেছে ছেলে, সেখানেই পড়তে পাঠিয়েছেন। কম্পিটিটিভ এক্সামের ইন্সটিটিউটে ভর্তি হওয়া, বিভিন্ন বইপত্র কেনার ব্যাপারে কার্পণ্য করেননি। তাঁর এক শালা ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। ছেলে সেই মামার মতো ব্যাঙ্কে চাকরি করবে বলে ঠিক করেছিল। তাই অন্য কোনও পরীক্ষা নয়, ব্যাঙ্কের চাকরির পরীক্ষা দিয়ে বেড়াত। একসময় ঠিক চাকরিও পেয়ে গেল। সেই অম্বুজই তাঁর শিক্ষা-সরঞ্জাম সাপ্লাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিল। উপার্জন তার কম নয়। সে কেন বাবাকে এইসব কাজ করতে দেবে! এখন বাবার বিশ্রাম নেবার সময়।

যৌবনকাল থেকে পরিশ্রম করার অভ্যেস অনিমেষের। কিন্তু শেষ বয়সে এসে একেবারে বসে যাওয়াতে মনটা দমে গিয়েছিল তাঁর। বাজার-দোকান করতে গেলে ভুল করেন, বাগানে গাছের পরিচর্যায় নানা ত্রুটি হয়। ফলে তাঁর ওপর ভরসা চলে গেল বাড়ির সবারই। কোনও কাজ আর তাঁকে কেউ দেয় না। তাঁরও হাতেপায়ে খিল ধরে যাচ্ছিল যেন। আচমকাই তাঁর মনের মধ্যে এল গন্ধ পাওয়ার অনুভূতি। আজকাল প্রায় প্রতিদিনই কোনও-না-কোনও গন্ধ অনুভব করেন তিনি। দিনের যে-কোনও সময় তাঁর ঘ্রাণেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। ভালো গন্ধ পেলে মনে মনে খুশি হন তিনি। আর গন্ধটা যদি খারাপ বা খারাপের দিকে হয়, তাহলে সতর্ক হয়ে ওঠেন। এ তাঁর নতুন এক আবিষ্কার। গন্ধপ্রবাহ তাঁকে আবার চনমনে করে তুলল। মাঝে মাঝে বিষণ্ণ করে দিলেও এই গন্ধের কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি আবার যেন নড়াচড়া শুরু করেছেন। প্রায়শই কোনও-না-কোনও গন্ধের কারণ খুঁজতে বের হন অনিমেষ।

এক সকালে গোলাপের সুবাস তাঁর নাকে ভেসে এল। খুশি খুশি মনে তিনি বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। সুবিমলের নাতির জন্ম সংবাদ পেলেন তিনি। পরম তৃপ্তিতে ভরে উঠল তাঁর মন। সুবিমল ছিলেন সরকারি অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মী, তাই একটা অহংকার ছিল তাঁর। তা মাঝে মাঝে ফুটেও বের হত। প্রেসের ব্যবসাকে সুবিমল তেমন ভালো চোখে দেখতেন না। তবু মাঝে মাঝে সন্ধের পরে অনিমেষের প্রেসে এসে বসতেন। অনিমেষ সুবিমলকে অপছন্দ করলেও কোনওদিন কিছু বলেননি। তবে মনে মনে একটা ক্ষোভ ছিলই। কিন্তু তাঁর নাতি জন্মানোর খবরে অনিমেষের অন্দরমহলে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল।

খারাপ গন্ধ ভেসে এলে তিনি হতাশ হন। তবু আবিষ্কারের নেশায় বেরিয়ে পড়েন। গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে প্রতাপের খবর তাঁকে স্তব্ধ করে দিল। প্রতাপ ছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু। বসিরহাটের বাড়ি ছেড়ে যখন বিরাটিতে পাকাপাকি চলে এলেন, তখন থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব। অনিমেষের মা বেঁচে থাকতে প্রতাপ প্রায়ই আসতেন তাঁদের বাড়িতে। অনিমেষও যেতেন প্রতাপদের বাড়িতে। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরপরই প্রতাপের ব্রেন স্ট্রোক হল। বাঁদিক পড়ে গেল। বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন বহুদিন। প্রথমদিকে যেতেন বন্ধুকে দেখতে। পরে যাওয়া বন্ধ করে দেন। দুজনের চোখের সামনেই হারানো দিনগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ত। খুব কষ্ট হত তাঁদের। তাই পরের দিকে যাওয়াই ছেড়ে দিলেন; প্রতাপকে বলেই তাঁর বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে খবরাখবর পেতেন কোনও না কোনও সূত্রে। একইরকম আছেন। ভালোও না, আবার মন্দও না। তীব্র কটু গন্ধের কারণ খুঁজতে বেরিয়ে প্রতাপের মৃত্যুসংবাদ পেলেন তিনি। তখনও তাঁর মরদেহ উঠোনে শোয়ানো। খুব ভেঙে পড়লেন অনিমেষ। ভেঙে-পড়া মাস্তুলের মতো তাঁর মাথা নুইয়ে পড়ল ঘাড়ে। অবশ শরীরটা প্রায় টেনে টেনে নিয়ে এলেন বাড়িতে।

সন্ধে উতরে গেছে অনেক আগেই। স্ট্রিট লাইটের আলোয় রাস্তাঘাট, দোকান, পথচলতি মানুষ, সবই ঘোলাটে মনে হচ্ছিল অনিমেষের। আজকাল তাঁর বাইরে বেরনো আর ফিরে আসার ঘটনা মালা বা সরমার গা-সওয়া হয়ে গেছে। তাই দেরিতে ফিরছেন নাকি তাড়াতাড়িই ফিরলেন, তা নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই দুজনের কারওই।

অনিমেষ এসে ঘরে ঢুকলেন। সোফায় বসে তাকিয়ে থাকলেন টিভির দিকে, যেখানে ধারাবাহিক চলছে এবং মালা ও সরমা সেই কাহিনিতে ডুবে আছে। অনিমেষ কোনও সিরিয়ালে মন বসাতে পারেননি কোনওদিন। এই সময় খবরের কাগজের পড়া সংবাদ বা না-পড়া ফিচারে চোখ বোলান। কিংবা শোবার ঘরে গিয়ে খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে কোনও বই পড়েন। তবে পড়তে পারেন না তেমন কিছুই। অতীতের নানা ঘটনা বইয়ের পাতার শব্দরাশি মুছে দেয়, তাঁকে নিয়ে যায় পুরনো দিনের চৌহদ্দিতে। এই নিয়ে তাঁর মনে ক্ষেদ নেই, বরং অতীতচারণে থাকতে তাঁর বেশ লাগে।

তবে এদিন যে অন্যদিনের তুলনায় দেরি করে ফিরলেন, ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসলেন অত্যন্ত বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে, সেদিকে কারও নজরই পড়ল না। শুধু সরমা একবার চোখ ফিরিয়েছিল তাঁর দিকে, মালা তাও করেননি। মেয়েও বসে আছে পাশে। সেও চোখ ফেরায়নি বাবার দিকে।

আবার একটা গন্ধ ভেসে আসছে অনিমেষের নাকে। এ গন্ধটা খুব চেনা তাঁর। কিন্তু ঠিক কীসের গন্ধ মনে করতে পারছেন না তিনি। চোখ বুজে অনুভব করছেন শুধু। খুব ভালো লাগছে তাঁর। মা পুজোর ঘরে ধূপ জ্বালাতেন। খানিকটা তার কাছাকাছি গন্ধটা। মনে হচ্ছিল উঠে দাঁড়াতে পারবেন না তিনি। অনেকক্ষণ সেভাবেই সোফায় বসে থেকেছেন।

সিরিয়াল দেখা শেষ হলে রাতের খাবার গুছিয়ে নিলেন মালা। রাত সাড়ে নটার মধ্যেই খেয়ে নেন তাঁরা। সরমা তাঁকে খেতে ডাকল। নিঃশব্দে খেয়ে নিলেন অনিমেষ। খাওয়া নয় যেন, খাবার নাড়াচাড়া করে চলেছেন জিভের আড়ালে।

পনিরটা আমি বানিয়েছি বাবা। ভালো হয়েছে না? হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল সুমি। মেয়ের প্রশ্ন যেন ভেসে এল কোন্‌ সুদূর থেকে। অদ্ভুত সুন্দর গন্ধটা ফিকে হয়ে এল। তিনি ভেসে-আসা প্রশ্নে মাথা নেড়ে জানালেন ভালো লেগেছে খেতে। সত্যি সত্যিই তাঁকে ভালো-মন্দ কোনও অনুভব ছুঁয়ে যায়নি। তবু অস্ফুটে ‘বেশ’ শব্দটা ভাসিয়ে দিলেন হাওয়ার ডানায়। খুশি হল সুমি।

ধীরপায়ে খাটে এসে শুলেন অনিমেষ। ফিকে গন্ধটা আবার জোরালো হয়ে উঠল। চোখ বুজে গন্ধটা অনুভব করছেন তিনি। তাঁর মনের ভেতরে চলমান অতীত খেলে বেড়াচ্ছে। ঐ তো কেষ্টদা বাঁশি হাতে হেঁটে চলেছে মাঠের দিকে। কালো মেঘ ঢেকে ফেলেছে আকাশ। কেষ্টদা যেন সেই মেঘের দিকে চলে যেতে চাইছে। কিশোর অনিমেষ তাকিয়ে দেখছেন কেষ্টদাকে। হাওয়া খেলছে তার শরীরে। কেষ্টদার কালো শরীরে নীলাভ জামা লেপ্টে আছে। মাঠের একধারে পিপুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে একলা। কেষ্টদা তার নীচে গিয়ে বসল। এরপর আপন মনে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে সে।

বাবা হেঁটে আসছেন মেঠোপথ ধরে। তাঁর ধুতির কোণটা মাটিতে লুটোচ্ছে। মালতীকে দেখলেন ছুটে চলে যেতে পুকুরধারে। এবার মালতী তুলে আনবে কলমি কিংবা শুষনি শাক। সমস্ত চলমান চিত্রে তিনি ফিরে পাচ্ছেন তাঁর কিশোরবেলাকে, ফিরে পাচ্ছেন যৌবনের দিনগুলোকে।

সুন্দর গন্ধটা তাঁর পাশে এসে বসে আছে যেন। তিনি স্পর্শ করছেন, অনুভব করছেন। তাঁর চোখের সামনে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ দুলে উঠল। অনিমেষ সেই সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করে হেঁটে চলেছেন একা। যত এগোচ্ছেন, ততই মিষ্টি গন্ধটা তাঁকে ঘিরে ধরছে যেন। ক্রমশ ডুবে যাচ্ছেন সুড়ঙ্গের গভীর অন্ধকারে। একা।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত