| 25 জুন 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

জীবনের যত জঞ্জাল

আনুমানিক পঠনকাল: 22 মিনিট

বুড়ো মানুষ এত মতলববাজ! শ্যামলের জানা ছিল না। তার বয়স আঠাশ। দুনিয়াদারির অনেককিছু দেখার-জানার বাকি। সে দু-চোখের পাতা ছোট করে সামনে পিটপিট দৃষ্টি রাখে। রোদের তাপ বাড়ছে। তীব্র আলোয় সবকিছু কেমন বিদগ্ধ…ঝাঁ-ঝাঁ। এসবের মধ্যে জব্বার মিয়ার অনেক ধৈর্য। মানুষটি একটুও ঘামে না। শীতল মেজাজে জাল বোনে। বাঁশের খুঁটির উপর থেকে ঝুলে আছে বর্ণিল সুতোর কারুকাজ। নকশি জাল। তার মনে কোন্ কল্পনার বুনন কে জানে। শ্যামলের স্বপ্ন বোনা। অনেক আশা নিয়ে এসেছে। বরষার আগে আগে সব কাজ গুছিয়ে নিতে পারলে একটু নিশ্চিত হতে পারে। হাতে দুটো পয়সা থাকে। এদিকে লক্ষ্মীর সময় নেই। কোন্দিন যে ব্যথা ওঠে। আধো ঘুম-জাগরণে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন ভাবনা-চিন্তায় কেটে যায় রাত।

রাস্তার ওপারে স’ মিল। অনেকদিন ধরে মেশিন বন্ধ। পরিত্যক্ত। চালু আছে জ্বালানি খড়ির দোকান। চারপাশে খড়ির স্তূপ। বাতাসে কাঁচা আমকাঠের শুকনো গন্ধ। কয়েকটি কাঠের গুঁড়ি এলোমেলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। সে-সবের পেছনে চা-বিস্কুটের টং-দোকান। মুড়ি-ঘুগনিও পাওয়া যায়। দোকানের কোনো ফাঁকফোকর গলিয়ে আসা পানি ভেসে ভেসে কাদাজল। কচুর দু-একটি লতা গজিয়ে উঠেছে। কখনো বাতাসে দোল খায়। আরও দক্ষিণে দেয়ালঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ইপিল-ইপিল গাছের ছায়া। তীব্র রোদে ম্লান। সেখানে একপাশে দু-একটি টাঙা। ঘোড়াদুটোকে বড় অসহায় লাগে। চোখে চামড়ার মোটা ঠুলি অন্ধপ্রায়। অন্যের বোঝা টানাই জীবনের ভাগ্যলিপি। এই বেঁচে থাকা। শ্যামলের দু-চোখ কখনো ঝাপসা। সেও সারাজীবন জীবনের বোঝা টেনে বেড়ায়। শান্তি পেল না। এদিক-ওদিক ছুটোছুটি ব্যস্ততা অস্থির পথরেখা ধরে হেঁটে যায়। দু-দ- বিশ্রাম নেই। এখন বসে আছে বুড়োর দোকানে। কেনাবেচা দরদাম শেষে যা হয় এক সমাধান হলে স্বস্তি আসে। গুমট গরমে ভালো লাগে না।

‘না ভাতিজা, ছেইদিন আর লাইখো। নদি শুকায়ে ছিল তখুন পেতি। এখুন বান-বন্যা সব ভেইসে লিয়েছে। যাওবা পাওয়া যায়, ছালার সাপখোপ-কাঁকড়া-বিছে কি কুন্ঠে ঘাপটি মেইরে আছে; বিপদ মানে মহাবিপদ। তার উপহ্র আবার শেয়াল-কুকুর হেইগে…কি বুলব? দুর্গন্ধ-দুর্গন্ধ। ওয়াক্ থুহ্! কি বলে কাপুড়ে গায়ে মাখামাখি। না না দুইশর কমে পারব লাখো।’

‘বড় বিপদ হলি গো চাচা। বাজার মন্দা। হাতে তেমন ট্যাকাও নাই।’

‘পরে দিবি। এখুন না থাকলে পরে দিবি। এক সপ্তাহ দু-সপ্তাহ। আমি কি ধারবাকি দিই না?…তো কী কহছিস, মাল টানমো?

বুড়ো কাঁচাপাকা-ধূসর-ঝাঁকড়া চুলে হাত বুলোয়। অন্য জেলার মানুষ। কথায় অদ্ভুত টান। শ্যামলের বুঝতে অসুবিধা হয় না। সাড়ে ছয়-সাত ক্রোশ রাস্তা পেরিয়ে এখানে আসে। প্রয়োজনীয় মালামাল কেনে। তারপর ফিরে যায়। এই কয়েক মাসে একটু ঘনিষ্ঠতাও হয়ে গেছে। সে অপলক তাকায়। বুড়ো মাথা ডানে-বামে দুলিয়ে নেতিবাচক মুখখানায় হাসি তোলে। শ্যামলের একচিলতে নীরব হাসি। তার ঠোঁটে সবসময় আনন্দ। জীবনের সকল হাসিখুশি ধরে রাখতে চায়। সেই আনন্দ কতটুকু সত্য কিংবা মিথ্যের জগাখিচুরি জানে না। বুঝতে পারে না। মনকে যে সবসময় বোঝানো যায় না। মন বড় উন্মন। নির্বোধ-দুর্বোধ্য। কারও কথা শোনে না। নিজের কথাও। সে বিড়িতে শেষ-সুখটান মেরে বুড়োর হাতে গুঁজে দেয়। দু-জনে মুখোমুখি বসে থাকে। আকাশে চনচনে রোদ। রাস্তায় তীব্র আলো। এখানে একচালার নিচে হালকা রোদছায়া। পশ্চিমে আশপাশ জুড়ে বনপাকুড়-শ্যাওড়া আর অচেনা গাছগাছালির ঘন জঙ্গল। কখনো ফ্যাকাশে ছায়া প্রগাঢ় অন্ধকার লাগে। চোখে-মুখে এনে দেয় হিম হিম তৃষ্ণা। তারপর আচমকা গরম বাতাসের উৎকট ঢেউ। তপ্ত ভাপ। বুড়ো দু-তিন ফুট উঁচু মাঁচায় বসে থাকে। শ্যামল নিচে পা ছড়িয়ে দড়ির পিঁড়িতে। নিঃশ্বাসে শুকনো মাটির আঁশটে গন্ধ।

ঘোড়াদুটো খয়েরি-কালো আর ধূসর-সাদা। নিস্তব্ধ দুপুরের মতো একমনে ঘাস চিবোয়। উজ্জ্বল রোদে নেপিয়ার ঘাসে সবুজ ঝিকমিক প্রভা। ঘোড়া ধীরস্থির মুখে টেনে নেয়। প্রগাঢ় শ্বাসে নিশ্চুপ ভোজন। ঠোঁটের কষ বেয়ে সাদা ফেনা নামে। কখনো থমকে নিঃসাড়। সহসা সামনে দৃষ্টি ছুড়ে দেয়। চোখের উপর ঠুলির শক্ত দেয়াল। কিঞ্চিৎ ফাঁক দিয়ে সামনের অংশ দেখা। পেছনে তাকাতে পারে কি? পারে না। পেছন বা অতীত বলে কোনোকিছু নেই। তেমনকিছু মনে পড়ে কি না… দৃশ্যছবি? কে জানে। শ্যামলের অনেক কথা অনেক ছবি দোলা দেয়। মন-ভাবনার নদীতে ঢেউ জাগে। অস্থির তরঙ্গ…প্রবাহ খেলা। তার দু-চোখে অতীতের সুখস্বপ্ন ঠুলি। সামনের দিনকাল তেমন স্বচ্ছ কোথায়? গোলকধাঁধা সুড়ঙ্গ মায়াঘোর। তেমন করে দেখতে পায় না অথবা কী এমন দেখে যায়, দেখার মতো দেখা হয়, হয় না; সব দেখা দেখা নয়। দুনিয়ার অনেককিছু দেখা হলো না। কিছু তার দেখা। যতটুকু হলো সবটুকু কেমন জানে অথবা জানে না। জানা যায় না। বোঝা যায় না। এ হলো জানা-অজানা জীবন-সংসার কাহিনি। দেখা হয়-দেখা হয় না, জানা-অজানা থেকে যায়; শত মানুষের বর্ণিল চেহারা। বুকের আড়ালে সেঁটে থাকা হাজার বিবিধ মুখছবি। মুখোশ।

জীবন আর জীবিকা নিয়েও কতটুকু ধারণা তার? যতটুকু জানা হলো বা বোঝার, সে শুধু বিমূর্ত জলছবি। দুপুরের রোদ-আকাশে স্বপ্নদোলার মতো দু-একটি মেঘ ভেসে যায়। উড়ে যায় দূর দিগন্তে। মানুষ-সমাজ থেকে অনেক দূর। দূর… বহুদূর। গন্তব্যহীন পথ চলা। ভেসে বেড়ানো জীবন। অথবা কোনোকিছু নয়। জীবনপ্রবাহে সততার কোনো কমতি নেই শ্যামলের। কারও মন্দ চিন্তা কেন, কোনো মনোযোগ নেই; সে থাকে নিজের মধ্যে। একলা ভুবন। একা একা অনবদ্য বেঁচে থাকা। প্রবীণ মানুষের কথা। পুঁথিপাঠ নিয়মনীতি গুরুজনের উপদেশ পরামর্শ পাথেয়। অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণের চেষ্টা। কাউকে ঠকিয়ে দু-আনা বেশি উপার্জন করে, এমন কাজে নেই। তাই বুড়োর দু-চোখে জলতরঙ্গ মতলব দেখে মন-ভাবনায় উন্মন-উদ্ভ্রান্ত আজ। শ্যামল অনেকক্ষণ অপলক-নিষ্পলক। বুঝতে পারে কি পারে না, কোনো গুমট তন্দ্রাঘোর দুপুরের মধ্য দিয়ে ভেসে যায়। তারপর সহসা চমকে দু-চোখ সরিয়ে রাখে। রাস্তা ছাড়িয়ে আকাশের নিঃসীম দিগন্তে দৃষ্টি চলে যায়। মানুষ কত মতলববাজ! এসবের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে তাকে। এগিয়ে যেতে হয়। বেঁচে থাকতে হয়। এরই নাম বেঁচে থাকা। অস্তিত্ব জীবন।

মানুষের সঙ্গে পেরে ওঠা বড় শক্ত। এই তো সেদিনের কথা। বাবার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায় শ্যামল। আজিজার ম-লের আঙিনা অনেক দিঘল। তখনো সন্ধের আলোছায়া নিশ্চুপ বসে আছে। অন্ধকার গাঢ় হয়নি। দু-চারজন মানুষ বেঞ্চের উপর। দক্ষিণে দুটো আমগাছ। আম্রপালি। বড় বড় আমের ভারে নুয়ে পড়েছে। মণ্ডল ফাযিল মাদরাসার প্রভাষক। আরবি পড়ায়। হাদিস-তাফসিরের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। ফারায়েজের কঠিন-জটিল অঙ্ক। শ্যামলের এসব জানার কথা নয়। লোকমুখে শোনা। সে সদ্য-কৈশোর উতরানো তরুণ। চোখে-মুখে নিষ্পাপ স্বপ্নমায়া। গোধুলির লালিমা আর রাতের ঘুমে শুধু লক্ষ্মীর মুখছবি। পাশের বাড়ির কিশোরী-তন্বী। শ্যামলের নিজ দেয়ালের ও-পাশে অন্য বাড়ির ঘর। কখনো রাতের স্থির-নিশ্চুপ প্রহরে কানপেতে শোনে নিঃশ্বাসের ঢেউ। তার উঠে দাঁড়ানো। চৌকিতে এপাশ-ওপাশ। কয়েক বছর হলো এখানে বসত গেড়েছে ওরা। পশ্চিমে পুবমুখি দুটো ঘর। পুবের দেয়াল ঘেষে হেঁসেল। তার পেছনে পুকুরপাড়ের কোণায় বিশাল কদম গাছ। বর্ষায় আকাশ আলো করে রাখে। নীল কিংবা ধূসর-সাদা পটভূমিকায় অদ্ভুত মায়া-জলছবি। কোনো কোনো দিন দুপুর-শেষ বিকেলে লক্ষ্মী এসে দাঁড়ায়। ছোটভাই সঙ্গে। কিছুক্ষণ স্থির-নীরব দূরের দৃশ্যে তাকিয়ে থাকে। কখনো খুনসুটি দৌড়োদৌড়ি। তখন দুটো কথা হয়। বাবা-মা দুই ভাইবোন। আঙিনার শেষে দেয়াল। ও-প্রান্তে যেমন লতিয়ে ওঠা দু-একটি জবা এ-প্রান্তের সীমানার বাতাসে দোল খায়, খেতে থাকে, তার দু-চোখে স্বপ্ন-আবাহন। শ্যামলের বুকে অচেনা ডাক… বিমূর্ত আহ্বান। লক্ষ্মী… লক্ষ্মী। মন হারালো… হারালো। একদিন ঘর আলো করে বুকে স্থায়ী ঠাঁই। শ্যামলের মায়াবী জীবন-সংসার। লক্ষ্মী মা হতে চলেছে। প্রথমবার। তাই শ্যামলের বুকে অস্থির উত্তেজনা। থিরথির অস্থির কাঁপন।

সেদিনের কথা মনে পড়ে। অনেকক্ষণ পর অন্দর থেকে বের হয় আজিজার ম-ল। ঘি-হলুদ রং পাঞ্জাবি। বাতাসে ছড়িয়ে যায় অচেনা আতরের সুবাস। মন হালকা লাগে। কোনো স্বপ্নঘোর মায়াজাল। বেঞ্চের উপর বসে থাকা মানুষজন উঠে দাঁড়ায়। তারা কী-সব কথা বলে বোঝা যায়!বোঝা যায় না। শোনা না শোনা ফিসফাস। এভাবে অন্ধকার ধীরে ধীরে হাত-পা ছড়িয়ে নেমে আসে। আসতে থাকে। টিউবওয়েলের ওদিকে লেবুতলায় ঘোর আঁধার। তারা সেখানের কোনো এক দূর কোণায় বসে থাকে। ছোট জাত। বেঞ্চে বসার অনুমতি নেই। মানুষজন চলে গেলে সময় হয় তাদের।

‘তো বাহে নীলকান্ত, কি তনে আইছি?’

‘বাবু ওই ভুঁইকোনা…।’

‘ওইটা তো জাকির নিছে। এই বছর তো হইল না, সামনের বছর নিবু।’

‘বাবু ভুঁইকোনা মোর বাপ দিয়া গেইছে। ম্ইু কিছু জাননু না, দেখনু না মাঁইষে হাল দিলি!আইজ রোপা গাঁড়োছে। কেমন কাথা?’

‘দুর ব্যাটা! তোর আর জমি আছে? খাস ভুঁই। তিন-চার মাস ধরি জরিপ হইল। তখন কুনঠে ছিলু? খাজনা নাই, খারিজ নাই, মালিক নাই। ওই জমি মোক দিছে সরকার। মোর জমি। এ্যালা তোর কেমন করি হইল? যা এই বছর জাকির আবাদ করুক। সামনের বছর তুই করিবু। তিন ফসলি জমি। বছরে ত্রিশ হাজার দিবু।’

‘মোর জমি! ফির ট্যাকা ক্যানে?’

‘আচ্ছা পাগল তো তুই নীলকান্ত। তুই এক কাম কর। সাদেক মেম্বারের ঠে যায়া ভালো করি শোনেক। জমি জমার হিসাব-কিতাব তো বুঝিবু না।’

‘এইটা ক্যাংকরি হইল বাবু? মোর জমি। বাপের আমল থাকি হাল-আবাদ করো। কাঁহো কিছু কইল না। এ্যালা মুই হাল জুড়িম। যায়া দেঁখ তোমার লোকজন হাল দিছে। মোরে জমি কিন্তু মুই ফিরি আনু। কেমন কাথা?’

‘ম্যালা কাথা কই না নীলকান্ত। ওই জমিত হাল জুড়িছে জাকির মাস্টার। মোর জমি, যাক খুশি তাক দিবার পাঁরো। যাঁয় টাকা দিবি, আবাদ করিবি। তুই দিবু আবাদ করিবু। যা হউক, তোর মনোত সন্দেহ থাকিলে মেম্বার-চেয়ারম্যানের ঠে যা। ওমাক ক। কোট-কাচারি আছে। মামলা করিবার পারিস। এইলা খাস জমি, সরকার নতুন করি দেছে। এ্যালা মুই মালিক। ভাল্ করি খবর নি। যাউক কাথা কওয়ার সমায় নাই। এ্যালা তোমরা যাও। নামাজের অক্ত চলি যাছে।’

শ্যামল ফিরে আসে। বাবার সঙ্গে হেঁটে যায়। বাইরে আলো-অন্ধকার ছায়া। রাস্তার ধারে মাটির তলায় ঝোপঝাড়ে উচ্চিংড়ে-ঘুগরের চিৎকার ঘনঘটা। মাথা ঝিমঝিম বিবশ প্রায়। রাস্তার পাশে পাশে ডিপ-টিউবওয়েলের নালায় সেচ পানির গতিপথ। চাঁদের আলোয় ঝকঝকে কুলুকুলু শব্দঢেউ। শ্যামলের বুকে অবরুদ্ধ চিৎকার। আর্তনাদ। বাবার পরাজিত অসহায় মুখছবি বার বার বাতাস ঝাপটার মতো জেগে ওঠে। কি করবে সে? কি করতে পারে? মনের কোণায় ফুঁসে ওঠা আগুনের দপদপ শিখা কান্না হয়ে যায়। মন পোড়ে। বিষাদ বেদনায় বাতাস ফিসফিস কথা কয়। কী বলে? সে জানে না। তার দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। দৃষ্টির সামনে পড়ে থাকে সেই জমি। শুক্লা নবমীর মৃদু আলোয় ধীর বাতাসে ধানের চারাগাছ দোল খায়।

আজ মন দোলায়মান। কয়েকদিন ধরে দোলাচল ঢেউ। কেন এমন হলো? কেন এমন হয়? এসব কাজ ভালো লাগে না। আগে যেমন ক্ষেতের জলে পা ভিজিয়ে ধানচারা রোপণ করে, রোদছায়া বিকেলে গাছের ডগায় আলোর নৃত্য দোলা; মন ফিরে পেতে ব্যাকুল। ক্ষেতের টলটলে জলের মধ্যে সাঁতার কাটে পোনামাছ, ছোট ছোট ঠোঁট খুলে বাতাসের বুদবুদ ঢেউ; খুব মনে পড়ে যায়। কোনোদিন পদ্মদিঘির পুবালি জঙ্গলে অনেক উঁচু গাছের শিখরদেশ দৃষ্টির গভীরে রহস্য তুলে ধরে। বাঁশবনের অচেনা কোনো গোপন খোপ থেকে দু-চারটি কানিবকের ছা টেনে নামায়। সন্ধের টিপটিপ আঁধারে ঝোপের ছায়ায় দিঘির পাড়ে বড়শি গেঁথে রাখে। তখনো সাঁতার কেটে চলে পুঁটি-সাঁটি কিংবা কই। তারপর রাত পাহারা চোখে অপেক্ষার ভোর হামলে পড়ে। ভাগ্য ভালো হলে শোল-রুই-কালবাউশ জুটে যায়। জঙ্গলের প্রগাঢ় অন্ধকারে পেতে রাখা ফাঁদেও জড়িয়ে যায় দু-একটি বনবেড়াল বা ধেড়ে ইঁদুর। আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো রাতচরা পাখি। কি তার ওজন! কি আনন্দ মনে! উচ্ছল সেইসব দিন ঢেউ জাগায়। এখন কী করে সে? পানসে নিরানন্দ পাণ্ডুর ঘর-সংসার। কষ্টের মধ্যে বেঁচে থাকা।

যেদিন কোনো বড় শিকার হাতে এসে পড়ে, তার মতো বাবার দু-চোখেও আনন্দ ঝলমল খুশি। মা আঙিনার উনুনে দুপুর রোদে রাঁধতে বসে। বাতাসে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যায় স্বাদু গন্ধের ঘ্রাণ। বাবা একচালার ছায়ায় বসে ভাত খায়। শ্যামল তার পাশে। চৈতালি বাতাসে কোনোদিন দূর মাঠে রাস্তায় আচমকা ধুলো ওড়ে। তাদের চালাঘরের পেছনে বড় দিঘিতে ছেলেমেয়েরা ধুপধাপ ঝাঁপায়। বাবার মুখে কুরকুরে শব্দ। শ্যামলের চোখে-মুখে উদার-তৃপ্তি। হাসি মুখছবি।

‘সুমতি আডি সেবেলাকানা য়া…আর মিত্ কুটি ইমাঞমে।’

(সুমতি বড় স্বাদ হয়েছে রে… আরেকটা টুকরা দে।)

‘হাপোই এমামকানাঞ।’

(হাঁ হাঁ দিই দিই।)

‘শ্যামলা এমায়মে…হোপনিঞ আডিতেত্ এ কামিয়া। আম লাগিত দোহোজংমে। মেনাক্গেয়া থ?’

(শ্যামলাকে দে…ব্যাটা আমার কাজ করে খুব। তোর জন্য রাখিস। আছে তো?)

‘মেনাক্ গেয়া।’

(আছে… আছে।)

বাবার সুখ-তৃপ্তি বুকে আনন্দ ঢেউ তোলে তার। মা-বাবা দু-জনের মধ্যে ভারি মিল। ভালবাসার এমন ছায়াছবি আর কোথায়? শ্যামল আবার ফাঁদ পেতে রাখে। ফাঁদের জীবন-সংসার। আজ সে নিজেই ফাঁদের মধ্যে ঘুরপাক খায়। সে এক বনবেড়াল কিংবা ধেড়ে ইঁদুর। দিঘির জলে ছায়া-অন্ধকারে পেতে রাখা আকশিতে তড়পানো ছোটমাছ। তার মন পোড়ে। মা চলে গেছে কত দিন। চোদ্দো বছরের শোককাল মিলিয়ে গেল। বিষণ্ন দৃষ্টি মুছে যায় না। সেই যুগকাল শেষ হয় না। এখন বাবার চলে যাওয়ার সময়। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি। অনন্ত প্রতীক্ষা। একচালার দূর ছায়ায় শোয়া-আধশোয়া নির্বাক মানুষটির দিকে তাকালে অচিন রূপকথা-কান্নাঢেউ বুকে আছড়ে পড়ে। ‘মা… মা তুই কেনে চলে গেলি? বাবার একলা থাকা সহ্য হয় না।’ মানুষ কেন চলে যায়? বাবার দু-চোখে তেমন জিজ্ঞাসা ঢেউ তোলে কি? কে জানে।

 

শ্যামল একলাফে সময়ের রোদে নেমে আসে। পশ্চিম আকাশে কয়েকটি চিল ওড়ে। শ্লথ-ক্লান্ত চক্রাকার ঘুরে ঘুরে দূর হাওয়ায় ভেসে যায়। আহা! এমন জীবন হয় না কেন তার? সে বুড়োর দিকে দৃষ্টি রেখে হয়তো কিছু ভেবে নেয়। যেভাবে হোক কোনোমতো কেনাবেচা শেষে ফিরতে হবে। তারপর কাজ আর কাজ।

নদী। গ্রীষ্মের দিনকালে শুকিয়ে যাওয়া নালা। বর্ষায় জলের স্রোত। প্রমত্তা ঢেউ। নীল আকাশে তুষার মেঘের আনাগোনায় দু-পাড়ে লম্বা ঘাস জেগে ওঠে। বিস্তীর্ণ কাশবনে নতুন জীবনের দৃশ্যছবি। কখনো হালকা মৃদু বাতাসে রেণু রেণু স্বপ্ন-ফোয়ারা দোল খায়। সেই শুভ্র কাশবন ছায়ায় নিজেকে সঁপে দিতে কত না মন-উন্মন আবেশ। সেখান থেকে খানিক দূর উঁচুতে উলুফুলের সারি। মানুষজন তুলে আনে। ঝাড়ু তৈরি করে। ময়লা-ধুলো সব পরিষ্কার। শ্যামল কত দিন তুলে এনেছে। মা অবসরে বসে সুতলিতে বাঁধে। ঘরদোর ঝাড়ু হয়। ঝকঝক করে ওঠে গোবর-জলে নিকোনো আঙিনা। শ্যামল তখন শিখে নেয় এই কাজ। আজ সেই নদী তেমন নেই। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি-বন্যায় দু-কুল ছাপিয়ে বিশাল জলরাশি ক্ষেতের ফসল-পুকুরের মাছ ভাসিয়ে দেয়া নদী হারিয়ে গেছে। এখন সীমানার ওই পাড়ে বিশাল বাঁধ। জল বেঁধে রাখা। এ প্রান্তের নদী শুকিয়ে নিশ্চিহ্ন প্রায়। হারিয়ে গেছে কাশবন। ঘাস আর উলুবনের শীতল মেঘ মেঘ ছায়া। এখানে রুক্ষ বালিয়াড়ি। নীল-ধূসর প্রান্তর। কখনো মাথা উঁচু জেগে থাকে শুকনো শ্যাওলা-সোলাকাঠি। নদীর উঁচু পাড়। দু-চার কদম হেঁটে এলে চৌচির ক্ষেত। চেনা-অচেনা গাছগাছালি পাড়ের জঙ্গলে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো বাতাসে দোল খায়। তার ফাঁকে ফাঁকে শিমুল-ডুমুরের শাখায় বিষণ্ন-নিস্তব্ধ মাছরাঙা। নদীতে জল নেই। মাছ উধাও। রোদ্রতপ্ত দিনকাল। ভিনদেশি বাঁধ মানব সভ্যতার দগদগে ক্ষত হয়ে মনের কোণায় জেগে থাকে। মানুষ ভুলে যায় হারানো সময়ের গ্রামছবি। শ্যামল ভুলে যায়নি। ভুলে যায় না। অনেক কথা অনেক দিনক্ষণ মনের কোণায় জ্বলজ্বল করে। কখনো মন বিষাদ। কখনো…না সময়ে অনেককিছু বদলে যায়। সেও তো অনেক বদলে গেল।

কোনো এক পুর্ণিমা তিথিতে জীবনে লক্ষ্মী এলো। সেই স্বপ্নের আঙিনায় বিনিদ্র জোছনা রাত। মন তবু বিষাদ হাতড়ে আনে। প্রায় বছর গড়িয়ে গেল মা নেই। অনেক সাধ ছিল। শ্যামলের বউকে নিজ হাতে সাজাবে। ঝাঁকড়া চুলে ছড়িয়ে দেবে সুবাসিত বনজ তেল। বুকে জড়িয়ে আদর। লক্ষ্মী দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মা কোনো কোনোদিন হাত টেনে ঘরে নিয়ে আসে। পাশাপাশি দুটো বাড়ির আঙিনা। এ-প্রান্তে ফুল ফুটলে বাতাস ধেয়ে সৌরভ ও-প্রান্তে ভেসে বেড়ায়। মানুষজন আপন হতে দেরি হয় না। মা হাসিখুশি। লক্ষ্মীর মুখছবিতে সলাজ কৌতুক। চোখের পাতায় থিরথির খুশির কাঁপন। শ্যামল অপাঙ্গে তাকায়। তার চোখে-মুখেও যে শেষ-বিকেলের অনুরাগ। স্বপ্নের মায়াখেলা। দু-জন মানুষ কত সহজে খুব কাছের হয়ে যায়। একজন আরেকজনকে নিজের করে নিতে জানে। তেমনভাবে মনের আড়ালে ছোট ছোট স্বপ্ন ফুল হয়ে ফোটে। বাতাসে দোল খায়। নিজের সঙ্গে কথা বলে। স্বপ্নকথন। এভাবেই সবকিছু পাকাপোক্ত করার সময় এসে দাঁড়ায়। সে-সময় আকস্মিক হাত থেকে খসে পড়ে সুবর্ণ সন্ধে। মা চলে গেল।

সেদিন সন্ধেবেলা স্নান সেরে জ্বরে পড়ে মা। সংসারের কত শত কাজ। ভোর-সকাল থেকে শুরু হয়ে চলতে থাকে সারাদিন। দিনক্ষণ-সময়-মুহূর্ত কাজ আর কাজ। বাতাসের বেগে ছুটে চলা। তখন কার্তিকের শেষ। ঘরে ঘরে অভাব-অভিযোগ যাই-যাই করে যেতে চায় না। শ্যামলের কানামাছি আলোছায়া আঙিনা-ঘরে কি মজা পেয়েছে, পাহাড়ের মতো হাতি বসে থাকে; নড়ে না। সে বাবার সঙ্গে কাকভোরে বেরিয়ে যায়। মানুষজন ঘুগরাতলি বটগাছের নিচে বসে থাকে। তাদের বিস্তীর্ণ অপেক্ষা। তীর্থের কাক। যদি কেউ একজন ডেকে নেয়। কাজ জোটে। কাজ পাওয়া যায় না। সেদিন জীবনের প্রয়োজনে কাজের সন্ধানে আলাদা হয়। বাবা পথে নেমে পেছন ফিরে বলে, –

‘কামিম ঞাম বাম ঞাম ওড়াক্গে চালাক্মে বা। ইঞ দ নাহুমমিঞ রুয়াড়া’

(তুই তালি কাজ পাই-না-পাই ঘরোত্ চলি যাবু বা। মুই সাঁঝোত চলি আসিম।)

‘চালাক্মে বাপু ঞিত্ দ। সনতরাকায় তাহেনমে।’

(হয় বাপু তুই চলি যা হেনে। দেখিশুনি থাকিবু।)

‘আর আঞ্জামমে বা, চালাওকাতে জমমে। আম গগো তাংঘিয়েম।’

(হয় হয়… আর শোনেক বা, তুই খায়া নিবু। তোর মাওক দেখিস।)

শ্যামল মাথা নাড়ে। এরপর গামছায় জড়ানো দা বের করে দেখে নেয়। ঘরামির কাজ মোটামুটি জানা হয়ে গেছে। আজকাল কামকাজ নাই। নিস্তব্ধ অবসর। অলস দিনকাল মন্থর হাতির মতো এগোয় কি না এগোয় না বড় অধৈর্য অসহায়। সে অপসৃয়মান মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। কত দ্রুত বুড়ো হয়ে গেছে বাবা। কত কষ্ট জমা হলে মানুষের দৃষ্টি হলুদ-ফ্যাকাশে হয়ে যায়? শ্যামলের পরিমাপ করার ক্ষমতা নেই। বিবিধ অসুখে ক্লান্ত-ন্যুব্জ সৈনিক। তবু কোনোদিন সামান্য কোনো কষ্টের কথা উচ্চারণ করে না। শ্যামল শোনেনি। সে তবু দেখে। ওই দু-চোখের গভীরে কত নোনাজল ঢেউ হয়ে শুকিয়ে গেছে বুঝে নেয়। শুকনো মরানদী। সেদিন মাওলানার আঙিনা থেকে ব্যর্থ ফিরে আসে। রাত অন্ধকার। জীবন আর অস্তিত্ব নেমে যায় কোনো অচেনা নিকষ অন্ধকার সুড়ঙ্গে। সেখানে কোনো আলো নেই। শ্যামল রাতের দেয়ালে তাকিয়ে থাকে। এভাবে কতক্ষণ অপলক। কোথাও ডুবে যায়। তখন দূরাগত সংগীতের মতো ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমির কথোপকথন ভেসে আসে। বাতাসে অস্ফুট কেঁপে বেড়ায়। কোন্ রূপকথার দেশ, স্বপ্নের ভুবন থেকে কারা বলে যায় কোন্ গল্প-কাহিনি? শ্যামলের ঘরে আবছায়া রাতের দেয়াল। তন্দ্রাঘোর ভাসাভাসা বিষণ্ন কোনো গুনগুন স্তব। প্রলম্বিত মহাকাব্য উপলব্ধ হতে থাকে। মন-উন্মন-বিভোল।

‘শ্যামলা আচ গগো ইঞ্চাক দ থোরা হামাতিঞ। বাবা-গড়ম বাবা তাকোকো এর ইরকেদা। ইঞ হোঞ ওনকায়েদা। ওকাখোন চেত্ চেকায়না। ওনা হাসা বাংমা ইঞাক আর বাংকানা। কেত্ ইঞ চেকায়া। বোহক্গে বায় কামিয়েদা।’

(শ্যামলার মা, মোর একখান ভুঁই। বাপ-দাদো আবাদ করিছে। মুই করো। কুসথাকি কি হয়া গেইল, এ্যালা ওই ভুঁই নাকি মোর নাহায়। মুই কী করো! মোর মাথা কাজ করে না।)

‘মেম্বার আর অকোয়কো ঠেনেম চালাও বাড়ালেনা। চেতকো মেনকেদা?’

(কদিন যে মেম্বার আর কার কার গোড়ত্ ছুটি গেইলেন। ওমহরা কী কছে?)

‘জরিপ অকতে নিতুন বাং রাকাপ অকানা।’

(জরিপের সমায় নাম উঠে নাই।)

‘কাগাদ বাম উদুক্ আত্কোয়া?’

(কাগজপত্র দেখাইলেন না?)

‘অনাকো দ মেনাক্ নাঁহি। লাড়হাই সেরমা অকায়েন বাং চেকাবোন মেনকেয়া।’

(ওইলা ফির আছে নাকি! যুদ্ধত্ কুঠি চলি গেইছে কাঁয় জানে।)

‘এনডেখান হাসা দ আর বামা ঞামা?’

(তাইলে এ্যালায় ভুঁই পাইমেন না?)

‘চেত্গে বাঞ বাডায়া, বাঞ বাডায়া।’

(মুই কিচ্ছু জানো না! জানো না।)

জানা-অজানার রহস্যঘেরা জিজ্ঞাসা কিংবা হতাশ যবনিকা সীমাহীন রাতে দোল খায়। রাত-অন্ধকার দেয়ালে ফেনিল ঢেউ তুলে তুলে দিগন্তে মিশতে থাকে। শ্যামলের দু-চোখ ভারী। তার কিশোর হাতে কোনো শক্তি নেই। কোনো জাদুমন্ত্র? রূপকথার বিষণ্ন স্তবগাঁথা শুনতে শুনতে কল্পনার দেয়াল ধ্বসে পড়ে। সে কি উঠে দাঁড়ায়? সেই ছায়ান্ধকার নিশ্চুপ কোণায় ছুটে চলে? শান দিয়ে রাখা দা’এর কোপে নামিয়ে ফেলে বিশাল কোনো মুণ্ডু? চুল-দাড়ি-পাগড়ির তলায় ঘিনঘিন করে ওঠে পান-জরদার মাখামাখি বিকট গন্ধ? সে সকল ছিল অসীম কল্পনার অভীপ্সা। দুর্দান্ত মোহমায়া। তার ঘুম মিলিয়ে যায়। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে আঙিনায় নেমে আসে।

হিম-কুয়াশা রাতে শিশির পড়ে কি পড়ে না, মধ্য-আকাশে অস্বচ্ছ-ঘোলা চাঁদ, তেমন কোনো তারা নেই; দেখা যায় না। দেয়ালের ওপাশে সারারাত জেগে থাকা নিশিপুষ্পাদল সুবাস জুড়িয়ে ঘুমোতে তোড়জোর ব্যস্ত। আঙিনার পুবপ্রান্তে দরজার হুড়কো খোলা। শ্যামল রাস্তায় বেরিয়ে আসে। বাবা আবার সেখানে গিয়েছে। মৃত্তিকার বড় মায়া। দূরে-বহুদূরে কোনো ছায়া আবছায়া লাগে। ওখানে একখণ্ড জমি ছিল তাদের। এখন নেই। কে দাঁড়িয়ে থাকে তার প্রান্তসীমায়? রহস্যময় ভূত-প্রেতের ছায়ামূর্তি। প্রাগৈতিহাসিক প্রচ্ছায়া। শ্যামলের স্বপ্ন-ঘুম ঘোর। পায়ে পায়ে এগোয়। কয়েকটি বাঁক পেরিয়ে নাতিদীর্ঘ পথ। সেই ছায়া নড়ে না। নিথর নিশ্চুপ কোনো বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকে। সে কিছু দেখে। দেখে যায় আকাশ। কোথায় ঈশ্বর অথবা তার দুনিয়া? সতর্ক শ্রুতিতে কোনোকিছু অনুধাবনের চেষ্টা। স্পর্শ ব্যাকুল। আচমকা দমকা বাতাসে কেঁপে ওঠে ছায়া চাদর।

‘বাপু ননডে রাবাংরে চেত্এম চেকায়দা? দেলা, ওড়াক দেলা।’

(বাপু তুই এ্যাঠে জাড়োত্ কী করোছি? চল ঘরোত্ চল।)

‘থিরক্মে শ্যামলা। আনজমিদাঞ, হোড়ো গেলেরএ লবান রেয়াক সেরেঞ।’

(চুপ কর শ্যামলা। শোনা পাছি, ধানের শিষে নবানের গান।)

‘ইঞ দ কেত্গে বাঞ আনজমেদা। মেদেলা রাবাংমেয়া।’

(মুই কিছু শোনা পাও না। চলেক, জাড় লাগিবি।)

‘লুতুর কিড়বিত্কাতে আনজম হোয়েক আ বা। হয়রেগে সেরেঞ দ আনজমক্ আ।’

(কান পাতি শোনা লাগে বা। বাতাসের ঢেউ। ঢেউয়ের মুখোত ঝিরঝির গান।)

‘আবো দ চেত্ রেয়াক লবান তাবো। মেদেলা ওড়াক মেদেলা।’

(হামাগের নবান নাই বাপু। ঘরোত্ চল…চলেক।)

‘হায়রে বাড়গে তিঞ…দায়াগে হাসা তিঞ।’

(মোর ভুঁই বা…মোর মাটি।)

শ্যামল কী বলে? এক সময় এই জমি তাদের ছিল। বাপ-ব্যাটা দু-জনে হাল জুড়েছে। তরতর করে বেড়ে উঠেছে ধান। কার্তিকের শেষে আনন্দ বুকে নিয়ে ঘরে তুলেছে শস্য। এখন কিছু নেই। প্রিয় কিছু হারিয়ে যাওয়ার বেদনা বড় নিশ্চুপ। অনেক গভীর। বুকের গহিনে তোলপাড় তোলে। তাকে মানিয়ে নিতে হয়। অস্তিত্বের প্রয়োজনে ভুলে যেতে হয়। এই হলো যুদ্ধ। সে মানুষটির হাত ধরে টেনে টেনে ফিরে যায়। ফিরে আসে। পড়ে থাকে কিছু শুকনো আবেগ, অশ্রুভেজা ভালবাসা ছলছল দৃষ্টির দৃশ্যছবি। সেই জমি ফিরে পাওয়া গেল না।

 

এক সন্ধেয় গোঁ-গোঁ ভূমিকম্প নিনাদ তুলে, আকাশে ধুলো উড়িয়ে কোনো অন্ধকার ছায়া এসে দাঁড়ায়। পুব-আকাশে জেগে উঠেছে দু-একটি তারা। অনেক দূর থেকে মিটমিট হাসে। তারা চমকে ওঠে জলদগম্ভীর হুংকারে।

 

‘নীলকান্ত… ও বাহে নীলকান্ত, বাড়িত আছি?’

শ্যামল ধড়পড় করে বেরোয়। বাবা দাঁড়িয়ে আছে। মাওলানা আজিজার মণ্ডলের জোব্বা পোশাক। বোবায় ধরা মানুষের মতো অসহায় বাবার পাশে দানব মনে হয়। জবা ঝাড়ের একপাশে মটরসাইকেল স্ট্যান্ড করে রাখা। একজন মানুষ নিশ্চুপ মূর্তির মতো নিশ্চল তাকিয়ে থাকে। শান্ত-গভীর দু-চোখ অন্ধকারে চকচক ঝলসে ওঠে। জাকির মাস্টার। শ্যামল চেনে।

‘বাহে নীলকান্ত, একখান কথা কবার তনে আসিবা হইল। কথা হইল্ কি…।’

‘হয় বাবু।’

‘তুই জাকির মাস্টারের জমিত যায় কী করিস? তোক নিড়ানি দিবার কাঁয় কইছে? যাঁয় আবাদ করোছে তাঁয় দেখিবি। তোর মাথাব্যথা ক্যানে?’

‘ভুঁইখান তো…।’

‘তুই কি এ্যালাও জমির মালিক আছি? জাকির মাস্টার আবাদ করে। তোর ফলনা চুলকায় ক্যান আঁ?’

‘ওই ভুঁইকোনা মোর বাপ-দাদো দিয়া গেইছে বাবু। তোমহরা ক্যাংকরি কি করিছেন, এ্যালায় কছেন ভুঁই মোর নাহায়।’

‘তুই যি মেম্বার-চেয়ারম্যানের গোড়ত্ দৌড়াদৌড়ি করলু, তো ওরা কী কইল? ফলনা-টেসকু দিল তো? শোনেক ওই জমি হইল খাস। তোর দাদো নিয়া খাছিল। ম্যালা বছরের খাজনা-ট্যাক্স বাকি। সরকার সেখন নিজের ঘরোত নিছে। মুই নিলাম ডাক দিয়া জমি বন্দোবস্ত নিছু। তুই জমির শোক ভুলিবার পারেছু না? শোনেক মুই তোক সাবধান করি দেছি, আর ককখনো জমির ধারে কাছোত যেন না দেখঁ; নাইলে মোর থাকি খারাপ কাঁহো হবি না। বুঝিলু?’

‘মোর জমি মোর ভুঁই। বাবু তোমহরা ফেরত দেন। ক্যাংকাবা করি নিছেন। মুই গরিব মানুষ ভুঁইকোনা ফেরত দিলি বাঁচি থাকনু হয়।’

‘শালা কয় কি রে!’

শ্যামল দেখে, বাবা অন্ধকার কোনো কোণায় হাতজোড় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আচমকা মাওলানার পায়ে হাত দিয়ে ফেলে। জোব্বা ছায়া দ্রুত সরে যায়। তারা ছোটজাত। কুলীন মানুষের পায়ে স্পর্শ রাখা গর্হিত অপরাধ। এরপর কখন কীভাবে কী হয়ে যায়, শ্যামল বুঝতে না বুঝতে দেখে; বাবা কুণ্ডলিত কোনো প্রাণির মতো নিচে বসে আছে। তার দু-চোখে অশ্রুধারা দিঘি অথবা রক্ত জবা আগুনের হলকা। মটরসাইকেল আবার ভূমিকম্প তোলে। অন্ধকার থেকে অন্ধকারে বেরিয়ে যায়। শ্যামল কোনো ধুলোরেখা দেখতে পায় না। দেখা যায় না। তার শেখা প্রথম অপমান। বুকে দাগ কেটে জেগে ওঠা আগুনের শিখা। আগুন জ্বলে। অহর্নিশ জ্বালায়। জ্বলতে থাকে। কিছুতেই নেভে না। তারপর থেকে থেকে জানান দেয়, সে আছে, চলে যায়নি; একদিন বেরিয়ে পড়বে। দা’এর চকচকে ক্ষুরধার কোণায় কোণায় প্রতিফলিত প্রতিটি দিন এবং রাত নিশ্চুপ মহাকাব্যের বিষাদ শ্লোকগাঁথা। বাবার জন্য মন পোড়ে। সেই মানুষ সারাদিন সারারাত ঘরের কোণায়, আঙিনায় নিম বা মেহগনি ছায়ার নিচে পড়ে থাকে। ছানিঘোলা দৃষ্টিতে কাউকে চিনে নেয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা। নাকি কোনো অভিযোগ বা বিচারহীনতার বিশুষ্ক অপমান প্রতিবাদ অবগাহন কে জানে। শ্যামলের দু-চোখ ভিজে আসে।

কোমরের সঙ্গে বেঁধে রাখা পুটলি। শ্যামলের অস্তিত্ব মূলধন। লক্ষ্মী বার বার সতর্ক করে দেয়, দেখে শুনে যেও। পথঘাট ভালো নয়। কেউ কিছু খেতে দিলে খেও না। শ্যামল কথা রেখেছে। কথা রাখে। রাস্তায় নেমে টাঙায় বসে কতবার সকলের অলক্ষ্যে টাকার স্পর্শ মনে নেই। এবার লুঙ্গির বাঁধন আলগা করে পুটলি খোলে। কাগজের কতগুলো নোট। তেল চিটচিটে ঘামে ভেজা স্যাঁতসেতে নোটের মধ্যে দু-একটি চকচকে রং ঝিলিক মারে। চোখে উৎকট লাগে। টাকা তবু টাকা। মন ভালো করে দেয়। মন ভালো হয়ে যায়। এই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে কিছু কিছু মানুষের বিত্ত-বৈভব-ঐশ্বর্যের ঝকঝকে জীবনযাপন যেমন, ভালো লাগে, দু-চোখে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতে সাধ হয়; শ্যামলের ঘামভেজা ভাঙাচুরা বেঁচে থাকা ময়লা-আবর্জনা। সে চকচকে টাকা নয়। টাকার মূল্য আছে। তার নেই। টাকা হলো ঈশ্বর। তিনি এই বিশাল পৃথিবী চালান। ভালো-মন্দ ন্যায়-অন্যায় সকল কাজ সকল বিচার তার হাতে।

শ্যামল টাকা গোনে। এক-দুই-তিন। তাক ধিনা ধিন ধিন। মানুষ নাচে। টাকা নাচায়। টাকায় সুখ! মানুষের মুখ। সেই চেহারায় থাকে আনন্দ-হাসি। বেঁচে থাকা স্বর্গসুখ। শ্যামল নরকের কীট। অস্তিত্বের শবাধারে মৃত জঞ্জাল। তার দৃষ্টি বিষণ্ন-উদাস। সে টাকা মানুষের হাতে তুলে দেয়। বুড়োর দু-হাতের মুঠোয় সুখ-আনন্দ। শ্যামলের হাতে কী? উলুফুলের ঝাড়। কাশখড়ের আঁটি। সে শুকনো গাদা টাঙায় তোলে। তাকে যেতে হবে সাত ক্রোশ পথ। দূরের রাস্তা, ধুলোওড়া বালুরাঙা শূন্য তেপান্তর। মাথার উপর রোদ। গনগনে আগুন। সূর্য যেতে যেতে ডুবতে শুরু করে। আগুন নিভে যায়। ফেলে রাখে কাঠ-কয়লা-ছাই জীবন। শ্যামলের মনে আগুন নেভে না। কোনোদিন উসকে ওঠে। কত ছবি ভেসে যায়। আঙিনার উত্তর কোণায় নিমগাছের ছায়ায় শুয়ে থাকে বাবা। মেহগনির দু-একটি বৃন্তচ্যুত পাতা দড়ির খাটে সঙ্গে শুয়ে থাকে। অনেক দূরে শ্যালো-মেশিনের ধুক ধুক শব্দঢেউ। কারও ক্ষেতে নেমে যায় শীতল জলরাশি। বাবা কি ছানিঘোলা বোবা দৃষ্টি তুলে দেখে যায়? জলঢেউয়ের গান শুনে হারানো দিনের কোনো ছবি আঁকে? শ্যামল পারল না। সে পারে না। সেই দৃশ্যছবির মধ্যে অসহায় কোনো কান্না বাতাসের শব্দে মিশে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাস হয়। মনের দেয়ালে আছড়ে পড়ে। সে পালিয়ে আসে। তখন লক্ষ্মী উনুনের ধূসর ছাইয়ে তাকিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখে যায়। তাদের আগামী দিন। শ্যামলের দৃষ্টিতে কোনো আলোছায়া দৃশ্যছবি উঁকি মারে। একটি শিশু আঙিনায় হেঁটে বেড়ায়। তার কোমরের ডোরে সাতফোঁটা পাথরের মাদুলি রোদে ঝিলিক দেয়। শ্যামলের চোখে-মুখে। তার মন-উন্মন অস্থির। লক্ষ্মীর বেশি দেরি নেই।

‘চাচা এই দিনু। এর বেশি দিতে পারমু না বাপ। বেচাবিক্রি নাই।’

‘কি যে বুলছিস ব্যাটা। একেকটা ঝাড়ুর দাম আট-দশ ট্যাকা। তুর ট্যাকা হবে না ক্যানে?’

‘না গো চাচা ব্যবসাপাতি নাই। মানুষজন তো পিত্তিক হাটে ইসব কেনে না। জিলিপি-বুন্দিয়ার দোকান? চায়ের দোকান দিলি পরে কিছু ট্যাকা হয় বটে।’

‘তা তুই দিবার পারিস ভাতিজা। একটো দোকান দিয়ে ফ্যাল্।’

‘ছোটজাত গো। এই হাতে জল খাবি মানুষ? ওমহরা মোর ঝাড়ু কিনবি। বাখ্যান করবি। সেই ঝাড়ু দিয়া জঞ্জাল সরাবি।’

বুড়োর নিষ্পলক দৃষ্টি কি কেঁপে ওঠে? শ্যামল বুঝতে না বুঝতেই আচমকা দমকা বাতাস। আগুনতাপ ঢেউ। মাঠের ঘাস পোড়ে। ক্ষেতের পানি সরসর করে নিচে নেমে যায়। বাতাসের সঙ্গে উড়ে উড়ে মেঘে মেশে। কাদামাটি ফেটে ফেটে নিষ্প্রাণ চৌচির। ক্ষেতের বুকজমিনে কোনো ক্ষত অভিমান। মানুষের চেহারায় তেমন প্রত্নতাত্ত্বিক চিত্রপট। জাতপাতের কুলীন সীমারেখা। আগুন তাকে পোড়াতে পারে না। শ্যামল ঝাড়ুর কারিগর। একসময় ঘরামির কাজ ভালো শিখেছিল। পাঁচ আঙুলের ডগায় নতুন খড়ের আঁটি ধরে ধরে সুতলিতে বেঁধে গেছে মনোরম ছাউনি। সেই ছায়ায় মানুষ শুয়ে থাকে। আরামে ঘুমোয়। কারও জীবনের সকল দিনরাত সুখ-আদরে কেটে যায়। তখন কোনো জাত বিচার থাকে না। শ্যামল জমিতে ধানচারা রোপণ করে। নিড়ানি দেয়। আগাছা উপড়ে ফেলে। শক্তিশালী নষ্ট মানুষের দাপট উপড়ে ফেলতে পারল না। অবশেষে জমি ছেড়ে দিনমজুরের রাতদিন। ঘরামির কাজ। এখন সে ঝাড়ু তৈরি করে। সারাদিন একা একা উলুফুল আর কাশখড়ের নকশি গাঁথে। সুতলিতে চেপে চেপে বেঁধে দেয় মজবুত গিঁট। লক্ষ্মী কখনো সঙ্গ দেয়। সারাদিন খেটে খেটে তৈরী হয় ঝাড়ুর স্তূপ। তারপর হাট-বাজার, রাস্তায় রাস্তায় ফেরি; শহরের দোকানে দোকানে দেয়া। অলিগলি বাড়ি বাড়ি হাঁকডাক। মানুষ কেনে। তারা ঘরদোর আঙিনা পরিষ্কার রাখে। পরিচ্ছন্ন সুখী জীবন। শ্যামল সকল জঞ্জাল সরিয়ে ধরে রাখে নিজের জীবন কাহিনি। জীবনের যত জঞ্জাল। অভিমান চোখের ম্লানরেখায় সভ্যতার আদিগন্ত ভেদাভেদ, দুঃখ-কথা; প্রবঞ্চনা ইতিহাস।

 

তখন টাঙা ছুটে চলে। প্রলম্বিত দীর্ঘ পথ। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? আকাশ দিগন্ত প্রান্ত-সীমানায়। দূর-অতিদূর তপ্ত বাতাসের দিশেহারা মায়াঘোর ছায়া। চোখ ঝিলমিল করে। অনেক উঁচু শূন্যে দু-একটি চিল ভেসে ভেসে ঘুরপাক খেতে থাকে। শ্যামল নিজেকে খড়ের স্তূপে এলিয়ে দেয়। কাঁধ থেকে গামছা টেনে চোখে-মুখে ছড়িয়ে রাখে।

 

শ্যাওড়াতলা তালদিঘির জলে ঝপাত করে নেমে পড়ে কেউ। চারপাশে ছলকে উঠে জলতরঙ্গ রংধনু। শ্যামল চমকে ওঠে। নিশ্চয়ই বড় কোনো রুই-কাতলা অথবা আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো গাছের ডালাপালা। সে হত-বিহ্বল স্তম্ভিত। মা-বাপের বারণ, দুপুর রোদে তালদিঘি ঘোরা যাবে না। সেখানের বাতাস ভালো নয়। বাতাসের ঢেউয়ে অপচ্ছায়া বিড়বিড় গুঞ্জন। শ্যামল কোনোদিন শোনেনি। সেদিন কি হলো? ভয় পেয়েছে? বাঁশঝাড়ের গহিন ছায়ায় সবে ফাঁদ পেতে রাখল। যদি একটি বালিহাঁস কিংবা বনবিড়াল ধরা দেয়। শ্যাওড়ার শাখায় শাখায় পাতার ফাঁকে প্রগাঢ় অন্ধকার। কেউ নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। বাতাসের ঢেউয়ে অশরীরি ফিসফিস কী কথা বলে যায়। সে সত্যি চমকে ওঠে। দিঘির জলে নেচে চলে সূর্যের সাতরং। ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে চোখধাঁধানো স্ফুলিঙ্গ। নিজের মধ্যে মগ্ন আনমনা এক জলপরি জলের বুকে সাঁতার কাটে। কি মসৃণ কেটে যায় জলের পাতলা শাড়ি। কে…কে সেই মায়াবিনী? শ্যামলের ভয় ভয় দৃষ্টিতে কৌতূহল নেচে যায়। ফ্যাকাশে বিবর্ণ চেহারায় উৎসুক জিজ্ঞাসা। একটু হেঁটে এসে খুঁজে ফেরে জলের কিনার। জলঢেউ রেখা। কেউ তো নেই। তখনো বাতাস ধরে রাখে চঞ্চল জলের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। ঢেউয়ের বৃত্তাকার রেখায় প্রতিবিম্ব কারও। ক্রমশ সকল মায়াভ্রম ভেবে ঘুরে দাঁড়াতে যাবে, আড়ালের ছায়া থেকে কথা বলে ওঠে কেউ। সেই কি একজন, যে মানুষ কিংবা সে জানে না, কে সে; চকিতে ধরা দেয় দৃষ্টিরেখায়।

‘জাহানাক্ এম নামকেদায়া সেয়ান হড়?’

(কিছু পেলে গো সেয়ানা মানুষ?)

‘ওকোয়? ওকোয় রড়েদা?’

(কে? কে কথা কয়?)

‘ইঞকান গিয়াঞ য়া।’

(মুই গো মুই।)

‘ওকোয়? লক্ষ্মী! আম ননডে দ চেদাক্?’

(কে? লক্ষ্মী! তুই এখেনে ক্যানে?)

‘ননডেনাক দাক্ দ আডি রেয়াড়গেয়া।’

(এখেনের জল বড়ই শীতল।)

‘আমাক্ হড়ম রেয়াক্ সেংগেল দ আড়িচ্এনা?’

(তো শরীরের আগুন নিবেছে?)

‘মেন! আম দ চালাকমেয়া…বাবাহড়কো তাহেন খান চেকাতেঞ উমোক্ আ?’

(হুঁ! তুমি যাও গো…পুরুষমানুষ থাকলে নাইতে পারি?)

‘তালেপুখরি দ মেনখান ভাগে জায়গা দ বাংকানা।’

(তালপুকুর কিন্তুক জায়গা ভালো লয়।)

‘চেদাক্ ভূতকো সাসাপ আ?’

(ক্যান্ ভূতে ধরবি?)

‘ইঞগেঞ সাপ্মেয়া। অকয় হো বানুক্কোয়া।’

(মুই ধরিম। কাঁহো কুথি নাই কো।)

‘হি হি হি বদমাশ কানাম…শয়তান দ! চালাক্মে অকাতেম চালাক্আ।’

(হি হি হি বদমাশ…শয়তান! যাও য্যাঠে যাবার যাও।)

‘নক্অয়ইঞ দনকেদা! হু য়া ও!’

(এই দিনু ঝাপ। হু য়া ও!)

‘আম দ একাল বাম বুজহাউআ চালাক্মে দো আমাক্ কামিতে।’

(এই যা যা তুর কাজে চলি যা।)

‘নাসোয়াক্ ওনডংলেনমে নেলালমগেঞ।’

(একটু বেইরা না ক্যানে, তোক দ্যাঁখো।)

‘ছি ছি ছি চালাক্মেয়া সেয়ান হড় কানাম।’

(ছি ছি ছি তুমি যাও গো সেয়ানা মানুষ।)

‘মিতুম বাম নামলেদা? তালারে মিত্-বার চানদো মেনাক। ইনা তায়োম আঘন।’

(তুই নাম নিতি পারলিনি? মধ্যত্ দু-একটা মাস। তারপর আঘন।)

‘আয়মা মাহা মেনাক্আ য়া।’

(ম্যালা দিন পইড়ে রইচে গো।)

‘ওনাগেঞ মেনা…লক্ষ্মী ও লক্ষ্মী…।’

(তাই তো কই…লক্ষ্মী ও লক্ষ্মী…।)

দিঘির পাড়ে জল-নতমুখি ঝোপ কেঁপে ওঠে। কপট হাসির আশকারা ঝংকার। গামছা-লাল কোনো জলঢেউ অপাঙ্গে ঝিলিক মারে। শ্যামলের প্রবল ইচ্ছে, নির্জন-নিরিবিলি দুপুরের প্রান্তে জাপটে ধরে মৎস্যকন্যা। দিঘির মধ্যখানে, যেখানে ওই পাড়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের শিখরছায়া কেঁপে কেঁপে নেমে গেছে; তাকে টেনে যায়। সে পারে না। তার বুক কাঁপে। গলা শুকিয়ে যায়। আকাশের তপ্ত রোদে চোখে জ্বালা ধরে। দিঘির হিমশীতল স্পর্শ বাতাসে দোলা ছড়ায়। সে নিজেকে অথবা তাকে কম্পনের ভগ্নাংশ হতে বাঁচাতে রাস্তায় নেমে পড়ে। দূরে ইটভাটা। কালো চিমনি দিয়ে ধূসর-সাদা ধোঁয়া বেরোয়। নীল আকাশের বুকে ভেসে ভেসে দিগন্তে মেশে। সে পুবে ক্ষেতের সামনে গিয়ে কী ভেবে পেছন ফিরে তাকায়। নিষ্পলক খোঁজে কাউকে। আহা এক জলপরি কত অবলীলায় জলে মেতে উঠেছে। বাতাসে ভেসে আসে জলখেলার শব্দঢেউ।

এমন সেই আবেগ-ভালবাসার দিনক্ষণ কত সহজে ফুরিয়ে যায়। তখন লক্ষ্মী ঘরে এসেছে। কত রাত মৌন-মুখর-শব্দমালায় কেটে গেল। নিরিবিলি নির্ঘুম শব্দকথন। জোছনারাতে কত সময় এসে দাঁড়িয়েছে কদমের ছায়ায়। সে হলো তেপান্তর জাদু-কাহিনি। জীবনকে নতুন করে দেখা। নতুন আলোয় পাওয়া। একজন আর একজনকে বুঝে নেয়ার সময়কাল। লক্ষ্মীর মা-বাবা সকলে রাজশাহি চলে গেছে। শ্যামলের মা নেই। বাবা একলা মানুষ খুব দ্রুত বুড়ো হয়ে গেল। সারাদিন কোথায় থাকে, কোথায় যায়, কোথায় ঘোরে; শ্যামল জানে অথবা জানে না। সে কী করে? দু-দণ্ড সময় নিজের জন্য নেই। কাকভোরে চলে যায়। মানুষের কাজ করে। ফিরে আসতে আসতে সন্ধেরাত। তারপর খুঁজে ফেরা। বাপ গেল কই? কোনোদিন নদীর পাড়, বাঁশঝাড়ের অন্ধকার ছায়ায়; অথবা সেখানে যেখানে মানুষ ফিরে ফিরে আসে। বাবাকে কোন্ মায়া টানে! কেন? এত মায়া বাড়িয়ে লাভ কি? যা চলে যায়, চলে যেতে দাও; কোনোকিছুই তো ধরে রাখা যায় না। সে আলগোছে বাবার কাঁধে হাত রাখে। মানুষ উদাস-বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়ায়। শ্যামল দেখে, একখ- জমি, শস্যক্ষেত; একদিন তাদের ছিল। সেই বাবা আকস্মিক বিছানায় পড়ে গেছে। সেদিন রাতদুপুরে চিৎকার আর্তনাদ। শ্যামল ছুটে গিয়ে দেখে, বাবা মেঝেতে পড়ে অস্থির লুটোয়। মেঝেয় জলকাদা শুকিয়ে গেছে প্রায়। আবদ্ধ হালকা ঝাঁজগন্ধ। অন্ধকার ছায়ায় তার বাঁ-চোয়াল ঝুলে গিয়ে মুখ-চোখ বাঁকা অদ্ভুত লাগে। দরজায় দাঁড়িয়ে অবাক-বিষ্মিত লক্ষ্মী। ভয়ার্ত নিশ্চুপ।

 

বাবার স্মৃতিভ্রংশ। কাউকে চিনতে পারে, কারও দিকে ফ্যাল ফ্যাল উদাস দৃষ্টি। সেই চোখ কী বলে অথবা বলতে চায় সবটুকু হোক বা না হোক কিছু তার বোঝা যায়, বোঝা যায় না; কে জানে বুঝতে চায় না শ্যামল। কবিরাজের কাছে যায়। অনেক আশা-প্রত্যাশা। আবার যদি উঠে দাঁড়ায় বাবা।

 

‘আমাদের ওষুধে চিনি-গুড়-মধু, তোমার বাপের চলবে না। সদরে হাসপাতাল নিয়া যাও। ডাকতার দেখুক। মধুমেহ। হিসাব করি খাওয়া-দাওয়া, যত্ন-আত্তি দরকার। তারপর সব উপরঅলার ইচ্ছা।’

‘দেখেন কাকা দেখেন। মানুষটা উঠি দাঁড়াক। বাঁচি থাকুক।’

‘পরে কিছু কইতে পারবা না আবার, যে কবিরাজ অসুখ বাড়াই দিছে। একটা প্রলেপ দি। এইটা বাঁ-হাত কবজি থাকি গোড়া, বাঁ-পা উরু পর্যন্ত ল্যাপ দিবা। সারাদিন রাখবা। সকালে আবার ল্যাপ। আকন্দপাতার সেক। গরম পাইলে রগ ছাড়ি দিবে। তোমার বাপের বয়াস কত?’

‘কত আর…চল্লিশ-পঞ্চাশ।’

‘দুর ব্যাটা! সত্তর-বাহাত্তর মনে হয়। এখন তো যাওয়ার সময়। মন শক্ত করি রাখো।’

শ্যামল মুখের উপর থেকে গামছা সরিয়ে নিলে উজ্জ্বল-উদোম আকাশ দৃষ্টিতে হামলে পড়ে। আজকেও তেমন তাপদাহ। ধাঁ-ধাঁ চোখ ঝলসানো রোদ। তীব্র আলোর ঝলকানিতে কত কথা মনে পড়ে যায়। পশ্চিম আকাশের দূর কোণায় স্বপ্ন-মায়া-মরীচিকা। হালকা সাদা মেঘ ফুলরেণুর মতো জমা হয়। বৃষ্টি হবে কি হবে না কে জানে। আকাশ জীবন দেখে যায়…জীবন ডাকে।

 ‘কতদূর এয়েচি গো মোজাফর ভাই?’

‘এই তো মাঝাডাঙ্গা হাট পেরিয়ে এলাম।’

‘টের পানু না।’

‘তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে।’

‘হাট-বাজারের শোরে তো…।’

‘আজ হাটবার নয়।’

‘ও মঙ্গলবার তো হাট বসে না।’

টাঙা চলে। নেমে আসে সময়ের প্রান্তসীমা। শ্যামলের দিনকাল ছায়াছবি। সকালে বাবাকে নিমগাছের ছায়ায় রেখে এসেছে। লক্ষ্মী পোয়াতি মানুষ। ভারী পেট ঝুলে পড়েছে প্রায়। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। সেও খাটে হাত দেয়। সেখানেই শুয়ে থাকে বাবা। তাকে পরিষ্কার করা, কাপড় ঠিক করে দেয়া, মুখে তুলে খাওয়ানো; লক্ষ্মী ধীরলয়ে সবটুকু করে। আজ নিমছায়ায় কাত হয়ে অদ্ভুত হাসে বাবা। নিশ্চুপ রহস্যময়। শ্যামল অনেকদিন পর তেমন মুখছবি দেখে। অথবা কে জানে চোয়ালভাঙা বাঁকামুখ মানুষ আনন্দ ধরে আনতে পারে কি না। তবু ভালো লাগে। বাবা আনন্দে থাক। মানুষ আপনমনে কত কথা বলে যায়, কেউ বোঝে কেউ বোঝে না; কেউ বলে বদ্ধ- পাগল। উন্মাদ। আপনমনে হাসে, কখনো কাঁদে; কখনো অন্যজগতের মানুষ। বাবা কোন্ পৃথিবীতে থাকে? তার স্মরণশক্তি নেই। আনন্দময় কথকথার মানুষ নিশ্চুপ নীরব আজ। প্রসারিত সম্মুখে ভাষাহীন চোখ ছড়িয়ে কী কথা যে বলতে চায় বোঝা যায় না। অথবা জেনে নিতে কাঙাল। শ্যামল কী বলে? বাবার স্মৃতিতে নির্জন-নিস্তব্ধ দুপুরে জল গড়িয়ে চলার শব্দ। বাতাসের কানে কানে ধানশিষের গান। বাবা সহজে খুঁজে পায়। শ্যামল কোনোদিন শোনেনি। কান পেতেও না।

সেই কথা দেড়-দুই মাস পর না বললে কি এমন ক্ষতি হতো কিংবা লাভ কী, কেউ ভেবে দেখে না; অন্তত লক্ষ্মী জানে না। বোঝার মতো মন নেই। আনমনা। অগ্রহায়ণের দিনশেষে সন্ধের আলোয় হিমবাতাসের নিশ্চুপ দোলা। তখনো পশ্চিম আকাশে গোধূলির রক্তিম আভা। শ্যামল চোখ তুলে তাকায়। মন হতচকিত-বিহ্বল। আকস্মিক নিষ্কম্প স্থির। লক্ষ্মী আবার বলে, –

‘বাপু দ মেনখান এনহিলোক কাথায় রড়লেদা। পুসটাউতেঞ আমজমকেদা।’

(বাপু কিন্তুক সেদিন কথা কয়ে উঠেছিল। মুই পষ্ট শুনিছু।)

‘চেত্! বার সেরমা অকয় হড় গুংড়া লেকায় তাহেকেনা, উনি দ চেকাতে কাথায় রড়া?’

(দূর! দু-বছর যে মানুষ বোবা হয়ে রইল, তার মুখে ক্যাংকরি কথা আসে?)

‘পুসটাউতেঞ আনজমা আকাদা। মেনখান আম দ বাঞ লাই আকাও আতমেয়া।’

(মুই পষ্ট শুনিছু। তুমাক কই নাই।)

শ্যামল তাকিয়ে থাকে। সম্মুখ দৃশ্যপট নাকি কোনো সুদূর অতীত থমকে দাঁড়ায়, রাতের ছায়া ধীরে ধীরে নেমে আসে; আঙিনায় জবাঝাড়ে মিইয়ে পড়ে দু-চারটি ফুল। এ কেমন কথা? পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় কথা কয় মানুষ? তখন দমকা বাতাসে কেঁপে ওঠে খড়ের গাদা শিখরদেশ। স্তূপ থেকে গড়িয়ে নেমে যায় দু-একটি ঝাড়ু।

‘লাহাতে দ বাঞ লাইয়াতমেয়া।’

(আগোত কইন্নাই তো।)

‘চমকাওলেন তাঁহেঁয়াঞ। পাতি আউগে বাং হেচলেনা। বাপু দ আর হোয়ে মেনকাদা। নংকাগে মিত্ধাও…বারধাও। ইনকাতে…।’

(মুই চমকি উঠিছিনু। বিশ্বাস হয় নাই। বাপু ফির কইলে। একবার…দুইবার। তারপর…।)

 

লক্ষ্মীর চোখ ছায়াম্লান। শ্যামল আলোছায়ায় তাকিয়ে অলৌকিক কোনো হদিশ হাতড়ায়। শেষযাত্রার সময় কথা বলে উঠেছিল বাবা। কী কথা? সেদিন টাঙা বিকেলের প্রান্তসীমায় বাঁশঝাড় পেরিয়ে আঙিনায় আসতে না আসতে দেখে মানুষজনের ভিড়। বাতাসে ভেসে থাকে চরম সত্য। পরম পূজ্য পিতা কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে। কেউ মুখে জল দেয়ার সময় ধারেকাছে ছিল না। সেই কাহিনি জেগে থাকে। চোখে ভাসে। ভেসে ভেসে আবছা করে রাখে দৃষ্টি।

 

সেদিন নিমগাছের ছায়া-অন্ধকারে পড়ে থাকল খাট। কাঁথা-বালিশ। পুকুরপাড়ে কদমগাছের নিচে মানুষটিকে শোয়ানো হলো। পৃথিবীর সকল কাজ-কমর্, আনন্দ-বেদনা-হাসিকান্না, মান-অভিমান, অভিযোগ-দুর্যোগ সব জল ঢেলে ঢেলে ধুয়ে দিল কেউ। শ্যামল কী করে? মন হত-বিহ্বল বিবশ। বাবা তো মরেই গিয়েছিল। যে অশত্থ ছায়া তবু মাথার উপর, আলগোছে নির্মম সরে যায়। মধ্যরাতের আগে আগুন দেয়া হলো। এই তো জীবন। তারপর বেঁচে থাকা দিনকাল, অস্তিত্বের খেয়াপার; পুরোনো সবকিছু ফিকে হয়ে যায়। ফ্যাকাশে হতে থাকে। জীবনের একমাত্রা থেকে অন্যমাত্রায় যাত্রা করে। পথে নেমে যায়। তাই সেদিন যে কথা না উঠলেও কোনো ক্ষতি হতো না, কিংবা কী লাভ; কৌতূহল চমকে অপলক জেগে থাকে সে।

‘বাপু চেত্ কাথায় রড়লেত্ তাহেয়া লক্ষ্মী?’

(বাপু কী কথা কয়েছিল লক্ষ্মী?)

‘অহঞ মেনকায়া। বাঞ দিশায়েদা।’

(জানি না। মনে নাই কো।)

‘আম দ বাম লাই আ।’

(তুই আর কবিনে।)

‘রাংগাক্ আম নাহাক। নোয়া ঘাটা নিনদা নোয়াকো কাথা দ তাহে আচোয়ান। গাপা সেতাক্ ইঞ মেনা।’

(তুমি রাগ করবা। ভরা সন্ধ্যায় ইসব থাক। কাল বিহানে কবো।)

‘চেদাক্ ভূতকো সাসাপ আ? ইঞ কানগেচুঞ মিত্চেন লাটু ভূত দ।’

(ক্যান ভূত ধরবি? মুই তো বড় একখান ভূত!)

‘আম দ ভূত দ বাং, রাক্ষস কানাম। ইঞেম জমেঞা আম দ। হি হি হি!’

(তুমি ভূত না, রাক্ষস। মোক মারি কাটি খাবি। হি হি হি!)

শ্যামল হাসতে পারে না। লক্ষ্মীর আর দেরি নাই। এই মাসের কয়েকটি দিন, পেরিয়ে যাবে কি যাবে না; এসে পড়বে সে। লক্ষ্মী কোনো কোনো রাত আচমকা ঘুম থেকে উঠে বসে। দু-হাতে আগলে রাখে পেট। শ্যামলের ঘুমঘোর, ডানহাত এগিয়ে দেয়; আগত শিশুকে স্পর্শে হাতড়ায়। লক্ষ্মী দু-হাতে সরিয়ে দেয় তাকে। একরকম ছুঁড়ে দেয় সকল আকাঙ্ক্ষা মনোযোগ। শ্যামল ক্লান্ত-বিবশ। সারাদিন হাট-বাজার। শহরের রাস্তা-অলিগলি-বাসাবাড়ি হাঁকডাক চিৎকার। সন্ধেরাতে ফিরে আসে। লক্ষ্মীকে দেখে বড় মায়া হয়। এমন ভারী শরীরে কীভাবে কাজ করে যায়? শ্যামল কিছু করতে পারে না। মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে? শ্যামলের দু-চোখে ঘুম নেই। ঘরের অন্ধকারে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। ব্যস্তত্রস্ত উদ্ভ্রান্ত।

‘চেত্ চেকায়দা? দারগিন ইঞ হহওয়া আ?’

(কী হইছে? দাই ডাকাম?)

‘বাঞ বাডায়া। আডি হাসো কানা। বাপু লেকা।’

(জানি না কো। বড্ড জ্বালায়। তুমার বাপুর মতো।)

‘বাপুগে চং-এ হিসুক্কানয়া। আহ্ ইঞরেন বাপু…বাপু।’

(বাপুই তো আসছে গো। আহ্ মোর বাপু…বাপু!)

শ্যামল উঠে বসে উদ্বাহু ডানা মেলে দেয়। লক্ষ্মীকে একবার জড়িয়ে ধরার অনন্ত সাধ। তার অনেক আদরের বউ। ভালবাসা জীবন। মায়াডোর বাঁধা স্বর্ণলতা-অস্তিত্ব। আদর করতে ইচ্ছে জাগে।

‘অচগক্ মেসে। বাঞ সাহেত দাড়ে আক্কানা।’

(সরি যাও তো…দম বন্ধ হই আসে।)

‘দারগিন বুডহিঞ হহ আয়া বাংখান।’

(দাইমাক ডাক দাও না হয়।)

‘আমরেন বাপু নিত দ বায় হিজুক্ আয়া।’

(তুমার বাপু এ্যালায় আসিবার নহায় গো।)

তখন সন্ধের কথা মনে আসে। আলাপ-প্রলাপ। ঘরের উপরচালা দিয়ে ভোরের আলো হাত-পা ছড়িয়ে নেমে আসে। এখন…ঠিক এখন বলা যায়। যায় কি? মন যে বড়ই উন্মন। কী কথা বলেছিল বাবা?

‘বাপু চেত্ কাথায় মেনলেদা?’

(বাপু কী কথা কয়েছিল?)

‘অক কাথা? তিনরে?’

(কোন্ কথা? কখন?’)

‘হলা আয়ুপ্এম মেন্লেত্। বাপু চালাক্ অক্তে চেত্ বাং-এ মেন্লেত্।’

(কাইল সাঁঝোত্ যে কলু, বাপু চলি যাবার সমায় কী বা কথা কয়েছিল।)

‘ও।’

(ও।)

ঘরের আলোছায়া দেয়ালে চকচকে দুটো চোখ। সেই দৃষ্টি কার? লক্ষ্মী নাকি বাবার? শ্যামলের মন-উন্মন বিভোল। আকস্মিক সকল স্মৃতি দিনকাল মন-ভাবনায় উদ্ভ্রান্ত-উদ্বেল জেগে ওঠে। লক্ষ্মী কথা বলে না কেন? কোনো গুপ্তধনের কথা বলে যায়নি তো বাবা? সেই যে বাবা প্রায়শ গল্প করে। আঙিনায় বসে, কদমতলায় পুকুরের পাড়; ফিসফিস কাহিনি। স্বপ্নকথন। এক বিঘত সোনার পুতুল বারান্দায় হেঁটে যায়। চমকে থমকে পেছনে দৃষ্টি রেখে ইশারায় ডাকে। তারপর আঙিনা জবাঝাড় পেরিয়ে কোথায় কোনখানে অদৃশ্য হতে থাকে। বাবা স্বপ্ন দেখে। ঘুমঘোরে হেঁটে চলে। পুতুল ডাকে। ডেকে যায়। বাবা দু-ধাপ এগিয়ে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে ধরবে। স্পর্শ লাগে। ধরতে ধরতে ধরা হয় না। স্বপ্ন ভেঙে যায়। যদি একবার হাতের মুঠোয় ধরা দেয়, অনেক অনেক ভুঁই হতো; হিমশীতল জলের পদ্মদিঘি। সেখানে স্বচ্ছ জলে মাছ সাঁতার কাটে। জলের ভাঁজে ভাঁজে সূর্যের আলোকচ্ছটা। মানুষের কল্পনা জীবনের স্বপ্ন। একটিই তো জীবন। এই সীমিত সময়ের কাহিনিতে কত আশা-আকাক্সক্ষা। সুখশান্তি। দুঃখ-বেদনা-অপমান। কেউ ভোলে কেউ ভোলে না। বুকের পাঁজরে গেঁথে নিয়ে বেঁচে থাকে। অস্তিত্বের সকল দায় কষ্ট শেষ হয় নদীর ঘাটে। কারও মুক্তি মেলে কারও মেলে না। বাতাসের ভাঁজে ভাঁজে শোনা যায় কত কথা। কত কান্না দীর্ঘশ্বাস। বাবা কী বলেছিল? লক্ষ্মী এবার বলুক। মানুষ মৃত্যুর আগে আগে যা বলে যায়, সবটুকু তার সত্য; কখনো অবাস্তব কল্পনা নয়।

‘লক্ষ্মী বাপু চেত্-এ মেনলেদা?’

(লক্ষ্মী কী কয়েছিল বাপু?)

সময় নিশ্চুপ স্তব্ধ। অপেক্ষার নদী কুলকুল বয়ে চলে। জল গড়িয়ে যায়। শ্যামলের দৃষ্টি আকুল। বাবা…বাবা সারাজীবন অপমান সইলে, কষ্ট করলে; সেই দায়ভার দিয়ে গেলে আমাকেও।

‘বাপু দ বাড়গে রেড়াক্-এ মেনলেদা। ইঞাক্ বাড়গে…ইঞাক্ হাসা। ইনা তায়োসে জাপিত্কেদা। মেত্দাক্ জরয়েনতায়া। মোচারেঞ দাক্ আদেয়া। মেনখান বায় নু লেদা…একালতেসে বাং।’

(বাপু ভুঁইয়ের কথা কয়েছিল। মোর ভুঁই…মোর ভুঁই। তারপর দু-চোখ বুজল। চোখের কোণা দিয়ে জল গড়িয়ে গেল। মুই মুখোত জল দিলাম। নিলনি…একফোঁটা নিলনি।)

শ্যামল বজ্রাহত বসে থাকে। একদা তাদের একখ- জমি ছিল। বাবা লাঙল দেয়। জমি চাষে। সারাদিন ধুলো-জল-কাদা মেখে ঝকঝকে করে রাখে সীমা-পরিসীমা। ধানের চারাগাছ মাথা উঁচু চোখ মেলে বাতাসে দোল খায়। বাবার মুখছবিতে আনন্দঢেউ। বাতাসে কানপেতে শোনে ধানশিষের নবান গান। বড় ভালো লাগে। তারপর হায়! কেন এমন হলো? কোন্ নষ্ট মানুষেরা দখল করে নেয় সুখশান্তি-আনন্দ-বেঁচে থাকার সকল অস্তিত্ব? এই জঞ্জাল সরাবে কী করে?

দিনের আলো ফুটতে ফুটতে আইলের সরুপথে হেঁটে যায় শ্যামল। চেনা পথ বড় অচেনা লাগে। অথবা অচেনা রাস্তা চেনা হয়ে যায়। অনেক সহজ কিংবা দুর্মর কঠিন। চারিদিকে নতুন ধানের মউ মউ সুঘ্রাণ। বাতাসে স্বপ্নদোলা নবান্ন সংগীত। সে এবার বোধহয় কোনো সুর শোনে। নিজের জমি। বাপ-দাদার সম্পদ। সে ধীরে ধীরে সেখানে উঠে আসে। আইলের কোণায় কাঁধের গামছা রেখে হাতে নেয় কাস্তে। সোনালি ধান। রোদের আলোয় ঝিকমিক। গামছার লালরং থেকে উঁকি মারে দা’এর প্রান্তসীমা ক্ষুরধার। রোদের আলো থমকে দাঁড়ায়।

শ্যামল ধান কাটে। জমে উঠে ফসলের স্তূপ। দুপুরে আচমকা মেঘ-গর্জন হুংকার। মটরসাইকেল দূরে রেখে ছুটে আসে মাওলানা আজিজার। জাকির মাস্টার। আর কে কে? বন্যমোষের ছায়া। ধূসর-কালো অন্ধকার মেঘ। শ্যামল চমকে ওঠে। হাত থমকে যায়। একমুহূর্ত। কী ভেবে আবার সচল। সে থেমে থাকে না। আপনমনে ধান কাটে। অদ্ভুত মায়ার বর্ণিল নেশা। কোথাও কোনো দৃষ্টি নেই। আকস্মিক কী হয়, বুঝতে পারে না; শ্যামল দূরে ছিটকে পড়ে। কে যে কখন পেছন থেকে ধাক্কা দেয়, নাকি রোদপোড়া শক্ত বাঁশের আঘাত; দু-চোখে অন্ধকার পরদা নেমে আসে। কতক্ষণ? একটু সময়-মুহূর্তকাল অথবা যুগের পর যুগ অনন্তকাল। শ্যামলের তন্দ্রাঘোর। আচ্ছন্ন টলায়মান পদক্ষেপ। সে কিছু দেখতে পায় না। ধূসর-কালো মেঘের পটভূমিকায় এক বন্যমোষ গর্জন করে। বাতাসে থরথর করে অদ্ভুত নিনাদ। তারপর কি হলো? আকাশ দেখে। মানুষ দেখে। সেই গর্জন থেমে গেছে। স্তম্ভিত বাতাস। শ্যামলের দা থেকে চুইয়ে পড়ে রক্ত। মাওলানার কালো বুনোমোষ শরীর বেয়ে রক্ত-হলাহল নেমে যায়। জমির বুকে। পাতালের গভীরে। রক্ত! রক্তের রং লাল। সেখানে কোনো জাতপাত বোঝা যায় না।

স্টেশন পুলিশ ফাঁড়ি থেকে গাড়ি আসে। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। গ্রামের বাতাসে ঘটনা-দুর্ঘটনা খবর দুর্গন্ধের মতো ছড়িয়ে যায়। লক্ষ্মী আসতে পারেনি। পারে না। আঙিনায় ছুটে এসেছিল। কিন্তু যে জগতে আসে, আসছে; থামিয়ে রাখে। ধুলো-মাটিতে গড়াগড়ি। জবাঝাড়ে উজ্জ্বল বর্ণের ফুল ফুটেছে। কোত্থেকে দুটো চড়ুই এসে ডালে নাচতে থাকে। শ্যামল সড়কের উপর ধীরলয়ে হেঁটে যায়। অগ্রহায়ণের বাতাস বড় বর্ণচোরা। মৃদুমন্দ বয়ে চলে। কোথাও হয়তো বৃষ্টি হয়। কখনো হিম-হিম বাতাস স্পর্শ আবার তপ্তঢেউ। শ্যামল হেঁটে যায়। হাঁটতে থাকে। বটতলি মোড়ে পুলিশের গাড়ি। প্রগাঢ় নীলরং কালো দেখায়। লক্ষ্মী দূর থেকে তেমন দেখতে পায় কি না পায়, তার মাথা ঘোরে; দৃষ্টি ছলছল হত-বিহ্বল উদাস। পরনের শাড়ি-পেটিকোটে রক্তের ছোপ ছোপ লাল-কালশিটে দাগ। জীবন মানচিত্র ইতিহাস। অস্তিত্বের অধিকার। তার কোলে শিশু। সদ্যকাটা নাড়ি থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ে। তার দু-চোখ আজব এই পৃথিবীকে অসীম কৌতূহলে চিনে নিতে চায়। বোধোদয়ের অনন্ত জিগীষা। এদিক-ওদিক ধ্যানগম্ভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ। তারপর সহসা আকাশ বিদীর্ণ করে চিৎকার ছুড়ে দেয়।

সেই মেঘ-গর্জন আকাশ দিগন্তরেখায় প্রতিধ্বনি স্ফুলিঙ্গ তুলতে থাকে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত