| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

অন্নপূর্ণা

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comঅতি ভোরে শহরের পথ দিয়ে দু’হাতে দুটি ভারী ব্যাগ বয়ে নিয়ে হাঁটছেন, আর তাঁর পিছু পিছু মিছিল করে চলছে এক দঙ্গল নেড়ি কুকুর-এ দৃশ্য দেখে সেদিন কী যে কৌতুহল হল সেদিন!

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার গল্পে প্রায় একই রকম দৃশ্য পড়ে আতঁকে উঠেছিলাম কৈশোরকালে। হ্যামেলিন চলছেন বাঁশি বাজাতে বাজাতে, আর তাঁর পিছু পিছু ছুটে চলেছে-প্রথম দফায় অজস্র ইঁদুর, পরের দফায় অজস্র বাচ্চা।

তো এই রোগা-ভোগা, সস্তার শাড়ি পরিহিতা মহিলার মুখে সেরকম কোনও বাঁশি নেই, যা আছে দু’হাতে দুটি ভারী ব্যাগ-যা টেনে নিয়ে যেতে বেশ কষ্টই হচ্ছে তাঁর। কী আছে ওই ব্যাগদুটিতে যা প্রায় চুম্বকের মতো টানছে এত গুচ্ছের কুকুরকে!

দেশে দেশে কুকুর প্রেমীদের অভাব কখনও ঘটে না। গলায় বাহারি বকলেস ঝোলানে কুকুরদের গলায় দড়ি হাতে নিয়ে টানতে টানতে সাদা হাফপ্যান্ট পরা পুরুষ কিংবা সাজুগুজু করে অতি স্বাস্থ্য, ভালো, সুন্দরী মহিলারা চলেছেন হেলেদুলে-এ দৃশ্য প্রায় সকলেরই চেনা।

নেড়ী কুকুর প্রেমীদেরও উৎসাহ চোখে পড়ে যখনই কোনও এলাকায় নেড়ি কুকুরদের ধরে ধরে স্টেরিলাইজ করা শুরু হয়, কিন্তু যখন সারা দিনরাত নেড়ি কুকুরদের উৎপাতে অসহনীয় হয়ে ওঠে এলাকাবাসীর জীবন, তখন সেই নেড়ি কুকুর প্রেমীরা ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকেন যে-যার নিজের ঘরে। আমি অবশ্য নেড়ি কুকুরদের একেবারেই পছন্দ করি না; সারাদিন এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত তাদের দৌরাত্মের বহর দেখি বলে।

শব্দটা হাইড্রোফোবিয়া। স্কুলে থাকতে জেনেছিলাম শব্দটার মানে, তাই রাস্তার কুকুর দেখলে ছিটকে সরে যেতাম সাত হাত তফাতে। কামড়ালে পেটের চারপাশে আঠোরোটা ইঞ্জেশন।

যদিও পরিস্থিতি বদলেছে, এতগুলো ইঞ্জেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হয় না, তবুও ভয় কাটেনি। রাস্তায় রাস্তায় সদা-সর্বদা চোখে পড়ে রাশি রাশি কুকুরের সদা সতর্ক টহল।

নেড়িকুকুরদের সঙ্গে আমার মোলাকাত শুরু হয় ভোর থেকে। কী শীতে, কী গ্রীম্মে ঠিক ভোর পাঁচটা পনোরোয় ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া আমার বহুকালের অভ্যাস। স্বাস্থ্যেদ্ধারের সন্ধানে এই নিরস্তর প্রয়াস কিন্তু মোটেই নিষকন্টক নয়। স্বাস্থ্য উদ্ধার করতে গিয়ে রোজই খানিকটা করে স্বাস্হ্য হানি হয় তা কেবল মাত্র নেড়ি কুকুরদের দৌলতে।

এলাকার বাসিন্দারা প্রায় সবাই ঘুমে বিভোর থাকে, অথচ কী আশ্চর্য্য, পথের মোড়ে মোড়ে ওঁত পেতে বসে থাকে সারমেয়কূল। তাদের চোখে একবিন্দু ঘুম নেই। বরং চলমান আমি-টার দিকে তাকিয়ে থাকে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে। আমি উদাসীন পথিকের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, এমন ভান করি যেন তাদের দেখতেই পাচ্ছি না, আসলে সেসময় আমার বুকের ভেতর সাইরেন বাজতে বাজতে ছুটে যায় এক অদৃশ্য দমকল। ভয় কাটাতে বিড়বিড় করে বলি ‘গুড মর্নিং, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ডগস’ কুকুররা বুঝল কিনা কে জানে।

কোন একদিন দেরিতে ঘুম ভাঙায় আধঘন্টা মতো দেরি হয়ে গেল বেরোতে। জোর পায়ে হাঁটছি, সারমেয়কুলের দিকে না-তাকিয়েও খেয়াল করি কুকুরগুলো যেন ছটফট করছে আজ! যেন কার প্রতীক্ষায় আছে! তাদের ছটফটানির টেনশন ছড়িয়ে যায় আমার কলজেয়। একঝলক তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করি আমিই তাঁদের টার্গেট কি না! কিন্তু না, আমার দিকে তাকিয়েও দেখছে না কেউ। কী তাজ্জব কি বাত, কুকুরগুলো এত ভালো হয়ে গেল কী করে ভাবছি! জানতাম ‘দুধ’ না খেলে, হবে না ভালো ছেলে’, কিন্তু বিড়ালরা না হয় এর ওর রান্নাঘরে সিঁধ কেটে দুধ খায়, কুকুরদের তো সে এলেম নেই। কুকুররা কেন এত সদয় আজ!

হঠাৎ দেখি এক মহিলা আমার ঠিক পিছনে পিছনে আসছেন, তাঁর দুই হাতে দুটি বিগশপার। বেশ ভারী ব্যাগ দুটো, তার ভারে মহিলা নুয়ে পড়েছেন অনেকখানি।

মহিলার বয়স তিরিশ বত্রিশের মধ্যে, পরনের শাড়ি-ব্লাউজ দেখে অনুমান করি হয়তো কোনও বাড়ির কাজের লোক। গরিবিয়ানার অন্যতম প্রকাশ শ্যামলা মুখে ছোটো ছোটো কোঁচ পড়েছে এই বয়সেই!

চলমান মহিলাকে দেখে কুকুরগুলি কীরকম চনমন করে উঠল, ছটফটানির প্রকাশ তাদের শরীরী ভঙ্গিতে। চকচক করতে থাকে তাদের শিকারি চোখ। ব্যাগদুটোর কাছে গিয়ে লাফালাফি করতে থাকে সবাই মিলে। আমার কুকুরভীতির কারণে ভাবলাম ভয়ে নিশ্চয় সন্ত্রস্ত হয়ে উঠবেন মহিলা। কিন্তু কী আছে তাঁর ব্যাগে যা ছিনতাই করতে চাইছে কুকুর বাহিনী।

সেই মহিলা অবশ্য আমার মতো ভীতু নন, রীতিমতো বীরঙ্গনার ভঙ্গিতে তাদের উদ্দেশ্যে ধমক দিয়ে বললেন, রোজ রোজ, বড্ড তাড়া তোদের! দিচ্ছি, দিচ্ছি।

আরিব্বাস মহিলার তো বেশ তেজ আছে। কৌতুহলী হয়ে মর্নিং ওর্য়াকে সাময়িক যতি টেনে অপেক্ষা করি পরবর্তী অ্যাখানের জন্য।

অতঃপর ভোরের সেই কাহিনী লেখা হল অন্যভাবে। তখন আমার ঘোর বিস্ময়ের পালা। উঁকি দিয়ে দেখি দুই বিগশপার ভর্তি ভাত।

ভাত!

বিগশপারে হাতা ডুবিয়ে অনেকখানি ভাত বেড়ে দিলেন রাস্তার একপাশে। সাদা ভাত তখন ভোরের বাতাসে জ্বলজ্বল করছে মুক্তোর মতো। সেই ভাতের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে কুকুরদের কী উল্লাস! তারা একযোগে হামলে পড়ল ভাতের উপর।

হাফ ডজন কুকুরকে ভাতের স্বাদে ও গন্ধে মোহিত হতে দিয়ে মহিলা আবার তুলে নিলেন বিগশপার দুটি। আগের মতোই হাঁটতে থাকে সামনে। আমিও নেশাগ্রস্তের মতো একটু দুরত্বে থেকে অনুসরণ করতে থাকি তাঁকে। কী এক অদ্ভুত ঘোর, কী এক আশ্চয্য আচ্ছন্নতা জড়িয়ে ধরে আমার চেতনা। ভোরের আলো আঁধারী সরে ‍গিয়ে ফরসা হচ্ছে পৃথিবী। আমি সেই মায়াময় পৃথিবীতে আবিষ্কার করতে থাকি কিছু আশ্চর্য্য দৃশ্য। সেই মহিয়সী মহিলার পিছু পিছু এগোই আরও একটু। কিছুক্ষণ পর থামলেন আবার যেখানে কুকুরের দল অপেক্ষায় ছিলো। সেই কুকুরগুলো তাঁর পায়ে পায়ে ঘুরতে থাকে, গা বেয়ে উঠতে চায়।

তিনি একটি ফাঁকা জায়গায় উবু হয়ে বসেন, কুকুরগুলো তাঁর গা  ঘেঁসে দাঁড়ায়, বাধ্য বাচ্চাদের মতো অপেক্ষা করে কখন ভাত বেড়ে দেয়া হবে তাঁদের। মহিলা আগের মতোই বিগশপার থেকে হাতা ভরে ভরে কিছু ভাত ছড়িয়ে দেন রাস্তার পাশে। কুকুরগুলোর মাথায় হাত-বুলিয়ে বলেন, খা রে খা।

কুকুরগুলো হামলে পড়ে চাটতে থাকে ভাতের কণাগুলো।

সেদিন আমার প্রাতঃভ্রমনের মাঠে যেতে দেরি হয়ে যায়, তবুও সেই মহিলাকে অনুসরণ করতে থাকি নিঃশব্দে। এরকম পর পর আরও দুটি মোড়ে কুকুরদের মায়ের মতোই যত্ন করে ভাত বেড়ে দেওয়ার পর আমি আর কৌতুহল সামলাতে না পেরে তাঁকে জিজ্ঞেস করি, রোজই কি এত এত ভাত কুকুরদের খাওয়ান?

মহিলা অবাক হননি, নিশ্চয় এর আগে আরও অনেককে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। বললেন, হ্যাঁ। খাওয়াই।

আশ্চর্য্য হয়ে জিঞ্জাসা করি, কী করেন আপনি?

মহিলা লাজুক স্বরে বললেন তাঁর এই বদ্যনতার ইতিহাস। তিনি একটি মাঝারি ধরনের হোটেলে ঘর-মোছা বাসন মাজার কাজ করেন। তাঁর একটাই ছেলে, তাঁর বয়স দশ। জন্ম থেকেই স্প্যাস্টিক।

রাস্তার একটা কুকুর ধরে এনে পুষেছিল বাড়িতে। খুব ভালোবাসতো তাকে। কিন্তু তারা এত গরীব যে রোজ রোজ কুকুরটাকে কী খাওয়ানো যায় তা নিয়ে চিন্তায় পড়তে হত। সে সময় মনে পড়ল যে হোটেলে কাজ করেন, রোজই কিছু ভাত অতিরিক্ত হয়ে যায় সেখানে। সেই ভাত ফেলে দেয়া হয় ডাস্টবিনে। হোটেলের সেই উদ্বৃত্ত ভাত নিয়ে আসতে শুরু করলেন বাড়িতে, আর তাঁর ছেলে খুব যত্ন করে খাওয়াচ্ছিল কুকুরটিকে। আর কী আশ্চর্য্য, ছেলেটি আগের চেয়ে একটু একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগল। তখন তাঁদের বাড়িতে কী আনন্দের পরিবেশ। কয়েক মাস আগে সেই কুকুরটি হঠাৎ গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। সে কী কান্না ছেলের!

-তারপর?

সেই ধূসর ভোরে হঠাৎ একাত্ম হয়ে যাই ছেলেটির কষ্টের সঙ্গে।

তাকে আর থামাতেই পারি না। আমি ভয় পেয়ে গেলাম ছেলে হয়তো আবার আগের মতো অস্বাভাবিক হয়ে উঠবে! আমি তাকে বললাম ‘রাস্তায় আরও কত নেড়ি কুকুর আগে, তাদের সবাইকে নিজের বলে ভাব না। ছেলে আমাকে বলল ‘তাদের কি রোজ রোজ আমরা খাওয়াই যে নিজের বলে ভাবব!’ তখন তাকে কথা দিলাম আমাদের এখানকার যত রাস্তার কুকুর আছে, তাদের সবাইকে খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার। সে আজ এক বছর আগের ঘটনা। তারপর রোজ রাতের বেলা হোটেল থেকে ভাত নিয়ে আসি। ভোরে উঠে বেরিয়ে সেই ভাত—

মহিলার তখন দেরি হয়ে যাচ্ছে, বিগশপার নিয়ে চললেন আরও আগের দিকে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে তাঁর আরও সন্তানরা। আমি বিপুল বিস্ময়ে  দেখতে থাকি মহিলার মৃদুমন্দ গতিতে এগিয়ে যাওয়া। প্রতি মোড়ে মোড়ে একটু একটু করে খালি হয়ে যাচ্ছে তাঁর বিগশপার, আর ভারী তৃপ্ত মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তার যাবতীয় প্রহরী, আর সেই মহিলা পূর্ণ থেকে পূর্ণতর হচ্ছেন, পূর্ণতর থেকে পূর্ণতম।

অন্নপূর্ণাকে দেখেছি মাটির প্রতিমায়।

আজ দেখলাম স্বচক্ষে চলমান উজ্জল, ভাস্কর, জীবন্ত। আশ্চর্য্য ভাতের গন্ধে তখন ভোরের পৃথিবী মাতল।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত