সাধারণ মেয়ের বৃত্তান্ত 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comজন্মের পরে স্কুল শিক্ষক বাবা নাম রেখেছিল ঝুমঝুমি, কিন্তু স্কুলের ওপরের ক্লাশে পড়ার সময় ডাক নামটা নিজেই ছেঁটে করেছিল ঝুমি। এখন এই গার্মেন্টস-এ কাজ করতে এসেও এই নামটাই চলছে, ওর পোশাকি নামটা ধরে আর কেউ ডাকে না। তাতে ওর আপত্তি নেই মোটেই, বরং নিজেকে একটু আধুনিক মনে হয় ওর। আধুনিক হওয়ার জন্য ঝুমি’র চেষ্টার অন্ত নেই। নিজেকে বদলাতে বদলাতে এখন বদলটাকেই ওর বেঁচে থাকা মনে হয়। ঝুমির বয়স, যে সময়ের কথা বলছি সে সময় একুশ পেরিয়ে বাইশের দিকে হাঁটছিলো। নিজেকে ও সাধারণ মনে করে না, একেবারেই না। 

ঝুমির বিত্তান্তটা একটু বিশদ বলার প্রয়োজন আছে। এই যে গার্মেন্টস-এ এসে কাজ নেয়া এবং বেশ ভালো ভাবেই সংসারটাকে দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করার একটা পূর্বাপর আছে। কুমার নদ-এর প্রায় কুলঘেঁষা ওদের বাড়ি, গ্রামটা গাছগাছালিতে ভরা। একসময় হিন্দু প্রধান ছিল, এখন এক ঘর হিন্দুও নেই। সেটা ওর জন্মের আগেই সাফা হয়ে গেছে। ওরা শুনতে পায় ওমুক বাড়ির নাম বাবু-বাড়ি, ওমুক বাড়ি ঘোষ বাড়ি, শ্মশ্মান ভিটা, নাটমন্দির এইসব শব্দবন্ধ ও জানে, কিন্তু এসবের ইতিহাস ওর অজানা। কোনোদিন বোঝার প্রয়োজনও হয়নি ওর। ও যেটা জন্মের পর থেকেই জেনেছিল তাহলো, ওর মাকে ওর বাবা বিয়ে করতে চায়নি, কিন্তু ওর নানা ষাট হাজার টাকা দিয়েছিল ওর বাবাকে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে তাই ওর সাধারণ বাঙালি মেয়ের তুলনায় খাঁটো এবং গায়ের রঙ ময়লা হওয়া মাকে ওর বাবা বিয়ে করেছিল। একটু খটমট লাগলেই ঝুমির স্কুলশিক্ষক বাবা একথা অসংখ্যবার শুনিয়েছে ওর মাকে, এবং সেটা ওদের সামনেই। ওরা একে একে চার বোন হয়েছে, বাবা ভেবেছিল এই বুঝি ছেলে হলো, কিন্তু হয়নি। এমন ছেলে হওয়া হওয়ার গল্পতো বাংলাদেশে বিস্তার শোনা যায়, ছেলে হবে ছেলে এই চিন্তায় এরকম একের পর এক মেয়ে হওয়ার কাহিনীও ঝুমির অনেকগুলো জানা আছে।

তো ষাট হাজার টাকা পেয়ে দয়া করে নিয়ে আসা ঝুমির মায়ের আসলে কোনো বক্তব্য নেই সংসারে, ভুমিকাও নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু মহিলা বুদ্ধিমতী, এটা ঝুমি জানে। তার বুদ্ধির তুলনা ঝুমি নিজেই, প্রথম থেকেই ঝুমিকে একটা কথাই শিখিয়েছে ওর মা, তাহলো, লেখাপড়া, লেখাপড়া আর লেখাপড়া। কিন্তু ঝুমির মাথায় সেটা ঢোকেইনি, আসলে লেখাপড়ার দিকে ওর কোনোদিনই মন ছিল না। এটা ওর দোষ নাকি ওর কপালের দোষ সেটা ঝুমি জানে না। লেখাপড়া তাই ওই স্কুল পার হওয়া অবধিই। 

কিন্তু ঝুমি দেখতে কেমন? একেবারে মায়ের প্রতিবিম্ব না হলেও মায়েরই মতো, এবং সেই ছোটবেলা থেকেই ও শুনেছে, ও বেটে এবং কালো। কখনও কখনও কারো মনটন ভালো থাকলে ঝুমিকে বলেছে, “চিহারাডা কিন্তু খারাপ না”। কেবলমাত্র আশুলিয়ার এই গার্মেন্টস কারখানায় যখন কাজ করতে এসেছে তখন জেনেছে যে, ওর গায়ের রঙ মাজা হলেও, ও উচ্চতায় খাঁটো হলেও, ওর চেহারাটা মিষ্টি। ওর চোখ দু’টো সুন্দর, কিন্তু ও দু’টোতে সব সময় কাজল দিয়ে রাখতে হবে, নাহলে ভালো দেখাবে না। ওর সঙ্গের মেয়েরা, যারা অনেকদিন ধরে গার্মেন্টস-এ কাজ করে তারা কতোকিছু মাখে মুখে, কতো কিছু কিনে কিনে ভরিয়ে ফেলে ঘর, ঝুমিও খুুব দ্রুত সেটা শিখে ফেলে। অবশ্য গ্রামে থাকতেই ওর শখ ছিল টিভি দেখে দেখে নিজেকে বদলানোর। তাই রাজধানীর এই প্রান্তসীমায় থেকে টিভি দেখে কিংবা অন্য মেয়েদের সাজগোজ দেখে দেখে ঝুমি জেনে গিয়েছিল কী করে নিজেকে সাজিয়ে রাখতে হয়। নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখার ফলও পেয়েছিল ও হাতে নাতে। বহুজন বহুভাবে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে এটা যেমন সত্য তেমনই কারখানার সুপারভাইজার থেকে শুরু করে বিদেশিদেরও নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল ঝুমি। এ নজর কু-নজর নয়, সু-নজরও বলা যাবে না, তবে ওকে আলাদা ভাবে লক্ষ্য করতো ওরা, এটা ও বুঝেছিল। তাই খুব অল্প সময়ে মেশিন অপারেটর থেকে সুপারভাইজারের সহকারী হয়ে গিয়েছিল ও। নিজেকে ঝুমি গুরুত্বপূর্ণ ভাবতো এবং ও যে পারবে, এরকম একজন মানুষ হিসেবে চিনতে পেরেছিল। 

ঝুমি’র এই নিজেকে চিনতে পারা এবং নিজস্ব শক্তিময়তা নিয়ে ওর ভালোই চলছিলো, মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় গ্রামের বাড়ি গেলে সবার হাতে কিছু না কিছু তুলে দিতে পারার আনন্দটাও যে বিশাল এবং সেটা যে কাউকে বোঝানোও যায় না, তাও ঝুমি বুঝতো। আর বুঝেছিল যে, নিজের মেয়ের উপার্জন ওর চিরকালের অপমানিত হওয়া মাকেও খানিকটা শক্তিশালী করে তুলেছিল। মাঝে মাঝে ওর মাও দু’একটি কথা বলতে শুরু করেছিল। আর এরকমই একদিন, মেজ বোনটা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর একদিন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করে লিখিত পরীক্ষায় টিকে গেলো এবং মৌখিক পরীক্ষার আগে যখন এক দালালের মাধ্যমে জানা গেলো যে, এক লাখের মতো টাকা ঘুষ দিলে চাকরিটা হয়েই যাবে, তখন ঝুমি আর ও মা মিলে সেই টাকা জোগাড়ে নেমে গেলো। স্কুল শিক্ষক বাবাকেও জানানো হলো, দরকার হলে একটু খানি জমি বিক্রি করে দেয়া যায় কি না তা নিয়ে দিন-রাত সলাপরামর্শ হলো পরিবারে, তখনই ঝুমির বাবার মনে আবারও মাত্র ষাট হাজার টাকার কাছে চৌধুরী বাড়ির বড় ছেলেটি কী ভাবে বিকিয়ে গিয়েছিল সেই দুঃখ উথলে উঠলো। এবার আর ঝুমি চুপ করে থাকতে পারলো না, বলেই ফেললো, “আপনারে যে ষাইট হাজার টাকা দিয়া কিনছিলো সেইডাই আপনার ভাইগ্য বুঝলেন? ফ্যাঁ ফ্যাঁ কইরা ঘুইরা বেড়াবার লাগছিলেন, ওই নামডাই যা খালি চোদরী, কামেতো সৎ মায়ের সংসার, বাপও আপনার দেড়শ টাকা বেতনের মাস্টার, এ্যাহন বড় বড় কতা কইয়া লাভ আছে কোনো?”

এই প্রথম মেয়ের কথায় বাবা মাথা নোয়ায়। কোনো জবাব দেয় না। এর আগে ঝুমিও এরকম কঠিন কিছু কখনও বলেছে বলে মনে পড়ে না, আর ওর বাবাও পান থেকে চুন খসার আগেই ‘জিকা গাছের ডাল দিয়া পিটাইয়া পিঠের ছাল তুইলা দেওয়ার’ সুযোগ কখনওই ছাড়েনি। সেদিনই প্রথম ঝুমির উপার্জন আর দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকার ফলাফল হাতেনাতে পেয়েছিল ও। এবং শেষ পর্যন্ত এক টুকরা জমি বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করে ঘুষ দিয়ে মেজ বোনটার প্রাইমারি স্কুলে চাকরি নিশ্চিত করেছিল ঝুমি আর ওর মা। বাবা কিছুই বলেনি। মেজ বোনটাও এখন চাকরি করে এবং সংসারটা একরকম ভালোই চলছে। 

এই ভালো চলা সংসারে হঠাৎই একদিন আরো খুশি খুশি ভাব দেখা দিলো। ঝুমির বাবার বন্ধু, পাশের থানার আরেক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আফতার  মোল্লা ঝুমির জন্য এক পাত্র নিয়ে এসে হাজির। গ্রামদেশে এখনও বিয়ের সম্মন্ধ আনাকে বলা হয় “কাম” আনা। ঝুমির জন্যও যে কামটি এলো তারা পাশের থানার নামকরা পরিবার। এই পরিবারের কত্রীটিও সেখানকার প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্বামী নেই। কিন্তু স্বামী চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যাপক জমিজমা রেখে গত হয়েছেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, মেয়ের বর বেশ নামকরা ব্যবসায়ী। এলাকার পোলট্রি শিল্প তার হাত ধরেই জাতীয়ভাবে নাম করেছে। জানা গেলো, ছেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু এখনও কোথাও কাজটাজ করে না, দুলাভাইয়ের ব্যবসায় সাহায্য সহযোগিতা করছে। যে কোনো মুহূর্তে নিজেই একটা কম্পিউটার কোম্পানী দিয়ে ফেলবে। ঝুমি এসবের নাড়ি-নক্ষত্র কিছুই জানে না। মোবাইলে ফোন করে ওর বাবা ওকে জানিয়েছে যে, যতো দ্রুত সম্ভব যেনো বাড়ি আসে, বাড়ির অবস্থা ভালো না। এরকম কোনোদিন হয়নি যে ওর বাবা ওকে ফোন করে কিছু বলেছে। ও ধরেই নিয়েছে যে বাড়িতে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওর মনে হয়েছে যে, কোনো বোন হয়তো কারো সঙ্গে ভেগে গেছে, যে কারণে বাবা বাড়ি যেতে বলেছে। ঝুমি বাড়ির আর কারো কাছে কিছু না জিজ্ঞেস করেই অফিস থেকে তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে। এসেই জেনেছে যে, ঘটনা আর কিছুই নয়, এরকম এক সুপাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং ছেলের মা, বোন ও দুলাভাই ওকে দেখতে আসবে। বেশ ভালো কথা, ঝুমিরও মনে বিয়ের হাওয়া লেগে যায় মুহূর্তে। এ স্বপ্ন ওর ছিলই, এখন সেটা চাগান দিয়ে ওঠে, এই যা।  

বিয়ের স্বপ্ন দেখা মেয়েদের স্বভাব, জন্মের সঙ্গে এই স্বপ্ন নিয়েই মেয়েরা জন্মায়। ঝুমিও এর বাইরে নয়। আর আজকালতো এই স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বিয়েতে কী পরবে, কেমন করে সাজবে সেসবও যোগ হয়েছে। নিজেকে এই যে সুন্দর করে রাখা, সুন্দর করে তোলা, এসবের জন্য যদি কোনো একজন মানুষই না থাকে তাহলে তা আসলে মূল্যহীন হয়ে যায়। ঝুমিও মনে মনে অনেককে কল্পনা করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কাউকেই ঠিক একেবারে জ্যান্ত চেহারার মনে হয়নি। বেশিরভাগই হয় সালমান খান কিংবা ঋত্ত্বিক রৌশনের মতো হয়ে গেছে। কতোদিন স্বপ্ন দেখেছে একটা ছেলে ওকে তোলপাড় আদর করছে, শরীরের এমন সব জায়গায় হাত দিচ্ছে যেখানে কারো হাত যাওয়ার কথা নয়, কিন্তু ছেলেটাকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। এমন সব স্বপ্নের রাতে ওর মনে হয়েছে জীবনে এমন কারো দরকার আছে, খুবই দরকার আছে। কিন্তু সে যে কে, সেটা ঠিক জানতে পারেনি। কারখানার সহকর্মীদের সঙ্গে ভাব-খাতির হয়েছে, কেউ কেউ তার চেয়েও এগিয়েছে বটে, কিন্তু ওর মনের রঙ তাদেরকে ছুঁতে পারেনি। রাতে-বিরেতে স্বপ্ন দেখা ছেলেদের সঙ্গে এদের মিল নেই। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে যখন জেনেছে যে ছেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, টাকা পয়সা ওয়ালা, এবং ক্ষমতাওয়ালাও তখন ওর মনে অবশ্য একটু সন্দেহ হয়েছে যে, ছেলেটা তাহলে ওরে বিয়ে করতে আসছে কেন? একথা ও জানতেও চেয়েছে বাবার কাছে একদম সরাসরি। বাবা কোনো উত্তর দেয়নি, মা বলেছে, “আমারও মনে ওইছে কতাডা, কিন্তুক কতো কিছু ঘডেনা দুনিয়ায়, তুই ক?” 

ঝুমি কি বলবে ভেবে পায়নি। কালকেই দেখতে আসবে ওকে, ওর নিজেকে গোছানোর দরকার আছে, আগে জানলে ঢাকা থেকে একটা শাড়ি অন্ততঃ নিয়ে আসতো, এখানেতো কিছুই নেই ওর। ভাবতে ভাবতে ও একটু অসহায় বোধ করে, বিয়ের কথা শুরু হলে নাকি মেয়েদের ভেতর এই অসহায়ত্ব দেখা যায়। ও তন্নতন্ন করে ট্রাঙ্ক-তোরঙ্গ খুঁজতে শুরু করে, শাড়ি পেয়ে যায় পুরোনো আমলের একটা, সবুজ জর্জেট। এবার ম্যাচিং ব্লাউজ খোঁজে, এটা যে পাবে না সেটা ও জানতো। গ্রামের কেউ ম্যাচিং করে ব্লাউজ পরার ধার ধারে না। একটা কালো ব্লাউজ পায় মায়ের, পুরোনো, সেটাকেই টাক দিয়ে নেবে কি না ভাবে, কিন্তু মাপ দিয়ে দেখে গায়ে লেগে গেলো। তার মানে কি ও একটু মোটা হয়েছে নাকি? মরুকগে, মোটা হলে হয়েছে। ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নেয় কাল দুপুরের আগেই একটা অটো ঠিক করে চলে যাবে থানা শহরে, সেখানে এখন বিউটি পার্লার হয়েছে, মুখটা একটু পরিষ্কার করে সেজে নেবে এবং শাড়িটাও একটু গুছিয়ে পিন করে পরে নেবে। রাতভর ভাবে ও কী ভাবে সাজবে, বেশি সাজগোজ করবে না, কানের দুল, হাতের চুড়ি, গলার মালা, এসব একেবারে ম্যাচিং হবে না ঠিকই, কিন্তু যেগুলো পরে এসেছে সেগুলোই পরা যাবে এই সবুজ শাড়ির সঙ্গে। 

ঘুম হয় না, ঘুম আসে না। সারারাত ভাবে, বিয়েটা যদি হয়েই যায়, তারপর কী করবে ও? চাকরি করবে? মনে হয় না ওই ফ্যামিলি চাকরি করতে দেবে, যতোটুকু শুনেছে ওদের সম্পর্কে, বউদের চাকরি করার কোনো দরকার থাকবে না মনে হয়। তাহলে মাকে যে মাসে মাসে টাকাটা দিতো ঝুমি তার কী হবে? বোনটা যা বেতন পায় তা দিয়ে ছোট দুই বোনকে লেখাপড়া করাচ্ছে। সংসারে কিছু দিতে পারে না। ওরও বিয়ের বয়স হলো, দেখতেতো মনে হয় ঝুমির চেয়েও সুমী খারাপ। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ঝুমি। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়, যেভাবেই হোক শ্বশুর বাড়িতে গিয়েও মাকে যা দিতো তাই-ই ও দেবে, টাকা হাতে পাওয়ার পর মায়ের মুখখানায় যে আলোটা খেলা করে তা কোনো ভাবেই নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। 

দিনটা শুরু হলো বেশ ভোরেই। গ্রামে এমনিতেই মানুষ ভোরে ওঠে, ঘুমাতে যায় সন্ধ্যের পর পরই, এতোক্ষণতো আর বিছানায় থাকা যায় না। ঝুমিও উঠে চটপট সবকিছু সেরে নেয়। ওদের বাড়িতে বাথরুম ছিল না, পাকা টয়লেট ছিল না। নিজেই  টাকা জমিয়ে এগুলো করেছে। এখন একটু আরামে সকালটা শুরু করা যায়। মানুষ কেন যে বোঝে না, জীবনে এইসব আরামের প্রয়োজন আছে, তাতে বাকি সব ব্যারামের কষ্ট কমে যায়। কিন্তু ও কাউকে বোঝাতে পারে না। কে জানে, যে বাড়িতে ও যাচ্ছে সে বাড়িতে কেমন অবস্থা। একথা ভাবতে ভাবতেই ওর মনে হয় যে, ও কী করে ধরে নিচ্ছে এখানেই ওর বিয়ে হবে? নিজের মনে নিজেই হেসে ফেলে ঝুমি। বেলা বাড়ে। 

মাকে বলে ঝুমি শাড়ি, ব্লাউজ, পেটিকোট আর নিজের ব্যাগটা নিয়ে গ্রামের সামনে দিয়ে যে রাস্তা থানা শহরের দিকে গেছে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। কৌতুহলী কেউ কেউ জানতে চায় চায়. “এ ঝুমি কুহানে যাইস?” ঝুমি হাসে, উত্তর দেয় না। লোকজন আরো কাছে এসে বলে, “কাইল না আইলি, আইজই ঢাকা যাবিনি?” ঝুমি আবার হাসে। বাবা শক্ত করে বলে দিয়েছে, “খবরদার কেউ যেনো না জানে আইজ তোরে দেখতে আসফি। গ্রামের মানুষ বালো না, ভাঙ্গানি দিবার মাইনষের অবাব নাই”। বাবার চেয়েও একথা ঝুমি বেশি ভালো করে জানে। ও কিছু না বলে, একটা চলতি অটো থামায় এবং উঠে পড়ে। তারপর পেছনের লোকদের পেছনে রেখে ঝুমি থানা শহরের সাজনালয়ের দিকে এগুতে থাকে। বাইরে তখন ঝুম রোদ, ঢাকা শহরে ঘরের মধ্যে থেকে থেকে যেটুকু ঔজ্জ্বল্য ঝুমি নিজের শরীরে আনতে পেরেছে এই রোদ একটুখানি ছুঁয়ে দিলেই তা উধাও হয়ে আসল রঙ ফিরে আসবে নাতো আবার? ঝুমি যতোটা সম্ভব রোদ বাঁচিয়ে অটোর মধ্যে সেঁটে থাকে। 

খুঁজেপেতে অসুবিধে হয় না সাজনালয়টা। নাম কারিনা বিউটি পার্লার। ছোট্ট একটা ঘরের মধ্যে কয়েকটা চেয়ার, সামনের দেয়ালে আয়না লাগানো। তিনটি চেয়ারে তিনজনকে সাজাচ্ছে তিনটি মেয়ে। ঢাকার মতো নয়, এখানে যারা সাজাচ্ছে তারা এখানকারই মেয়ে। ঢাকায়তো বিউটি পার্লার মানেই ময়মনসিংহ কিংবা চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে আসা মেয়েদের রাজত্ব, মালিক অবশ্য ব্যবসায়ীদের বউরা। ঝুমি অবাক হয়, এখানেও বিউটি পার্লারে বেশ ভিড় দেখে। ও বলে, “আমি একটু ফেছিয়াল করতে চাই। আর শাড়ি পরে মেকআপ নিতে চাই। কতো নেন আপনারা?” 

একজন মোটা মতো মহিলা একটু কর্কশ গলাতেই বলে, “আইজতো ফেছিয়াল করানো যাবে না। মেয়ে নাই। শাড়ি পরাইয়া দিয়া সাজাইতে পাঁচশ টাকা লাগবে”। বলেই কাজে মন দেয় আবার, মহিলা তখন একটি মেয়েকে সাজাচ্ছে, মনে হলো মেয়েটি কণে। ঝুমি বুঝতে পারে এখানে দরদাম করা যাবে না, ও বলে, “ঠিক আছে। তাহলে আমি একটু মুখটা ধুইয়া নেই? কোথায় ধুবো?” 

“ওই যে পিছনে যান, দ্যাহেন কল আছে। মুখ ধুইয়া আসেন। তারপর পেটিকোট ব্লাউজ পইরা বসেন, আমি সাকেলারে দিতাছি। ওর আতের কাম প্রায় শ্যাষ”- মহিলাকে ওর বেশ প্রফেশনাল মনে হয়। হঠাৎই ঝুমির মাথায় আইডিয়াটা আসে, ওর ছোট বোনদের যদি ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিউটি পার্লারে ট্রেনিং করিয়ে এলাকাতেই একটা দোকান খুলে দেয়া যায়, তাহলে কেমন হয়? মুখ ধুতে গিয়ে মনের ভেতর ভাবনাটা ডালপালা মেলে, ব্লাউজ-পেটিকোট পরতে পরতে আরো গভীর হতে থাকে ওর মনের ভেতর বিষয়টা। ওর চোখের সামনে একটা দোকানও দেখতে যেনো দেখতে পায় ঝুমি। ও সেই দোকান দেখতে দেখতেই অপেক্ষা করে সাকেলার জন্য। বেশ গরম এখানে, ফ্যান চলছে ঠিকই, এয়ার কন্ডিশন হলে ভালো হতো বলে ওর মনে হয়। ও সিদ্ধান্ত নেয়, বোনদের বিউটি পার্লারে ও এয়ার কন্ডিশনের ব্যবস্থা করবে অবশ্যই। তাতে কাস্টমার অনেক খুশি হবে, সাজার সময় গরমে ঘামার কোনো মানেই হয় না। 

সাকেলা মেয়েটা বেশ চটপটে এবং মিশুক। গ্রাম্য উচ্চারণে হলেও সুন্দর করে কথা বলে। এসেই ওকে বলে যে, “আপনারে তো আগে কোনোদিন দেহি নাই। আপনাগো বাড়ি কোন গ্রামে?” ঝুমি ওদের গ্রামের নাম বলে। সাকেলা বলে, ওই গ্রামে ওর বোনের বিয়ে হয়েছে। জানা যায় যে, ওরা লতায়-পাতায় আত্মীয়। আর আত্মীয়তার সুবাদে ওরা কতো কথা যে আলোচনা করে তার শেষ নেই। আর দ্রুত হাতে ঝুমিকে সাজাতে শুরু করে সাকেলা। মুখে প্যানকেক ঘঁষে, প্রথমে হলুদ হলুদ একটা রঙের, তারপর কালচে রঙা একটা। নাক খাড়া করানোর জন্য কপাল থেকে নাকের নীচ অবধি কালো দাগ দিয়ে সেটা ঘঁষে ঘঁষে মোছার চেষ্টা করে। তারপর পেন্সিল দিয়ে ভ্রু জোড়া আরো মোটা করে দেয়। শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে চোখের ওপর গাঢ় সবুজ রঙ লাগায়, তার সঙ্গে টকটকে গোলাপি শেড দেওয়ার পর দেখা যায় যে, গোলাপি আর সবুজ মিলে গিয়ে পুরো চোখের পাতাটা লাল হয়ে গেছে। মোটা করে কাজল দিয়ে চোখের পাপড়িতে লাগিয়ে দেয় মাসকারা, আঁঠালো সেই মাসকারা দেয়ার পর চোখ খুলে রাখতে ঝুমির অসুবিধে হয় কিন্তু ঝুমিরতো এতে অভ্যেস আছে। তারপর রুজ-এর কৌটো থেকে গোলাপি আভা নিয়ে ঝুমির দুই গালে একটু গভীর করেই ছুঁইয়ে দেয় সাকেলা। ঠোঁটের কিনার ঘেঁষে গাঢ় মেরুন লাইনার লাগিয়ে তারপর টকটকে লাল লিপস্টিক লাগায়, নিজেকে একটু একটু অপরিচিত লাগতে শুরু করে ঝুমির। এরকম ওর প্রায়ই হয়, বিশেষ করে এই সাজার বেলায়, সাজতে বসে এই যে ক্রমশঃ অন্যরকম হয়ে যাওয়া, নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে ওঠা, এটা ওর বেশ লাগে। 

মুখটা সাজানো হয়ে গেলে ঝুমির চুল নিয়ে কাজ শুরু করে সাকেলা। ঝুমির চুল লম্বা নয়, মাঝারি কিন্তু শক্ত শক্ত এবং কোকড়ানো। এই চুল নিয়ে খুব বেশি কিছু করাও সম্ভব নয়। সে কারণেই ও সব সময় চুলের সঙ্গে সুতোয় তৈরি বাড়তি টাসেল ব্যবহার করে, বেশিরভাগ সময়ই এটা দিয়ে বেণি করে রাখে ও। আজকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল টাসেল, সবুজ শাড়ির সঙ্গে টাসেলের নীচের দিককার রঙিন সুতোর-ফুলের কোনো মিল নেই ঠিকই, আবার বেমানানও কি হবে? জানতে চায় সাকেলার কাছে ঝুমি। সাকেল বলে, “কি যে কন বিয়াইন? আপনারে দেইখা আমাগো দুলাভাইয়ের মাথা খারাপ হইয়া যাবেনে”। সাকেলার বোনের বিয়ে যেহেতু ঝুমিদের গ্রামে হয়েছে এবং সেই গ্রাম সূত্রেই ঝুমি সাকেলার “বেয়াইন” হয়ে গিয়েছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই ঝুমিকে যে বিয়ে করে সে দুলাভাই হবে। এই যে পরিচয়ের পর মুহূর্তে নতুন সম্পর্ক তৈরি হওয়া এটাইতো এদেশের রীতি। মজার ব্যাপার হলো এই সব সম্পর্ক তার চেয়েও দ্রুততার সঙ্গে ভেঙেও যায়, ঝুমি ভাবে সাকেলার সঙ্গে হয়তো আবার দেখা হবে শিগ্গিরই, যদি সত্যি সত্যিই এখানে বিয়েটা হয়, তখন সাকেলাকে ও বাড়িতেই ডেকে নেবে সাজানোর জন্য। ঝুমি সেকথা বলেও ফেলে ওকে, কিন্তু সাকেলা বলে, “নারে বিয়াইন, ম্যাডাম যাইতে দেবে নানে, বাইরে কোনোহানে যাইতে দেয় না। আর বউ সাজানোর কাম ম্যাডাম নিজের হাতে করে। কাউরে করতে দেয় না, যদি আমরা শিখ্খা যাই?” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সাকেলা। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে, “বিয়াইন আপনে আমার নাম্বার নিয়া যাইয়েন, আগের দিন মোবাইল কইরা দিলে আমি পরের দিন ছুটি নিয়া আপনারে সাজাইয়া দিয়া আসবানে, কেউ জানবারও পারবেনানে”।ঝুমি সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকায়।

কথার সঙ্গে সঙ্গে সাকেলার হাতও চলে দ্রুত, বন্ধ হয় না। ঝুমির চুল শ্যাম্পু করা ছিল, ও একটু পানি স্প্রে করে তারপর হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকাতে শুরু করতেই কারেন্ট চলে যায়। সাকেলা বলে, “এহনই আইসা যাবেনে বিদ্যুৎ, এহন আর গিয়া বেশিক্ষণ থাহে না বুঝলেন?” সত্যি সত্যিই কিছুক্ষণের মধ্যেই বিদ্যুৎ বাবু এলেন। সাকেলা নিপূণ হাতে চুল করে দিলো ঝুমির। টাসেল লাগিয়ে লম্বা বেণি করে দিলো। তারপর শাড়িটা পরিয়ে দিলো অনেক যতœ নিয়ে। ঝুমি দেখেছে নিজে নিজে শাড়ি পরলে এতো সুন্দর হয় না। পাঁচশ টাকা গেলো ঠিকই কিন্তু সাজটা খারাপ হলো না। টাকা বুঝিয়ে দিয়ে সাকেলার হাতে আরো কুড়ি টাকা গুঁজে দিয়ে যখন সাজনালয় থেকে ঝুমি বেরুলো তখন জৈষ্ঠ মাসের সূর্য্যবাবু নিজেই গলে গলে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। রাস্তাটা কেমন নির্জন, কেউ নেই, হয়তো খাওয়ার সময় বলেই, কিংবা আজকে হাটবারও নয় যে মানুষ থাকবে। ঝুমি ঘামতে ঘামতে অটো খোঁজে। ঢাকা শহরে যখন থেকে সিএনজি চলা শুরু করেছে তখন থেকেই ঢাকা শহরের সব অটো রিক্সা যাকে আগে লোকে বেবিট্যাক্সি বলতো সব চলে এসেছে গ্রামের দিকে। ঝুমির বেশিক্ষণ ঘামতে হলো না, একটা বেবিট্যাক্সি পেয়ে গেলো ও। 

আবার থানা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কচুরি ভর্তি কুমার নদের ওপর ভাঙাচোরা সেতুটি পার হয়ে ওদের বাড়ির দিকে ছুটলো বেবিট্যাক্সি। রাস্তার দু’পাশে আগে বিল ছিল এখন বাড়ি উঠে গেছে। দোকান পাটও বসেছে কিছু কিছু। গ্রাম আর গ্রাম নেই, শহর হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ঝুমির অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই। ওর মনে হচ্ছে, ওরা যদি এসে গিয়ে থাকে? তাহলে? আবার ভাবলো গ্রামে সাধারণত তিনটে চারটের দিকে লোকে মেয়ে দেখতে আসে। রাতেও না, দিনের ফটফটে আলোতেও না। কেন কে জানে? ঝুমি ড্রাইভারকে তাড়াতাড়ি একটু তাড়াতাড়ি চালাতে বলে নিজে বাতাস থেকে চুল বাঁচানোর চেষ্টা করে। আঁচল দিয়ে মাথাটা ঢেকে ফেলে। নিজেকে ওর বউ বউ মনে হয়। আহা এমন সময়ে যদি পাশে সালমান অথবা ঋত্ত্বিকের মতো একটা লোক থাকতো, ওকে যদি জড়িয়ে ধরে রাখতো, কী আনন্দই না হতো। মনে মনে ভাবে, একদিন এরকম স্বামী লোকটাকে নিয়ে ও সেজেগুজে অটো চড়ে বেড়াতে বেরুবে আর চুল তখন আঁচল দিয়ে ঢাকবে না, উড়তে দেবে, উড়তেই দেবে। 

বাড়ি পৌঁছুতে আধ ঘন্টা মতো লাগলো ওর। অথচ এই পথ পেরুতে এক সময় তিন ঘন্টার বেশি লেগে যেতো, সেদিন কতো দূর অতীত মনে হয় আজকাল। ও তখন বেশ ছোটও। দুপুরের তেজ মরে বিকেল এগিয়ে আসছে। বেবিট্যাক্সি একেবারে দরোজার সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছিল ঝুমি, যাতে কেউ ওকে না দেখে ফেলে। দেখলেই হাজার প্রশ্ন, এখন কারো সঙ্গে কথাই বলতে মন চাইছে না ওর। ঝুমির বাবাকে দেখা গেলো না কোথাও, বোনগুলো কাজ করছে মায়ের সঙ্গে, মেজ বোনটা তখনও স্কুল থেকে ফেরেনি। ছোটগুলো আজ স্কুলেই যায়নি। রান্না বান্না হচ্ছে, পোলাও-এর ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ও গিয়ে ওদের টিনের ঘরের একবারে কোণের দিককার কামরার জানালা খুলে দিয়ে বসে থাকে। কামরাতো নয়, যেনো খোপ, মাঝখানে টিনেরই বেড়া দিয়ে আলাদা করা। ও জানে অপেক্ষা ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই ওর। 

বাইরে অটোর আওয়াজে ঝুমির ভাবনাটা ছিঁড়ে যায়। বোঝে যে বাড়িতে লোকজন ঢুকছে। আফতার মোল্লার গলার আওয়াজ বোঝা যায়। সঙ্গে নারী কন্ঠ এবং অপরিচিত পুরুষের গলাও, বাবার গলাতো চেনাই যায়। ওদেরকে বাইরে বসানো হয় না, সরাসরি ঘরের ভেতর এনে বসানো হয়। কে আবার কী জিজ্ঞেস করতে শুরু করে, গ্রামের মানুষেরতো ঠিক ঠিকানা নাই। এমন সব কথা শুরু করতে পারে, যার মাথামু-ু নাই। ঝুমি বসে বসে কী ভাববে বুঝতে পারে না, সময় যেনো কাটেই না, অবস্থাটা ঠিক এমন। আর ঠিক তখনই কোত্থেকে যেনো গরমের হলকা এসে ঘর ভরিয়ে দিয়ে যায়, ওর মনে হয়, আজকে গরমটা কি একটু বেশিই পড়লো। গায়ে জর্জেট শাড়ি লেপ্টে যেতে থাকে ঘামের সঙ্গে। 

ঝুমিকে নিতে আসে ওর ছোট বোন। বলে “আফা চলো, তোমারে নিয়া যাইতে কইছে আব্বা”। ঝুমি তৈরিই ছিল। শুধুমাত্র ঘেমে যাওয়া ছাড়া আর কোনো অসুবিধে ওর ছিল না। ও স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে বোনের সঙ্গে পাশের ঘরের দিকে এগোয়। বুকের ভেতর এতোক্ষণ যে ভয়-ভীতি কাজ করছিলো তা চলে যায় কেন যেনো। ও গিয়ে দাঁড়ায় রুমের মানুষগুলোর সামনে। এ দৃশ্য সনাতন, বাংলাদেশের অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও এরকম দৃশ্যের বদল খুব একটা হয়নি। একজন মোটা মতো চশমা পরা মহিলা ওকে প্রথমেই প্রশ্ন করে, “গার্মেন্টস-এ কি মেশিন চালানোর কাম করো?” ঝুমি পরিষ্কার গলায় বলে, “না, সুপারভাইজারের এসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করি”। 

“ওই একই কথা। গামেন্টস-এর কাজ মানেই মেশিন চালানো”। মহিলা খসখসে গলায় বলে। ঝুমির মহিলার দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারে যে, মহিলার কপাল কুঁচকে আছে। ও মহিলার কথার কোনো উত্তর করে না। মহিলা আবার বলে, “শোনো এই চাকরি করা যাবে না, চাকরির দরকার নাই। আমি ছেলেরে বিয়া করাইয়া বউয়ের কামাই খাওয়া মানুষ না। তোমারে চাকরি ছাড়তে হবে”। ঝুমি এবারও চুপ করে শোনে, কী বলবে এ কথার পরে ও? এখনও তো ও জানেই না যে, এখানে ওর বিয়ে হবে কি হবে না। তারপর একের পর এক কথা বলে যায় মহিলা, মহিলার মেয়ে, মেয়ের জামাই। ঝুমি কোনোটার উত্তর দেয়, কোনোটার দেয় না। হঠাৎই এক সময় মহিলা বলে, “এই মাইয়া, তুমি মুখে এইগুলান কী মাখছো? গায়ের আসল রঙতো বুঝার উপায় নাই। যাও তুমি সাবান দিয়া ডইলা ডইলা মুখ ধুইয়া আসো, ওঠো, এহনই ওঠো”। মহিলার গলার স্বরে, বলার ভঙ্গিতে এমন কিছুটা একটা ছিল যে, ঝুমি হতচতিক হয়ে যায়। ও সরাসরি মহিলার দিকে চোখ তুলে তাকায়। দেখতে পায় চশমার ভেতর দিয়ে মহিলার চোখ দু’টো যেনো জ্বলছে। যদিও ওদের ঘরটা যে খুব আলোকিত তা নয়, একটু আঁধার আঁধার, গ্রামের টিনের ঘর যেমন হয়, তেমন।

ঝুমি বুঝতে পারছিলো না ও কী করবে। ওর কান্না আসছিলো, কষ্টে আবার কষ্টটা গিলেও ফেলছিলো। ওর কি ওঠা উচিত নাকি উচিত না, সেটা বুঝে ওঠার আগেই বাবা বলেছিল, “যা ওঠ, মুখ ধুয়ে আয়। কী গরম পড়ছে, এই গরমের মধ্যে এরকম সঙ সাজার কী দরকার আছিলো? দ্যাহো কেমনে ঘামছে মাইয়ায়?” ঝুমি উঠে দাঁড়ায়, একা একাই, তারপর সবার সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়, বাইরে তখন বাতাস ছেড়েছে হাল্কা একটু। এতোক্ষ শরীরের ওপর বসে যাওয়া ঘামের ওপর বাতাসের ছোঁয়া লাগায় ওর ভালো লাগে। ও ওর নিজের বানানো বাথরুমের দিকে এগোয়। সেখানে বালতিতে রাখা জল, বাসায় মেহমান আসবে বলে বোনেরাই হয়তো এনে রেখেছে। ও সেই বালতি থেকে আজলা ভরে জল নিয়ে মুখে ছেঁটাতে শুরু করে। ওর চুল ভিজে যায়, শাড়িও একটু একটু ভেজে। সাবান থাকে ঘরে, কাউকে ডেকে যে সাবানটা দিয়ে যেতে বলবে সেটা আর ইচ্ছে করে না। ঘঁষে ঘঁষে মুখ থেকে রঙ ওঠাতে শুরু করে ঝুমি। এক সময় মনে হয় মুখের চামড়াটাই বুঝি উঠে যাবে ওর। ও জানে এই আধ-খেচড়া ভাবে মেক আপ ওঠানোর কারণে ওকে দেখতে অনেক বাজে লাগবে কিন্তু তাতে কি? ভেতরে ভেতরে যে আকাঙ্খা নিয়ে ও সেজেছিল তাতো আর কাউকে বোঝানোর দরকার নেই, ও শাড়ির আঁচল দিয়েই মুখটা মুছতে মুছতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে আসে। 

মহিলা তখনও অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে, দেনা-পাওনা কিছুই চায় না তারা, “আমার সোজা সাপ্টা কথা, আমি ছেলে বেচতে আসি নাই। মেয়ে কিনতেও আসি নাই। আমার ছেলের বউ দরকার, বউ নিতে আইছি”, যে মুহূর্তে ঝুমি ঘরে ঢোকে সেই মুহূর্তে মহিলা এই বাক্যটি বলছিল, এবং সেটা থামিয়েই ঝুমির দিকে তাকিয়ে বলে, “এইতো আসল রঙ বাইর ওইয়া আইছে। আমার চোখরে ফাঁকি দিতে পারবা না বুঝলা? কোনোদিন সেই চিষ্টাও কইরো না, এই যে কইয়া দিলাম”। ঝুমিকে কেউ বসতেও বলে না আর। এক সময় ঝুমির মনে হয় ও মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবে কিন্তু ওর সামনে যে সব কথা হতে থাকে তাতে ওর মনে হয়, এখানে মাথা ঘুরিয়ে পড়লেও কেউ ওকে ধরবে না। ওই মুহূর্তে ওদের টিনের ঘরের সবচেয়ে বড় রুমটাতে বসে ওর বিয়ের তারিখ ঠিক করছিলো উপস্থিত মানুষেরা। কোনো রকম দেনা-পাওনা ছাড়া, ঝুমির মতো সাধারণের চেয়ে খাঁটো, কোকড়া চুলের আর মাজা গায়ের রঙের মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো পরের সপ্তাহে। ছেলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ছেলের মা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার, ছেলের এক বোন, বিয়ে হয়ে গেছে, বোনের স্বামী ব্যবসায়ী; থানা শহরে ঢোকার আগেই বিশাল বাড়ি এবং মাঠে বিঘা পঞ্চাশেক জমি – কেউই ভাবতে পারেনি যে, ঝুমির এরকম বিয়ে হবে। ঝুমির মা মানত করে ফেলে সেই সন্ধ্যায়, বিয়েটা ভালোয় ভালোয় শেষ হওয়ার জন্য। ঝুমির বাবা দৌঁড়োদৌড়ি শুরু করে চারদিকে, ফোন করে জানায় আপনজনদের, কেবল গ্রামের কাউকেই এ বিয়ের কথা জানানো হয় না, যদি কেউ ভাঙানি দেয় সে জন্য। কিন্তু কথা কি আর চাপা থাকে? থাকে না। বরং, কথা বেড়ে যায়, বাড়তে বাড়তে ঝুমির কপাল নিয়ে অতিরঞ্জন শুরু হয়। আর এগুতে থাকে পরের সপ্তাহ আসার সময়।

ঝুমির এহেন সৌভাগ্যে সকলেই আপ্লুত, বিস্মিত হলেও কেবলমাত্র একজন, ঝুমির বাবার সৎ বোনের বড় মেয়ে সালমা, যে কিনা ঢাকা শহরে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে একা একা বৃদ্ধা মাকে নিয়ে বসবাস করে, সে সোজা ঝুমির বাবাকে বলে, ছেলে সম্পর্কে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন বড় মামা, নিশ্চয়ই ছেলের কোনো দোষ আছে, নইলে ঝুমিরে ক্যান পছন্দ করবে এতো ভালো ছেলের জন্য। ঝুমির বাবা সৎ বোনের মেয়েকে যতোটা উৎসাহ নিয়ে ফোন করেছিল ঠিক ততোটা বিরক্তি নিয়েই বলে, “তোর সব কিছুতেই বাগড়া দেওয়ার স্বভাব, নিজেতো সংসার করতে পারলি না, এ্যাহন আমার মেয়ের সংসার নিয়া তোর কিছু না কইলেও অবে। আফারে নিয়া আসলে খুশি অবো। না আসলেও কিছু কওয়ার নাই। যে পরিবারে বিয়া অবার লাগছে সাত জনম ধইরা রাস্তায় বইসা কানলেও এইরম পরিবার পাবো না আমরা। এ্যাহন খোঁজ খবর নিতে গিয়া সব নষ্ট করার কোনো মানে নাই। তোগো কওয়ার কাম আছিলো  কইলাম, আসলে আসফি না আসলে নাই”। বলেই ঝুমির বাবা ফোন রেখে দেয়। 

পরের সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনটি দ্রুত চলে আসে। এবং ঝুমির বিয়ে হয়ে যায়। ঝুমিকে অসাধারণ করে সাজিয়ে দিয়েছিল সাকেলা। 

অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো – গল্পটা এরকম হলেও হতে পারতো কিন্তু সালমার সন্দেহটা একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়েছিল অনেকেরই মনে। বিয়েতে সালমা তার মাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল। এবং সালমারা ঢাকা ফিরে গিয়ে জেনেছিল যে, বিয়ের দিনই বর নাকি ঝুমিদের লেবু বাগানে বসে ফেনসিডিল খেয়েছিল। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেরা তার সাক্ষী। কিন্তু এসব নিছক গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল ঝুমির বাবা। শুধু ঝুমি বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যে জেনেছিল যে, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার-টিয়ার কিছু নয়, চেয়ারম্যান বাবার বখে যাওয়া নেশাড়– ছেলেকে ভালো করানোর শেষ ভরসা হিসেবে ছেলেকে বিয়ে করানোর পরামর্শ ঝুমির শাশুড়িকে দিয়েছিল আফতার মোল্লা নিজেই। 

ঝুমির স্বামীর নাম ইমারত ইসলাম, প্রধান শিক্ষক মা আদর করে ছেলেকে ডাকে ইমো বলে। আর তার আদরের ইমো আজকাল মা’কে ছুরি নিয়ে সারা বাড়ি দাবড়ে দাবড়ে নেশার টাকা জোগাড় করে। স্কুল থেকে ফিরে প্রধান শিক্ষক মহিলা নিজের ঘরের দরোজা বন্ধ করে বসে থাকে ছেলের ভয়ে, জানালা দিয়ে তারে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। 

ঝুমি এখন আর চাকরি করে না। ঝুমি সাজেও না, ও সাধারণ হয়ে গেছে, খুবই সাধারণ। ঝুমির আয় উপার্জন নাই। ঝুমি সাবেক চেয়ারম্যানের “ব্যাটার বউ” হয়ে বিশাল চেয়ারম্যান বাড়ির একটি ঘরে থাকে। কাজ করে, আবার করে না, ওর ইচ্ছা। স্বামীর সঙ্গে কখনও কোনো কোনো রাতে দেখা হয়, যে রাতে নেশা কম হয় সে রাতেই কেবল। ওর স্বামীর ঘর আলাদা, বাড়ির বাইরের দিকে সে ঘর। বিয়ের আগে যে সব স্বপ্নের কথা আমরা জানি সেগুলো এখনও ঝুমি দেখে কি না তার খবর আমাদের জানা নেই। আমরা জানতে পারি যে, ঝুমির পেটে সন্তান বড় হচ্ছে। আর ঝুমি একটা উপায় পেয়েছে তার মার হাতে কিছু টাকা তুলে দেয়ার। নিজেকে ছেলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মহিলা বেশিরভাগ সময় ঘরবন্দী করে রাখে বলে, ফসলাদির খবর মহিলা আজকাল তেমন রাখে না। এবার ঝুমি অন্ততঃ মণ দশেক ধানতো বিক্রি করতেই পারবে। দশ মণ ধানের দাম কতো? ঝুমি সারাদিন হিসেব কষে এবং পেটের ভেতর প্রাণের নড়াচড়ার আনন্দ সমস্ত শরীর আর মন দিয়ে উপভোগ করে। 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত