| 14 এপ্রিল 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

বিগ্রহ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comএকটা হিলহিলে হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠতেই বিপুলের গা ছমছম করে উঠলো। ভোরের ছায়ান্ধকার এখনো কাটতে শুরু করেনি। কান পাতলে শিশিরের শব্দ শোনা যায়। ভট্টাচার্য বাড়ির পূজা এবার নমো নমো করে হবার কথা থাকলেও প্যান্ডেল প্রতিবারের মতোই জাঁকজমক করে করেছে। বাড়ি ফেরার পথে বিপুল দেখেছে মস্ত বড় প্যান্ডেলটা। লাল নীল মরিচ বাতিগুলো তখনো নেভেনি।

বাতাসে ধুপধুনোর সুঘ্রাণ। রাজীবদের শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। পথের উপরেও ফুল ঝরে পড়েছে। বুক ভরে ঘ্রাণ নিতে নিতে আসছিল বিপুল দাশগুপ্ত । চারুকলা থেকে পাস করে বের হবার পর একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করছে তিন বছর হলো। বছরে দু’তিন বার বাড়ি আসা হয়। এবার এলো প্রায় ছমাস পর। ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছে বিপুল। নইলে শুধু বিজয়ার ছুটিতে এতদূর জার্নি করে আসা পোষায় নাকি! তবু মা লক্ষ্মী পূজা অব্দি থেকে যেতে জোরাজুরি করবে। কিন্তু বিপুল প্রতিবারই ফিরে যায়। এত লম্বা ছুটি মেলে না কখনো।

একটু সামনে এগিয়েই অতনুদের বাড়ি। বাড়ির সামনে নতুন টিউবওয়েল। এর আগেরবার এটা দেখেনি বিপুল। প্রতিবারই বাড়ি এলে সে টের পায় চেনা দৃশ্যগুলি কেমন অল্প অল্প করে বদলে যাচ্ছে। ব্যাগটা গাছের সাথে হেলান দিয়ে রেখে শার্টের হাতা গুটিয়ে নেয় সে। হ্যান্ডেলের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ভোরের মাধুর্যটা মুহূর্তেই খানখান হয়ে যায়। শীতল জলের ঝাপটায় গাটা শিরশির করে ওঠে ওর৷

দূরে বিষ্ণুমন্দিরের চূড়ায় বসে একটা বিশাল আকৃতির পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। পাশের বাবলা গাছটার দিকে চোখ যেতেই একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। মনে হচ্ছে শরীর ধরে কেউ ঝাকাচ্ছে ওটাকে, গাছের পাতায় পাতায় অশরীরি কিছু ভর করেছে।

বাকি পথটুকু বিপুল প্রায় ছুটতে ছুটতে গেল। সেই ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে যেমন হতো, বুকে থুতু দিয়ে রাম নাম জপতে জপতে আসতো ওরা। এ বয়সে এমন ভয় পাওয়া কি ছেলেমানুষি !

সামনে তাকাতেই দেখতে পেল সদর দরজায় মা দুর্গা দাঁড়িয়ে আছে। আহ্, এবার আর ভয় কিসের!

মা কাছে আসতেই মিষ্টি একটা ঘ্রাণ নাকে ঝাপটা দিয়ে গেল। ভেজা ভেজা চোখমুখ৷ এই ভোরবেলাতে স্নান সেরে আহ্নিক করা হয়ে গেছে বোধ হয়। এখন হাত পাতলে সাগুমাখা কলা খেতে পাবে সে। কিন্তু মা বলবে, আগে স্নান সেরে আয়, গরম জল দিচ্ছি।

অনেকদিন পরপর বাড়ি এলে প্রথম দু’দিন শুধু মাকে দেখে সে। কপালে সিঁদুরের ফোঁটাটা কেমন জ্বলজ্বল করে, শাড়ির আঁচলে রাখা চাবির গোছাটা কেমন ঝনঝন করে!মাকে মনে হয় যেন কিশোরবেলার প্রিয় উপন্যাসের কোনো চরিত্র। দুর্গার আরেক নাম গৌরি, মায়ের নামও তাই। বৌদি আর দিদিদের কখনো মা দুর্গা মনে হয়নি ওর। ওরা অত বড় করে সিঁদুর টিদুর পরে না। মোটা মোটা শাঁখা নোয়াও না। সরু আর নিত্য নতুন ডিজাইনের শাঁখা পলা চাই ওদের।

আজকে সপ্তমীপূজা। ভট্টাচার্য বাড়ির মন্ডপে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। এদিকের লোকজন সব ও বাড়িতেই অঞ্জলি দেয়। লাউডস্পিকারে চণ্ডীপাঠ হচ্ছে। বিপুল স্নান সেরে বের হয়েছে। এই সকাল সকাল বৌদি জোর করে একগাদা লুচি পায়েস খাওয়ালো। ভরপেট খেয়ে কেমন অস্বস্তি লাগছে এখন। হাঁটতে হাঁটতে দু’চক্কর দিলে আরাম পাবে বলে বেরিয়েছে সে। এ সুযোগে এলাকার প্রতিমাগুলোও দেখা হয়ে যাবে। তবু সন্ধ্যায় দল বেঁধে বের হওয়া চাই। নইলে বৌদি আর দিদিরা সব গাল ফোলায়।

হাঁটতে হাঁটতে অতনু, রাজীবলোচনদের বাড়ি পেরিয়ে আসে সে। মন্দিরের চূড়ার দিকে চোখ চলে যায়। পাখিটা যায়নি এখনো। ভোরবেলায় সেই একই ভঙ্গিতে বসে ছিল। একসময় এই মন্দির নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা করতো ওরা। আজ ভোরে অনেকদিন পর যে ভয়মিশ্রিত অস্বস্তিটা হয়েছিল এখন আর তা নেই। পুরো জায়গাটা জুড়ে বনগাঁদা, হাতিশুঁড়, লতাকস্তুরীরা অনেকদিন হলো জাঁকিয়ে বসেছে। বিপুল সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে সামনে এগোচ্ছে। শ্যাওলার পুরু স্তর ফুঁড়ে চকচকে সবুজ ফার্ণ মাথা তুলে বেরিয়েছে। বহুদিন পর এদিকে পা পড়লো। কিশোর বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে এখানে আসা হতো। মাগরিবের আজানের পর এক ঘন্টা থাকতে পারলেই পঞ্চাশ টাকা জেতা যেতো। সেসব বহুদিন আগেকার কথা। এখন বোধ হয় কেউ এমন বোকা বোকা বাজি ধরে না। কাছে যেতে যেতে বিপুল এবার একটু অবাক হলো কারণ একটু আগেও চূড়ায় যে পাখিটাকে দেখতে পেয়েছে সেটা এখন আর নেই। কখন চলে গেছে লক্ষও করেনি।

একসময় রৌদ্রপাড়ায় একমাত্র দর্শনীয় জায়গা ছিল এই মন্দিরটা। এমন পরিত্যক্ত মন্দির দেখতে এখন আর তেমন কেউ আসে না। তাছাড়া জমিটার মালিকানা নিয়েও বছরখানেক ধরে কী সব গণ্ডগোল চলছে।

মন্দিরের মূর্তিটা ভীষণ সুন্দর ছিল, কালচে রঙের, কষ্টিপাথরের। বিপুলের কাছে এখন যেটা আছে ঠিক সেটার মতো রঙ ছিল সেটার। ওর মনে আছে যতবারই সে প্রণাম করে মাথা তুলতো মনে হতো বিষ্ণুঠাকুর তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। মাঝেমাঝে সে জায়গা বদল করেও দেখেছে। সব কোণ থেকেই মনে হতো বিগ্রহের দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। সেই মূর্তিটিই বছর পনেরো আগে হঠাৎ একদিন মন্দির থেকে বেদীসহ চুরি হয়ে গেলে এলাকায় বেশ শোরগোল পড়ে যায়।

বিপুল আর তার বন্ধুরা সেবার পুরো পূজার ছুটিটা চুরির ঘটনা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে কাটিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে কথিত আছে জমিদার কেশবচন্দ্রের দীঘিতে বিষ্ণুঠাকুরের বিষ্ণুদেবের ঐ বিগ্রহটা পাওয়া গিয়েছিল। সেও এক রূপকথার গল্পের মতো কাহিনী। প্রায় শত বছর আগে সাহা বাড়ির বড় ছেলে ভূপেন সাহা স্বপ্নে ঠাকুরের আদেশ পায়। মাঝরাত্রেই লোকটা ছুটে গিয়ে কেশবচন্দ্রের দীঘিতে ডুব দেয়। পরপর ছয় ডুব দিয়ে বিষ্ণুর বিগ্রহ, বেদী, পঞ্চপ্রদীপ, কোষা, ধুপদানি,পুষ্পদানি তুলে আনে৷ অনেকেই বললো বিগ্রহটা চুরি হয়নি। কোনো কারণে ঠাকুর অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাই আবার জলে ফিরে গেছেন। কেউ কেউ প্রস্তাব দিল দীঘিতে লোক নামাতে, আবার সেখানেই পাওয়া যাবে কষ্টিপাথরের মূর্তিটি।

সেবার পূজার ছুটিতেই বিপুল প্রথম কাদামাটি দিয়ে প্রতিমা বানাতে শুরু করে। ওর তৈরি বিষ্ণুমূর্তি দেখে বাড়ির সবাই অবাক হয়েছিল। মা বলেছিল মূর্তিটা দেখতে অনেকটাই চুরি যাওয়া বিগ্রহটার মতোন। এই ছেলের হাতে যাদু আছে। ফলে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে সে একের পর বিগ্রহ বানাতে থাকে। হয়ত একারণেই পরবর্তী জীবনেও এই কাজটা ওর প্রিয় হয়ে উঠেছে৷

মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াবার পর ছেলেবেলার সেই অদ্ভুত আমেজটা ফিরে এলো। কেমন গা ছমছম করা পরিবেশ, কেমন একটা ঘোরগ্রস্ত মুহূর্ত! ঐ পশ্চিম দিকে কয়েক পা এগোলেই জমিদার কেশবচন্দ্রের দীঘিটা দেখা যায়। সেবার বিগ্রহ চুরি হয়ে যাবার পর ওটা খুঁজতে গিয়ে জলে ডুবে দুজন মারা গিয়েছিল। এরপর থেকে পুরো ব্যাপারটাই এই এলাকার লোকজনের কাছে অভিশপ্ত হয়ে গেছে।

এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ বেলা বাড়ছে। রোদের তেজে ঘামতে শুরু করেছে বিপুল। বৌদির ফোন এলো বলে সে ফিরে চললো এবার। আজকে মন্দিরের একটা স্কেচ আঁকবে। বহুদিন পর স্কেচ করতে ইচ্ছে করছে। ওর স্কেচবুকটা বাড়িতেই আছে, মা যত্ন করে তুলে রেখেছিল কোথাও৷ বিপুল একা একা খুঁজে পাবে কিনা সেটাই প্রশ্ন।

সবার জন্য আনা উপহারগুলোও দিয়ে দিতে হবে ফিরে। প্রতিবারের মতো বিপুল এবারেও বৌদি আর দিদিদের জন্য শাড়ি এনেছে। দাদা আর বাবার জন্য পাঞ্জাবি। মায়ের জন্য ইচ্ছে করেই শাড়ি আনেনি। মানুষটা বকে ওকে। বলে -গুচ্ছের টাকা খরচ না করে কিছু জমালেও পারিস, সামনে বিয়ে করে সংসারী হতে হবে, বুঝবি তখন! এ জন্মে আর হিসেব করে চলতে শিখলি না,ইত্যাদি। এবার তাই মায়ের শাড়ি বাদ।

আরো খানিকটা পায়চারি করে তারপর বাড়ি ফিরলো বিপুল। ও ফিরে এলে বৌদি খেতে দিলো সবাইকে। এ বাড়িতে দশমীর আগ পর্যন্ত প্রতিদিনই নিরামিষ রান্না হয়। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মা অন্তত পাঁচ পদের ব্যঞ্জন রান্না করে। এসব ছাড়াও লুচি, পায়েস, সন্দেশ তো থাকবেই। এবার বৌদি আর দিদিরা মিলে সেসব আয়োজন করছে। বিপুল খেতে বসে অঞ্জলির কথা জিজ্ঞেস করতেই মুখ শুকনো হয়ে গেল ওদের। শেষমেশ বাবা মৃদুগলায় বললো অশৌচ পুরো এক বছর জুড়ে চলে, এবছর তাই ওদের অঞ্জলি দেবার নিষেধ আছে।

নিজের প্রতি বিরক্ত হলো বিপুল। ওরই দোষ, মনে থাকে না অত নিয়মটিয়ম। এখনো যে বছর গড়াতে আরো কয়েকটা দিন বাকি রয়েছে সেটাও মনে থাকে না। যেন মানুষটা এ বাড়িতেই কোথাও আছে, ডাকলেই সাড়া দেবে। কান পাতলেই তার চুড়ির শব্দ, চাবির ঝনঝন শোনা যাবে। বাড়ি ফিরলেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে বরাবরের মতোন।

খাবার পর বৌদি এসে নতুন শাড়িগুলো দেখতে চাইলে পরিবেশ যেন একটু হালকা হলো। দিদিরাও এলো পিছু পিছু। ওদের চোখেমুখে কৌতূহলের আভাস। প্রতিবারই এ মুহূর্তটা খুব উপভোগ করে বিপুল।

সবাই যার যার উপহার বুঝে নেবার পর সবশেষে ব্যাগ থেকে বের হলো কালো রঙের মূর্তিটা। মূর্তি দেখে কেউ অবাক হলো না। বিপুলের হাতে তৈরি কিছু ভাস্কর্য এখনো সাজানো আছে বসার ঘরের শোকেসে। সে পড়াশোনা করেছেই এ বিষয়ে।

কালো রঙের নতুন এই মূর্তিটা দেখতে অনেকটা দুর্গা প্রতিমার মতো। কিন্তু একে একে সেটা যখন সবার হাতে পৌঁছে গেল তখন কারো বুঝতে বাকি রইলো না মুখাবয়বটি কার।

বাবা কিছু একটা বলতে গিয়েও বললো না৷ বোধ হয় একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে নিজের ঘরে চলে গেল। বৌদি আর দিদিরা চোখের জল লুকালো না। ওরা বললো-ভালোই হলো, চলে যাবার এক বছরের মাথায় মা ফিরে এলো এ বাড়িতে, বিগ্রহের রূপ ধরে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত