| 1 মার্চ 2024
Categories
দুই বাংলার গল্প সংখ্যা

ফুল ফুটুক না ফুটুক

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আজ মাঠের মাঝ বরাবর, বিশাল ঝুপসি কাঠবাদাম গাছটার কাছাকাছি  বিশাল বাজ পড়েছে। প্রবল শব্দে চৌচির হয়ে গেছে যেন ইশকুল বাড়িটা। ঠিক বেলা আড়াইটের সময়ে। 

টিফিন পিরিয়ডের পর থেকেই ক্রমশ সমস্ত আকাশ কালো করে এসেছিল। দিনের বেলা নিজের হাতের পাতা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না। হলদে টিমটিমে আলোর সুইচ বাংলার দিদিমণি রেবাদির নির্দেশে জ্বলছে বটে কিন্তু দিনের বেলা রাতের আঁধার দেখে ক্লাস এইটের বি সেকশনের  মেয়েদের সে কী তুমুল আনন্দ আর উল্লাস। ঐ ক্লাসরুমটাই তিনতলার সবচেয়ে কোণের ক্লাসরুম কিনা। আকাশমুখো। 

তা,  সে হৈচৈ এর মধ্যে র‍্যাপিড রিডারের গল্পপাঠ উবে গেল তপ্ত কড়ার মধ্যে ছ্যাঁক করে পড়া এক ফোঁটা জলের মত। মেঘ করা ইশতকই ক্লাস জুড়ে তুমুল অরাজকতা সত্ত্বেও  রেবা রায় একটা চেষ্টা করছিলেন কিছুটা স্বাভাবিকতা রাখার। দুদিকে লম্বা বিনুনি করা অনিন্দিতাকে ডেকে প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন গল্পগুচ্ছ দিয়ে। 

কিন্তু বেলা আড়াইটের তুমুল বাজটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজলি বাতিও গেল চলে। ব্যাস মেয়েদের আর পায় কে। সে কী তুমুল চীৎকার, হট্টগোল। হুড়মুড় করে সব মেয়েদের ক্লাসঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ানো। তিন তলার বারান্দা থেকে গোটা ইশকুলের খেলার মাঠটা সবুজের ওপর এক পোঁচ মেঘের ছায়া মেখে বনরাজিনীলা হয়ে গিয়েছে। আর বৃষ্টি নামতেই বিশাল বিশাল ফোঁটা তেরচা ছাঁটে এসে  আক্রমণ করেছে। ঝরে পড়ছে , গ্রিল ছাপিয়ে মেয়েদের গায়ে। 

এমত সময়ে গটগট করে স্কুল পরিদর্শনে বেরুলেন নলিনী হালদার। যেখানেই ইনডিসিপ্লিন সেখানেই নলিনী হালদারের সাদা শাড়ির ঝলক আর চাপা ঠোঁটের আভাস… এবং সঙ্গে সঙ্গে জোঁকের মুখে নুন। 

করিডোরে নলিনীর আবির্ভাব হতেই হুড়মুড়িয়ে মেয়েরা আবার প্রত্যাবর্তন করে ক্লাসরুমে এবং নীরব হয়ে যায় সব্বাই… দিদিমণি আধো অন্ধকারে পড়াতে থাকেন।” কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করে, সে মরে নাই। – বল ত মেয়েরা, এই বাক্যটার অর্থ কী দাঁড়াল?”

সময়টা সত্তরের দশক। সরকারি বাংলা মিডিয়াম ইশকুলের হেড দিদিমণি নলিনী হালদার। তাঁর দাপটই আলাদা। ঋজু, বলিষ্ঠ, সপাট চোখে তাকানো, কঠোর। অবশ্যই বিবাহ করেন নি। অবিবাহিতা বললে কিছু বোঝা যায়না। বলতে হয় অবিবাহকে বেছে নিয়েছেন। সাদা শাড়ি, শ্বেতশুভ্র চুল টান করে পেছনে খোঁপা। নলিনী হালদার সব শিক্ষিকার মধ্যেও আলাদা। “অন্যরকম”। কেউ কেউ বলে, ছাত্রীদের বাবা মায়েরা, বিশেষত বাবারাই…, দু এক খানা পেরেন্ট টিচার মিটিং এর পর… উনি বলিষ্ঠ, পুরুষালি। 

এর পরেও যেটা অবশ্যই উল্লেখ্য,  যে বস্তুটা নলিনীর কর্মতৎপরতাকে মোটরের মত চালনা করত, সেটা নলিনী হালদারের বিশ্বাস। সেটা গোপন না, গোপনীয়ও না। না, নলিনীর ভেতরের চাপা, অজানা কোন সুরভি না। রীতিমত ঘোষিত, প্রায় যেন অ্যাজেন্ডাই। 

ইশকুলের বাচ্চা  বাচ্চা মেয়েরা, ক্লাস সিক্স এর মেয়েগুলোও তার আঁচ পায়। সচেতন হয়।    নলিনী হালদার  পাক্কা কমিউনিস্ট। শব্দটা যারা চেনেনা তারাও এখন শব্দটার শোনা শোনা ভাসা ভাসা অর্থটা আঁচ করতে পারে। বিমূর্ত শব্দটা নলিনী হালদারকে ঘিরে অবয়ব পায় যেন। 

সেই আদর্শবাদ, বিশ্বাস ত  চেপে রাখবার বস্তুই না। মিশনারি উৎসাহে প্রচার করার জিনিস। মনে প্রাণে তাই চেষ্টা করছেন নলিনী। ছাত্রীদের কাঁচামাটির তালের মত মনের ওপর ছাপটা পড়ুক, চাইতেন। ফলত প্রতি পদক্ষেপে তাঁর ভেতর থেকে ঝরে পড়ত সে উদ্দেশ্য, সে অভিপ্রায়। 

এ যেন প্রেম। কভু রয় না ঘরে, আলোর মত ছড়িয়ে পড়ে। এক অদ্ভুত প্রখর তীব্র মনোষ্কামনা তাঁকে চালিত করে। আর তাই নলিনী হালদারের ক্লাস নেওয়া, তাঁর ছাত্রীদের সঙ্গে কথা, কাজ, তাদের প্রতি নির্দেশ সবের ভেতর এমন এক মাদকতা আছে। কেউ কেউ অবধারিতভাবে নলিনীর ভক্ত হয়ে গেল। অন্যেরা  তাঁকে  ভয় পায়। বিশুদ্ধ ভয়।  

 

অথচ এই মেয়ে ইশকুলটা যে বছর বছর কতগুলো অপসংস্কৃতির ডিপো হয়েছে সে কথা আর বলতে। সরকারি ইশকুলে মেয়েরা আসে মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘর থেকে। এই বিশাল মাঠ ওলা, সরকারি ছাপ্পা পড়া সাদা সবুজ ইশকুলটা কলকাতার যে অঞ্চলে, এর ছাত্রীরা অধিকাংশ আসে দক্ষিণের বেশ কিছু মধ্যবিত্ত পাড়া থেকেই। কিছু উচ্চবিত্ত পাড়ার খাঁজে খোঁজে লেগে থাকা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেও আসে। তবে উচ্চবিত্ত আজকাল ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মিডিয়াম বা বড় নামের প্রাইভেট স্কুলেই ভর্তি করতে শুরু করেছে। এ ইশকুলের মেয়েদের দিকে অ্যাসেমব্লি লাইনে তাকালে কখনো কখনো বোঝা যায় কোন মেয়ে তার দিদির সবুজ স্কার্টের তলা মুড়ে পরে এসেছে। সামান্য ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া স্কার্টটি সাক্ষ্য দেয় বহু বছরের কাচাকাচি আর ইস্তিরির। দিদিমণিদের কাজ হল ময়লা  ব্লাউজ, কুটকুটে ময়লা মোজা নজর করার। মোজা প্রায়শই এদের ইলাস্টিক ঢিলে হয়ে গিয়ে গুটিয়ে হাঁটু থেকে নেমে যায়। তবু বাবা মায়েরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে পরিষ্কার ধোপদুরস্ত করে পাঠানোর। তাও এক আধটা মেয়ে এরকম গুবলেট পাকিয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে যায়। অ্যাসেমব্লির এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। মঞ্চে তখন পকেটে গান্ধিজির বাণী লিখে আনা চিরকুট নিয়ে একটা মেয়ে থরথর করছে ভয়ে। সবার সামনে মুখস্ত করে বাণী বলতে হয়। সে এক বিপন্ন সময়।

লোকে বলবে, দিদিমণিদের কাজটা কীই বা এমন।  এটা ত ছেলেদের স্কুল নয় যে দিদিমণিদের বেত হাতে মারকুটে বাচ্চাদের সামলাতে হবে। তবু মেয়েরাও মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে, গুপচুপ গল্প করে। পেছনের দিকের চিলতে মাঠে বসে ক্লাস ফাঁকিও দেয় কখনো সখনো। আবার দৌড়োদৌড়ি করতে গিয়ে মাঠে পড়ে গিয়ে জামা ময়লা করে ফেলে। 

অ্যাসেমব্লি লাইনে আরেকটা জিনিস দেখতেই হয় ওঁদের। নজরে রাখতে হয়। মেয়েগুলোর চুল। কারো কারো চুলের দশা বলে দেয় বাড়িতে যত্ন হয়না। রুক্ষ হলদেটে লালচে চুল, মাথা চুলকোচ্ছে, উশকো-খুশকো, ছোট ক্লাসে এইটে খেয়াল রাখতেই হয়, সম্ভাব্য উকুনের কেস।  কে না জানে যে উকুন দ্রুত এক বাচ্চার মাথা থেকে অন্য বাচ্চার মাথায় চলে যায়। আর উঁচু ক্লাসে নজর রাখা হয় কেয়ারি করে কাটা, লক্স রাখা চুলের দিকে। কানের পাশ থেকে কপালের ওপর ঝুঁকে পড়া বাহারি লকস আজকাল ফ্যাশন। ববি সিনেমাটা এক বছর প্রায় রাজত্ব করে এই সেদিন চলে গেছে। বিশাল রিং কানে, কপালে বাহারি লকস, এ যেন  উঠন্তি বয়সের মেয়েদের প্রায় এপিডেমিক এ দাঁড়িয়েছে। ববিপ্রিন্ট, ববিহাতা জামার মতই। জামার সমস্যা ইশকুলে নেই।  ইউনিফর্ম পরা মেয়েদের নিয়ে এখন চিন্তা, ইশকুলে যদি লক্স কাটা মেয়ে আসে, অন্যদের ওপরে  তার কী ছাপ পড়ে যাবে। 

ক্লাস নাইনে, ক্লাস এইটে এক একটা ধাড়ি মেয়ে থেকে যায়, বছরের পর বছর এক ক্লাসে। পাকার ধাড়ি, চেহারা হঠাৎ ডেভেলাপড, আর তারাই এসব লকস কেটে ফেটে আসে আর ছেলেবন্ধুদের গল্প করে সব অন্য অপক্ক মাথাগুলোকে চিবিয়ে রাখে। পড়াশুনোর নামটি নেই সারাদিন শুধু অসভ্য কথা আর অসভ্য গল্প। বয়সগুলোও ত খারাপ। 

দিদিমণিদের সবার এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা। এই ত সেদিন ক্লাস সেভেনের সুচরিতার ডেস্কে হুমড়ি খেয়ে পড়া মেয়ের দল, মেয়েদের চোরা চাউনি, হাসাহাসি। টিফিন  পিরিয়ড শেষ হয়েছে।  তবু জিওগ্রাফি ক্লাসের দিদি মালবীদিকে দেখেও তাদের উল্লাস আর বাগ মানে না।  

বগলে রেজিস্টার মালবীদি, প্রত্যেকটা মেয়েকে কান ধরে বেঞ্চিতে দাঁড় করান, তারপর সুচরিতার হাত থেকে উদ্ধার করেন তার মূল্যবান সংগ্রহটি, ভুল বানানে ভরা অতি কদর্য হাতের লেখার দোমড়ানো মোচড়ানো এক  লাভ লেটার। হাতে নাতে ধরা পড়েছে। সুচরিতাকে নিয়ে মালবীদি প্যারেড করে  যান  নলিনী হালদারের চেম্বারে। জিনিসটা হেডের জিম্মা করে দিয়ে তবে তাঁর ছুটি। এক ঘন্টা সুচরিতাকে জেরা করা হয়। পরদিন গার্জেন কল করা হবে কি হবে না ভাববেন নলিনীদি।  সেভেনে টেনেটুনে উঠেছে, তার আগে  সিক্সে দু বছর পড়েছে সুচরিতা। চেহারায় একটা বেপরোয়া বড় বড় ভাব। চেহারা বেশ ম্যাচিওর। অথচ ব্রা পরে না সে। বাড়ির লোক দেখেনা এদের!

সুচরিতা সামনে বসে আঙুল খুঁটছে। 

নলিনী হালদারের কপালে ভাঁজ।

এই ইশকুলে প্রথম হেড হয়ে এসে কিছু ভাল কাজ করার ইচ্ছা ছিল। দেখে রেখেছেন প্রতি ক্লাসেই বেশ কিছু চমৎকার মেয়ে আছে, যাদের সংঙ্গে কথা বলার দরকার, কিছু কিছু কাজ ওদের দ্বারা হতে পারে। ওয়াল ম্যাগাজিন বেরোয় প্রতি দু সপ্তাহে, সেগুলো মন দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন নলিনী। বেশ কিছু কাঁচা ছড়া লেখা হয় তাতে, আবার কাঁচা হাতে হলেও কিছুটা প্রতিশ্রুতির সাক্ষর আছে এমন তথাকথিত আধুনিক কবিতাও পড়েছেন। ক্লাস এইটের  একটা মেয়ে, সুরূপা, ব্লু হাউজের। তার লেখা দেখে নিজের ছোটবেলার হাত মকশো করা কবিতার কথা মনে পড়ে। সঠিক সময়ে গাইডেন্স দিতে হবে এদের। হয়ত এদের ভেতর থেকেও ভবিষ্যতের কোন লেখক, কবি বেরিয়ে আসবে। ক্লাসের টপার মেয়েগুলো, নন্দিতা , বা মালশ্রী ক্লাস নাইনের, অঙ্কে ৯৮ তোলে। এরাই ত দেশের ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী হবে , চিকিৎসক হবে। এদের লেখাপড়ার দায় দায়িত্ব অনেকটাই তাদের বাড়ির, পরিবারের অবদান, টিউটর ও আছে এদের। তবু কাঁচামাটির তাল ত, এদের রুচিকে গড়তে ইচ্ছে করে। নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচী নিতে চান নলিনী।

কিন্তু এই  মেয়েদের দলে পেছনে পড়ে থাকা, পেছনে টেনে রাখা এইসব সুচরিতার মত মেয়েদের নিয়ে কী করেন তিনি? এদের দেখতে গেলে তো ওদের দেখা হয় না। ওই সম্ভাবনাময়  মেয়ে, ওদের জন্য সময় থাকে না। কোনদিকে মন দেবেন? ভাল মেয়েদের ভুলে যাবেন,  পতনের সর্বনিম্ন স্তর থেকে কিছু মেয়েকে টেনে তুলবেন? কাকে কাকে উদ্ধার করবেন তিনি।

-বাবা কী করেন তোমার?

-অফিসে কাজ করেন..হেড ক্লার্ক। মাথা নিচু, চোখ লাল সুচরিতার। 

-বাবার অফিসের নম্বর জানো, আমরা ফোন করব ওনাকে। তোমার কীর্তিটি বলতে হবে ত। 

-দিদি বাবা আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে তাহলে, প্লিজ  ফোন করবেন না, আপনার পায়ে পড়ি দিদি …

হুমড়ি খেয়ে এসে নলিনীর পায়ে পড়ে সুচরিতা। হু হু করে কাঁদে। কতটা সত্যি কতটা নাটক, বোঝা যায় না। 

-তোমার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে দেখা কোথায় হয়… চিঠি কীভাব দিয়েছে?

পাকা, রাজ্যের দিদি আর বৌদির কাছে অসভ্য কথা শিখে শিখে লংকা তেঁতুলের আচারের মত মজে যাওয়া সুচরিতার কানে ছেলেবন্ধু শব্দটা খট করে লাগে।  ওরা বলে লাভার। ক্লাসেও সবাই বলে লাভার, পাড়ার দিদিরা বৌদিরাও বলে ওটাই। 

-আমার ইশকুল আসার পথে রাস্তায়… হু হু হু…। দিদি বাবা মাকে বলবেন না প্লিজ…

-এসব আর করবে না , এসব নোংরা ভাষার নোংরা চিঠি আর আনবে না স্কুলে, বল। এখুনি ছিঁড়ে ফেল ওই চিঠি। রাজি?

-হ্যাঁ দিদি। 

শাস্তি দিয়ে কী হবে?  বরঞ্চ একটা পলিসি নিয়ে এই পাকা, ধেড়ে মেয়েগুলোকে শেষের দিকে গ্রেস দিয়ে পাশ করিয়ে দিলেই মঙ্গল।  এরা স্কুল ছেড়ে চলে যায়। অন্য, নিরীহ বাচ্চামেয়েগুলোকে করাপ্ট করে না। নিজেরা ত একেবারেই হোপলেস, পড়াশুনো কিছুই হবে না।  সর্বনাশের শেষ সীমায় চলে গেছে। বাবা মা এদের ইশকুলে দিয়ে চোখ বুজে রয়েছে।

অথবা চোখ বুজেও নেই। হয়ত ঘটক লাগিয়েছে বা রোজ খবরকাগজে পাত্রী চাই এর বিজ্ঞাপন দেখে। কোনমতে পাত্রস্থ করতে পারলে বাঁচে। এ ত আরেক সমস্যা এখন। সতেরো আঠেরো বছর বয়সে কত মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, যদিও আঠেরোর আগে বিয়ে বে আইনি। টাকা দিয়ে কোনমতে পাত্রস্থ করতে চায় বাপ মা। 

ভুরুর ভাঁজ আরো গভীর হয় নলিনীর। মেয়েটিকে যেতে দিয়ে তিনি ঘরের ভেতর পায়চারি করেন।  মাধ্যমিক পর্যন্ত পাশ না করলে সেও ত এক মুশকিল। মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন ছাড়া ভাল পাত্র পাবে কোথা থেকে। 

নলিনী ঠিক করেন, তিনি ভাল মেয়েদের দিকে বেশি মন দেবেন। ইনভেস্টমেন্ট করতেই যদি হয় যেখান থেকে রিটার্ন আসবে সেদিকেই করা ভাল। ধনতন্ত্রের জগত থেকেই নিজের অজান্তেই একটি ভাবনা ধার নিলেন নলিনী। 

ট্রিং। ট্রিং

বেল বাজালেন নলিনী। বেয়ারা রামশরণ এসে দাঁড়াল। এইট এ সেকশন থেকে ব্লু হাউজের সুরূপা দাসকে ডাক দেখি। 

একটা ভারি পর্দা কাঠের ফ্রেমে আটকে পার্টিশন করা। তার ওপারে একটা ইজি চেয়ার আছে। দুপুরে খানিক ক্ষণ চাইলে সেখানে বিশ্রাম করা যায়। আগের বড়দি করতেন। নলিনী কোনদিন আরাম চেয়ারে বসেন নি। ওই সময়টা উনি স্কুল ময় টহল দেন। 

আসব বড়দি? কাঁপা গলায় অনুমতি নিল। তারপর মেয়েটা জড়োসড়ো পায়ে ঘরে ঢুকল। তার দেহভঙ্গি বলে দিচ্ছে ভয়ে  প্রাণ উড়ে গেছে। মজা লাগল নলিনীর। হেডুর ঘরে ডাক? নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে?

তাকে অভয় দেবার ভঙ্গিতে বললেন নলিনী, এখন কোন ক্লাস ছিল তোমার?

-ইংরেজি, দিদি।

-কোন্‌ দিদির ক্লাস?

-রেখাদি।

-কোন সাবজেক্ট ভাল লাগে পড়তে তোমার?

-ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক। 

-কেন, ইতিহাস ভাল লাগে না?

মাথা নামিয়ে সুরূপা চুপ। বুক দুরদুর করেই চলেছে। আকাশ পাতাল ভেবেও সে বের করতে পারেনি সম্প্রতি কী ভুল কাজটা সে করেছে। কেন তার হেডুর ঘরে ডাক পড়ল।

-ইতিহাস পড়তে হবে ত? ইতিহাস না জানলে বর্তমানকে ত জানা যায় না। মানব সভ্যতার ইতিহাস জানা ত জরুরি। 

খুব সাহস করে মুখচোরা সুরূপা বুক ঠেলে বের করে দেয় একটি বাক্য। 

সাল, তারিখ মুখস্ত থাকতে চায় না আমার। 

ও, এই কথা? গল্পের মত করে ইতিহাস পড়বে। নেক্সট মাস থেকে আমি তোমাদের ইতিহাস পড়াব। 

নলিনী মনে মনে নোট করলেন ব্যাপারটি। এখানে ইতিহাস ঠিকভাবে পড়ানো হচ্ছে না। নিজের হাতে তুলে নিতে হবে কাজটি। নিজের বিষয়টিকে তিনি এতটাই ভালবাসেন। ছোটদের মনের জমিতে যদি ইতিহাসপ্রীতির চারাগাছটি না রোপণ করা যায় তবে আর হল টা কী। 

গল্পের বই পড়?

ভয়ে ভয়ে চোখ তোলে সুরূপা। হ্যাঁ বলবে, না কি মিথ্যে বলবে? মনে হয় সত্যি বলাই ভাল। 

ঘাড় কাত করে সে বলল, হ্যাঁ পড়ি দিদি। 

বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি পড়েছ?

হ্যাঁ। অপরাজিতও পড়েছি। 

আরণ্যক?

হ্যাঁ দিদি। 

মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর পড়েছ?

গণদেবতা…। 

কার লেখা?

তারা…. শংকর…

দিদি কোন দিকে যাচ্ছেন কিছু বুঝতে পারে না সুরূপা। তবে তার সাহস অল্প বাড়ে। 

-ওয়াল ম্যাগাজিনে দেখলাম তুমি কবিতা লিখেছ। কবিতাটা ভাল হয়েছে। তবে তোমার একটা ভুল শুধরে নিতে হবে। কবিতাটায় আমরা শব্দটা না ব্যবহার করে মোরা ব্যবহার করেছ… কেন?

ছন্দ মিলিয়ে লিখতে গিয়ে… ঢোঁক গেলে সুরূপা। এই প্রথম তাকে কোন শিক্ষিকা ওয়াল ম্যাগাজিনের কবিতা নিয়ে কিছু বললেন। 

না, ব্যবহার করবে না। মোরা, মোদের এসব আধুনিক কবিতায় আর চলে না। বহুদিন ধরে এসব শব্দ পুরনো, তামাদি, ফেলে দেওয়া শব্দ হয়ে গেছে। 

আচ্ছা দিদি। ঘাড় নাড়ল সুরূপা। 

এটাই? এটাই ছিল দিদির তাকে ডাকার কারণ? তার কবিতার সমালোচনা। বুকের ঢিপঢিপানির সঙ্গে একটা চোরা স্রোতে আনন্দও বইতে শুরু করে সুরূপার। 

কবিতাটা ভাল হয়েছে। আরো লিখবে। 

ক্লাস সেভেন এইট আর নাইনের ইতিহাস ক্লাস নিতে শুরু করেই নলিনী হালদার প্রায় প্রতিটা চেনা ছকের ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করতে শুরু করলেন। বকাবকি করলেন মেয়েদের, জোর করে চাপিয়ে দিলেন তাঁর মত। অনেক মেয়ে বাড়িতে বাবা মায়ের কাছ থেকে একপেশে ধারনা গজিয়ে তবেই ইশকুলে এসেছে, সেটাও বুঝতে পারলেন। যেটুকু প্রতিরোধ পেলেন তা সমাজের কাছ থেকেই ফেরত আসছে, তিনি জানেন। ভুরু কুঁচকে বাচ্চা মেয়েগুলো তাঁকে অবিশ্বাস করছিল অথচ হেডু বলে মুখে কিছু বলতে পারছিল না। বুঝেও কিছু বললেন না। 

ইশকুলে প্রতি দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার ছুটি। আর প্রথম ও তৃতীয় শনিবার নানারকম সাংস্কৃতিক কাজ , প্রতিযোগিতা ইত্যাদি হয়। আগেও হত। আঁকার, মডেল তৈরির প্রতিযোগিতা ছিল। নলিনী চালু করলেন আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মিছিলের মুখ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি বা ভয় করলেই ভয়… এসব দেওয়া হচ্ছে এখন মুখস্ত করে এসে আবৃত্তি করার জন্য। চালু করলেন বিজ্ঞান প্রদর্শনী। মেয়েরা নিজেরা বিজ্ঞানের প্রজেক্ট করে সবাইকে দেখাবে। 

গরমের ছুটির আগে তিনি সুরূপাদের ক্লাসের এক গোছা মেয়েকে বললেন, এই ছুটিতে তোমরা যে বই পড়বে তার আলোচনা লিখে আনবে ইশকুল খোলার দিন। কী কী বই পড়লে, কেমন লাগল। 

ইস্কুল খোলার পর জমা পড়ল মেয়েদের কাগজগুলো। মহিমা সেন লিখেছে সে লু সুনের রচনাবলী পড়েছে। পুতুলনাচের ইতিকথার ওপর চমৎকার লিখেছে পারমিতা রায়। সুরূপার কাগজটি সাগ্রহে তুলে নিয়ে হতাশ হলেন নলিনী। এ কী!  এ মেয়ে নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব পড়ে তাই নিয়ে লিখে এনেছে। ছিঃ। এ মেয়েকে তিনি ভবিষ্যৎ যুগের কবি ভেবে ফেলেছিলেন!

এইধরণের বই আর কোনদিন পড়বে না। আর এসব নিয়ে কোনদিন লিখবে না। কঠোর মুখে সুরূপাকে জানিয়ে মনের দরজা বন্ধ করে দিলেন নলিনী। 

সুরূপা করুণ কাঁদো কাঁদো মুখে কাগজটা হাতে নিয়ে ফিরে গেল। অবশ্যই জীবনে কখনো তার আর একটি উপন্যাস ও পড়া হয়নি নিমাই ভট্টাচার্যের। কেন যে মরতে মামার বিয়েতে পাওয়া বইটাই এ গ্রীষ্মের ছুটিতে তার চোখে পড়ে গিয়েছিল! আর সে যা পড়েছে সেটাই লিখে ফেলেছে। ক্লাসের বন্ধুরা চালাকি করে ভাল ভাল বইয়ের কথা লিখে দিয়েছে দিদিকে খুশি করবে বলে। লু সুনের দু পাতা উল্টে মহিমা হিরো হয়ে গেল। ও নিজেই বলেছে ওর খুব কঠিন লেগেছে বইটা। ও ত সুরূপার চেয়েও বেশি বেশি করে প্রত্যেক সংখ্যার দেশ থেকে সমরেশ মজুমদারের কালবেলার অনিমেষ মাধবীলতার প্রেমের জায়গাগুলো পড়ে, পড়ে পাগল হয় আর সবাইকে শোনায়। ব্যাগে করে দেশ এনে সবাই লুটোপুটি খায়। বুদ্ধদেব গুহর লেখায় প্রেম প্রেম জায়গাগুলো ওরা পড়ে পড়ে শেষ করতে পারে না  যেন। এমনকি পারমিতাও, ওর দিদির কাছ থেকে হেডলি চেজের অনুবাদের বই এনে এনে বন্ধুদের দেয়। লেখার বেলায় মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। যাতে নলিনীদি ভাল বলেন। যত্তোসব। ওরা খুব চালু, খুব ম্যানেজমাস্টার। সুরূপার মত বোকা নয়। সৎ নয়। সুরূপা ঠোঁট কামড়াল। আজকাল তার নেশা, ভূগোল বইয়ের তলায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস রেখে পড়া। সেটা জানলেও নিশ্চয়ই নলিনীদি খুব বকা দেবেন। কিন্তু আপাতত গৌড়মল্লার সে ছাড়তে পারবে না। মাকে লুকিয়ে , মাসিকে লুকিয়ে সে পড়ে চলে। 

শেষ পর্যন্ত আর ভালদের টেনে আরো ভালতে তোলা হল না নলিনীর। খারাপ মেয়েদের আইডেন্টিফাই করাটাও একটা কাজ। ডিসিপ্লিন। ডিসিপ্লিন। ডিসিপ্লিন। 

নিজের জীবনটিকেও ডিসিপ্লিনের মোড়কে মুড়ে রেখেছেন নলিনী। ইশকুল যাওয়া আসা করেন ট্রামে। ছ স্টপ দূরে থাকেন, একা। ছোট ভাড়া বাড়ি, বাড়িওয়লা দোতলায় থাকেন আর তিনতলার ছাতের দুটি ঘরে নলিনী। উত্তর বঙ্গ থেকে বদলি হয়ে এই যে এলেন, কলকাতার বিষ মেখে রোজ পথে যাতায়াত শুধু সহনীয় হয়েছে কারণ এখানে এখনো সমমনস্ক মানুষের অভাব নেই। 

প্রতিটি দিন রুটিনের মত কাটে। তবু তারই ভিতর কবিতা লেখেন সন্ধেতে , ডায়েরি খুলে। রাত্রে ক্যাসেট প্লেয়ার চালান। সুচিত্রা মিত্রের বলিষ্ঠ কন্ঠটি তাঁকে জোর দেয়। কখনো কখনো সন্ধেতে কফি হাউজে যাওয়া হয়, কমরেড বন্ধুদের সঙ্গে। এবিটিএ-র মিটিং। 

রাত্রি গভীর হলে মনে পড়ে দীর্ঘতম কাঁধের বন্ধুকে ছেড়ে এসেছেন বহুদিন হল। ছাত্রাবস্থায় সে আগ্রহ দেখিয়েছিল। নলিনীর আগ্রহ ছিল রাজনীতিতে, বাম পন্থায়। হোলটাইমার হতে চেয়েছিলেন পার্টির। ষাটের দশকের শিক্ষক আন্দোলন। মিছিল মিটিং জমায়েত প্রচারের কাজ। 

আপাতত একাকিত্ব সহনীয়। কাজ, কাজ, এবং কাজই তাঁর জীবনের সবটা ধরে আছে। ডায়েরি খুলে একটা লেখা লেখেন রোজ শুতে যাবার আগে। এও ডিসিপ্লিন।  লালচে সূর্যোদয়ের ভাবনা, ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্তের ভাবনা… সঙ্গে এক কলম ছবিও আঁকা হয়ে যায়।  নৈরাশ্য কখনো আসে না। নাহ। 

মেয়েরা ক্লাস টেনে এক রাত ইশকুল গ্রাউন্ডে থাকে। ক্যাম্পিং। সারাদিন নানা কর্মকান্ড, পাশের বস্তিতে গিয়ে বাচ্চাদের ক্লাস নেবে মেয়েরা। ব্রতচারীর ড্রিল করবে। তারপর সন্ধেতে বনফায়ারের আগুন জ্বেলে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলা হয়, গান হয়, আবৃত্তি। রাতে নিজেদের আনা থালাবাসনে মেয়েরা খাবে, নিজেরাই মাজবে সে থালা, ডর্মে সার দিয়ে বিছানা পাতা আছে, সেখানে শোবে। 

এ বছর সেই ক্যাম্পের রাতেই অনর্থ ঘটে গেল। কে বা কারা সঙ্গে নিয়ে এল সিগারেট, আর কয়েকজন মিলে খেল সেই  সিগারেট রাত্রে শুতে যাবার নির্ধারিত সময়ের পর। যখন দিদিরা অন্যত্র গিয়েছেন। 

ক্লাসেরই অন্য মেয়ে, ভাল মেয়ে, দিদিদের রিপোর্ট করে পরদিন। বাথরুমে ফেলা  সিগারেটের পোড়া টুকরো থেকে পরদিন  হাতেনাতে ধরা হল কালপ্রিটদের। 

তিন দিন পর ইশকুলের নোটিস বোর্ডে কয়েকটি মেয়ের নাম প্রকাশ করে দিলেন নলিনী হালদার। এই সব মেয়েদের দুষ্কর্মের জন্য এদের সাবধান করা হচ্ছে। হুলুস্থুল সারাদিন। দলে দলে নানা ক্লাসের মেয়েরা টিফিনের সময়ে দেখতে এল তালিকাটি। ক্লাস টেনের মেয়েদের লজ্জা মানে সারা স্কুলের লজ্জা। ছোটদের সামনে বড়দের লজ্জা, এ এক ভয়াবহ ঘটনা। 

এখানেই শেষ নয়। আরো একটা ব্যাপার ধরা পড়ল। মেয়েরা মেয়েদের প্রেম পত্র লেখে। কুৎসিত ভাষায় প্রেম নিবেদন, যেন কোন পুরুষ নারীকে করছে। এবার ও ক্লাসের কোন এক মেয়ে, যে নলিনী হালদারের ভক্ত, সেই পৌঁছে দিল সে চিঠি তাঁর হাতে। এটা ঘটল ক্লাস এইটের বি সেকশনে। 

করিডর দিয়ে হেঁটে গিয়ে নলিনী যখন দাঁড়ালেন ক্লাসের প্লাটফর্মের ওপর, তাঁর দুচোখ দিয়ে গনগনে আগুন ঝরছে, ঘৃণায় বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছে না। 

তিনি দাঁড়িয়ে প্রথমে চিঠিটি পড়ে শোনাবেন মনস্থ করলেন, তারপর বললেন ছিঃ। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না এ কাজ তোমাদের মত ছাত্রীদের কারুর। 

কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন, আর সবাইকে বলে রাখছি ভবিষ্যতে এরকম আর যদি জানতে পারি, স্কুল থেকে বহিষ্কার হবে। জেনে রেখ সবাই।

ক্লাসে ক্লাসে সেই বার্তা রটে গেল ক্রমে। ভীতি ও সন্ত্রস্ততা তৈরি হল ক্রমশ। হালকা শিহরন ত বটেই। গোটা গল্পেই একজনের ভয়ে তটস্থ সবাই। বাবা মায়েরা বাড়িতে  চিঠি পেয়ে অস্থির বিরক্ত ক্ষুব্ধ অপমানিত। মেয়েগুলোর পিঠে দু এক ঘা পড়ল বটে তবে বেশি রাগ জমে উঠল স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর। 

উনি কী ভাবেন নিজেকে? সমাজ সংস্কারক?

নিজে ত পলিটিক্স করেন। পার্টি করেন, সেটা লুকোন না, মেয়েদের পর্যন্ত বামপন্থী বানাচ্ছেন এক একটি।

এরই ভেতর একদিন ফেটে পড়ল নতুন বোমা। 

ইতিকা, সুরূপার ক্লাসের মেয়ে, এর ভেতরে একদিন বাবা মায়ের সঙ্গে খেতে গিয়েছিল বালিগঞ্জের নামকরা চিনে রেস্তোরাঁ ফুং চং এ। আর সেখানেই সে নাকি দেখেছে, নলিনী হালদার দু’জন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে খেতে এসেছেন। 

হি হি হা হা ফিস ফিসের বন্যা বয়ে যাচ্ছে আজ ক্লাসে। নলিনী হালদার সব রকমের প্রেম প্রেম বাইকে হাঁচি কাশির মত ভাইরাস দমনের স্টাইলে মেয়েদের মাথা থেকে তাড়াচ্ছেন। আর তিনিই নাকি, পুরুষদের সঙ্গে চাইনিজ খান। 

গোল গোল চোখ করে গল্প বলতে বলতে ইতিকা উঠে পড়েছে বেঞ্চির ওপরে। সাংঘাতিক উত্তেজিত মৌচাকের মত ভনভনে একটা বৃত্ত তোইরি হয়েছে তার চারপাশে। বড়দি যে বিয়ে করেন নি তা ত সবাই জানে। আর বিয়ে না করা মহিলাদের সঙ্গে যখন কোন পুরুষ মানুষকদে দেখা যায় তখন তারা ভাই বা বাবা না হলে সত্যিই ব্যাপারটা সন্দেহজনক বইকি। 

সুরূপা এমনিতেই একটু একাচোরা। ক্লাসরুমের এক পাশে দাঁড়িয়ে সে ইতিকার গল্পবলা দূর থেকে শুনছিল। তার মেমরি বুক নিয়ে দুরুদুরু বক্ষে সে একবার বড়দির কাছে গিয়েছিল। তিনি সেখানে লিখে দিয়েছিলেন, আলোর জন্য  লড়াই চলুক… এঁকে দিয়েছেন সূর্যের ছবি…। সুরূপার কবিতা লেখার ডায়েরি নিজের কাছে রেখেছিলেন, কিছু কিছু ছন্দের ভুল মার্জিনে পেনসিল দিয়ে মার্ক করে দিয়েছেন। আর বাকি অনেক জায়গায় বাহ, চমৎকার লিখে দিয়েছিলেন। দেখতে দেখতে আনন্দে গর্বে বুক ফুলে উঠেছিল সুরূপার। 

বন্ধুরা এত কথা সব জানে না। জানলে ওকে নলিনী হালদারের ফ্যান বলে খেপাবে। ফ্যান তকমা একবার কারুর গায়ে লেগে গেলে সর্বনাশ। উঁচু ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে নিচু ক্লাসের মেয়েদের নাম জড়িয়ে কী কান্ড যে করা হয়। অমুক তমুকের ফ্যান, তা নিয়ে  চোখ টেপা, কাশি… দু ক্লাস ওপরে মহিমার এক ফ্যান আছে, সে একদিন কী একটা নোটিস নিয়ে ওদের ক্লাসে ঢুকেছিল, সবার মধ্যে হাসাহাসি আর কাশাকাশির ঝড় বয়ে গেল যেন। 

নলিনীদি তাকে নিমাই ভট্টাচার্যের বই পড়ার জন্য বকেছিলেন। তারপর থেকে সে রাহুল সাংকৃত্যায়ণ, তারাশংকর, প্রেমাংকুর আতর্থী এইসব বই লাইব্রেরি থেকে নিয়ে নিয়ে পড়ে চলেছে। বড়দিকে জানিয়েছেও তা। আর কবিতার হাত মকশো সমানে চলেছে। পরের বার দিদি যেন একটাও ভুল না বের করতে পারেন। বাড়িতে ত কেউ এভাবে তাকে গাইড করবে না কখনো। বাবা মায়ের, মাসির, কারুর সময় নেই। বাবা বিজ্ঞান আর অঙ্ক করতে বলবে। মা ভূগোল নিয়ে অতিষ্ঠ করবে। আর মাসি কেবল গলা সাধতে বলবে ওকে। 

ইতিকাদের আলাপ আলোচনা এখন ঘুরপাক খাচ্ছে, অন্যদিকে গড়াচ্ছে।  কার বাবা কী জেনেছেন, কোথা থেকে জেনে এসে কী  বলেছেন নলিনী হালদারের সম্পর্কে।  নলিনী হালদার বালুরঘাট থেকে বদলি হয়ে আসার আগে ওখানে কোন পলিটিশিয়ানের সঙ্গে ওঁর কী যেন ঝামেলা হয়েছিল… পারমিতার বাবা বলেছেন। ঝামেলা কাজ নিয়ে না প্রেম নিয়ে? নলিনীদির কটা লাভার ছিল কম বয়সে? হা হা হি হি, নলিনীদির লাভার থাকতে পারে। মুখের সামনে হাত নাড়তে নাড়তে ন্যাকা ফর্সা রীতা বলছে, ভাবতেই পারছি না আমি এবার মরেই যাব হাসতে হাসতে… হেসে নাটক করে পেট চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ছে সুস্মিতা…।

সুরূপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বাইরে সবুজের পোঁচ , তার চোখ আর মনকে শুদ্ধ করে দেয়। সে মনে মনে বলে, ছেলে বন্ধু সবার থাকতে পারে, সব্বার। নলিনীদির থাকবে না কেন? নলিনীদি ত অসভ্য চিঠি লিখতে মানা করেছেন… ছেলেবন্ধু থাকাটায় ত কিছু বলেন নি। ছেলেরা বন্ধু হলেই তাদের সঙ্গে প্রেম হতে হবে, এ কথাই বা কে বলল। সুরূপা ত বড় হয়ে অনেক ছেলে বন্ধু করে দেখিয়ে দেবে, প্রেম না হলেও ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়।  ও অন্যরকম হবে। নলিনীদিও অন্যরকম। নলিনীদি ত চান, ওরাও অন্যরকম হোক। অনেক ছেলে বন্ধুর কথাটা এই মেয়ে ইশকুলে বসে এখন ভাবাই যাচ্ছে না বটে, তবে চিরদিন কি সে এই ইস্কুলে থাকবে? একদিন না একদিন ত পৃথিবীর পথে বেরুবে!

তবে নলিনীদিকে তার এই প্রতিজ্ঞার কথা হয়ত কোনদিন জানানো যাবে না। 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত