গল্পকার হবার পিছনের গল্প…

বিতস্তা ঘোষালের একটি সাক্ষাৎকার করার কথা ছিলো ইরাবতী টিমের। মৌমিতা ঘোষ ব্যস্ত। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় গেছেন শিকাগো। আর তখনই আবার অসুস্থ হলেন বিতস্তা ঘোষাল। সাক্ষাৎকার নেয়া হলো না। কিন্তু বিতস্তা ঘোষালকে যে মেসেজ করেছিলো ইরাবতী টিম তাতে লেখা ছিলো- “আপনার গল্পকার,কবি ও সম্পাদক হয়ে ওঠার গল্প পাঠকদের জানাতে চায় ইরাবতী ওয়েবসাইট। তাই আপনার একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাই আমরা”…

সাক্ষাৎকার করা হয়নি। কিন্তু ইরাবতী ও তাঁর পাঠকদের বিতস্তা ঘোষাল নিজের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত করেননি। বিতস্তা ঘোষাল তাঁর গল্পকার,কবি ও সম্পাদক হয়ে ওঠার পিছনের গল্প লিখেছেন। আজ তার প্রথম কিস্তি।


 

নিজের লেখা বা বই প্রকাশ এসব নিয়ে কথা বলতে কখনোই খুব একটা স্বচ্ছন্দ বোধ করিনি।অনেকে বলেন, কতদিন ধরে লিখছ? কেউ বলেন, তুমি তো সাহিত্যের পরিমন্ডলেই জন্মেছ, কাজেই লিখবে এটাই স্বাভাবিক।এসব কথায় আমি খুব বিব্রত হই ।আরো কুন্ঠিত হয়ে পড়ি। বাবা শ্রী বৈশম্পায়ন ঘোষাল সাহিত্য জগতের মানুষ, অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক, ভাষা সংসদ, নীল সরস্বতী প্রেসের কর্নধার। অফিসে অন্নদা শংকর রায়, লীলা রায়, শঙ্খ ঘোষ, মানবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায়, সন্দীপন, সুনীল, তপন বন্দোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, ভগীরথ মিশ্র, জয় গোস্বামী, সোমক দাস, অনুরাধা মহাপাত্র, নবনীতা দেবসেন, কঙ্কাবতী দত্ত, সহ বহু বিখ্যাত সাহিত্যিক, আমলা, রাজনীতিবিদ প্রমুখ মানুষদের আনাগোনা, বাড়িতে কদাচিৎ তাদের প্রবেশ। এলেও সেভাবে তাদের সঙ্গে গল্প নয়। তা স্বত্তেও এ পর্যন্ত ঠিক আছে।

কিন্তু তার সঙ্গে আমার সাহিত্য, প্রকাশনা, সম্পাদনা জগতে আসার বিন্দুমাত্র যোগ নেই।এমনকি কখনো ভাবিওনি ভবিষ্যতে কিছু লিখব।আমি প্রচুর পড়তাম।মায়ের দৌলতে রাশি রাশি বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতাম অ আ ই ঈ ক খ পড়তে শেখার পর থেকেই ।সেগুলো মা দিত ভালো বাচ্চা হয়ে, বোনকে ভালো বেসে রাখার পুরস্কার হিসেবে। মা তখন বি এড পড়তে যেতেন।কাজেই বাড়িতে তিনবোনের মধ্যে বড় আমির দায়িত্ব ছিল বোনেদের সারাদিন চুপ করিয়ে রাখা ।আমার হাতের সেই বইগুলো, বলা বাহুল্য মহামনিষীদের জীবনী, ইতিহাসের গল্প, রামায়ন, মহাভারত, বাইবেল, কোরান, ঈশপের গল্প, জাতকের গল্প, প্রভৃতি এভাবেই পড়ে ফেলেছিলাম বানান করে করে। আসলে এটাই ছিল আমার হোম টাস্ক।মা ফিরে সেগুলো আবার রিডিং পড়াতেন। আসলে ওগুলো ছিল আমার স্পিচথেরাপি ও স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর পদ্ধতি।

এর পর এল তুলসীদি। আমাদের তিন বোনকে দেখাশোনার জন্য।দিদি এত ভালো গল্প বলত বানিয়ে বানিয়ে যে সব সত্যি মনে হত। হাঁ করে গিলতাম সেই সব গল্প । হাতা খুন্তি বোতল সিসি থেকে অত্যন্ত সাধারন বিষয় নিয়ে যেভাবে গল্প বানাতো তাতে যথেষ্ট কল্পনা শক্তির দরকার হয়। আজ মনে হয় তুলসীদি যদি কিছুটা লেখা পড়া জানতো এই বাংলা সাহিত্যে ছোটোদের গল্পের ভান্ডার আরো খানিকটা সমৃদ্ধ হত।

আমার লেখার দৌড় ছিল নাচের স্ক্রিপ্ট ।মনের যাবতীয় কল্পনা মেশাতাম সেই স্ক্রিপ্টে।রবীন্দ্রনাথ, জসিমউদ্দিন, নজরুল, গণসংগীত, সুকান্ত, পল্লীগীতি , লোকসংগীত সব নিয়েই কলম চালাতাম কিছু না ভেবেই ।আর যেহেতু স্টেজে অভিনীত হবে সে সব, তাই স্টেজ ক্রাপ্টের বিষয়ে খুব ডিটেলিং এ যেতাম।যেটার জন্য যেটা লাগবে স্ক্রিপ্টে যা লিখেছি , তা না পেলে মাথা গরম হয়ে যেত।নতুন করে ভাবতে বসতাম সহজে কিভাবে ওই দৃশ্য দেখানো সম্ভব।

না, সেই সময় কখনোই ভাবিনি ভবিষ্যতে এই লেখাটাই আমাকে অক্সিজেন যোগাবে।

২০০০ সালে মেয়ে হবার সময় একটা দীর্ঘ ডিপ্রেশনে চলে গেলাম।তখন কিছু ভালো লাগছে না, নাচ বন্ধ, ঘর বন্দী, মেজাজ তুঙ্গে, নিত্য ঝামেলা।একা থাকা. . . সব মিলিয়ে হঠাৎই একদিন ডায়েরির পাতায় লিখে ফেললাম ‘একা’ বলে একটি দীর্ঘ গল্প।মাকে নিয়ে গিয়ে দেখালাম। মায়ের চোখে জল।কিভাবে লিখলি এ লেখা ! মা পরম মমতায় সেই গল্পটা কপি করে দিলেন।

কঙ্কাবতীদির সঙ্গে আলাপ বহুদিনের।বাবার সূত্রে ।গল্পটা তাঁকে দিলাম পড়তে।সালটা ২০০৪ -০৫।এর মধ্যে লিখে ফেলেছি আরো কিছু গল্প।সবগুলোই মা কপি করে দিয়েছেন ।সেগুলো সবই জমা দিলাম ওনার কাছে ।২০০৫ সালে মায়া সিদ্ধান্ত বাসুর সম্পাদনায় ‘শারদীয়া আশ্রম সংবাদে’ বেরোলো ‘একা’। গল্পর শুরুটা হচ্ছে- “ আজিমগঞ্জ- কাটোয়া লোকালে, একা, বহুদিন পরে। নিজেকে ফিরে পাবার জন্যে। শরতের আকাশ, পরীরা নীল ভেলায় স্নান করছে। পেঁজা মেঘগুলো যেন সাবানের বুদবুদ, নানা রঙের হাতছানি। দু’ধারে কাশফুল, সাদা পদ্ম। সোনালি রঙের শিসগুলো মাথা নাড়ছে।বাইরের পৃথিবীতে সোনা ঝরা রোদ্দুর,গায়ে মাখছি উদাস করা বাতাস- ট্রেন চলছে।চাকার আর লাইনের ঘর্ষণে ঘর্ষণে সা-রে –গা-মা বাজছে। কেমন মন- মাতাল করা আমেজ।”

আর ২০০৭ এ তাঁরই সম্পাদিত চল্লিশ বছরের পুরোনো পত্রিকা ‘মালিনী’তে জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘ঝিলাম নদীর তীরে’। যা বই হবার সময় প্রকাশক অরিজিত কুমার পালটে দিলেন। সেটা ২০১২। ‘ছিন্ন পালের কাছি’ নাম দিয়ে বেরোলো প্যাপিরাস থেকে প্রথম উপন্যাস।

এর আগে কঙ্কাবতীদির কাছে জমা দেওয়া কিছু গল্প প্রকাশিত হল প্রতিদিনে। চন্দ্রশেখরদা সেই সময় প্রতিদিনে ছিলেন, ছিলেন রবি শঙ্কর বল।তারাও উৎসাহ দিলেন গল্প লেখার। মায়া সিদ্ধান্তের মালিনী তো ছিলই, আরো কিছু পত্রিকায় লিখতে শুরু করলাম।যেমন, প্রসাদ, নতুন শতক।এর মধ্যে পরিচয় ঘটেছে একান্তর পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্যের সঙ্গে।তিনিও লেখার সুযোগ দিলেন। বলা বাহুল্য একান্তর ও মালিনী আমাকে ইচ্ছেমত গল্প নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ দিয়েছেন। যা লিখতে চেয়েছি, যে আঙ্গিকে লিখব ভেবেছি তাতেই সমর্থন জানিয়েছেন।

আমি অবশেষে গল্পকার হলাম। সেই সব গল্প নিয়ে ২০০৭ সালে প্যাপিরাস থেকে প্রকাশিত হল আমার প্রথম গল্পের বই ‘একা এবং রঙিন হলুদ বিকেলের গল্প’।

মনে আছে , প্যাপিরাসের কর্নধার অরিজিত কাকু বইয়ের ৫ কপি যেদিন হাতে তুলে দিলেন, আমি হাতিবাগান থেকে শোভাবাজার হয়ে মেট্রোতে দমদম ফিরে ছিলাম।সারাটা পথ বইগুলোর গন্ধ শুকছি আর কাঁদছি।আমার প্রথম বই! এ যে এত আনন্দের তাতো বুঝতে পারিনি।

ভূমিকায় লিখেছিলাম-“ নারী- আমার গল্পের সব চরিত্রই নারী; সে কখনো প্রেমিকা, কখনো স্ত্রী, কখনো বান্ধবী, কখনো মা। সর্ব অর্থে যে-কোন সম্পর্কেই নারী। নারীর কোন জাত নেই, আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই, নেই তার আলাদা অনুভূতি,ভালোবাসা, অনুরাগ, কিংবা মননশীলতা- সকলের জন্য সে নারী। তবে কোথাও তো উত্তরণ প্রয়োজন, সে হোক না কল্পনায়, হোক না চেতনায় বা জীবনবোধে,- তাই এই চরিত্রগুলো সেই নারীত্বের বন্ধন ছেড়ে কোথাও না কোথাও শেষ পর্যন্ত বিশ্ব মানবী হয়ে উঠতে চায়, কোথাও না কোথাও দাগ কেটে যেতে চায়- যেন বলতে চায় আমরা আছি হৃদয়ের, সভ্যতার সবটুকু জুড়ে।”

উৎসর্গ করেছিলাম, মা, কঙ্কাবতীদি আর মায়াদিকে।বাবা বলেছিলেন, তুই লেগে থাক, পারবি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে।

বাবা আজ নেই, রবিদাও নেই। কিন্তু বোনেরা আছে, মা আছে, অরুপদা আছেন,নলিনী বেরা দা আছেন, আর আছেন অসংখ্য মানুষ যারা প্রতিদিন বলেন আমার লেখা তারা পড়তে চায়। জানি না একটা লেখাও লেখা হয় কিনা, কিন্তু এখন লিখতে চাই, সত্যিকারের একটা লেখা . . যার জন্য বাঁচতে চাই ।

পুনশ্চ: কবি হবার গল্পটা পরে বলব।একমাত্র কেতকী পত্রিকার সম্পাদক মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় আর বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়ই জানেন সেই গল্পটা।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত