সতত ডানায় এক সকালের যাত্রা

সুবীর সরকার, শৌভিক বণিক, নিলাদ্রী দেব, জ্যোতি পোদ্দার, দেবব্রত দাস আর পহেলী দাস মিলে তুমুল কবি আড্ডা চলছে। আড্ডা তখন চরমে। আমিই একমাত্র শ্রোতা এই মাঝরাতের কবি আড্ডায়। চেটেপুটে নিচ্ছি তাদের কবিতা ভাবনা ও কবিতার দৃশ্যপট কিংবা শব্দের মোচড়। তর্ক বিতর্কও হচ্ছে কবিতা নিয়ে। বহুবছর মনে রাখার মত কবি ও কবিতা আড্ডার পরে এক এক করে সবাই ঘুমে, রাত আর ভোরের অন্তমিলে ঘুমে ডুবে গেলো শৌভিকও। তখন হঠাৎ ভোরের নিঃসঙ্গতায় ভিক্টোরিয়ার সেই পরীটা যেন বলে উঠলো গুডমর্নিং, কলকাতা কিংবা-

‘‘সারাজীবনে হাতে গুনে ঊনিশটা ভাল মুহূর্ত আসে। ঊনিশটা। উনিশবার ম্যাট্রিকে ফেল করার মতো আমিও তো ঊনিশতম বেদনায় ঘায়েল হয়েছি, সখী। ব্যথা মোর উঠুক বেজে। তবু ঐ ঊনিশটা মুহূর্তে আমি সাতনরী হার বিক্রি করব কলকাতার ফুটপাথে, বিক্রি করব রাংতার কানপাশা। মুখে মুখে বলব বীতশোকের কবিতা। স্বপ্নে সারারাত দেখব তোমাকে, বাসস্টপে মাত্র তিনমিনিট। স্রেফ একটা এপিটাফ ফেরি করব বলে টবের সাকুলেন্ট হয়ে বেঁচে আছি। তলোয়ার মাছ হয়ে সাঁতার কাটছি কাচের পুকুরে।’’(গুডমর্নিং, কলকাতা/৩৩)।

সুজিত দাস। বাংলা কবিতায় যার আগমন আঙুল গুনে বলে ফেলা যায়। কিন্তু পাঠক তার লেখা নিয়ে যে রকম মাতামাতি করছে তা বাংলা কবিতাকেও আশা দেয়। তার গুডমর্নিং কলকাতা বইটির প্রচ্ছদে দেখি-

গুডমর্নিং, কলকাতা একটি ছায়াকবিতা বা মায়াগদ্যের সংকলন। অনার্য ভাষায় লেখা এক নতুন ডিকশন। বাঁক বদলের অবাধ্য সাইরেন…।

আসলেই কি নতুন বাঁক বদলের স্বর এই ছায়াকবিতা বা মায়াগদ্যগুলো? প্রশ্নটি চোখে মেখেই পড়া শুরু করেছিলাম। সুজিত দাসকে আগেও পড়েছি। তিনি তার পদার্পনের দিন থেকেই ছন্দ মাত্রাকে আয়কর ফাঁকি দিয়েই লিখছেন। সুনিপুণ পাঠ ও দক্ষতায় তিনি গদ্যকবিতাতে দিনদিন হয়ে উঠছেন জাদুকর। গুডমর্নিং, কলকাতার আগের কবিতা ও এই বইয়ের কবিতাগুলোয় সেই উত্তরণের ছাপ সুস্পষ্ট পাওয়া যায়। সুজিত দাস যে রীতিতে লিখছেন সেই মুক্তছন্দ বা ফ্রি ভার্স বিশ্ব সাহিত্যে নতুন কিছু নয়।

১৫৪০ অব্দে ইংল্যান্ডে Earl of Surrey (আসল নাম Henry Howard) ভার্জিলের ‘ইনিড’ অনুবাদ করেছিলেন। ইনিডের দ্বিতীয় ও চতুর্থ খণ্ডের অনুবাদে অভূতপূর্ব এক সাহিত্যরূপের সন্ধান দিলেন তিনি। পাঠক এই অনুবাদ পড়ে বুঝতে পারল, যা পড়ছে, সেই সাহিত্যে অন্ত্যমিল নেই, নেই সুস্পষ্ট কোনো ঝোঁক, অথচ অদ্ভুত সুন্দর কাব্যময়তা আচ্ছন্ন করে রেখেছে এই পদ্যকে। হ্যাঁ, পদ্যে। কারণ, ততদিনে মুদ্রণযন্ত্র এসে গদ্যভাষা, অর্থাৎ, চলিত কথ্যভাষাকে কেজো দরকারের ভাষা হিসেবে চালু করে দিয়েছে। সাহিত্য তখনো রচিত হয়ে চলেছে পদ্যেই। এই নতুন রূপের নাম ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’।

‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ কী? ‘A Handbook of Literary Terms’ বলছে – 

‘Blank Verse consists of lines of iambic pentameter (five stress iambic verse) which are unrhymed – hence the term ‘blank’. Of all English metrical forms it is closest to the natural rhythms of English speech, yet flexible and adaptive to diverse level of discourse; as a result it has been more frequently and variously used than any other form of versification.’

অর্থাৎ মিল না থাকার কারণে ব্ল্যাঙ্ক, এবং পদ্য বলেই তা ভার্স। ব্ল্যাংক ভার্সের পরই কবিতার অন্যান্য আধুনিক সংরূপ জন্ম নেয়। যেমন, Free Verse বা মুক্ত ছন্দ।

Writing free verse is like playing tennis with the net down, বলেছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। এই উক্তিটিকে ব্যজস্তুতি হিসেবে নিলে দাঁড়ায়: গদ্য কবিতা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ; কেননা ছন্দ নেই কিন্তু তার অদৃশ্য উপস্থিতিকে (ছন্দতো খানিকটা চোখে দেখার ব্যপারও) অক্ষুন্ন রাখতে হয়। এটি দক্ষ শিল্পীর কাজই বটে। পুনশ্চ কাব্যের ভূমিকাতে রবীন্দ্রনাথকে বলতে শুনি, “গদ্যকাব্যে অতি নিরূপিত ছন্দের বন্ধনকে ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষার প্রকাশরীতিতে যে সলজ্জ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীন ক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেকদূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এই আমার বিশ্বাস…।”

রবার্ট ফ্রস্ট ও রবীন্দ্রনাথের কথামত চিন্তা করলে সুজিত দাসের গুডমর্নিং কলকাতা’র কবিতাগুলি অদৃশ্য ছন্দকে অক্ষুন্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে।

শার্ল বোদলেয়ার এরপর মালার্মের হাত থেকেও বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু টানা গদ্য কবিতা। ফরাসিদের এই ধরনের কবিতার ঐতিহ্য ভালোই আছে। কিন্তু ইংরেজিতে টানা গদ্য সম্ভব নয়, এমন ধারণাই চালু ছিলো দীর্ঘদিন ম্যথু আর্নল্ড এর প্রয়াস সত্ত্বেও। ষাট-সত্তরের দশকে এই ধারণা পাল্টে যায় আমেরিকানদের হাতে—রবার্ট ব্লাই, এ্যালেন গিন্সবার্গ, চার্লস সিমিক, জেমস রাইট, রাসেল এডসন প্রমুখ কবির প্রয়াসে। আর আশির দশকে এটি গুরুত্ব পেতে শুরু করে; বিভিন্ন সংকলনে ঠাঁই দেয়া হতে থাকে টানা গদ্য কবিতাকে। একক সংকলনও প্রকাশিত হতে থাকে। সারা বিশ্বেই এই ফর্মটি ছড়িয়েছে, গৃহীত ও অভ্যর্থিত হয়েছে। স্প্যনিশ ভাষায় অক্টাবিও পাজও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন তার “Eagle or Sun” গ্রন্থে। একই ভাষার অপর দুই কবি এঞ্জেল ক্রেসপো ও গিয়ান্নিনা ব্রাশি করেছেন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ। দ্বিতীয়জন পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে পেরেছেন টানা গদ্য কবিতার একটি ট্রিলজি, El imperio de los suenos (1988, Empire of Dreams)। ফরাসি কবিতার অনুরাগী ও রেবোর অনুবাদক কবি অরুণ মিত্র টানা গদ্যে আদ্যন্ত একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করলেন, উৎসের দিকে (১৯৫৪খ্রি.)। বাংলায় এটি টানা গদ্য কবিতার প্রথম একক বই। ফরাসি প্রতীকবাদের দ্বারা স্পৃষ্ট এর গদ্য-বিন্যাস।

ষাটের দশকের শেষের দিকে আবদুল মান্নান সৈয়দ যখন আদ্যন্ত-প্রায় টানা গদ্যে লেখা জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ করলেন, তখন দারুণ হৈচৈ পড়ে গিয়েছিলো, জমে উঠেছিলো বিতর্ক। একে তো পরাবাস্তববাদের অভিনবত্বের চাপ (জীবনানন্দের কিছু উদাহরণ বাদ দিলে), অন্য দিকে ছন্দ অস্বীকার করে, কবিতার চেনা অবয়ব পাল্টে, গদ্যের মতো সাজিয়ে পাঠককে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দিলেন। এই বইয়ের আগেও টানা গদ্য বাংলাভাষী পাঠক লক্ষ করেছে শক্তি চট্টোপাধ্যায় (জরাসন্ধ) কি শঙ্খ ঘোষের (দিনগুলি রাতগুলি) দু-একটি রচনায় ও অরুণ মিত্রের উৎসের দিকে গ্রন্থে। কিন্তু এই বইয়ের মাধ্যমে বাংলাভাষায় টানা গদ্যের একটি বড় পদক্ষেপ আমরা দেখতে পেলাম। 

গুডমর্নিং কলকাতায় চিন্তার অভিনবত্বের সাথে ভাষায় যে ঘোর তৈরি করেছেন এখানে কবি, তা পাঠককে বইটি পুনর্পঠনে প্ররোচিত করে। পরাবাস্তবতার অচেনা মহলে প্রবেশ করিয়ে দ্রুত এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে যেতে যেতে কবি অর্থ-উদ্ধারের আকাঙ্খাকে যেন ভুলিয়ে দেন। কবিতাগুলো, প্রচলিত ব্যাকরণকে পাশ কাটিয়ে আমার মা সব জানের মতো কেবলি অন্যদিকে যেতে প্ররোচিত করে,   যেহেতু সব পাপড়ি-ই সুগন্ধি নয়। ম্যারিনেটেড ঈর্ষা এবং/অথবা দেউসির গান বা মেয়েদের ভাবসম্প্রসারণ আমি পারিনা লেখা এইসব ভাষা ও দৃশ্যপট বেশ দ্রুতগতির। তার টানা গদ্যের কবিতার বৈশিষ্ট্য মূলত এরকমই । অবশ্য বেশ প্রসন্ন ও মন্থর ভঙ্গির লেখাও তার আছে। কিছু কৃৎ-কৌশল তিনি ব্যবহার করছেন। কোথাও কোথাও টুকরো আখ্যান তিনি ব্যবহার করছেন ; টানা গদ্যে যা-ছিলো আরও ফ্র্যাগমেন্টেড। তবে কবিতার ভেতরে বিশেষভাবে আখ্যান বা গল্প ব্যবহার তার অভিপ্রেত নয়; অনেকগুলো কৌশলের এটি একটি মাত্র। যেহেতু অনেকটা কনফেশনাল ধরনে তিনি কথা বলেন, বিশেষত এই কবিতাগুলোতে সেহেতু আত্মজীবনীর নানান বিচূর্ণ অংশ বিভিন্ন মুখোশে প্রবেশ করেছে। একটা সামান্য প্রসঙ্গেও অসীমের ব্যঞ্জনা ও ব্যাপ্তি আনাই তার ধরন। অনেক সময় দেখি কবিতা নেহাৎ প্রবন্ধের ভঙ্গিতে শুরু হচ্ছে, কিংবা একটি আখ্যানকে বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে অনুসরণ করতে করতে এগুচ্ছে, কিন্তু হঠাৎ পাঠককে চমকে দিয়ে বুদ্ধিকে পার হয়ে এটি এমন জায়গাতে উপনীত হয় যেখানে ছোঁয়া লাগে অসামান্যের।

 

গুডমর্নিং, কলকাতা

সুজিত দাস

সোপন প্রকাশনী

২০৬, বিধান সরণি, কলকাতা-০৬

মূল্য: ১৭০

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত