এই সময়ের পদাবলি

ব্যথা  যখন
দেবযানী ভট্টাচার্য্য 
সে আমার ব্যথার দোতারা
  তাকে আমি নিভৃতে  বাজাই,
       আমাকে সে ডাকে সুরস্নানে
          এ তার  যদিও অজানাই-
দুটি পারে এঁটেলের ঢাল
   ফেলে আসা নকশী  অসুখ-
       ব্যথা ছেনে প্রদীপ বানাই
           সে আলোর অভিসারী মুখ।
ডেকেছে  সে দীপ্ত পরানিয়া 
     তবু তার  হৃদয় জানেনি 
       ব্যথাকে ডাকলে ব্যথা দিয়ে
          জ্বলে ওঠে অমোঘ  অরণি ।
উনকোটি  পুণ্যতোয়া সুরে
      লিখেছে সে  হরষিত  পথ,
         সে পথে ঢেলেছি যত ক্লেদ
             ফিরিয়েছে  ফুলেল  শপথ।
হৃদি তার ব্রহ্মকমল
   সঞ্চরণে ছড়ায় আতর,
      ব্যথাবতী ক্লিন্ন পঙ্কলীনা
          সুরাহূত  বাজাই  প্রহর।
বাজাই নিমগ্ন ঢেউস্নানে
    চরাচর  ধোওয়া নামগান- 
      তার  থাক বিশ্বজোড়া পথ,
         আমি রাখি নিঝুম উঠান।
নামের পাশে নাম
তনিমা হাজরা 
কোথায় জ্বেলে এসেছি বাতি,
সেখানেই তো রোজ আলো হয়ে থেকে যাই। 
তবে কেন আয়নার আগে এসে থমকে দাঁড়াই,
ওরা প্রশ্ন করে পরিচয়।
বাস্তুহারা আমি জানিনা এখন আর নিজের সঠিক পরিচয়, গোত্র, পদবি। 
শুধু বুঝি
যা প্রকাশ্যে দেখাই তা যথার্থ নয়।
সেখানে নামের পাশে যে নাম লেখা,
কাটাকুটি খেলা খেলে হেরে চলে গেছে সময়, 
নদীটি এখন অন্যদিশায় বয়। 
ওরা প্রশ্ন করে পরিচয়। 
বাস্তুহারা আমি জানিনা এখন আর নিজের সঠিক পরিচয়, গোত্র, পদবি।
শুধু বুঝি,
যা প্রকাশ্যে দেখাই তা যথার্থ নয়।
এ ক্ষেত্রে  নিড়ানি দিয়েছি, 
এখন এখানে অন্য শস্য মরশুম। 
তাদের শরীর থেকে অন্য ঘ্রাণ ভাসে,
অন্য বৃক্ষ এসে শোয় ঘেঁষে গায় গায়
ঘুম,ঘুম,ঘুম।
ওরা প্রশ্ন করে পরিচয়। 
বাস্তুহারা আমি জানিনা এখন আর নিজের সঠিক পরিচয়, গোত্র, পদবি।
শুধু বুঝি,
যা প্রকাশ্যে দেখাই তা যথার্থ নয়।
প্লাবনের ভাগে নদীর কিনারায় এসে
 কড়া নাড়ে জল,
কেড়ে নেয় চোখের পাতায় আঁকা রাতজাগা নাবিকের কাজললতার কালি,
ওরা প্রশ্ন করে পরিচয়।
বাস্তুহারা আমি জানিনা এখন আর নিজের সঠিক পরিচয়, গোত্র, পদবি।
শুধু বুঝি,
যা প্রকাশ্যে দেখাই তা যথার্থ নয়।
  একগাল হাসি নিয়ে যার পাশে এখনো পুরনো ছবিতে টিকে আছি, মাকড়সা বসত গেঁড়ে বসেছে তার গায়,
 তারই পাশের  পাঁচিল ভেঙে কে যেন আসে যায়, 
ওরা প্রশ্ন  করে পরিচয়।
বাস্তুহারা আমি জানিনা এখন আর নিজের সঠিক পরিচয়, গোত্র, পদবি,
শুধু বুঝি,
যা প্রকাশ্যে দেখাই তা যথার্থ নয়।
কোথায় কতদিন আগে এক ঘর ছিল, মাছরাঙা ভোরে বিছানায় ছিল  ঘুমন্ত  এক পুরুষ।
 তার মুখ, স্পর্শ , ঘ্রাণ বৃষ্টিতে ঝড়ে অস্পষ্ট, এলোমেলো, 
নিজেরই স্বার্থে  তার শব আগলে বসে আছি কাগজের পাতায় পাতায়। 
জানালার পাশে রোজ কাঠবেড়ালি খুঁটে খুঁটে খেয়ে যায় দায়বদ্ধ জীবন, 
সুখস্মৃতি কিছু কি ছিল যা দিয়ে এখনো  রঙ লাগানো যায় সেই শতচ্ছিন্ন বিবর্ণতায়? 
নাকি, 
এখন সেইসব বাতিল পরিচয়পত্র দেখিয়ে কেবলমাত্র নাগরিকত্ব প্রমাণের ছলনাই করা যায়।
ছায়াহীন রাত্রিশেষে
পূর্বা দাস
অনেকদিন ভেবেছি, সটান চলে যাবো
কলিং বেলে হাত রেখে বলব, 
বাড়ি আছেন? 
যত আবেগ, প্রশ্ন, সাথে নিয়ে যাবো, 
জানি – জানানো হবে না কিচ্ছুই।
পর্বতসমান প্রজ্ঞার পাদপীঠে,
নামহীন বনজ পুষ্পের মত কিছুক্ষণ ;
চুপ করে দেখে যাব শুধু।
অপুর্ব মায়াময় দুই চোখে
ভালবাসার ভরা দীঘি।
মনে মনে বলব, চিরদিবসের ‘সই’ আমার, আমাদের।
হয়তো মনে মনেই বলব, 
জীবনভর একাদশীর নির্জলা –
তারও পরে, আপনি, আপনিই পারেন, 
চরাচর ভাসিয়ে দিতে শস্যে, সমারোহে। 
এতো ভঙ্গুর , তবু জীবনের একককে 
সঞ্চিত রেখেছেন আপনাতেই। 
কিভাবে, সই, কিভাবে? 
আজ আর কোথাও যাবার নেই। 
ভাবনাটুকুও মিশে গেল পঞ্চভূতে
এক কাপ চা নিয়ে, একাই – 
দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম
আমার ভালবাসাহীন বারান্দায়।
আমার এক অনবদ্য ঘুম আছে
সুকন্যা সেনগুপ্ত
আমার এক অনবদ্য ঘুম আছে
সলমা চুমকি আকাশ
কবে থেকে যেন হিন্দুকুশ পথে খড়কুটো বেঁধেছি –
সে বাঁধন কি আজও খুঁজে ফেরোনি
তবে আগুনে ছুঁড়ে ফেল তাকে
প্যান্ডোরার বাক্সটা হাতছাড়া করিনি এখনও
আজানের সুরে সন্ধ্যে ভাঙ্গে
সে সন্ধ্যে জুড়ে উটের সারি, মীড়, গমক 
আমার বুকে সিল্যুয়েট হয়ে যায় –
এমন একটি সিকোয়েন্সে ঘুম আসে আমার
হিন্দুকুশের অপার ভূমিধ্বসের মতো
আমার অনবদ্য ঘুম সেই তলানিতে তলিয়ে যেতে যেতে…
জরি চুমকি আকাশ
ভোররাতের মিনার
তোমার শিরস্ত্রাণ 
        
ব্যক্তিগত
সৌমী আচার্য্য
ঘুমটা না ভাঙলেও চলতো,এতটা জেগে থাকিনি বহুদিন
আলোটা সত‍্যিই আমার বয়স জানিয়েছে তোমায়?
অথবা দুষ্টুমি করেছিলে নিপাট কে জানে?
আমি কিন্তু দ্বিতীয় বার তোমার বয়স ভাবিনি
হাতটা ধরার পর
কে আগে জন্মেছে এ প্রশ্ন সত‍্যিই অবান্তর?
বয়সের ভাঙাচোরা হিসেবে আমি যে ডুবছি
টের পেয়েই ছেলেমানুষী জেদ জুড়েছিলে তাইনা?
তোমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যেতাম ঠিক….
আমার ছবি কেমন এলো তোমার লেন্সে?
তোমার হাতের ওম এখনো আমার হাতে ওতোপ্রতো।
ভিজে রাস্তায় সমুদ্রের নুন ঠোঁটেও লাগবে জানতাম
তবু তোমার চোখের মুগ্ধতা আমায় জড়িয়ে রেখেছে
এখনো ….এখনো গোপন করছি তোমায়
কতদিন এমন ডাকেনি কেউ ভেতর কাঁপিয়ে
কতদিন মোম হয়ে সুখি হইনি
নীলের বুদ্বুদে মিশে গেলে স্বপ্নের মতো 
পথটা শেষ হলো না,ছবিগুলো দেখা হলো না
বারবার এভাবেই স্বপ্ন ভাঙে
তবু মিথ‍্যেটাকেই কাজল করে চোখে রাখি
নিজেকে সুখি দেখার মতো পাপ আর নেই
সেই পাপটা কেবল তোমার সাথেই উপভোগ করি
আমার বুকে আরেকবার হাত রাখো 
তোমার সাথে আরো কয়েক পা হাঁটতে 
আমি নিলামে দিয়েছি জেগে থাকার সব শর্ত।
এসেছিলে? স্বপ্নে, গতকাল?
নিলয় নন্দী
কাল রাতে যাকে স্বপ্নে দেখেছি
আসলে তাকে বহুদিন দেখিনি…
যদিও অন্যমনস্কতা, লুকোনো সংলাপ।
যদিও ইনস্টাগ্রাম। যদিও ভদ্রতা দূরত্ব।
এসব ছাপিয়ে স্বপ্নের রঙ সবুজ
বা চুম্বনের রঙ গোলাপী…
স্বপ্ন মানে তো ধোঁয়া, কুয়াশা বা…
আদিম জলছবি, আদুরে আঁচল আর
কতদিন এভাবে তোমাকে দেখিনি। 
তুমিও তো কবিকে দেখোনি বহুকাল। 
প্রোফাইল সবুজ উপত্যকা হয়ে আছে
চোখে চোখ, ঢেউ গোণা বাকি… 
তবুও প্লাটফর্মে কেউ বেহালা বাজালে
আমি তাকে মনে মনে…
এভাবেই জাপটিয়ে, এভাবেই আগলিয়ে রাখি।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত