গোপাল ভাঁড়ের গল্প

লোকসান দু’ পয়সা

গোপাল একবার নদীর ঘাটে ঘাটের ইজারা নিয়েছিল। নদীর ফেরী ঘাটের ইজারাদার গোপাল ভাড়া ছয় পয়সা থেকে কমিয়ে চার পয়সা করে দিলে- যাতে গরিব লোকদের উপকার হয়। সে বছর দেশের অবস্থাও খুব ভাল ছিল না বলে গোপাল এই ব্যবস্থা নিলে। যাতে গরিব লোকেরা খুশি হয় পরপারে যাতে সুবিধা হয়। তখন একদল ছেলে ইজারাদার গোপালের সঙ্গে দেখা করে বললে, ভাড়া কমানো চলবে না মোটেই। এতে আমাদের খুব আপত্তি আছে। ভাড়া যেমন ছিল ঠিক তেমনিই থাকবে, একেবারেই কমানো চলবে না। এসব করলে একেবারে ভালো হবে না।
 গোপাল তো তাদের কথা শুনে অবাক হয়ে বলে, ভাড়া বাড়ালেই জনসাধারন সচরাচর আপত্তি করে থাকে, কিন্তু ভাড়া কমালে তো কেউ আপত্তি করে না- প্রথম শুনলাম আপনাদের কাছ থেকে। গোপাল তখন তাদের জিজ্ঞেস করলে, ভাড়া কমানোতে আপনাদের এত আপত্তি কেন? লোকসান তো হবে আমার। আপনাদের আপত্তির কারন আমার মাথায় একেবারে ঢুকছে না।
 তখন সেই অদ্ভূত ছেলেগুলো মুখ ব্যাজার করে বললে, তবে শুনুন মশায়, আমরা রোজ সাঁতেরে ওপারে যাই আর রোজই ভাবি ফেরী নৌকায় না গিয়ে সাঁতরে ওপারে যাওয়ার জন্য পারের খরচ বাবদ ছয় পয়সা আমাদের সঞ্চয় হচ্ছে। এখন আপনি ছয় পয়সার জায়গায় ভাড়া চার পয়সা করায় আমাদের যে প্রতিবারে সাঁতরে যাওয়ার জন্যে মাত্র চার পয়সা করে মনের খাতায় জমবে। তা হলে বুঝুন তো, দুপয়সা করে আমাদের লোকসান হচ্ছে। এই লোকসান কেমন করে মিটবে বলুন।
 গোপাল ছেলেদের কথায় না হেসে পারল না।
হুজুর যে আমার প্রেমে পড়েছেন
গোপাল মাঝে মাঝে রসের কথা বলতে গিয়ে বেফাঁস কথা বলে ফেলত। মহারাজ সে সব কথা কানে বিশেষ তুলতেন না। একবার কিন্তু কথা প্রসঙ্গে গোপাল একটা বেফাঁস কথা বলায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মনে বড্ড ঘা লাগে। রাজা চটে গিয়ে প্রহরীকে ডেকে বললেন, গোপাল ভাঁড়কে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বেত মারতে মারতে রাজসভা থেকে বের করে দাও এক্ষুনি। অমন লোক আমার রাজ্যে না থাকলেও চলবে। ভাঁড় ভাঁড়ের মতো না থেকে যেন মাথায় চড়েছে? বড় বাড়াবাড়ি করছে আজকাল ভাঁড় মশাই।

 গোপাল গলায গামছা দিয়ে কাঁদো-কাঁদো হবে বলল, কথা প্রসঙ্গে একটা বেফাঁস কথা মুখ ফসকে হঠাৎ বেরিয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে আর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মারতে মারতে

রাজসভা থেকে বের করে দিতে হবে না- আমি নিজেই বেরিয়ে চলে যাচিছ। তাছাড়া দূর যখন করে দিলেন, আপনার রাজ্যে ছেড়ে সাত দিনের মধ্যেই আমি চলে যাব। তবে এই বয়সে মারলে আর আমি বাঁচব না মহারাজ, এবারের মত ক্ষমা করুন, দয়া করুন। গোপাল বিষন্ন মনে বাড়িতে ফিরে এসে পাড়া পড়শীদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললে, জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নেয় গিন্নী, আমরা সাতদিনের মধ্যে এ রাজ্য ছেড়ে চলে যাব। জমি বাড়ির আসবাবপত্রের খদ্দের ঠিক করতে চললুম আমি। তুমি তো সব গুছিয়ে টুছিয়ে নাও। দেরি করলে মহারাজ রাগ করবেন। আমাদের চলে যেতে হুকুম হয়েছে।
 গোপালের কথা শুনে গোপালের স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললে, নিজের দেশ সাতপুরুষের শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে কোথায় যাবো আমরা? তুমি যেতে পার, আমি যাবো না। গোপাল গিন্নীর কানে কানে চুপিচুপি বললে, খুব করে পাড়াপড়শীদের শোনাও, আর পাড়া-পড়শীদের দেখিয়ে জিনিসপত্র গোছ-গাছ করতে থাক। কিন্তু আমরা যেন সত্য সত্যই চলে যাচ্ছি। এ কথাটা রাজার কানে পৌছান দরকার। গোপালও লোকজন এনে বাড়ি ঘর দোর দেখাচ্ছে, দাম দস্তর করছে-বিক্রী করবে।

 তিন চারদিন পরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র লোকমুখে জানতে পারলেনে যে, গোপালের মনের দুঃখে তার বসতবাটী বিক্রি করে স্ত্রী পুত্রের হাত ধরে অন্য রাজ্যে আজকালের মধ্যে চলে যাবে, শুধু বাড়ি ঘর বিক্রী করতে উপযুক্ত খদ্দের সহসা পাচ্ছে না বলে যেতে পারছে না, খরিদ্দাররা জুটলেই চলে যাবে। টাকা পয়সা না হলে কি করে যাবে।

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র খবর পেয়ে মনে মনে অশ্বস্তি বোধ করলেন। অনেক ভেবেচিন্তে কয়েকজন বন্ধুসহ তিনি নিজেই গোপালের বাড়িতে বিকেলে এলেন। গোপাল আর গোপালের স্ত্রী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে আসতে দেখে যেন যারপরনাই বিস্মিত হল। দুজনে মহারাজকে ভূমিষ্ঠ হ প্রণাম করলে।
 রাজা গোপালকে বললেন, গোপাল, তুমি নাকি এ রাজ্য ছেড়ে চলে যাচ্ছ? কবে যাচ্ছ, কোথায় যাচ্ছ। জানতে পারি কি?
 গোপাল উদাস মুখে বললে, ঠিকই শুনেছেন মহারাজ। আপনি আমার অন্নদাতা প্রভু, আপনিই যখন আমার প্রতি বিরুপ, তখন আমার এ রাজ্যে থেকে লাভ কি? আমি আগামীকালই সপরিবার আপনার রাজ্য ত্যাগ করে চলে যাচ্ছি। আপনি আমার উপর রাগ করবেন না মহারাজ, যেতে দেরি হল বলে। এরজন্য ক্ষমা চাইছি।
 মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র বিষাদগ্রস্থ হয়ে বললেন, যাবে যখন ঠিকই করে ফেলেছো তখন আর কি হবে বলে? গোপাল আমার যে কি হয়েছে বলতে পারছি না- তোমাকে তাড়াতে পারছি না, আবার কাছে ডাকতেও পারছি না। যেন ভূতে পেয়েছে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কথা শুনে গোপাল মুচকি হেসে বললে, প্রেমে পড়লে এমন অবস্থা হয় হুজুর। আপনি যে আমার প্রেমে পড়েছেন। যারা প্রেমে পড়ে তাদের সবারই এ অবস্থা হয় মহারাজ। গোপালের কথা শুনে রাজা রজার অন্তরঙ্গ সঙ্গীরাও হো হো করে হেসে উঠলেন। বলা বাহুল্য, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে গোপালের আর রাজ্য ত্যাগ করা সম্ভব হল না। কারণ মহারাজ গোপালকে সত্যিই ভালবাসার মত ভালোবাসতেন।
গোপাল ভূত
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে রাজবৈদ্য নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশদেশান্তর থেকে চিকিত্সকেরা এলেন যোগ দিতে। গোপালকে রাজা দায়িত্ব দিলেন চিকিত্সক নির্বাচনের। গোপাল খুশিমনে বসলেন তাঁদের মেধা পরীক্ষায়। —আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব আছে? —জি আছে। প্রচুর ভূত। ওদের অত্যাচারে ঠিকমতো চিকিত্সা পর্যন্ত করতে পারি না। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এবার দ্বিতীয় চিকিৎসকের পালা। —আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব কেমন? —আশ্চর্য, আপনি জানলেন কীভাবে! ওদের জ্বালায় আমি অস্থির। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই। এভাবে দেখা গেল সবার চিকিত্সালয়ের আশপাশেই ভূতের উপদ্রব আছে। একজনকে শুধু পাওয়া গেল , যাঁর কোনো ভূতসংক্রান্ত ঝামেলা নেই। গোপাল তাঁকে রাজবৈদ্য নিয়োগ দিলেন। পরে দেখা গেল এই চিকিৎসকই সেরা। রাজাও খুশি। একদিন রাজা ধরলেন গোপালকে। গোপাল বললেন , ‘আজ্ঞে মহারাজ, দেখুন, সবার চিকিৎসা  কেন্দ্রের আশপাশে ভূতের উপদ্রব শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। এর অর্থ হলো , তাঁদের রোগী মরে আর ভূতের সংখ্যা বাড়ে…আর যাঁকে নিলাম, তাঁর ওখানে কোনো ভূতের উপদ্রব নেই…অর্থাৎ তাঁর রোগী একজনও মরে না।
অনামুখো কে?

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র অনামুখোদের একদম পছন্দ করতেন না। একদিন রাতে গোপালের পক্ষে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব

হয়নি। কারন গানের জলসা শুনতে শুনতে অনেক রাত হয়েছিল। তাই সেদিন বাধ্য হয়ে তাকে রাজবাড়ির অতিথিশালায় থাকতে হয়েছিল।
পরদিন ভোরে মহারাজ ঘুম থেকে উঠে অতিথিশালার বারান্দায় গোপালকে প্রথম দেখলেন, গোপালও মহারাজকে দেখে তাঁকে নমস্কার করল।

কিন্তু সেদিন নাপিতের কাছে নখ কাটতে যেতেই, রাজার কড়ে আঙ্গুলের খানিকটা মাংস কেটে গেল।

নাপিত বলল,- হুজুর, এত বছর ধরে আপনার নখ দাড়ি ও চুল কাটছি,-কই, একদিনও তো একটু আঁচড় লাগেনি-আজ

নিশ্চয় আপনি কোন অনামুখোর মুখ দেখেছেন।

রাজা মনে করে দেখলেন, তিনি সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই গোপালের মুখ দেখেছিলেন। রাজরাজড়ার খেয়ালাই

আলাদা।

তিনি তক্ষুনি রক্ষী পাঠিয়ে গোপালকে তলব করে আনিয়ে বললেন- তোমার মতো অনামুখো বেঁচে থাকলে বহু

লোকের সর্বনাশ ঘটবে-তাই আমি তোমার মৃত্যুদণ্ড দিলাম। আজ ভোরে উঠে তোমার মুখ দেখেছিলাম বলেই আমার কড়ে আঙ্গুল কেটে গেছে।

গোপাল মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শুনে কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল- হুজুর, অনামুখোদের চরম দণ্ড দিয়ে ভালই করেছেন। কিন্তু মহারাজ, ঘুম থেকে সবার আগে আপনি আমার মুখ দেখেছেন বলে-আপনার কড়ে আঙ্গুলের সামান্য একটু মাংস কেটে গেছে। আর ঘুম থেকে উঠে সবার আগে আমি আপনার মুখ দেখে উঠেছি বলে-আজ আমার মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে। আপনি এবার বিচার করে বলুন-আমাদের দু’জনের মধ্যে কে বেশী অনামুখো।

সঙ্গে সঙ্গে মহারাজ গোপালের মৃত্যুদণ্ড মকুব করে দিয়ে বললেন- আমি মোটেই অনামুখো নই। দেখলে তো তোমার কিছুই হ’লো না।

চোরের আজব সাজা

একদিন গোপালের জ্বর হওয়ায় সে সেদিন রাজসভায় যেতে পারেনি। মহারাজ সভা সদদের নিয়ে নানা আলাপ আলোচনা করতে করতে হঠাৎ বললেন, আমার সভার মধ্যে এমন কি কেউ আছে, যে গোপালের ঘর থেকে কিছু চুরি করে আনতে পারে?

যদি কেউ পারে, তবে সে সামান্য জিনিস হলেও আমি তাকে বিশেষভাবে পুরষ্কৃত করব। তোমরা কেউ রাজী থাকলে বল। মহারাজের পুরষ্কার লোভেও কেউ রাজি হল না গোপালের ঘরে চুরি করতে। কারণ বড় চতুর সে। তার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। ধরা পড়লে নাকালের শেষ থাকবে না। নাকানি চোবানি তো খেতে হবেই, আর সে তার প্রতিশোধ একদিন না একদিন নেবেই নেবে এবং অশেষ দুর্গতির সীমা থাকবে না।

ভূপাল নামে একটি লোক পুরষ্কারের লোভে সেদিন মধ্যরাত্রে গোপালের বাড়িতে সিদ কেটে প্রবেশ করল। গোপাল আগে থেকেই রাজসভার কথা জানতে পেরেছিল, তাই সে লোভি লোকটাকে জব্দ করার জন্য তৈরি হয়ে রইল। গোপালের ঘরের দেওয়ালে সিদ।

গোপাল পূর্ব প্রস্তুতি মতো একটা মানুষের বিষ্ঠাপূর্ণ কলসির উপরে গোটাকতক টাকা রেখে দিয়েছিল এবং সেখানে নিজে একপাশে আত্ন গোপন করে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটি সিদ কেটে যখন ঘরের মধ্যে মাথা গলিয়ে ঢুকে দেখল যে, সামনেই একটা টাকভর্তি কলসী বসানো আছে। সে আরকালবিলম্ব না করে তাই মাথায় তুলে নিয়ে মনের আনন্দে রাজবাড়িরে দিকে এগোতে যেতেই গোপাল ঢিল ছুঁড়ে ব্রাহ্মণের মাথার কলসীটা ভেঙে দিল। কলসী চুরমার হয়ে সঙ্গে সঙ্গে লোকটির সারা শরীর বিষ্ঠাতে পূর্ণ হয়ে গেল। তখন ভোর হয়েছে। গোপাল বেরিয়ে বলল, কি বাবা চুরি করা হল। মহারাজ পরে গোপালের মুখে এসব কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলেন।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত