গোপন

কী রে বাইরে খুব মেঘ করেছে নাকি রে?

জানিনা, এক রাশ হাঁপিয়েই বলল বেলা। খুব ভ্যাপশা। ঘাম হচ্ছে।

ইশকুল থেকে ফিরে জামাকাপড় ছাড়ছিল বেলা। ক্লাস এইটে উঠেছে। চোদ্দ বছরের মেয়ে।  হাঁসফাঁস করছিল তার  শরীরটা। কালো সিন্ডারেলা জুতো দরজার বাইরে খুলেছে, মোজাজোড়া যেন পায়ের সঙ্গে সেঁটে গেছে। একে একে স্কার্ট, সাদা ব্লাউজ, সব ছাড়তে ছাড়তে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত টাঙানো দড়িটা থেকে এক হেঁচকায় টেনে আনল লাল গামছাটা।

ও কি ও কি আমার গামছাটা নিলি কেন। আমি চানে যাব ত একটু বাদে।

তপতী মাটিতে থেবড়ে বসে ফল ছাড়াচ্ছিল। বাতাবি লেবু। বেলা খাবে, বেলার বাবা দোকান থেকে এসে খাবে। একটা বড় স্টিলের গামলার মধ্যে স্তুপীকৃত জমা হচ্ছিল গোলাপি বাতাবিলেবুর কোয়া। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল থার্মোকলের টুকরোর মত বাতাবি লেবুর মোটা খোসা। রাশি রাশি বিচি আর পাতলা কোয়ার খোসাগুলোও এক পাশে একটা খবরের কাগজের ওপর জড়ো করছিল তপতী।

ঘরে অনেক ক্ষণ থাকার পর অন্ধকারে চোখ সয়ে যায় , তখন আর বাইরে যাবার কথা মনেও হয়না, ইচ্ছেও হয়না তপতীর। সেইজন্যেই সে মেয়েকে কথাটা জিগ্যেস করল। বড় বেশি ভ্যাপশা গুমোট করে আছে, বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে কিন্তু বাইরে যেন রোদের ঝাঁঝ কমে আসছে। গলায় ঘাড়ে বিনবিন করে ঘাম জমে যাচ্ছে । আঁচল দিয়ে মুছছে তপতী, আবার জমে উঠছে।

এখন বাড়িতে থাকলে তপতী উর্ধাঙ্গে ব্লাউজ রাখে না। খালি গায়ে কাপড় জড়িয়ে কাজ চালিয়ে দেয়।  রান্নাঘরে থাকার সময় সেই কাপড়ও ঘামে চুপচুপে হয়ে ভিজে যায়। আজ যেন আরো বেশি। বর্ষা নেমেছে কিন্তু গরম কমেনি।

বেলা ধাতস্থ হয়ে  ফিরল বাথরুম থেকে। তপতী যে দু বালতি জল বাথরুমে রেখে এসেছিল এক বালতি ধ্বংস করে এসেছে। তপতী ডাক দিল, বাবু এদিকে শোন, খেতে বসবি? আর , জল তুলে দিয়ে রাখিস বাবু । আমি স্নান করব কী করে নইলে।

বড় কুয়োতে ঝপাং শব্দে বালতি পড়ল। দড়ি টেনে বেলা জল তুলল। রান্নাঘরে তপতীর টুং টাং।

তপতী থালায় মেয়ের জন্য খাবার বেড়ে শোবার ঘরের পড়ার টেবিলেই দিতে চলল। এইটুকু বেনিয়ম সে মেনে নিয়েছে। মেয়ে পড়ছে। পাশ করলে বেশ হবে। নতুন আলমারি গড়ে দেবে বাবা বলেছে। মা এই যে তার জন্যে রাঁধা খাবার তুলে নিয়ে পড়ার টেবিলে চেয়ার বসে খেতে দেয়, এইটেও বেশ আহ্লাদের ।

মা তার জন্য বুক দিয়ে পড়ে  লড়াই করে। জানে বেলা।

সে বেশ কিছুদিন আগের কথা। ও সবে সিক্সে উঠেছে।  মেয়েটাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেব।  বাবা একবার বলছিল, ও পাশের ঘর থেকে শুনেছিল। মা ফুঁসে উঠেছিল। কী , কী বললে? ছেলে নেই, একটাই তোমার মেয়ে। সেই মেয়েকে পার করে দেবে? পড়তে দেবে না ওকে? ও কত পড়াশুনোয় ভাল। আমি ত ওকে বি এ এম এ বানাব। বিয়ে দিতে ওর অনেক অনেক দেরি।

বাবা একদম চেপে গেছে। কিছুতেই বাবাকে আর মা এসব কথা তুলতে দেয়নি। আশেপাশের বাড়ির লোকেদের বাড়ির মেয়েদের কথা আলাদা। অনেকের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে , তেরো চোদ্দ পনেরো বছর বয়সে। বাবার মত যাদের অবস্থা। আরো ভাল টাকাকড়ি আছে , বড় আলুর কোল্ড স্টোরেজের মালিক গোপাল মল্লিকের মেয়ে দুটোর এক এক করে বিয়ে হল। বড়জন, মাধুরী,  পড়ত বেলার ইস্কুলেই। সে মেয়ে একদিন হঠাৎ আর ইস্কুলে এল না। তারপর বাড়িতে বসে রোজ মসুর ডাল ভিজিয়ে বেটে মুখে মেখে , সর মাখা মেখে ফর্সা হয়ে, বিয়ের জল গায়ে লেগে গোলগালটি হয়ে, এক বৈশাখ মাসের প্যাঁ পোঁ করে সানাই বাজিয়ে বিয়ে বসে গেল। ডি জে ট্রাক বেরল, লাল নীল সবজে টিউব আলো লাগানো, গাঁ গাঁ করে জগঝম্প বাজনা মাইকে বাজিয়ে সারাসন্ধে বারাতিদের নিয়ে ঘোরাল, সবাই কত নাচল বম্বের ফিলিমের মত , মেয়েরাও বাড়ির আজকাল নাচে।

মা কিছুতেই যেতে দেয়নি বেলাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলেছে, যাবিনা, ওসব ইশকুলে পড়তে পড়তে বিয়ে বসা আমি পছন্দ করিনা।

বিশাল একটা ভাইরাল জ্বরে পড়ল তপতী হঠাৎ করে। খুব জ্বর কদিন , তারপর অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হল। জ্বর ছেড়ে যাবার পর ও মুখ বিস্বাদ। তপতীর এই অসুখে , আর যাই হোক, বাবার ত আর দোকান যাওয়া বন্ধ হতে পারেনা। তাই বেলাই কদিন স্কুলে গেল না, মাকে সাবুবার্লি করে দেওয়া থেকে শুরু করে সরবতি লেবুর রস করে খাওয়াল। বাবা খুব খুশি । কিন্তু মায়ের মুখ ভারি হয়ে উঠল। অসুখের মধ্যেও কাতরাতে কাতরাতে বলতে লাগল, বেলা তুই বাড়িতে বসে গেলি কেন, ইস্কুল এতদিন কামাই গেলে তোর ত খুব ক্ষতি হয়ে যাবে রে।

মা, মা, তুমি একটু শোন আমার কথা। আমি বন্ধুদের বলেছি আমাকে সব খাতা দিয়ে দেবে আমি টুকে নেব যা পড়া দিয়েছে দিদিমুনিরা। তুমি অত ভেব না মা, আগে ভাল হয়ে ওঠো, লক্ষ্মীটি বলছি।

বেলা মাকে ওষুধ, পথ্যি দিয়ে ফাঁকা সময়ে একটু ঘর গোছাতে থাকে। মায়ের আলমারি খুলে শাড়ি গোছাতে গোছাতে একদিন খুব কাপড় টাপড় দিয়ে বাঁধা এক খানা বান্ডিল পায়, ভেতরে যেন কোন বই। বই দেখলেই পড়তে হবে, বেলা বান্ডিল খুলে ফেলে কী এক অধীর আশায়, আগ্রহে।

শুনশান গরম দুপুর। পাতাও নড়ছে না। কোন শব্দ নেই কোথাও। বহুদূর থেকে কারো ইঁদারা থেকে জল টানার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ ভেসে আসছে। মা এক ঘরে শোয়া। অন্য ঘরের মেঝেতে থেবড়ে বসে বেলা বইগুলো হাতে নিল বান্ডিল খুলে।

কয়েক পাতা গল্পের মত, তা পড়তে পড়তেই তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল।

গায়ের রোম খাড়া করা এসব সে কী পড়ছে। একইসংগে মনে হচ্ছে খুব খারাপ বই, আবার ছাড়তেও পারছে না।

হলুদ মলাটের বইগুলো আরেকবার উল্টে দেখল সে। পাতলা চটি বই সব। মায়ের লক্ষ্মীর আসনে এমন চটি বই ত থাকে, লক্ষ্মীর পাঁচালি, তাছাড়াও পুজোর নির্ঘন্ট, পাঁজি। তেমনি সব পাতলা কাগজের বই। নামগুলো অদ্ভুত। গুরুকরণ, গুপ্তকথা, খট্টাঙ্গের ইতিহাস।

এসব কী? কেন? বান্ডিল করে মায়ের আলমারির তলার তাকেই বা কেন? চটপট আবার বান্ডিলে বেঁধে সে লুকিয়ে ফেলে নিজের বই খাতার বাক্সের একেবারে তলায়। এখনই সব পড়ে নেবে না সে।

সারাদিন তার মাথায় ঘুরতে থাকে যা পড়েছে। একটা যুবকের সঙ্গে তার বিধবা পিশিমার কথা, কাজ, কাজগুলো ভাবলেই তার কান ঝাঁ ঝাঁ করে। ইস্কুলের পাকা মেয়েরা ক্লাসে বসে এইসব কাজের কথা বলে সে শুনেছে। পড়াশুনোয় মন দেবে বলে সেই ফেল করা পাকা মেয়েগুলোকে সে পাত্তা দিত না। অথচ এখন মনে হচ্ছে তারা, ওই পলি, সুরমারা তার থেকে অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি জ্ঞানী ওরা।

পলি আবার সদ্য বিয়ে হয়ে যাওয়া মাধুরীর খুব বন্ধু। সেদিন ডি জে ট্রাকের সামনে নেচেছিল, বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এসেছিল মাধুরী, তখন সে গেছিল মাধুরীর সঙ্গে দেখা করতে। ফিরে সে কী গুজগুজ গল্প ওদের ক্লাস ঘরের পেছন দিকটায় বসে বসে। পাঁচ ছজন মিলে। সদ্য বিয়ে হওয়া একটা মেয়ের সঙ্গে গল্পে কী এত মধু থাকতে পারে, হি হি হাসির থাকতে পারে সেদিন বেলা বুঝতেই পারেনি। আজ বেলার মনে হচ্ছে আসলে বেলাই একটা গাধা। ক্লাসের মেয়েরা আসলে বেলাকে দেখে সবাই হাসে। নয়ত কী!!!

সেদিন ওই দলটার  থেকে হাসি আর হুল্লোড় উঠছিল যখন, তখন কে একটা চেঁচিয়ে ফেলেই চুপ হয়ে গেছিল। এক রাতে ছ বার!!! তারপর সবার হাসির রোলে সব কথা চাপা পড়ে গেছিল।

এই ত সেই গল্প এখানে, এই বইতেও  । ওটা করার গল্প। যেটা ছবার, ওরা বলেছিল। এখানে সারাদিন ধরে দশবার। এসব খারাপ কথা কান গরম করে দিলেও, মন কেন যে বার বার এদিকেই ফিরে যাচ্ছে বেলার। পড়াশুনো মাথায় ওঠে। বায়োলজি বই বার করে প্রজনন তন্ত্রের চ্যাপ্টার খুলে লাইনে লাইনে পড়ে। দিদিমণি এই চ্যাপ্টার পড়ায়নি। বলেছে এসব লজ্জার কথা। মেয়েরা যেন নিজেরা পড়ে নেয়।

ওর বন্ধুরা সবাই সব কিছু জানে। মা-ও জানে তার মানে। মা , বাবা, কে এসব বই কিনেছিল? কে-ই বা বান্ডিল করে বই ওই আলমারির তলায় গোপন করে রেখেছিল। ছিঃ!!! এত্তো অসভ্য বাবা, মা? মা, তার মা ত তার কাছে ভগবান! হায়, আজ এ কী হল। মায়ের এই অধঃপতন কেন ঘটল তার চোখে। লজ্জা পেল। দুঃখ পেল বেলা মায়ের জন্য। কান্না আসছিল তার। ভয় হচ্ছিল।

সবাই বলে বাবা আর মায়েরা কীসব করেছিল। তাই সে জন্মেছে। কী করেছিল প্রজনন তন্ত্রে তা লেখা নেই। শুধু ছবি দেওয়া আছে  দুটো শরীরের।

পরের দিন সারাদুপুর সে আয়নায় নিজেকে দেখতে চেষ্টা করে। মা আজ ভাত পেয়েছে। পথ্যি পাওয়ার পর মা একটু ঘুমোচ্ছে। কেমন খিটখিটে হয়ে গিয়েছে মা, খুব মুখ তেতো তাই অল্প আলুসেদ্ধতে গোটা মশলা ভাজার গুঁড়ো আর লেবু দিয়ে মেখে দিয়েছে আজ বেলা। খেয়ে মা এবার ঘুমোচ্ছে। আর আলমারির আয়নায় দেখছে বেলা নিজেকে। দোর দিয়ে।

এখনো  তপতী অবিন্যস্ত। বেলাকে জোর করে ইশকুলে পাঠিয়েছে। পথ্যি পাওয়ার পর আস্তে আস্তে সব কাজে হাত দিতে হবে। তবু, এখনো সে উঠে আসতে ভয় পায়, বিছানা বালিশ এখনো ঘুমের রেশ ধরে রাখে। জ্বর  নয়, জ্বরের অদ্ভুত স্মৃতি মাথা জুড়ে থাকে। প্রতিদিন সকালের চায়ের  স্বাদ এখন বড় ভাল লাগে। কেমন এক আশ্লেষ । মরা মাছের মত শরীর এতদিন বিছানায় পড়ে ছিল। কোন সাড় ছিল না তার।

আজ আবার সাড় আসছে। বেলা নেই, বর ও কাজে। তপতী একা একা উঠে ঘোরে সারাবাড়ি। মাকে রাঁধতে দেবে না বলে মেয়েটা ইশকুল যাবার আগেই ভাতে ভাত রেঁধে গেছে। নিজে খেয়েছে, বাবাকে দিয়েছে। মায়ের খাবার ঢাকা দেওয়া। মেয়েটা এই কদিনেই যেন কত্তো বড় হয়ে গেল। একেবারে গিন্নি।

এখনো কানটা কেমন যেন বন্ধ। দূর থেকে আসা কোন বাড়ির বাসন মাজার ধাতব শব্দ। ভোঁতা দিন।

সারাবাড়ি ঘুরতে ঘুরতে তপতীর শরীর জেগে ওঠে আবার, মন জেগে ওঠে। খাবার খেতে বসে আলুসেদ্ধতে খানিক লংকা ডলে নেয়, সরষের তেল ঢেলে নেয়।

লংকা পাড়তে বাইরে, রোদ্দুরে বেরুচ্ছিল সে, উঠোনেই আছে লংকার গাছ সব। হঠাৎ গাছ গাছালির মধ্যে একটা কী জিনিস দেখে তার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। মেয়ের খাতা থেকে ছেঁড়া একটা কাগজ, ভিজে মাটির মধ্যে পড়ে আছে। তাইতে একটা ছবি আঁকা, পেনসিলে। দেখতে প্রকৃতিবিজ্ঞান জীববিজ্ঞানের আঁকা প্র্যাকটিসেরই মত। কিন্তু কেমন অসোয়াস্তিতে তপতীর গা গুলিয়ে উঠল।

এ ত বেলাই এঁকেছে! আর কে !

খেতে খেতে অনেক ভাবল সে। প্রথমে ইচ্ছে হয়েছিল খাতার পাতার আঁকাটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর প্রমাণ হিসেবে সেটা ব্লাউজের ভেতরে রেখেছে। মেয়ে ফিরলেই তাকে ধরতে হবে চেপে। এসব কী!

সত্যিই , এই কদিনে মেয়ের হাবে ভাবে কিছু পরিবর্তন ত তপতী দেখেইছে। মুখের ভেতর থেকে চাপা আগুন যেন ঠিকরোচ্ছে তার। তপতী তখন কিছু ভাবেনি। ভেবেছে চিরদিন ত তপতীই রান্নাবাড়া করে। এত বেশি আগুনের সামনে যেতে হচ্ছে মেয়েটাকে। আগুনের তাতেই ওর মুখ ওমন লাল লাল হচ্ছে বুঝি।

উফফফ। ভাবতে পারছে না। জ্যামিতি আর রসায়নে ডুবে থাকা তার মেয়ে বখে গেল! ওই ছবি আঁকে কীভাবে নইলে। উফফফ। এই হতভাগী মেয়ের জন্য কিনা তপতী বরের সঙ্গে লড়াই করেছে। তাকে বিয়ে দিতে মানা করেছে। এখন তপতীরই মনে হচ্ছে যে পোড়ারমুখীকে আর একদিনের জন্যও এই বাড়িতে রাখা উচিত নয়। কী থেকে কী হয়ে যাবে, সমাজের সামনে কলংকের এক শেষ হবে ত! পড়াশুনো ওর আর হবে না। তার চেয়ে বরং শ্বশুরঘর করুক।

কী মনে হল তপতীর। আর কিছু প্রমাণ পায় কিনা দেখতে সে বেলার পড়ার টেবিলের ওপরের খাতা পত্তর হাঁটকাতে লাগল। কী মনে হল, সে টান দিয়ে খুলল বেলার লোহার বাক্স, যার মধ্যে বেলার বইখাতা থাকে।

বিকেলে মেয়ে ফিরল। মা তখন শোয়া। দুপুরের ঘুম এখন জ্বর পরবর্তী। খুব প্রগাঢ়। তাছাড়া ধকল গেছে শরীরে, মনে। বাড়ির টুকটাক সামাল দিয়েছে একা। তাছাড়া মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ত কম হয়নি তপতীর।

মেয়ে জানে না কিছু। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে লোহার গেটের তালা খুলে ঢুকে নিজের ঘরে গেছে। তারপর কলঘরে গেছে। জামা ছেড়েছে।

চা চাপিয়েছে । দুটো প্রজাপতি বিস্কুট দিয়ে চা খেয়েছে। মায়ের চা , বাবার চা রেখেছে ফ্লাস্কে ভরে। মায়ের অসুখের সময়ে বাবাই বড় বাজার থেকে ফ্লাস্ক কিনে এনেছে এসব কারণে।

চা খেতে খেতে আবার নিজের বইখাতার বাক্সো খুলল বেলা। তলায় ওই অসভ্য বইয়ের বান্ডিলটা সে সরিয়ে ফেলবে। আবার চালান করে দেবে মায়ের আলমারির তলার তাকে, ঠিক যেমনটি ছিল তেমনটি রেখে দেবে।

চাঁ করে মাথা ঘুরে গেল বেলার এবার। বইগুলো নেই!!! কে ধরল! তবে কি মা? আজ প্রথম সে ইশকুল গেছে। সারাদিন বাড়িতে মা একা। হয়ত তার বইয়ের বাক্স গুছোতে বসেছিল। কী হয়েছে কে জানে । কিন্তু মা কী ভাবল!!! কী ভীষণ বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল তার। ভয় করতে লাগল। কিন্তু ভয়ের পাশাপাশি একটা চিনচিনে রাগ ও হতে লাগল এবার তার মায়ের ওপর।

মা উঠল যখন, মেয়ে পরিপাটি হয়ে বসেছে মায়ের বিছানার ধারে। গুম হয়ে নিচু মুখে আছে। চোখ খুলে বেলাকে দেখেই সব ভুলে তপতী বলল, কী রে, তুই কখন এলি?

অনেক ক্ষণ।

মা বাথরুম গেল। বেলা তপতীকে ধরে ধরে কলঘর অব্দি নিয়ে গেল। সেবার, যত্নের আদরে মায়ের বুকটা আরামে কুলকুলিয়ে উঠল।

ঘরে ফিরে বসল তপতী। চুল আঁচড়াল। বেলা তাকে চা ঢেলে দিল। বিস্কুট বের করে দিল।

তপতী কিছুতেই সাহস করে উঠতে পারল না বেলাকে বলার, তুই ওইসব বই কোথায় পেলি? কেন অসভ্য সব ছবি এঁকেছিলি খাতায়?

তপতীর ব্লাউজের ভেতর খচমচ করে জানান দিল কাগজের টুকরোটা। পেনসিলে আঁকা বায়োলজির ছবিটা।

বেলাও কিছু বলল না। মা যদি না বলে, সেই বা কেমন করে কথা তোলে।

তবে, মা যদি কখনো তাকে অসভ্য বলে, উত্তর ত তারও তৈরি হয়ে আছে ঠোঁটের ডগায়। আমি অসভ্য! কী করে বল তুমি, মা? তুমিও কি কম অসভ্য? বইগুলো ত তোমারই মা, তোমারই!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত