ভাটির দেশ

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comউত্তরের হাওয়া পথ ঘুরে দক্ষিণে যেতেই গায়ের জড়তা ভেঙে ঝাড়া দিয়ে উঠেছিল পুরো গ্রামটা। সমুদ্দুরের নোনা হাওয়া ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা দানোটাকে জাগিয়ে দিয়েছিল ফের। সীমাহীন এক নীল দিগন্ত হাত নেড়ে ডেকেই চলেছিল কেবল। দুই চোখে ভেসে উঠেছিল সমুদ্দুরের ছবি। রাশি রাশি মাছ।রূপোলী জল। জোলো হাওয়ার ঝাপটা।

সমুদ্দুরের ডাকে একবার যে সাড়া দিয়েছে সমুদ্দুর তাকে বারে বারে ডাকে।তাকে আটকে রাখে সাধ্য কার!

না,আটকে রাখতে পারেনি ফুলিও।বলতে গেলে হাতে পায়েই ধরেছিল।বলেছিল,” আমি যেতি দেবো না তুমারে।” বিস্ময়ে অবাক হয়ে গিয়েছিল মাধাই,” ক্যান?দেবা না ক্যান?”

“সব্বাই বলে সমুদ্দুর হল যোমের দখিন দোর। যারা ওই দোর পেরোয় যায় তারা কেউ ফেরে,কেউ ফেরে না। আমার বাপও তো—”

হেসে উঠেছিল মাধাই,” কতবার আমি ওই দোর পেরোয় গিছি জানো? কই, কিছুই তো হয় নাই আমার।”

-“তবু আমি তুমারে যেতি দেবো না।” 

-“ওই বললি হয়? মালোর পো মাছ না মারলি খাবো কী?”

-“ক্যান? জমিতি যাবা।চাষ করবা।”

-“জমি?ওটুক জমিতি প্যাট ভরবে?”

-“এত মানষির ভরে আর আমাগের ভরবে না?”

“তুমি বড্ড অবুঝ মেইয়ে।”

-“বেশ। আরও যা বলবা বলো কিন্তু যেতি আমি দেবো না।”

এমন একটা বাধা যে আসতে পারে তা মনে মনে ধরেই রেখেছিল মাধাই। জন্মেছে মালোর ঘরে। এসব জানবে না, তা হয়? বাপ হরদেব যতবার সমুদ্দুরে যেত মা তো এমনি করেই আটকানোর চেষ্টা করতো তাকে। তা বলে আটকে কী রাখতে পেরেছে কখনও? রক্তে যার নোনা হাওয়ার মাতন সে তো নোনা হাওয়ার টানেই ছুটবে।বাপও ছুটতো।’ দরিয়ার পাঁচ পীর বদর বদর’ বলে নাও ভাসাতো গাঙে। গহীন গাঙ। বড়ো বড়ো ঢেউ। চাদ্দিক অথৈ জলের সাম্রাজ্য। কত দিন, কত রাত পথ চেয়ে বসে থাকতো মা।বাপ ফিরতো দেড় মাস,  দু’ মাস পর। নোনা হাওয়ার ছোঁয়ায় গায়ের চামড়ায় খরখরে রুক্ষতা। উস্কো খুষ্কো চুল।জবাফুলের মত টকটকে রাঙা চোখ। তা সত্ত্বেও কত খুশি বাপ। নৌকোর খোল ভর্তি মৃত মাছেদের স্তুপ। রাশি রাশি স্বপ্ন। খুশি হত মাও। কদিন বেশ ভালো ভালো রান্না হত বাড়িতে। মায়ের গায়ে উঠতো নতুন লালপেড়ে শাড়ি। পায়ে আলতার টান। খোপায় রঙীন ফিতে। কেমন ঝিম মেরে আসা মুখটায় হাসি ফুটিয়ে তখন কত কথা মায়ের  ফুলি বাঁধা হয়ে দাঁড়াতেই মাধাই বলেছিল,” ইবার সমুদ্দুর থে ফিরে তুমারে একজোড়া দুল গড়ায়ে দেবানি। নতুন বৌ!  কিছু দিতি পারি নেই। আমারও তো তুমারে দিতি সাধ হয়।”

“সাধ হয় বল্যে তুমি সমুদ্দুরি যাবা? মাছ ধরতি হয় নদীতি ধরো। জমিতি ফসল ফলাও। খেতি কাম করো।”

খন কথা হচ্ছিলো তখন সন্ধে উতরে রাত।মাঘ শেষ হয়ে সবে ফাল্গুন পড়েছে। সারাটা মালোপাড়া জুড়ে আঁধারের বেসাতি। গাদা গুচ্ছের তারা পরিস্কার আকাশ পেয়ে বেলকুঁড়ির মত ফুটে আছে। গাঙ পেরিয়ে বয়ে আসা দক্ষিণের হাওয়ায় নোনা গন্ধ।ভাটির দেশে এই গন্ধ মানুষকে পাগল করে।ঘর থেকে বের করে আনে পুরুষকে।

মাটির দাওয়ায় বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে মাধাই বলেছিল,” সারাডা শীত তো এই নদীতি মাছ ধরেই কাটালাম। পালাম কী? দিন শ্যাষে খালি কয়ডা চুনো মাছ। ওই সপ চ্যালা চুঁচড়ো না আছে ধরে সুখ, না বেঁচ্যে।খালি খাওয়া দাওয়াতেই শ্যাষ। হাতে দুডো ট্যাকাও জমলো না যে কিছু এট্টা করি। ইবার সমুদ্দুর থে ফিরে ঘরের চালার টালি নামায়ে টিন দেবো ভাবছি আর আশু স্যাকরার সাথেও কথা হইচে তুমার জন্যি একজোড়া দুল— “

“আমার দুলও চাই নে,টিনির চালার ঘরও চাই নে। খালি তুমি ঘরে থাকো।”

-“ক্যান?”

 -“আমার বড়ো ভয় করে।বাপের কথাডা মনে পড়ে খালি। তুমার মতন করে আমার বাপও বলতো আমার মা রে। আর মাও মানা করতো। বাপ শোনলো না।

দুই চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল এসে জমা হয়েছিল ফুলির। ঘন অন্ধকারের ভেতরেও বুঝি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো মাধাই। বৌকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আচ্ছা যাবো না। অহন তো হাসো একবার।”

না! ফুলি কে দেওয়া কথা রাখেনি মাধাই। রাশি রাশি নোনা হাওয়ায় ডাক পাঠিয়েছিল দখিন দেশ। সে ডাকে ঘরছাড়া হয়েছিল মালোপাড়ার বেবাক পুরুষ মানুষ। দলে দলে নাও ভাসিয়েছিল গাঁয়ের ছেলে বুড়োরা। ঘর ছেড়েছিল মাধাইও। পঞ্চা, গনেশ, হারু, সুবলা, রতন…। 

নতুন বৌ ফুলি। সবাইকে চেনেও না ভালো করে। এক সন্ধেবেলায় সবাই মিলে এসে ধরেছিল ফুলিকে, “তুমার ভয় নাই। আমরাও তো সাথে যাচ্ছি।”

সাঁইদার নিজে এসেছিল ফুলির কাছে।বলেছিল,” পুরুষ মানুষ ঘরে বসে থাকলে তোমারেই যে সবাই দোষ দেবে মাধাইয়ের বৌ। তার চেয়ে যাচ্ছে যাক না। জালে যদি ভালো মাছ পড়ে সারা বছর খাওয়া – পরার আর ভাবনা থাকবে না। তাছাড়া এরাও তো সবাই যাচ্ছে। “

ফুলি বুঝেছিল বাঁধা দিয়ে কোনও লাভ নেই।যে যাওয়ার সে যাবেই। দখিন দেশের ডাক একবার যার আসে তাকে আটকায় সাধ্য কার।

ডাক এসেছিল মাধাইয়ের। মাধাই ঘর ছেড়েছিল সেই ডাকে। এক সকালে নৌকো ভাসিয়েছিল ওরা। ওরা মানে মাধাই, রতন, পঞ্চা, গনেশ, হারু, সুবলা।

গাঙ পাড়ে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ওদের চলে যাওয়া  দেখতে দেখতে বাপের কথাটা বড়ো বেশি করে মনে পড়ে গিয়েছিল ফুলির। এমনি করে এক সকালে নাও ভাসিয়েছিল বাপও। গাঁয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট গাঙ পেরিয়ে কোন বড়ো গাঙ বেয়ে কোথায় চলে গিয়েছিল বাপ আর ফেরেনি। মা-টা কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল শুকিয়ে ফেলেছে। হাজার কাঁদলেও আজ আর দু ফোটা জল বেরোয় না। বাপটা তবু ফেরেনি।ফিরবে কী, সে তো সেই নোনাজলের সমুদ্দুরেই রয়ে গেল। এমনই ঝড় যে নাও শুদ্ধ ডুবিয়ে মারলো সবাইকে। নোনাজলের গহীন বুকে আজও বুঝি বাপটা তার ঘুমায়ে আছে। মা-টা তার ভাবে তেমনই আর তাই আজও মাঝে মধ্যেই গাঙ পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দুই চোখ খুঁজে চলে সেই নাও। যে নাওয়ে চড়ে ঘর ছেড়েছিল মানুষটা।

যাওয়ার সময় একটিবার ফুলির দিকে তাকিয়ে হেসেছিল মাধাই। কোথায় এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেছিল ফুলি। সদ্য বিয়ে হয়েছে তার।স্বামী কোথায় চোখে চোখে রাখবে তাকে, সময় অসময়ে আদর সোহাগে ভরিয়ে দেবে,তা না! ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো মানুষটা। ফিরবে নাকি আর দেড়-দু মাস পর।এতগুলো দিন কীভাবে কাটাবে ফুলি? নতুন ঘর। নতুন সংসার।নতুন মানুষজন। এই সময় ‘মানুষডারে’ কত দরকার ছিল ফুলির।

নৌকোটা ক্রমশ চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেতেই বুকের ভেতর থেকে ঠেলে ওঠা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল ফুলি। গাঙের জল ছুঁয়ে বয়ে আসা নোনা হাওয়ার ঝাপট নাড়া দিয়ে গিয়েছিল তাকে। ফের একবার মনে পড়ে গিয়েছিল বাপের মুখটা। তাকে কত ভালোবাসতো বাপ। বলতে গেলে তার চোখের মনি ছিল সে। বাড়িতে থাকলে কোলে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। গাঙ বাঁধ দিয়ে ঘুরিয়ে আনতো বিকেল বেলায়।ইলিশের মরশুম শুরু হলে নাও নিয়ে বেরিয়ে যেত সমুদ্দুরে। ফিরতো দেড়-দু মাস বাদে।আবার বেরোতো। আবার দেড়-দু মাস। মা-টা পথ চেয়ে থাকতো তার। পথ চেয়ে থাকতো ফুলিও। একদিন বাপ ফিরতো। তারপর ক দিন কত হৈ চৈ।কত আনন্দ। নতুন জামা।একটু ভালো ভালো খাওয়া। ইলিশের মরশুম ফুরোলে সমুদ্দুরে যাওয়া বন্ধ হত তার। বদলে জাল আর তাদের ছোট ডিঙি নৌকোটা নিয়ে সারাদিন খাল-বিল-নদী-খাঁড়িতে মাছ ধরে বেড়াতো। বিকেলে গিয়ে বেচে আসতো কৈখালির বাজারে। সেই বাপ একদিন হারিয়ে গেল। সমুদ্দুর তাকে টেনে নিল আপন ‘ গভ্ভে’।

ভাবতে ভাবতে চোখের কোন দুটো চিক চিক করে উঠেছিল ফুলির। শ্বাশুড়ি জবা হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল,” ও বৌ, তোর হল কী বল দিকিন? আর কতক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকপি? চল, ঘরে চল ইবার।”

আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিল ফুলি।তাকিয়েছিল শ্বাশুড়ির দিকে। শ্বাশুড়ির চোখ দুটোও কী ভিজে উঠেছিল তখন? হয়তো উঠেছিল। তবু নতুন বৌয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,” এ সমায় মন খারাপ করতি নাই রে বৌ। ঘরের মানুষ বাইরে না গেলি সোংসার চলবে ক্যামনে? তোর শ্বউরও কত গেছে।”

হ্যাঁ, মাধাইয়ের মুখ থেকেই তার বাপের বারে বারে সমুদ্দুরি যাওয়ার গল্প শুনেছে ফুলি।নদী-নালায় মাছ ধরতে একদম ভালো লাগতো না মানুষটার। সমুদ্দুরে যাওয়ার কথা শুনলেই এক পায়ে খাঁড়া হয়ে যেত। সমুদ্দুর তাকে টানতো নেশার মতই। চাদ্দিকে খালি জল আর জল। জলের বুকে রূপোলী মাছের সাম্রাজ্য। জাল ফেললেই উঠে আসতো মাছ।কত রকমের মাছ যে ধরা পড়তো জালে।তবে ইলিশ মাছ ধরা  পড়লেই সবচেয়ে খুশি হত মানুষটা। দুই চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠতো সেই খুশির আভা। নাও ভর্তি সেই মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরতো। সে অবশ্য কবেকার কথা।এখন বয়স বেড়েছে। তবু দক্ষিণের দেশ এখনও তাকে টানে। কিন্তু শরীর কুলোয় না বলে যেতে পারে না। তাছাড়া বুড়ো মানুষকে এখন আর নিতেও চায় না কেউ। তবু এক এক সময় ইচ্ছে করে। আর তখনই গিয়ে দাঁড়ায় গাঙ পাড়ে। গাঙের বুক ছুঁয়ে বয়ে আসা নোনা হাওয়ার ঝাপটায় মনে পড়ে যায় সেইসব সমুদ্দুরে যাওয়ার ছবি। বুড়ো হরদেব খুশি হয় খুব। শৈশবের এক সারল্য তখন ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে। কখন দিন ফুরিয়ে সন্ধে হয় খেয়াল থাকে না।সন্ধেবেলার আঁধার চারিদিকে ঘিরে আসতে শুরু করলে বৌ জবা গিয়ে ডেকে আনে তাকে।

বুড়ো তখন বলে,” আরেট্টা বার যদি সমুদ্দুরি যেতি পারতাম! “

বৌ বলে,” সমুদ্দুরি যাওয়ার দিন কী আর তুমার আছে?”

বুড়ো বলে, “দিনগুলোন বড্ড মনে পড়ে গো।চাদ্দিকি কত জল।কত মাছ জলে।নিজির হাতে সেই মাছ ধরার যে সুখ কত।”

বৌ ফের বলে, “আর সেই সুখ দে তুমার কাম নাই। মাধাই বড়ো হইচে। ওই যাক ইবার থে।”

আর কথা বাড়ায় না বুড়ো। বরং আরও খানিক্ষণ চেয়ে থাকে অন্ধকার ঘিরে আসা গাঙের দিকে। গাঙ ছুঁয়ে বয়ে আসা নোনা বাতাস তার ভেতরে স্মৃতি জাগায়। হয়তো বা সমুদ্দুরের বুকে সন্ধে নামা। আঁধারে ঘিরে আসা রাত। নোনা হাওয়ার গন্ধ। হয়তো বা এসবই মনে পড়ে যায়।

মাধাই দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে একটা কষ্ট ঠেলে উঠেছিল ফুলির বুকের ভেতরটায়।শ্বাশুড়ি তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনলেও তার মন পড়েছিল গাঙ পাড়ে। ওই গাঙপথ দিয়েই তো সমুদ্দুরে গেছে মাধাই। নিজের চোখে সমুদ্দুর দ্যাখেনি ফুলি। তবুও সে জানে সমুদ্দুর মানেই অথৈ জলের সাম্রাজ্য। চারদিকে কেবল জল আর জল। সীমাহীন জলরাশির মধ্যে এতটুকু ডাঙার চিহ্ন নেই কোথাও। মাথার ওপর কেবল বিরাট একখানি আকাশ। নিচে শুধুই জল।আর চারপাশে কেবল শূন্যতা।

সেই যে গেল মাধাই, আজ পর্যন্ত এতটুকু খবরও পেল না তার। ফাল্গুন শেষ হয়ে চৈত্রে পড়লো। সে চৈত্র ও এখন যায় যায়।বাতাসের বুকে আগুনের হলকা ছুটতে শুরু করেছে। ভরদুপুরে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। রোদ ঝলমল আকাশ। আকাশে ভাসতে শুরু করেছে এক আধ খন্ড মেঘ। ঝকঝকে নীল আকাশের গায়ে একটু মেঘ দেখতে পেলেই তার দিকে চেয়ে থাকে ফুলি। দক্ষিণ থেকে ভেসে আসা ওই মেঘের গা থেকে সমুদ্দুরের গন্ধ পায়। আর যেন দেখতে পায় মাধাইকে।তার জাল ফেলার দৃশ্য।সেই হাসি মুখ।

অবশ্য খুব বেশিক্ষণ মেঘের দিকে চেয়ে থাকার ফুরসৎ পায় না ফুলি। সারাদিনে বিস্তর কাজের চাপ থাকে তার। সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠতে হয়। তারপর হাঁস-মুরগির খাঁচার দরজা খোলা, উঠোন ঝাটানো, গোয়াল থেকে ছাগল ক’টা বের করে পাতা ভেঙে দেওয়া, তারপর উনুন ধরানো। সকাল সকাল চাট্টি  নাকে মুখে খেয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। বুড়ো হরদেব বেরোয় তারও আগে। সাকুল্যে বিঘে দেড়েক জমি আছে তার। বছর ভর ওই জমিতেই পড়ে থাকে বুড়ো। সংসার চালাতে শ্বাশুড়ি জবা ফুলিকে সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। সারাদিন জাল টেনে ছোট মাছ আর বাগদার মীন ধরে বিকেলে গিয়ে বেচে আসে কৈখালির বাজারে। নতুন বৌ বলেই ফুলিকে বাজারে পাঠায় না। মাছের ঝাঁকা মাথায় নিয়ে মাইলখানেক পথ একাই হেঁটে যায়। ফিরে আসে রাত করে। ততক্ষণে ফের রান্না বসায় ফুলি। বাড়ির সামনে খানিক ধানি জমি। তার পরেই গাঙ। সরু গাঙ বেয়ে খানিক দক্ষিণে এগোলেই বড়ো গাঙে পড়া যায়। ছোট্ট ডিঙি নৌকোটা নিয়ে সেখানেই মাছ ধরে ওরা।কখনও সখনও বা ছোট গাঙেও। নিজের হাতে মাছ ধরার যে কত সুখ তা তারিয়ে তারিয়ে অনুভব করে ফুলি আর ভাবে মাধাইয়ের কথা। সেও হয়তো তখন কোন অথৈ সমুদ্দুরের বুকে জাল থেকে মাছ তুলছে। রাশি রাশি মাছ। রূপোর ঝিলিক।একমুঠো স্বপ্ন।

কদিন ধরে মনটা বড্ড উদাস উদাস হয়ে পড়ছিল ফুলির।মাধাইয়ের ফেরার সময় হয়ে এল বলেই হয়তোবা! শেষ চৈত্রের বাতাসে যেন তারই ফিরে আসার ইঙ্গিৎ।একটু জোরালো হাওয়া এসে যেই নাড়া দিয়ে যেত অমনি উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো ফুলি। দক্ষিণ থেকে ভেসে আসা খন্ড মেঘের দিকে তাকিয়ে মনটা আনচান করে উঠতো। কত সব ভাবনারা এসে জড়ো হত মাথার ভেতর।জোরে জোরে শ্বাস টানতো ফুলি। সমুদ্দুরের গন্ধটা যেন ভেসে আসতো তখন। আর ভেসে আসতো মাধাইয়ের গায়ের গন্ধও।

শ্বাশুড়ি জিজ্ঞেস করতো,” ও বৌ, কী হল তোর?” নির্বাক তাকিয়েই থাকতো ফুলি। জবা ঈষৎ হাসতো,” ও, বুঝছি। মাধাইর কথা মনে পড়ছে তো? তার তো ফেরার সমায় হইয়ে আলো রে বৌ। আজ কালের মধ্যি ফিরে আসপে, দেহিস।”

প্রতিটা দিন, প্রতি মুহূর্ত প্রতীক্ষায় কেটেছে ফুলির। ঘরের মানুষ ফের ঘরে ফিরবে। ফেল খলবল করে উঠবে বাড়িটা। ফের একবার আদর সোহাগে ভরিয়ে দেবে ফুলিকে। ফুলি কেবল ভাবে আর আকাশ দ্যাখে। আর বারে বারে তাকিয়ে থাকে নদী যেতে যেতে আচমকা যেখানে বাঁক নিয়ে ঘুরে গেছে ওদিকটায়। কারন ওই পথ দিয়েই তো ফিরে আসবে মানুষটা। আর সে ফিরে এলেই সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে খুশি। রং লাগবে ফুলির স্বপ্নে। ঘরের চালায় টিন উঠবে।ফুলির কানে দুল উঠবে। কত সব রান্না-খাওয়া। কত আদর-সোহাগ।

রাত্তিরে আবার একলা শুয়ে ঘুম আসেনি তার। চোখের সামনে বারে বারেই ভেসে উঠেছে সমুদ্দুরের ছবি। অথৈ জল।মাধাইয়ের মাছ ধরা। সে এক অন্য জীবন।বিছানা থেকে আলগোছে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে উঠোনে। রাশি রাশি আঁধার দিয়ে ঘেরা আকাশটায় লক্ষ তারার ভীড়ের দিকে তাকিয়েও মনে করার চেষ্টা করেছে মাধাইয়ের মুখ। তার হাসি। তার কথা বলা।তার সোহাগ করার দৃশ্যগুলো। এভাবেই রাত কেটেছে। রাতের পরে দিন। আর তারপরই একদিন ফিরে আসার সময় হয়েছে তার।

কিন্তু না! মাধাই ফেরেনি। দুরন্ত এক কালবৈশাখীর ঝাপটায় সমুদ্দুর তাকে টেনে নিয়েছে আপন ‘গভ্ভে’। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের মত চোখের জল শুকিয়ে ফেলেছে ফুলিও। সে আজও মাছ ধরে। নদীতে যায়।আকাশে মেঘ ভাসলে উদাস হয়ে চেয়ে থাকে। এক একদিন মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যায় ফুলির। দরজার ঝাপটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে ধীর পায়ে হেঁটে উঠোনে নামে।কীসের এক আকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যায় গাঙ পাড়ে। রাতের আঁধার ফেটে বেরিয়ে আসা জ্যোৎস্নায় পথ হাঁটে একা। চারপাশে নীরব রাত্রি। নোনা হাওয়ার ঘ্রাণ। জলের শব্দ।

আর ঠিক তখনই মাধাই আসে।পাশে এসে দাঁড়ায়।হাসে। কথা বলে। বন-বাবলার গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে ফুলিকে আদর সোহাগে ভরিয়ে দেয়। তারপর কখন ফের মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। ক্লান্ত, ধ্বস্ত শরীরটা নিয়ে গাঙ বাঁধে শুয়েই কখন ঘুমিয়ে পড়ে ফুলি।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত