ঘাসেরা জন্ম নিচ্ছে

ঝর্না রহমান জন্ম: ১৯৫৯। কথাসাহিত্যিক ও কবি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, নাটক, কবিতা, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য-সবক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ। তবে গল্পকার হিসেবে তিনি বিষেশভাবে পরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ: ঘুম-মাছ ও একটুকরো নারী, অগ্নিতা, স্বর্ণতরবারি, কৃক্ষপক্ষের ঊষা, নাগরিক পাখপাখালি ও অন্যান্য, পেরেক। কাব্যগ্রন্থ: নষ্ট জোছনা নষ্ট রৌদ্র। নাটক: আদৃতার পতাকা। কিশোর উপন্যাস: বৃদ্ধ ও রাজকুমারী। ১৯৮০ সনে বাংলাদেশ পরিষদ আয়োজিত একুশে সাহিত্য পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ছোটগল্পে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ। আজ ২৮ জুন ঝর্না রহমানের জন্মতিথি তে ইরাবতী পরিবার তাকে জানায় শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

ইরাবতীর পাঠকদের জন্য এই শুভদিনে রইল ঝর্না রহমানের একটি গল্প।


জাহানারা বেগমের চুল কুঁকড়ে যাচ্ছে। মানুষের চুলের নানারকম পরিবর্তনের কথা জানেন তিনি। সবাই-ই জানে। মানুষের চুল বাড়ে, নানা কারণে চুল পড়ে যায়। পড়া চুল আবার গজায়ও। বয়স হলে চুল পাকে। এ সবই চুলের স্বাভাবিক পরিবর্তন। সোজা চুল কুঁকড়ে যাওয়ার কথা তিনি জীবনেও শোনেননি। জাহানারা জানেন মানুষের মাথার চুলের ডিজাইন সহজাত। জন্ম থেকেই চুলের একটা ধরন থাকে মানুষের। সে হিসেবে কারো চুল কোঁকড়া, কারো বা ঢেউ খেলানো। কারো সোজা। কারো শক্ত তারের মতো কারো বা সিলকের মতো নরম মসৃণ। কালো লাল সোনালি খয়েরি নানা রঙও চুলের স্বাভাবিক এবং জাতিগত বৈশিষ্ট্য। আজকাল অবশ্য চুলের ডিজাইন রঙ ধরন সবই মেশিন ও কেমিক্যাল দিয়ে ইচ্ছামতো বদলে ফেলা যায়। কিন্তু আপনা আপনি কারো সোজা চুল কুঁকড়ে যাওয়ার কখনো শোনেননি, নিজের মাথা ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে দেখেনওনি।

জাহানারা বেগমের বয়স বাহান্ন। এতকাল তাঁর মাথার চুল ছিলো স্ট্রেইট। সোজা আর চিক্কণ। যৌবনে তাঁর চুলগুলো ছিলো কালো ঝলমলে মসৃণ সিলকের সুতার মতো। ছোট বেলা থেকেই তাঁর মাথার মাঝখানে সিঁথি। রেশমি কোমল ঘন কালো উজ্জ্বল চুল নিয়ে জাহানারা বেগমের গোপন আনন্দের অন্ত ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই চুল রাখেতেন খুলে। তাতে গরমের দিনে ঘাড়ে পিঠে গরম লাগতো। পিঠ ভিজে যেতো ঘামে। কিন্তু তাতে কী। আয়নায় নিজেকে দেখতে গিয়ে যে মনে হতো তাঁর সিঁথির দুপাশে তাঁতীবাড়ির কালো রঙ করা মসলিন সুতার লাছি ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আর তাতে তাঁকে দেখতে লাগছে চমৎকার – এটা তো দারুণ একটা ব্যাপার। তো এর জন্য কোন মূর্খ গরমকে পাত্তা দেয়!

বয়স বাড়ার সাথে সাথে জাহানারা বেগমের চুলের ঝালর কিছুটা পাতলা হয়ে এলো। তলে তলে সাদা চুলও বাড়তে লাগলো। কিন্তু এসব পরিবর্তন যেন জাহানারা তাঁর মাথাকে টের পেতে দিতে চাইতেন না। বাইরে থেকে কোথাও কোনো রুপালি চুলের দেখা পাওয়া যেতো না। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব সতর্ক। কানের পাশে কপালে সিঁথির পাশে কোথাও একটু রুপালি ঝিলিক দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে আঙুলে পেঁচিয়ে সমূলে উৎপাটন। কখনো ছোট কাঁচি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কুচুৎ কুচুৎ করে কর্তন।

মাস ছয়েক আগে একদিন জাহানারা খেয়াল করেন – তাঁর চুল কুঁকড়ে যা্েচ্ছ। কপালের উপকূলে কয়েকটা কোঁকড়া চুল ঊর্ধমুখী হয়ে উঠেছে। কানের পাশের ছোটো চুলগুলো স্প্রিঙের মতো পেঁচিয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই এগুলোকে সোজা করা যায় না। ধীরে ধীরে মাথাটা যেন তাঁর ভারি হয়ে উঠতে থাকে। সারা মাথায় যেন ছোট ছোট চুলের আর একটা বুনন চলতে থাকে। কিছুতেই এ চুলগুলো বশ মানছে না।

জাহানারা বেগম চিন্তিত মৃুখে দিনে রাতে বহুবার আয়নার সামনে দাঁড়ান। বারবার চুল আঁচড়ান। তেল দিয়ে চেপে দেন। ভেজা চুল আঁচড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ছয়মাসের মধ্যেই তাঁর চেহারা বদলে গেলো। তাঁর মাথায় এখন নিগ্রোদের মতো প্যাচ খাওয়া চুল ফুলে ফেঁপে থাকে। ছেড়ে দিলে ঘন জঙ্গলের মতো মনে হয়।
জাহানারা একটি কলেজের অধ্যাপিকা। মহিলা সহকর্মীদের মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ দু একজন বলে, আপনাকে এখন মিলি আপার মতো দেখায়। মিলি আপার মতো কোঁকড়া চুল হয়ে যাচ্ছে আপনার।

আঁতকে ওঠেন জাহানারা। কী সর্বনাশ, মিলি আপাকে তো দেখায় রাগী পুরুষের মতো। তাঁর চুল ঘাড় ছাটা। ছোট ছোট। কথাও বলেন বাজখাই গলায়। টেলিফোনে তো মিলি আপার কথা একেবারেই ব্যাটা ছেলেদের মতো মনে হয়। সামনাসামনি কথা শুনলে মনে হয় তাঁর গলার ভেতর কাঁসাপেতলের থালাবাটির শব্দ হচ্ছে। মিলি আপা হাসলেও তাঁর চেহারা থেকে রাগের ঝাঁজ কমে না। সেই মিলি আপার মতো হয়ে যাচ্ছে জাহানারা বেগমের চেহারা? রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি। কষে লাগেন চুলের পেছনে।

সহকর্মী নাফিসাকে বলেন- কী করা যায় বলতো! কথা নেই বার্তা নেই, আমার চুলগুলো কেন এমন বদলে যাবে বলো? এমন কি কারো কখনো হয়?

শর্মিলা বলে, হ্যাঁ, হয় তো! কতরকম কাণ্ড হয়! শুধু চুল কেন, পুরো মানুষটাই বদলে যাওয়ার ঘটনা শোনেননি আপা? মেয়ে ছেলে হয়ে যাচ্ছে, ছেলে মেয়ে হচ্ছে। এ রকম তো অনেক শুনেছি। এই সব বদলে যাওয়া মানুষেরা আবার বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে বিয়ে সাদি করে দিব্যি ঘরসংসার করছেন। আপা, আপনি ভালো করে ল করবেন, শরীরের অন্য কোনো অংশে… মানে সেক্স অর্গানে কোনো চেঞ্জ টেঞ্জ….

বালাই, ষাট! শর্মি, তোমার মুখে কি কোনো আগল নেই? কিসের মধ্যে কী আর পান্তা ভাতে ঘি। জাহানারার হয়েছে চুলে সমস্যা, আর তুমি কি না নিয়ে এলে জেনেটিক চেঞ্জের কথা।
শর্মি বর্ষীয়ান সহকর্মী নাফিসা আপার ধমক খেয়ে মোটেও দমে যায় না। সে একাধিক রেফারেন্স তুলে ধরতে থাকে- কবে কোথায় কীভাবে এই সব অনাকাক্সিত ঘটনাগুলো ঘটে গেছে।

নাফিসা আপা তবু বলেন, এধরনের জেনেটিক চেঞ্জ এর একটা বয়স আছে। জাহানারার মতো এই মধ্যবয়সে কারো এ ধরনের সমস্যার কথা শোনা যায়নি।

শর্মি সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্কুলের লাইব্রেরি ম্যাডামের দৃষ্টান্ত নিয়ে আসে।

আমাদের সেই ম্যাডামের মৃত্যু হয় একা ঘরে। ছেলেমেয়ে সবই তাঁর থাকতো বিদেশে। নিঃসঙ্গ মোমেনা ম্যাডাম একলা ঘরে মরে পড়ে থাকলেন। লোকে গিয়ে দেখে দাড়ি গোঁফওয়ালা একজন পুরুষ-মোমেনা ইজি চেয়ারে গুটিশুটি পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছেন।

তবে কথা হচ্ছে মোমেনা ম্যাডামের আগে থেকেই মুখে লোমবাহুল্য ছিলো। আমরা মজা করে বলতাম নারুষ ম্যাডাম। মানে নারী আর পুরুষের সন্ধি। ম্যাডাম সবসময় তাঁর দাড়ি-গোঁফ ছেটে-কেটে রাখতেন। শেষদিকে অসুস্থতার জন্য তা আর পারেননি।

জাহানারা বেগম তখনকার মতো রসিকতা করে বলন- ব্যাটাছেলে হয়ে গেলে ভালোই হবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবো। এতকাল তো নারী হিসেবে নির্যাতিত হয়েই থেকেছি, মেয়েমানুষ থেকে মানুষ হতে পারিনি। মানুষ বলো লোক বলো ব্যক্তি বলো সবই হলে ওই পুরুষ। ওদের হাতেই শাসনদণ্ড। কমাণ্ডিং পাওয়ার। আমাদের হাতে সেই আদ্যিকালের হাতা খুন্তি মুড়ো-ঝাঁটা। আমাদের জন্য কাঁচকলা। যদি সত্যি পুরুষ হয়ে যাই তো প্রথমেই বিধবা কলঙ্ক ঘুচিয়ে ফেলবো। তরতাজা যুবতী একটা বউ নিয়ে আসবো ঘরে। না হয় শর্মিকেই টার্গেট করা যাবে। শর্মি তো এখনও সিঙ্গেল!

শর্মি কলা দেখায়। নো চান্স। বুকড।

-তাতে কী! ওই সব বুকিং টুকিং ভেস্তে যাবে। আমার চুল দেখো, ঠিক কার্তিক ঠাকুরের ময়ূরটির মতো পেখম মেলে ধরেছে। পুরুষ হয়ে গেলে, আমার মাথার এই কুঞ্চিত কেশদাম দেখে তোমার মাথা কি ঠিক থাকবে? ঠিক পটে যাবে।

হাসাহাসি চলে।

পাাশাপাশি চুল কুঁকড়ে যাওয়ার সমাধানও বাতলে দেন যে যেভাবে পারেন। লেবুর রস, চায়ের পাতা ভেজানো পানি, মেহেদির রস, পাকা কলা, খইল বাটা, নিমের পেস্ট -কতরকম দাওয়া!

নাফিসা আপা বলেন – এত চিন্তা কোরো না তো! এটা নিশ্চয়ই তোমার কোনো ওষুধের এফেক্ট। তুমি তো শরীরের ব্যথাবেদনার জন্য ম্যালা ওষুধ খাও। তারই কোনোটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। আমি দেখেছি, আমারে খালাতো বোন কলি আপাকে ক্যানসারের জন্য দুটো কেমোথেরাপি দিতেই মাথা টাক হয়ে গেল, কিছুদিন পরে যা ছিল তার চেয়ে ডাবল চুলে তাঁর মাথা ভরে গেল। তোমারও হয়তো কোনো ওষুধের কারণে চুল পড়ে যাচ্ছে আর অন্য কোনোটার কারণে তার দ্বিগুন গজাচ্ছে। পুরোনো চুলগুলো পাতলা হয়ে গেছে তাই ছোটগুলো ঝলমলে দেখোচ্ছে। তা ছাড়া, ছোট ছোট বলে অমন উড়ু উড়ু হয়ে আছে। আর একটু বড় হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

জাহানারা নিজের মাথা হাতড়াতে হাতড়াতে বলেন, কিন্তু কুঁকড়ে যাচ্ছে যে! তাতে চুল আরও বেশি ঘন মনে হচ্ছে!

শর্মি আবার ফোঁড়ন কাটে -এ তো আপনার সৌভাগ্য জাহানারা আপা, বুড়ো হলে লোকের মাথার চুল পড়ে গিয়ে টাক হয়, আর আপনার তা না হয়ে হচ্ছে উল্টোটা। আপনি বার্ধক্যের দিকে না গিয়ে যৌবনের দিকে যাচ্ছেন মনে হচ্ছে।

তা অবশ্য ঠিক। জাহানারা বেগম দেখেন, তাঁর চুল যে পরিমাণ চিরুনিতে উঠে আসছে গজাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। তাঁর কপালের চৌহদ্দি যেন একটু করে কমে আসছে।

তবে এটাও একটা চিন্তার বিষয়। সত্যিই যদি ওষুধের প্রতিক্রিয়া হয়, তা হলে তো ধীরে ধীরে তার পুরো কপালটাই চুলে ঢেকে যাবে! দেখা যাবে একদিন সিংহের মতো ভুরুর ওপর থেকেই ফুলে ফেঁপে উঠলো ঝাঁকড়া কেশর।

জাহানারা বেগম সাবধানে গোপনে তাঁর কানের জুলপিতে হাত বোলান। দুই গালের কিনার ধরে লোমগুলো কেমন বড় হয়ে উঠছে আজকাল। বড় হয়েই মাথাগুলো লাউকুমড়োর আকর্ষির মতো রিং হয়ে যায়। তার মানে কী? তিনি কি মানবী থেকে কেশরীতে রূপান্তরিত হয়ে যাবেন? নাকি মোমেনা ম্যাডামের মতো নারুষ?

জাহানারার পুত্রবধু বিনু শাশুড়িকে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে। জাহানারারই ডাক্তার। ডাক্তার নূরুল হাসান। আর্থরাইটিসের জন্য ডাক্তার হাসানের কাছে দশ বছর ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।

ডাক্তার বলেন, আর্থরাইস ড্রাগ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এন্টি ক্যান্সার কেমো ও স্টেরয়েড খাওয়ার জন্য এক ধরনের হরমোনাল রেসপন্স দেখা দিচ্ছে তাঁর দেহে। সে কারণে চুলের এই পরিবর্তন হতে পারে।

তবে এ জন্য জাহানারার চিন্তিত হবার কারণ নেই। কিছুদিন ভিটামিন ই ক্যাপ খেলে চুল নমনীয় হয়ে আসতে পারে।

কিন্তু ডাক্তার বলে দিলে কী হবে, চুলের চিন্তা জাহানারাকে ছাড়ে না। আয়নায় প্রতিবারই জাহানারা নিজেকে মোমেনা ম্যাডামের মতো নারুষ হয়ে যেতে দেখেন। মাঝমধ্যে শেভও করতে শুরু করেন। তাতে তাঁর জুলপি আরও ঘন ধারালো হয়ে ওঠে।

দিনের মধ্যে কয়েকবার বাথরুমে ঢোকেন জাহানারা। তাঁর সেক্স অর্গানও কি বদলে যেতে শুরু করেছে? নিজেকে পরীা করতে গিয়ে ব্যথায় ঘাড়ের হাড় মুচমুচ করে ওঠে। তাঁর স্ত্রী-অঙ্গে কোনো পুরুষ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান না। কিন্তু ঝাঁকড়া চুলের ভেতর কেমন জান্তব হয়ে আছে তাঁর নারীভূমি! পাঁচবছর হলো তাঁর মাসিক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান জিনিয়া এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এই বয়সে তিনি নারী-অঙ্গ নিয়ে চিন্তিত হবেনই বা কেন।

জিনিয়ার পাঁচ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান জাহানারার স্বামী হাসিবুল ইসলাম। কাজেই সতর আঠারো বছর ধরে তাঁর শরীর পুরুষের যৌনসংসর্গ থেকে মুক্ত। তিনি কি স্বামীর মৃত্যুর পর কখনো কোনো যৌন ক্ষুধা অনুভব করেছেন? তাঁর দেহ তো ছিলো সম্পূর্ণ সুস্থ! এমন কি এই পঞ্চাশোর্ধ্বতেও জাহানারার দেহ দুরন্তভাবে টঙ্কার-তোলা তীরের মতো তীক্ষ্ণ। তবে কেন তাঁর দেহে কোনো যৌন ক্ষুধা জাগেনি? না কি জেগেছে?

বছর চারেক আগে একবার তাঁর কিছু গায়নোলজিকাল টেস্টের দরকার পড়েছিলো। মেনোপজের সময়টাতে খুব জটিলতা যাচ্ছিলো। নানারকম ইনভেস্টিগেশনের মধ্যে একটা ছিলো মেমোগ্রাম।

পর্দাঘেরা ঘরটিতে টেকনিশিয়ান তরুণীটি যখন যত্ন করে তাঁর বুকের কাছে তুলে ধরা মেমোগ্রাফি প্লেটের ওপর তাঁর আটচলি­শ বছরের ভরাট স্তনযুগল দুহাতে যত্ন করে ধরে দুটো পাকা ফলের মতো বিছিয়ে সেট করে দেয়, তখন উৎকণ্ঠা ছাপিয়েও এক ধরনের অনাস্বাদিত অনুভূতিতে সারা শরীরে বাজনা বেজে উঠেছিলো জাহানারার! নিজের কাছে নিজে লজ্জায় কয়েকদিন যেন মুখ দেখাতে পারেন নি তিনি। লজ্জায় আরও শিউরে উঠতেন, রাতের নির্জন বিছানায় ঘুমের দোলায় দুলতে দুলতে জাহানারা যখন সেই দৃশ্যটি মনে মনে রিওয়াইন্ড করে দেখতেন।

তরুণীর নাম জেনে নিয়েছিলেন তিনি। লাকী। লাকীর সাথে এক অদ্ভুত স্বপ্নচারী সম্পর্ক কি তৈরী করে নিয়েছিলেন না? লাকীর কথা ইদানীং খুব মনে পড়তে থাকে।

যখন আয়নায় মুখ দেনে জাহানারা। রেজর দিয়ে সাবধানে পোঁচ দেন তাঁর নাকের ওপর গজিয়ে ওঠা নরম গোঁফের রেখাটিতে। যখন বগলে আর উরুসন্ধিতে কুঞ্চিত কেশদামের ঘনত্ব পরীা করেন। স্নানের একান্ত মুহূর্তে আনত সুপক্ব ফলের মতো স্তনজোড়া একটু তুলে ধরে অদ্ভুত ঘোরলাগা চোখে যখন চেয়ে দেখেন, তখন লাকী আসে। লাকী তাঁর একান্ত মুহূর্তের দোসর হয়ে ওঠে। লাকীকে ছাড়া যেন তাঁর চলবে না। লাকী যেন জাহানারার দেহের ঘুমন্ত অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে দিচ্ছে।

পানির ধারা নেমে পড়ার মুহূর্তে জাহানারা চামড়ার তলায় অনুভব করেন শিহরন। সাবানের ফেনার ভেতর থেকে দেহের কোষগুলো যেন কেঁপে ওঠে। অদ্ভুত। অদ্ভুত। মধ্যবয়সে পৌছে জাহানারার দেহ এ কি আজগুবি আচরণ শুরু করে দিলো! শর্মির কথাই কি ঠিক? তিনি কি আবার যৌবনের দিকে যাচ্ছেন? তাঁর চুলের মতোই ধারালো হয়ে উঠছে শরীর! শরীরের ভেতর যেন জন্ম নিচ্ছে আর একটা অন্য শরীর।

ডাক্তার, আমার শরীর উল্টোপাল্টা হয়ে যাচ্ছে।
জাহানারার বহুদিনের ডাক্তার নূরুল হাসান। তাঁর কাছে জাহানারার শারীরিক যে কোনো সমস্যার কথা বলতে বাঁধা নেই।
-কি রকম উল্টোপাল্টা?
– চামড়ার তলায় কেমন ঝিমঝিম! ঘাস গজানোর শব্দ পাওয়া যায়।
হাসেন ডাক্তার।
– ছোটবেলায় সুকুমার রায়ের ছড়া পড়েছি। ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রুম করে ফুল ফোটে। আপনি সেরকম ঘাস গজানোর শব্দ শুনছেন? তা-ও চামড়ার তলায়? দারুণ তো?
– অদ্ভুত একরকম বাজনা। তোলপাড় করা বাজনা। আমি ঠিক বোঝাতে পারবো না। জাহানারার মুখে রক্তোচ্ছ্বাস।
– কখন হয় এরকম? এটা তো নতুন সমস্যা? আপনার চুল সমস্যা এখন আর নেই তো?
জাহানারা চুলে হাত বোলান। আছে। কেমন ধারালো। তারের মতো আমার চুল।
ডাক্তার জাহানারার মাথায় আলতো করে হাত রাখেন।
– কী বলেন? কই, ঠিকই তো আছে? এখন আপনার বয়স হচ্ছে। চুল পাকতে শুরু করেছে। চুলের মেলানিন এ সময়ে কমতে শুরু করে। তাতে চুল একটু রু মনে হতে পারে। আপনার তো তা-ও মনে হচ্ছে না।
চুলের ওপর হালকা একটা চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে আনেন ডাক্তার।
– কিন্ত, আমার মুখের লোম? জুলপি, গোঁফ। কেমন ঘন হয়ে যায়।
জাহানারা থুতনিতে তর্জনী ঠেকিয়ে নিজেই তাঁর মুখটি ডাক্তারের দিকে তুলে ধরেন। শিরশির করে সতর্ক হয়ে ওঠে তাঁর রোমরাজি।
ডাক্তার নিবিড় করে কতণ জাহানারার মুখে তাকিয়ে থাকেন। জাহানারার মুখের রক্তাভা কি তাঁর চোখে পড়ে?
ডাক্তার জাহানারার বাহুতে স্টেথো লাগাতে লাগাতে নির্বিকার গলায় বলেন, আপনি অনেক ড্রাগস নিচ্ছেন। মেথোট্রাকস খাচ্ছেন ম্যাক্সিমাম ডোজ। তাতে আপনার লোম বা চুল একটু বেশি রেসপনসিভ হয়ে উঠছে। এটা স্বাভাবিক। নতুন ওষুধগুলো খান, ঠিক হয়ে যাবে।
– কিন্তু, আমার ভয় হয়…।
– কিসের ভয়?
– অনেকের নাকি এভাবে শারিরীক পরিবর্তন…মানে.. মেয়েদের পুরুষ হয়ে যাওয়া…।
হাহা করে হেসে ওঠেন ডাক্তার।
– কে বলে এসব? আপনি তো বরঞ্চ তরুণী হয়ে উঠছেন। চুলগুলো ঘন হওয়াতে আপনার বয়স কম দেখাচ্ছে। এসব আপনার ইমাজিনারি কনসেপ্ট।
বেডে শুয়ে পড়তে বলেন ডাক্তার জাহানারাকে। অস্থিসন্ধিতে চাপ দিয়ে ব্যথা পরীা করেন। পায়ের গোড়ালি থেকে শাড়ি সামান্য ঠেলে ওপরে তুলে জয়েন্টে আঙুলের চাপ দিয়ে হঠাৎ জাদুকরের মতো নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ওঠেন,
– আপনার পায়ের চামড়ার তলায় কি ঘাস গজানোর শব্দ শুনছেন এখন?
জাহানারা কোনো জবাব দেন না।

ডাক্তারের মাথার পেছনে উজ্জ্বল বাতিটা থাকাতে তাঁর মুখে অন্ধকারের পর্দা। কিন্তু বাতির ভেতর থেকে ঝরতে থাকে অজস্র সূক্ষ্ণ  হিম রেশম। তাঁর পায়ের চামড়া বেয়ে শিরশির করে বেয়ে উঠতে থাকে ফিনফিনে আঁশ।

জাহানারা তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয়ে জেগে ওঠা তীব্র ঝাঁকুনি সয়ে নিতে দুচোখ চেপে বন্ধ করেন। শুকনো ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে হাঁ করে দম নেন।

তাঁর সারা দেহে তখন তোলপাড় হয়ে অদ্ভুত এক বাজনা বেজে চলছে। ডাক্তারের আঙুলের তলায় চামড়া ফুঁড়ে বেড়ে উঠতে থাকে আজগুবি ঘাস।

জাহানারা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো আচমকা তাঁর পা টেনে নিয়ে বেডের ওপর দ হয়ে শুয়ে পড়েন।

.

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত