গুপী গাইন বাঘা বাইন ঃ নট আউট ফিফটি


১৯৬৯ সালের ৮ মে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা গুপী গাইন বাঘা বাইনআজ সেই বিখ্যাত সিনেমার পঞ্চাশ বছর। উপেন্দ্রকিশোরের ‘গুপী গাইন’ গল্পের সঙ্গে অনেকখানি পার্থক্য রেখেছিলেন সত্যজিৎ রায় তার এ ছবিতে। উপেন্দ্রকিশোরের গল্প থেকে শিশু ফ্যান্টাসির সঙ্গে এ ছবিতে মিশ্রণ ছিলো বাস্তবতার। গল্পে যেখানে ছিলো গুপী চালাক, বাঘা একটু সাধাসিধে।


গল্পের প্রধান দুই চরিত্র গুপী আর বাঘা। দু’জনেই গান বলতে পাগল, গান গাওয়ার প্রবল আগ্রহ তাদের দুজনের ভিতর। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আগ্রহ দিলেও দুজনকেই রেখেছেন সাংগীতিক প্রতিভাহীন। রাজার বাড়ির সামনে সাতসকালে বেসুরো গান গাওয়ার কারণে আমলকী গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয় গুপী। তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর.. গুপী চললো বহু দূর। গাধার পিঠে চড়ে গ্রামতাড়িত হয়ে কোন এক বাশঝোড়ের মাঝে গুপীর দেখা হয় হরতুকী গ্রামের অধিবাসী বাঘার সাথে যারও ঢোল বাজাতে গিয়ে তার মতই দশা। তাদের দুর্দশা দেখে সেই বাশঝোড়ে ঘুমের মাঝে তাদের সাথে দেখা করেন ভূতের রাজা আর দেন তিন বর। দু’জনে হাত তালি দিয়ে ১) ইচ্ছেমতো খাইতে-পোশাক পড়তে পারা ২) যেখানে খুশি যেতে পারা ৩) গুপীর গলায় ও বাঘার ঢোলে গানের সুর ফিরিয়ে দেয়া, শ্রোতাদের গান শুনিয়ে অবশ করে দেওয়ার ক্ষমতা পায় তারা।

ভাগ্যক্রমে এবার দুজনে মিলে শুন্ডী রাজ্যের রাজাকে গান শুনিয়ে তাঁর সভাগায়ক হয়ে সেখানেই পাকাপোক্ত স্থান নেয়। কিন্তু শুন্ডীর বিরুদ্ধে শুন্ডীর রাজারই আপন ভাই হাল্লার রাজা যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধ থামাতে গুপ্তচরের বেশে হাল্লায় যায় দুজন ও হাল্লার রাজা, মন্ত্রীদের সততা, সঙ্গীত ও বুদ্ধি দিয়ে দিয়ে পরাস্ত করে যুদ্ধ থামিয়ে দেয় তারা। পরিশেষে দুই রাজার মেয়েকে বিয়ে করে রাজার জামাই বনে যায় তারা। শুন্ডীর রাজকন্যা মণিমালাকে স্ত্রী হিসেবে পায় গুপী আর হাল্লার রাজকন্যা মুক্তামালার সঙ্গে জুটি হয় বাঘার।

উপেন্দ্রকিশোরের ‘গুপী গাইন’ গল্পের সঙ্গে অনেকখানি পার্থক্য রেখেছিলেন সত্যজিৎ রায় তার এ ছবিতে। উপেন্দ্রকিশোরের গল্প থেকে শিশু ফ্যান্টাসির সঙ্গে এ ছবিতে মিশ্রণ ছিলো বাস্তবতার। গল্পে যেখানে ছিলো গুপী চালাক, বাঘা একটু সাধাসিধে। হাল্লা রাজা ভালো, শুন্ডী দুষ্টু। ছবিতে এর পুরোটাই উল্টো। মূলত ছোটদের জন্য নির্মাণ করা হলেও গুপী গাইন বাঘা বাইন যেকোন বয়সের দর্শকদের জন্যই সমানভাবে উপভোগ্য।

ছবির অন্যতম আকর্ষণ সত্যজিৎ রচিত গানগুলি। ভূতের রাজা দিলো বর, মহারাজা তোমারে সেলাম, ও মন্ত্রী মশাই, এক যে ছিলো রাজা.. ছবির গানগুলো যেন একটা থেকে আরেকটা সেরা। গুপীর কণ্ঠে অধিকাংশ গানগুলোই গেয়েছেন অনুপ ঘোষাল আর অসাধারণ সঙ্গীতায়োজন সত্যজিৎ রায়ের নিজেরই।

ছবিটি প্রথমে প্রযোজনা করার কথা ছিলো আর ডি বনশলের। রাজনীতির ডামাডোলে সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। চেষ্টা করে ফিল্ম ফিন্যান্স কর্পোরেশনকেও রাজি করানো যায়নি। এরপর প্রযোজক হিসেবে এগিয়ে আসেন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত অভিনেতা প্রযোজক রাজ কাপুর। তবে তার ছিলো একটাই শর্ত, ছবির মুখ্য দুই ভূমিকায় অর্থাৎ গুপী হবেন পৃথীরাজ কাপুর, বাঘা শশী কাপুর। নিজ পছন্দের বাইরে একচুলও আপস করতে নারাজ সত্যজিৎ রায় সেই প্রস্তাব তখনই বাতিল করে দেন। অবশেষে যোগাযোগ হয় নেপাল দত্তের সাথে। পূর্ণিমা পিকচারস থেকে ছবিটি অবশেষে প্রযোজনা করেন নেপাল দত্ত ও অসীম দত্ত।

ওদিকে ছবির চরিত্রায়ন নিয়েও অনেক গল্প রয়েছে। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমার জন্য নাকি প্রথমে কিশোর কুমার গঙ্গোপাধ্যায়কেই ভেবেছিলেন মানিকবাবু (সত্যজিৎ রায়)। কিন্তু পরে পিছিয়ে আসেন তিনি কারণ ততদিনে নাকি কিশোর কুমারের ওজন অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল যা চরিত্রের জন্য মানানসই ছিলো না। শেষমেশ গুপী বাঘা চরিত্রে ছবিতে টিকে যান তপেন চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ। শুন্ডী ও হাল্লার রাজা দ্বৈত চরিত্রে পর্দায় দেখা যায় জটায়ু খ্যাত সন্তোষ দত্তকে। মজার বিষয় হলো ছবিতে ভূতের রাজা চরিত্রের কণ্ঠদান করেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।

১৯৬৮-এর জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছিলো ছবিটির শুটিং। বাশঝোড়ে বাঘের দৃশ্য, হাতে তালি দিয়ে হুন্ডী-ঝুন্ডী-শুন্ডীর যাওয়া দেখাতে গিয়ে সিমলা, জয়সলমীর চলে যাওয়া, হাল্লার যুদ্ধে আকাশ থেকে মিষ্টিবর্ষণ নিয়ে বিস্তারিত গল্প রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের নিজ হাতে লেখা বই ‘একেই বলে শুটিং’ এ। জানুয়ারিতে শুরু ছরি কাজ শেষ হয় সেই বছরের ডিসেম্বরে। পরের বছর জানুয়ারিতে ছবিটি মুক্তির কথা থাকলেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ পেছাতে থাকে ছবি মুক্তির তারিখ। কিন্তু ওদিকে বার্লিন এবং মেলবোর্ন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ছবিটি প্রদর্শনের অনুরোধ আসে। অনেক টালবাহানার পর ১৯৬৯ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গের মিনার, বিজলী, ছবিঘর, গ্লোবে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। ছবিটি মেলবোর্ন, অ্যাডেলেইড, টোকিও, অকল্যান্ডের পুরস্কারসহ ভারতীয় অনেকগুলো চলচ্চিত্র পুরস্কার নিজের করে নেয়।

হিন্দি ভাষায় অ্যানিমেশনের মাধ্যমে রিমেক করা হয়েছিলো এ ছবিটির। ‘গুপী গাইয়াইয়া বাঘা বাজাইয়া’ নামে ওই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন শিল্পা রানাড়ে। এছাড়াও মঞ্চে অসংখ্যবার মঞ্চায়িত হয়েছে এটি। বাংলাদেশে প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইনের প্রযোজনায় মঞ্চায়িত হয়েছে গুপী গাইন বাঘা বাইন।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত