গুপ্তহত্যা…অতঃপর (পর্ব-১)

শুরু হল শাপলা সর্পযিতার ধারাবাহিক গুপ্তহত্যা…অতঃপর। আজ তার প্রথম পর্ব। আগামী কিছু শুক্রবার এই রহস্যগল্পের বাকি পর্বগুলো ঘিরে রাখবে ইরাবতীর পাঠক মনন।

 

প্রায়ই মাঝরাতে তালগাছের মাথা থেকে কারা যেন নেমে আসে ভেতর বাড়িটাতে। এমন কথা লোকমুখে শোনা যায়। মধ্যরাতে কোনো কোনো পাড়া প্রতিবেশিও দেখেছে। আর যখনই এমন ঘটনা ঘটে তখনই মধ্যরাতে খালার পোষা কুকুর বব্ খুব বেশি পরিমাণে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে।

– বব্। বাপ আমার চুপ কর। চুপ কর।

এসব বলে খালা ববকে শান্ত করবার চেষ্টা করেন। তবু

-ঘেউ ঘেউউউ ঘেউউউউ

করে লেজ নাড়াতে নাড়াতে উদভ্রান্তের মতো খালার গায়ে গা ঘষে বব্। কিছু বুঝাতে চেষ্টা করে

-কিছু না। কিছু নয়। তুই শান্ত হ।

বব্ শান্ত হতে পারেনা। গলা উঁচু করে আর্তনাদের মতো সুরে কাঁদতে থাকে

-উউউ আউউউ আউউউ………

খালা ওর গলায় হাত বুলিয়ে দেন

-না না। ওরা আমাদের দেখভাল করে। ওদের ভয় পাবার কি”ছুটি নেই বব্। যা। তোর কাজে যা

পোষা ময়নাটা খাঁচার ভেতরে ছটফট্ করতে করে

-কে? কে? কে?

করে চেঁচিয়ে ওঠে। রাশেদ আরও ছোট বয়েসেও দেখেছে। এখন মনে পড়ে। ছোট খালা সেই সব রাতগুলোতে ঘুম রেখে বিছানা ছাড়েন। বাড়ির এদিক সেদিক হাঁটেন। ববকে আদর করে বুঝাতে চেষ্টা করেন। ময়নাকে কেউ শুনতে না পায় এমন ফিসফিস করে বলেন

-কেউ নয় রে চুপ কর, চুপ কর

ময়না শান্ত হলে পর এক গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমাতে যান আবার। ব্যাস এটুকুই ঘটনা ঘটে। পরদিনই ভোরে  আবার নতুন সূর্য ওঠে। নতুন ফুল ফোটে নতুন সুগন্ধ ছড়িয়ে। গতরাতের কোনো ছায়াছবিই আর ভেসে ওঠেনা দিনের পর্দায়। যদিও ছোট খালার সামনে এসব কথা বলবার সাহস নেই কারো। রাশেদের খুব ইচ্ছে করে খালাকে জিজ্ঞেস করে। কারা এরা? কাদের দেখে বব্ এমন অস্থির হয়ে ওঠে? ময়নাটাও দেখতে পায়? আমরাই কেন দেখিনা? খালা কি দেখেন? কারা? কেন? কত কত যে প্রশ্ন রাশেদের মনে ভীড় করে। কিন্তু খালাকে এ কথা জিজ্ঞেস করবে সে সাহস তারও নেই ।

 

ছোট খাট একটা রাজপ্রাসাদ যেন। পুরো বাড়িটা জুড়ে অনেক লোকজন আর চাকর বাকর। গমগম্ করে সারাদিনই এ বাড়ি। তবু কোথাও যেন কী ঘুপটি মেরে থাকে। রাশেদের এমনই অনুভব হয় যতবারই এখানে আসে। পুরানো আমলের জমিদার বাড়ি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এটা। পোড় খাওয়া হিন্দু রাজা জমিদাররা যখন বাংলাদেশে ছেড়ে চলে যাচ্ছিল একের পর এক। পাকিস্তানি হানাদাররা যখন পরণের কাপড় খুলে চেক করতে লাগলো কে মুসলমান আর কে হিন্দু। হিন্দু হলো তো আর রক্ষা নেই। জানে প্রাণে যখন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে মারা পড়তে লাগলো হিন্দুরা। সাথে বাঙালি মুসলমান রাজাকাররা মিলে প্রবল অত্যাচারে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তখন হিন্দু রাজা জমিদাররাও ফেলে যেতে লাগলো সহায় সম্পত্তি। কেউ কেউ নামমাত্র দামে বিক্রি করে দিচ্ছিল সব। ভিটে বাড়ি বিক্রি করে পাড়ি জমাচ্ছিল ভারতে। ঠিক তখনই রাশেদের খালু নিজামুন্দিন তরফদার বাড়িটা কিনে নিয়েছিলেন। খুব কম দামে। পঞ্চাশ হাজার টাকায় মাত্র। প্রায় ১০ কাঠা জমির উপর বাড়ি। বার চৌদ্দটা বিশাল বিশাল ঘর। সামনের দালানে বড় বড় পিলার। দু’তিনজনে হাত ধরাধরি করেও পিলারগুলোর বেড় পাওয়া যায়না। বাড়ির মাথার উপর আস্ত জোড়া সিংহের মূর্তি। সদর দরজা খুলে বাড়িতে কেউ ঢুকতে গেলে এই জোড়া সিংহের মূর্তি চোখে পড়বেই দূর থেকে।  পেছনে কাচারী ঘর। লাগোয়া বিশাল এক রান্নাঘর। তার পাশেই ভাড়ার ঘর। আরও পেছনে খালি জামিটাতে পুকুর কেটে মাছের চাষের ব্যবস্থা। পেছনের টানা বারান্দা ধরে অনেকটা জমি খালি পড়ে ছিল। সেখানে পেয়ারা বরই জামের গাছ লাগিয়েছেন। নিজামউদ্দিন বাড়িটার রূপ অবিকল রেখেছেন। বদলাননি একটুও। শুধু মাথার উপর জোড়া সিংহের মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলেছেন। সেখানে সমান ভূমিতে নিজের নামে বাড়ির নাম করেছেন নিজামনিলয়। এখন এই এ বছরই বাড়িটার বয়স একশ বছর পূর্ণ হলো। বাড়িতে ঢুকতেই একটা টানা রাস্তা বাঁধাই করে দিয়েছেন যেটা চলে গেছে একদম ভেতর বাড়ির সামনের বারান্দা অবধি। দু’দিকে বেশ বড় করে ফুলবাগান করেছেন। তাতে রোজই নানা রং এর ফুল ফোটে । ফুল গাছগুলোর পাশেই বাড়ির বাউন্ডারীর এক কোণায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা এক তালগাছ। আশে পাশে আরও বেশ কিছু উঁচু উঁচু নারকেল গাছ। ওই গাছগুলোর মাথায় প্রতিদিন অসংখ্য পাখি বসে। আসে বনটিয়ার দল। পেছন বাড়ির গাছের পেয়ারা খায়। তারপর এসে বসে থাকে সামনের অংশে নারকেল গাছের মাথায়। তাল গাছের মাথায়। এই লোকালয়েও কোথা থেকে যেন আসে পাহাড়ি ময়না। শালিক ফিঙে চড়ুই আর টুনটুনির তো আনাগোনা আছেই যখন তখন। আসে কোথা থেকে সব পায়রার দল। খালা প্রায়ই ওদের খেতে দেন। এ বাড়িতে পায়রাগুলোকে কোনো রকম বিরক্ত করা নিষেধ আছে। ছোট খালার খুব বিশ্বাস। প্রায়ই রাশেদ তাকে বলতে শুনেছে

– পায়রা শান্তির দূত। সবার বাড়িতে পায়রা আসেও না। বসবাসও করেনা। পায়রা যে বাড়িতে থাকে সে বাড়িতে শান্তি থাকবেই।

পায়রাগুলো গাছের ওপর থেকে মাটিতেও নেমে আসে। প্রাণভরে হাঁটে। মানুষ চলবার সময় পাশে সরে গিয়ে যাবার পথ করে দেয়। রাশেদের পায়ের কাছে এসেও বসে হেঁটে বেড়ায়। ভয় পায়না। একেবারে নির্ভিক ওরা।  লোকে এও বলে এই বাড়িটাতে মৃত আত্মার আনাগোনা আছে। হিন্দু রাজারা অনেক মানুষকে অন্যায় ভাবে খুন করে নাকি এখানেই পুতে রাখতো কোনো একটা ঘরের মেঝেতে। বহু প্রজাদের লাশ এখানেই একটা জায়গায় গুম করে রাখা থাকতো। সেই সব মৃত আত্মাদের অতৃপ্তি ক্ষোভ এখনও আছর করে আছে বাড়িটার উপর। আর গাছে গাছে বসে থাকা পায়রাগুলো। মানুষের গায়ে গায়ে হেঁটে চলা পায়রাগুলো? এ বাড়ির বহুকালের সদস্য। এদের কারণেই বাড়িটার কোনো ক্ষতি করতে পারছেনা তারা। বহু পরে ওই ঘরটার উপর দালান তোলা হয়েছে। রাশেদ অনেকবারই বেড়াতে এসেছে এখানে। বাবা বড় কোনো ট্রেনিং এ গেলে খালার বাড়িতে রেখে যেতেন তাদের। ছোট ছোট ভাইবোন নিয়ে মা একা থাকতে পারেননা। তাই প্রায় বছরই একবার তাদের ওই বাড়িতে মাস খানেক থাকা পড়ে।  বাড়িটাতে এলে খুবই আনন্দ হয়। প্রচুর মানুষ এখানে। কিন্তু রাশেদের খেলার সাথি নেই একটিও এখানে। এ বাড়িতে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। এত্তগুলো খালাত বোন। একটিমাত্র ভাই। সেও আবার তার চেয়ে অনেক বড়। সারাদিন একা একা সারাটা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে অবশ্য মন্দ লাগেনা রাশেদের। শুধু একটা ঘরকে তার কেন যেন বেশ ভয় ভয় লাগে। তবু ওই ঘরটার প্রতি কৌতুহলও রয়েছে। যতবারই আসে মনে মনে রাশেদ খোঁজে সেই ঘর। কোনটা হতে পারে। আদৌ কি এমন কোনো ঘর রয়েছে? এ বাড়িতে? মা যতই নিষেধ করেন

ওদিকে ..ওই যে ও..দিকটায় যাসনে কিন্তু কখনও

বলে মা কোন দিকটা যে নির্দেশ করেন আজও স্পষ্ট করে ঠাহর করতে পারেনা রাশেদ। তবু কেমন যেন এক দুর্নিবার নেশা ওদিকেই টেনে নেয় তাকে। বাইরে পুকুর ঘাটের কাছে ভাড়ার ঘরের ঠিক উল্টো পাশে লাগোয়া ঘরটা। যে ঘরটা পুরো বাড়িটা থেকে একদম শেষে। কখনো বিয়ে শাদিতে খুব বেশি লোকজন হয় যদি। তখন এই ঘরটা কাজে লাগে। না হলে ওদিকে কারো যাতায়াত নেই বললেই চলে। অনেক দেরীতে এই ঘরটা তোলা হয়েছে । এটুকু রাশেদ জানে।

এখানে তার গল্প করবার মত কেউ নেই। আছে এখানে কেবল একটিমাত্র কাজের ছেলে। রহিমুদ্দিন। সবাই রহিম বলে ডাকে। বাড়ির সবার ফুট ফরমাস খাটে। বাইরে বাজার করা। দোকানে এটা সেটা আনতে যাওয়া। বাড়ির মেয়েরা স্কুলে যাবার সময় রিক্সা ডেকে বাড়ির গেট পর্যন্ত নিয়ে আসা। এসবই তার কাজ। বয়স কত হবে? রাশেদ আন্দাজ করে চৌদ্দ পনের হবে বড়জোর। তারই কাছাকাছি বয়সটা। রাশেদ এবার সতেরো পার হলো। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে। খালার বাড়িতে এসেছে অবসরে বেড়াতে। এবার একা। মা সাথে নেই। বাড়ির সামনের বারান্দাটায় বসে ছিল রাশেদ। শেষ বিকেলে হালকা আলোয় …হঠাৎ একটা গুলির শব্দে সামনে তাকায় রাশেদ। এরই মধ্যে এক জোড়া পায়রা ঝুপ করে পায়ের কাছে এসে পড়ে ওর। শরীর রক্তে ভেসে গেছে। কোলে তুলে নেয় ওদের। ততক্ষণে ছোট খালা দৌঁড়ে এসেছেন গুলির শব্দে। কাজের ছেলে রহিমও আসে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে

-আয় হায় হায় আম্মাআ আ আ দেহুইন দেহুইন। কারা জানি গুলি করছে পায়রাগুলারে। আহারে

– কারা? কারা গুলি করেছে?

-বাহির থাইক্যা কেউ অইবো আম্মা।

-দরজা খোল। দেখ। কারা এরা । কারা গুলি করেছে দেখ।

 

আগামী শুক্রবারে পরের অংশ পড়ুন…

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত